📄 তক্বদীর
এক ভীষণ উদ্বিগ্ন মানসিক রোগী এক মুসলিম চিকিৎসকের নিকট পরামর্শ চেয়েছিল। চিকিৎসক তাকে উপদেশ দিলেন, “জেনে রাখুন, ভবিষ্যতে যা কিছু ঘটবে তা আগেই নির্ধারিত হয়ে আছে, সুতরাং আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোন কিছু নড়ে না এমনকি ফিসফিস শব্দও হয় না। অতএব, দুশ্চিন্তা কেন?” নিম্নোক্ত হাদীসে একথা এভাবে আছে— “আল্লাহ সৃষ্টিকে সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই সকল সৃষ্টির তকদীর বা ভাগ্যলিপি বা কর্মবিধি লিখে রেখেছেন।”
বিখ্যাত আরব কবি মুতানাব্বি বলেছেন— “ছোট লোকের চোখে ছোট জিনিস বড় দেখায় আর মহৎ লোকের চোখে বড় জিনিস ছোট দেখায়।”
📄 আপনার ভাগ্যে যে রিযিক আছে তা আপনার নিকট আসবেই
যে তার রিযিকের বিলম্বে অধৈর্য, কেন তার সম্পদ এত কম সেজন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং অন্যদের তুলনায় পার্থিব সম্পদ কম থাকার কারণে অসন্তুষ্ট সে তো ঐ ব্যক্তির মতো যে নাকি সালাতের ইমামের আগে সালাতের রোকনসমূহ (রুকু, সেজদা, কওমা, জলসা ইত্যাদি) আদায় করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে ইমামের সালাম ফিরানোর আগে সালাম ফিরিয়ে সালাত শেষ করতে পারে না। অনুরূপভাবে, কেউ তার তকদীরের সব রিযিক ভোগ করার আগে মরতে পারে না। সকল সৃষ্টিকে সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার (৫০,০০০) বছর আগেই তার তকদীর লেখা হয়ে গেছে।
“আল্লাহর আদেশ আসবেই। সুতরাং এর জন্য তাড়াহুড়া করো না!” (১৬-সূরা আন নাহল: আয়াত-১)
“আর আল্লাহ্ যদি তোমার কল্যাণ চান তবে কেউ তাঁর অনুগ্রহকে রদ করতে পারবে না।” (১০-সূরা ইউনুস: আয়াত-১০৭)
উমর (রা) বলেছেন— “হে আল্লাহ্! আমি আপনার নিকট পাপীদের ধৈর্য থেকে ও অবিশ্বাসীদের দুর্বলতা থেকে পানাহ্ চাই।”
এ কথার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থ আছে। আমি যখন ইতিহাসের প্রধান প্রধান ঘটনা নিয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখলাম, তখন দেখতে পেলাম যে, আল্লাহর অনেক শত্রুদের আশ্চর্য রকম বীরত্বপূর্ণ সহিষ্ণুতা, কষ্ট সহিষ্ণুতা ও অধ্যবসায় ছিল। পক্ষান্তরে, আমি এও দেখতে পেলাম যে, বহু মুসলমান নীরস, জড়ত্বগ্রস্ত বা অলস ও দুর্বল ছিল। এসব কিছু তখনই দেখা দিয়েছিল যখন তারা ভুল করে ভাবতে ছিল যে, তারা আল্লাহর উপর নির্ভর করে আছে। আল্লাহর উপর সঠিক নির্ভরতা বলতে বুঝায় প্রচেষ্টা করা ও কাজ করা এবং তারপর কাজের ফলাফল আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়া।
📄 রিযিক তালাশ করুন কিন্তু লোভ করবেন না
সমস্ত মহিমা ও প্রশংসা স্রষ্টা ও রিযিকদাতার প্রাপ্য। তিনি কীটকে মাটিতে, মাছকে পানিতে, পাখিকে শূন্যে (আকাশে), পিঁপড়াকে অন্ধকারে এবং সাপকে পাথরের ফাটলে খোরাক দেন।
আল্লামা ইবনুল জাওযী এমন এক দৃশ্য দর্শন করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন যা চমৎকার এমনকি আজবও বটে। একটি গাছের আগডালে একটি অন্ধ সাপ বাস করত। একটি পাখি তার ঠোঁট দিয়ে এটির জন্য খাবার নিয়ে আসত। এটি সাপের নিকট এসে (কিচির মিচির) শব্দ করত। এ শব্দ শুনে সাপটি হাঁ করত, আর পাখিটি সাপের (সে হাঁ করা) মুখে খাবার ভরে দিত। সকল মহিমা ও প্রশংসা সেই আল্লাহরই প্রাপ্য যিনি পাখিকে দিয়ে সাপের সাহায্য করালেন।
“নিজ ডানার সাহায্যে উড়ে এমন প্রতিটি পাখিই তোমাদের মত এক একটি উম্মত।” (৬-সূরা আন’আম: আয়াত-৩৮)
মেহরাবের মধ্যে মরিয়ম (আ)-এর নিকট দিন-রাত রিযিক আসত। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো— “এসব আপনার নিকট কীভাবে আসে?” তিনি উত্তর দিলেন, “সব আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। নিশ্চয় আল্লাহ যাকে চান তাকে অপরিমিত রিযিক দান করেন।” (৩-সুরা আলে ইমরান: আয়াত-৩৭)
“এবং অভাবের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা কর না। আমিই তোমাদের ও তাদের রিযিক দিই।” (১৭-সুরা বনী ইসরাঈল: আয়াত-৩১)
লোকজনকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে পিতা-পুত্র উভয়েরই রিযিকদাতা হলেন তিনি যিনি জন্ম দেন না এবং জাতও নন। অনন্ত অসীম ধন ভাণ্ডারের মালিক নিজেই আপনার (এবং সকলের) রিযিকের গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা দিয়েছেন।
“অতএব আল্লাহর নিকট রিযিক চাও এবং তাঁর দাসত্ব (ইবাদত) কর ও তাঁর কৃতজ্ঞতা (শোকরিয়া) আদায় কর।” (২৯-সুরা আনকাবুত: আয়াত-১৭)
“এবং তিনিই আমাকে পানাহার করান।” (২৬-সুরা আশ শুয়ারা: আয়াত-৭৯)
📄 অল্পে তুষ্টির ফল
“আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।” (৫-সুরা মায়িদা : আয়াত-১১৯)
অল্পে তুষ্টি বহু কল্যাণময় ফল বহন করে। যা তকদীরে আছে অন্য যে কোন জিনিসের তুলনায় তার প্রতি বেশি সন্তুষ্ট হয়েই ঈমান ও বিশ্বস্ততার সর্বোচ্চ স্তরে উত্তীর্ণ হওয়া যায়।
কেউ হয়তো শুধুমাত্র ভালোটাতেই তাদের উপর বর্তাক হোক এমনটাই আশা করতে পারে। কিন্তু শুধুমাত্র সুখকর জিনিসই তাদের জীবনে আসুক এটুকু আশা করতে পারে। কিন্তু আল্লাহর রাজত্বে এমনটা হবে না। বহু সত্যিকার ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য হলো ধৈর্য, সম্পূর্ণ ভরসা, পরিতৃপ্তি, বিনয় ও আল্লাহর ইচ্ছার নিকট আত্মসমর্পণ। যখন তারা প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হতেন তখন তাদের এসব গুণ প্রকাশিত হতো। অতএব, তকদীরে সন্তুষ্ট হওয়ার অর্থ এ নয় যে, কেবলমাত্র চাহিদামূলক বা মনের মতো জিনিসের প্রতিই সন্তুষ্ট থাকা; বরং সত্যিকার পরিতৃপ্তির প্রকৃত মাপকাঠি তখনই নির্গত হয় যখন কেউ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করে। মানুষের এ অধিকার নেই যে সে তকদীরের বিষয়াবলি নিয়ে মাতব্বরি করবে; সে শুধুমাত্র খুশী বা বেজার হতে পারে এবং এককথার কোন বাত্যয় নেই যে, বেজার হয়ে সে পাপী হয়। এলাহী তক্বদীরের (স্বর্গীয় বিধানের) ব্যাপারে মানুষের পছন্দ করার কিছুই নেই। তক্বদীরের পছন্দ ও সিদ্ধান্ত করার বিষয় একমাত্র আল্লাহর নিকট। তিনি সর্বজ্ঞ ও সর্বোচ্চ।