📄 আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে আঁকড়িয়ে ধরবেন না
মহান আল্লাহই যদি জীবন মৃত্যুর মালিক হন এবং তিনি একাই যদি সকল সৃষ্টির রিযিক যোগিয়ে থাকেন তবে কেন মানুষকে ভয় করা বা তাদের কাজে দুঃখ পাওয়া? আমি মনে করি আমাদের সমাজে অনেক দুঃখ-কষ্ট ও দুশ্চিন্তা-উদ্বিঘ্নতা মানুষের সাথে আমাদের সম্পূর্ণতার কারণেই হয়, তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে চাওয়ার কারণে, তাদের করুণা পাওয়ার চেষ্টা করার কারণে, তাদের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রশংসা করার জন্য চেষ্টা করার কারণে এবং তাদের অপমানকর ব্যবহারে মনে আঘাত পাওয়ার কারণেই হয়। আর এসব কিছু দ্বারা আল্লাহর প্রতি মানুষের ঈমানের দুর্বলতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
“জীবন যখন দুঃসহ তখন যদি তুমি সন্তুষ্ট থাকতে, আর যখন লোকেরা থাকে রাগাম্বিত তখন যদি তুমি তৃপ্ত থাকতে, যদি আল্লাহর প্রতি তোমার ভালোবাসা খাঁটি হয় তবে অন্য সব কিছুই তুচ্ছ। আর ময়লার উপরের সব কিছুই ময়লা।”
📄 আমাদের জন্য একমাত্র আল্লাহই যথেষ্ট আর তিনি কতইনা উত্তম অভিভাবক!
ইবরাহীম (আ)-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল তখন তিনি এ কালিমা حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ বলেছিলেন এবং এর ফলে আগুন তার জন্য শীতল ও শান্তিদায়ক হয়েছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহুদের যুদ্ধে এ কালিমা পাঠ করেছিলেন আর তাই আল্লাহ তাঁকে বিজয়ী করেছিলেন। যখন ইবরাহীম (আ)-কে অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হয়েছিল তখন জিব্রাঈল (আ) এসে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আমার কাছ থেকে আপনি কি কিছু চান?” ইবরাহীম (আ) আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিয়েছিলেন, “আপনার কাছ থেকে নয় বরং আল্লাহর কাছ থেকে চাই!”
মূসা (আ)-এর পিছন থেকে শত্রুরা ধাওয়া করছে আর তার সামনে সাগর; এমন অবস্থায় তিনি বললেন—
“(আমি ধ্বংস হব!) কক্ষনো নয়, নিশ্চয় আমার সাথে আমার প্রভু আছেন; তিনি আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন।” (২৬-সূরা আশ শুআরা: আয়াত-৬২)
সাহাবীগণ বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরতের সময় (পথিমধ্যে) গুহাতে লুকিয়ে ছিলেন তখন আল্লাহর হুকুমে একটি কবুতর ও একটি মាកড়সা এসে গুহার মুখে তাদের বাসা বানিয়ে ফেলল, যা দেখে স্বাভাবিকভাবে মনে হয়েছিল যে সে গুহাতে কোন লোক প্রবেশ করেনি। আর তাই কাফেররাও বলেছিল যে, “এ গুহাতে মুহাম্মাদ প্রবেশ করেনি।”
যারা আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রাখেন আল্লাহ তাদেরকে রক্ষা করেন। বিখ্যাত আরব কবি আল্লামা বুসরী বলেছেন—
“সকল সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি যেখানে আছেন সেখানে কবুতর ও মাকড়সা বাসা বাঁধতে পারে কাফেরা এমনটা ধারণাও করতে পারেনি। আল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে শক্ত বর্ম ও সুউচ্চ দুর্গ থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিয়েছিল। (আল্লাহর হেফাজতের কারণে সেগুলোর কোন প্রয়োজন হয়নি)।
বিখ্যাত আরব কবি (আহমদ) শাওকী বলেছেন-
“যখন আল্লাহর সাহায্যের দৃষ্টি তোমার উপর পড়ে তখন তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাও; কেন না তখন যা কিছু ঘটবে সবই নিরাপদ।”
“কেননা তুমি আমার নজরে আছ।” (৫২-সুরা আত্ব তূর : আয়াত-৪৮)
“কেননা আল্লাহ হলেন উত্তম রক্ষক এবং তিনি সর্বাপেক্ষা করুণাময়।” (১২-সুরা ইউসুফ : আয়াত-৬৪)
📄 আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে তাঁর ইবাদত করুন
তকদীরের ভালো-মন্দ সব কিছুর প্রতি রাজি থাকা ঈমানের জরুরি বিষয়। “এবং আমি অবশ্যই তোমাদেরকে ভয়; ক্ষুধা; সম্পদ, জীবন ও ফলমূলের ক্ষয়-ক্ষতি এমনসব কিছু জিনিস দ্বারা পরীক্ষা করব; কিন্তু ধৈর্যশীলদেরকে (জান্নাতের) সুসংবাদ দান করুন।” (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-১৫৫) আমাদের তকদীরে যা কিছু নির্ধারিত আছে তা সর্বদা আমাদের ইচ্ছা ও কল্পনার সাথে মিলে না। কিন্তু তখন আমাদের কোন (বিরূপ) মন্তব্য করা শোভা পায় না। বরং তোমাদের সঠিক অবস্থা হলো তাই যা একজন আত্মসমর্পণকারী দাসের অবস্থা। আমরা সবাই আমাদের ঈমানের সবলতা ও দুর্বলতা অনুযায়ী কঠিন ও সহজ পরীক্ষার সম্মুখীন হই। নবী করীম ﷺ বলেছেন- “তোমরা দু’জন লোক যতটা মৃত্যু-যন্ত্রণা অনুভব কর আমি একাই ততটা মৃত্যু-যন্ত্রণা অনুভব করছি।” “নবীগণকে সর্বাপেক্ষা কঠিন পরীক্ষা করা হয়; অতঃপর অন্যান্য সৎকর্মশীলদেরকে (তাদের মর্যাদা অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়)।” “অতএব (হে মুহাম্মাদ!) আপনি তেমনভাবে ধৈর্য ধরুন যেমনভাবে দৃঢ়সংকল্প রাসূলগণ ধৈর্য ধরেছিলেন।” (৪৬-সূরা আল আহকাফ : আয়াত-৩৫) আল্লাহ যদি কারো ভালো চান তবে তিনি তাকে পরীক্ষায় ফেলেন। “এবং আমি অবশ্যই পরীক্ষা করে তোমাদের মধ্য থেকে মুজাহিদদেরকে এবং ধৈর্যশীলদেরকে চিনে নিব। এবং আমি তোমাদের ব্যাপার-স্যাপার (অর্থাৎ কে সত্যাবাদী আর কে মিথ্যবাদী) পরীক্ষা করে দেখব।” (৪৭-সূরা মুহাম্মদ বা কেতাল : আয়াত-৩১) “আর আমি অবশ্যই তাদের পূর্ববর্তীদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম।” (২৯-সূরা আল আনকাবুত : আয়াত-৩)
📄 তাওহীদের সুফল
আপনি যখন অত্যাচারের শিকার হন তখন আপনার জীবনে অবশ্যই তাওহীদের সুফল দেখা দেবেন। একথা মনে রাখবেন যে, অন্যেরা যখন আপনাকে আঘাত করে তখন আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস আপনাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করবে।
১. আল্লাহ্র প্রতি আপনার পাকা ঈমান থাকলে আপনার প্রতি যে ব্যক্তি জুলুম করেছে আপনি তাকে ক্ষমা করে দিবেন। এর চেয়ে আরো ভালো তার জন্য শুভ কামনা করা। শুধুমাত্র ক্ষমা করে দেয়া বা শুধুমাত্র শুভ কামনা করার চেয়েও আরো ভালো, উচ্চতম ও সর্বোত্তম স্তর হলো তার কোন উপকার করা বা তাকে কোনভাবে সাহায্য করা। ক্ষমার প্রথম পর্যায় হলো স্বীয় ক্রোধ দমন করা, এর অর্থ হলো আপনি আঘাতের বদলে আঘাত দিচ্ছেন না। তারপর আসছে সত্যিকার ক্ষমা- যার অর্থ হলো ক্ষমা করা, কোনরূপ অন্তত ইচ্ছা বা কামনা পরিত্যাগ করা। এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে আসছে কল্যাণ করা তথা আপনার যে ক্ষতি করা হয়েছে কোন ভালো কাজের মাধ্যমে বা (অত্যাচারী) দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে তার ক্ষতি পূরণ করা। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- “যারা ক্রোধ দমন করে এবং অন্যদেরকে ক্ষমা করে; আল্লাহ্ সৎকর্মশীলদেরকে ভালোবাসেন।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৩৪) “আর যে নাকি ক্ষমা করে দেয় এবং আপোস মীমাংসা করে তার পুরস্কার আল্লাহ্র নিকটেই আছে।” (৪২-সূরা আশ শুরা : আয়াত-৪০) “তারা যেন (তাদেরকে) ক্ষমা করে ও (তাদের) দোষ উপেক্ষা করে।” (২৪-সূরা আন নূর : আয়াত-২২)
বর্ণিত আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “যে ব্যক্তি আমার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করেছে তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক করতে, যে আমার সাথে অন্যায় আচরণ করেছে তাকে ক্ষমা করে দিতে এবং যে আমাকে বঞ্চিত করেছে তাকে দান করতে আল্লাহ্ অবশ্যই আমাকে আদেশ করেছেন।”
২. তক্বদীরের প্রতি আপনার ঈমান পাকা হবে। অন্য কথায় আপনি বুঝতে পারবেন যে, যে ব্যক্তি আপনার সাথে অন্যায় আচরণ করেছে সে তা আল্লাহ্র পূর্ব নির্ধারণী ও বিধান অনুসারেই করেছে। মানুষ তো উপায় মাত্র, কিন্তু যিনি বিধান করেন ও সিদ্ধান্ত দেন তিনি হলেন আল্লাহ্। সুতরাং আপনার ইচ্ছাকে তাঁর সমীপে সমর্পণ করুন।
৩. আপনি বুঝতে পারবেন যে, আপনার যে ক্ষতি হয়েছে তাতে আপনার পাপ ক্ষয় হয়েছে এবং এর ফলে আল্লাহ্র দরবারে আপনার মর্যাদা বৃদ্ধি পেতে পারে। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- “অতএব যারা হিজরত করেছে এবং নিজেদের ঘর-বাড়ি হতে বিতাড়িত হয়েছে ও আমার পথে নির্যাতিত হয়েছে এবং যুদ্ধ করেছে ও নিহত হয়েছে আমি অবশ্যই তাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিব।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৯৫)
মুমিনগণ একথা বুঝতে পারে যে, জীবনে শত্রুতায় আগুন নিভানো এক বুদ্ধিমত্তার কাজ। কুরআনের ভাষায়- “উত্তম জিনিস দ্বারা মন্দকে দূর কর, যাতে তোমার মাঝে ও যে তোমার সাথে শত্রুতা করে তার মাঝে এমন সম্পর্ক হয়ে যায় যেন সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু।” (৪১-সূরা হা-মীম-আস-সাজদাহ : আয়াত-৩৪) অর্থাৎ আল্লাহ্ মুমিনদেরকে ক্রোধের সময় ধৈর্য ধরতে এবং যারা তাদের সাথে মন্দ আচরণ করেছে তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়ার আদেশ দিয়েছেন। “যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্যান্য মুসলিমগণ নিরাপদ থাকে সেই প্রকৃত মুসলমান।” পূর্বোক্ত আয়াতের অর্থ হলো, যে ব্যক্তি আপনার ক্ষতি করে বিনিময়ে আপনার উচিত তার সাথে হাসি মুখে সাক্ষাৎ করা ও কোমল কথা বলা। এভাবে আপনি তার অন্তর থেকে ঘৃণার আগুন নিভিয়ে দিতে পারবেন। কুরআনের ভাষায়- “আমার বান্দাদেরকে যা উত্তম তা বলতে বলুন, নিশ্চয় শয়তান তাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে।” (১৭-সূরা বানী ইসরাঈল : আয়াত-৫৩)
৪. আপনি আপনার ত্রুটি-বিচ্যুতি সম্বন্ধে জানতে পারবেন। অন্য কথায় আপনি একথা বুঝতে পারবেন যে, আপনার পাপের কারণেই একজন লোক আপনার ক্ষতি করার সুযোগ গ্রহণ করতে পেরেছে। “কি ব্যাপার! যখন তোমাদের নিকট একটি বিপদ আসল তখন তোমরা বললে, “এটা কোথা হতে আসল?” অথচ পূর্বে তোমরা (তোমাদের শত্রুদের) দ্বিগুণ বিপদ ঘটিয়ে ছিলে।” আপনি (হে মুহাম্মাদ) (তাদেরকে) বলে দিন যে, এটা (তোমাদের পাপের কারণে) তোমাদের নিজেদের থেকেই এসেছে।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৬৫) “আর তোমাদের যে বিপদাপদ ঘটে তা তোমাদের নিজ কৃত কর্মের ফলেই ঘটে।” (৪২-সূরা আশ শূরা : আয়াত-৩০)
৫. আপনি যখন অত্যাচারিত হন তখন আপনাকে অত্যাচারী না বানিয়ে অত্যাচারিত বানানোর কারণে আল্লাহ্র প্রশংসা করা ও তাঁর শোকরিয়া আদায় করুন। আমাদের কতিপয় ধার্মিক পূর্বসুরী বলতেন- “হে আল্লাহ্! আমাকে অত্যাচারী না বানিয়ে বরং অত্যাচারিত বানান।” আদম (আ)-এর দু’ছেলের একজন অপরজনকে যা বলেছিল একথা সে কথার মতো। “যদি তুমি আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হাত বাড়াও তবে আমি তোমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হাত বাড়াবো না; নিশ্চয় আমি সমস্ত বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ্কে ভয় করি।” (৫-সূরা মায়িদাহ : আয়াত-২৮)
৬. যে আপনাকে আঘাত করেছে তার প্রতি আপনার করুণা প্রদর্শন করা উচিত। সে আপনার অনুকম্পা ও করুণার পাত্র। মন্দ কাজে তার শৌর্য ও মুসলমানকে আঘাত না করার জন্য আল্লাহ্র যে আদেশ তা প্রকাশ্যে অমান্য করার কারণে সে আপনার কোমলতাচরণ ও অনুকম্পার পাত্র। সম্ভবত আপনি (এরূপ আচরণ করে) তাকে পতন বা ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারবেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “অত্যাচারী বা অত্যাচারিত যাই হোক না কেন তোমার ভাইকে সাহায্য কর।” (অত্যাচারিতকে সাহায্য করার অর্থ আশা করি সকলেই বুঝি। কিন্তু অত্যাচারীকে সাহায্য করার অর্থ হলো সদাচরণের মাধ্যমে তাকে অত্যাচার করা থেকে বিরত রাখা ও ফলে তাকে আল্লাহ্র গযব ও ধ্বংস থেকে বাঁচাতে সাহায্য করা।)