📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 জেনে রাখুন! আল্লাহর জিকিরেই আত্মা শান্তি পায়

📄 জেনে রাখুন! আল্লাহর জিকিরেই আত্মা শান্তি পায়


“জেনে রাখ! আল্লাহর জিকিরেই হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে।” (১৩-সূরা রা'আদ : আয়াত-২৮)

সততা আল্লাহর প্রিয় এবং আত্মাকে পরিষ্কার করার সাবান। আর আল্লাহর জিকির ছাড়া এমন কোন কাজ নেই যা আত্মাকে এমন শান্তি দিতে পারে যার পুরস্কার এর চেয়ে বেশি। “অতএব আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব।” (২-সূরা বাকারা : আয়াত-১৫২)

আল্লাহর জিকির (স্মরণ)-ই দুনিয়াতে তাঁর বেহেশত। আর এতে যে প্রবেশ করেনি সে আখেরাতের বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। জিকির শুধুমাত্র এ পৃথিবীর সমস্যা ও উদ্বিগ্নতা থেকে এক নিরাপদ দুর্গই নয়; অধিকন্তু, দুর্গম সাফল্য লাভের এক সংক্ষিপ্ত ও সহজ পথও বটে। আল্লাহর জিকির সম্বন্ধে বিভিন্ন আয়াত পড়ে দেখুন তাহলেই আপনি এর উপকারিতা বুঝতে পারবেন। যখন আপনি আল্লাহর জিকির করবেন তখন দুশ্চিন্তা ও ভয়ের কালোমেঘ দূরীভূত হয়ে যাবে ও আপনার সমস্যার পাহাড় সরে যাবে। যারা আল্লাহর জিকির করেন তারা শান্তিতে আছেন বা থাকেন—একথা শুনে আমাদের আশ্চর্য হওয়া উচিত নয়। যা সত্যিই আশ্চর্য তা হল অবহেলাকারীরা ও অমনোযোগীরা তাঁকে স্মরণ না করে কীভাবে বেঁচে থাকে। “তারা নিষ্প্রাণ, নির্জীব আর তারা জানে না কখন তাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে।” (১৬-সুরা আন নাহল : আয়াত-২১)

ওহে! যে নাকি বিনিদ্র রজনীর অভিযোগ করে ও তার দুর্দশার ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত, তাঁর পবিত্র নাম ধরে ডাকুন। “তাঁর মতো কারো কথা কি তোমরা জানো?” (১৯-সুরা মারইয়াম : আয়াত-৬৫) তাঁর মতো কিছুই নেই, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (৪২-সুরা শুরা : আয়াত-১১)

তুমি আল্লাহকে যে পরিমাণ স্মরণ করবে, তোমার আত্মা সে পরিমাণই শান্ত ও সন্তুষ্ট হবে। তাঁর জিকিরের অর্থই হলো তাঁর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা, সাহায্যের জন্য তাঁর মুখাপেক্ষী হওয়া, তাঁর সম্বন্ধে সুধারণা পোষণ করা এবং তাঁর পক্ষ থেকে বিজয়ের অপেক্ষায় থাকা। সত্যিই যখন তাঁর কাছে আবেদন করা হয় তখন তিনি নিকটেই থাকেন; যখন তাঁকে ডাকা হয় তিনি তখন শোনেন ও তাঁর নিকট আকুল আবেদন করা হলে তিনি সাড়া দেন। তাই তাঁর সামনে নিজেকে বিনীত কর ও একনিষ্ঠভাবে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা কর। বারবার তাঁর কল্যাণময় নামের তাসবীহ পাঠ কর ও তাঁর একমাত্র উপাস্য হওয়ার কথা উল্লেখ কর। তাঁর প্রশংসা কর, তাঁর নিকট কাকুতি-মিনতি করে প্রার্থনা কর ও তাঁর নিকট ক্ষমা ভিক্ষা চাও, তাহলেই ইনশাআল্লাহ তুমি সুখ, শান্তি ও অন্তরে আলোকপাত পাবে। “তাই আল্লাহ্ তাঁদেরকে এ জগতের পুরস্কার ও পরকালের চমৎকার পুরস্কার দান করলেন।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৪৮)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 সালাত ... সালাত

📄 সালাত ... সালাত


“হে ইমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর।” (২-সুরা বাক্বারা : আয়াত-১৫৩)

আপনি যদি আতঙ্কগ্রস্ত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, তবে এক্ষুণি সালাতে দাঁড়িয়ে যান। দেখবেন, আপনি শান্তি ও সান্ত্বনা পাচ্ছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি একনিষ্ঠভাবে ও জাগ্রত হৃদয়ে সালাত আদায় করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সালাত আপনার উপর এই প্রভাব ফেলবে। নবী করীম ﷺ যখনই কোন কষ্টে পতিত হয়েছিলেন, তখনই তিনি বলতেন : “হে বিলাল! সালাতের আজান দিয়ে আমাদেরকে শান্তি দাও।” সালাত তাঁর আনন্দ ও খুশির উপায় ছিল। সালাত তাঁর চোখের মণি ছিল।

আমি অনেক ধার্মিক লোকের জীবনী পড়ে দেখেছি, তারা দুঃখ-কষ্টে পড়লেই সর্বদা সালাতে মনোযোগ দিতেন এবং যতক্ষণ তাদের মনোবল, ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ়প্রত্যয় ফিরে না আসত, ততক্ষণ তারা সালাত পড়তে থাকতেন। সালাতূল খাওফ (ভয়কালীন সালাত, যা যুদ্ধের সময় পড়া হতো) অনুমোদন করা হয় যখন অসহনীয় কষ্ট হয় এবং দেহ থেকে আত্মা চলে যাওয়ার উপক্রম হয় তখন পড়ার জন্য। এ সময়ে একমাত্র একাগ্রচিত্তে সালাত আদায়ের মাধ্যমেই মনোবল ও দৃঢ় প্রত্যয় ফিরে পাওয়া যেত।

মানসিক রোগে আক্রান্ত এ জাতিকে অবশ্যই মসজিদে ফিরে গিয়ে সিজদা করতে এবং আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি কামনা করতে হবে। আমরা যদি এ কাজ না করি, তবে অশ্রু আমাদের চোখকে ভাসিয়ে রাখবে ও দুঃখ-বেদনা আমাদের স্নায়ুকে ধ্বংস করে দিবে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত একনিষ্ঠভাবে আদায় করে আমরা মহাকল্যাণ অর্জন করতে পারি। আমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি এবং আমাদের প্রতিপালকের দরবারে আমাদের মর্তবা বৃদ্ধি করতে পারি। সালাত আমাদের অসুস্থতার জন্য এক শক্তিশালী মহা ঔষধও বটে। কেননা, সালাত আমাদের অন্তরে ঈমান সঞ্চারিত করে। যারা মসজিদ ও সালাত থেকে দূরে থাকে, তাদের জন্য রয়েছে অসুখ, দুর্ভাগ্য ও বিষাদময় জীবন। “তাদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য এবং আল্লাহ তায়ালা তাদের আমলকে বাতিল করে দিবেন।” (৪৭-সূরা মুহাম্মাদ বা কেতাল : আয়াত-৮)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 দুশ্চিন্তা করবেন না-সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করুন

📄 দুশ্চিন্তা করবেন না-সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করুন


যিকির সম্বন্ধে আল্লাহ বলেন— “নিশ্চয়, আল্লাহর যিকিরেই আত্মা প্রশান্তি লাভ করে।” (১৩-সূরা রা’আদ : আয়াত-২৮)

“সুতরাং (প্রার্থনা, প্রশংসা ইত্যাদির মাধ্যমে) তোমরা আমাকে স্মরণ কর, তাহলে আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব।” (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-১৫২)

“এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও নারীদের জন্য আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা ও মহাপুরস্কার রেখেছেন।” (৩৩-সূরা আল আহযাব : আয়াত-৩৫)

“হে মুমিনগণ! তোমরা বেশি করে আল্লাহর যিকির কর এবং সকাল-বিকাল তাঁর তাসবীহ বা প্রশংসা পাঠ কর।” (৩৩-সূরা আল আহযাব : আয়াত-৪১-৪২)

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর যিকির হতে অমনোযোগী করে না দেয়।” (৬৩-সূরা আল মুনাফিকুন : আয়াত-৯)

“এবং যখন তুমি ভুলে যাও তখন তুমি তোমার প্রভুকে স্মরণ করবে।” (১৮-সূরা আল কাহাফ : আয়াত-২৪)

“এবং যখন তুমি ঘুম থেকে ওঠ তখন তুমি তোমার প্রভুর সপ্রশংস মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা কর এবং রাত্রিকালে এবং তারকা অস্তগমনের পরেও তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।” (৫২-সূরা আত্ব তুর : আয়াত-৪৮-৪৯)

“হে মু’মিনগণ! যখন তোমরা কোন শত্রু বাহিনীর মোকাবেলা কর তখন বেশি বেশি আল্লাহর স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (৮-সূরা আনফাল : আয়াত-৪৫)

একখানি সহীহ হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— “যে তাঁর প্রভুর যিকির করে আর যে তার প্রভুর যিকির করে না এদের উদাহরণ হলো জীবিত ও মৃতের মতো।”

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন— “অনন্য ব্যক্তিবর্গ অন্যদেরকে ছাড়িয়ে গেছে।” সাহাবীগণ বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! কারা অনন্য ব্যক্তিবর্গ?” নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে এমন নারী এবং পুরুষগণ।”

আরেকটি বিশুদ্ধ হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— “তোমাদের প্রভুর নিকট তোমাদের যে কাজ সর্বোত্তম ও পবিত্রতম, যা (সৎ কাজে) তোমাদের সোনা-রূপা ব্যয় করার চেয়েও ভালো এবং যা (জিহাদের সময়) তোমাদের শত্রুদের মোকাবেলা করে তাদের গর্দান উড়িয়ে দেয়া ও তারা তোমাদের গর্দান উড়িয়ে দেয়ার চেয়েও উত্তম তার সংবাদ আমি কি তোমাদেরকে দেব না?” সাহাবীগণ বললেন, “অবশ্যই! হে আল্লাহর রাসূল!” নবী করীম বললেন, “আল্লাহর জিকির।”

একখানি সহীহ হাদীসে আছে— নবী করীম ﷺ-এর কাছে একজন লোক এসে বলল: “হে আল্লাহর রাসূল! আমার পক্ষে ইসলামের বিধানসমূহ অনেক বেশি হয়ে গেছে, অথচ আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি, তাই আমাকে এমন (একটি সহজ) আমলের কথা জানিয়ে দিন—যা আমি সর্বদা করতে পারব।” নবী করীম ﷺ বললেন, “তোমার জিহ্বা যেন আল্লাহর জিকিরে সর্বদা সিক্ত থাকে (তথা তাজা থাকে বা ব্যস্ত থাকে)।”

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 সালাত পড়তে আসুন

📄 সালাত পড়তে আসুন


“আর তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও।” (২-সূরা আল বাকারা : আয়াত-৪৫)

নবী কারীম ﷺ যখনই কোন সংকটে পড়তেন অমনি সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন। তিনি বেলাল (রা)-কে মাঝে মাঝে বলতেন, “হে বেলাল! আযান দিয়ে আমাদেরকে শান্তি দাও।” যখন আপনি মানসিক চাপ অনুভব করেন, সমস্যায় পড়েন বা যখন আপনি নিজেকে প্রতারিত বোধ করেন তখন তাড়াতাড়ি মসজিদে যেয়ে সালাত পড়ুন।

বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে নবী কারীম ﷺ সালাতে শান্তি পেতেন। যেমন—বদর ও আহযাবের যুদ্ধে। বোখারী শরীফের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাকার ইবনে হাজার একবার ডাকাত দল পরিবেষ্টিত এক প্রাসাদে আটকা পড়েন। যখন তিনি সালাতে দাঁড়ালেন তখন আল্লাহ্ তাঁকে রক্ষা করলেন। ইবনে আসাকির ও ইবনুল কাইয়্যিম উভয়ই একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এক ধার্মিক লোক শাম দেশে (বর্তমানে সিরিয়া ও ফিলিস্তিন) যাত্রা করেন। পথে এক ডাকাত তাঁর সঙ্গী হয়, ডাকাতটি তাঁকে হত্যা করতে চায় কিন্তু তাঁর নিকটে আসার আগে ধার্মিক লোকটি ডাকাতের কাছে সালাত পড়ার জন্য কয়েক মিনিট সময় চায়। সে সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহ্র নিম্নোক্ত বাণী স্মরণ করল— “তোমাদের দেবতাবর্গ ভালো? না কি তিনি যিনি সংকটাপন্ন লোকের ডাকে সাড়া দেন যখন সে তাঁকে ডাকে?” (২৭-সুরা আন নামল : আয়াত-৬২) সে এ আয়াত তিনবার পড়ল। তারপর আকাশ থেকে একজন ফেরেশতা বর্শা নিয়ে এসে ডাকাতকে হত্যা করে ফেলল। ফেরেশতা বলল, “আমি তাঁর ফেরেশতা যিনি সংকটাপন্ন লোকদের ডাকে সাড়া দেন যখন তারা তাঁকে ডাকে।”

“এবং তোমার পরিবার-পরিজনকে সালাত পড়ার আদেশ দাও এবং তুমি তাতে অবিচলিত থাক।” (২০-সুরা ত্বাহা : আয়াত-১৩২)

“নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও অপছন্দনীয় কাজ থেকে বিরত রাখে।” (২৯-সুরা আল আনকাবূত : আয়াত-৪৫)

“নিশ্চয় নির্ধারিত সময়ে সালাত আদায় করা মুমিনদের উপর ফরয।” (৪-সুরা আন নিসা : আয়াত-১০৩)

নবী কারীম ﷺ-এর উপর দরূদ শরীফ পৌঁছালেও তা সংকট দূর করতে সাহায্য করে। “হে মুমিনগণ! তোমরা তাঁর (মুহাম্মদের) উপর দরূদ পৌঁছাও এবং সালাম দেয়ার নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে সালাম দাও।” (৩৩-সুরা আল আহযাব : আয়াত-৫৬)

উবাই ইবনে কা'ব (রা) আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার উপর আমি কত সংখ্যক দরূদ পড়ব?” তিনি ﷺ বললেন, “তোমার যত ইচ্ছা।” উবাই (রা) বললেন, “এক-চতুর্থাংশ?” তিনি ﷺ বললেন, “তোমার যত ইচ্ছা, যদি আরো বেশি পড় তবে তোমার জন্য তা ভালো।” তিনি (রা) জিজ্ঞাসা করলেন, “দুই-তৃতীয়াংশ?” নবী কারীম ﷺ উত্তর দিলেন, “তোমার যত ইচ্ছা, যদি আরো বেশি পড় তবে তা ভাল।” তারপর তিনি বললেন, “আমি সব দরূদই আপনার জন্য পড়ব।” নবী কারীম ﷺ উত্তর দিলেন, “তাহলে তোমাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং তোমার দুশ্চিন্তার প্রতি খেয়াল রাখা হবে।” উপরোক্ত হাদীসের শেষ কথা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, নবী করীম ﷺ-এর উপর দরূদ শরীফ পৌঁছালে দুশ্চিন্তা দূর হয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px