📘 কুফর ও তাকফির > 📄 সাহাবাগ্রাহ্য জামাআত

📄 সাহাবাগ্রাহ্য জামাআত


রাসুল বলেছেন,
لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ، لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ، حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَذَلِكَ
আমার উম্মাহর একটি দল সর্বদা হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যারা তাদের অসহযোগিতা করবে, তারা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না; যতক্ষণ-না আল্লাহর আদেশ আসে এবং তারা সেই অবস্থায় থাকে।
পাঠক, আপনিই বলুন এই হাদিসটি নিচের দু-দলের কোন দলের ওপর প্রযোজ্য হয়:
১. এক দল কুফরের ধ্বজাধারী ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান, মুশরিক ও মুরতাদদের মুখোমুখি হয়েছে। তাদের থেকে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছে। নিজেদের ও তাদের মধ্যে ফায়সালার জন্য আল্লাহর নাজিলকৃত 'হাদিদ' (লোহা) ব্যবহার করেছে। এরপর কখনো রক্তের নজরানা পেশ করেছে আর কখনো-বা রক্তের বদলা নিয়েছে। তারা যখন কুফফার কর্তৃক মসজিদ ধ্বংস হতে দেখেছে, কুরআন অবমাননার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে, মুসলিম নারীদের সম্ভ্রমহানির কথা জেনেছে এবং ইসলামকে নত হতে ও কুফরকে সমুন্নত হতে দেখেছে, সর্বোপরি পৃথিবীর মানচিত্রকে মুসলিমদের বুকের তপ্ত খুনে সিক্ত হয়ে উঠতে দেখেছে, তখন দৃঢ় প্রত্যয়ে জিহাদের ঘোষণা দিয়ে ময়দানে নেমে পড়েছে এবং কুরআনের আয়াত ও রাসুলের ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর বিশ্বাসকে কার্যে পরিণত করেছে।
২. আরেক দলের দৃষ্টিতে এতকিছুর পরেও অদ্যাবধি জিহাদ ফরজই হয়নি। তারা বর্তমানে সংঘটিত সব লড়াইকে ফিতনার লড়াই হিসেবে বিবেচনা করে। তারা ঘরে বসে থেকে, নিজেদের জীবন, পরিবার ও কর্মক্ষেত্র নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে মুজাহিদদের সর্বপ্রকার সহযোগিতা পরিহার করেছে। মুজাহিদদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিয়েছে। কথা দ্বারা তাদের কষ্ট দিয়েছে।
কখনো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তাদের অস্তিত্ব ঝুঁকিপূর্ণ মনে করলে তাদের পেছনে তাগুতের কুকুর লেলিয়ে দিয়েছে। সব সময় মুজাহিদদের দোষত্রুটি অনুসন্ধানে ব্যতিব্যস্ত থেকেছে। কালেভদ্রে কখনো কিছু পেয়ে গেলে ডাকঢোল পিটিয়ে সেটা প্রচার করেছে। তারা মুজাহিদদের কোনো গুণ ও সাফল্য স্বীকারের উদারতাটুকুও প্রদর্শন করেনি।
এবার আপনিই বিচার করুন, সাহায্যপ্রাপ্ত জামাআত-বিরোধিতাকারীদের বিরোধিতা ও অসহযোগিতাকারীদের অসহযোগিতা যাদের কোনো ক্ষতি করে না-উপরিউক্ত দুই দলের মধ্যে কোন দল? শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহ. তাঁর সময়ে এর ব্যাখ্যা করেছিলেন, শামে জিহাদরত জামাআতই হাদিসে বর্ণিত সাহায্যপ্রাপ্ত জামাআত। শুধু ইবনু তাইমিয়া রাহ.-ই নন; বরং তাঁর অনেক পূর্বে সাহাবি আমিরুল মুমিনিন মুআবিয়া রা.-ও একই কথা বলে গেছেন।
এই যুগেও গোটা দুনিয়া মুজাহিদদের বিপক্ষে যূথবদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও আলহামদুলিল্লাহ কেউ-ই তাঁদের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। জ্ঞানের কেন্দ্র থেকে মুজাহিদদের প্রকাশ্য বিরোধিতা করা হয়েছে। যদিও ভক্তরা এটাকে প্রমাণহীনভাবে রাজনৈতিক কৌশল বলে চালানোর অপপ্রয়াস পেয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক কৌশলও কেন যে কখনো মুজাহিদদের পক্ষে না গিয়ে সর্বদা তাদের বিপক্ষে যায়, এর যথার্থ সমাধান অদ্যাবধি পাওয়া যায়নি। শুধু কাফির-মুশরিকরা নয়; মাদরাসা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাঁচানোর তাগিদে, মসজিদের ইমাম ও খতিবগণ কমিটির চোখ রাঙানির ভয়ে বা চাকরি হারানোর শঙ্কায়, পির ও তাবলিগিরা দৃষ্টিভঙ্গিগত ভিন্নতার কারণে এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা প্রতিপক্ষ মনে করার সূত্র ধরে আজন্ম মুজাহিদদের বিরোধিতা করে এসেছে। হ্যাঁ, নির্দিষ্ট শ্রেণির সবাই যে এমন নয়, এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এসব শ্রেণির অধিকাংশ মানুষকে সাধারণত সেই ভূমিকায়ই দেখা যায়। এর পরও এতকাল যে তাঁরা টিকে আছে, সবার অসহযোগিতা সত্ত্বেও তাঁদের সাফল্যধারা ক্রমে সামনে এগোচ্ছে, এমনকি তাঁরা কোথাও কোথাও বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে, এটা আল্লাহর প্রত্যক্ষ মদদ ছাড়া কীভাবে সম্ভব? কারণ, একমাত্র আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আর কী-ই-বা পাথেয় তাঁদের আছে? যে দেশে লক্ষাধিক নারী ও পুরুষ আলিমের স্বাক্ষরে জিহাদবিরোধী ফাতওয়া প্রকাশিত হয়, সে দেশে এক আল্লাহ ছাড়া মুজাহিদদের পাশে সহযোগী হিসেবে আর কাকে দেখার প্রত্যাশা করা যায়?
যারা মুজাহিদদের অসহযোগিতা বা বিরোধিতা করে, মুজাহিদদের মানহাজকে ভুল বলে আখ্যা দেয়, তাদের থেকে যে বিষয়টা জানা প্রয়োজন-তাদের দৃষ্টিকোণ মোতাবেক সঠিক মানহাজ অনুসারে বর্তমানে কোথায় জিহাদ হচ্ছে? নাকি জিহাদ বর্জন করাই তাদের একমাত্র মানহাজ? যদি তা-ই হয়, তাহলে রাসুল ﷺ যে কিয়ামত পর্যন্ত জিহাদ জারি থাকার সংবাদ শুনিয়ে গেলেন, তার ব্যাপারে কী বলা হবে? এই সংবাদ কি রহিত, নাকি এই যুগে তা অকার্যকর?
এসব সাধারণ যুক্তি ছাড়াও উপরিউক্ত হাদিস যে মুজাহিদদের ওপর প্রযোজ্য, এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো- সহিহ মুসলিমে স্পষ্টভাবে এসেছে,
لَا تَزَالُ عِصَابَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى أَمْرِ اللَّهِ، قَاهِرِينَ لِعَدُوِّهِمْ، لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَالَفَهُمْ، حَتَّى تَأْتِيَهُمُ السَّاعَةُ وَهُمْ عَلَى ذَلِكَ
আমার উম্মাহর একটি দল অব্যাহতভাবে আল্লাহর দীনের ওপর যুদ্ধ করবে, তারা তাদের শত্রুকে পরাস্ত করবে। যারা তাদের বিরোধিতা করবে, তারা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না; যতক্ষণ-না তাদের কাছে কিয়ামত আসে এবং তারা সেই অবস্থায় থাকে।
এবার ফায়সালা করা সহজ হবে, উল্লিখিত দুটি দলের মধ্যে কারা সাহায্যপ্রাপ্ত দল। কারণ, এক পক্ষে আছে এমন দল, যাদের মানহাজে তাত্ত্বিক জিহাদের অস্তিত্ব থাকলেও প্রায়োগিক জিহাদের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না-না বিগত কয়েক যুগে আর না বর্তমানে। এমনকি তাদের অনেকে তো খোদ তত্ত্বকেই বিকৃত করে ফেলেছে। আর অপর পক্ষে আছে এমন দল, যারা এই মাজলুম ফরজকে আঁকড়ে রেখেছে যুগ যুগ ধরে। কাল থেকে কালান্তরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এর ধারণ, বহন ও বাস্তবায়নের গুরুদায়িত্ব আনজাম দিয়ে আসছে।
হাদিসটি দারস-তাদরিসে যারা বর্ণনা করেন, তারা কেন যেন 'আল্লাহর দীনের ওপর যুদ্ধ করবে' অংশটুকু এড়িয়ে যান। যার কারণে তারা সাহায্যপ্রাপ্ত জামাআতের পরিচয় প্রসঙ্গে আলিম ৩৮২ মুহাদ্দিস ৩৮৩ ইত্যাদি নাম অন্তর্ভুক্ত করলেও মুজাহিদদের নাম কদাচিৎ উচ্চারণ করেন। আর কালেভদ্রে কখনো উচ্চারণ করলেও কথা আর সামনে এগোতে দেন না। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা করলেও হাদিসের এতগুলো শব্দের ব্যাখ্যা করার কষ্ট না করে; বরং সেখানেই প্রসঙ্গ পালটে ফেলেন। এর আরেকটি উদাহরণ হলো সুরা তাওবার ১১১ নম্বর আয়াত। অধিকাংশজন শুধু প্রথমাংশ বলেই ক্ষান্তি দেন, যাতে রয়েছে— 'নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের প্রাণ ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন এর বিনিময়ে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত'; কিন্তু এরপরই যে আল্লাহ নিজে আয়াতে উল্লিখিত মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন— 'তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে অনন্তর হত্যা করে ও নিহত হয়'—সে-সকল বর্ণনাকারী এটা বেমালুম ভুলে যান বা ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যান।

টিকাঃ
৩৫৮ এর দ্বারা উদ্দেশ্য সেই বায়ু, যা কিয়ামতপূর্ব সময়ে এসে প্রত্যেক মুমিন পুরুষ ও নারীর প্রাণ সংহার করবে। দ্রষ্টব্য-সহিহ মুসলিম: ১৯২৪।
*** সহিহ মুসলিম: ১৯২০; সহিহ বুখারি: ৭৩১১।
৩৬০ মুসনাদু আবি দাউদ তায়ালিসি গ্রন্থে (২/৬৮) বর্ণনা এসেছে,
عَنْ أَبِي عَبْدِ اللَّهِ الشَّائِيِّ، قَالَ: سَمِعْتُ مُعَاوِيَةَ، يَخْطُبُ وَهُوَ يَقُولُ: يَا أَهْلَ الشَّامِ حَدَّثَنِي الْأَنْصَارِيُّ يَعْنِي زَيْدَ بْنِ أَرْقَمَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ: «لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ وَإِنِّي أَرَاكُمُوهُمْ يَا أَهْلَ الشَّامِ
৬১ সহিহ মুসলিম: ১৯২৪, ১৯২৪, ১৫৬।
৩৮২ যেমনটা ইমাম বুখারি রাহ. বলেছেন।
৩৮৩ যেমনটা ইমাম তিরমিজি রাহ. বলেছেন।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 গুরারা

📄 গুরারা


রাসুল বলেন,
بَدَأَ الْإِسْلَامُ غَرِيبًا، وَسَيَعُودُ كَمَا بَدَأَ غَرِيبًا، فَطُوبَى لِلْغُرَبَاءِ
ইসলাম শুরু হয়েছে অপরিচিতরূপে। শীঘ্রই ইসলাম সে অবস্থায় ফিরে যাবে, যেভাবে তার সূচনা হয়েছিল। সুতরাং সুসংবাদ 'গুরাবা' (অপরিচিত)-দের জন্য।
এ হাদিসে রাসুল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর যুগের কিছুকাল পরেই হকপন্থিরা সমাজে অপরিচিত, মুসাফির, আগন্তুক ও ভিনদেশিদের মতো হয়ে যাবে। যে ব্যক্তি তার আকিদা ও জিহাদের জন্য প্রাণের ভয়ে ভীত হয়ে প্রতিটা মুহূর্ত অতিবাহিত করে, নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকে; সে জানে না একটি দিন নিরাপদে পার করতে পারবে কি না। জানে না তার অনুপস্থিতিতে তার পরিবারের দুর্বল সদস্যদের ওপর নির্যাতনের খড়গ নেমে আসবে কি না। এমনকি কখনো কখনো নিজ পরিবারেও সে নিরাপত্তাহীন থাকে। পরিবারের সদস্যরা তার অস্তিত্বকেই ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে, যার কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে তারা তাকে নির্যাতন করতে থাকে। এই যুগে তারচেয়ে বড় 'গারিব' আর কে আছে!
অপরদিকে রয়েছে সে-সকল মুসলিম, যারা কুফফার, মুশরিক ও তাগুতগোষ্ঠীর অপরাধের ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করে; বরং তারা এ-ও বলে, এই তাগুতগোষ্ঠীই তাদের শাসক, তাদের আমির, যাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হারাম।
যারা জীবনে একটা দিনও আল্লাহর পথে জিহাদে ব্যয় করেনি, কারাবরণের স্বাদ একমুহূর্তের জন্যও আস্বাদন করেনি; আর না কখনো পীড়িত বা নিগৃহীত হয়েছে, অথবা পরিবারের সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত থেকেছে। তারা নির্ভয়ে-নির্বিঘ্নে বুক ফুলিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে, নগরে-মফস্বলে বিচরণ করে বেড়ায়। কোনো ধরনের আর্থিক ক্ষতির শিকার তো তাদের হতেই হয় না, উলটো কুফরি তন্ত্রমন্ত্রের ধ্বজাধারীদের প্রদত্ত আর্থিক উপহারের মধ্য দিয়ে তাদের দিন ভালোই অতিবাহিত হয়। উপরন্তু তাদের অনেকে তাগুতের মঞ্চে পুষ্পমাল্যে বরিত হয়। তাদের থেকে আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে উপকৃত হয়। এদের ব্যাপারে কি হাদিসে বর্ণিত 'গারিব' শব্দ প্রয়োগ করা সংগত? ইহজগৎ মুমিনদের জন্য কারাগার আর কাফিরদের জন্য স্বর্গ, এ হাদিস কি এ সকল আপসকামী মুমিনের ব্যাপারে প্রযোজ্য, নাকি সিদ্দিকি ও ফারুকি চেতনায় উদ্বুদ্ধ আপসহীন মুমিনদের ব্যাপারে প্রযোজ্য? আল্লাহ বলেন,
﴿أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ﴾
মানুষ কি ভেবে নিয়েছে, তারা ইমান আনার কথা বললে পরীক্ষা না করে তাদের এমনিতেই ছেড়ে দেওয়া হবে! [সুরা আনকাবুত (২৯) : ০২]
বস্তুত আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রসমূহও কুফফার, মুশরিক ও তাগুতদের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণাধীন। যখন আল্লাহর শরিয়তকে অকার্যকর করে পৃথিবীকে মানবরচিত আইনকানুন দ্বারা পরিচালনা করা হচ্ছে। এ সবকিছু দেখে যারা প্রতিবাদ করবে বা অন্তত এগুলো প্রত্যাখ্যান করবে, অনিবার্যভাবেই গুরাবার সারিতে তাদের চলে যেতে হবে। আর যারা সব ক্ষেত্রে মান্যতা ও আনুগত্য প্রদর্শন করবে বা নীরবতাকেই নিজেদের মানহাজ বানাবে, ইহকালে নিরাপত্তা পেলেও পরকালে তাদের চেয়ে হতভাগা আর কেউ হবে না। কারণ, এই জামানায় ইমান রক্ষাকারীদের দৃষ্টান্ত হলো হাতে জ্বলন্ত কয়লা ধারণকারীদের মতো, যেমনটা রাসুল ﷺ তাঁর সময়েই বলে গেছেন। আল্লাহ বলেন,
﴿وَلَنْ تَرْضَى عَنْكَ الْيَهُودُ وَلَا النَّصْرَى حَتَّى تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ﴾
ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টানরা কিছুতেই তোমার ওপর সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ-না তুমি তাদের আদর্শের অনুসরণ করো। [সুরা বাকারা (২): ১২০]
সাধারণ নামাজি, দাতা, রোজাদার ও হাজি মুসলিমদের খুব কমই এই পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। ইমান রক্ষার জন্য সাধারণভাবে তাদের হাতে না কখনো জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড ধারণ করার অবস্থা হয়; আর না তাদের জন্য গোটা পৃথিবী জ্বলন্ত নরক ও কারাগারে পরিণত হয়।

টিকাঃ
৩৬৪ সহিহ মুসলিম: ১৪৫।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 মিল্লাতে ইবরাহিমের অনুসারী

📄 মিল্লাতে ইবরাহিমের অনুসারী


আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ يَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ إِبْرَهِمَ إِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهُ
মিল্লাতে ইবরাহিম থেকে কেবল ওই ব্যক্তিই বিমুখ হতে পারে, যে নিজেকে নির্বোধ সাব্যস্ত করেছে। [সুরা বাকারা (০২) : ১৩০]
সুতরাং মুমিন সর্বাবস্থায় মিল্লাতে ইবরাহিমের অনুসরণ করবে। সে মিল্লাতে ইবরাহিমের মোকাবিলায় নিজের অপরিণত বোধকে দাঁড় করাবে না। কখনো যদি তার যুক্তির সঙ্গে মিল্লাতে ইবরাহিমের দাবির সংঘর্ষ হয়, তাহলে সে নিজের যুক্তি ছুঁড়ে ফেলে এবং মিল্লাতে ইবরাহিমের সামনে নিজেকে আনুগত্যপরায়ণ বান্দার মতো সঁপে দেয়। আল্লাহ বলেন,
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَءُوا مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ
তোমাদের জন্য ইবরাহিম ও তার সঙ্গীদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ-যখন তারা নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের বলল, তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যা কিছুর উপাসনা করো, তার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের অস্বীকার করলাম। আমাদের মধ্যে এবং তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রকাশিত হলো, যতক্ষণ-না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ইমান আনবে। [সুরা মুমতাহিনা (৬০) : ০৪]
ইবরাহিম আ. নিজের দুর্বলতা ও একাকিত্বের সময়ই তাগুত ও তাগুত-পূজারিদের সঙ্গে স্পষ্ট সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিয়েছেন।
এ ক্ষেত্রেও উপাস্যের পূর্বে উপাসকের সম্পর্ক ছিন্নের সঙ্গে ঘোষণা দিয়েছেন। কারণ, অনেক সময় এমন হয়, মানুষ বাতিল উপাস্যের উপাসনার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ঠিকই; কিন্তু বিভিন্ন স্বার্থের কথা চিন্তা করে তার উপাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সাহস করে না।
এমন ব্যক্তি মিল্লাতে ইবরাহিম বাস্তবায়ন করতে পারেনি। উপরন্তু তিনি শুধু সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্তি দেননি; বরং সঙ্গে এ-ও বৃদ্ধি করেছেন— 'আমরা তোমাদের অস্বীকার করলাম,' যাতে করে আল্লাহর বন্ধু এবং তাগুতের দোসরদের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এরপর বলেছেন, 'আমাদের মধ্যে এবং তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রকাশিত হলো।'
এ ক্ষেত্রে তিনি বিদ্বেষের ওপর শত্রুতার প্রসঙ্গকে অগ্রবর্তী করেছেন। কারণ, শত্রুতা থাকে প্রকাশ্যে আর বিদ্বেষ থাকে অন্তরে সুপ্ত। অনেকে ভেতরে বিদ্বেষ লালন করলেও শত্রুতা প্রকাশের সাহস করে না। এটা কখনোই মিল্লাতে ইবরাহিমের সঙ্গে সমঞ্জস নয়। তাগুত ও তার উপাসকদের প্রতি এই শত্রুতা অব্যাহত থাকবে, যতক্ষণ-না তারা এক আল্লাহর প্রতি ইমান আনয়ন করে।

টিকাঃ
*** মিল্লাতে ইবরাহিম সম্পর্কে জানতে পড়ুন আমার অনূদিত- মিল্লাতে ইবরাহিমের জাগরণ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00