📄 কুরবানীর পশুর শর্তসমূহ
কোন্ প্রকারের পশুকে কুরবানী করতে হবে এবং তার কি কি শর্তসমূহ আছে তা বিভিন্ন উক্তি এবং ক্রমিকের মধ্যে এর বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হল-
(১) স্রেফ মুসিন্নাহ অর্থাৎ দাঁতবিশিষ্ট পশুই কুরবানী করা জায়েয। আর যদি ‘সংকির্ণতার’ কারণে দাঁত বিশিষ্ট পশু পাওয়া সম্ভব না হয় তবে এক বছর বয়স্ক দুম্বা কুরবানী করা জায়েয (দেখুন: ছহীহ মুসলিম হা/১৯৬৩)।
‘সংকির্ণতা’ দ্বারা উদ্দেশ্য এই যে, হাট-বাজারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা এবং অনুসন্ধানের পরও দাঁতবিশিষ্ট পশু পেতে সক্ষম না হওয়া।
(২) হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, চার (প্রকারের) পশু কুরবানী করা জায়েয নেই- (১) স্পষ্ট কানা। (২) স্পষ্ট অসুস্থ। (৩) স্পষ্ট লেংড়া। (৪) আর খুবই দুর্বল পশু যা হাড্ডিসার (দেখুন: সুনানে আবী দাউদ হা/২৮০২, সনদ ছহীহ)।
(৩) সাইয়েদুনা আলী রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা আছে যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিং কাটা পশু কুরবানী করতে নিষেধ করেছেন।
ইমাম সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'এমন পশু যার অর্ধেক শিং বা ততোধিক ভেঙ্গে গিয়েছে' (সুনানে তিরমিযী হা/১৫০৪, তিনি বলেছেন, হাদীছটি হাসান ছহীহ)।
サイয়েদুনা আলী রাযিআল্লাহু আনহু থেকে আরেকটি বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে (কুরবানীর পশুর মধ্যে) চোখ এবং কান দেখার হুকুম দিয়েছেন (সুনানে তিরমিযী হা/১৫০৩, তিনি বলেছেন, হাসান ছহীহ)।
এর উপর ইজমা আছে যে, অন্ধ পশু কুরবানী করা জায়েয নেই (আল-মাজমূ শারহুল মুহায্যাব ৮/৪০৪)।
ইমাম খাত্তাবী রহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৩৮৮ হি.) বলেছেন, 'এই হাদীছের (যেটি ২ নং ক্রমিকে গত হয়েছে) মধ্যে এই দলীল আছে যে, কুরবানীর পশুর মাঝে থাকা সাধারণ ত্রুটি ক্ষমাযোগ্য' (মাআলিমুস সুনান ২/১৯৯)।
উবায়েদ বিন ফায়রূয (তাবেঈ) সাইয়েদুনা বারা বিন আযেব রাযিআল্লাহু আনহুকে (ছাহাবী) জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমি এমন পশুও অপছন্দ করি যার দাঁতের মধ্যে ত্রুটি থাকে। তিনি বললেন, যা তুমি অপছন্দ কর তা বর্জন কর এবং অন্যের জন্য সেটি হারাম করবে না' (সুনানে আবী দাউদ হা/২৮০৩, সনদ ছহীহ)।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: যদি কোন পশুর শিং-এর উপর ঘর্ষণ জনিত সাধারণ ত্রুটি হয়ে থাকে অথবা শিং-এর উপরের আবরণটি ভেঙ্গে যায় তাহলে ইমাম সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব রহিমাহুল্লাহ্র উপরোল্লিখিত বর্ণনার আলোকে অত্র পশুর কুরবানী করা জায়েয।
📄 কুরবানীর চামড়া
কুরবানীর চামড়া মিসকীন লোকদের মধ্যে বন্টন করে দিবেন। যেমনটি সাইয়েদুনা আলী রাযিআল্লাহু আনহুর হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত আছে (ছহীহ মুসলিম হা/ ১৩১৭)।
যবাইকারী অথবা কশাইকে কুরবানীর চামড়া হতে মজুরী প্রদান করা জায়েয নয়। অনুরূপভাবে মজুরী হিসাবে কুরবানীর গোশত প্রদান করাও জায়েয নেই। বরং হারাম।
📄 গোশত বন্টন
কুরবানীর সকল গোশত স্বয়ং ভক্ষণ করা বা সংরক্ষণ করা জায়েয। আর গোশতের তিনটি ভাগ করে একটি ভাগ নিজের জন্য, একটি গরীব-মিসকীন লোকদের জন্য এবং একটি আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের জন্য নির্ধারিত করাও জায়েয। বরং এটি উত্তম (দেখুন : সূরা হাজ্জ, আয়াত ২৮, ৩৬)।
📄 কুরবানীর অংশ ও শরীকানা
বকরী ও দুম্বা-ভেড়ার স্রেফ একটি ভাগ হয়ে থাকে। কিন্তু গাভী-ষাঁড়, উট-উটনীর মধ্যে সাতটি ভাগ ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। আর একটি হাসান রেওয়ায়াত দ্বারা উট-উটনীর মধ্যে দশ ভাগেরও প্রমাণ আছে (দলীলের জন্য দেখুন: ছহীহ মুসলিম হা/১৩১৮; সুনানে তিরমিযী হা/১৫০১, তিনি বলেছেন, 'হাসান গরীব')।
সতর্কীকরণ : স্রেফ ছহীহ আক্বীদা সম্পন্ন মুসলমানদের সাথে মিলে সাত অথবা দশ ভাগের মধ্যে শরীক হতে পারে। এবং বিদআতপন্থী, গোমরাহ, ভ্রষ্ট-ভ্রষ্টকারী লোকদের সাথে মিলে কখনোই কুরবানী করা উচিৎ নয়। আর না এমন গোমরাহ লোকদের কোন আমলের কোনরূপ মূল্য আছে। বরং এমন লোকদের সকল আমল 'বিক্ষিপ্ত ধুলার ন্যায়' হয়ে বাতাসে উড়িয়ে দেয়া হবে। ইনশাআল্লাহ।
বিবিধ মাসায়েল
শেষে কুরবানী সম্পর্কে কতিপয় ভিন্ন ভিন্ন মাসায়েল উক্তির আকারে পেশ করা হল-
(১) পশুকে যবাই করার সময় 'তাসমিয়া' (বিসমিল্লাহ) এবং 'তাকবীর' (আল্লাহু আকবার) বলা সুন্নাত দ্বারা প্রমাণিত (দেখুন : ছহীহ মুসলিম হা/১৯৬৬; ছহীহ বুখারী হা/৫৫৬৪)।
স্রেফ 'বিসমিল্লাহ' পড়াও প্রমাণিত আছে (দেখুন ছহীহ মুসলিম হা/১৯৬৭)।
(২) পুরো পরিবারের পক্ষ হতে একটি কুরবানী করাও যথেষ্ট (সুনানে তিরমিযী হা/১৫০৫, তিনি বলেছেন, 'হাদীছটি হাসান ছহীহ')। এবং পরিবারের অন্য সদস্যরাও কুরবানী করতে পারেন।
(৩) মৃতর পক্ষ হতে কুরবানী করা প্রমাণিত নেই। আর এই সম্পর্কে যে রেওয়ায়াতগুলি এসেছে সেগুলির সনদ শারীক ক্বাযী এবং হাকাম বিন উতায়বাহ- (নামী দুজন) মুদাল্লিস রাবীর 'আন' দ্বারা রেওয়ায়াত করার কারণে এবং আবুল হাসনার 'মাজহুল' হওয়ার কারণে যঈফ। কিন্তু মৃতর পক্ষ থেকে ছদক্বা করা জায়েয। সুতরাং যদি কোন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বা কোন মৃতর পক্ষ হতে কুরবানী করেন তবে সেটির সম্পূর্ণ গোশত ও চামড়া ইত্যাদি ছদক্বা করে দিবেন।
(৪) কুরবানীর পশু পূর্বেই কিনে নিয়ে খাইয়ে-দাইয়ে মোটা করা জায়েয (দেখুন: তাগলীকুল তালীকু ৫/৬, সনদ ছহীহ)।
(৫) ঈদগাহের মধ্যে পশুর কুরবানী করা জায়েয। আর ঈদগাহ-এর বাইরে যেমন নিজের ঘরে বা ঘরের বাইরে ইত্যাদিতে কুরবানী করাও জায়েয (দেখুন: ছহীহ বুখারী হা/৫৫৫১, ৫৫৫২)।
(৬) নিজেই কুরবানীর পশুকে যবাই করা সুন্নাত। এবং অন্যকে দিয়ে যবাই করিয়ে নেয়াও জায়েয (দেখুন: মুওয়াত্তা ইমাম মালেক, ইবনুল কাসেমের বর্ণনা, আমার তাহক্বীক্বকৃত হা/১৪৫)।
(৭) যদি মাসনূন বা নফল কুরবানীর পশু হারিয়ে যায় তবে জানোয়ারের মালিকের মর্জি থাকবে যে, অন্য (কোন) পশুকে কুরবানী করবে অথবা কুরবানী করবে না (দেখুন: আস-সুনানুল কুবরা ৯/২৮৯, এর সনদ ছহীহ)।
(৮) সাইয়েদুনা আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রাযিআল্লাহু আনহু কুরবানীর পশুর মধ্যে একটি একচোখা উটনী দেখলেন। তখন তিনি বললেন, 'যদি এটি ক্রয়ের পর একচোখা হয়ে যায় তবে একে কুরবানী করে ফেল। আর যদি কেনার পূর্বেই এটি একচোখা ছিল তবে একে বদলিয়ে অন্য উটনীকে কুরবানী কর' (বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা ৯/২৮৯, এর সনদ ছহীহ)।
প্রমাণিত হল যে, যদি কুরবানীর জানোয়ার কেনা হয়ে থাকে এবং এর পর তার মধ্যে কোন ত্রুটি প্রকাশিত হয় তবে এমন পশু কুরবানী করা জায়েয।
(৯) যদি কুরবানীর ইচ্ছা পোষণকারী কোন ব্যক্তি নখ বা চুল কাটায় এবং এরপর কুরবানী করে তবে তার কুরবানী হয়ে যাবে। কিন্তু এই ব্যক্তি গুণাহগার হবে (আশ-শারহুল মুমতে ৩/৪৩০)।
(১০) যদি অন্য কারো পক্ষ হতে কুরবানী করা হয় তবে যবাই করার সময় ঐ ব্যক্তির নাম নিয়ে এটি বলা উচিৎ যে, ‘এই কুরবানীটি তার পক্ষ হতে করা হচ্ছে’।
সতর্কীকরণ : এই প্রসঙ্গে বিশদ জানতে পড়ুন আমার গ্রন্থ ‘তাহক্বীক্বী মাক্বালাত’ (২/২১ল-২১৯)।
(১১) খাসীকৃত পশুর কুরবানী করা জায়েয। এবং এর নাজায়েয হওয়ার কোন ছহীহ দলীল নেই।
(১২) যদি কোন মানুষকে আল্লাহ ধন-সম্পদ প্রদান করেন তবে তিনি কয়েকটি কুরবানী করতে পারেন। আর প্রকাশ থাকে যে, তার অত্র আমল দ্বারা গরীব-মিসকীন এবং সাধারণ মুসলমানদের উপকার হবে।
(১৩) গাভী-এর গোশত খাওয়া একেবারেই হালাল। আর কোন প্রকারের অসুখের আশঙ্কা নেই তবে এই যে, কোন ব্যক্তি স্বয়ং অসুস্থ হয়। যেই রেওয়ায়াতের মধ্যে এসেছে যে, গাভীর গোশতের মধ্যে অসুখ থাকে, সেই রেওয়ায়াতটি যঈফ। এবং তাকে ছহীহ আখ্যা দেয়া ভুল।
(১৪) উটের গোশত খাওয়ার দ্বারা ওযূ ভেঙ্গে যায়। যেমনটি ছহীহ মুসলিমের হাদীছ (হা/৩৬০, দারুস সালাম হা/৮০২) দ্বারা প্রমাণিত আছে। আর অন্য গোশত যেমন গাভী, বকরী ও ভেড়ার গোশত খাওয়ার দ্বারা ওযু ভাঙ্গে না।
(১৫) কুরবানীর আসল উদ্দেশ্য এই যে, তাক্বওয়া অর্জন হোক। সেজন্য প্রতিটি সময় আল্লাহকে ভয় করা উচিৎ (সূরা হজ্জ ৩৭)।
(১৬) কুরবানীর জানোয়ার (যেমন গাভী) এর মধ্যে আকীকাকে শামিল করা জায়েয নেই। আর স্মর্তব্য যে, আকীকার মধ্যে স্রেফ বকরা- বকরী, ভেড়া-দুম্বাই যবাই করা প্রমাণিত আছে। পুত্র'র পক্ষ হতে দুটি এবং মেয়ের পক্ষ হতে একটি। আকীকা আলাদাভাবে করতে হবে এবং কুরবানী আলাদাভাবে করতে হবে。
মিথ্যা বলা, গীবত করা, পরনিন্দা করা, আর প্রত্যেক প্রকারের কবীরা গুনাহসমূহ হতে আপনি নিজেকে সর্বদা বাঁচিয়ে রাখুন। আর দুআ করুন যেন আল্লাহ তাআলা আপনার এবং আমাদের আমলসমূহ স্বীয় দরবারে গ্রহণ করে নেন। আমীন।
অমা আলাইনা ইল্লাল বালাগ
জামেআতুল ইমাম বুখারী
স্থান: সারগোধা (৮/১০/২০১১ইং)।