📄 তুমি যখন সাহায্য চাও, তখন তুমি তা আল্লাহর নিকটেই চাও
আল্লাহর দয়া আমাদের অতি নিকটেই। তিনি সব কিছু শোনেন এবং আমাদের প্রার্থনার জবাব দেন। আমরা ভুলে ভরা এবং তাই নাছোড় বান্দা হয়ে প্রার্থনা করা আমাদের খুবই প্রয়োজন। ক্লান্তি, বিরক্তি ও হতাশা যেন কখনই আমাদেরকে আল্লাহর নিকট আকুল আবেদন করা থেকে বিরত না রাখে। আর আমাদের কেউ যেন না বলে: “আমি প্রার্থনা করেছি তবুও আমার প্রার্থনার জবাব দেওয়া হয়নি।” বরং আমাদের উচিত বিনয়ের সাথে জমিনে মাথা ঠেকানো ও আল্লাহর নিকট থেকে সাহায্য ভিক্ষা চাওয়া। এ কাজ করার সর্বোত্তম পন্থা হলো তাঁর পবিত্র নাম ও গুণাবলির মাধ্যমে তাঁর নিকট সাহায্য চাওয়া। জবাব না দেওয়া পর্যন্ত আমাদেরকে অবশ্যই নাছোড় বান্দা হয়ে তাঁর নিকট সাহায্য চাইতে হবে।
“বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের প্রভুকে ডাক।” (৭-সূরা আল আ'রাফ: আয়াত-৫৫)
একজন লেখক নিম্নোক্ত এই গল্পটি বর্ণনা করেছেন— “একজন মুসলমান শরণার্থী হিসেবে এক দেশে গেলেন এবং সেখানে তাঁর নাগরিকত্ব মঞ্জুরের জন্য কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করলেন। তাঁর সামনে সকল দ্বার রুদ্ধ হয়ে গেল। অন্যদের নিকট নাছোড় বান্দা হয়ে কাকুতি করার সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁর সকল যোগাযোগ ব্যর্থ হলো। একদিন এক ধার্মিক আলেমের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হলো এবং তিনি তাঁর নিকট তাঁর দুর্ভাগ্যপূর্ণ ও বিপজ্জনক অবস্থার একটি বর্ণনা দিলেন। আলেম লোকটি তাঁকে বললেন, তোমার প্রভুর নিকট প্রার্থনা কর; কেননা তিনিই সব কিছু সহজ করে দেন। এ উপদেশের তাৎপর্য নিম্নোক্ত হাদীসে পাওয়া যায়—
‘তুমি যখন সাহায্য চাও, তখন তুমি তা আল্লাহর নিকটেই সাহায্য চাও। আর জেনে রাখ যে, গোটা জাতি যদি তোমার কোন উপকার করার জন্য একত্রিত হয় তবে আল্লাহ্ তোমার জন্য যা লিখে রেখেছেন তা ছাড়া তারা তোমার কোন উপকার করতে পারবে না।’
শরণার্থী এরপর বর্ণনা করেছেন— “আল্লাহর কসম, আমি মানুষের নিকট সাহায্যের জন্য অথবা মধ্যস্থতার জন্য যাওয়া বন্ধ করে দিলাম এবং তার বদলে আমি বরং আলেম আমাকে যেমনটি বলেছেন ঠিক তেমনি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা শুরু করলাম। ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার ঠিক পূর্বে আমি আল্লাহকে ডাকতাম এবং তাঁর নিকট আকুল আবেদন করতাম। মাত্র কয়েকদিন পর, আমার পক্ষে সুপারিশ করার জন্য কোন পদস্থ ব্যক্তির সাহায্য ছাড়াই আমি নাগরিকত্বের জন্য একটি দরখাস্ত জমা দিলাম। আরো কয়েকটি দিন গেল আর তখন আমাকে বিস্মিত করে হঠাৎ করে আমার নাগরিকত্বের জন্য আবেদনপত্র তোলার জন্য আমাকে ডাকা হলো। ওসব কাগজ পত্রে সীল মারা ছিল—অনুমোদিত।”
“আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের প্রতি খুবই মেহেরবান।” (সূরা-৪২ আশ শূরা : আয়াত-১৯)
📄 আল্লাহ একাই সর্বশক্তিমান
এটা খুব ছোটখাট ঘটনা না, মানুষ মাঝে মাঝে জীবনের বাস্তবতা বুঝতে পারে। ১৪১০ হিজরীতে আমার এক বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য রিয়াদ সফর করেছিলাম। রিয়াদে আমার আগমনের দিন তাঁকে দিনের শেষ নাগাদ কল দিয়েছি। তাই আমি সরাসরি আমার (আবাসিক) হোটেলে চলে গেলাম। কুলি আমাকে হোটেল কর্মচারীদের কাজকর্মে স্থান থেকে অনেক দূরে পঞ্চম তলার একটি কক্ষে নিয়ে গেল। ঘরে প্রবেশ করার পর বিছানার উপরে আমার ব্যাগ রেখে অজু করতে গোসলখানায় গেলাম। দরজা বন্ধ করে গোসল সারার পর হঠাৎ দরজার কাছে গেলাম। কিন্তু খুলতে পারলাম না। শীঘ্রই আমি বুঝতে পারলাম যে, আমি এই সংকীর্ণ স্থানে আটকা পড়ে গেছি, যেখানে নেই কোন জানালা, নেই কোন টেলিফোন আর সবচেয়ে খারাপ যা হলো, নিকটে এমন কেউ ছিল না যাকে সাহায্যের জন্য ডাকতে পারতাম।
আমি আমার প্রভুর স্মরণ এবং সাহায্যের জন্য তাঁর নিকট আকুল আবেদন করলাম। আমি সম্পূর্ণ শক্তিহীন হয়ে বিশ মিনিট দাঁড়িয়ে রইলাম, (যদিও বিশ মিনিট) তবুও এটা আমার নিকট তিন দিন মনে হয়েছিল। সে বিশ মিনিটটি আমি ঘাম ঝরিয়েছিলাম, আমার হার্টবিট তখন বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল আর আমার শরীর কাঁপতে শুরু করে দিয়েছিল। আমার আতঙ্কের প্রধান কারণ এই ছিল যে, কোনরূপ সতর্কসংকেত ছাড়াই এ ঘটনা হঠাৎ করে ঘটেছিল এবং এমন এক অদ্ভুত স্থানে ছিলাম যেখানে সাহায্য পাওয়ার কোন উপায় ছিল না। আমার কাছে মনে হয়েছিল যে, সেখানে আমি এক জীবনকাল কাটালাম।
এরপর আমি শারীরিক শক্তি খাটিয়ে দরজাটির ছিটকিনি খোলার চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি আমার দুর্বল শরীর নিয়ে দরজাটিকে ধাক্কাধাক্কি শুরু করে দিলাম। আমি অনবরত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে দুর্বল হয়ে পড়লাম ও বিশ্রাম করার প্রয়োজন বোধ করলাম। যখনই আমি দুর্বল হচ্ছিলাম তখনই আমি বিশ্রাম নিয়ে—এভাবে কিছুক্ষণ চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। অবশেষে দরজা খুলে গেল এবং আমি এমন ধরনের অনুভূতি নিয়ে বেরিয়ে এলাম যা কিনা সে লোকের থাকতে পারে যে নাকি তার কবর থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমি আল্লাহর প্রশংসা ও শুকরিয়া আদায় করলাম। আমি স্মরণ করলাম যে, মানবজাতি কতইনা দুর্বল আর এক মুহূর্ত অতিক্রম করার সময় আমরা কতইনা অসহায় হয়ে যেতে পারি। তখন আমি আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা ও আমাদের পরকালকে ভুলে যাওয়ার কথা মনে করলাম।
“আর তোমরা সেদিনকে ভয় কর যেদিন তোমাদেরকে আল্লাহর নিকট ফিরিয়ে আনা হবে।” (২-সূরা বাকারা: আয়াত-২৮১)
“তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদেরকে পেয়ে বসবেই, যদিও তোমরা মজবুত ও সুউচ্চ দূর্গে থাক না কেন।” (৪-সূরা আন নিসা: আয়াত-৭৮)
মৃত্যু এমনভাবে আসে যা আমরা প্রত্যাশা করি না। আমি এমন কিছু লোক সম্পর্কে শুনেছি যারা মৃত্যুকে চেয়েছিল, কিন্তু অবশেষে তারা দীর্ঘ জীবন পেয়েছিল। পক্ষান্তরে অন্যান্যরা যারা নিরাপত্তা চেয়েছিল, তারা যে স্থানকে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ করেছিল ঠিক সে স্থানেই মারা গিয়ে তারা শেষ হয়ে গিয়েছিল। কেউ একজন রোগের জন্য চিকিৎসার সন্ধান করে আর এভাবে (চিকিৎসার মাধ্যমে) সে তার মৃত্যুর সাথে সাক্ষাৎ করে। অপর পক্ষে আরেকজন উদারভাবে জীবন যাপন করে ও নিরাপদ থাকে। মহান আল্লাহ্ কতইনা নির্ভুল ও পবিত্র। তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর এলাহী প্রজ্ঞা অনুসারে সবকিছুর পরিকল্পনা করেছেন।
📄 অপ্রত্যাশিত সাহায্য
ইদানীং আমি একটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর গল্প পড়েছি। সে তার বাড়িতে কয়েক বছর শয্যাশায়ী হয়েছিল এবং অবশেষে তিক্ততা ও ব্যর্থতার অনুভূতি তাকে পেয়ে বসল। চিকিৎসকেরা তার কোন উপকার করতে পারল না। একদিন সে যখন বাড়িতে একাকী ছিল তখন ঘরের ছাদ থেকে একটি বিছা নেমে এল। যদিও সে এটাকে আসতে দেখেছিল কিন্তু সে নড়াচড়া করতে অক্ষম ছিল। বিছাটি তার মাথার উপর নেমে তাকে বারবার দংশন করল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত সারা শরীরে বিঁধুনি হতে লাগল। সে বিস্মিত হয়ে গেল যে ধীরে ধীরে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অনুভূতি ফিরে এল আর কিছুক্ষণ পর সে নিজেকে ঘরের ভিতরে এদিক-ওদিক হাঁটতে দেখতে পেল। এরপর সে দরজা খুলে তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিকট গেল। তারা যখন তাকে তাদের সামনে দাঁড়ানো দেখল তখন তারা তাদের চক্ষুকে বিশ্বাস করতে পারল না। কেবলমাত্র তারা দৃঢ়ভাবে শান্ত হওয়ার পরই সে তাদেরকে যা ঘটেছিল তা বুঝাতে সক্ষম হচ্ছিল।
এ ঘটনা আমি একজন চিকিৎসকের নিকট উল্লেখ করলাম আর তিনি এর সংগঠনকে যুক্তিযুক্ত বলে গ্রহণ করলেন। তিনি আমাকে বললেন যে, কিছু বিষাক্ত সিরাম আছে, যখন এগুলোতে বিষাক্ততা রাসায়নিকভাবে কমানো হয় তখন এগুলো চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
আল্লাহ এমন কোন রোগ দেননি যার চিকিৎসাও দেননি (অর্থাৎ আল্লাহ যে রোগ সৃষ্টি করেছেন, তিনি সে রোগের চিকিৎসাও সৃষ্টি করেছেন)।
📄 আউলিয়াদের জন্য কারামত আছে
দ্বিতীয় শতাব্দীর একজন ধার্মিক মুসলমান সিলাহ্ ইবনে আসিয়ামাহ্ আল্লাহর পথে সফর করছিলেন। যখন রাত হলো তখন তিনি পার্শ্ববর্তী এক জঙ্গলে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি জঙ্গলে ঢুকে অযু করে সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। কোনরূপ হুঁশিয়ারী সংকেত ছাড়াই একটি সিংহ তাঁর দিকে ধেয়ে আসছিল। সিলাহ্ যখন বিপদজনকভাবে তাঁর নিকট আসল, সিলাহ্ তখন অনবরত সালাত পড়ছিলেন। সিলাহ্ ইবনে আসিয়ামাহ্ দূরে ছিলেন তবুও তিনি তাঁর সালাত ভাঙ্গেননি, বরং অধ্যাবসায়ের সাথে আল্লাহ্র নিকট আবেদন করেছিলেন। তিনি সালাম ফিরানোর মাধ্যমে সালাত শেষ করে সিংহকে বললেন, “আমাকে হত্যা করার জন্য যদি তোমাকে আদেশ দেওয়া থাকে তবে তুমি তা কর নচেৎ আমাকে একাকী ছেড়ে দাও, যাতে আমি আমার প্রভুর সাথে একান্তভাবে কথা বলতে পারি।” এ কথা বলার পর সিলাহ্কে রেখে সিংহটি শান্তভাবে প্রস্থান করল।
“আল বিদায়াহ্ ওয়াননিহায়াহ্” নামক কিতাবে আল্লামা ইবনে কাসীর এ ঘটনার মতোই একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ্র রাসূল ﷺ-এর আজাদিকৃত গোলাম সাফীনাহ্ (রা) সঙ্গীসাথীসহ সাগরের তীর দিয়ে ভ্রমণ করছিলেন। যখন তারা স্থলভাগের দিকে এগিয়ে গেলেন তখন একটি সিংহ ভয়ঙ্করভাবে তাদের দিকে এগিয়ে আসল। সাফীনাহ্ (রা) বললেন, “হে সিংহ! আমি আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এক সেবক। আর এরা আমার সঙ্গীসাথী; অতএব, আমাদের বিরুদ্ধে তোমার কিছুই করার নেই।” সিংহ তাদের নিকট থেকে দৌঁড়ে পালিয়ে গেল। এমন অনেক ঘটনাই সত্য এবং নির্ভরযোগ্য উসূলের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। যা হোক, যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো এসব ঘটনা থেকে এটা অনুভব করুন যে, আমাদের প্রভু হলেন পরম দয়ালু ও পরম বিজ্ঞ এবং বিশ্ব জগতে যা কিছু ঘটছে সে সব বিষয়ে তিনি অবগত আছেন।
“তিন জনের গোপন পরামর্শে তিনি (আল্লাহ্) চতুর্থজন হিসেবে এবং পাঁচ জনের (গোপন পরামর্শে তিনি) ষষ্ঠজন হিসেবে থাকেন।” (৫৮-সূরা মুজাদালা: আয়াত-৭) [আল্লাহ্ সাত আসমানের উপরে তাঁর আরশে (সিংহাসনে) থেকে তিনি তাঁর (কুদরতী) জ্ঞানের মাধ্যমে তাদের সাথে থাকেন—তারা যেই হোক না কেন!]