📄 কুরবানীর আহকাম ও মাসায়েল
ঈদুল আযহায় যে কুরবানী করা হয়ে থাকে, তার কতিপয় আহকাম ও মাসায়েল পেশ করা হল।-
(১) সাইয়েদাহ উম্মে সালামাহ রাযিআল্লাহু আনহা হতে রেওয়ায়াত আছে যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যখন তোমরা যিল হজ্জের চাদ দেখবে এবং তোমাদের মধ্য হতে কোন ব্যক্তি কুরবানী করার ইচ্ছা করে; তবে সে চুল এবং নখ কাটা থেকে বিরত থাকবে' (ছহীহ মুসলিম হা/১৯৭৭, দারুস সালামের হাদীছ নং ৫১১৯)।
এই হাদীছে 'ইচ্ছা করে' দ্বারা যাহির হয় যে, কুরবানী করা ওয়াজিব নয়। বরং সুন্নাত। দেখুন: ইবনে হাযম, আল-মুহাল্লা (মাসআলা নং ৯৭৩, ৭/৩৫৫)।
নিম্নোক্ত হাদীছ দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, কুরবানী করার ইচ্ছা পোষণকারীদের নখ কাটা, চুল কামানো, চুল কামিয়ে নেয়া বা উপড়ানো, উপড়িয়ে নেয়া জায়েয নয়।
সাইয়েদুনা আবূ সারীহা/সুরাইহা রাযিআল্লাহু আনহু হতে রেওয়ায়াত আছে যে, (সাইয়েদুনা) আবূ বকর (ছিদ্দীক্ব) এবং (সাইয়েদুনা) ওমর রাযিআল্লাহu আনহু উভয়ই আমার পড়শী ছিলেন। আর উভয়ই কুরবানী করতেন না (বায়হাক্বী, মারিফাতুস সুনান ওয়াল আছার হা/৫৬৩৩, ৭/১৯৮, এর সনদ হাসান; নববী একে হাসান বলেছেন, আল-মাজমূ শারহুল মুহাযযাব ৮/৩৮৩; ইবনে কাছীর বলেছেন, এর সনদ ছহীহ, মুসনাদুল ফারূক্ব ১/৩৩২)।
সাইয়েদুনা আবূ মাসঊদ উক্ববাহ বিন আমের আনছারী রাযিআল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আমি এই ইচ্ছা করেছি যে, কুরবানীকে বর্জন করি। যদিও আমি তোমাদের চাইতে (সম্পদের দিক দিয়ে) স্বচ্ছল। এই আশঙ্কায় (কুরবানী বর্জন করতে চাই) যে, কোন মানুষ যেন একে ওয়াজিব মনে না করে' (বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা ৯/২৬৫, সনদ শক্তিশালী)।
ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'কুরবানী করা সুন্নাত। ওয়াজিব নয়। এবং যে ব্যক্তি ক্ষমতা রাখে সে কুরবানী করা বর্জন করুক তা আমি পছন্দ করি না' (আল-মুওয়াত্ত্বা হা/১০৭৩, ২/৪৮৭)।
ইমাম শাফেঈ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'কুরবানী করা সুন্নাত। আমি একে বর্জন করা পছন্দ করি না' (কিতাবুল উম্ম ১/২২১; উপরন্তু দেখুন : ইবনে কুদামার আল-মুগনী (মাসআলা নং ৭৮৫১, ৯/৩৪৫)।
ইমাম বুখারী বলেছেন, 'কুরবানীর সুন্নাত-এর অনুচ্ছেদ' (ছহীহ বুখারী হা/৫৫৪৫-এর পূর্বে)।
(২) সাইয়েদুনা আবূ হুরায়রাহ রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা আছে যে, 'রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ক্ষমতা থাকার পরও কুরবানী না করে তবে সে যেন আমাদের মুছাল্লায় না আসে (সুনানে ইবনে মাজাহ হা/৩১২৩, সনদ হাসান; হাকেম একে ছহীহ বলেছেন ২/২৩২; যাহাবী তাকে সমর্থন করেছেন; আহমদ এটি বর্ণনা করেছেন ২/৩২১)।
এই রেওয়ায়াতে আব্দুল্লাহ বিন আইয়াশ আল-মিছরী হলেন বিতর্কিত রাবী। যার উপর কিবারে আলেমগণ জারহ করেছেন এবং জমহূর ছিক্বাহ বলেছেন। প্রায় পাচ-ছয়জনের মোকাবেলা রয়েছে।
উপরোল্লিখিত রেওয়ায়াতটির উদ্দেশ্য এই যে, যে ব্যক্তি কুরবানীকে গুরুত্বহীন ও তুচ্ছ মনে করে ক্ষমতা থাকার পরও কুরবানী করে না। তার উচিৎ মুসলমানদের ঈদগাহ হতে দূরে থাকা। অর্থাৎ এই বর্ণনাটি কুরবানীর মুসতাহাব এবং সুন্নাত হওয়ার উপর ধর্তব্য হয় আর হাদীছ অস্বীকারকারীদের প্রত্যাখ্যানকারী।
(৩) সাইয়েদুনা আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আছ রাযিআল্লাহু আনহু হতে রেওয়ায়াত আছে যে, একজন ব্যক্তি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, আপনি কি মনে করেন, যদি আমি স্রেফ দুধদানকারী পশু পাই তবে কি আমি সেটি কুরবানী করব? তিনি বললেন, 'না'। কিন্তু তুমি নখ, চুল কাটাবে। গোফ ছেঁটে ফেলবে, লজ্জাস্থানের চুল কামিয়ে ফেলবে। তাহলে আল্লাহ্র কাছে তোমার এটি (অত্র কাজগুলি) পূর্ণ কুরবানী হয়ে (হিসাবে গণ্য হয়ে) যাবে (সুনানে আবী দাউদ হা/২৭৮৯, সনদ হাসান; ইবনে হিব্বান, আল-মাওয়ারিদ হা/১০৪৩; হাকেম ৩/২২৩ এবং যাহাবী ছহীহ বলেছেন)।
এই হাদীছের রাবী ঈসা বিন হিলাল আছ-ছদাফী সত্যবাদী। দেখুন : তাক্বরীবুত তাহযীব (রাবী-৫৩৩৭)।
তাকে ইয়াকূব বিন সুফিয়ান আল-ফারিসী (আল-মারিফাতু ওয়াত-তারীখ ২/৪৮৭, ৫১৫) এবং ইবনে হিব্বান ইত্যাদি ইমামগণ ছিক্বাহ বলেছেন। এমন রাবীর রেওয়ায়াত হাসান স্তরের চাইতে কম নিম্ন মানের হয় না আদৌ।
আইয়াশ বিন আব্বাস আল-কিতবানী ছিক্বাহ ছিলেন। দেখুন : তাকরীবুত তাহযীব (ক্রমিক ৫২৬৯)। অবশিষ্ট সনদ ছহীহ।
এই হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয়েছে যে, যে ব্যক্তি কুরবানী করার ক্ষমতা না রাখে, সে যদি যুল হজ্জের চাঁদ উঠার পর থেকে ঈদের ছলাত হতে অবসর হওয়া পর্যন্ত চুল না কাটায়, নখ না কাটে তবে সে কুরবানীর ছওয়াব পাবে।
(৪) সাইয়েদুনা জাবের রাযিআল্লাহু আনহু হতে রেওয়ায়াত আছে যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, দাঁত বিশিষ্ট (মুসিন্নাহ) ব্যতীত অন্য পশু যবাই করবে না। তবে যদি তোমার উপর সংকির্ণতা এসে যায় তবে জুযআহ যবাই করবে (ছহীহ মুসলিম হা/১৯৬৩, দারুস সালামের হাদীছ নং ৫০৮২)।
বকরীর (বা ভেড়ার) ঐ বাচ্চাকে 'জুযআহ' বলে যেটি আট বা নয় মাস বয়স্ক হয়েছে। দেখুন : আল-ক্বামূসুল ওয়াহীদ (পৃ. ২৪৩)।
হাফেয ইবনে হাজার বলেছেন, জমহূরের নিকটে দুম্বার জুযআহ তাকে বলে যেটি একবছর পুরো করেছে (ফাহুল বারী ১০/৫, হা/৫৫৪৭-এর আলোচনা)।
এক বছরের জুযআহ ভেড়া/ভেড়ীর মধ্য হতে হওয়া উত্তম। নতুবা আট বা নয় মাস বয়স্ক হলেও জায়েয। আল্লাহ্ই অধিক অবগত।
বিশেষ সতর্কীকরণ : ছহীহ মুসলিমের এই হাদীছটির উপর বর্তমান যুগের শায়েখ আলবানী রহিমাহুল্লাহ্র সমালোচনাটি প্রত্যাখ্যাত। দেখুন : আয-যঈফাহ হা/৬৫; ইরওয়াউল গালীল হা/১১৪৫)।
মুসতাদরাকে হাকেম (হা/৭৫৩৮, ৪/২২৬, সনদ ছহীহ) এর হাদীছ দ্বারাও এটি প্রকাশিত হয় যে, মুসিন্নাহ (দাঁত বিশিষ্ট পশু) না থাকাবস্থায় জুযআহ-ই কুরবানীর জন্য যথেষ্ট।
(৫) সাইয়েদুনা বারা বিন আযেব রাযিআল্লাহু হতে রেওয়ায়াত আছে যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, চারটি জানোয়ার কুরবানী করা জায়েয নেই। এমন কানা যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট। ২. এমন অসুস্থ যার অসুখ স্পষ্ট। ৩. এমন ল্যাংড়া যার খোড়াত্ব স্পষ্ট বুঝা যায়। ৪. আর খুবই দুর্বল পশু যা হাড্ডিসর্বস্ব। (এই হাদীছের রাবী তাবেঈ উবায়দ বিন ফায়রূয) বলেছেন, আমি এমন পশুও অপছন্দ করি যার দাঁতে ত্রুটি থাকে। তখন (সাইয়েদুনা) বারা (রাযিআল্লাহু আনহু) বললেন, তুমি যা অপছন্দ কর তা বর্জন কর। কিন্তু অন্যের উপর তা হারাম করবে না (সুনানে আবী দাউদ হা/২৮০২)।
এই হাদীছের সনদ ছহীহ। এবং একে তিরমিযী (হা/১৪৯৭), ইবনে খুযায়মাহ (হা/২৯১২), ইবনে হিব্বান (হা/১০৪৬, ১০৪৭), ইবনুল জারূদ (হা/৪৮১, ৯০৭), হাকেম (১/৪৬৭, ৪৬৮) এবং যাহাবী ছহীহ বলেছেন।
প্রতীয়মান হল যে, যেই বস্তুর সম্পর্কে অন্তরে সংশয় হয়েছে আর অনুরূপভাবে সন্দেহযুক্ত বিষয়সমূহ হতে বেঁচে থাকা জায়েয।
সাইয়েদুনা আলী বিন আবী তালেব রাযিআল্লাহু আনহু হতে রেওয়ায়াত আছে যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিং ভাঙ্গা জানোয়ার কুরবানী করতে নিষেধ করেছেন। প্রসিদ্ধ তাবেঈ ইমাম সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, এমন পশু যার অর্ধেক শিং অথবা তার চাইতে অধিক ভেঙ্গে গিয়েছে (সুনানুন নাসাঈ হা/৪৩৮২, ৭/২১৭, সনদ হাসান; তিরমিযী ছহীহ বলেছেন হা/১৫০৪)।
সাইয়েদুনা আলী রাযিআল্লাহু আনহু হতে আরো একটি বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে হুকুম দিয়েছেন যে, কুরবানীর (জানোয়ারের) চোখ এবং কান দেখে নিতে (সুনানুন নাসাঈ হা/৪৩৮১, ৭/২১৭, এর সনদটি হাসান; তিরমিযী (হা/১৫০৩), ইবনে খুযায়মাহ (হা/২৯১৪) ইবনে হিব্বান, আল-ইহসান (হা/৫৮৯) হাকেম (৪/২২৫) এবং যাহাবী ছহীহ বলেছেন)।
এই হাদীছসমূহের সারকথা এই যে, কানা, ল্যাংড়া, স্পষ্ট অসুস্থ, খুবই দুর্বল, শিং (ভাঙ্গা অথবা) কাটা এবং কান কাটা পশুদের কুরবানী করা জায়েয নয়।
আল্লামা খাত্তাবী (মৃ. ৩৮৮ হি.) বলেছেন, (সাইয়েদুনা বারা বিন আযেব রাযিআল্লাহু আনহুর বর্ণনাকৃত) হাদীছটির মধ্যে দলীল রয়েছে যে, কুরবানীর মধ্যে সাধারণ দোষ-ত্রুটি থাকলেও তা ক্ষমাযোগ্য (মাআলিমুস সুনান হা/৬৮৩-এর আলোচনা ২/১৯৯)।
প্রতীয়মান হয়েছে যে, যদি শিং-এর মধ্যে সাধারণ দোষ থাকে অথবা কিছুটা কাটা অথবা ভাঙ্গা থাকে তবে উক্ত পশুটির কুরবানী করা জায়েয।
নববী বলেছেন, ‘এর উপর ইজমা আছে যে, কানা/অন্ধ পশুকে কুরবানী করা জায়েয নয়’ (আল-মাজমূ শারহুল মুহযযাব ৮/৪০৪)।
(৬) রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলী রাযিআল্লাহু আনহুকে হুকুম দিয়েছেন যে, কুরবানীর গোশত, চামড়া লোকদের মধ্যে বন্টন করে দাও। আর কশাইকে এগুলির মধ্য হতে (মজুরি হিসাবে) কিছুই দিবে না। দেখুন : ছহীহ বুখারী (হা/১৭১৭) এবং ছহীহ মুসলিম (হা/১৩১৭)।
এই হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয়েছে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানী করতে হবে (যেমন কুরবানী, আকীকা)। এগুলি বিক্রি করা জায়েয নয়। দেখুন: বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ (হা/১৯৫১, ৭/১৮৮)।
(৭) সাইয়েদুনা আনাস বিন মালেক রাযিআল্লাহু হতে রেওয়ায়াত আছে যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুটি সাদা এবং কাল শিং বিশিষ্ট ভেড়া নিজ হাতে যবাই করেছেন। তিনি ‘তাসমিয়া’ এবং ‘তাকবীর’ বলেছিলেন এবং স্বীয় পা কুরবানীর পশুর গর্দানের উপর রেখেছিলেন (ছহীহ মুসলিম হা/১৯৬৬, দারুস সালামের ক্রমিক নং হা/৫০৮৭; ছহীহ বুখারী হা/৫৫৬৪)।
মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়েদাহ আয়েশাহ রাযিআল্লাহু আনহাকে ছুরিকে পাথর দ্বারা তীক্ষ্ণ করে নিতে হুকুম দিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি ভেড়াকে শুইয়ে যবাই করেছেন এবং বলেছেন, 'বিসমিল্লাহ। হে আমার আল্লাহ! মুহাম্মাদ, মুহাম্মদের পরিবার এবং মুহাম্মাদের উম্মতের পক্ষ হতে কবুল কর' (ছহীহ মুসলিম হা/১৯৬৭, দারুস সালামের হাদীছ নং ৫০৯১)।
(৮) সাইয়েদুনা জাবের রাযিআল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আমরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর সাথে হুদায়বিয়ার সনে সাতজন ব্যক্তির পক্ষ হতে একটি উট এবং সাতজনের পক্ষ হতে একটি গরু যবাই করেছি' (ছহীহ মুসলিম হা/১৩১৮, দারুস সালাম হাদীছ নং ৩১৮৫)।
সাইয়েদুনা ইবনে আব্বাস রাযিআল্লাহu আনহু বলেছেন, 'আমরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে একটি সফরে ছিলাম। ঈদুল আযহা এসে উপস্থিত হল। তখন আমরা (একটি) গরুতে সাতজন এবং (একটি) উটের মধ্যে দশজন শরীক হলাম' (তিরমিযী হা/১৫০১, তিনি বলেছেন, হাসান গরীব; এর সনদটি হাসান)।
এই হাদীছসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হল যে, উটের মধ্যে সাত অথবা দশজন মানুষ শরীক হতে পারেন। এবং গরুতে স্রেফ সাতজন ভাগী হবে।
বকরী, ভেড়ার ক্ষেত্রে ঐক্যমত আছে যে, স্রেফ একজন ব্যক্তির পক্ষ হতেই তা যথেষ্ট।
ইবনে আব্বাসের হাদীছ দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, সফরে কুরবানী করা জায়েয।
(৯) ঈদের ছলাতের পর কুরবানী করতে হবে। দেখুন: ছহীহ বুখারী (হা/৫৫৪৫) এবং ছহীহ মুসলিম (হা/১৯৬১)। ঈদের ছলাতের আগে কুরবানী করা জায়েয নেই।
(১০) সাইয়েদুনা আবূ উমামাহ বিন সাহল বিন হানীফ রাযিআল্লাহু আনহু বলতেন, মুসলমানদের মধ্য হতে (মদীনাতে) কেউ স্বীয় কুরবানীর পশু ক্রয় করত এবং সে তাকে খাইয়ে-দাইয়ে মোটা তাজা করত। অতঃপর যুল হজ্জের (কুরবানীর নির্ধারিত তারীখের) শেষে (!) সেটি যবাই করত (আবূ নুআইম, আল-মুসতাখরাজ, তাগলীকুত তালীকের বরাতে ৫/৬, সনদ ছহীহ; আহমাদ বলেছেন, 'এই হাদীছটি গরীব'; ছহীহুল বুখারী হা/৫৫৩-এর আগে, তালীকরূপে)। সতর্কীকরণ : 'মদীনাতে' শব্দটি ছহীহ বুখারীতে আছে।
(১১) মৃতর পক্ষ হতে কুরবানীর উল্লেখ যেই হাদীছের মধ্যে এসেছে সেটি 'শারীক আল-ক্বাযী' এবং 'হাকাম বিন উতায়বাহ' দুই মুদাল্লিস রাবীর তাদলীসের কারণে এবং 'আবুল হাসনা' নামী মাজহুল রাবীর অজ্ঞ থাকার কারণে যঈফ। দেখুন সুনানে আবী দাউদ (হা/২৭৯০, আমার তাহক্বীককৃত) এবং সুনানে তিরমিযী (হা/১৪৯০) ও আযওয়াউল মাছাবীহ (হা/১৪৬২)।
তদুপরি ছদক্বা হিসাবে কুরবানী করা জায়েয আছে। সেজন্য এই কুরবানীর সকল গোশত এবং চামড়া প্রভৃতি মিসকীন বা মিসকীনদেরকে ছদক্বা করে দেয়া আবশ্যক।
সতর্কীকরণ : সাধারণ কুরবানীর (যেটি ছদক্বা হিসাবে নয়) চামড়া নিজেই ব্যবহার করুন বা কোন বন্ধুকে হাদিয়া দিয়ে দিবেন। অথবা কোন মিসকীনকে ছদক্বা করে দিবেন। কিন্তু মনে রাখবেন যে, যাকাতের আটটি খাতের মধ্যে কুরবানীর চামড়া বন্টন করার কোন প্রমাণ নেই।
(১২) সাইয়েদুনা আবু আইয়ূব আনছারী রাযিআল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আমরা একটি বকরীর কুরবানী করতাম। লোকেরা নিজের পক্ষ হতে এবং নিজের পরবিারের পক্ষ হতে (একটি বকরী কুরবানী করত)। অতঃপর লোকেরা একে অপরের উপর গর্ব করা আরম্ভ করে দেয়' (মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালেক হা/১০৬৯, ২/৪৮৬, এর সনদ ছহীহ; আন- নাছীহাতুল বাকিস্তানিইয়া পৃঃ ৪৯৭; বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা ৯/২৬৮; সুনানে তিরমিযী হা/১৫০৫, তিনি বলেছেন, হাসান ছহীহ; সুনানে ইবনে মাজাহ হা/৩১৪৭; নবীব ছহীহা বলেছেন, আল-মাজমূ শারহুল মুহাযযাব ৮/৩৮৪)।
'সুনানে ইবনে মাজাহ' ইত্যাদি গ্রন্থে এই কথাটি স্পষ্টভাবে আছে যে, সাইয়েদুনা আবু আইয়ূব রাযিআল্লাহু আনহু এবং ছাহাবার এই আমলটি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের যামানায় হত (সনদ হাসান)।
প্রতীয়মান হল যে, যদি ঘরের অভিভাবক অথবা কোন একজন ব্যক্তি একটি কুরবানী করেন তাহলে সমস্ত পরিবারের পক্ষ হতে তা যথেষ্ট।
(১৩) ঈদগাহে কুরবানী করা জায়েয। এবং ঈদগাহের বাইরে স্বীয় ঘর ইত্যাদির মধ্যে কুরবানী করাও জায়েয (ছহীহ বুখারী হা/৫৫৫১, ৫৫৫২)।
(১৪) কুরবানীর পশু নিজেই যবাই করা সুন্নাত। এবং অন্যকে দিয়ে যবাই করানোও জায়েয। দেখুন: আল-মুওয়াত্ত্বা (ইবনুল ক্বাসেমের বর্ণনা হা/১৪৫, আমার তাহক্বীক্বকৃত, এর সনদটি ছহীহ; নাসাঈ, আস-সুনানুছ ছুগরা হা/৪৪২৪, ৭/২৩১; মুসনাদে আহমাদ ৩/৩৮৮)
(১৫) রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের স্ত্রীদের পক্ষ হতে গাভী যবাই করতেন (ছহীহ বুখারী হা/৫৫৫৯; ছহীহ মুসলিম হা/১২১১)।
সতর্কীকরণ : যে রেওয়ায়াতের মধ্যে এসেছে যে, গাভীর গোশতে অসুখ আছে সেগুলির মধ্য হতে একটিও ছহীহ প্রমাণিত নয়।
(১৬) সাইয়েদুনা আলী রাযিআল্লাহু আনহু বলেছেন, বনূ তাগলিবের ন্যায় নাছারাদের যবাই করা পশু খেও না। কেননা তারা শরাব পান করা ব্যতীত আর কোন কিছুই করে না (বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা ৯/২৮৪)।
প্রতীয়মান হল যে, মুরতাদ ও নাস্তিকদের যবাই ভক্ষণ করা হালাল নয়।
(১৭) কুরবানীর গোশত নিজে খাওয়া যরূরী নয়। বরং মুসতাহাব।
(১৮) একবার সাইয়েদুনা আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাযিআল্লাহু আনহু মদীনা কুরবানী করলেন এবং মাথা মুন্ডালেন। তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি হজ্জ করল না এবং কুরবানী করল তার উপর মাথা কামানো ওয়াজিব নয় (বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা ৯/২৮৮, এর সনদটি ছহীহ; মুওয়াত্ত্বা হা/১০৬২, ২/৪৮৩)।
(১৯) কুরবানীর গোশত নিজে খাওয়া, বন্ধুদের এবং আত্মীয়দেরকে খাওয়ানো আর গরীবদেরকে হাদিয়াস্বরূপ প্রদান করা- তিনভাবেই জায়েয। যেমন দেখুন: সূরাতুল হাজ্জ (আয়াত-৩৬, ৩৮; ফাতাওয়া ইবনে তায়মিয়া ২৬/৩০৯ ইত্যাদি)।
(২০) সাইয়েদুনা আব্দুল্লাহ বিন ওমর বলতেন, যে ব্যক্তি কুরবানীর পশু নিয়ে বায়তুল্লাহর দিকে রওয়ানা করে এবং পথিমধ্যে তা হারিয়ে যায়; এক্ষেত্রে যদি সে মান্নত করে থাকে তবে তাকে দ্বিতীয়বার পশু পাঠাতে হবে। আর যদি নফল কুরবানীর পশু হয়ে থাকে তবে তার মর্জি হলে কুরবানী করবে নতুবা করবে না (আস-সুনানুল কুবরা ৯/২৮৯, সনদ ছহীহ)। উপরন্তু (দেখুন মাসিক আল-হাদীছ-৫২, পৃঃ ১২, ১৩)।
(২১) সাইয়েদুনা আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রাযিআল্লাহু আনহু কুরবানীর একটি কানকাটা উটনী দেখলেন। তখন তিনি বললেন, যদি এটি কেনার পর কানা হয়ে থাকে তাহলে কুরবানী করবে। আর যদি কেনার পূর্বেই অন্ধ থেকে থাকে তাহলে একে পরিবর্তন করে অন্য উটনী কুরবানী করবে (আস-সুনানুল কুবরা ৯/২৮৯, সনদ ছহীহ)।
(২২) কুরবানীর পশু যবাই করার সময় তার চেহারা কিবলামুখী করানো উচিৎ। সাইয়েদুনা ইবনে ওমর রাযিআল্লাহু আনহু ঐ পশুর গোশত খাওয়া মাকরূহ মনে করতেন যেটি কিবলামুখী করানো ব্যতীত যবাই করা হয়েছে (মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক্ব হা/৮৫৮৫, ৪/৪৮৯, সনদ ছহীহ)।
(২৩) হাদীছ অস্বীকারকারীগণ কুরবানীর সুন্নাত হওয়াকে অস্বীকার করেন। অথচ মুতাওয়াতির হাদীছসমূহ এবং আছারসমূহ দ্বারা কুরবানীর সুন্নাত হওয়া প্রমাণিত। আর একটি হাদীছের মধ্যে এসেছে যে, প্রতিটি জীবের মধ্যে ছওয়াব রয়েছে। দেখুন: ছহীহ বুখারী (হা/২৩৬৩) এবং ছহীহ মুসলিম (হা/২২৪৪)।
(২৪) ঈদের ছলাতের ক্ষেত্রে দেরী করা উচিৎ নয়। বরং শীঘ্রই পড়া সুন্নাত। এক বার একজন ইমাম ঈদের ছলাতে বিলম্ব করে ফেলেন তখন আব্দুল্লাহ বিন বুসর রাযিআল্লাহু আনহু তাকে প্রত্যাখ্যান করলেন এবং বললেন, আমরা তো এই সময়ে (যখন চাশতের ছলাত পড়া হয়) ঈদের ছালাত সমাপ্ত করি (সুনানে আবী দাউদ হা/১১৩৫, সনদ ছহীহ; হাকেম বুখারীর শর্তে ছহীহ বলেছেন ১/২৯৫; যাহাবী তাকে সমর্থন করেছেন)।
(২৫) যদি কুরবানীর ইচ্ছা পোষণকারী ব্যক্তি নখ বা চুল কাটিয়ে নেয় এবং কুরবানী করে তবে তার কুরবানী হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি গুণাহগার হবেন (ইবেন উছায়মীন, আশ-শারহুল মুমতে আলা যাদিল মুনক্বতানি ৩/৪৩০)।
(২৬) কুরবানী যবাইকারীর এবং শরীকদের সবাইকে ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন হতে হবে।
(২৭) যদি কারো পক্ষ হতে কুরবানী করা হয় তবে যবাই করার সময় তার নাম নিতে গিয়ে এটি বলতে হবে যে, এই কুরবানী অমুকের পক্ষ হতে করা হচ্ছে।
(২৮) অগ্রগণ্য মতানুসারে কুরবানী করার দিন হল তিনদিন। দেখুন : আল-হাদীছ (৪৪ পৃ. ১১)।
শেষে কুরবানী করা সম্পর্কে ইমাম ইবনুল মুনযির নিশাপুরীর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-ইজমা' হতে ইজমাকৃত মাসআলাগুলি পেশ করা হল-
‘(২১৭) ইজমা রয়েছে যে, কুরবানীর দিন সূর্য উদয়ের পূর্বে কুরবানী করা জায়েয নেই।
(২১৮) ইজমা আছে যে, কুরবানীর গোশত মুসলমান ফক্বীরদেরকে খাওয়ানো বৈধ।
(২১৯) ইজমা আছে যে, যদি জায়েয হাতিয়ার দ্বারা কুরবানী করে, বিসমিল্লাহ পড়ে, কন্ঠ এবং উভয় রগ কেটে দেয় ও রক্ত প্রবাহিত করে। তাহলে এমন কুরবানীকৃত পশু খাওয়া বৈধ।
(২৩০) ইজমা আছে যে, বোবা ব্যক্তির যবাই করার বৈধতা আছে।
(২৩১) ইজমা আছে যে, যবাইকৃত পশুর পেট হতে মৃতবাচ্চা বের হয়ে আসে তবে মায়ের যবাই করাই তার জন্য যথেষ্ট হবে। (অর্থাৎ বাচ্চাকে নতুন করে কুরবানী করতে হবে না-অনুবাদক)।
(২৩২) ইজমা আছে যে, নারীদের এবং শিশুদের যবাই করার বৈধতা আছে। যদি ছহীহ তরীকায় যবাই করতে সক্ষম হয়।
(২৩৩) ইজমা আছে যে, আহলে কিতাবের (ইহুদী-নাছারাদের) যবাই আমাদের জন্য হালাল যদি তারা ‘বিসমিল্লাহ’ বলে যবাই করে।
(২৩৪) ইজমা আছে যে, ‘দারুল হারব’-এর মধ্যে বসবাসকারীর (আহলে কিতাব) যবাইকৃত পশু খাওয়া হালাল।
(২৩৫) ইজমা আছে যে, মাজুসীদের (অগ্নিপূজকদের) যবাই করা পশু হারাম। (এটা) খাওয়া যাবে না।
(২৩৬) ইজমা আছে যে, আহলে কিতাবের নারীদের এবং শিশুদের যবাইকৃত পশু হালাল (বিসমিল্লাহ বলার শর্তে)।
(২৩৭) ইজমা আছে যে, কুকুর হল শিকারী জানোয়ার। যদি কোন মুসলমান তাকে শিকার করানো শিখায় এবং বিসমিল্লাহ বলার পর শিকার ধরতে (শিকারী কুকুরকে) ছেড়ে দেয় আর সেটি সেই ব্যক্তির জন্য শিকার ধরে আনে; তাহলে এমন শিকার খাওয়া জায়েয। তবে শর্ত হল, কাল রং-য়ের কুকুর হওয়া যাবে না (কিতাবুল ইজমা পৃ. ৫২, ৫৩, অনুবাদক: আবুল ক্বাসেম আব্দুল আযীম)।
📄 মৃতর পক্ষ হতে কুরবানী করা
প্রশ্ন : মৃত ব্যক্তির পক্ষ হতে কুরবানী করা জায়েয আছে? (একজন প্রশ্নকারী)।
জবাব : সুনানে আবী দাউদ (হা/২৭৯০) এবং জামে তিরমিযী (হা/১৪৯৫) গ্রন্থে 'শারীক বিন আব্দুল্লাহ আল-ক্বাযী আবুল হাসনা হতে, তিনি আল-হাকাম বিন হিনশ'-এর সনদে বর্ণিত আছে যে, আমি আলী রাযিআল্লাহু আনহুকে দেখেছি, তিনি দুটি ভেড়া কুরবানী করতেন। আমি বললাম, 'এটি কি? তখন তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ওছিয়ত করেছিলেন যে, আমি তার পক্ষ হতে কুরবানী করি। এই জন্য আমি তার পক্ষ হতে কুরবানী করছি'।
তাহকীক : এর সনদ যঈফ। 'শারীক আল-ক্বাযী' মুদাল্লিস ছিলেন। আর এই রেওয়ায়াতটি 'আন' দ্বারা বর্ণিত। 'আবুল হাসনা' মাজহুল রাবী (তাক্বরীবুত তাহযীব, জীবনী নং ৮০৫৩; আছারুস সুনান হা/৭৮৪)।
হাকেম এবং যাহাবী উভয়ই ভুল করেছেন। তারা একে আল হাসান বিন আল-হাকাম অনুধাবন করে হাদীছটিকে ছহীহ বলে দিয়েছেন। অথচ ইবনুল হাকাম অন্য রাবী ছিলেন। এবং উপরোল্লিখিত আবুল হাসনা অন্য রাবী।
হাকাম বিন উতায়বাহও মুদাল্লিস ছিলেন। আর (বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তে) তিনি আন দ্বারা বর্ণনা করছেন। ইমাম তিরমিযী এই বর্ণনাটিকে 'গরীব' লিখেছেন।
যখন এটি প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে যে, উপরোল্লিখিত হাদীছটি যঈফ তখন তো প্রতীয়মান হয়েছে যে, মৃতর পক্ষ হতে কুরবানী করার কোন দলীল নেই। এক্ষণে যদি কোন ব্যক্তি অবশ্যই অবশ্যই কুরবানী করতে চান তবে তার উচিৎ যে, একে ছদক্বা আখ্যা দিয়ে সমস্ত গোশত মিসকীন এবং ফক্বীরদের বন্টন করা। কেননা মৃতর পক্ষ হতে ছদক্বা করা জায়েয আছে। যার অসংখ্য দলীল রয়েছে। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।
[শাহাদাত, মার্চ ২০০১ ইং]
📄 প্রথম দিন কুরবানী করা উত্তম
প্রশ্ন : প্রথম দিন কুরবানী করা অধিক উত্তম এবং নেকীর কাজ নাকি তিনদিনেই কুরবানী করার একই নেকী রয়েছে? (যাফর ইকবাল, শুকুর গড়)।
জবাব : রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদুল আযহার দিন বলেছেন, আজ আমরা প্রথমে ছলাত পড়ব অতঃপর কুরবানী করব (বুখারী হা/৯৫১; মুসলিম হা/১৯৬১)।
এই হাদীছ দ্বারা এটি প্রমাণিত হয় যে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম দিন কুরবানী করেছেন। সেজন্য উত্তম এবং উৎকৃষ্ট এটাই যে, ঈদুল আযহার তিন দিনের মধ্য হতে প্রথম দিন অর্থাৎ দশ তারিখের দিনে কুরবানী করা। আর অবশিষ্ট দিনগুলিতে কুরবানী করা জায়েয এবং ছওয়াবের ওসীলা। সাইয়েদুনা আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহু বলেছেন, কুরবানীর দিনের পর দুদিন রয়েছে কুরবানীর জন্য। এবং উত্তম হল প্রথম দিনে কুরবানী করা।
[শাহাদাত, আগস্ট ২০০০ ইং]
📄 কুরবানীর দিন হল তিন দিন
প্রশ্ন: আমার মুহতারাম হাফেয ছাহেব, আল্লাহর কাছে দুআ রইল যে, আল্লাহ আপনাকে সুস্থতা এবং নিষ্কলুতার সাথে দীর্ঘ জীবন দান করুন। আর আল্লাহ আপনার পত্রিকা 'আল-হাদীছ'-কে শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি দান করুন। মুহতারাম শায়খ 'আল-হাদীছ' এর প্রতিটি সংখ্যা ইলম এবং তাহক্বীক্ব-এর সমাহার আর তাহক্বীক্বী প্রবন্ধসমূহের সমষ্টি হয়ে থাকে। মুহতারাম শায়েখ! আপনি আপনার পত্রিকার বাৎসরিক মূল্য ২০০ রুপি নির্ধারণ করেছেন। যদি একটি পত্রিকা আমি ২০০ রুপিতেও পাই তবুও আমি এটি নিতে প্রস্তুত। আল্লাহ আপনার মেহনত কবুল করুন (আমীন)। কিন্তু আফসোস! এত তাহক্বীক্বী পত্রিকা আমার আহলে হাদীছ ভাইগণ চিনেন না এবং তারা কুরআন-হাদীছ ভিত্তিক এই পত্রিকাটি সম্পর্কে অবগত নন। আহলে হাদীছ ভাইগণ ব্যতীত পাকিস্তানের সমগ্র আহলে হাদীছ আলেমদের কাছেও এই পত্রিকাটি পৌঁছেনি। স্রেফ কতিপয় আলেমদের কাছে এটি পৌঁছায়। আমি আপনাকে এবং সকল আহলে হাদীছ ভাইকে আবেদন করছি যে, এই পত্রিকাটিকে অধিকাংশ আহলে হাদীছ আলেমদের নিকটে পৌঁছিয়ে দিন। আর আহলে হাদীছ ছাত্রদেরকে, যারা মাদরাসায় অধ্যয়ন করেন তাদের ওখানেও এই পত্রিকাটি পৌঁছানো উচিৎ যেন তরুণ প্রজন্মের কাছে ইলম এবং তাহক্বীক্ব-এর ঢেউ বয়ে যায়। আর তারা এই পত্রিকাটিকে অধ্যয়ন করে তাহক্বীক্বের প্রতি আসেন ও তারা আসমাউর রিজালের ইলম অর্জন করেন এবং তারা আহলে হাদীছ মাসলাকের ব্যাপকভাবে খেদমত করতে সক্ষম হন।
মুহতারাম শায়েখ ছাহেব! আমার এই পত্র এবং আমার নিম্নোক্ত প্রশ্নটি মাসিক 'আল-হাদীছ' পত্রিকায় প্রকাশ করবেন। আপনার কাছে প্রশ্ন এই যে, চতুর্থ দিনে কুরবানী করা কুরআন ও হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত? আমি কতিপয় আলেম হতে শুনেছি যে, চতুর্থ দিনে কুরবানী করার যে হাদীছগুলি রয়েছে সেগুলি যঈফ। আর আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাযিআল্লাহু আনহু হতে ছহীহ সনদের সাথে প্রমাণিত আছে যে, তিনি বলেন, 'কুরবানীর মেয়াদ হল তিন দিন'।
এই প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক আহলে হাদীছ পত্রিকায় ফযীলাতুশ শায়েখ আব্দুস সাত্তার হাম্মাদ হাফিযাহুল্লাহ দলীলসমূহ দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে, কুরবানীর সময় হল চারদিন। তার দলীলসমূহ নিম্নরূপ-
ফযীলাতুশ শায়েখ লিখেছেন, 'ঈদের পর তিন দিন পর্যন্ত কুরবানী করা যেতে পারে। দশ-ই যিল হজের দিনে ঈদ হয়ে থাকে। এরপরের তিন দিনকে আইয়ামে তাশরীক্ব বলা হয়। আইয়ামে তাশরীক্বের দিনগুলিকে যবাই করার দিন বলা হয়েছে। যেমন হযরত জুবাইর বিন মুত্বইম রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা আছে যে, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আইয়ামে তাশরীক্বের সকল দিনগুলি হল যবাই করার দিন' (মুসনাদে আহমাদ ৪/৮২)। যদিও এই বর্ণনাটি সম্পর্কে বলা হয় যে, এটি মুনক্বাত্বি। কিন্তু ইমাম ইবনে হিব্বান এবং ইমাম বায়হাক্বী একে মওছুল হিসাবে বর্ণনা করেছেন। আর আল্লামা আলবানী রহিমাহুল্লাহ একে ছহীহ বলেছেন (ছহীহুল জামে আছ-ছগীর হা/৪৫৩৭)।
কতিপয় ফক্বীহ ঈদের স্রেফ দুদিন পর্যন্ত কুরবানী করার জন্য অনুমতি প্রদান করেছেন। তাদের দলীলগুলি নিম্নরূপ-
ঈদুল আযহার পর কুরবানী করার দিন দুদিন পর্যন্ত রয়েছে (বায়হাক্বী ৯/২৯৭)। কিন্তু এটি হযরত ইবনে ওমর রাযিআল্লাহু আনহু অথবা হযরত ওমর রাযিআল্লাহু আনহুর নিজস্ব উক্তি। এই জন্য রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের মারফু হাদীছের মোকাবেলায় একে পেশ করা যেতে পারে না। সুতরাং এই হাদীছটি দলীলযোগ্য নয়। আল্লামা শাওকানী এ সম্পর্কে পাঁচটি মাযহাব উল্লেখ করেছেন। অতঃপর নিজের ফায়ছালা এই ভাষায় লিখেছেন যে, সমস্ত আইয়ামে তাশরীক্ব হল যবাই করার দিন। আর সেটি নহরের দিনের পরের তিনদিন' (নায়লুল আওত্বার ৫/১২৫)।
প্রকাশ থাকে যে, প্রথমদিন কুরবানী করা সর্বাধিক ফযীলত সম্পন্ন। কেননা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপরই আমল করেছেন। সুতরাং কারণ ব্যতীত কুরবানী দেরীতে যেন না করা হয়। যদিও কতিপয় হযরতের ধারণা আছে যে, গরীব-মিসকিনদের উপকারার্থে দেরী করা উত্তম। কিন্তু এটি স্রেফ একটি ধারণা। যার পক্ষে কোন হাদীছ বর্ণিত নেই। উপরন্তু যদি কাউকে ১৩ই যিল হজে কুরবানী করতে হয় তবে সূর্য ডোবার আগে আগেই করতে হবে। কেননা সূর্য ডোবার পর আসন্ন দিন শুরু হয়ে যায় (সাপ্তাহিক আহলে হাদীছ খন্ড : ৩৮, ৭-১৩ রবীউছ ছানী ১৪২৮ হিজরী, এপ্রিল-মে ২০০৭ ইং)।
এটি ঐ দলীলসমূহ যেগুলি হাফেয আব্দুস সাত্তার হাম্মাদ হাফিযাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন।
মুহতারাম শায়েখ ছাহেব! উপরোক্ত দলীলগুলি এবং সেগুলি ব্যতীত কুরবানীর চারদিন সংক্রান্ত যত দলীল আছে সেগুলি বর্ণনা করে দিবেন। আর সেগুলির সনদের অবস্থা স্পষ্টভাবে তুলে ধরবেন। এবং কুরবানীর এই মাসআলা সম্পর্কে বিশুদ্ধতম তাহক্বীক্ব বর্ণনা করবেন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম পুরস্কার দান করুন (আমীন)।
এই প্রশ্নটি 'আল-হাদীছ' পত্রিকায় প্রকাশ করবেন। আর এর জবাব লিখে 'জবাব' (লেখা সম্বলিত) খামে ভরে পাঠিয়ে দিবেন।
(খুরম আরশাদ মাহমূদ, দওলত নগর, গুজরাট ২৯/৪/২০০৭ ইং)
জবাব:
বর্ণনা-১ : 'মুসনাদে আহমাদ' গ্রন্থের (হা/১৬৭৫২, ৪/৮২) বর্ণনাটি নিশ্চিৎরূপে মুনক্বাত্বি।
'সুলায়মান বিন মূসা' সাইয়েদুনা জুবায়ের বিন মুত্বইম রাযিআল্লাহুকে পান নি। ইমাম বায়হাক্বী এই বর্ণনা সম্পর্কে বলেছেন, 'এটি মুরসাল তথা বিচ্ছিন্ন' (বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা ৫/২৩৯, ৯/২৯৫)।
ইমাম তিরমিযীর প্রতি সম্বন্ধিত 'কিতাবুল ইলাল' গ্রন্থে ইমাম বুখারী হতে বর্ণনা আছে যে, তিনি বলেছেন, 'সুলায়মান নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন ছাহাবীকে পান নি' (আল-ইলালুল কাবীর ১/৩১৩)।
এর সমর্থন এর দ্বারাও হয়ে থাকে যে, কোন ছহীহ দলীল দ্বারা এটি প্রমাণিত নেই যে, সুলায়মান বিন মূসা সাইয়েদুনা জুবায়ের বিন মুত্বইমকে পেয়েছিলেন। আসন্ন বর্ণনাটিতেও (২ নং) এটাই প্রমাণিত হয় যে, সুলায়মান বিন মূসা সাইয়েদুনা জুবায়ের বিন মুত্বইম রাযিআল্লাহু আনহু হতে এই রেওয়ায়াতটি শ্রবণ করেন নি। দেখুন: নাছবুর রায়াহ (৩/৬১)।
বর্ণনা-২ : ছহীহ ইবনে হিব্বান (আল-ইহসান হা/৩৮৪৩, অন্য সংস্করণ হা/৩৮৫৪) গ্রন্থে এবং ইবনে আদীর আল-কামিল (৩/১১১৮) গ্রন্থে, বায়হাক্বীর আস-সুনানুল কুবরা গ্রন্থে (৯/২৯৫, ২৯৬), মুসনাদুল বাযযার (কাশফুল আসতার হা/১১২৬) ইত্যাদি গ্রন্থে 'সুলায়মান বিন মূসা আব্দুর রহমান বিন আবী হুসাইন হতে, তিনি জুবায়ের বিন মুত্বইম হতে' সনদে বর্ণিত আছে যে, 'এবং প্রতি আইয়ামে তাশরীক্বের দিনে যবাই করা যায়'।
এই রেওয়ায়াতটি দুটি কারণে যঈফ-
(১) হাফেয বায্যার বলেছেন, 'ইবনে আবী হুসাইন জুবায়ের বিন মুত্বইমকে পান নি' (আল-বাহুরুয যাখখার হা/৩৪৪৪; উপরন্তু দেখুন: নাছবুর রায়াহ ৩/৬১; আত-তামহীদ, নতুন নুসখা ১৫/২৮৩)।
(২) আব্দুর রহমান বিন আবী হুসাইন-এর তাওছীক্ব ইবনে হিব্বান (কিতাবুছ ছিক্বাত ৫/১০৯) ব্যতীত আর কারো হতে নেই। সুতরাং ইনি 'মাজহুলুল হাল'।
বর্ণনা-৩ : ত্বাবারানী (আল-মুজামুল কাবীর হা/১৫৮৩), বায্যার (আল-বাহরুয যাখখার হা/৩৪৪৩), বায়হাক্বী (আস-সুনানুল কুবরা ৫/২৩৯, ৯/২৯২) এবং দারাকুনী (আস-সুনান হা/৪৭১১) ইত্যাদি গ্রন্থে 'সুয়াইদ বিন আব্দুল আযীয সাঈদ বিন আব্দুল আযীয আত- তানুখী হতে, তিনি সুলায়মান বিন মূসা হতে, তিনি নাফে বিন জুবায়ের বিন মুত্বইম হতে, তিনি তার পিতা হতে' সনদে মারফু হিসাবে বর্ণনা করেছেন যে, 'আইয়ামে তাশরীক্ব-এর সকল দিনেই যবাই করা যায়'।
এই বর্ণনার বুনিয়াদী রাবী সুয়াইদ বিন আব্দুল আযীয যঈফ (তাক্বরীবুত তাহযীব ক্রমিক ২৬৯২)।
হাফেয হায়ছামী বলেছেন, 'আর তাকে জমহুর ইমামগণ যঈফ বলেছেন' (মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৩/১৪৭)।
বর্ণনা-৪: একটি রেওয়ায়াতে এসেছে যে, 'সুলায়মান বিন মূসা হতে, আমর বিন দীনার তাকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন জুবায়ের বিন মুত্বইম হতে যে, নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আইয়ামে তাশরীক্বের প্রতিটি দিনেই যবাই করার বিধান রয়েছে' (সুনানে দারাকুতনী হা/৪৭১৩; বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা ৯/২৯৬)।
এই রেওয়ায়াতটি দুটি কারণে প্রত্যাখ্যাত।-
(১) এর রাবী আহমাদ বিন ঈসা আল-খাশশাব অত্যন্ত সমালোচিত। দেখুন : লিসানুল মীযান (১/২৪০, ২৪১)।
(২) আমর বিন দীনারের সাথে জুবায়ের বিন মুত্বইম রাযিআল্লাহু আনহুর সাক্ষাৎ প্রমাণিত নেই। দেখুন : 'আল-মাওসূআতুল হাদীছিইয়া' (২৭/৩১৭)।
বিশেষ দ্রষ্টব্য : একটি বর্ণনার মধ্যে الْوَلِيدُ بْنُ مُسْلِمٍ، عَنْ حَفْصِ بْنِ غَيْلَانَ، عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ مُوسَى، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ، عَنْ جُبَيْرٍ بْنِ مُطْعِمٍ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «عَرَفَاتُ مَوْقِفٌ وَادْفَعُوا مِنْ عُرْنَةَ, وَالْمُزْدَلِفَةُ مَوْقِفٌ وَادْفَعُوا عَنْ مُحَسِّرٍ
'আল-ওয়ালীদ বিন মুসলিম হাফছ বিন গায়লান হতে, তিনি সুলায়মান বিন মূসা হতে, তিনি মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির হতে, তিনি জুবায়ের বিন মুত্বইম হতে'-এর সনদে এসেছে যে, আরাফাত হল অবস্থানস্থল ... (মুসনাদুশ শামিঈন হা/১৫৫৬; নাছবুর রায়াহ ৩/৬১ সংক্ষেপিত)।
এই রেওয়ায়াতটির সনদ ওয়ালীদ বিন মুসলিমের তাদলীসের কারণে যঈফ। আর এতে আইয়ামে তাশরীক্বের মধ্যে যবাই করারও উল্লেখ নেই।
তাহক্বীক্বের সারাংশ : আইয়ামে তাশরীক্বের দিনে যবাই সংক্রান্ত রেওয়ায়াতটি স্বীয় সকল সনদের সাথে যঈফ। সুতরাং একে ছহীহ বা হাসান আখ্যা দেয়া ভুল।
আছারে ছাহাবা : প্রশ্নকৃত বর্ণনাটির যঈফ হওয়ার পর আছারের ছাহাবার তাহক্বীক্ব নিম্নরূপ-
(১) সাইয়েদুনা আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাযিআল্লাহু আনহু বলেছেন, 'কুরবানীর দিনের পর আরো দুদিন রয়েছে কুরবানী করার জন্য' (মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালেক হা/১০৭১, সনদ ছহীহ; বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা ৯/২৯৭)।
(২) সাইয়েদুনা আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) বলেছেন, 'কুরবানীর দিনের পরে আরো দুদিন রয়েছে। আর নহরের দিনে (প্রথমদিনে) কুরবানী করা সর্বাধিক উত্তম' (ত্বাহাবী, আহকামুল কুরআন হা/১৫৭১, ২/২০৫, সনদ হাসান)।
(৩) সাইয়েদুনা আনাস বিন মালেক রাযিআল্লাহু আনহু বলেছেন, 'কুরবানীর জন্য দিন হল তিন দিন' (তাবাহী, আহকামুল কুরআন হা/১৫৭৬, হাদীছটি ছহীহ)।
(৪) সাইয়েদুনা আলী রাযিআল্লাহু আনহু বলেছেন, 'নহর তথা কুরবানী হচ্ছে তিনদিন' (তাহাবী, আহকামুল কুরআন হা/৫৬৯, এটা হাসান হাদীছ)।
সতর্কীকরণ : 'আহকামুল কুরআন' গ্রন্থে 'হাম্মাদ বিন সালামাহ বিন কুহাইল হতে, তিনি হাজ্জাতিহ হতে, তিনি আলী হতে' -রয়েছে। অথচ ছহীহ হল 'হাম্মাদ সালামা বিন কুহাইল হতে, তিনি হুজাইয়া হতে, তিনি আলী হতে' সনদটি। যেমনটি আসমাউর রিজালের গ্রন্থসমূহে প্রকাশিত আছে। আর হাম্মাদ দ্বারা উদ্দেশ্য হল হাম্মাদ বিন সালামাহ। আল-হামদুলিল্লাহ।
এর মোকাবেলায় কতিপয় আছার নিম্নরূপ-
(১) 'হাসান বছরী' বলেছেন, 'ঈদুল আযহার পরে তিনদিন রয়েছে কুরবানীর জন্য (ত্বাহাবী, আহকামুল কুরআন হা/১৫৭৭, ২/২০৬, এর সনদটি ছহীহ; বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা ৯/২৯, এর সনদ ছহীহ)।
(২) আত্বা (বিন আবী রাবাহ) বলেছেন, 'আইয়ামে তাশরীক্বের শেষ দিন পর্যন্ত (কুরবানীর সুযোগ রয়েছে)' (তাহাবী, আহকামুল কুরআন হা/১৫৭৮, সনদ হাসান; বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা ৯/২৯৬, সনদ হাসান)।
(৩) ওমর বিন আব্দুল আযীয বলেছেন, 'ঈদের দিন এবং এরপরের তিনদিন হল কুরবানীর (জন্য) (বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা ৯/২৮, সনদ হাসান)।
ইমাম শাফেঈ এবং সাধারণ আহলে হাদীছ আলেমদের এই ফৎওয়া রয়েছে যে, কুরবানী হল চার দিন। কতিপয় আলেম এই প্রসঙ্গে সাইয়েদুনা জুবায়ের বিন মুত্বইম রাযিআল্লাহু আনহুর প্রতি সম্বন্ধিত বর্ণনাটি দ্বারাও দলীল গ্রহণ করেন। কিন্তু এই সনদটি যঈফ। যেমনটি পূর্বোক্ত পৃষ্ঠাগুলিতে বিস্তারিতভাবে প্রমাণ করা হয়েছে।
(৪) সাইয়েদুনা আবূ উমামাহ বিন সাহল বিন হানীফ রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা আছে যে, 'মুসলমান স্বীয় কুরবানীর পশুসমূহ ক্রয় করতেন। অতঃপর সেগুলিকে (খাওয়ায়ে) মোটা করতেন। অতঃপর ঈদুল আযহার শেষ যুল হিজ্জাহ পর্যন্ত যবাই করতেন (বায়হাক্বী, আস- সুনানুল কুবরা ৯/২৯৭, সনদ ছহীহ)!!
এই সকল আছারগুলির মধ্যে সাইয়েদুনা আলী রাযিআল্লাহু আনহু ইত্যাদির প্রণিধানযোগ্য উক্তি হল যে, কুরবানী হল তিন দিন। অর্থাৎ ঈদুল আযহা এবং তারপরের দুদিন।
ইবনে হাযম 'ইবনে আবী শায়বাহ' হতে বর্ণনা করেছেন যে, আমাদেরকে যায়েদ বিন হুবাব সংবাদ প্রদান করেছেন মুআবিয়া বিন ছালেহ হতে। (তিনি বলেছেন) আমাকে আবূ মারইয়াম হাদীছ বর্ণনা করেছেন। (তিনি বলেছেন) আমি শুনেছি যে, আবূ হুরায়রাহ রাযিআল্লাহু আনহু বলেন, 'কুরবানী করার সময় হল তিন দিন' (আল-মুহাল্লা ৭/৩৭৭, মাসআলা নং ৯৮৩)।
এই বর্ণনাটির সনদ হাসান। কিন্তু মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ (মুদ্রিত) গ্রন্থে এই রেওয়ায়াতটি পাইনি। আল্লাহ্ই অধিক জ্ঞাত।
ফায়েদাহ : নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূচনাতে তিন দিন-এর অধিক গোশত রাখতে নিষেধ করেছিলেন। পরে এই হুকুমটি রহিত হয়ে গিয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞাটি এরই দলীল যে, কুরবানীর তিন দিন সংক্রান্ত উক্তিটিই অগ্রগণ্য। এই সকল তাহক্বীক্বের সারাংশ এই যে, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে স্পষ্টভাবে এই প্রসঙ্গে কিছুই প্রমাণিত নেই। আর আছারসমূহের মধ্যে ইখতিলাফ আছে। কিন্তু সাইয়েদুনা আলী রাযিআল্লাহু আনহু এবং জমহুর ছাহাবাদের বক্তব্য এই যে, কুরবানী তিন দিন যাবত করা যায় (ঈদুল আযহা এবং তারপরের দুদিন)। আমাদের তাহক্বীক্ব-এ এটাই প্রণিধানযোগ্য। আর ইমাম মালেক এবং অন্যরা একেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আল্লাহ্ই অধিক জ্ঞাত।
(২/৫/২০০৭ ইং; আল-হাদীছ: ৪৪)