📄 অসন্তোষ সন্দেহের দ্বার
অসন্তুষ্টি আল্লাহর প্রতি, তাঁর তকদীর বা বিধানের প্রতি, তাঁর প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের প্রতি সন্দেহের দ্বার খুলে দেয়। অভিযোগকারী এসব সন্দেহ থেকে মুক্ত হয় এমনটি খুব কমই দেখা যায়। এসব সন্দেহ তার আত্মার সাথে মিশে থাকে এবং তার অস্তিত্বে ছড়িয়ে থাকে। সে (অসন্তুষ্ট ব্যক্তি) যদি অসন্তুষ্টি নিয়ে নিজের বিষয়ে গভীর গবেষণা করে দেখত, তবে সে দেখতে পেত যে, তার ঈমান নড়বড়ে ও সন্দেহযুক্ত। সন্তুষ্টি ও ঈমান ভাইয়ের মতো, যা একে অপরের সাথে থাকে। পক্ষান্তরে, সন্দেহ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একই রকম ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক আছে। তিরমিযী শরীফে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম ﷺ বলেছেন- “যদি তুমি ঈমানের সাথে সন্তুষ্টি প্রদর্শন করতে পার তবে তা কর, আর যদি তা না পার তবে আত্মা যা অপছন্দ করে তাতে ধৈর্য ধরার মধ্যে প্রচুর কল্যাণ আছে।”
অতএব যারা অসন্তুষ্ট তারা ভিতরে ভিতরে বিরক্ত, ক্ষুব্ধ এবং ক্রুদ্ধও বটে, যদিও তাদের ক্রোধ কথায় প্রকাশ পায় না। তাদের ভিতরে বিভিন্ন রকম প্রশ্ন মিশে আছে, যেমন—এটা কেন ঘটল বা এটা কীভাবে হতে পারে?
📄 সন্তুষ্টিই সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা
তকদীর বা খোদায়ী বিধান সম্পর্কে যে ব্যক্তি তার অন্তরকে সন্তুষ্টি দ্বারা পূর্ণ করে, আল্লাহ তার অন্তরকে সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও শান্তি দ্বারা ভরে দেন। আর যে ব্যক্তি অসন্তুষ্ট হবে তার অন্তর বিপরীত গুণাবলি দ্বারা পূর্ণ হবে এবং তার অন্তর এমন সব বিষয় নিয়ে পূর্বে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবে যা সুস্থ ও সফলতাকে ধ্বংস করে দিবে।
অতএব সন্তুষ্ট অন্তরকে সকল প্রকার অনাবশ্যক আচরণ থেকে মুক্ত করে তা এক সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য ছেড়ে দেয়। অসন্তুষ্ট অন্তর থেকে আল্লাহর সকল চিন্তা দূর করে দেয়। সুতরাং ক্রুদ্ধ, বিরক্ত ও অভিযোগকারী লোক—যে সর্বদা মনে করে যে, সে এক সমস্যায় পড়েছে তার প্রকৃত কোন ভিত্তি নেই। সে মনে করে তার রিযিক কম, সে গরিব (দরিদ্র), তার সমস্যা নানাবিধ এবং সর্বোপরি সে মনে করে যে, সে আরো পাওয়ার যোগ্য। আল্লাহ্ তার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন মূলত সে বিষয়ে বা তা নিয়ে সে অসন্তুষ্ট। তাহলে এ ধরনের লোক কীভাবে শান্তি ও ভালো জীবন পেতে পারে?
“তা এজন্য যে, যা আল্লাহকে রাগান্বিত করত তারা তার অনুসরণ করেছিল এবং তাঁর (আল্লাহর) সন্তুষ্টিকে অপছন্দ করেছিল। তাই তিনি (আল্লাহ) তাদের আমলসমূহকে বাতিল করে দিলেন।” (৪৭-সূরা মুহাম্মাদ বা কেতাল : আয়াত-২৮)
📄 সন্তুষ্টির ফল কৃতজ্ঞতা (শুকরিয়া)
অল্পে তুষ্টি তকদীরের প্রতি বিশ্বাসের পথে পরিচালিত করে, শুকরিয়া হলো ঈমানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের। আসলে এটাই ঈমানের আসল রূপ। ধার্মিকতার বিভিন্ন পর্যায়ের সর্বোচ্চ শিখর বা চূড়া আল্লাহর শুকরিয়া আদায়। যে ব্যক্তি আল্লাহর করুণা, শাসন, বিধান, তাঁর দান ও তাঁর ছিনিয়ে নেয়ার প্রতি সন্তুষ্ট নয় সে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ নয়। প্রকৃতপক্ষে কৃতজ্ঞ লোকেরাই সর্বাপেক্ষা ধন্য ও সমৃদ্ধ লোক।
প্রতিদিনেই আমরা এ ধরনের লোক দেখি, যারা মানসিকভাবে দুঃখিত, অন্তরসংশয়ী ও তাদের প্রতি ভক্তি-বিরক্ত আর তা এ কারণে যে, তিনি তাদেরকে আরো বেশি দান করেননি। তারা সুঅবস্থায় থাকা সত্ত্বেও এবং তাদের প্রতিদিনের পুষ্টিকর খাবার সত্ত্বেও তারা এ রকমটা ভাবে। তাদের যে সব মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিস আছে তার সবটা উপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। তারা এসব জিনিসের জন্য কৃতজ্ঞও নয় এবং তাদের যে অবসর সময় আছে তার জন্যও কৃতজ্ঞ নয়। যদি তাদেরকে প্রাসাদ বা অট্টালিকা দান করা হতো তাহলে কি ঘটনা ঘটত! আসলে তাদের প্রচুর প্রশ্ন এমনকি আরো বেশি বিঘাতত হয়ে যেত এবং তারা আরো বেশি ঔদ্ধত্য ও অবজ্ঞা প্রকাশ করত। যে খালি পায়ে হাঁটে সে বলে, “আমার প্রভুর প্রতি আমি তখন কৃতজ্ঞ হব, যখন তিনি আমাকে জুতো দিয়ে ধন্য করবেন।” অথচ জুতাওয়ালা একটি দামী গাড়ি পাওয়া পর্যন্তও তার কৃতজ্ঞতা বিলম্বিত করতে চায়। আমরা কল্যাণকে নগদে গ্রহণ করি আর ভবিষ্যতে কৃতজ্ঞ হই। আল্লাহ্র কাছ থেকে আমাদের আশা অশেষ। অথচ তাঁর আদেশ পালনে আমরা ধীর ও অলস।
📄 অসন্তুষ্টির ফল অবিশ্বাস (কুফরি)
বিরক্তি ও ক্ষুব্ধতার কারণে মানুষ আল্লাহর অনুগ্রহকে অস্বীকার করে। ফলত এটা কুফরি (আল্লাহকে অবিশ্বাস) পথে নিয়ে যায়। বান্দা যদি প্রভুর প্রতি সর্বাবস্থায় সন্তুষ্ট থাকে তবে স্বভাবতই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। অতএব, সে সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু যদি সে অসন্তুষ্ট হয় তবে সে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধদের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং কাফেরদের পথ অনুসরণ করে। ঈমানের মধ্যে মিথ্যা ও বিচ্যুতি অনুভব কেবল এভাবেই ঘটে যে, আল্লাহ্র অনেক বান্দা নিজেই নিজের প্রভু হতে চেয়েছিল, এমনকি তাদের অনেকে নিজেদের চাহিদা ও ইচ্ছাকে তাদের প্রভু কর্তৃক লিখিয়ে নিতে বা অনুমোদন করিয়ে নিতেও উদ্যোগ নিয়েছিল। “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আগে বেড়ো না।” (৪৯-সূরা আল হুযুরাত : আয়াত-১)