📄 সুখের উপকরণ
১. কৃতজ্ঞ আত্মা এবং আল্লাহর জিকিরে সিক্ত জিহ্বা। একজন আরব কবি বলেছেন— “কৃতজ্ঞতা, জিকির ও ধৈর্যের মাঝেই রয়েছে নেয়ামত ও পুরস্কার।”
২. সুখের আরেকটি উপাদান হলো গোপনীয়তা রক্ষা করা, বিশেষ করে নিজের গোপনীয়তা রক্ষা করা। আরবদের মাঝে এক বেদুইনের এক প্রসিদ্ধ ঘটনা প্রচলিত আছে। বিশ দিনারের বদলে সে একটি বিষয় গোপন রাখার অঙ্গীকার করেছিল। প্রথমে সে চুক্তির প্রতি সৎ ছিল অর্থাৎ চুক্তি রক্ষা করেছিল; কিন্তু পরে হঠাৎ করে অধৈর্য হয়ে সে গিয়ে টাকাটা ফেরত দিয়ে দিল—সে গোপনীয়তা রক্ষা করার বোঝা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চেয়েছিল। এমনটি হওয়ার কারণ এই যে, গোপনীয়তা রক্ষা করতে দৃঢ়তা, ধৈর্য ও ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন।
“হে আমার বৎস! তোমার ভাইদের নিকট তোমার স্বপ্ন বর্ণনা করিও না।” (১২-সূরা ইউসুফ : আয়াত-৫)
মানুষের বহুবিধ দুর্বল বৈশিষ্ট্যের মাঝে একটি দুর্বলতা এই যে, সে তার নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপারাদি অন্যের কাছে ব্যক্ত করার সদা এক বেগ অনুভব করে। মন গোপন বিষয় ও গল্প প্রচার করতে ভালোবাসে। যে ব্যক্তি তার গোপন বিষয় প্রচার করবে সে অতি অবশ্যই অনুতপ্ত, দুঃখিত ও দুর্দশাপন্ন হবে।
“সে যেন সতর্ক থাকে এবং কাউকে তোমাদের সম্বন্ধে জানতে না দেয়।” (১৮-সূরা আল কাহাফ : আয়াত-১৯)
📄 সুখের উপাদান
নবী করীম ﷺ বলেছেন : “যে ব্যক্তি মনের শান্তিতে, সুস্থ দেহে দিবসের পূর্ণ খোরাক নিয়ে রাত কাটাল তাকে যেন গোটা দুনিয়াটা দেওয়া হলো।” এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেছেন।
এর অর্থ এই যে, কারো যদি যথেষ্ট খাবার থাকে ও নিরাপদে ঘুমানোর জায়গা থাকে তবে তার পৃথিবীর সর্বোত্তম জিনিস আছে। অনেকেই জীবনে এ পর্যায়ে আছে তবুও তারা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে না। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বলেন— “আমি আপনার উপর আমার নেয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছি।” (৫-সুরা মায়িদা : আয়াত-৩)
এ আয়াত পড়ার পর আপনার উচিত নিজেকে এ প্রশ্ন করা—নবী করীম ﷺ-এর জন্য কি নেয়ামত পূর্ণ করে দেয়া হয়েছিল? এটা কি পার্থিব সম্পদ ছিল? এটা কি দালান-কোঠা-অট্টালিকা ও সোনা-রুপার মালিকা ছিল? আল্লাহ যে নেয়ামতের কথা বলেছেন তা এসব নয়; কেননা নবী করীম ﷺ ধনী ছিলেন না। নবী করীম ﷺ মাটির তৈরি ঘরে ঘুমাতেন। তাঁর ঘরের ছাদ বা চাল খেজুরের ডাল দিয়ে তৈরি ছিল। প্রচণ্ড ক্ষুধার জ্বালায় তিনি মাঝে মাঝে পেটে পাথর বেঁধে রাখতেন আর এতে ক্ষুধার জ্বালা কিছুটা কমত। তাঁর মাদুর ছিল খেজুর গাছের ডাল যাতে তিনি শয়নকালে তাঁর পার্শ্বদেশে ব্যথা পেতেন। তিনি তাঁর বর্মখানিকে একটি ইহুদীর নিকট টাকা পরিশোধ করার আগ পর্যন্ত বন্ধক রেখে কিছু গম ক্রয় করেছিলেন। মাঝে মাঝে তিনি একটানা তিন দিন পর্যন্ত একটি পচা খেজুরও খেতে পেতেন না।
“এবং অবশ্যই পরকাল আপনার জন্য দুনিয়ার চেয়ে উত্তম। আর অচিরেই আপনার প্রতিপালক অবশ্যই আপনাকে এমন দান করবেন যার ফলে আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন।” (৯৩-সূরা আদ দোহা: আয়াত-৪-৫)
📄 শাসক থেকে কাঠমিস্ত্রি
আলী ইবনুল মাইমুনিল আব্বাসী নিজে একজন শাসক ও একজন খলিফার পুত্র ছিলেন। তিনি এক বিশাল প্রাসাদে ধনাঢ্য জীবন-যাপন করতেন। পৃথিবীর যা কিছু তিনি পেতে চাইতেন তাই তাঁর জন্য সহজপ্রাপ্য ছিল।
একদিন প্রাসাদের এক বারান্দা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলেন যে মাঠে এক লোক কঠোর পরিশ্রম করছে। আলী পরপর কয়েক দিন তাঁর প্রতি অধিক থেকে অবিরাম মনোযোগ দিলেন এবং লক্ষ্য করলেন যে সে সারাদিন কাজ করার পর একটু বিরতি দেয় ও তখন ওজু করে দু’রাকাত সালাত আদায় করে, কেবলমাত্র সন্ধ্যা হলেই সে তাঁর কাজ ছাড়ে ও বাড়িতে তাঁর পরিবার পরিজনদের কাছে যায়। তাঁর সম্বন্ধে আরো কিছু জানার জন্য আলী একদিন তাঁকে দাওয়াত করলেন ও তাঁকে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি শীঘ্রই জেনে নিলেন যে কাজের লোকটির একজন স্ত্রী, দু’জন বোন ও একজন মা আছেন এবং এদের সকলকেই তাঁর দেখাশুনা করতে হয়। আর তাঁদের জন্যই তাঁকে এতটা অধ্যবসায়ের সাথে কাজ করতে হয়।
তিনি (সে কর্মচারীটি) সারাদিন রোযা রাখতেন ও সন্ধ্যা হলে দিনের উপার্জিত অর্থ দ্বারা (খাদ্য ক্রয় করে) রোযা ভাঙতেন। আলী তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কি কোন অভিযোগ আছে?” তিনি উত্তর দিলেন, “না, সকল প্রশংসা সমগ্র বিশ্ব জগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই।”
এই সামান্য কর্মচারীর কথায় আলী এতটাই অভিভূত হয়ে পড়লেন যে, তিনি রাজপ্রাসাদ ও রাজপদ ত্যাগ করে বিদেশে পাড়ি দিলেন। কয়েক বছর পরে তাঁকে খোরাসানের নিকটবর্তী অঞ্চলে মৃত পাওয়া গিয়েছিল। তিনি কাঠমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেছিলেন এবং তাঁর নতুন জীবনে তিনি এমন সুখ পেয়েছিলেন যা তাঁর আগের জীবনে তাঁর নিকট সম্পূর্ণ অজানা ছিল।
“পক্ষান্তরে যারা সৎপথে চলে আল্লাহ তাদের সৎপথে চলার ক্ষমতা আরো বাড়িয়ে দেন এবং তাদেরকে তাদের (প্রাপ্য) তাকওয়া দান করেন।” (৪৭-সুরা মুহাম্মাদ : আয়াত-১৭)
এ ঘটনা আমাকে আসহাবে কাহাফের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়। তারা এক রাজার নিকট তাঁর রাজপ্রাসাদে থাকত। তবুও তারা নিজেদেরকে সংকীর্ণ, বিভ্রান্ত ও সমস্যাগ্রস্ত মনে করত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধনাঢ্য জীবনে কুফুরী ও অপচয় প্রাধান্য পায়। তাই তারা সে স্থান ত্যাগ করে চলে গেল। তাঁদের একজন বলেছিলেন : “অতএব তোমরা গুহায় আশ্রয়গ্রহণ কর, তোমাদের প্রভু তোমাদের জন্য তাঁর দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের কাজকে কার্যকর করবার বন্দোবস্ত করবেন।” (১৮-সুরা আল কাহাফ : আয়াত-১৬)
📄 শান্তির মূলকথা
ড. হাসসান শামসী পাশা ১৯৯৪ সনের কোন এক সংখ্যায় আহলান-সাহলান নামক পত্রিকার “দুশ্চিন্তা দূর করার বিশটি উপায়” নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। নিম্নে তার সারমর্ম দেয়া হলো-
১. আপনার জীবনকাল (অর্থাৎ আয়ু কত বছর তা) নির্ধারিত করা আছে, কেননা সব কিছুই তাকদীর (পূর্ব নির্ধারিত বিধান) অনুসারেই ঘটে। অতএব সে বিষয়ে দুশ্চিন্তা করার কোন প্রয়োজন নেই।
২. আমাদের প্রত্যেকের কতটা পরিমাণ রিযিক গ্রহণ করব তা সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহর নিকটেই। অন্য কেউই সে রিযিকের মালিক নয় বা আপনার থেকে তা ছিনিয়ে নেয়ার ক্ষমতা অন্য কারো নেই।
৩. অতীত তার সকল দুঃখ-কষ্ট নিয়ে চলে গেছে। সমগ্র মানবজাতিও যদি একযোগে তাঁকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে, তবুও তা ফিরে আসতে পারে না।
৪. ভবিষ্যৎ অদৃশ্য জগতের অন্তর্ভুক্ত এবং এখনও তা আসেনি। আপনার অনুমতি বা অনুভূতি প্রতি কোনরূপ শ্রদ্ধা প্রদর্শন না করেই এটি বিস্ময়াদি নিয়ে আসে। অতএব এটা সত্যি সত্যি আগমন করার আগেই এটাকে ডাকবেন না।
৫. অন্যের উপকার করলে নিজের মনে শান্তি পাওয়া যায়। একটি ভালো কাজ বা কল্যাণমূলক কাজ দাতাকে গ্রহণীয়তার তুলনায় অনেক বেশি দয়া (রহমত), পুরস্কার ও শান্তি ইত্যাদি বহুবিধ উপকার করে।
৬. মু'মিনের একটি মহৎ গুণ হল যে, সে মিথ্যা সমালোচনার ধার ধারে না, কেউ সমালোচনা থেকে বাঁচতে পারে না। এমনকি সমগ্র বিশ্ব জগতের প্রতিপালক, নিখুঁত মহান আল্লাহও না। (মানুষ আল্লাহ তায়ালাকেও গালি দেয়, সুতরাং আপনি কেন মনে করেন যে, আপনাকে কেউ গালি দিবে না, কেউ আপনার সমালোচনা করবে না। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানব নবীদেরকে প্রত্যেক জাতি মিথ্যা বলেছে, তাদেরকে কষ্ট দিয়েছে; এমনভাবে সকল মহানবীগণও একই অবস্থার শিকার হয়েছে।)