📄 ইলাহী তাক্বদীর বা স্বর্গীয় পূর্বনির্ধারিত বিধান
সিরিয়া থেকে প্রকাশিত ‘আলক্বাসীম’ নামক পত্রিকায় এক যুবক সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লেখা হয়েছিল। যুবকটি বিদেশ ভ্রমণের জন্য ফ্লাইটে একটি সিট বুকিং করেছিল। সে তার মাকে ফ্লাইটের সময়ের কথা জানিয়ে অনুরোধ করেছিল বিমান ছেড়ে যাওয়ার কিছু আগে তাকে জাগিয়ে দিতে। সে ঘুমিয়ে পড়ার পর তার মা রেডিওতে সংবাদ শুনল যে, আবহাওয়ার অবস্থা খুব খারাপ ও প্রচণ্ডভাবে ঝড়ো বায়ু বইছে। তার একমাত্র সন্তানের জন্য তার মায়া হলো তাই সে তাকে জাগাল না এ আশায় যে, যাতে সে ফ্লাইট মিস করে (ফ্লাইট ধরতে না পারে)। যখন সে নিশ্চিত হলো যে বিমান ছেড়ে গেছে তখন সে তার ছেলেকে জাগাতে গেল। ছেলের ঘরে ঢুকে মা ছেলেকে বিছানায় মৃত শায়িত পেল! (ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস!)
📄 আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন
ভাবার্থ: “প্রভু হিসেবে আল্লাহর প্রতি, ধর্ম হিসেবে ইসলামের প্রতি এবং নবী হিসেবে মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি আমি সন্তুষ্ট।”
এ কথার প্রতি ঈমান (বিশ্বাস) রাখার পাশাপাশি অবশ্যই আল্লাহর তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে থাকতে হবে। তাকদীরের বিশ্বাসের ব্যাপারে যখন আপনার পছন্দ-অপছন্দ থাকে তখন আপনার বিশ্বাস (ঈমান) সঠিক নয়। তাকদীরের বাধ্যবাধকতার অর্থ হলো শুধুমাত্র আপনার ইচ্ছার সাথে আপনার তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত থাকা এবং একই সময়ে আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যে তাকদীর তার প্রতিও অভিযোগ না করা ও এর প্রতি রোষ পোষণ না করা।
কিছু লোক তাদের প্রভুর প্রতি তখন খুশি হতো যখন নাকি সবকিছু ঠিকঠাক চলত, কিন্তু যখন সবকিছু কঠিন হতো তখন তারা তাকদীরের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকত। এদের সম্বন্ধে আল্লাহ বলেছেন— “যদি তার কোন কল্যাণ হয় তবে সে তাতে সন্তুষ্ট থাকে, কিন্তু যদি তার কোন বিপদ হয় তবে সে মুখ ফিরিয়ে নেয় (অর্থাৎ পূর্বাবস্থায় ফিরে যায় তথা ইসলাম গ্রহণ করার পর পুনরায় কাফের হয়ে যায়)। সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়টাই হারায়।” (২২-সূরা আল হাজ: আয়াত-১১)
কিছু কিছু মক্কাবাসী আরব প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করত এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে (অর্থাৎ কুরআনে) তারা যখন সাফল্য ও উপকার পেত তখন তারা বলত, “এটা উত্তম ধর্ম।” তখন তারা হুকুম মানত ও ধর্মীয় কর্তব্য পালন করত। কিন্তু যখন তারা বিপরীত অবস্থা অবলোকন করত, উদাহরণস্বরূপ—খরা ও দারিদ্র্য, তখন তারা হতাশায় তাদের ধর্মকে পরিত্যাগ করে মুখ ফিরিয়ে নিত। এভাবে যে ব্যক্তি ইসলাম চর্চা করে সর্বদাই তার ইচ্ছা পূরণে স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বস্তি আশা করে, আল্লাহ্র ইবাদত করার জন্য এবং ইসলামের পতাকা বহন করার জন্য তাকে মনোনীত করা হয়েছে, কিন্তু সে এ সম্মানে সন্তুষ্ট নয়, সে চিরস্থায়ী শাস্তির যোগ্য। “তাদেরকে ওই ব্যক্তির ঘটনাও পড়ে শোনাও যাকে আমি আমার আয়াতসমূহ (নির্দেশনাবলী) দিয়েছিলাম, কিন্তু সে সেগুলোকে ছেড়ে দূরে সরে যায়, তাই শয়তান তার পিছু নেয়, ফলে সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।” (৭-সূরা আল আ'রাফ : আয়াত-১৭৫)
আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব অন্বেষণকারীরা যে জীবন বিধান অনুসরণ করেছেন সে উচ্চতর জীবন বিধান অনুসারে যারা জীবন যাপন করতে চান তারাই আল্লাহর তুষ্টির পথ অনুসরণ করেন। হুনাইনের যুদ্ধের পর আল্লাহর রাসূল ﷺ গণীমতের মাল বন্টন করলেন। বিভিন্ন গোত্রপতি ও বিশেষ করে দেরীতে ইসলাম গ্রহণকারী আরবদেরকে তিনি গণীমতের মাল বন্টন করে দিলেন। তিনি আনসারদের তুষ্টি ও ঈমানের প্রতি আশ্বস্ত হয়ে তাদেরকে গণীমতের মাল দিলেন না। সম্ভবত তাদের কেউ কেউ এ বন্টন থেকে তাদের বাদ পড়ার কারণ পুরোপুরি বুঝতে পারেনি, তাই আল্লাহর রাসূল ﷺ তাদেরকে বাদ দেওয়ার কারণ তাদের নিকট ব্যাখ্যা করার জন্য তাদেরকে একত্রে জমায়েত করলেন। রাসূল ﷺ তাদেরকে তাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা জানালেন এবং এও জানালেন যে, ইসলামের নিকটবর্তী করার জন্যই শুধুমাত্র তিনি অনারবদেরকে (গণীমতের সব মাল) দিয়েছেন, তাদের ঈমানের দুর্বলতার কারণেই একাজ করা হয়েছে, তাদের ঈমানকে শক্তিশালী করার প্রয়োজন ছিল। তিনি আনসারদেরকে বললেন: “যখন নাকি লোকেরা উট ও ভেড়া নিয়ে চলে যাচ্ছে তখন তোমরা আল্লাহর রাসূলকে ﷺ নিয়ে যাচ্ছ এবং তাতে কি তোমরা সন্তুষ্ট নও! আনসারগণ আমার অন্তরবাসের মতো আর অন্যরা আমার বহির্বাসের মতো। আল্লাহ যেন আনসারদেরকে, আনসারদের সন্তানদেরকে এবং আনসারদের বংশধরদেরকে করুণা করেন। সব মানুষ যদি কোনো উপত্যকা বা গিরিপথ দিয়ে চলে তবে আনসারগণ অন্য উপত্যকা বা গিরিপথ দিয়ে ভ্রমণ করবে আর আমিও আনসারদের উপত্যকা বা গিরিপথ দিয়ে চলব।” তখন তারা সন্তুষ্ট হলো, তাদের উপর আনন্দ ও প্রশান্তি নেমে আসল। অধিকন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ তাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন।
যারা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর সন্তুষ্টি চায় তারা এমনকি গোটা দুনিয়ার বিনিময়েও এ সন্তুষ্টিকে বিসর্জন দিবে না। আল্লাহর সন্তুষ্টির পুরস্কারের সাথে কোন কিছুরই তুলনা হয় না। এক মক্কাবাসী আরব আল্লাহর রাসূলের ﷺ উপস্থিতিতে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তখন নবী করীম ﷺ তাকে কিছু টাকা-পয়সা দিলেন। আরবী লোকটি তখন বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনার আনুগত্য করার বায়াত (অঙ্গীকার) আমি এর জন্য করিনি!” নবী করীম ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে কেন তুমি আমাকে অনুসরণ করার বায়াত করেছ?” তিনি উত্তর দিলেন, “আমি আপনার বাইয়াত এজন্য করেছি যাতে একটি তীর আমার এখান দিয়ে ঢুকে এখান দিয়ে বের হয়ে যায়।” আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, “তুমি যদি আল্লাহর নিকট সৎ থাক তবে আল্লাহও তোমার সাথে সৎ থাকবেন।” লোকটি একটি যুদ্ধে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং একটি তীর তাকে ঠিক সেভাবেই আঘাত করেছিল যেভাবে তিনি আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন।
আরেকবার আল্লাহর রাসূল ﷺ কিছু সম্পদ বিতরণ করেছিলেন, যারা দ্বীনের ব্যাপারে দুর্বল ছিল রাসূল ﷺ তাদেরকে দিলেন; কিন্তু, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে যাদের তরবারি রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, দ্বীন রক্ষার্থে যারা তাদের দেহ ও সম্পদ ব্যবহার করেছিলেন রাসূল ﷺ তাদেরকে দিলেন না। আল্লাহর রাসূল ﷺ জনসম্মুখে দাঁড়িয়ে বললেন— “আল্লাহ যাদের অন্তরকে লোভ ও উদ্বিগ্নতা দিয়েছেন আমি তাদেরকে দেই আর অন্যদেরকে অন্তরে আল্লাহর আনুগত্য থাকার কারণেই আমি তাদেরকে দেই না। তাদের একজন হলেন আমর ইবনে তাগলাব।” আমর (রা) বললেন, “এসব কথার বিনিময়ে আমি গোটা দুনিয়াকেও চাই না।” এ হলো পরম সন্তুষ্টি ও মহান আল্লাহর নিকট যা আছে তার চরম অন্বেষণ। তাদের কারো নিকট গোটা দুনিয়ার মূল্যও আল্লাহর রাসূলের ﷺ হাসির সমান ছিল না।
আল্লাহর রাসূলের ﷺ অঙ্গীকার ছিল: আল্লাহর পুরস্কার, তাঁর সন্তুষ্টি ও জান্নাত। রাসূল ﷺ তাদেরকে অট্টালিকা ও জমিজমার অঙ্গীকার দেননি। রাসূল ﷺ তাদেরকে বলেছেন, “যে ব্যক্তি অমুক অমুক কাজ করবে তার পুরস্কার হবে জান্নাত।” আর রাসূল ﷺ অন্য কাউকে বলতেন, “যে ব্যক্তি অমুক অমুক কাজ করবে সে জান্নাতে আমার সঙ্গী হবে।” পার্থিব তুচ্ছ মুদ্রা দ্বারা সাহাবীদের বিশাল ত্যাগ ও প্রচেষ্টার প্রতিদান দেওয়া যেতে পারে না। পরকালে তাদের ন্যায্য প্রতিদান দেওয়া যাবে।
ইমাম তিরমিযী (রহ) বর্ণনা করেছেন যে, উমর (রা) মক্কায় হজ্জ করতে যাওয়ার জন্য নবী করীম ﷺ এর অনুমতি নিতে গেলেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ উত্তর দিলেন, “হে আমার ভাই! তোমার প্রার্থনায় আমাকে ভুলে যেও না।” এ অনুরোধের বক্তা বা কথক ছিলেন হেদায়েতের বার্তাবাহক, যিনি নিষ্পাপ ছিলেন এবং যিনি ইচ্ছানুসারে কথা বলতেন না বরং ওহী অনুসারে কথা বলতেন। উমর (রা) নবী করীম ﷺ-এর অমূল্য ও হৃদয়ের কাঙ্ক্ষিত বাণী সম্বন্ধে বললেন, “গোটা দুনিয়ার বিনিময়েও আমি একথাগুলো বিক্রি করব না।” কল্পনা করুন যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ আপনাকে বলেছেন, “হে আমার ভাই! তোমার দোয়ায় আমাকে ভুলো না।” তখন আপনার কেমন লাগবে? আল্লাহর নিকট নবী করীম ﷺ-এর সন্তুষ্টি ও আনন্দের মাত্রার স্তর বর্ণনা করা আমাদের সাধ্যতীত। রাসূল ﷺ অভাবের সময় ও দারিদ্র্যতার সময়, সুস্থতার সময় ও অসুস্থতার সময় এবং সুখে ও দুঃখে বা দুঃসময় ও সুসময়ে তাঁর প্রতিপালকের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন।
রাসূল ﷺ এতিম হওয়ার তিক্ততা ও দুঃখ ভোগ করেছেন। তাঁর জীবনে মাঝে মাঝে তিনি খাওয়ার জন্য একটি নিম্নমানের খেজুরও সংগ্রহ করতে পারতেন না। ক্ষুধার যন্ত্রণা নিবারণ করতে রাসূল ﷺ পেটে পাথর বাঁধতেন। এক ইহুদীর কাছ থেকে ঋণ করার জন্য তাঁকে তাঁর নিকট একটি বর্ম জামানত হিসেবে রাখতে হয়েছিল। তাঁর বিছানা ছিল খড়কুটোর যাতে তাঁর পার্শ্বদেশে দাগ বসে যেত ও ব্যথা করত। মাঝে মাঝে খাবার যোগাড় করতে পুরা তিন দিন কেটে গেছে। এতসব দুঃখ-কষ্ট ও সংকট সত্ত্বেও রাসূল ﷺ সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। “তিনি কতইনা মহান যিনি ইচ্ছা করলেই আপনার জন্য সৃষ্টি করে দিতে পারেন এর চেয়ে উত্তম জান্নাতসমূহ যাদের পাদদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গেছে নদী-নালা, আরো তিনি (ইচ্ছা করলেই) আপনার জন্য সৃষ্টি করে দিতে পারেন অট্টালিকাসমূহ।” (২৫-সূরা আল ফুরকান : আয়াত-১০)
তাঁর দ্বীন প্রচার অভিযানের প্রাথমিক বছরগুলোতে তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম সময়েও রাসূল ﷺ আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। গোটা দুনিয়া তাদের জনসংখ্যা নিয়ে, তাদের সম্পদ নিয়ে ও তাদের ক্ষমতা নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। এ সময় তাঁর চাচা আবু তালিব ও তাঁর স্ত্রী খাদীজা (রা) উভয়ই ইন্তেকাল করেছেন। কুরাইশরা তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদেরকে সব রকমের গালি দিয়েছিল। মিথ্যুক, জাদুকর, পাগল ও কবি হওয়ার অভিযোগ দিয়ে তাঁর জাতি তাঁকে অপবাদ দিয়েছিল। তাঁর জন্মভূমি মক্কা—যেখানে তিনি শৈশবে খেলা-ধুলা করেছেন ও বড় হয়েছেন সেখান থেকে যেদিন তাড়িয়ে দেয়া হয় সেদিনও রাসূল ﷺ তাঁর প্রভুর প্রতিই সন্তুষ্ট ছিলেন। মক্কার দিকে ফিরে তাঁর নয়নযুগল অশ্রুসিক্ত হয়ে গিয়েছিল আর তিনি ﷺ বলেছিলেন— “আল্লাহ্র যমিনের মধ্যে তুমিই আমার নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয়, তোমার অধিবাসীরা যদি তোমার কাছ থেকে আমাকে তাড়িয়ে না দিত তবে আমি (তোমাকে) ছেড়ে যেতাম না।”
যখন রাসূল ﷺ তাঁর মহান বাণী পৌঁছানোর জন্য তায়েফে গমন করলেন আর তাঁকে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে বরং তাঁকে পাথর নিক্ষেপ করে সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল। ফলে পা দিয়ে রক্ত ঝরেছিল—তখনও রাসূল ﷺ তাঁর প্রভুর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ উহুদের যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন, তাঁর এক দাঁত ভেঙে গিয়েছিল, তাঁর বহু সাহাবীকে জখম করা হয়েছিল তবুও রাসূল ﷺ যুদ্ধের পরক্ষণেই বলেছিলেন— “তোমরা আমার পিছনে কাতার বেঁধে দাঁড়াও, যাতে আমি আমার প্রভুর প্রশংসা করতে পারি।” তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই তিনি তাঁর প্রভুর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন—যার পুরস্কার নিম্নোক্ত আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে— “আর নিশ্চয় শীঘ্রই আপনার প্রভু আপনাকে এমন জিনিস দান করবেন যার ফলে আপনি সন্তুষ্ট (আনন্দিত) হয়ে যাবেন।” (৯৩-সূরা আদ দোহা : আয়াত-৫)
📄 ধ্বংস হওয়ার পরেও সন্তুষ্টি
বনী আবস গোত্রের এক লোক তাঁর হারিয়ে যাওয়া কতগুলো উটের সন্ধানে তাঁর শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। তিন দিন সে তাঁর বাড়ি থেকে দূরে ছিলেন। তিনি একজন ধনী লোক ছিলেন; আল্লাহ্ তাঁকে বহু সম্পদ ও একটি বড় পরিবার (বহু সন্তান-সন্তুতি) দান করেছিলেন। তাঁর সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি এক বিশাল ভূ-সম্পত্তির উপর থাকত। তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে শান্তি ও সমৃদ্ধি দিয়ে রেখেছিল—কখনও তাঁদের কোন বিপর্যয় ঘটেনি। তাঁদের পিতার অনুপস্থিতির সময়ে এক রাতে গোটা পরিবারটাই ঘুমিয়ে পড়েছিল। তখন আল্লাহ্ তাঁদের উপর প্রবল স্রোতপূর্ণ বন্যা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, যার সাথে এমনভাবে পাথর আর মাটি মিশে ছিল যেমন নাকি প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ুর সাথে বালি উড়ে আসার আশা করা যায়। তাঁর বাড়িটি সমূলে উৎপাটিত হয়ে গেল এবং অনুপস্থিত পিতার গোটা পরিবার ও সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেল। আবহাওয়া শান্ত হওয়ার পর না থাকল পরিবারের কোন চিহ্ন, আর না থাকল সম্পদের কোন চিহ্ন। যেন তারা কখনও ছিল না।
তিন দিন পর সে তার বাড়িতে ফিরে এসে দেখতে পেল ফাঁকা ও শূন্য একটি ভূমি। জীবনের কোন চিহ্নও দেখা গেল না। সে যে মানসিক আঘাত পেয়েছিল তাতে সে যে সবকিছু হারিয়েছিল তা সত্যভাবে বিশ্বাস করতে কিছু সময় লেগেছিল। তারপর আরো খারাপ ঘটনা হলো যে, তাঁর একটি উট পালিয়ে যেতে চেষ্টা করল। সে এটাকে নিজে ধরে রাখতে চেষ্টা করল, কিন্তু এটা এর পিছনের পা দিয়ে তাঁর দু’চোখে লাথি মেরে তাঁকে অন্ধ বানিয়ে দিল। মরুভূমিতে একাকী লোকটি নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার কারো উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে লাগল। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর অবশেষে সে একজন মরুবাসী আরবকে তাঁর ডাকে সাড়া দিতে শুনল। মরুবাসী আরব তাঁকে দামেশকের খলিফা ওয়ালীদ ইবনে আব্দুল মালেকের নিকট নিয়ে গেল। লোকটি তাঁর ঘটনা বলল, আর খলিফা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “(এখন) আপনি কেমন আছেন?” লোকটি দৃঢ়ভাবে উত্তর দিলেন, “আমি আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট আছি।”
এই যে মুসলিম—যার অন্তরে সত্যিকার তাওহীদ বহন করেছিল—তিনি এই যে ‘শক্তিশালী কথাগুলো’ বললেন তা তাঁর পরবর্তী জাতির জন্য শিক্ষা ও নৈতিক উপদেশ হয়ে গেল। কী ছিল এই নৈতিক শিক্ষা? তা ছিল সর্বদা আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। যে লোক আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত নয় সে যদি চায় তবে সে অন্য পথ খোঁজার চেষ্টা করুক– “যে কেউ মনে করে, আল্লাহ্ তাঁকে কখনও দুনিয়া ও আখিরাতে সাহায্য করবেন না, সে আকাশের দিকে একটি রজ্জু প্রসারিত করুক; পরে তা বিচ্ছিন্ন করুক। অতঃপর সে দেখুক যে তার কৌশল তার ক্রোধ দূর করে কি না।” (২২-সূরা আল হাজ্জ : আয়াত-১৫)