📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 সবাইতো সুখী হতে চায়, কিন্তু,

📄 সবাইতো সুখী হতে চায়, কিন্তু,


যে পথে চললে সুখ পাওয়া যায় সে পথে কম লোকই চলে। সুখের পথ সম্বন্ধে তিনটি বিষয় নিয়ে আপনাকে ভেবে দেখতে হবে।

১. যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান বিষয় বানায় না, সে অবশেষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শেষ হয়ে যাবে। “আমি অচিরেই তাদেরকে ক্রমে ক্রমে শান্তি দিয়ে এমনভাবে ধ্বংস করে ফেলব যে তারা টেরও পাবে না।” (৭-সূরা আল আ'রাফ: আয়াত-১৮২)

২. সুখ লাভের আশায় মানুষেরা বিভিন্ন জটিল ও চাতুর্যপূর্ণ পথ অনুসরণ করে। তারা খুব কমই জানে যে, ইসলাম ধর্মে তাঁদের জন্য একটি সহজতম পথ প্রস্তুত করাই আছে। সে পথ তাঁদের জন্য সর্বোত্তম ইহজীবন ও পরকাল বয়ে আনবে। “কিন্তু তোমাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল যদি তারা তা (অনুসারে কাজ) করত তবে অবশ্যই তা তাঁদের জন্য ভালো হতো এবং (চিত্তের) স্থিরতার জন্য তা দৃঢ়তর হতো।” (৪-সূরা আন নিসা: আয়াত-৬৬)

৩. এ পৃথিবীতে অনেক লোক আছে যারা মনে করে যে, তারা ভালো কাজ করছে। কিন্তু আসলে তারা ইহজীবনে ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধুমাত্র এ কারণে যে, তারা সত্য ধর্মকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করছে। “আর সত্য সত্ত্বাই এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে তোমার প্রভুর বাণী পূর্ণ হয়েছে।” (৬-সূরা আল আ'নআম: আয়াত-১১৫)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 সুদিনে কৃতজ্ঞ থেকে দুর্দিনের জন্য প্রস্তুত থাকুন

📄 সুদিনে কৃতজ্ঞ থেকে দুর্দিনের জন্য প্রস্তুত থাকুন


আরাম, শান্তিতে ও সুস্থ থাকাকালে প্রায়ই প্রার্থনা করুন। মুমিনের চরিত্র হলো যে, সে শোকরগোজার ও পাকা নিয়তকারী (কৃতজ্ঞ ও স্থির সংকল্প)। সে ধনুক তীর থেকে নিক্ষেপ করার আগেই ওটাকে ধার দিয়ে নেয় এবং মুসিবতে পড়ার আগেই সে আল্লাহর মুখাপেক্ষী হয়। এ বিষয়ে মুমিনদের বিপরীত হলো ইতর কাফের ও অবিবেচক (বোকা) মুমিন।

“আর যখন মানুষকে কোন ক্ষতি স্পর্শ করে তখন সে বিনীতভাবে বা একনিষ্ঠভাবে তাঁর প্রভুকে ডাকে; অতঃপর যখন তিনি তাঁর পক্ষ থেকে তাঁকে কোন নেয়ামত দান করেন, তখন সে যে তাঁর নিকট আবেদন করত সে কথা সে ভুলে যায় এবং সে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করায়।” (৩৯-সূরা আয যুমার: আয়াত-৮)

অতএব, যদি আমরা সত্যিই নিরাপদ থাকতে চাই তবে আল্লাহর নিকট আবেদন (দোয়া) করব এবং আল্লাহর প্রশংসায় আমাদেরকে অবশ্যই অটল থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বা সুখের সময় আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করার উদ্দেশ্য হলো (ইমাম হালীমির মতে): আল্লাহর প্রশংসা করা, তাঁর শোকরিয়া আদায় করা ও তাঁর অগণিত করুণাকে অনুধাবন করা এবং একই সময়ে হেদায়েত ও সাহায্য চাওয়া। আপনার ক্ষতি-বিচ্যুতির জন্য ক্ষমা চাওয়াও জরুরি। আল্লাহর যে হক আপনার উপরে আছে আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন তা আপনি কিছুতেই পুরাপুরিভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন না।

নির্দিষ্ট ও নিরাপদ অবস্থায় যে ব্যক্তি সে অধিকার সম্পর্কে অমনোযোগী থাকে সে নিম্নোক্ত আয়াতের মধ্যে উল্লেখিত লোকদের দলে পড়ে— “আর যখন তারা নৌযানে চড়ে তারা আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাসকে খাঁটি করে তাঁকে ডাকে, কিন্তু যখনই তিনি তাদেরকে স্থলভাগে উত্তীর্ণ করেন তখনই তারা আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করে।” (২৯-সূরা আনকাবুত : আয়াত-৬৫)

সালাতে থাকাকালে আমাদের জাহাজকে রক্ষা করার জন্য আমরা তাকে ডেকেছি! কিন্তু যখন আমরা নিরাপদে তীরে ভিড়েছি তখন আমরা তাঁর অবাধ্যতা করেছি! আর আমরা নিরাপদে ও শান্তিতে আকাশে উড়ছি; অথচ আমরা পড়ে যাই না; কেননা, (আমাদের) রক্ষক হলেন আল্লাহ!

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 আমি কি আপনার বক্ষকে প্রশস্ত করে দিই নি?

📄 আমি কি আপনার বক্ষকে প্রশস্ত করে দিই নি?


“(হে মুহাম্মাদ!) আমি কি আপনার বক্ষ প্রশস্ত করে দেইনি?” (৯৪-সূরা আল ইনশিরাহ : আয়াত-১)

নবী করীম ﷺ-এর উপর এমন কিছু বাণী নাযিল হয়েছে যা চরিত্রে প্রস্ফুটিত হয়েছিল। তাঁর মন শান্তিতে ছিল এবং তিনি ছিলেন সাহসী। রাসূল ﷺ ছিলেন আশাবাদী ও সহজভাবে তাঁর কাজকর্ম করে যেতেন। তিনি মানুষের মনের মানুষ ও শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। যদিও তিনি জনগণের কাছের মানুষ ছিলেন, সদা হাসি মুখে থাকতেন তবুও সর্বদা তাঁর নিকট মর্যাদা ও সম্মানবোধ ছিল। তাঁর চরিত্র ছিল পূর্ণ ও অনুপম।

তিনি অনেক কোমলতা দেখিয়ে শিশুদের সাথে খেলা করতেন এবং মেহমানকে খোলামেলা অভ্যর্থনা করতেন। কেননা, তিনি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ায় সুখী ছিলেন। হতাশা ও ব্যর্থতা তাঁর নিকট সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। বরং তিনি অনুকূল আশাবাদকে সমর্থন দিতেন। জাঁক, বড়াই, কৃত্রিমতা, মুনাফেকি, অপচয় ও অসংযম তাঁর নিকট খুবই ঘৃণার বস্তু ছিল। উপরোক্ত সকল চরিত্রের পরম পরাকাষ্ঠা তিনি ছিলেন—একথা সহজে বলা যায়। সত্যিকার অর্থেই রাসূল ﷺ মহান ছিলেন, কেননা তিনি ছিলেন সত্য বার্তাবাহক, সম্মানজনক মূলনীতির অধিকারী, একটা গোটা জাতির জন্য আদর্শ এবং শিক্ষক, পারিবারিক ও সামাজিক মানুষ এবং বহু গুণের অধিকারী। সংক্ষেপে, তিনি ছিলেন সকল কল্যাণের দিকে পরিচালিত ব্যক্তি।

“তাদের উপর যে বোঝা ও শৃঙ্খল ছিল তিনি তাদের থেকে তা সরিয়ে দিবেন।” (৭-সূরা আল আরাফ : আয়াত-১৫৭)
“সমগ্র বিশ্ব জগতের জন্য রহমতস্বরূপ।” (২১-সূরা আল আম্বিয়া : আয়াত-১০৭)
“সাক্ষী, সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী, আল্লাহর হুকুমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী এবং আলো বিকিরণকারী বাতিস্বরূপ।” (৩৩-সূরা আহযাব : আয়াত-৪৫-৪৬)

ইসলাম ও এর সহজ অনুসরণীয় বাণীর বিপরীত হলো বারীজীদের বাড়াবাড়ি, সুফীদের বোকামী ও বাড়াবাড়ি, কবিদের আবেগতাড়িত অদম্য ভালোবাসা এবং ইহুদীজন-পূজারীদের অসার দম্ভ। “অতপর, মুমিনরা যে বিষয়ে মতপার্থক্য করত আল্লাহ নিজ ইচ্ছায় তাদেরকে সে বিষয়ে সত্য পথ প্রদর্শন করলেন। আর যাকে ইচ্ছা আল্লাহ তাকে সরল পথ প্রদর্শন করেন।” (২-সূরা বাকারা : আয়াত-২১৩)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 তাহলে সুখ কী?

📄 তাহলে সুখ কী?


“এ দুনিয়াতে এমনভাবে থাক যেন তুমি একজন বিদেশী অথবা পথিক।” (অর্থাৎ বিদেশীর মতো বা পতিকের মতো হাল্কা বোঝা নিয়ে জীবনযাপন কর।)

আব্দুল মালেক ইবন মারওয়ান প্রসঙ্গে আছে, হারুনুর রশীদের সেনাবাহিনীতে, ইবনে জাসসাসের অট্টালিকায়, কারুনের ধনভাণ্ডারে অথবা গোলাপের বাগানে সুখ নেই। কল্যাণ ও সুখ নবী করীম ﷺ-এর সাহাবীদের (রা) ভাগ্যে ছিল, যদিও তারা গরীব ছিলেন এবং কঠিন জীবনযাপন করতেন। ইমাম বুখারী (র)-এর সুখ হলো হাদীস সংগ্রহের মাঝে, হাসান বসরীর সুখ ছিল তাঁর সত্যবাদিতার মাঝে, ইমাম শাফীঈ (র)-এর সুখ ছিল তাঁর অনুসিদ্ধান্তের মাঝে, ইমাম মালেক (র) এবং ইমাম আহমদের (র) সুখ ছিল তাঁদের আত্মসংযমের মাঝে এবং হাবিদ আল-বাল্লুয়ির সুখ ছিল তাঁর ইবাদতে।

“কেননা, আল্লাহর রাস্তায় তাদের যে পিপাসা, ক্লান্তি ও ক্ষুধা হয়, কাফেরদের ক্রোধ উদ্রেককারী যে পদক্ষেপ তারা নেয় এবং শত্রুদের পক্ষ থেকে তারা যে আঘাতপ্রাপ্ত হয় তা তাদের জন্য আমলে সালেহেই লিপিবদ্ধ করা হয়। নিশ্চয় আল্লাহ আমলে সালেহকারীদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।” (৯-সূরা তাওবা : আয়াত-১২০)

সুখতো আর টাকার চেক, কেনা গাড়ি বা শাম্পু করে ওঠানো তেল নয়। সুখ হলো সত্যের উপর থাকার ফলে উৎপন্ন শান্তি, সুখ হলো সুপরিপূর্ণ বিচক্ষণ, নির্ভরযোগ্য ও উপকারী নিয়মনীতি অনুযায়ী জীবন-যাপন করার ফলে অর্জিত মনের শান্তি এবং সুখ হলো ভালো জীবনযাপন করার ফলে সৃষ্ট শান্তভাব। আমরা ভাবতাম যে, যদি আমরা আরো বড় একটি বাড়ি কিনতাম, আরো জিনিস-পত্র থাকত, যদি সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি এবং জীবনকে সহজতর করে এমনসব মেশিন-পত্র কিনতাম, তবে আমরা সুখী ও আনন্দিত হতাম। কিন্তু পরে যখন দেখলাম এ জিনিসগুলোই আমাদের জীবনের দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা ও সমস্যার কারণ তখন আমরা এতে বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম।

“দুনিয়ার জীবনের যে জাঁকজমক ও সৌন্দর্য তাদের কিছু দলকে পরীক্ষা করার জন্য আমি ভোগ করতে দিয়েছি, আপনি কিছুতেই সেদিকে আপনার চোখদ্বয়কে প্রসারিত করবেন না।” (২০-সূরা ত্বাহা : আয়াত-১৩১)

হেদায়েতের বার্তাবাহক মুহাম্মাদ ﷺ ছিলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কারক। আর্থিকভাবে তিনি ছিলেন দরিদ্র; মাঝে মাঝে ক্ষুধা মেটানোর জন্য একটি নিম্নমানের খেজুরও পেতেন না। এসব সমস্যা, জটিলতা ও কষ্ট সত্ত্বেও রাসূল ﷺ এমন এক অনুপম পর্যায়ে কল্যাণ ও শান্তির জীবনযাপন করতেন, যার প্রসারণ ও বিস্তার মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না।

“আর আমি আপনার থেকে বোঝাকে (দুশ্চিন্তাকে) দূর করে দিয়েছি, যা আপনার পিঠ ভেঙে দিয়েছিল।”
“এবং আপনার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ খুবই মহান।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-১১৩)
“আল্লাহ ভালোই জানেন কাকে তাঁর রিসালাত দিবেন।” (৬-সূরা আন’আম : আয়াত-১২৪)

একটি নির্ভরযোগ্য হাদীসে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম ﷺ বলেছেন- “উত্তম চরিত্রই পুণ্য আর তোমার বিবেক যে কাজে বাধা দেয় এবং মানুষ তা জানুক তা তুমি পছন্দ কর না তাই পাপ।” পুণ্যকর্ম (আমলে সালেহ) বিবেক ও আত্মা উভয়কেই শান্ত করে বা শান্তি দেয়। নবী করীম ﷺ বলেছেন- “পূণ্যকর্ম হল মনের প্রশান্তি আর পাপ হলো মনের অনিশ্চয়তা (সন্দেহ)।”

পুণ্যকর্মকারী সর্বদা শান্তিতে থাকেন আর পাপী তাঁর চারিদিকে কি হচ্ছে তা নিয়ে সর্বদা সতর্ক ও সন্দেহ প্রবণ। “তারা মনে করে প্রতিটি চিৎকারই তাঁদের বিরুদ্ধে (উচ্চারিত হচ্ছে)।” (৬৩-সূরা মুনাফিকুন : আয়াত-৪)

“যারা ঈমান আনে এবং তাঁদের ঈমানকে জুলুমের সাথে মিশিয়ে ফেলে না তাঁদের জন্য রয়েছে নিরাপত্তা এবং তারাই হেদায়েতপ্রাপ্ত।” (৬-সূরা আন’আম : আয়াত-৮২)

আক্ষরিকভাবে সুস্থ মুসলিম হওয়া রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের মালিক হওয়ার চেয়েও ভালো। কেননা, পার্থিব বিশাল সম্পদের মালিক হওয়ার চেয়ে মুসলিমের নিকট আত্মিক শান্তি বেশি ভালো। কেননা, ধর্ম (দীন ইসলাম) আপনি বেহেশতের বাগানে বসতি গড়া পর্যন্ত আপনার সাথে থাকবে। ক্ষমতা ও পদমর্যাদা শুধুমাত্র ক্ষণস্থায়ী ও নশ্বর। “নিশ্চয় আমি পৃথিবী ও এর উপর যা কিছু আছে সব কিছুরই মালিক এবং আমার নিকটই সব কিছু ফিরিয়ে আনা হবে।” (১৯-সূরা মারইয়াম : আয়াত-৪০)

ফন্ট সাইজ
15px
17px