📘 কুফর ও তাকফির > 📄 গুরারা

📄 গুরারা


রাসুল বলেন,
بَدَأَ الْإِسْلَامُ غَرِيبًا، وَسَيَعُودُ كَمَا بَدَأَ غَرِيبًا، فَطُوبَى لِلْغُرَبَاءِ
ইসলাম শুরু হয়েছে অপরিচিতরূপে। শীঘ্রই ইসলাম সে অবস্থায় ফিরে যাবে, যেভাবে তার সূচনা হয়েছিল। সুতরাং সুসংবাদ 'গুরাবা' (অপরিচিত)-দের জন্য।
এ হাদিসে রাসুল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর যুগের কিছুকাল পরেই হকপন্থিরা সমাজে অপরিচিত, মুসাফির, আগন্তুক ও ভিনদেশিদের মতো হয়ে যাবে। যে ব্যক্তি তার আকিদা ও জিহাদের জন্য প্রাণের ভয়ে ভীত হয়ে প্রতিটা মুহূর্ত অতিবাহিত করে, নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকে; সে জানে না একটি দিন নিরাপদে পার করতে পারবে কি না। জানে না তার অনুপস্থিতিতে তার পরিবারের দুর্বল সদস্যদের ওপর নির্যাতনের খড়গ নেমে আসবে কি না। এমনকি কখনো কখনো নিজ পরিবারেও সে নিরাপত্তাহীন থাকে। পরিবারের সদস্যরা তার অস্তিত্বকেই ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে, যার কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে তারা তাকে নির্যাতন করতে থাকে। এই যুগে তারচেয়ে বড় 'গারিব' আর কে আছে!
অপরদিকে রয়েছে সে-সকল মুসলিম, যারা কুফফার, মুশরিক ও তাগুতগোষ্ঠীর অপরাধের ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করে; বরং তারা এ-ও বলে, এই তাগুতগোষ্ঠীই তাদের শাসক, তাদের আমির, যাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হারাম।
যারা জীবনে একটা দিনও আল্লাহর পথে জিহাদে ব্যয় করেনি, কারাবরণের স্বাদ একমুহূর্তের জন্যও আস্বাদন করেনি; আর না কখনো পীড়িত বা নিগৃহীত হয়েছে, অথবা পরিবারের সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত থেকেছে। তারা নির্ভয়ে-নির্বিঘ্নে বুক ফুলিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে, নগরে-মফস্বলে বিচরণ করে বেড়ায়। কোনো ধরনের আর্থিক ক্ষতির শিকার তো তাদের হতেই হয় না, উলটো কুফরি তন্ত্রমন্ত্রের ধ্বজাধারীদের প্রদত্ত আর্থিক উপহারের মধ্য দিয়ে তাদের দিন ভালোই অতিবাহিত হয়। উপরন্তু তাদের অনেকে তাগুতের মঞ্চে পুষ্পমাল্যে বরিত হয়। তাদের থেকে আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে উপকৃত হয়। এদের ব্যাপারে কি হাদিসে বর্ণিত 'গারিব' শব্দ প্রয়োগ করা সংগত? ইহজগৎ মুমিনদের জন্য কারাগার আর কাফিরদের জন্য স্বর্গ, এ হাদিস কি এ সকল আপসকামী মুমিনের ব্যাপারে প্রযোজ্য, নাকি সিদ্দিকি ও ফারুকি চেতনায় উদ্বুদ্ধ আপসহীন মুমিনদের ব্যাপারে প্রযোজ্য? আল্লাহ বলেন,
﴿أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ﴾
মানুষ কি ভেবে নিয়েছে, তারা ইমান আনার কথা বললে পরীক্ষা না করে তাদের এমনিতেই ছেড়ে দেওয়া হবে! [সুরা আনকাবুত (২৯) : ০২]
বস্তুত আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রসমূহও কুফফার, মুশরিক ও তাগুতদের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণাধীন। যখন আল্লাহর শরিয়তকে অকার্যকর করে পৃথিবীকে মানবরচিত আইনকানুন দ্বারা পরিচালনা করা হচ্ছে। এ সবকিছু দেখে যারা প্রতিবাদ করবে বা অন্তত এগুলো প্রত্যাখ্যান করবে, অনিবার্যভাবেই গুরাবার সারিতে তাদের চলে যেতে হবে। আর যারা সব ক্ষেত্রে মান্যতা ও আনুগত্য প্রদর্শন করবে বা নীরবতাকেই নিজেদের মানহাজ বানাবে, ইহকালে নিরাপত্তা পেলেও পরকালে তাদের চেয়ে হতভাগা আর কেউ হবে না। কারণ, এই জামানায় ইমান রক্ষাকারীদের দৃষ্টান্ত হলো হাতে জ্বলন্ত কয়লা ধারণকারীদের মতো, যেমনটা রাসুল ﷺ তাঁর সময়েই বলে গেছেন। আল্লাহ বলেন,
﴿وَلَنْ تَرْضَى عَنْكَ الْيَهُودُ وَلَا النَّصْرَى حَتَّى تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ﴾
ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টানরা কিছুতেই তোমার ওপর সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ-না তুমি তাদের আদর্শের অনুসরণ করো। [সুরা বাকারা (২): ১২০]
সাধারণ নামাজি, দাতা, রোজাদার ও হাজি মুসলিমদের খুব কমই এই পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। ইমান রক্ষার জন্য সাধারণভাবে তাদের হাতে না কখনো জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড ধারণ করার অবস্থা হয়; আর না তাদের জন্য গোটা পৃথিবী জ্বলন্ত নরক ও কারাগারে পরিণত হয়।

টিকাঃ
৩৬৪ সহিহ মুসলিম: ১৪৫।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 মিল্লাতে ইবরাহিমের অনুসারী

📄 মিল্লাতে ইবরাহিমের অনুসারী


আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ يَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ إِبْرَهِمَ إِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهُ
মিল্লাতে ইবরাহিম থেকে কেবল ওই ব্যক্তিই বিমুখ হতে পারে, যে নিজেকে নির্বোধ সাব্যস্ত করেছে। [সুরা বাকারা (০২) : ১৩০]
সুতরাং মুমিন সর্বাবস্থায় মিল্লাতে ইবরাহিমের অনুসরণ করবে। সে মিল্লাতে ইবরাহিমের মোকাবিলায় নিজের অপরিণত বোধকে দাঁড় করাবে না। কখনো যদি তার যুক্তির সঙ্গে মিল্লাতে ইবরাহিমের দাবির সংঘর্ষ হয়, তাহলে সে নিজের যুক্তি ছুঁড়ে ফেলে এবং মিল্লাতে ইবরাহিমের সামনে নিজেকে আনুগত্যপরায়ণ বান্দার মতো সঁপে দেয়। আল্লাহ বলেন,
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَءُوا مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ
তোমাদের জন্য ইবরাহিম ও তার সঙ্গীদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ-যখন তারা নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের বলল, তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যা কিছুর উপাসনা করো, তার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের অস্বীকার করলাম। আমাদের মধ্যে এবং তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রকাশিত হলো, যতক্ষণ-না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ইমান আনবে। [সুরা মুমতাহিনা (৬০) : ০৪]
ইবরাহিম আ. নিজের দুর্বলতা ও একাকিত্বের সময়ই তাগুত ও তাগুত-পূজারিদের সঙ্গে স্পষ্ট সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিয়েছেন।
এ ক্ষেত্রেও উপাস্যের পূর্বে উপাসকের সম্পর্ক ছিন্নের সঙ্গে ঘোষণা দিয়েছেন। কারণ, অনেক সময় এমন হয়, মানুষ বাতিল উপাস্যের উপাসনার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ঠিকই; কিন্তু বিভিন্ন স্বার্থের কথা চিন্তা করে তার উপাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সাহস করে না।
এমন ব্যক্তি মিল্লাতে ইবরাহিম বাস্তবায়ন করতে পারেনি। উপরন্তু তিনি শুধু সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্তি দেননি; বরং সঙ্গে এ-ও বৃদ্ধি করেছেন— 'আমরা তোমাদের অস্বীকার করলাম,' যাতে করে আল্লাহর বন্ধু এবং তাগুতের দোসরদের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এরপর বলেছেন, 'আমাদের মধ্যে এবং তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রকাশিত হলো।'
এ ক্ষেত্রে তিনি বিদ্বেষের ওপর শত্রুতার প্রসঙ্গকে অগ্রবর্তী করেছেন। কারণ, শত্রুতা থাকে প্রকাশ্যে আর বিদ্বেষ থাকে অন্তরে সুপ্ত। অনেকে ভেতরে বিদ্বেষ লালন করলেও শত্রুতা প্রকাশের সাহস করে না। এটা কখনোই মিল্লাতে ইবরাহিমের সঙ্গে সমঞ্জস নয়। তাগুত ও তার উপাসকদের প্রতি এই শত্রুতা অব্যাহত থাকবে, যতক্ষণ-না তারা এক আল্লাহর প্রতি ইমান আনয়ন করে।

টিকাঃ
*** মিল্লাতে ইবরাহিম সম্পর্কে জানতে পড়ুন আমার অনূদিত- মিল্লাতে ইবরাহিমের জাগরণ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00