📄 কুরবানীর পারিভাষিক অর্থ
ঈদুল আযহার ছলাতের পর প্রথম দিন অথবা কুরবানীর দিনগুলিতে গৃহপালিত জন্তুর (যেমন বকরী, ভেড়া, গাভী, উট) মধ্য হতে কোন পশুকে শারঈ পন্থায় উৎসর্গ এবং নৈকট্য অর্জন করার লক্ষে যবাই করাকে কুরবানী বলা হয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: শহর হোক বা গ্রাম হোক, ঈদের ছলাতের পূর্বে কুরবানী করা জায়েয নেই।
📄 কুরবানীদাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শর্তসমূহ
(১) কুরবানী দাতাকে ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন মুসলিম, কিতাব ও সুন্নাতের আনুগত্যকারী হওয়া, শিরক ও কুফর, বিদআতসমূহ হতে পাক হওয়া যরূরী। আর যার আক্বীদা নষ্ট, তার কোন আমল কবুলযোগ্য নয়। কুরআন, হাদীছ ও ইজমার প্রতি পর্যবেক্ষণ করতঃ প্রতিটি মুহুর্তে স্বীয় ঈমান ও আমলের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।
(২) রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যখন তোমরা যুল হজ্জ মাসের চাঁদ দেখ এবং তোমাদের মধ্য হতে কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা কর; তখন তাকে স্বীয় চুল, নখ কাটা হতে বিরত থাকতে হবে' (ছহীহ মুসলিম হা/১৯৭৭)।
এই হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, কুরবানী দাতাকে যুল হজ্জের শুরু হতে কুরবানী করা পর্যন্ত নিজের চুল কাটানো উচিৎ না। আর নখ কাটাও উচিৎ নয়।
যদি কারো নখ ভেঙ্গে যায় অথবা এমন খারাপ হয়ে যায় যে, নখ তুলে ফেলা/কাটা যরূরী হয়ে পড়ে; তাহলে এমন করা জায়েয। যেমনটি ইজমা দ্বারা প্রমাণিত আছে।
(৩) একটি হাদীছে এসেছে যে, এক ব্যক্তি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করল, যদি আমি স্রেফ মাদী (দুধ দেয় এমন পশু) কুরবানী করার জন্য পাই তাহলে আমি কি সেটি কুরবানী করব?
তিনি বললেন, 'না। কিন্তু তুমি নখ, চুল কেটে ফেলবে, গোঁফ ছাঁটবে এবং লজ্জাস্থানের চুল মুন্ডিয়ে ফেলবে। তাহলে আল্লাহ্র কাছে এটি সম্পূর্ণ কুরবানী হিসাবে গণ্য হয়ে যাবে' (সুনানে আবী দাউদ হা/২৭৮৯, সনদ হাসান)।
এই হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয়, যে ব্যক্তি কুরবানীর ক্ষমতা রাখে না, সে যদি প্রথম যুল হজ হতে শুরু করে ঈদের ছলাত পর্যন্ত চুল না কাটে এবং নখ না কাটে তবে সে কুরবানীর পুরো নেকী পাবে। সুবহানাল্লাহ।
📄 কুরবানীর উদ্দেশ্য
কুরবানীর উদ্দেশ্য হল আল্লাহ তাআলাকে রাযী করা এবং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুত-পবিত্র বরকতময় সুন্নাতের উপর একনিষ্ঠ নিয়াত দ্বারা আমল করা। আর এর অনেক বড় ছওয়াব মিলবে ইনশাআল্লাহ।
📄 কুরবানীর পশুর শর্তসমূহ
কোন্ প্রকারের পশুকে কুরবানী করতে হবে এবং তার কি কি শর্তসমূহ আছে তা বিভিন্ন উক্তি এবং ক্রমিকের মধ্যে এর বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হল-
(১) স্রেফ মুসিন্নাহ অর্থাৎ দাঁতবিশিষ্ট পশুই কুরবানী করা জায়েয। আর যদি ‘সংকির্ণতার’ কারণে দাঁত বিশিষ্ট পশু পাওয়া সম্ভব না হয় তবে এক বছর বয়স্ক দুম্বা কুরবানী করা জায়েয (দেখুন: ছহীহ মুসলিম হা/১৯৬৩)।
‘সংকির্ণতা’ দ্বারা উদ্দেশ্য এই যে, হাট-বাজারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা এবং অনুসন্ধানের পরও দাঁতবিশিষ্ট পশু পেতে সক্ষম না হওয়া।
(২) হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, চার (প্রকারের) পশু কুরবানী করা জায়েয নেই- (১) স্পষ্ট কানা। (২) স্পষ্ট অসুস্থ। (৩) স্পষ্ট লেংড়া। (৪) আর খুবই দুর্বল পশু যা হাড্ডিসার (দেখুন: সুনানে আবী দাউদ হা/২৮০২, সনদ ছহীহ)।
(৩) সাইয়েদুনা আলী রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা আছে যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিং কাটা পশু কুরবানী করতে নিষেধ করেছেন।
ইমাম সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'এমন পশু যার অর্ধেক শিং বা ততোধিক ভেঙ্গে গিয়েছে' (সুনানে তিরমিযী হা/১৫০৪, তিনি বলেছেন, হাদীছটি হাসান ছহীহ)।
サイয়েদুনা আলী রাযিআল্লাহু আনহু থেকে আরেকটি বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে (কুরবানীর পশুর মধ্যে) চোখ এবং কান দেখার হুকুম দিয়েছেন (সুনানে তিরমিযী হা/১৫০৩, তিনি বলেছেন, হাসান ছহীহ)।
এর উপর ইজমা আছে যে, অন্ধ পশু কুরবানী করা জায়েয নেই (আল-মাজমূ শারহুল মুহায্যাব ৮/৪০৪)।
ইমাম খাত্তাবী রহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৩৮৮ হি.) বলেছেন, 'এই হাদীছের (যেটি ২ নং ক্রমিকে গত হয়েছে) মধ্যে এই দলীল আছে যে, কুরবানীর পশুর মাঝে থাকা সাধারণ ত্রুটি ক্ষমাযোগ্য' (মাআলিমুস সুনান ২/১৯৯)।
উবায়েদ বিন ফায়রূয (তাবেঈ) সাইয়েদুনা বারা বিন আযেব রাযিআল্লাহু আনহুকে (ছাহাবী) জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমি এমন পশুও অপছন্দ করি যার দাঁতের মধ্যে ত্রুটি থাকে। তিনি বললেন, যা তুমি অপছন্দ কর তা বর্জন কর এবং অন্যের জন্য সেটি হারাম করবে না' (সুনানে আবী দাউদ হা/২৮০৩, সনদ ছহীহ)।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: যদি কোন পশুর শিং-এর উপর ঘর্ষণ জনিত সাধারণ ত্রুটি হয়ে থাকে অথবা শিং-এর উপরের আবরণটি ভেঙ্গে যায় তাহলে ইমাম সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব রহিমাহুল্লাহ্র উপরোল্লিখিত বর্ণনার আলোকে অত্র পশুর কুরবানী করা জায়েয।