📄 হতাশ হবেন না
প্রায়ই দেখা যায় যে সংকট কেবলমাত্র মেঘ যা দ্রুত সরে যায়। “আল্লাহ ছাড়া এটাকে কেউ মুক্ত করতে পারে না।” (৫৩-সূরা আন নাজম : আয়াত-৫৮)
📄 দুঃখ করবেন না, অবস্থার পরিবর্তন ঘটবেই- ইনশাল্লাহ
মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়্যাহ যখন মক্কার আরিম কারাগারে বন্দী হলেন তখন কুফাবাসীকে বলেছিলেন—
“সমুদ্রগামীদের জন্য দুনিয়ার জাঁকজমক স্থায়ী হবে না, দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট মারাত্মক আঘাতও নয়; এটার জন্য ও ওটার জন্য নির্দিষ্ট সময় আছে যা শীঘ্রই শেষ হয়ে যাবে, আর আমি যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছি তা স্বপ্নদ্রষ্টার স্বপ্ন হয়ে যাবে।”
“আর এদের পূর্বে কত জনপদকে ধ্বংস করেছি! তুমি কি এদের কারো চিহ্নও অনুভব করতে পার বা এদের ফিসফিসানি শুনতে পাও?” (১৯-সূরা মারইয়াম : আয়াত-৯৮)
একটি সহীহ হাদীসে আছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন : “বিচারের দিন প্রত্যেককে তার অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হবে; এমনকি শিং ছাড়া ভেড়াও শিংওয়ালার প্রতিশোধ গ্রহণ করবে।”
📄 দুঃখ করে শত্রুদের আনন্দ দিবেন না
হতাশ ও দুঃখিত হয়ে আপনি আপনার প্রতিপক্ষকে আনন্দ দিবেন; এ কারণেই আমাদের ধর্ম শত্রুদের অন্তরে ভীতি-সন্ত্রাস করার আদেশ দিয়েছে। “এর দ্বারা তোমরা আল্লাহর শত্রুকে এবং তোমাদের শত্রুকে ভীত-সন্ত্রস্ত করবে।” (৮-সূরা আনফাল : আয়াত-৬০) উহুদের যুদ্ধের দিন আবু দুজানাহ যখন মুসলমানদের সারির মাঝ দিয়ে (বীরের মতো) নেচে নেচে বা লাফিয়ে লাফিয়ে বা হেলে দুলে চলতে লাগল তখন নবী করীম ﷺ বললেন– “নিশ্চয় আল্লাহ এ ধরনের হাঁটাকে এমন অবস্থায় ছাড়া পছন্দ করেন না।”
কাফেররা যখন মুসলমানদেরকে পাহাড়ের উপর থেকে পর্যবেক্ষণ করছিল, তখন নবী করীম ﷺ সাহাবীদের কাবার চারিপাশে রমল করার (বীরের মতো হাঁটার) আদেশ দিলেন, যাতে মুশরিকরা মুসলমানদের শক্তি, সহ্য ও মনোবল দেখে ভয় পায়।
“সেদিন মুমিনগণ আনন্দিত হবে।” (৩০-সূরা আর রুম : আয়াত-৪) (অর্থাৎ পারস্যের বিরুদ্ধে রোমানরা যেদিন বিজয়ী হবে সেদিন মুসলমানরা খুশি হবে।)
কারুন, পারসিকরা একদিকে যেমন অগ্নিউপাসক ছিল, অন্যদিকে তেমনই মুসলিম হিতৈষী ছিল না বরং মুসলিম বিদ্বেষী ছিল। আর রোমানরা খ্রিস্টান ছিল (অগ্নি-উপাসক তথা মুশরিক ছিল না) এবং মুসলমানদের হিতৈষী ছিল।
সত্তরের শত্রুরা যখন দেখতেও পায় যে, আমরা সুখী বা আনন্দিত আছি তখন তারা বেদনা বোধ করে।
“(হে মুহাম্মাদ ﷺ!) আপনি বলে দিন, ‘তোমরা রাগে তোমরাই মর’।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১১৯)
“আপনার কোন কল্যাণ হলে তাদের খারাপ লাগে।” (৯-সূরা তাওবা : আয়াত-৫০)
“তারা তোমাদের সাথে ক্ষতির কামনা করে।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১১৮)
নবী করীম ﷺ বলেছেন— “হে আল্লাহ্! আমার দুর্ভাগ্য কোনো শত্রুকে বা কোনো হিংসুককে হাসার সুযোগ দেবেন না।”
একজন আরব দেশীয় কবি বলেছেন– “যুবক সব ধরনের বিপদাপদ সহ্য করতে পারে, তবে তার বিপদে শত্রুর আনন্দ সে সহ্য করতে পারে না।” হিংসুক ও যারা অন্যের দুঃখে আনন্দ করে তাদের আনন্দকে নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য আমাদের পূর্বসূরী মুসলমানরা সংকটের মুখে থাকতেন এবং সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করতেন।
“আল্লাহর পথে তাদের যে বিপদাপদ হয়েছিল, তাতে তারা মনোবল হারায়নি, দুর্বল হয়নি এবং নত হয়নি।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৪৬)
📄 হে আদম সন্তান, হতাশ হয়ো না
যে জীবনের প্রতি বিরাগ ব্যক্তি, যার দিন গুজরান কঠিন এবং যে-ই জীবনের তিক্ত উত্থান-পতনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনি স্মরণ করুন যে, কষ্টের পরেই আরাম আসে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং আপনি যদি খাঁটি ও একনিষ্ঠ হন তবে বিজয় নিকটে।
“আল্লাহর ওয়াদা, আল্লাহ তাঁর ওয়াদাকে ভঙ্গ করেন না, কিন্তু অধিকাংশ লোকই তা জানেন না।” (৩০-সূরা আর রুম : আয়াত-৬) আপনার সংকট যাই হোক না কেন, তার প্রতিকার আছে এবং আপনার সমস্যা যাই হোক না কেন তার সমাধান আছে।
“সকল প্রশংসা, কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ আল্লাহরই প্রাপ্য, যিনি আমাদের থেকে সকল দুশ্চিন্তা দূর করে দিয়েছেন।” (৩৫-সূরা ফাতির : আয়াত-৩৪)
হে মানব জাতি! তোমাদের সন্দেহকে ঈমানের দ্বারা এবং তোমাদের ভ্রান্ত চিন্তা-চেতনার হেদায়েতের দ্বারা আরোগ্য করার সময় এসে গেছে। সত্যিকার সূর্যোদয়ের উজ্জ্বলতা দেখার জন্য তোমাদের অন্ধকারাচ্ছন্নতা তোমাদেরকে অবশ্যই দূর করতে হবে। তোমাদেরকে অবশ্যই ত্রুটির মিষ্টতা দিয়ে দুঃখের তিক্ততাকে উচ্ছিন্ন করতে হবে।
হে মানব সম্প্রদায়! তোমরা যে শুষ্ক মরু পাড়ি দিচ্ছ তা ছাড়িয়ে তোমরা সবুজ চারণভূমি ও উর্বর মাটি পাবে। সেখানে সব ধরনের ফলফলাদি প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয়।
হে মানুষ! যে নাকি বিনিদ্র রজনী যাপনের কারণে গভীর রাত পর্যন্ত চিৎকার করছ, তাকে বলছি, তুমি স্মরণ কর— “প্রভাত কি নিকটে নয়?” (১১-সূরা হুদ : আয়াত-৮১)
হে যার মন দুঃখ-কষ্টে দিশেহারা! ধীরে ধীরে কাজে লেগে পড় (কিছুকালের জন্য ধৈর্য ধর) কেননা, অদৃশ্য দিগন্তে তোমার সমস্যার সমাধান ও উপায় আছে।
হে যার চোখ অশ্রুতে ভরা! তোমার অবিচলতা সংরক্ষণ কর ও তোমার চক্ষু-পল্লবকে বিশ্রাম দাও অর্থাৎ ঘুমাও। বিশ্রাম কর ও জেনে রাখ যে তোমার সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ রক্ষা করেন ও সাহায্য করেন এবং তোমার প্রতি তাঁর করুণা তোমাকে শান্তি বয়ে এনে দিবে। হে আল্লাহর বান্দা! মনে মনে শান্তিতে থাক। কেননা, স্বর্গীয় বিধান (তকদীল) লিখা হয়ে গেছে এবং সবকিছু সিদ্ধান্ত করা হয়ে গেছে। এবং জেনে রাখ যে তোমার পুরস্কার তাঁর নিকট নিশ্চিত আছে। যিনি তাঁকে হতাশ করেন না, যে তাঁকে সন্তুষ্ট করতে চায়।
শান্তিতে থাকুন। কারণ, অভাবের পর সম্পদ আসে, পিপাসার পর পানীয় আসে, বিচ্ছেদের পর আনন্দময় মিলন ঘটে এবং অনিদ্রার পর গভীর ঘুম আসে।
“তুমি জান না, হয়তো আল্লাহ এর পরে নতুন কিছু ঘটাবেন।” (৬৫-সূরা আত-তালাক : আয়াত-১)
ওহে, তোমরা যারা দেশে দেশে অত্যাচারিত আছ; ক্ষুধা, যাতনা, অসুস্থতা ও দারিদ্রতায় ভুগছ একথা জেনে আনন্দ কর যে, তোমরা শীঘ্রই খাদ্য পেয়ে পরিতৃপ্ত হবে এবং তোমরা সুখী হবে ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হবে।
“রাত্রি অবসানকালের শপথ এবং প্রভাত আলোকিত হওয়ার সময়ের শপথ।” (৭৪-সূরা আল মুদ্দাছছির : আয়াত-৩৩-৩৪)
প্রত্যেক মুসলমানকে তার প্রভুর সম্বন্ধে অবশ্যই সুধারণা পোষণ করতে হবে এবং অবশ্যই তার দয়ার জন্য ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করতে হবে। কেননা, যে সত্তার এ ক্ষমতা আছে যে, তিনি কোন কিছুকে ‘হও’ বলেন তা অমনি হয়ে যায়। তিনি তাঁর অঙ্গীকার অনুযায়ী বিশ্বাস স্থাপনের উপযুক্ত ক্ষেত্র। তিনি ছাড়া কেউ কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না এবং তিনি ছাড়া অন্য কেউ মন্দকে দূর করতে পারে না। প্রতিটি কাজের জ্ঞান তাঁর আছে এবং তিনি প্রতি মুহূর্তেই শান্তি বয়ে আনেন। তিনি রাতের পর প্রভাতকে আনয়ন করেন এবং কষ্টের পর বুদ্ধি আনেন। তিনি এজন্য দান করেন যেন তার শুকরিয়া আদায় করা হয়। (সব কিছু জানা সত্ত্বেও) কে ধৈর্যশীল তা তিনি জানার জন্য পরীক্ষা করেন। অতএব, মুসলমানের সর্বাপেক্ষা লাভজনক কাজ হলো তার প্রভুর সাথে তাঁর সম্পর্ককে শক্তিশালী করা এবং তার নিকট আরো বেশি অনুগ্রহ প্রার্থনা করা।
“এবং আল্লাহর নিকট তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-৩২)
“তোমাদের প্রতিপালককে বিনীতভাবে ও গোপনে আহ্বান কর।” (৭-সূরা আল আ’রাফ : আয়াত-৫৫)
আলা ইবনে হামরামি (রা) নবী করীম ﷺ-এর কিছু সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে এক মরুভূমির মাঝে নিরুপায় ও অসহায় অবস্থায় পতিত হন। তাঁদের পানির সরবরাহ ফুরিয়ে গিয়েছিল এবং তাঁরা মৃত্যুর সীমানায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। তিনি তাঁর প্রভুকে ডেকে বললেন, “হে সর্বোচ্চ সত্তা! হে সর্বাপেক্ষা মহান সত্তা! হে সবচেয়ে বিজ্ঞ সত্তা! এবং হে সর্বাপেক্ষা বদান্য সহনশীল সত্তা!” সে মুহূর্তেই মুষলধারে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। তাঁরা পান করলেন, অযু-গোসল করলেন ও তাঁদের পশুপালকে পান করালেন।
“এবং তারা হতাশ হয়ে যাবার পর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তার অনুগ্রহ ছড়িয়ে দেন। আর তিনি হলেন অভিভাবক ও প্রশংসনীয়।” (৪২-সূরা আশ শুরা : আয়াত-২৮)