📄 শান্তির মূলকথা
ড. হাসসান শামসী পাশা ১৯৯৪ সনের কোন এক সংখ্যায় আহলান-সাহলান নামক পত্রিকার “দুশ্চিন্তা দূর করার বিশটি উপায়” নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। নিম্নে তার সারমর্ম দেয়া হলো-
১. আপনার জীবনকাল (অর্থাৎ আয়ু কত বছর তা) নির্ধারিত করা আছে, কেননা সব কিছুই তাকদীর (পূর্ব নির্ধারিত বিধান) অনুসারেই ঘটে। অতএব সে বিষয়ে দুশ্চিন্তা করার কোন প্রয়োজন নেই।
২. আমাদের প্রত্যেকের কতটা পরিমাণ রিযিক গ্রহণ করব তা সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহর নিকটেই। অন্য কেউই সে রিযিকের মালিক নয় বা আপনার থেকে তা ছিনিয়ে নেয়ার ক্ষমতা অন্য কারো নেই।
৩. অতীত তার সকল দুঃখ-কষ্ট নিয়ে চলে গেছে। সমগ্র মানবজাতিও যদি একযোগে তাঁকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে, তবুও তা ফিরে আসতে পারে না।
৪. ভবিষ্যৎ অদৃশ্য জগতের অন্তর্ভুক্ত এবং এখনও তা আসেনি। আপনার অনুমতি বা অনুভূতি প্রতি কোনরূপ শ্রদ্ধা প্রদর্শন না করেই এটি বিস্ময়াদি নিয়ে আসে। অতএব এটা সত্যি সত্যি আগমন করার আগেই এটাকে ডাকবেন না।
৫. অন্যের উপকার করলে নিজের মনে শান্তি পাওয়া যায়। একটি ভালো কাজ বা কল্যাণমূলক কাজ দাতাকে গ্রহণীয়তার তুলনায় অনেক বেশি দয়া (রহমত), পুরস্কার ও শান্তি ইত্যাদি বহুবিধ উপকার করে।
৬. মু'মিনের একটি মহৎ গুণ হল যে, সে মিথ্যা সমালোচনার ধার ধারে না, কেউ সমালোচনা থেকে বাঁচতে পারে না। এমনকি সমগ্র বিশ্ব জগতের প্রতিপালক, নিখুঁত মহান আল্লাহও না। (মানুষ আল্লাহ তায়ালাকেও গালি দেয়, সুতরাং আপনি কেন মনে করেন যে, আপনাকে কেউ গালি দিবে না, কেউ আপনার সমালোচনা করবে না। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানব নবীদেরকে প্রত্যেক জাতি মিথ্যা বলেছে, তাদেরকে কষ্ট দিয়েছে; এমনভাবে সকল মহানবীগণও একই অবস্থার শিকার হয়েছে।)
📄 সুখ স্বর্গীয়
ভূমিকা দিন দিন এমন যায় (উদ্দেশ্য-যে দিনকার আয় সে দিনেই খেয়ে শেষ করে) এমনটা দেখা অসাধারণ কিছু নয়। তবুও তাঁদের অনেকেই সুখী, শান্তিপূৰ্ণ এবং শক্তিশালী ও প্রশান্ত আত্মার অধিকারী। এর কারণ হলো-তারা এত ব্যস্ত যে তারা গতকাল বা আগামীকাল সম্বন্ধে ভাববার সময় পায় না। তাঁদের জীবন যাপন ধারণা তাঁদের শুধুমাত্র আজকের দিনের মূল্যায়নই শিক্ষা দেয় বা আজকের দিনটির গুরুত্ব বুঝতে দেয়, একারণেই তারা অন্য কিছু নিয়ে ভাবার সুযোগ পায় না।
যারা অরাজিকতায় বাস করে তাদের সাথে এদের তুলনা করে দেখুন। কার্যহীনতা ও অবসর সময় মুমিনরা তাঁদের সমস্যা ও জীবনের উদ্দেশ্যহীনতা নিয়ে ভাবতে প্রচুর সময় যোগায়। এভাবে তাঁদের অনেকেই দিন-রাত দুর্দশা ও দুশ্চিন্তা আক্রান্ত করে।
📄 সবাইতো সুখী হতে চায়, কিন্তু,
যে পথে চললে সুখ পাওয়া যায় সে পথে কম লোকই চলে। সুখের পথ সম্বন্ধে তিনটি বিষয় নিয়ে আপনাকে ভেবে দেখতে হবে।
১. যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান বিষয় বানায় না, সে অবশেষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শেষ হয়ে যাবে। “আমি অচিরেই তাদেরকে ক্রমে ক্রমে শান্তি দিয়ে এমনভাবে ধ্বংস করে ফেলব যে তারা টেরও পাবে না।” (৭-সূরা আল আ'রাফ: আয়াত-১৮২)
২. সুখ লাভের আশায় মানুষেরা বিভিন্ন জটিল ও চাতুর্যপূর্ণ পথ অনুসরণ করে। তারা খুব কমই জানে যে, ইসলাম ধর্মে তাঁদের জন্য একটি সহজতম পথ প্রস্তুত করাই আছে। সে পথ তাঁদের জন্য সর্বোত্তম ইহজীবন ও পরকাল বয়ে আনবে। “কিন্তু তোমাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল যদি তারা তা (অনুসারে কাজ) করত তবে অবশ্যই তা তাঁদের জন্য ভালো হতো এবং (চিত্তের) স্থিরতার জন্য তা দৃঢ়তর হতো।” (৪-সূরা আন নিসা: আয়াত-৬৬)
৩. এ পৃথিবীতে অনেক লোক আছে যারা মনে করে যে, তারা ভালো কাজ করছে। কিন্তু আসলে তারা ইহজীবনে ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধুমাত্র এ কারণে যে, তারা সত্য ধর্মকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করছে। “আর সত্য সত্ত্বাই এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে তোমার প্রভুর বাণী পূর্ণ হয়েছে।” (৬-সূরা আল আ'নআম: আয়াত-১১৫)
📄 সুদিনে কৃতজ্ঞ থেকে দুর্দিনের জন্য প্রস্তুত থাকুন
আরাম, শান্তিতে ও সুস্থ থাকাকালে প্রায়ই প্রার্থনা করুন। মুমিনের চরিত্র হলো যে, সে শোকরগোজার ও পাকা নিয়তকারী (কৃতজ্ঞ ও স্থির সংকল্প)। সে ধনুক তীর থেকে নিক্ষেপ করার আগেই ওটাকে ধার দিয়ে নেয় এবং মুসিবতে পড়ার আগেই সে আল্লাহর মুখাপেক্ষী হয়। এ বিষয়ে মুমিনদের বিপরীত হলো ইতর কাফের ও অবিবেচক (বোকা) মুমিন।
“আর যখন মানুষকে কোন ক্ষতি স্পর্শ করে তখন সে বিনীতভাবে বা একনিষ্ঠভাবে তাঁর প্রভুকে ডাকে; অতঃপর যখন তিনি তাঁর পক্ষ থেকে তাঁকে কোন নেয়ামত দান করেন, তখন সে যে তাঁর নিকট আবেদন করত সে কথা সে ভুলে যায় এবং সে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করায়।” (৩৯-সূরা আয যুমার: আয়াত-৮)
অতএব, যদি আমরা সত্যিই নিরাপদ থাকতে চাই তবে আল্লাহর নিকট আবেদন (দোয়া) করব এবং আল্লাহর প্রশংসায় আমাদেরকে অবশ্যই অটল থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বা সুখের সময় আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করার উদ্দেশ্য হলো (ইমাম হালীমির মতে): আল্লাহর প্রশংসা করা, তাঁর শোকরিয়া আদায় করা ও তাঁর অগণিত করুণাকে অনুধাবন করা এবং একই সময়ে হেদায়েত ও সাহায্য চাওয়া। আপনার ক্ষতি-বিচ্যুতির জন্য ক্ষমা চাওয়াও জরুরি। আল্লাহর যে হক আপনার উপরে আছে আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন তা আপনি কিছুতেই পুরাপুরিভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন না।
নির্দিষ্ট ও নিরাপদ অবস্থায় যে ব্যক্তি সে অধিকার সম্পর্কে অমনোযোগী থাকে সে নিম্নোক্ত আয়াতের মধ্যে উল্লেখিত লোকদের দলে পড়ে— “আর যখন তারা নৌযানে চড়ে তারা আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাসকে খাঁটি করে তাঁকে ডাকে, কিন্তু যখনই তিনি তাদেরকে স্থলভাগে উত্তীর্ণ করেন তখনই তারা আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করে।” (২৯-সূরা আনকাবুত : আয়াত-৬৫)
সালাতে থাকাকালে আমাদের জাহাজকে রক্ষা করার জন্য আমরা তাকে ডেকেছি! কিন্তু যখন আমরা নিরাপদে তীরে ভিড়েছি তখন আমরা তাঁর অবাধ্যতা করেছি! আর আমরা নিরাপদে ও শান্তিতে আকাশে উড়ছি; অথচ আমরা পড়ে যাই না; কেননা, (আমাদের) রক্ষক হলেন আল্লাহ!