📄 আল্লাহ্ যা দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকুন
সম্পদ, চেহারা, সন্তানাদি, গৃহ ও মেধা আপনার ভাগে যা আছে তাতে আপনাকে অবশ্যই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। “সুতরাং, আমি আপনাকে যা দান করেছি তা গ্রহণ করুন এবং কৃতজ্ঞ হোন।” (৭-সূরা আল আ'রাফ : আয়াত-১৪৪)
ইসলামের প্রাথমিক যুগের অধিকাংশ আলেম ও ধার্মিক মুসলিমগণ দরিদ্র ছিলেন; তাই তো একথা বলা নিষ্প্রয়োজন যে, তাদের সুন্দর সুন্দর বাড়ি ঘর বা গাড়ি ঘোড়া ছিল না। এমন অসুবিধা সত্ত্বেও তারা সফল জীবন যাপন করেছিলেন। কোন জাদু দিয়ে নয় বরং তাদের যা দান করা হয়েছিল তার যথার্থ প্রয়োগ করে, তাদের সময়কে সঠিক পথে ব্যয় করে তারা মানব জাতির কল্যাণ সাধন করেছিলেন। এ কারণে তাদের জীবন, তাদের সময় ও তাদের মেধা বরকতময় ও কল্যাণকর হয়েছিল।
অপরপক্ষে, কিছু লোক আছে, যাদেরকে সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও সব ধরনের নেয়ামত দ্বারা ভূষিত করা হয়েছে। আবার এ নেয়ামতসমূহুই তাদের দুর্দশা ও ধ্বংসের কারণ হয়েছে। তারা তাদের সহজাত প্রকৃতি যা বলত, তা থেকে অর্থাৎ একমাত্র পার্থিব জিনিসই যে সবকিছু নয়- এ কথা থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিল। যারা বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ থেকে বহু উপাধি অর্জন করা সত্ত্বেও অখ্যাতির সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ হয়ে আছে, তাদের দিকে লক্ষ্য করুন। তাদের মেধা ও ক্ষমতা অকেজোই থাকছে। যখন নাকি অন্যেরা যাদের জ্ঞান সীমিত—তাদের যা দান করা হয়েছে তা দিয়েই তাদের নিজেদের ও সমাজের উভয়ের পাহাড়সম উপকার করতে পেরেছেন।
আপনি সুখে সম্মানী হয়ে থাকলে আল্লাহ তায়ালা আপনাকে যে চেহারা সুরত দিয়েছেন, তাতে আপনার পারিবারিক অবস্থাতে, আপনার কণ্ঠস্বরে, আপনার বুঝ শক্তির স্তরে ও আপনার বেতনের পরিমাণের উপর পরিতৃপ্ত থাকুন। প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে আপনার যা আছে তার চেয়েও কমের উপরও (বা তার চেয়ে কম নিয়েও) নিজেকে পরিতৃপ্ত মনে করা উচিত।
আমাদের পূর্ববর্তী যেসব মুসলিমগণ বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা মোকাবেলা করে জীবনে উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন তার একটি তালিকা নিম্নে আপনাদের দেওয়া হলো :
আতা ইবনে রাবাহ : তিনি তাঁর সময়ে জগদ্বিখ্যাত একজন আলেম ছিলেন। তিনি শুধু মুক্ত ক্রীতদাস ও নাকবোঁচাই ছিলেন না, অধিকন্তু পক্ষাঘাতগ্রস্তও ছিলেন।
আল আহনাফ ইবনে কাইছ : তিনি আরবদের মাঝে তাঁর অনন্য ধৈর্যের কারণে প্রসিদ্ধ ছিলেন। শীর্ণ, কুঁজো, পঙ্গু (খোঁড়া) ও দুর্বল-ভঙ্গুর দেহ হওয়া সত্ত্বেও তিনি ওই সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
আল আ-মাশ : তিনি তাঁর সময়ের একজন অতি প্রসিদ্ধ হাদীস শাস্ত্রবিদ ছিলেন। তিনি এক আজাদ ক্রীতদাস ছিলেন। তাঁর দৃষ্টিশক্তি ভালো ছিল না। তিনি ছিলেন দরিদ্র। তাঁর পোশাক ছিল ছেঁড়া-ফাঁটা। তাঁর বেশভূষা ছিল আলুথালু এবং তিনি দরিদ্র জীবন যাপন করতেন।
প্রত্যেক নবীই (আ) কোন না কোন সময় রাখাল ছিলেন। দাউদ (আ) কামার ছিলেন, যাকারিয়া (আ) কাঠমিস্ত্রি ছিলেন ও ইদ্রীস (আ) দর্জি ছিলেন; তবুও তারা শ্রেষ্ঠ মানব ছিলেন।
অতএব, আপনার দক্ষতা, সৎকাজ, আচার-আচরণ ও সমাজের প্রতি অবদানের ওপর আপনার মূল্য নির্ভর করে। তাই রূপ-লাবণ্য, সম্পদ বা পরিবার যাই আপনার জীবনে হারিয়েছেন তার জন্য দুঃখ করবেন না এবং আপনার জন্য আল্লাহ তায়ালা যা বরাদ্দ করেছেন, তাতে পরিতৃপ্ত থাকুন।
“আমিই এ জগতে তাদের মাঝে তাদের জীবিকা বণ্টন করি।” (৪৩-সুরা আয যুখরুফ : আয়াত-৩২)
📄 দুঃখিত হবেন না সব- কিছুই ভাগ্যানুসারে ঘটবে
তাকদীর অনুপাতে ও যা সিদ্ধান্ত করা হয়েছে সে অনুসারেই সব কিছু ঘটে। মুহাম্মাদ ﷺ-এর উম্মত মুসলিমদের ধর্ম-বিশ্বাস এমনই। আল্লাহর ইলমের বাইরে, তাঁর অনুমতি ছাড়া এবং ঐশী পরিকল্পনা ছাড়া এ বিশ্ব জগতে কোন কিছুই ঘটে না।
“পৃথিবীতে এবং তোমাদের মাঝে যে বিপর্যয় আসে তা আমি ঘটানোর পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে, নিশ্চয় সে কাজ আল্লাহর পক্ষে সহজ।” (৫৭-সূরা আল হাদীদ: আয়াত-২২)
“নিশ্চয় আমি প্রতিটি জিনিসকেই তার পূর্বনির্ধারণী অনুসারেই সৃষ্টি করি।” (৫৪-সূরা আল ক্বামার: আয়াত-৪৯)
“এবং অবশ্যই আমি তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষতি ইত্যাদি কতিপয় জিনিস দ্বারা পরীক্ষা করব এবং (হে নবী মুহাম্মাদ!) আপনি ধৈর্যশীলদেরকে (জান্নাতের) সুসংবাদ দিন।” (২-সূরা বাকারা: আয়াত-১৫৫)
একটি হাদীসে নবী করীম ﷺ বলেছেন- “মুমিনের কাজ বড়ই আশ্চর্যজনক! নিশ্চয় তার সব কাজই তাঁর জন্য কল্যাণকর। যখন তাঁর কোন কল্যাণ হয় তখন শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তাঁর আরো কল্যাণকর হয়ে যায়। আর যখন তাঁর কোন ক্ষতি হয় তখন সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে সে ক্ষতিও তাঁর জন্য কল্যাণকর হয়ে যায়। আর এমনটি মুমিন ছাড়া অন্য কারো জন্যই হয় না।”
একটি বিশুদ্ধ হাদীসে নবী করীম ﷺ বলেছেন- “যখন তুমি কোন কিছু চাইবে, তখন তুমি তা আল্লাহর নিকটে চাও, আর যখন তুমি সাহায্য চাইবে তখন তুমি আল্লাহর নিকটেই সাহায্য চাও। আর জেনে রাখ যে, সব মানুষও যদি কোন বিষয়ে তোমার উপকার করার জন্য একত্রিত হয় তবুও তারা তা করতে পারবে না। তবে আল্লাহ তোমার ভাগ্যলিপিতে যেটুকু লিখে রেখেছেন ততটুকু উপকার করতে পারবে। আর যদি তারা তোমার ক্ষতি করার জন্যও একত্রিত হয় তবুও তারা তা করতে পারবে না, তবে তোমার ভাগ্যলিপিতে আল্লাহ যেটুকু লিখে রেখেছেন—সেটুকু ক্ষতি তারা করতে পারবে। কলম উঠিয়ে রাখা হয়েছে এবং (কালিতে লিখিত) পৃষ্ঠাসমূহ শুকিয়ে গেছে।”
নবী করীম ﷺ আরো বলেছেন- “এবং জেনে রাখ যে, যা তোমার নিকট এসেছে তা তোমার নিকট না আসার ছিল না এবং যা তোমার নিকট আসেনি তা তোমার নিকট আসার ছিল না।”
অন্য একটি নির্ভরযোগ্য হাদীসে নবী করীম ﷺ বলেছেন- “যা তোমার উপকার করবে তার জন্য চেষ্টা কর, আল্লাহর নিকট সাহায্য চাও, দুর্বল হয়ো না ও এ কথা বলো না যে, আমি অমুক অমুক কাজ করলে অবস্থা এমন এমন হতো। বরং একথা বল যে, আল্লাহ সিদ্ধান্ত করে ফেলেছেন এবং তিনি যা চান তা তিনি করেন।”
আরো একখানি নির্ভরযোগ্য হাদীসে নবী করীম ﷺ বলেছেন- “বান্দার জন্য আল্লাহ যে ফয়সালা করেন তা তাঁর জন্য কল্যাণকর।”
শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়াকে পাপ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হলো, এটা কি কারো জন্য উপকারী? তিনি বললেন! “হ্যাঁ, তবে এ শর্তে যে, পাপের পর লজ্জিত, অনুতপ্ত, ক্ষমা প্রার্থনাকারী ও মানসিকভাবে চরম অনুতপ্ত হতে হবে।”
“এবং এমনও হতে পারে যে, তোমরা যা অপছন্দ কর তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর আর এমনও হতে পারে যে, তোমরা যা পছন্দ কর তা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর এবং আল্লাহ জানেন আর তোমরা জান না।” (২-সুরা বাক্বারা : আয়াত-২১৬)
📄 রিযিকের অভাবে বিষণ্ণ হবেন না
যিনি রিযিক যোগান তিনি অবশ্যই আল্লাহ। তিনি নিজের উপর এটা বাধ্যতামূলক করে নিয়েছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য যে রিযিক লিখে রেখেছেন তা তিনি তাঁদের নিকট পৌঁছে দিবেন।
“এবং আকাশে আছে তোমাদের রিযিক ও যা কিছু তোমাদেরকে ওয়াদা করা হয়েছে তাও।” (৫১-সূরা আয যারিয়াত : আয়াত-২২)
সৃষ্টির রিযিক আল্লাহই যদি যোগিয়ে থাকেন তবে কেন মানুষকে তোষামোদ করা? তবে কেন অন্যের থেকে নিজের রিযিক পাওয়ার আশায় তার সামনে নিজেকে নীচু করতে হবে?
“এবং পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে সবার রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহ্ই।” (১১-সূরা হূদ : আয়াত-৬)
“আল্লাহ মানুষের জন্য যে দয়ার ভাণ্ডার খুলে দেন তা কেউ রদ বা বন্ধ করতে পারবে না, আর যা তিনি (পাঠানো) বন্ধ করে দেন তারপর কেউ তা পাঠাতে পারবে না।” (৩৫-সূরা ফাতির : আয়াত-২)
📄 ততক্ষণ আপনার এক টুকরো রুটি... থাকে ততক্ষণ নিজেকে বঞ্চিত মনে করবেন না
একজন নাবিক সমুদ্রে পথ হারিয়ে ফেলেছিল এবং এভাবে একুশ দিন পথহারা ছিল। এ ঘটনায় সবচেয়ে বড় কি শিক্ষা সে পেয়েছে এ সম্বন্ধে একজন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর দিলেন, “এ ঘটনা থেকে সর্বাপেক্ষা বড় যে শিক্ষা আমি পেয়েছি তা হলো- পরিষ্কার পানি ও পর্যাপ্ত খাবার থাকলে কখনো অভিযোগ করা উচিত নয়।”
জোনাথন সুইফট বলেছেন, “পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কয়েকজন চিকিৎসক হলেন ‘যথার্থ খাদ্য-চিকিৎসক’, ‘বিশ্রাম চিকিৎসক’ এবং ‘সুখ চিকিৎসক’।”
জোনাথন সুইফটের মন্তব্যের কারণ হলো যে, স্থূলতা এমন এক তিরস্কারযোগ্য রোগ যা মানুষের মেধাকে ধ্বংস করে দেয়। পক্ষান্তরে, বিশ্রাম, সংযম ও সুখ হলো মন-মানসিকতা, আত্মা ও হৃদয়ের জন্য সন্তোষজনক পুষ্টিদায়ক উপাদান।