📄 সীমালঙ্ঘনকারীর অন্যায় আচরণ
হাশরের দিন আমরা মহা বিচারকের নিকট চলে যাব, আর সকল বিবাদীকে আল্লাহর সামনে হাজির করা হবে। ঈমানদারদের পক্ষে ন্যায় বিচারের জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে সেদিন (বিচার হওয়ার জন্য) অপেক্ষা করতে থাকবে যেদিন কিয়াম (হাশর) আল্লাহ প্রথম ও শেষ সৃষ্টিকুলকে একত্রিত করবেন। সে দিন স্বয়ং আল্লাহ বিচারক হবেন আর সাক্ষী হবেন ফেরেশতারা। “এবং আমি কিয়ামতের দিন ন্যায় বিচারের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করব, অতএব কারো প্রতি জুলুম করা হবে না এবং সৎকর্ম দানা পরিমাণ (ওজনের আমলও) যদি থাকে আমি তাও (দাঁড়িপাল্লায় ওজন দিতে) নিয়ে আসব।” (২১-সূরা আল আম্বিয়া : আয়াত-৪৭)
📄 ধৈর্য নিয়ে জ্ঞানীদের বাণী
বলা হয় মানুষের ওলান বলেছেন: “এ দুনিয়াতে দুর্দশা দু'ধরনের। প্রথম প্রকারের প্রতিকার আছে; দুশ্চিন্তা হলো এর ঔষধ। আর দ্বিতীয় প্রকারের কোন প্রতিকার নেই; ধৈর্যই এর আরোগ্যকর চিকিৎসা।” বলা হয় যে, “যে ধৈর্য ধরে সে সফল হয়।”
বলা হয়েছে যে, “মৃত্যু তালাশ করে বাঁচতে চেষ্টা কর। কেননা, মৃত্যু তালাশ করার কারণে কত লোকই না বেঁচে আছে। আর বেঁচে থাকতে চাওয়ার কারণে কত লোকই না ধ্বংস হয়ে গেছে। অধিকাংশ সময়ই অনিশ্চিত পথে চলার পরই নিরাপত্তা আসে।”
আরবরা বলত, “নিশ্চয়ই মন্দ কাজেরও ভালো-মন্দ স্তর আছে।” আবু উবাইদাহ্ একবার ব্যাখ্যা করেন এভাবে, “আপনি যদি কোন সংকটে পড়ে থাকেন তবে জেনে রাখুন যে আপনি এর চেয়ে আরো অনেক বেশি মন্দ বা খারাপ অবস্থার শিকার হতে পারতেন। আপনার যদি ধৈর্যের দূরদৃষ্টি থাকে তবে আপনি আরো ভালোভাবে সংকটের মোকাবিলা করতে পারবেন।” যখন সকল আশা ভরসা শেষ হয়ে যায়, অধিকাংশ সময় তখনই সংকট নিঃসরণের (সমস্যা সমাধানের) উপায় বেরিয়ে আসে (পাওয়া যায়)।
“আমি তাদের নিকট থেকেই তাদের উত্তম আমলগুলো কবুল (গ্রহণ) করি এবং তাদের মন্দ (বদ্) আমলগুলোকে আমি উপেক্ষা করি; তারা জান্নাতবাসী হবে। এ সত্য অঙ্গীকারই তাদেরকে দেওয়া হতো।” (৪৬-সুরা আহকাফ : আয়াত-১৬)
(কাফেরদেরকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল না তাই) এমনকি রাসূল ﷺ-ও হতাশ হয়ে গিয়েছিলেন এবং তারা ভেবেছিল যে তাদেরকে (তাদের জাতি কর্তৃক) অস্বীকার করা হলো এমন সময় তাদের নিকট আমার সাহায্য এলো।” (১২-সুরা ইউসুফ : আয়াত-১১০)
“নিশ্চয় আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (২-সুরা বাকারা : আয়াত-১৫৩)
“কেবলমাত্র ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের পুরস্কার পূর্ণমাত্রায় (পূরাপূরি) বেহিসাবে দেওয়া হবে।” (৩৯-সুরা যুমার : আয়াত-১০)
মাঝে মাঝে যখন সকল আশা ভরসা শেষ হয়ে যায় এবং সব কিছু অন্ধকার মনে হয়, তখন আল্লাহ্ সফলতা ও শান্তি এনে দেন। আল্লাহর নিকট আশা করতে আমাদের উৎসাহিত করার জন্য তাঁর প্রতি পুরোপুরি নির্ভর ও বিশ্বাস করার জন্য এবং কখনও তাঁর সাহায্যের আশা ত্যাগ না করার জন্যই এমনিটি হয় (আল্লাহ্ করেন)। বিপদগ্রস্ত অবস্থাতেও প্রত্যেকের এ কথা জেনে সন্তুষ্ট থাকা উচিত যে, সে ছোট খাট বিপদাক্রান্ত হয়েছে এবং বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে। ইস্হাক্ব (নামে এক আবেদ লোক) বলেছেন, “আল্লাহ্ যখন কোন বান্দাকে বিপদগ্রস্ত করে পরে তাকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করেন, তখন সম্ভবত তিনি তাকে (সে বিপদ দ্বারা) পরীক্ষা করেন। এভাবে বিপদাপদ (দুঃখবেশে) এক মহাকল্যাণ।”
বলা হয়েছে যে, যে কষ্ট সহ্য করে এবং ধৈর্যশীল হওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর বিধানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে সে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তার কোন গোপন কল্যাণ হবে।
কোন কোন খ্রিস্টান বর্ণনা করেছে যে, তাদের কোন নবী বলেছেন, “কষ্ট হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে শিক্ষাদান আর শিক্ষাদান সব সময়ের জন্য নয়। অতএব, যখন কাউকে শিক্ষাদান করা হয় ও সে ধৈর্য ধরে তার জন্য শুভ সংবাদ রয়েছে। এমন লোককে এমন মুক্তি পরানো হবে যা হবে উত্তরণ ও বিজয়ের প্রতীক। এমন বিজয়, যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ্ তাদেরকে দিয়েছেন যারা তাঁকে ভালোবাসে ও তাঁর আনুগত্য করে।” (আবেদ) ইস্হাক্ব আরো বলেছেন— “যদি তুমি কোন সংকটের ধারালো ধারায় পড় তবে অভিযোগ করা থেকে সাবধান থেকো। কেননা নিরাপত্তার উপায় হলো কঠিন পথে চলা।”
📄 ধৈর্য নিয়ে কিছু কথা
বর্ণিত আছে যে, ইবনে মাসউদ (রা) বলেছেন : “ঈমান ও পরিতৃপ্তি থেকেই শান্তি ও সাহায্য আসে। সন্দেহ ও ক্রোধ থেকে দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা ও দুঃখ-কষ্ট আসে।” তিনি আরো বলতেন— “ধৈর্যশীল সর্বোচ্চ লক্ষ্য অর্জন করে।”
আক্ববান ইবনে তাগলাব বলেছেন— “আমি এক মরুবাসী আরবকে বলতে শুনলাম যে সে বলছে, ‘যখন কেউ অপ্রিয়কর অবস্থার সম্মুখীন হয়ে সে প্রকাশিত হওয়ার জন্য ধৈর্য ধরে তখন সর্বাপেক্ষা মহৎ একটি গুণ প্রকাশিত হয়; তার ধৈর্য ও আশা তার উপর আশাপ্রদ প্রভাব ফেলে; এ যেন সে সদা নিজেকে সমস্যা থেকে সুরক্ষিত হতে দেখে; আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস ও তাঁর সম্বন্ধে তার সুধারণার কারণে তার মানসিক অবস্থা এতটাই উচ্চমাত্রার আশাপ্রদ।’ যখন কারো এসব গুণ থাকে তখন আল্লাহ্ তার হাজত (প্রয়োজন) পূর্ণ করে দিবেন ও তার জীবন থেকে সংকট (দুঃখ-কষ্ট-অভাব-অনটন ও সমস্যা) দূর করে দিবেন এবং এর জন্য তাকে কখনও দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে হয় না। তিনি নিরাপদে থাকবেন এবং তার ধৈর্য ও সম্মানও নিরাপদ থাকবে।”
আল আসামায়ী বর্ণনা করেন যে, এক মরুবাসী আরব বলেছেন: “যখন আপনি মন্দ অবস্থায় পান তখন আপনি ক্ষতির আশংকা করুন। যখন আপনি মন্দ অবস্থায় থাকেন তখন ভালোয় আশা করুন। যারা যুদ্ধকে আকাঙ্ক্ষা করেছে এমন অনেকেই বেঁচে গেছেন আর যারা বাঁচতে চেয়েছিল এমন অনেকেই মরে গেছে। ভয়ংকর পথে চলার পরই অধিকাংশ সময় নিরাপত্তা আসে।”
কোন একজন জ্ঞানী লোক বলতেন: “জ্ঞানী ব্যক্তি সংকটে পড়লে নিজেকে দু’ভাবে সান্ত্বনা দেন। প্রথমটি হলো—পরিতৃপ্ত হওয়া। দ্বিতীয়টি হলো—তার উপর যে মুসিবত এসেছে তা থেকে নিষ্কৃতির উপায়ের আশায় থাকা। মূর্খ লোক সংকটের সময় দৃঢ়তা বিচলিত ও ভীত হয়। প্রথমটি হলো—যে সব লোকের কাছে সে সাহায্য চায় তাদের সংখ্যা। দ্বিতীয়টি হলো—তার উপর যে মুসিবত এসেছে তার চেয়ে আরো মন্দ অবস্থা সম্বন্ধে তার সদা ভয় ও আশংকা।”
এবং আমি পূর্বে যেমনটি উল্লেখ করেছি, বর্ণিত হয়েছে যে, মহান আল্লাহ্ কঠিন সমস্যার মাধ্যমে আমাদেরকে শিক্ষা দেন। এমন শিক্ষা যা অন্তর, কর্ম ও চক্ষুকে উন্মুক্ত করে। আল হাসান ইবনে সাউল বিপদাপদকে তুলনা দিয়ে লোকদের জন্য জাগরণী আহ্বান, ধৈর্যশীল লোকদের জন্য গভীর উপায় এবং প্রত্যেকের জন্য কল্যাণের স্মারক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এবং আল্লাহ্র বিধান সর্বদা উত্তম, বিশেষ করে তাদের জন্য, যারা তাদের বীরত্বের মাধ্যমে মৃত্যু তালাশ করেছে এবং যারা ক্ষণস্থায়ী জীবন তালাশ করেছে। এবং যারা তাদের মতো নয় তাদের বর্ণনা নিচে আয়াতেও দেওয়া হয়েছে— “যারা তাদের (নিহত) ভাইয়ের সম্বন্ধে বলল— {অথচ তারা (ঘরে) বসেছিল} যদি তারা আমাদের অনুসরণ করত {আমাদের (কথা) মতো ধৈর্য ধরে থাকত} তবে তারা মরত না।” {মুহাম্মাদ ﷺ আপনি বলে দিন, “যদি তোমরা সত্যবাদীই হয়ে থাক, তবে তোমরা তোমাদের মৃত্যুকে হটিয়ে দাও।”} (৩-সুরা আলে ইমরান : আয়াত-১৬৮)