📄 সালাত পড়তে আসুন
“আর তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও।” (২-সূরা আল বাকারা : আয়াত-৪৫)
নবী কারীম ﷺ যখনই কোন সংকটে পড়তেন অমনি সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন। তিনি বেলাল (রা)-কে মাঝে মাঝে বলতেন, “হে বেলাল! আযান দিয়ে আমাদেরকে শান্তি দাও।” যখন আপনি মানসিক চাপ অনুভব করেন, সমস্যায় পড়েন বা যখন আপনি নিজেকে প্রতারিত বোধ করেন তখন তাড়াতাড়ি মসজিদে যেয়ে সালাত পড়ুন।
বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে নবী কারীম ﷺ সালাতে শান্তি পেতেন। যেমন—বদর ও আহযাবের যুদ্ধে। বোখারী শরীফের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাকার ইবনে হাজার একবার ডাকাত দল পরিবেষ্টিত এক প্রাসাদে আটকা পড়েন। যখন তিনি সালাতে দাঁড়ালেন তখন আল্লাহ্ তাঁকে রক্ষা করলেন। ইবনে আসাকির ও ইবনুল কাইয়্যিম উভয়ই একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এক ধার্মিক লোক শাম দেশে (বর্তমানে সিরিয়া ও ফিলিস্তিন) যাত্রা করেন। পথে এক ডাকাত তাঁর সঙ্গী হয়, ডাকাতটি তাঁকে হত্যা করতে চায় কিন্তু তাঁর নিকটে আসার আগে ধার্মিক লোকটি ডাকাতের কাছে সালাত পড়ার জন্য কয়েক মিনিট সময় চায়। সে সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহ্র নিম্নোক্ত বাণী স্মরণ করল— “তোমাদের দেবতাবর্গ ভালো? না কি তিনি যিনি সংকটাপন্ন লোকের ডাকে সাড়া দেন যখন সে তাঁকে ডাকে?” (২৭-সুরা আন নামল : আয়াত-৬২) সে এ আয়াত তিনবার পড়ল। তারপর আকাশ থেকে একজন ফেরেশতা বর্শা নিয়ে এসে ডাকাতকে হত্যা করে ফেলল। ফেরেশতা বলল, “আমি তাঁর ফেরেশতা যিনি সংকটাপন্ন লোকদের ডাকে সাড়া দেন যখন তারা তাঁকে ডাকে।”
“এবং তোমার পরিবার-পরিজনকে সালাত পড়ার আদেশ দাও এবং তুমি তাতে অবিচলিত থাক।” (২০-সুরা ত্বাহা : আয়াত-১৩২)
“নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও অপছন্দনীয় কাজ থেকে বিরত রাখে।” (২৯-সুরা আল আনকাবূত : আয়াত-৪৫)
“নিশ্চয় নির্ধারিত সময়ে সালাত আদায় করা মুমিনদের উপর ফরয।” (৪-সুরা আন নিসা : আয়াত-১০৩)
নবী কারীম ﷺ-এর উপর দরূদ শরীফ পৌঁছালেও তা সংকট দূর করতে সাহায্য করে। “হে মুমিনগণ! তোমরা তাঁর (মুহাম্মদের) উপর দরূদ পৌঁছাও এবং সালাম দেয়ার নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে সালাম দাও।” (৩৩-সুরা আল আহযাব : আয়াত-৫৬)
উবাই ইবনে কা'ব (রা) আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার উপর আমি কত সংখ্যক দরূদ পড়ব?” তিনি ﷺ বললেন, “তোমার যত ইচ্ছা।” উবাই (রা) বললেন, “এক-চতুর্থাংশ?” তিনি ﷺ বললেন, “তোমার যত ইচ্ছা, যদি আরো বেশি পড় তবে তোমার জন্য তা ভালো।” তিনি (রা) জিজ্ঞাসা করলেন, “দুই-তৃতীয়াংশ?” নবী কারীম ﷺ উত্তর দিলেন, “তোমার যত ইচ্ছা, যদি আরো বেশি পড় তবে তা ভাল।” তারপর তিনি বললেন, “আমি সব দরূদই আপনার জন্য পড়ব।” নবী কারীম ﷺ উত্তর দিলেন, “তাহলে তোমাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং তোমার দুশ্চিন্তার প্রতি খেয়াল রাখা হবে।” উপরোক্ত হাদীসের শেষ কথা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, নবী করীম ﷺ-এর উপর দরূদ শরীফ পৌঁছালে দুশ্চিন্তা দূর হয়।
📄 সকালের দোয়া
এ অধ্যায়ে যে দু'আগুলো লিখা আছে আপনি যদি তা প্রতিদিন পড়েন তবে এগুলো আপনার সুখ বয়ে আনতে সাহায্য করবে, আপনাকে মানুষ ও জ্বীন শয়তান থেকে রক্ষা করবে এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত বাকি দিনের জন্য আপনাকে রক্ষা করবে।
১. আাসাইনা ওয়া আসাল মুলকু লিল্লাহে ওয়াল হামদু লিল্লাহে ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর। রব্বি আসআলুকা খাইরা মা ফী হাযিহিল লাইলাতে ওয়া খাইরা মা বা'দাহা ওয়া আউযুবিকা মিন শাররি মা ফী হাযিহিল লাইলাতে ওয়া শাররি মা বা'দাহা। রব্বি আউযুবিকা মিনাল কাসালি ওয়া সূইল কিবারি। রব্বি আউযুবিকা মিন আযাবিন ফিন নারি ওয়া আযাবিন ফিল ক্বাবরি।
২. আল্লাহুম্মা আলিমাল গাইবে ওয়াশ শাহাদাতে ফাতিরাস সামাওয়াতে ওয়াল আরদ্বি রব্বা কুল্লি শাইয়িন ওয়া মালীকাহু আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লা আনতা আউযুবিকা মিন শাররি নাফসী ওয়া মিন শাররিশ শাইতানি ওয়া শিরকিহী ওয়া আন আক্বতারিফা আলা নাফসী সূয়ান আও আজুররাহু ইলা মুসলিমিন।
৩. বিসমিল্লাহিল্লাযী লা ইয়াদ্বুররু মাআসমিহী শাইয়ুন ফিল আরদ্বি ওয়া লা ফিস সামাই ওয়া হুয়াস সামীউল আলীম। (এ দোয়া তিনবার পড়বেন)।
৪. আল্লাহুম্মা ইন্নী আসবাহতু আশহাদুকা ওয়া আশহাদু হামালাতা আরশিকা ওয়া মালাইকাতিকা ওয়া জামীআ খালক্বিকা ইন্নাকা আন্তাল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা আনতা ওয়াহদাকা লা শারীকা লাকা ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুকা ওয়া রাসূলুকা ﷺ।
৫. আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিন আন উশরিকা বিকা শাইয়ান ওয়া আনা আলামু ওয়া আসতাগফিরুকা লিমা লা আলামু। (এ দু'আ তিনবার পড়বেন)।
৬. আসবাহনা আলা ফিতরাতিল ইসলামি ওয়া আলা কালিমাতিল ইখলাসি ওয়া আলা দ্বীনি নাবিই্যনা মুহাম্মাদিন ﷺ ওয়া আলা মিল্লাতে আবীনা ইব্রাহীমা হানীফাম মুসলিমাম ওয়া মা কানা মিনাল মুশরিকীন। (তিনবার)।
৭. সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী আদাদা খালক্বিহী ওয়া রিদ্বা নাফসিহী ওয়া জিনাতা আরশিহী ওয়া মিদাদা কালিমাতিহী। (তিনবার)।
৮. রাদ্বীতু বিল্লাহি রব্বান ওয়া বিল ইসলামি দ্বীনান ওয়া বি মুহাম্মাদিন ﷺ নাবীয়ান। (তিনবার)।
৯. আউযু বিকালিমাতিলাহিত তাম্মাতে মিন শাররি মা খালাক্ব। (তিনবার)।
১০. আল্লাহুম্মা বিকা আসবাহনা ওয়া বিকা নামূতু ওয়া ইলাইকান নুশূর।
১১. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর। (একশত বার)।
📄 তাহাজ্জুদ সালাত পড়ুন
[অর্থাৎ, শেষ রাতে নফল (অতিরিক্ত বা স্বেচ্ছাপ্রদত্ত) সালাত আদায় করুন। – অনুবাদক]
শেষ রাতে (যখন কোন মানুষ আপনাকে দেখে না) সালাতে দাঁড়ানো আপনার অন্তরে প্রশান্তি এনে দিবে। সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন— “যে ব্যক্তি শেষ রাতে জেগে উঠে আল্লাহকে স্মরণ করল, তারপর অযু করে সালাত পড়ল সে চটপটে ও পবিত্র চিত্ত হয়ে গেল।”
“তারা রাতের সামান্য অংশেই নিদ্রা যেত।” (৫১-সুরা যারিয়াত: আয়াত-১৭)
“এবং রাতের কিছু অংশে এর (কুরআন তিলাওয়াতের) মাধ্যমে তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করুন, যা আপনার জন্য নফল (অতিরিক্ত)।” (১৭-সুরা বনী ইসরাঈল: আয়াত-৭৯)
আবু দাউদ শরীফে একটি সহীহ হাদীসে ইঙ্গিত আছে যে, শেষ রাতে তাহাজ্জুদ সালাত আদায়ের মাধ্যমে শরীরের অসুস্থতা দূর হয়ে যায়। নবী করীম ﷺ বলেছেন— “অমুক লোকের মতো হয়ো না যে নাকি রাতে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদ সালাত পড়ত কিন্তু পরে তা ছেড়ে দিয়েছে।”
নিচের অংশটুকু আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে— “আবদুল্লাহ খুবই ভালো মানুষ। কিন্তু যদি সে রাতে তাহাজ্জুদ সালাত পড়ত তবে কতইনা ভালো হত!”
ক্ষয়শীল বস্তুর জন্য দুঃখ করবেন না: আল্লাহ ছাড়া এ বিশ্বজগতের সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। “তার সত্তা ছাড়া সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে।” (২৮-সুরা কাসাস: আয়াত-৮৮) “এর উপর যা কিছু আছে সবই ধ্বংসশীল। এবং তোমার মহা প্রতাপশালী ও মহাসম্মানিত প্রভুর সত্তাই শুধু চিরকাল ঠিক থাকবেন।” (৫৫-সুরা মারিয়দা: আয়াত-২৬-২৭)
📄 মনাযোগের সাথে আল্লাহর কালাম (বাণী) শুনুন
কুরআন তিলাওয়াত করুন এবং তিলাওয়াত শুনুন। এতে সুখ-শান্তি ও প্রশান্তি পাবেন। নবী করীম ﷺ কোন মহান সাহাবীর মুখে কুরআন তিলাওয়াত শুনতে ভালোবাসতেন। কুরআন তিলাওয়াতের ক্যাসেট শোনার জন্য আপনি প্রতিদিন কয়েক মিনিট বরাদ্দ করতে পারেন। আপনি রাস্তা-ঘাটে, কর্মস্থলে বা অফিসে যে শব্দ শোনেন তা অবশ্যই আপনার বিরক্তি উৎপাদন করে, তাই আপনার মনকে শান্তি দেওয়ার জন্য কিছু সময় বের করুন।
“যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের অন্তর আল্লাহর জিকিরে প্রশান্ত হয়। জেনে রাখ! আল্লাহর জিকিরে অন্তর প্রশান্ত হয়।” (১৩-সূরা রা'আদ: আয়াত-২৮)
একটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে— নবী করীম ﷺ ইবনে মাসউদ (রা)-কে কুরআনের সূরা নিসা পড়তে আদেশ করলেন। তিনি পড়তে থাকলেন আর নবী করীম ﷺ-এর চোখের পানি তাঁর গাল বেয়ে পড়তে লাগল। তখন নবী করীম বললেন, “যথেষ্ট হয়েছে (এখন তুমি থামতে পার)।”
“(হে মুহাম্মদ!) আপনি বলে দিন: ‘যদি মানুষেরা ও জ্বীনরা এই কুরআনের মতো কোন কিছু সৃষ্টি করার জন্য একত্রিত হয় তবুও তারা এর মতো কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারবে না, যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়।” (১৭-সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত-৮৮)
“যদি আমি এ কুরআনকে পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি অবশ্যই পাহাড়কে আল্লাহর ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ হয়ে যেতে দেখতে পেতে।” (৫৯-সূরা আল হাশর: আয়াত-২১)
দৈনন্দিন জীবনের কার্যকলাপের মাঝে যা মনকে উদাসীন করে তোলে, তাতে খাওয়া আর ঘুম ছাড়া কোন কিছুর প্রতি যত্ন নেয়া হয় না; এভাবে জানোয়ারের পর্যায়ে নেমে যেতে হয়। কিন্তু যখন কেউ তার প্রভুর বাণীর দিকে ফিরে আসে তখন সে আরাম ও শান্তি বোধ করে। এখানে এটা উল্লেখ করা জরুরি যে, গান নয় বরং আল্লাহর কালামই শান্তি বয়ে আনে। গান হলো তুচ্ছ, বাজে ও নিষিদ্ধ বিকল্প। আমাদের নিকট এর চেয়ে ভালো কিছু আছে যা নিয়ে আল্লাহর রাসূল আগমন করেছেন।
“এ কুরআনের সামনে পিছনে কোন দিকেই বাতিল আসতে পারে না, এটা সকল প্রশংসার প্রাপক মহাজ্ঞানীর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।” (৪১-সূরা হা-মীম-আস-সাজদাহ: আয়াত-৪২)
“তুমি তাদের চক্ষুসমূহকে অশ্রুতে ভেসে যেতে দেখতে। কেননা, তারা যা সত্য তা অনুধাবন করতে পেরেছে।” (৫-সূরা মায়িদা: আয়াত-৮৩)
কেবলমাত্র বোকারাই গানে শান্তি পায়— “এবং মানুষের মাঝে এমন লোকও আছে যে নাকি অজ্ঞতাবশতঃ (মানুষকে) আল্লাহর পথ হতে বিপথে চালিত করার জন্য বেহুদা কথা (যেমন—গান-বাজনা, গল্প-গুজব) ক্রয় করে।” (৩১-সূরা লুকমান: আয়াত-৬)