📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 ইসলাম গ্রহণ করার কারণে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই

📄 ইসলাম গ্রহণ করার কারণে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই


সেসব আত্মা খুবই হতভাগা যেগুলো ইসলাম সম্বন্ধে অজ্ঞ অথবা যেগুলো ইসলাম সম্বন্ধে জানে তবুও ইসলামের পথে পরিচালিত হয়নি। বর্তমানে মুসলমানদের প্রয়োজন বিশ্বব্যাপী প্রচারিত এক স্লোগান ও বিজ্ঞাপনের। কেননা, ইসলাম এমন এক মহা সংবাদ যা অতি অবশ্যই জনগণের নিকট পৌঁছাতে হবে। এই স্লোগানগুলো স্পষ্ট, সংক্ষিপ্ত এবং আকর্ষণীয় হওয়া দরকার; কেননা, সমগ্র মানবজাতির সুখ এই সত্য ধর্মে নিহিত আছে।
“আর যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মের তালাশ করে- তার থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-৮৫)

জার্মানির মিউনিখ শহরে একজন বিখ্যাত ইসলাম প্রচারক কয়েক বছর পূর্বে বসতি স্থাপন করেন। শহরের প্রবেশ পথে পৌঁছার সময়ে তিনি এক বিশাল বিজ্ঞাপন দেখতে পেলেন। এর উপর লিখা ছিল, “আপনারা চিনেন না।” পরবর্তীতে তিনি এ বিজ্ঞাপনের পাশে এটার মতোই বিশাল এক বিজ্ঞাপন টাঙিয়ে দিলেন। এর উপর তিনি লিখে দিয়েছিলেন, “আপনারা ইসলাম কি তা জানেন না। যদি আপনারা এর সম্বন্ধে জানতে চান তবে এই নাম্বারে আমাদেরকে ফোন করুন।” স্থানীয় জার্মানদের ফোনের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। মাত্র এক বছরে এই লোকের হাতে হাজার হাজার লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তিনি একটি মসজিদ, একটি ইসলাম প্রচার কেন্দ্র ও একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

অধিকাংশ মানুষই বিভ্রান্ত এবং এই মহান ধর্ম ইসলাম তাদের একান্ত প্রয়োজন। বর্তমানে তারা যে বিশৃঙ্খলাপর্ণ জীবন-যাপন করছে তার স্থান যাতে এক শান্তিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন অধিকার করতে পারে এ জন্য তাদের ইসলাম ধর্মের দরকার।
“যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায় আল্লাহ তাদেরকে এ দ্বারা শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান এবং তাদেরকে সরল-সহজ সঠিক পথে পরিচালিত করেন।” (৫-সূরা মায়িদা: আয়াত-১৬)

বহু দূরবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী একজন ইবাদতগুজার লোক- যার আগে কখনো অন্য লোকেদের সাথে সাক্ষাৎ হয়নি- বলেছিল- “আমি কখনো ভাবিনি যে, পৃথিবীতে কোনো লোক আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করেছে।”
“আমার বান্দাদের মধ্য থেকে খুব কম সংখ্যকই কৃতজ্ঞ।” (৩৪-সূরা আস সাবা: আয়াত-১৩)
“আর যদি তুমি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের অনুসরণ কর তবে তারা তোমাকে আল্লাহ্র পথ থেকে বিপথে পরিচালিত করবে।” (৬-সূরা আল আন’আম: আয়াত-১১৯)
“আর তুমি যদিও আকুল আকাঙ্ক্ষা কর তবুও অধিকাংশ মানুষই ঈমান আনবে না।” (১২-সূরা ইউসুফ : আয়াত-১০৩)

একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি আমাকে জানিয়েছেন যে, সুদান যখন ব্রিটিশ রাজ্যের কলোনী ছিল তখন এক মরুবাসী বেদুঈন রাজধানী শহর খার্তুমে এসেছিল। সে যখন একজন ব্রিটিশ পুলিশকে শহরের কেন্দ্র দিয়ে হাঁটতে দেখল তখন সে একজন পথিককে জিজ্ঞাসা করল, “ঐ লোকটি কে?” তাকে বলা হলো যে, লোকটি একজন বিদেশি পুলিশ ও সে একজন কাফের। যাযাবর জিজ্ঞাসা করল “কি বিষয়ে সে অবিশ্বাস করে?” “আল্লাহতে অবিশ্বাস করে।” এ ছিল উত্তর। দীর্ঘদিন মরুভূমিতে বাস করাতে এ লোকের জন্মগত স্বভাব মন্দ ধারণা মুক্ত ছিল ও অক্ষত ছিল এবং একারণেই যখন সে অদ্ভুত কিছু শুনল তখন সে এতে বিস্মিত হয়ে গেল ও অসুস্থ হয়ে পড়ল। সে বলল, “কেউ কি আল্লাহকে অবিশ্বাস করে?” এরপর সে যা শুনেছিল তাতে চরম ঘৃণায় তার পেটে খামচি দিয়ে ধরে বমি করে দিল।

“তাহলে তাদের কি হলো যে তারা ঈমান আনে না।” (৮৪-সূরা আল ইনশিকাক : আয়াত-২০)
“আকাশ ও পৃথিবীর প্রভুর শপথ করে বলছি যে, এসব তেমনই সত্য যেমন সত্য একথা যে, ‘ তোমরা কথা-বার্তা বল’।” (৫১-সূরা আয যারিয়াত : আয়াত-২৩)

প্রত্যেকের উচিত তার প্রভুর সম্বন্ধে সুধারণা পোষণ করা ও তাঁর করুণা ও দয়া তালাশ করা। একটি সহীহ হাদীসে আছে, নবী করীম ﷺ বলেছেন যে, ‘আমাদের প্রভু হাসেন।’ একথা শুনে এক বেদুইন বলেছিল, “আমরা এমন প্রভুহীন নই যিনি ভালোভাবে হাসেন!”
“আর তারা হতাশ হয়ে যাবার পর তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন।” (৪২-সূরা আশ শুরা : আয়াত-২৮)
“নিশ্চয় আল্লাহর রহমত সৎকর্মপরায়ণদের নিকটবর্তী।” (৭-সূরা আল আ'রাফ : আয়াত-৫৬)
“মনে রাখ : নিশ্চয় আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।” (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-২১৪)

সফল লোকদের জীবনী পড়ে জানা যায় যে তাদের কতিপয় সাধারণ জিনিস ছিল হয়তো তা তাদের পরিবেশে, গুণ বা ওই পরিস্থিতি যা তাদের সফলতাকে ঘিরে ছিল। সফল লোকদের জীবনী পাঠ করে আমি কতিপয় সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি- তা আমি নিম্নে পেশ করছি–
১. লোকের মূল্য তার সৎকর্মের উপর নির্ভর করে। একথা আলী (রা) বলেছেন। এর অর্থ হলো যে, কারো জ্ঞান, চরিত্র, ইবাদত ও উদারতা মাহাত্ম্য হলো এমন গজকাঠি যা দ্বারা তার মূল্যায়ন করা হয়। “মুশরিক পুরুষ তোমাদের বিস্মিত করলেও তার চেয়ে মুমিন কৃতদাস ভালো।” (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-২২১)
২. ইহকাল ও পরকালের জন্য কারো জীবন যাত্রার মান তার প্রত্যয়, প্রচেষ্টা ও উত্সর্গের উপর নির্ভর করে। “আর যদি তারা বের হওয়ার ইচ্ছা করত তবে অবশ্যই তারা এর জন্য কিছু প্রস্তুতি গ্রহণ করত।” (৯-সূরা তাওবা : আয়াত-৪৬) “এবং আল্লাহর পথে প্রকৃত জিহাদ কর।” (২২-সূরা আল হাজ্জ : আয়াত-৭৮)
৩. আল্লাহর ইচ্ছায় প্রতিটি লোকই তার নিজের ইতিহাস রচয়িতা। সে তার ভালো-মন্দ কর্মের মাধ্যমে তার জীবন ইতিহাস লেখে। “তাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল কীর্তিই আমি লিখে রাখি।” (৩৬-সূরা ইয়াসিন : আয়াত-১২)
৪. জীবন সংক্ষিপ্ত এবং দ্রুত চলে যায়। পাপ করে, দুশ্চিন্তা করে বা ঝগড়া করে একে আরো সংক্ষিপ্ত করবেন না। “সে দিন তারা মনে করবে যেন তারা পৃথিবীতে এক সন্ধ্যা বা এক সকালের চেয়ে বেশি কাল ছিল না।” (৭৯-সূরা আন নাযিয়াত : আয়াত-৪৬)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 হতাশ হবেন না-আপনার প্রকৃত অবস্থা অনুযায়ী চলতে শিখুন

📄 হতাশ হবেন না-আপনার প্রকৃত অবস্থা অনুযায়ী চলতে শিখুন


এ জীবনে আপনার যা পাওয়া অসম্ভব আপনি যদি মনে মনে তাকে ঘৃণা করেন তবে আপনার নিকট এর মূল্য কমে যাবে। যা আপনি সত্যিই পেতে চান তা না পাওয়ার জন্য যদি আপনি পরিতৃপ্ত থাকেন তাহলে আপনার আত্মা সান্ত্বনা খুঁজে পাবে।
“অচিরেই আল্লাহ আমাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহ হতে দান করবেন এবং তাঁর রাসূলও (দান করবেন); নিশ্চয় আমরা আল্লাহর নিকটই আকাঙ্ক্ষা করি।” (৯-সূরা তাওবা : আয়াত-৫৯)

একবার আমি এক লোকের ঘটনা পড়েছিলাম। ওই লোকের ঘরের জানালা দিয়ে তাঁর আংটিটি বাইরে পড়ে গিয়েছিল। আংটিটি পড়ে গিয়ে তা কর্নিশের তাকে পোতা এক পেরেকের সাথে আটকে যায়। তারকাঁটাটি তাকে পুরাপুরি পোতা ছিল না, ফলে তাঁর বাম হাতের অনামিকা অঙ্গুলি সমূলে উঠে যায়। এতে তাঁর সেই হাতে চার আঙ্গুল হয়ে গেল। যা আশ্চর্যজনক তা ঘটনাটি নয় বরং দুর্ঘটনার দীর্ঘকাল পরে লোকটি যে পরিতৃপ্ত ভাব দেখিয়েছেন তাই আশ্চর্যজনক। পরবর্তী কথায় তার পরিতৃপ্তি প্রকাশ পায়। “আমার একহাতে যে চার আঙ্গুল বা আমি যে একটি আঙ্গুল হারিয়েছি তা আমি মনে করি না বললেই চলে। একথা আমার তখনই মনে পড়ে যখন আমার দুর্ঘটনার কথা মনে পড়ে। অন্যথায় আমার কাজ-কর্ম ভালোই চলছে আর যা ঘটেছে তাতে আমি পরিতৃপ্ত।”
“আল্লাহ সবকিছু পূর্বেই নির্ধারিত করে রেখেছেন এবং তিনি যা চান তাই করেন।”

আমি এক পরিচিত লোক চিনি, যিনি রোগের কারণে তাঁর বাম হাতটাকে হারিয়েছেন। তিনি অনেক বছর যাবতই বাস করছেন। তিনি বিয়ে শাদীও করেছেন এবং তাঁর সন্তানাদিও আছে। বিনা কষ্টে তিনি তাঁর গাড়ি চালান এবং সহজেই তাঁর বিভিন্ন কাজ সমাধান করেন। তিনি এতটাই আত্ম-বিশ্বাসী যে, মনে হয় যেন শুধুমাত্র এক হাত দিয়ে বেঁচে থাকার জন্যই আল্লাহ তাঁকে সৃষ্টি করেছেন।
“আল্লাহ তোমার ভাগ্যে যা রেখেছেন তাতে তুষ্ট হও, তাহলেই তুমি সর্বাপেক্ষা সুখী মানুষ হবে।”

কত দ্রুতই না আমরা পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিই! এটা আশ্চর্যজনক যে, যখন জীবন-যাপন পদ্ধতির পরিবর্তন আমাদের উপর প্রভাব ফেলে তখন আমরা কিভাবেই না আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে খাপ খাইয়ে নিই! পঞ্চাশ বছর আগে একটি বাড়ির উপাদান (জিনিসপত্র) ছিল-তালপাতার তৈরি একটি মাদুর, একটি পানির কলসী, কিছু কয়লা এবং অন্যান্য তুচ্ছ কিছু জিনিসপত্র। বর্তমানে মানুষ যেভাবে জীবন চালিয়ে নিচ্ছে অতীতেও সেভাবে তারা জীবন চালিয়ে নিতে পারতো; কোন উপাদানের বা উৎসের বা আরাম-আয়েশের অভাব অতীতেও জীবনমানকে বর্তমানের চেয়ে কোন অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ করেনি। একজন আরব কবি বলেছেন– “তুমি যখন আত্মাকে প্রলোভন দেখাবে তখন আত্মা আরো চাইবে, আর যখন একে অল্পের কথা বলা হয় তখন এটা অল্পে তুষ্ট হয়।”

কুফার কেন্দ্রীয় মসজিদে দু'গোত্রের মাঝে ঝগড়া বেধে গেল। তখন একদল অপরদলকে অপমানসূচক কথা বলতে লাগল। আল আহনাফ বিন কায়সকে খুঁজে বের করার জন্য মসজিদের এক লোক চুপিসারে বের হয়ে পড়ল। আল আহনাফ ইবনে কায়স সবার নিকটে পরমোকৃষ্ট শান্তি প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। লোকটি তাকে বাড়িতে ছাগলের দুধ দোহন করা অবস্থায় পেলেন। আল আহনাফ এমন পোশাক পরিধান করেছিলেন-যার মূল্য দশ দিনারও ছিল না। যিনি কৃশ, চোখ-মুখ বসা এবং তাঁর এক পা অপর পা থেকে লম্বা ছিল; যার ফলে তিনি খোঁড়ায়ে হাঁটতেন। যখন তাঁকে ঝগড়ার খবরটা দেওয়া হলো তখন তাঁর হাব-ভাবের কোন পরিবর্তন হলো না এবং তিনি শান্ত থাকলেন। এ ধরনের বীরত্বপূর্ণ সাহসিকতা প্রদর্শন এ কারণেই সম্ভব হয়েছে যে, আল আহনাফ জীবনে অনেক বিবাদ ও সংকট প্রত্যক্ষ করেছেন। ফলে, তিনি এমন ঘটনায় অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি লোকটিকে বললেন, “আল্লাহ চাহে তো সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।” তারপর তিনি নাস্তা খেতে শুরু করলেন, যেন কিছুই ঘটে নি। তাঁর নাস্তা বলতে ছিল এক টুকরো শুকনো রুটি, তেল, লবণ ও এক গ্লাস পানি। তিনি আল্লাহর নাম নিয়ে খেলেন।

তারপর তিনি আল্লাহর প্রশংসা করে পরে বললেন, “ইরাকের গম, সিরিয়ার তেল, ফোরাত নদীর পানি ও রাশিয়ার লবণ। নিশ্চয় এগুলো মহা নেয়ামত।” তিনি কাপড়-চোপড় পরে নিলেন। হাতের লাঠিখানা নিলেন ও ওই লোকজনের দিকে যাত্রা শুরু করলেন। তারা যখন তাঁকে দেখল তখন তাদের দৃষ্টি তাঁর উপর নিবদ্ধ হলো ও তিনি যা বললেন তারা তা মনোযোগ সহকারে শুনল। তিনি শান্তি ও সমঝোতার কথা বললেন-তা উভয় দলকেই সন্তুষ্ট করল এবং তাদেরকে তিনি নিজ নিজ পথে চলে যেতে অনুরোধ জানালেন। তারা সবাই একথা নীরবে মেনে নিল ও প্রত্যেকেই মনে সামান্যতম হিংসা-বিদ্বেষ না রেখেই সে স্থান ত্যাগ করে গেল। আর এভাবেই সেই অপ্রীতিকর পরীক্ষা শান্তিপূর্ণভাবে সমাপ্ত হলো।

একজন আরব কবি বলেছেন– “যুবক মর্যাদার অধিকারী হতে পারে যদিও তার চাদর ছেঁড়া ও তার জামার পকেট তালি দেওয়া হয়।”
এ ঘটনা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। তার মধ্যে একটি হলো- মাহাত্ম্য বাহ্যিক আকারে বা পোশাকে নিহিত নয়। অন্যান্য শিক্ষার মাঝেও একটি যে, সামান্য কিছু পার্থিব জিনিসপত্র থাকা দুঃখ ও ধন-সম্পদের মাঝে নিহিত নয়।
“আর মানুষ তো এমনই যে, যখন তাকে তার প্রভু সম্মানিত করে ও ধন-সম্পদ দান করে পরীক্ষা করেন তখন বলে, “আমার প্রভু আমাকে সম্মানিত করেছেন।” আর যখন তার প্রভু তাকে রিযিক কমিয়ে দিয়ে পরীক্ষা করেন তখন সে বলে, “আমার প্রভু আমাকে অপমানিত করেছেন।” (৮৯-সূরা আল ফাজর : আয়াত-১৫-১৬)

এ ঘটনা থেকে আমরা আরেকটি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। আর তা হলো- মানুষের চরিত্র ও গুণই তার মূল্যের মাপকাঠি, তার পোশাক, জুতা বা ঘর-বাড়ি নয়। তার জ্ঞান, উদারতা, মাহাত্ম্য, আচার-আচরণ ও কাজ-কর্ম দ্বারা তাকে মূল্যায়ন করা হয়।
“তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি সর্বোৎকৃষ্ট মুত্তাকী আল্লাহর নিকট সে ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা সম্মানিত।” (৪৯-সূরা আল হুজুরাত : আয়াত-১৩)
“বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর দয়ায় তারা আনন্দ করুক। তারা যে সম্পদ জমায় তার চেয়ে এটা ভালো।” (১০-সূরা ইউনুস : আয়াত-৫৮)

আপনার ভাগ্যে যা আছে তাতে সন্তুষ্ট থাকতে নিজেকে প্রশিক্ষণ দান করুন। আপনি আল্লাহর হুকুম বা তকদীরে বিশ্বাস না করে কী করবেন? আল্লাহর স্বর্গীয় বিধান বা তকদীরের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ছাড়া অন্য যে পরিকল্পনাই আপনি গ্রহণ করুন না কেন তাতে আপনার কোন লাভ হবে না এবং সে কারণেই আপনি জিজ্ঞাসা করতে পারেন, “সংকটের সমাধান কি?” সমাধান হলো একথা বলা যে, “আমরা অপরিতৃপ্ত নই, সন্তুষ্ট এবং আমাদের ইচ্ছাকে ত্যাগ করেছি।”
“তোমরা যেখানে থাক না কেন মৃত্যু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই; যদিও তোমরা সুদৃঢ় ও সুউচ্চ দূর্গে থাক না কেন।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-৭৮)

যেদিন চিকিৎসক আমাকে বলেছিল যে আমার ভাই মুহম্মদ-এর একটি হাত কেটে ফেলতে হবে সেদিনটি আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিন ছিল। সংবাদটি আমার মনে বিনা মেঘে বজ্রপাত করেছিল। আমি আবেগে পরাভূত হয়ে গিয়েছিলাম আর আমার আত্মা আল্লাহর এই বাণীতে সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছিল।
“আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোন মুসিবত আসে না, আর যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে আল্লাহ তার অন্তরকে সৎপথ দেখান।” (৬৪-সূরা আত তাগাবুন : আয়াত-১১)
“কিন্তু, ধৈর্যশীলদেরকে (জান্নাতের) সুসংবাদ দান করুন, যারা (ধৈর্যশীলরা) মুসিবতে পড়লে বলে, “আমরা অবশ্যই আল্লাহর জন্য এবং তাঁর নিকটই আমরা ফিরে যাব।” (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-১৫৫-১৫৬)

এসব আয়াতসমূহ আমার মনে শান্তি ও সান্ত্বনা বোধ সঞ্চার করেছিল। যা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হয়ে গেছে তা প্রতিরোধ করার কোন কৌশলই নেই। অতএব, আমাদেরকে অবশ্যই ঈমান রাখতে হবে এবং আমাদের ইচ্ছাকে ত্যাগ করতে হবে।
“নাকি তারা কোন পরিকল্পনা করেছে? তাহলে আমিও পরিকল্পনা করছি।” (৪৩-সূরা আয যুখরুফ : আয়াত-৭৯)
“আল্লাহ্ তাঁর কার্য সম্পাদনে পূর্ণ ক্ষমতাবান।” (১২-সূরা ইউসুফ : আয়াত-২১)
“আর যখন তিনি কোন বিষয় নির্ধারণ করেন, সেজন্য তিনি শুধুমাত্র বলেন, ‘কুন’ (হয়ে যাও) আর তখনই তা হয়ে যায়।” (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-১১৭)

আব্দুল মালেক বিন আব্দুল্লাহ্ আরিয়াবিয়্যাহকে তার চার পুত্রের মৃত্যুর সংবাদ এক মুহূর্তে দেওয়া হয়েছিল। ক্বাদিসিয়ার যুদ্ধে আল্লাহর রাস্তায় তারা সবাই শহীদ হয়েছিল। তার একমাত্র প্রতিক্রিয়া ছিল আল্লাহর প্রশংসা করা ও যা সর্বোত্তম ছিল তা পছন্দ করায় আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করা। ঈমান বিপদে ধৈর্য ধারণ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। আর কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে মানুষ ইহকালের ও পরকালের সুখ লাভ করে। আপনার যদি এ উপদেশ মানতে মন না চায় তবে নিজেকে একথা জিজ্ঞেস করুন- টিকিয়ে থাকার মতো কোন বিকল্প পদ্ধতি আছে কি? যদি সে বিকল্প পদ্ধতি তিক্ততা, অভিযোগ এবং যা ঘটেছে তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি হয় তবে আপনি ইহকাল ও পরকালে আপনার নিজের উপর শুধু বেদনাই বয়ে আনবেন।
“যে সন্তুষ্ট হয় তার জন্য রয়েছে সন্তুষ্টি আর যে ক্রুদ্ধ হয় তার জন্য রয়েছে ক্রোধ।”

বিপর্যয়ের পরে উত্তম প্রতিকার হলো- “নিশ্চয় আমরা (সবাই) আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকেই ফিরে যাব।” একথা বলা। এর অর্থ হলো যে, আমরা সবাই আল্লাহর সৃষ্টি; আল্লাহ্ আমাদের মালিক; আমরা তাঁর রাজ্যে বাস করি এবং আমরা তাঁর নিকট ফিরে যাব। তাঁর মাধ্যমেই শুরু এবং তাঁর নিকটেই শেষ। সবকিছুই আল্লাহর হাতে।

একজন আরব কবি বলেছেন- “আমার আত্মা যা দ্রব্যাদির মালিক সে নিজেই প্রস্থানকারী, অতএব, যখন কোনো জিনিস চলে যায় তখন কিভাবে আমি কাঁদি?”
“আল্লাহর সত্তা ছাড়া সবকিছুই ধ্বংসশীল।” (২৮-সূরা ক্বাসাস : আয়াত-৮৮)
“নিশ্চয় আপনিও (হে মুহাম্মাদ!) মরণশীল এবং তারাও মরণশীল।” (৩৯-সূরা আয যুমার : আয়াত-৩০)

আপনার বাড়ি-ঘর পুড়ে গেছে, আপনার ছেলে মারা গেছে বা আপনার জীবনের কোনো সুযোগ হারিয়ে গেছে একথা শুনে যদি আপনি বিচলিত হয়ে যান তবে আপনি কী করবেন? এ মুহূর্ত থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। ভাগ্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে তা থেকে পালানোর চেষ্টা করা হলো এক নিষ্ফল প্রচেষ্টা- এতে কোনো লাভ হয় না। তকদীরে যা আছে তাতে সন্তুষ্ট থাকুন, আপনার বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিন ও আপনার পুরস্কার অর্জন করুন। অন্য কোনো কিছু বেছে নেবার অধিকার আপনার নেই।

একথা নিশ্চিত যে, আপনি বলতে পারেন যে, অন্য কোনো কিছু পছন্দ করার অধিকার আমার আছে; কিন্তু, এটা হীন কোন কিছু এবং আমি আপনাকে এর থেকে পবিত্র থাকার সতর্ক করছি। এটা হলো অভিযোগ করা, ক্রুদ্ধ হওয়া এবং রাগে জ্বলে আপনার আত্মসংবরণ হারানো। এ মনোভাব ও আচরণ আসলে কী করতে পারে? আপনি আপনার প্রভুর ক্রোধ অর্জন করবেন আর লোকজন আপনাকে ভীষণ গালাগালি করবে। অধিকন্তু, আপনি যা হারিয়েছেন তা ফিরে আসবে না, আর আপনার মুসিবতও আপনার জন্য হালকা হবে না।

“তবে যেন সে আকাশের দিকে একটি রশি বিস্তার করে, অতঃপর তাতে গলায় ফাঁস দিয়ে মরে, তারপর যেন দেখে তার এ চেষ্টা তার ক্রোধের কারণ দূর করে কি না।” (২২-সূরা আল হাজ্জ : আয়াত-১৫)

হতাশ হবেন না-দু’দিন আগে বা পরে এ পৃথিবীর সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। আমরা অত্যাচারী ও অত্যাচারিত, শক্তিশালী ও দুর্বল, ধনী ও গরিব যাই হইনা কেন মৃত্যুই আমাদের সবার শেষ পরিণতি। আপনার মৃত্যু নতুন কিছু নয়, জাতির পর জাতি এসেছে চলে গেছে এবং জাতির পর জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে। ইবনে বতুতা বর্ণনা করেছেন যে, পৃথিবীর উত্তরাঞ্চলে এক গোরস্থানে এক হাজার রাজা বাদশাহকে কবর দেওয়া হয়েছে। এ কবরস্থানের প্রবেশ পথে একটি ফলকে লেখা আছে-
“এই রাজা-বাদশাহদের ও বড় বড় নেতাদের কবরের চারিধারের মাটিকে তাদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা কর, তারা সবাই এখন শুধু হাড় হয়ে আছে।”
(এই রাজা-বাদশাহ ও বড় বড় নেতৃবর্গ সবাই মরে পচে গলে গেছে, এখন শুধু এদের হাড়ই অবশিষ্ট আছে বিশ্বাস না হয় তো এদের কবরের মাটি খুঁড়ে দেখ।)

আশ্চর্যের বিষয় মানুষের মৃত্যুকে ভুলে যাওয়া এবং কীভাবে সে মৃত্যু সম্বন্ধে বেপরোয়া হয়ে থাকে অথচ দিন-রাত তার উপর মৃত্যুর বিভীষিকা ঝুলে আছে! মানুষ নিজেকে ধোঁকা দিয়ে এ চিন্তা করে যে, সে এ পৃথিবীতে চিরকাল বেঁচে থাকবে。
“হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রভুকে ভয় কর ও যথার্থ কর্ম সম্পাদন কর, কেননা, কেয়ামতের প্রকম্প এক ভয়াবহ ব্যাপার।” (২২-সূরা আল হাজ্জ : আয়াত-১)
“মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় ঘনিয়ে এসেছে, অথচ তারা অবহেলায় বিমুখ হয়ে আছে।” (২১-সূরা আল আম্বিয়া : আয়াত-১)
“তুমি কি তাদের কাউকে দেখতে পাও অথবা তাদের ফিসফিসানি শুনতে পাও?” (১৯-সূরা মারইয়াম : আয়াত-৯৮)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 হতাশা দুর্দশা বয়ে আনে

📄 হতাশা দুর্দশা বয়ে আনে


‘আলমুসলিমুন’ পত্রিকায় বলা হয়েছে যে, ১৯৯০ সালে সারা বিশ্বে বিশ লক্ষ লোক হতাশায় ভুগেছে। হতাশা এমন এক রোগ যা মানব জাতির সম্পূর্ণ প্রতিহিংসামূলক ধ্বংস সাধন করে। এটা প্রাচ্যের লোক আর পশ্চিমা লোককে আলাদা করে দেখে না। এটা ধনী ও দরিদ্র লোককেও আলাদা করে দেখে না। এটা এমন রোগ যা সব ধরনের লোককে আক্রমণ করে এবং কিছু লোককে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়।

হতাশা সম্পদ, সম্ভ্রান্ত বংশ ও ক্ষমতাকে চিনে না ও এদেরকে ভয় করে না। যাই হোক, এটা মুমিনদের থেকে দূরে থাকে। কতিপয় পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে বিশ কোটি লোক বর্তমানে হতাশায় ভুগছে। সম্প্রতি এক গবেষণার ফলে দেখা যায় যে, কমপক্ষে প্রতি দশজনে একজন জীবনে কোনো না কোন সময়ে এই মারাত্মক রোগে ভুগেছে। বিপদ শুধুমাত্র বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বর্তমানে তরুণরাও হতাশার প্রতি সংবেদনশীল। এমনকি গর্ভস্থ ভ্রূণও ঝুঁকির সম্মুখীন; কেননা, হতাশা তার সমস্যা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার উপায় হিসেবে গর্ভপাত ঘটাতে পারে।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 হতাশা আত্মহত্যা ঘটাতে পারে

📄 হতাশা আত্মহত্যা ঘটাতে পারে


“আর তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে হত্যা করিও না।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-২৯)
“এবং নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করিও না।” (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-১৯৫)
এ তথ্য ফাঁস হয়ে গিয়েছিল যে ভূতপূর্ব প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান সাংঘাতিক হতাশার শিকার হয়েছিলেন। তাঁর এ অবস্থার কারণ ছিল তাঁর সত্তরোর্ধ্ব বয়স হওয়া সত্ত্বেও বিশাল বিশাল মানসিক চাপযুক্ত কার্য সম্পাদন করা এবং বারবার শল্য চিকিৎসার অধীনস্থ হওয়া।
“তোমরা যেখানেই থাক না কেন, এমনকি সুরক্ষিত (দৃঢ় ও সুউচ্চ) দুর্গেও যদি তোমরা থাক তবুও মৃত্যু তোমাদেরকে পেয়ে বসবেই।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-৭৮)
অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ বিশেষ করে কলা বিভাগের লোকজন হতাশায় ভোগেন। কবি সালেহ জাহিনের মৃত্যুর একমাত্র কারণ না হলেও প্রধান কারণ ছিল হতাশা। একথাও বলা হয়েছে যে, নেপোলিয়ান বোনাপার্ট নির্বাসনে থাকাকালে হতাশ অবস্থায় মারা যান।
“তারা কাফের থাকা অবস্থায় তাদের আত্মা তাদের দেহ ত্যাগ করবে।” (৯-সূরা তাওবা : আয়াত-৫৫)
অল্পকিছু দিন আগে এক জার্মান মহিলা তার তিন তিনটি সন্তানকে হত্যা করে ফেলেছে। পরে এটা স্পষ্ট হয়েছিল যে, সে এ জঘন্য কাজ করেছিল হতাশার কারণে। সে তার সন্তানদেরকে খুবই ভালোবাসত এবং সে এই ভয় করত যে, সে জীবনে যে ব্যথা-বেদনা-দুঃখ-কষ্ট ও সংকটের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে তার সন্তানদেরও সেরূপ ব্যথা-বেদনা-দুঃখ-কষ্ট ও সংকট ভোগ করতে হবে। এ কারণে সে তাদেরকে শান্তি দিতে ও “তাদের প্রত্যেককে” জীবনের জটিলতা ও উত্থান-পতনের হাত হতে “রক্ষা করতে” সিদ্ধান্ত নেয়। তাদেরকে হত্যা করে সে নিজেও আত্মহত্যা করে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px