📄 আবদুল্লাহ ইবনু জাহশের বাহিনীর ভুল
ইমাম ইবনু হিশাম রাহ. তাঁর সিরাতগ্রন্থে বর্ণনা করেন, রাসুল রজব মাসে আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশের নেতৃত্বে প্রথম বদর অভিযান থেকে ফিরে আসা আটজন মুহাজির সাহাবির সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনী পাঠালেন। তিনি সে বাহিনীতে কোনো আনসারি সাহাবিকে অন্তর্ভুক্ত করেননি। রাসুল আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশকে একটি পত্র দিয়ে বললেন, দু-দিন পথচলার পর পত্রটি খুলে পড়বে; তার আগে নয়। চিঠি পড়ার পর তাতে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সে অনুসারে কাজ করবে এবং সঙ্গীদের কারও ওপর কোনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দেবে না।'
দু-দিন পথচলার পর আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রা. চিঠি খুলে পড়লেন। তাতে লেখা ছিল—'আমার এই চিঠি যখন তুমি পড়বে, ঠিক তখনই রওনা হয়ে মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী নাখলা নামক স্থানে পৌঁছে যাত্রাবিরতি করবে। সেখানে কুরাইশদের জন্য ওত পেতে থাকবে এবং কোনো তথ্য পেলে আমাকে জানাবে।'
আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রা. চিঠিটি পড়েই বললেন, 'আমি মেনে নিলাম ও অনুগত রইলাম।' এরপর সঙ্গীদের বললেন, 'রাসুল আমাকে নাখলায় গিয়ে কুরাইশদের জন্য ওত পেতে থাকতে বলেছেন এবং কোনো খবর জানলে তা তাঁকে জানাতে বলেছেন। আর এ ব্যাপারে তোমাদের কারও ওপর বাধ্যতামূলক কোনো দায়িত্ব চাপাতে নিষেধ করেছেন। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি শাহাদাত লাভে ইচ্ছুক থাকে, সে যেন যায়। আর যে তা চায় না, সে যেন ফিরে যায়। তবে আমি রাসুলের আদেশ পালন করব।'
এ কথা বলার পর আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশের সঙ্গে সবাই রওনা হয়ে গেলেন। কেউ-ই ফিরে গেলেন না। তিনি হিজাজে প্রবেশ করলেন। বাহরান নামক স্থানে সাআদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস ও উতবা ইবনু গাজওয়ান রা. তাঁদের উট হারিয়ে ফেললেন।
তাঁরা দু-জন তখন ওই উটকে অনুসরণ করে চলছিলেন। ফলে উটের সন্ধানে তাঁরা আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রা. থেকে পিছিয়ে পড়েন। আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ ও তাঁর সঙ্গীগণ যাত্রা অব্যাহত রাখেন এবং নাখলায় পৌঁছে যাত্রাবিরতি করেন।
এই সময় তাঁদের কাছ দিয়ে কুরাইশদের একটি কাফেলা কিশমিশ ও চামড়া বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এ ছাড়া অন্য পণ্যসামগ্রীও ছিল। কুরাইশের এ দলে আমর ইবনু হাদরামি, উসমান ইবনু আবদুল্লাহ ও তার ভাই নাওফিল ইবনু আবদুল্লাহ এবং হাকাম ইবনু কাইসান ছিল। আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রা.-এর বাহিনী তাদের দেখে ঘাবড়ে যান। কারণ, তাঁরা তাদের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। উক্বাশা ইবনু মিহসান রা. তো তাদের একেবারেই কাছে চলে গেলেন। তখন তাঁর মাথা মুণ্ডানো ছিল। তাঁকে দেখে কুরাইশরা আশ্বস্ত হয়ে বলে, 'এরা স্থানীয় বাসিন্দা। এদের থেকে কোনো ভয় নেই।' এদিকে মুসলিমরা কুরাইশদের ব্যাপারে পরামর্শে বসেন। সে দিন ছিল রজবের শেষ দিন। বৈঠকে সবাই মতামত দিলেন, কুরাইশদের এই কাফেলাকে আজ ছেড়ে দিলে এরপরই তারা হারাম এলাকায় প্রবেশ করবে এবং আমাদের হাত থেকে নিরাপত্তা পেয়ে যাবে। পক্ষান্তরে আজ যদি তাদের হত্যা করা হয়, তাহলে নিষিদ্ধ মাসে রক্তপাত ঘটানোর দোষে আমাদের দোষী হতে হবে।
তাঁরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন এবং কুরাইশ কাফেলার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সংকোচবোধ করতে লাগলেন। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে একমত হলেন যে, যাকে যাকে পারা যায়, হত্যা করতে হবে এবং তাদের যার কাছে যা আছে, তা নিয়ে নিতে হবে। এর পর ওয়াকিদ ইবনু আবদুল্লাহ তামিমি আমর ইবনু হাদরামিকে বর্শার আঘাতে হত্যা করেন এবং উসমান ইবনু আবদুল্লাহ ও হাকাম ইবনু কাইসানকে বন্দি করেন। নাওফিল ইবনু আবদুল্লাহ পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। তাকে কিছুতেই ধরা সম্ভব হলো না। তারপর আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রা. অবশিষ্ট লোক ও বন্দি দুজনকে নিয়ে মদিনায় রাসুলের কাছে উপস্থিত হলেন।
রাসুল বললেন, 'আমি তো নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করতে তোমাদের বলিনি।' তারপর তিনি কাফেলা ও বন্দিদের আটকে রাখলেন এবং তাদের সম্পদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। রাসুলের এ উক্তিতে আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রা. সবার সামনে লজ্জা পেয়ে নিরুত্তর হয়ে গেলেন। তাঁর দলের লোকেরা ভাবলেন, তাঁদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। মুসলিমরা এ কাজের জন্য তাঁদের তিরস্কার করলেন। অপরদিকে কুরাইশরা বলতে লাগল, 'মুহাম্মাদ ও তাঁর সহচররা নিষিদ্ধ মাসের পবিত্রতা লঙ্ঘন করেছে। তাঁরা নিষিদ্ধ মাসে রক্তপাত ঘটিয়েছে, অন্যের সম্পদের দখল নিয়েছে এবং লোকজনকে বন্দি করেছে।' মক্কায় তখন পর্যন্ত যে কজন মুসলিম ছিলেন, তাঁদের একজন জবাব দিলেন—'মুসলিমরা যা করেছে, শাবান মাসে করেছে।
এই প্রচারণা অভিযান যখন ব্যাপক আকার ধারণ করে, তখন আল্লাহ তাআলা রাসুলের প্রতি এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন,
يَسْتَلُونَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيهِ قُلْ قِتَالٌ فِيهِ كَبِيرٌ وَصَلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَكُفْرُ بِهِ وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ * وَإِخْرَاجُ أَهْلِهِ مِنْهُ أَكْبَرُ عِنْدَ اللَّهِ وَ الْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ الْقَتْلِ وَلَا يَزَالُونَ يُقَاتِلُونَكُمْ حَتَّى يَرُدُّوكُمْ عَنْ دِينِكُمْ إِن اسْتَطَاعُوا وَمَنْ يَرْتَدِدُ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتُ وَهُوَ كَافِرُ فَأُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأُولَئِكَ أَصْحَبُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خُلِدُونَ )
তারা তোমাকে নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। তুমি বলো, এ মাসে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া অন্যায়। তবে আল্লাহর কাছে তার চেয়েও বড় অন্যায় হলো আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখা, কুফর করা, মসজিদে হারামে যেতে বাধা দেওয়া এবং হারামের অধিবাসীদের সেখান থেকে বহিষ্কার করা। বস্তুত নির্যাতনের মাধ্যমে মানুষকে বিপথগামী করা হত্যার চেয়েও বড় অপরাধ। তারা অবিরতভাবে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত, যাতে করে সাধ্যে কুলালে তোমাদের ধর্মান্তরিত করতে পারে। [সুরা বাকারা (২) : ২১৭]
অর্থাৎ, তোমরা যদি হারাম মাসে হত্যাকাণ্ড করেও থাকো, তবে তারা তো আল্লাহর পথে চলতে তোমাদের বাধা দিয়েছে। সেই সঙ্গে কুফরিও করেছে এবং মসজিদে হারামে তোমাদের যেতে দেয়নি। আর তোমরা মসজিদুল হারামের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও সেখান থেকে তোমাদের বিতাড়িত করা আল্লাহর কাছে তোমাদের দ্বারা একজন কাফির হত্যার চেয়ে মারাত্মক অপরাধ। এ ছাড়া তারা যে মুসলিমদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে ধর্মত্যাগে তাঁদের বাধ্য করত এবং কুফরি অবস্থায় ফিরিয়ে আনত, সেটা হত্যার চেয়েও জঘন্য কাজ। আর এই জঘন্যতম অন্যায় কাজ তারা তোমাদের সঙ্গে অবিরতভাবেই করে চলেছে এবং তা থেকে ফিরছে না বা তাওবা করছে না।
কুরআনের এই পথনির্দেশ যখন এলো এবং আল্লাহ মুজাহিদদের ভীতি ও দুশ্চিন্তা দূর করে দিলেন, তখন রাসুল আটক কাফেলা ও বন্দিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করলেন। কুরাইশরা তাঁর কাছে উসমান ও হাকামকে পণ্যের বিনিময়ে মুক্তির অনুরোধ জানিয়ে বার্তা পাঠাল। রাসুল জবাবে তাদের জানালেন, 'আমাদের দুজন লোক—সাআদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস ও উতবা ইবনু গাজওয়ান ফিরে না-আসা পর্যন্ত বন্দিদের মুক্তি দেবো না। কারণ, তোমাদের দ্বারা তাদের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।' এরপর শিগগিরই সাআদ ও উতবা ফিরে এলে রাসুল পণ্যের বিনিময়ে তাদের মুক্তি দেন। তবে বন্দিদ্বয়ের মধ্যে হাকাম ইবনু কাইসান ইসলাম গ্রহণ করে খাঁটি মুসলিম হয়ে যান এবং রাসুলের কাছেই থেকে যান। পরে বীরে মাউনার ঘটনায় তিনি শহিদ হন। আর উসমান ইবনু আবদিল্লাহ মক্কা চলে যায় এবং কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।
টিকাঃ
৩২৭ তাফসিরে ইবনু কাসিরের বর্ণনা অনুসারে সেই দিনটি ছিল জুমাদাল উখরার শেষ দিন বা রজবের শুরুর দিন। আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশের বাহিনী নিশ্চিত ছিলেন না, সেই দিনটি আসলে কোন দিন ছিল।
১৩২৮ এ কথা বলার পেছনে যুক্তি ছিল- রজবের শেষ তারিখের সূর্যাস্তের পর শাবান মাস শুরু হয়েছিল।
৩২১ সিরাতু ইবনু হিশাম: সারিয়াতু আবদিল্লাহ ইবনি জাহাশ।
📄 উসামার ভুল
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় এসেছে, উসামা রা. বলেন,
بَعَثَنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى الحُرَقَةِ، فَصَبَّحْنَا القَوْمَ فَهَزَمْنَاهُمْ، وَلَحِقْتُ أَنَا وَرَجُلٌ مِنَ الأَنْصَارِ رَجُلًا مِنْهُمْ، فَلَمَّا غَشِينَاهُ، قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ فَكَفَّ الأَنْصَارِيُّ فَطَعَنْتُهُ بِرُمْحِي حَتَّى قَتَلْتُهُ، فَلَمَّا قَدِمْنَا بَلَغَ النَّبِيَّ ﷺ، فَقَالَ: يَا أُسَامَةُ ، أَقَتَلْتَهُ بَعْدَ مَا قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ قُلْتُ: كَانَ مُتَعَوَّذَا، فَمَا زَالَ يُكَرِّرُهَا، حَتَّى تَمَنَّيْتُ أَنِّي لَمْ أَكُنْ أَسْلَمْتُ قَبْلَ ذَلِكَ اليَوْمِ
রাসুল আমাদেরকে হুরকা গোত্রের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। আমরা প্রত্যুষে গোত্রটির ওপর আক্রমণ করি এবং তাদের পরাজিত করি। এ সময়ে আনসারদের একব্যক্তি ও আমি তাদের (হুরকাদের) একজনের পিছু ধাওয়া করি। আমরা যখন তাকে ঘিরে ফেলি, তখন সে বলে ওঠে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। এ বাক্য শুনে আনসারি তার অস্ত্র সামলে নিলেন; কিন্তু আমি তাকে আমার বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে ফেলি। আমরা মদিনায় ফেরার পর এ সংবাদ নবি পর্যন্ত পৌঁছালে তিনি বললেন, হে উসামা, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার পরেও তুমি তাকে হত্যা করেছ? আমি বললাম, সে তো জান বাঁচানোর জন্য কালিমা পড়েছিল। এর পরেও তিনি-'হে উসামা, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরেও তুমি তাকে হত্যা করেছ'-এ কথাটি বার বার বলতে থাকলেন। এতে আমার মন চাচ্ছিল যে, হায়, যদি সেই দিনটির পূর্বে আমি ইসলামই গ্রহণ না করতাম!
অন্য বর্ণনায় এসেছে,
قَالَ: «مَنْ لَكَ بِلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟». فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّمَا قَالَهَا مَخَافَةَ السَّلَاحِ. قَالَ: «أَفَلَا شَقَقْتَ عَنْ قَلْبِهِ حَتَّى تَعْلَمَ مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ قَالَهَا أَمْ لَا؟ مَنْ لَكَ بِلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟» فَمَا زَالَ يَقُولُهَا حَتَّى وَدِدْتُ أَنِّي لَمْ أُسْلِمْ إِلَّا يَوْمَئِذٍ
রাসুল বললেন, কিয়ামতের দিন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' তোমার বিরুদ্ধে বাদী হলে কে তোমার জন্য সুপারিশ করবে? আমি বললাম, আল্লাহর রাসুল, সে তো অস্ত্রের ভয়ে কালিমা পাঠ করেছে। তিনি বললেন, সে অস্ত্রের ভয়েই কালিমা পাঠ করেছে, সেটা কি তুমি তার অন্তর চিড়ে দেখেছ? কিয়ামাতের দিন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'- এর সামনে কে তোমাকে মুক্তি দেবে? তিনি বার বার এ কথা বলতে থাকলেন। এমন কি আমার মনে হচ্ছিল, আমি যদি এ দিনটির পূর্বে মুসলিম না হতাম!
📄 খালিদের ভুল
সহিহ বুখারির এক বর্ণনায় এসেছে,
بَعَثَ النَّبِيُّ ﷺ خَالِدَ بْنَ الوَلِيدِ إِلَى بَنِي جَدِيمَةَ، فَدَعَاهُمْ إِلَى الإِسْلَامِ، فَلَمْ يُحْسِنُوا أَنْ يَقُولُوا: أَسْلَمْنَا، فَجَعَلُوا يَقُولُونَ: صَبَأْنَا صَبَأْنَا، فَجَعَلَ خَالِدٌ يَقْتُلُ مِنْهُمْ وَيَأْسِرُ، وَدَفَعَ إِلَى كُلِّ رَجُلٍ مِنَّا أَسِيرَهُ، حَتَّى إِذَا كَانَ يَوْمُ أَمَرَ خَالِدٌ أَنْ يَقْتُلَ كُلُّ رَجُلٍ مِنَّا أَسِيرَهُ، فَقُلْتُ: وَاللَّهِ لَا أَقْتُلُ أَسِيرِي، وَلَا يَقْتُلُ رَجُلٌ مِنْ أَصْحَابِي أَسِيرَهُ، حَتَّى قَدِمْنَا عَلَى النَّبِيِّ ﷺ فَذَكَرْنَاهُ، فَرَفَعَ النَّبِيُّ يَدَهُ فَقَالَ: «اللهُمَّ إِنِّي أَبْرَأُ إِلَيْكَ مِمَّا صَنَعَ خَالِدٌ مَرَّتَيْنِ»
নবি ﷺ এক অভিযানে খালিদ ইবনু ওয়ালিদকে বনু জাজিমার বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। (সেখানে পৌঁছে) খালিদ রা. তাদের ইসলামের দাওয়াত দেন; কিন্তু 'আমরা ইসলাম কবুল করলাম'-এ কথাটি তারা ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে পারছিল না। তাই তারা বলতে লাগল, আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করলাম, আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করলাম। তখন খালিদ তাদের হত্যা ও বন্দি করতে থাকলেন এবং আমাদের প্রত্যেকের কাছে বন্দিদের সোপর্দ করতে থাকলেন। অবশেষে একদিন তিনি আদেশ দিলেন, আমাদের সবাই যেন নিজ নিজ বন্দিকে হত্যা করে ফেলি। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমি আমার বন্দিকে হত্যা করব না। আর আমার সঙ্গীদের কেউই তার বন্দিকে হত্যা করবে না। অবশেষে আমরা নবি ﷺ-এর কাছে ফিরে এলাম। আমরা তাঁর কাছে এ ব্যাপারটি উল্লেখ করি। নবি ﷺ তখন দু-হাত তুলে বললেন, হে আল্লাহ, খালিদ যা করেছে আমি তার দায় থেকে মুক্ত হওয়ার কথা তোমার কাছে ঘোষণা করছি। এ কথাটি তিনি দু-বার বললেন。
এ ছাড়াও উহুদ ও হুনায়নের যুদ্ধে মুজাহিদ সাহাবিদের ভুল সিদ্ধান্তের ব্যাপারে রাসুলের গৃহীত পদক্ষেপ ও কৃত আচরণও এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এভাবে নবিজীবনের বাঁকে বাঁকে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সেগুলোকে গ্রন্থের পাতা থেকে তুলে এনে বাস্তবজীবনে প্রয়োগ করা। নবি ﷺ-এর উত্তরসূরি অভিধার লাজ রক্ষা করা।
আমরা আমাদের এই গ্রন্থে মুজাহিদদের মানহাজ সম্পর্কে খানিকটা পর্যালোচনা করব। আশা করি, আমাদের আলোচনার মধ্য দিয়ে সত্যের অধিক নিকটবর্তী কোনটি—মুজাহিদদের মানহাজ নাকি তাদের বিরোধিতাকারীদের মানহাজ—এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে। আল্লাহই উত্তম সহায়।
টিকাঃ
৩০২ সহিহ বুখারি: ৪৩৩৯।
📄 মুজাহিদদের বৈশিষ্ট্য
পৃথিবী এগিয়ে গেছে অনেক দূর। কিন্তু আমরা যদি এখনো সফলতা ও মুক্তির পথ খুঁজতে চাই, তাহলে ফিরে তাকাতে হবে ইসলামের সূচনালগ্নে। প্রথমে রাসুলের যুগ, এরপর সাহাবি ও তাবিয়িদের যুগের দিকে। কারণ, তাঁরাই আমাদের আদর্শ, আমাদের অনুসরণীয়, আমাদের পথিকৃৎ এবং আমাদের আকাবির ও আসলাফ। রাসুল বলেন,
خَيْرُكُمْ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ يَكُونُ بَعْدَهُمْ قَوْمٌ يَشْهَدُونَ وَلَا يُسْتَشْهَدُونَ، وَيَخُونُونَ وَلَا يُؤْتَمَنُونَ، وَيَنْذِرُونَ وَلَا يَفُونَ وَيَظْهَرُ فِيهِمُ السَّمَنُ
তোমাদের মধ্যে আমার যুগের লোকেরাই সর্বোত্তম। তারপর এর পরবর্তী যুগের লোকেরা। তারপর এদের পরবর্তী যুগের লোকেরা। তারপর এমন লোকদের আবির্ভাব হবে যে, তারা সাক্ষ্য দেবে অথচ তাদের সাক্ষ্য চাওয়া হবে না। তারা খিয়ানতকারী হবে। তাদের আমানতদার মনে করা হবে না। তারা মানত করবে অথচ তা পূরণ করবে না। আর তাদের দৈহিক হৃষ্টপুষ্টতা (স্থূলতা) প্রকাশিত হবে।
ইমাম মালিক রাহ. বলেন,
إِنَّهُ لَا يُصْلِحُ آخِرَ هَذِهِ الْأُمَّةِ إِلَّا مَا أَصْلَحَ أَوَّلَهَا
'নিশ্চয়ই এই উম্মাহর শেষ ভাগকে সংশোধিত করবে কেবল সে উপকরণ, যা সংশোধিত করেছিল উম্মাহর প্রথম ভাগকে।
'রাসুল এবং তাঁর পর খুলাফায়ে রাশিদিন দীনের ভিত্তিসমূহ প্রণয়ন করে দিয়েছেন। এগুলোকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে আল্লাহর কিতাবকে সত্যায়ন করা, আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে নিয়োজিত করা এবং আল্লাহর দীনের ওপর শক্তি-সামর্থ্য ব্যয় করা বাস্তবায়িত হয়। যে ব্যক্তি এর আলোকে আমল করে, সে হিদায়াতপ্রাপ্ত। যে এর মাধ্যমে সাহায্য কামনা করে, সে সাহায্যপ্রাপ্ত। আর যে এর বিরুদ্ধাচারণ করে, সে মুমিনদের পথ ব্যতীত ভিন্নপথ অনুসরণ করে। আর আল্লাহ তাকে সেই পথেই ছেড়ে দেন, যা সে অবলম্বন করেছে।’
আল্লাহর কিতাব, তাঁর রাসুলের সুন্নাহ এবং প্রথম তিন যুগের মানুষদের জীবনাদর্শই আমাদের জীবনপথের পাথেয়। এগুলোই হলো আমাদের কষ্টিপাথর। উম্মাহর এই ক্রান্তিকালে, বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা হাসিল করে, শত-সহস্র পথ মাড়িয়ে আমরা যখন চরম হতাশা ও নিরাশায় ভুগছি, তখন সেই মহিমান্বিত আদর্শই আমাদের সামনে সাফল্যের পথ উদ্ভাসিত করে তুলতে পারে। দীন প্রতিষ্ঠার পথে তারা যে চিন্তাধারা ও কর্মপন্থা অনুসরণ করেছেন, আমরাও যদি তা অনুসরণ করতে পারি, তাহলে কুফরের ধ্বজাধারীদের পরাভূত করে অবশ্যই আমরা ইসলামকে বিজয়ী করতে পারব। আমাদের হারানো মসনদ, হারানো ফিরদাউস সবই পুনরায় আমাদের কাছেই ফিরে আসবে। প্রয়োজন শুধু নব-উদ্ভাবিত সব পথ ও মত, তথাকথিত হিকমাত ও মাসলাহাত জলাঞ্জলি দিয়ে নববি সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়া। প্রকৃত আকাবির ও আসলাফ সাহাবি ও তাবিয়িদের আদর্শকে পুনর্জীবিত করা।
আল্লাহ মুমিনদের এক পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ দীন দিয়েছেন, যা মানবজীবনের সবগুলো দিককে পরিব্যাপ্ত করে আছে। আল্লাহ বলেন,
الْيَوْمَ يَئِسَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ دِينِكُمْ فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
আজ কাফিররা তোমাদের দীনের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে। সুতরাং তোমরা তাদের ভয় করো না; আমাকে ভয় করো। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামতকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দীন হিসেবে মনোনীত করলাম। [সুরা মায়িদা (৫) : ৩]
۞ وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَّرَحْمَةً وَّبُشْرَى لِلْمُسْلِمِيْنَ
আমি আপনার ওপর এ কিতাব নাজিল করেছি, যাতে তা প্রতিটি বিষয় সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করে দেয় এবং মুসলিমদের জন্য হিদায়াত, রহমত ও সুসংবাদ হয়। [সুরা নাহল (১৬) : ৮৯]
তিনি মুসলিমদেরও আদেশ করেছেন, তারা যেন এই দীনের ওপর পরিপূর্ণ আমলকারী হয়। ইরশাদ করেছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَتِ الشَّيْطٰنِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে ইমানদাররা, তোমরা সম্পূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ করো এবং তোমরা শয়তানের পদচিহ্ন অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। [সুরা বাকারা (২): ২০৮]
একজন মুসলিম ততক্ষণ পর্যন্ত দীনের ওপর পূর্ণ আমলকারী হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত এই দীন পৃথিবীতে বিজয়ী না হয় এবং আল্লাহর জমিনে আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়। এ জন্যই আল্লাহ মুসলিমদের ওপর দীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চেষ্টা-পরিশ্রমকে ফরজ করে দিয়েছেন। কারণ, পৃথিবীতে শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করা ছাড়া আল্লাহর দীন কখনোই পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হতে পারে না। আল্লাহ বলেন,
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ
তোমরা তাদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাও, যতক্ষণ-না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং দীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হয়ে যায়। [সুরা আনফাল (৮): ৩৯]
আল্লাহ তো কিতাবিদেরও স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন, যেন তারাও পূর্ণাঙ্গ দীন বাস্তবায়ন করে। আর এটা তো স্পষ্ট বিষয় যে, নবিগণের শরিয়া ভিন্ন থাকলেও সবার দীন ও মিল্লাত এক ও অভিন্ন। বর্ণিত হয়েছে,
قُلْ يَأَهْلَ الْكِتٰبِ لَسْتُمْ عَلَى شَيْءٍ حَتَّى تُقِيمُوا التَّوْرٰنَةَ وَالْإِنْجِيلَ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَلَيَزِيدَنَّ كَثِيرًا مِنْهُمْ مَّا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَّبِّكَ طُغْيَانًا وَكُفْرًا ۚ فَلَا تَأْسَ عَلَى الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ
আপনি বলে দিন, হে কিতাবিরা, তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত তাওরাত ও ইনজিল এবং যে কিতাব তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর নাজিল করা হয়েছে (অর্থাৎ, কুরআন), তা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা না করবে, ততক্ষণ তোমাদের কোনো ভিত্তি নেই, যার ওপর তোমরা দাঁড়াতে পারো। (হে রাসুল,) আপনার প্রতি যে ওহি নাজিল করা হয়েছে, তা তাদের অনেকের অবাধ্যতা ও অবিশ্বাসই বৃদ্ধি করবে। সুতরাং আপনি কাফিরদের জন্য মোটেও দুঃখ করবেন না। [সুরা মায়িদা (৫) : ৬৮]
আল্লাহ মুসলিমদের শেষ জাতি হিসেবে নির্ধারণ করে কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য তাদের ওপর ইসলামি শরিয়া বাস্তবায়নের দায়িত্ব অপরিহার্য করে দিয়েছেন। বর্ণিত হয়েছে,
وَعَدَ اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَ عَمِلُوا الصَّلِحْتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَ لَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِّنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنَا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَ مَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفُسِقُونَ
তোমাদের মধ্যে যারা ইমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি অবশ্যই পৃথিবীতে তাদের খিলাফাত দেবেন, যেমন খিলাফাত দিয়েছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদের। এবং তাদের জন্য সেই দীনকে অবশ্যই প্রতিষ্ঠা দান করবেন, যে দীনকে তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তারা যে ভয়ভীতির মধ্যে আছে, তার পরিবর্তে তাদের অবশ্যই নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না। এরপরও যারা কুফর করবে, তারাই অবাধ্য সাব্যস্ত হবে। [সুরা নূর (২৪): ৫৫]
রাসুল এবং তাঁর পরে খুলাফায়ে রাশিদিন এই ফরজ অত্যন্ত সুন্দরভাবে আদায় করেছেন। সারা জীবন মানুষকে দীনের দিকে দাওয়াত দিয়েছেন এবং আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করতে নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন। প্রথম শতাব্দী থেকে বিগত শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিমরা যেখানেই নিজেদের শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেখানেই ইসলামি বিধিবিধান জারি করেছেন। হ্যাঁ, এ কথা অস্বীকারে উপায় নেই যে, ইসলামের ইতিহাসে অনেক শাসক এমন ছিল, যাদের লড়াই-যুদ্ধের একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশ জয় ও নিজের সাম্রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি। তবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মিথ্যাচার হবে যদি কেউ বলে যে, মুসলিমরা একটা জাতি হিসেবে পৃথিবীতে শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠা এবং কুফরি পরাশক্তিগুলোকে পরাভূত করে নিজেরা সুপার-পাওয়ার হওয়ার একমাত্র লক্ষ্যই ছিল নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তার করা! বাস্তবে যদি এমনই হতো, তাহলে মুসলিমদের শাসন দ্বারা পৃথিবীতে শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রসারিত হওয়ার পরিবর্তে অত্যাচার ও নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়ত; যেমনটা পশ্চিমা দেশগুলোর ক্ষেত্রে বর্তমানে ঘটেছে।
এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো মুসলিমদের দেশগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাবু করে নিয়েছে। মুসলিমদের হাত থেকে শাসনক্ষমতার রজ্জু ছুটে গেছে। সারা পৃথিবী থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ইসলামি বিধিবিধানগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা সামাজিক ক্ষেত্রে ইসলামি বিধিবিধান ও নির্দেশনাকে সরিয়ে দিয়ে এর স্থলে কুফরি ও শিরকি আইনকানুন জারি করেছে। এভাবে মুসলিম দেশগুলোর ওপর রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমাদের কুফরের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাসুল ﷺ বলেন,
لَتُنْقَضَنَّ عُرَى الْإِسْلَامِ عُرْوَةً عُرْوَةً، فَكُلَّمَا انْتَقَضَتْ عُرْوَةٌ تَشَبَّتَ النَّاسُ بِالَّتِي تَلِيهَا، وَأَوَّلُهُنَّ نَقْضًا الْحُكْمُ وَآخِرُهُنَّ الصَّلَاةُ
অবশ্যই ইসলামের হাতলগুলো একে একে ভেঙে ফেলা হবে। যখন একটা হাতল ভেঙে যাবে, তখন লোকেরা এর পরবর্তী হাতল আঁকড়ে ধরে থাকবে। প্রথমে যে হাতলটি ভেঙে যাবে, তা হলো শাসনক্ষমতা আর সর্বশেষটি হলো সালাত。
এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিকভাবে মুসলিমদের দু-ধরনের সংশোধন-প্রচেষ্টা আমাদের সামনে এসেছে,
১. কুফফারগোষ্ঠীর শাসনব্যবস্থা সন্তুষ্টি ও আগ্রহের সঙ্গে মেনে নেওয়া, তাদের প্রতি কল্যাণকামী হওয়া এবং তাদের অধীনতা মেনে দীনের যতটুকু অংশের ওপর আমল করার অনুমতি পাওয়া যায়, ঠিক ততটুকু অংশের ওপর আমল করাকেই নিজের ওপর আবশ্যক মনে করা। এটা পশ্চিমা চেতনাধারী মুসলিমদের কর্মপন্থা। ভারতীয় উপমহাদেশে স্যার সাইয়িদ আহমাদ খান (১৮১৭-১৮৯৮) এবং মিসরে শায়খ মুহাম্মাদ আবদুহু (১৮৪৯-১৯০৫) এই চিন্তাধারা প্রসারে ভূমিকা রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতা বাস্তবায়নের জন্য প্রথমে যে বিষয়টি আবশ্যক ছিল তা হচ্ছে, ইসলামি শিক্ষা থেকে 'শাসনব্যবব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা', 'দীন জীবিত করা' ইত্যাদি বিষয়কে সরিয়ে ফেলা হবে বা উম্মাহর সবার ওপর এর জন্য চেষ্টা- সাধনার অপরিহার্যতাকে সুকৌশলে অস্বীকার করা হবে। এই চিন্তাধারা লালনকারীদের দৃষ্টিতে পৃথিবীতে ইসলামকে সর্বতোভাবে বিজয়ী করা এবং বিজয়ের পথ সুগম করতে ইসলামের শাসন প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজনীয় কোনো বিষয় নয়। এ লোকগুলো ইসলামের নাম বাকি রাখতে তো পুরোপুরি চেষ্টা ব্যয় করেছে, এমনকি এ ক্ষেত্রে তারা ভালো প্রসিদ্ধিও পেয়েছে; কিন্তু তারা ইসলামের অবস্থাকে পরিবর্তন করে তাকে খ্রিষ্টধর্ম, বৌদ্ধধর্ম ও হিন্দুধর্মের মতো কেবলই এক অন্তঃসারশূন্য ধর্মরূপে উপস্থাপন করেছে, যা শুধু তার অনুসারীকে ব্যক্তিজীবনে প্রভুকে ডাকার শিক্ষা দিয়ে থাকে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি কুফরি শক্তির চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। যার কারণে তারা এসব স্কলারকে উৎসাহিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে এবং তাদের ছত্রছায়ায় এসব চিন্তাভাবনার নামে ইসলামবিরোধী প্রচার-প্রসারের ব্যবস্থাও করে দিয়েছে। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো আজও ইসলামের সেকুলার সংস্করণ প্রচারের কেবল অনুমতিই শুধু দেয় না; বরং রীতিমতো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শক্তি প্রয়োগ করে মুসলিমবিশ্বের ওপর ইসলামের নামে ইসলামবিরোধী এই সংস্করণটি চাপিয়ে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকে। এভাবে সংশোধন-প্রচেষ্টা পরিণত হয় দীন-বিকৃতিতে।
২. এর বিপরীত মেরুর সংশোধন-প্রচেষ্টা হচ্ছে দীনের সঙ্গে সুগভীর সম্পর্ক রক্ষাকারী আলিমগণের। তাঁরা কুফরি শাসনব্যবস্থা মেনে নিতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এর বিপরীতে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আবশ্যকতা ও অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন। কুফরের ধ্বজাধারীদের বিরুদ্ধে কার্যত জিহাদ ও কিতাল শুরু করেছেন। ভারতীয় উপমহাদেশে এ প্রকারের প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি রাহ.-এর বংশধরদের নাম বিশেষ মর্যাদায় স্মরণীয়। তাদের দীনি আন্দোলনের প্রতিপাদ্য ছিল বিশেষভাবে তিনটি বিষয়:
• মুসলিমদের জন্য এটা কোনোভাবেই বৈধ হবে না যে, তারা কুফফারগোষ্ঠীকে নিজেদের বিচারক হিসেবে মেনে নিয়ে কুফরি আইনকানুন বাস্তবায়নের ব্যাপারে সন্তুষ্টচিত্ত থাকবে।
• মুসলিমদের ওপর ফরজ হলো, তারা কুফরি শাসনব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটাতে চেষ্টা করবে এবং এই চেষ্টার অংশ হিসেবেই কুফফারগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জিহাদ ও কিতালের ধারা শুরু করবে।
• মুসলিমদের ওপর ফরজ হলো তারা ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে; যেখানে মুসলিমদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সব বিধান ইসলামি শরিয়তের আলোকে প্রণীত হবে।
এই মূলনীতিগুলোর ওপর সাইয়িদ আহমাদ শহিদ রাহ. তাঁর আন্দোলনের ভিত্তি রেখেছিলেন এবং ভারতীয় উপমহাদেশের কিছু অংশে ইসলামি শাসনও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই লক্ষ্যসমূহকে সামনে রেখেই ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমরা স্বাধীনতা-যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। এগুলোর আলোকেই রেশমি রুমাল আন্দোলনের (১৯১৩-১৯২০) সূত্রপাত হয়েছিল; কিন্তু যখন বাস্তবতার নিরিখে এসব আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারল না, তখন পরবর্তী লোকেরা পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করে হিকমাতে আমলির (কর্মগত কৌশলের) পথে হাঁটেন। কেউ আবার ইসলামকে বিজয়ী করার স্বপ্ন ছেড়ে মুসলিমদের ইসলাহ করার কাজে মনোযোগ দেন, যাতে পৃথিবীতে না হলেও অন্ততপক্ষে মুসলিমদের জীবনাচারে যেন ইসলামকে জীবিত রাখা যায়। অনেকে আবার জিহাদের পরিবর্তে জুহুদ তথা চেষ্টা-সাধনার পথ বেছে নেন।
প্রথমদিকে এই পরিবর্তন ছিল কেবলই হিকমাতে আমলির পরিবর্তন। লক্ষ্য ছিল এক ও অভিন্ন। তাতে কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন অনুপ্রবেশ করেনি। তাদের সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, পৃথিবীতে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া বিকল্প নেই। একইভাবে কুফরি শাসনব্যবস্থার সঙ্গে বৈরিতা রাখা ছাড়াও কোনো উপায় নেই। অপারগতার কারণে যদিও আমরা প্রত্যক্ষ লড়াইয়ের ময়দান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছি।
তবে সময়ের পালাবদলে হিকমাতে আমলির এই পরিবর্তন কেবলই 'হিকমাত'র মধ্যে আর সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা ক্রমশ লক্ষ্যের ভিন্নতায় রূপ নেয়।
কুরআন মাজিদে আল্লাহ বলেন,
۞ وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيمَةِ أَعْلَىٰ ۞ قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْلَىٰ وَقَدْ كُنْتُ بَصِيرًا ۞ قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا ۖ وَكَذَٰلِكَ الْيَوْمَ تُنْسَىٰ
আর যে আমার উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে বড় সংকটময়। আর কিয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ করে উঠাব। সে বলবে, হে আমার রব, তুমি আমাকে অন্ধ করে উঠালে কেন? আমি তো দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ছিলাম! আল্লাহ বলবেন, এভাবেই তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল; কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। আজ তোমাকেও সেভাবেই ভুলে যাওয়া হবে। [সুরা তোয়াহা (২০) : ১২৪-১২৬]
রাসুল বলেন,
وَإِنَّ أَشْقَى الأَشْقِيَاءِ مَنِ اجْتَمَعَ عَلَيْهِ فَقْرُ الدُّنْيَا وَعَذَابُ الْآخِرَةِ
নিশ্চয়ই সবচেয়ে দুর্ভাগা ওই ব্যক্তি, যার ওপর দুনিয়ার দারিদ্র্য এবং আখিরাতের শাস্তি একত্রিত হলো。
উপরিউক্ত আয়াত ও হাদিসের দর্পণে বর্তমান পৃথিবীকে মূল্যায়ন করলে খুব সহজেই মুসলিমদের অবস্থা পর্যালোচনা করা যাবে। আমরা বর্তমানে এমন একটা সময় অতিবাহিত করছি, যখন মুসলিমরা তাদের দীন থেকে বিচ্যুত। আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ এবং তাঁর সাহাবিরা সর্বোচ্চ পরিশ্রম করে এবং বুকের তপ্ত খুন ঢেলে যে দীনকে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, মুসলিমরা আজ সেই দীনকে হারিয়ে ফেলেছে। উপরন্তু দীন হাতছাড়া করার মধ্যেই তাদের দুর্ভাগ্য সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এর পাশাপাশি তাদের হাত থেকে দুনিয়াও ছুটে গেছে। এ ছাড়াও তাদের ওপর চেপে বসে আছে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর শত্রুরা। জীবনের অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের প্রণীত ও নির্দেশিত বিধিবিধান অনুসারেই পরিচালিত হচ্ছে মুসলিমদের ওপর তাগুতের শাসন ও বিচার।
মুসলিম উম্মাহ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্তম্ভ ও দীনের তাৎপর্যপূর্ণ অনেক প্রতীক হারিয়ে বসেছে। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এর মধ্যে সর্বপ্রধান হলো আল্লাহর শরিয়া অনুযায়ী শাসন ও বিচার। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে মুসলিমদের যতগুলো দেশ রয়েছে, তার প্রায় সবগুলোতেই কুরআন-সুন্নাহর শাসন অনুপস্থিত। যেসব দেশে কাগজে-কলমে কুরআন-সুন্নাহর শাসনকে মেনে নেওয়া হয়েছে, সেসব দেশেও কার্যত দেখা যায় মানবরচিত বিধিবিধানের সঙ্গে তা মিশ্রিত করে 'দীনে এলাহি' সদৃশ এক শিরকি শাসন ও বিচারব্যবস্থার উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। অথচ বর্তমান পৃথিবীতে মুসলিমদের জনসংখ্যা এত বেশি, অতীতে যার নজির পাওয়া দুষ্কর। বাহ্যিক বিচারে মুসলিমদের সংখ্যা বাড়ছে; কিন্তু গুণগতমানের বিচারে মুসলিমরা ক্রমশই চূড়ান্ত ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তারা বরবাদির অতল গহ্বরের একেবারেই প্রান্তে এসে উপনীত হয়েছে। নব্য জাহিলিয়াত তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে।
রাসুল বলেন,
لَتُنْقَضَنَّ عُرَى الْإِسْلَامِ عُرْوَةٌ عُرْوَةٌ، فَكُلَّمَا انْتَقَضَتْ عُرْوَةٌ تَشَبَّتَ النَّاسُ بِالَّتِي تَلِيهَا، وَأَوَّلُهُنَّ نَقْضًا الْحُكْمُ وَآخِرُهُنَّ الصَّلَاةُ
অবশ্যই ইসলামের হাতলগুলো একে একে ভেঙে ফেলা হবে। যখন একটা হাতল ভেঙে যাবে তখন লোকেরা এর পরবর্তী হাতল আঁকড়ে ধরে থাকবে। প্রথম যে হাতলটি ভেঙে যাবে তা হলো শাসনক্ষমতা; আর সর্বশেষটি হলো সালাত。
হুজায়ফা রা. বর্ণনা করেন; রাসুল বলেছেন,
تَكُونُ النُّبُوَّةُ فِيكُمْ مَا شَاءَ اللهُ أَنْ تَكُونَ، ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا، ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةُ عَلَى مِنْهَاجِ النُّبُوَّةِ، فَتَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ، ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ اللهُ أَنْ يَرْفَعَهَا، ثُمَّ تَكُونُ مُلْكًا عَاضًا، فَيَكُونُ مَا شَاءَ اللهُ أَنْ يَكُونَ، ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا، ثُمَّ تَكُونُ مُلْكًا جَبْرِيَّةٌ، فَتَكُونُ مَا شَاءَ اللهُ أَنْ تَكُونَ، ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا، ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةٌ عَلَى مِنْهَاجٍ نُبُوَّةٍ
তোমাদের মধ্যে নবুওয়াত থাকবে তত দিন পর্যন্ত যত দিন আল্লাহ চাইবেন যে, নবুওয়াত থাকুক। এরপর যখন তিনি তা উঠিয়ে নিতে চাইবেন তখন উঠিয়ে নেবেন। এরপর আসবে নবুওয়াতের আদলে খিলাফাহ। খিলাফাহ তত দিন পর্যন্ত থাকবে, যত দিন আল্লাহ চাইবেন যে তা থাকুক। এরপর যখন আল্লাহ তা উঠিয়ে নিতে চাইবেন তখন উঠিয়ে নেবেন। এরপর আসবে দাঁত কামড়ে থাকা রাজত্ব। তা তত দিন পর্যন্ত থাকবে, যত দিন আল্লাহ চাইবেন যে তা থাকুক। এরপর যখন আল্লাহ তা উঠিয়ে নিতে চাইবেন তখন উঠিয়ে নেবেন। এরপর আসবে জবরদস্তিমূলক রাজত্ব। তা তত দিন পর্যন্ত থাকবে, যত দিন আল্লাহ চাইবেন যে তা থাকুক। এরপর যখন আল্লাহ তা উঠিয়ে নিতে চাইবেন তখন উঠিয়ে নেবেন। তারপর আবার প্রতিষ্ঠিত হবে নবুওয়াতের আদলে খিলাফাহ。
আনাস রা.-এর বর্ণনায় এসেছে; রাসুল বলেছেন,
إِنَّهَا نُبُوَّةٌ وَرَحْمَةٌ , ثُمَّ خِلَافَةٌ وَرَحْمَةٌ ، ثُمَّ مُلْكُ عَضُوضُ ثُمَّ جَبْرِيَّةٌ ثُمَّ طَوَاغِيتُ
নিশ্চয়ই এখন রয়েছে নবুওয়াত ও রহমত। এরপর আসবে খিলাফাহ ও রহমত। তারপর আসবে দাঁত কামড়ে থাকা রাজত্ব। এরপর আসবে জবরদস্তিমূলক রাজত্ব। তারপর তাগুতগোষ্ঠী。
এ ছাড়াও মুসলিমদের পবিত্র তিন ভূমি-মক্কা মুকাররামা; যার মধ্যে রয়েছে কাবা ও মসজিদে হারাম, মদিনা মুনাওয়ারা; যেখানে রয়েছে আল্লাহর রাসুলের রওজা এবং মসজিদে নববি এবং সম্মানিত আল কুদস; যা মুসলিমদের প্রথম কিবলা ও তৃতীয় হারাম শরিফ-এর ওপর ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর শত্রুরা অবৈধ জোরদখল প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে। সাধারণভাবে প্রচলিত হলো, এই তিন পবিত্র ভূমির মধ্য থেকে প্রথমে আল কুদস ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমদের হাতছাড়া হয়। আর মক্কা, মদিনা ও আরব উপদ্বীপের ওপর তাগুতগোষ্ঠীর দখল প্রতিষ্ঠিত হয় মার্কিন সেনাবাহিনী ও নব্য ক্রুসেডার জোট ন্যাটো কর্তৃক ১৯৯১ ও ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে পরিচালিত উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ে। কিন্তু আলে সাউদের শাসন সম্পর্কে যাদের জানাশোনা আছে, তাদের এ-ও অজানা নয় যে, প্রত্যক্ষভাবে আল কুদসের পতন আগে মনে হলেও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পরোক্ষভাবে মক্কা ও মদিনা তারও আগে মুসলিমদের হাতছাড়া হয়েছে এবং তার ওপর ক্রুসেডারদের দখল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; বরং নব্য ক্রুসেডারদের তল্পিবাহী যে অশুভ শক্তি মক্কা ও মদিনার ওপর নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে রেখেছিল, তাদের অশুভ প্রভাবেই একসময় আল কুদসেরও পতন ঘটেছিল। ১৯৩৬-১৯৪৭-১৯৬৭-২০০২ সর্বমোট এই চারটি ধাপে মুসলিমদের পবিত্র ভূমিগুলো কুফফারগোষ্ঠীর পুরোপুরি হস্তগত হয়।
এরচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যের কথা হলো, অধিকাংশ মুসলিম আজ তাওহিদের আকিদা বিস্মৃত হয়ে গেছে। তারা রাসুল ও তাঁর সাহাবিগণের সুন্নাহকে বাদ দিয়ে নব-উদ্ভাবিত সব পথ, মত, আদর্শ ও কার্যকলাপকেই বেছে নিয়েছে। অধিকাংশ মুসলমানের অবস্থাই এমন যে, তাদের মধ্যে ইসলামের নাম ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। প্রকৃত ইসলাম অবলম্বনকারী মুসলমানের সংখ্যা বর্তমানে নিতান্তই কম। অধিকাংশ মুসলিমই ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের সঙ্গে পরিচিত নয়। যার কারণে তারা সেই আকিদা-বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিতও হতে পারেনি, যার ওপর ছিলেন রাসুল ও তাঁর সাহাবিরা এবং যা আঁকড়ে থেকেছিলেন মহান সালাফে সালিহিন। রাসুল তাঁর উম্মাহর মধ্যে যে বিভক্তির ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন, বাস্তবে তা-ই হয়েছে। উম্মাহ আজ শতধাবিভক্ত। ইসলামের মৌলিক বিধিবিধান ও নীতিমালায়ও দেখা যায় যত মুখ, তত মত। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ حُذَيْفَةَ بْنَ اليَمَانِ قَالَ: كَانَ النَّاسُ يَسْأَلُونَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ عَنِ الخَيْرِ، وَكُنْتُ أَسْأَلُهُ عَنِ الشَّرِّ، مَخَافَةَ أَنْ يُدْرِكَنِي، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّا كُنَّا فِي جَاهِلِيَّةٍ وَشَرِّ، فَجَاءَنَا اللهُ بِهَذَا الخَيْرِ، فَهَلْ بَعْدَ هَذَا الخَيْرِ مِنْ شَرِّ؟ قَالَ: «نَعَمْ» قُلْتُ: وَهَلْ بَعْدَ ذَلِكَ الشَّرِّ مِنْ خَيْرٍ؟ قَالَ: «نَعَمْ، وَفِيهِ دَخَنُ» قُلْتُ: وَمَا دَخَنُهُ؟ قَالَ: «قَوْمٌ يَهْدُونَ بِغَيْرِ هَدْيِي تَعْرِفُ مِنْهُمْ وَتُنْكِرُ قُلْتُ: فَهَلْ بَعْدَ ذَلِكَ الخَيْرِ مِنْ شَرِّ؟ قَالَ: «نَعَمْ، دُعَاةُ عَلَى أَبْوَابِ جَهَنَّمَ، مَنْ أَجَابَهُمْ إِلَيْهَا قَذَفُوهُ فِيهَا قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ صِفْهُمْ لَنَا، قَالَ: «هُمْ مِنْ جِلْدَتِنَا، وَيَتَكَلَّمُونَ بِأَلْسِنَتِنَا قُلْتُ: فَمَا تَأْمُرُنِي إِنْ أَدْرَكَنِي ذَلِكَ؟ قَالَ: تَلْزَمُ جَمَاعَةَ المُسْلِمِينَ وَإِمَامَهُمْ قُلْتُ: فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُمْ جَمَاعَةٌ وَلَا إِمَامُ؟ قَالَ: «فَاعْتَزِلْ تِلْكَ الفِرَقَ كُلَّهَا، وَلَوْ أَنْ تَعَضَّ بِأَصْلِ شَجَرَةٍ، حَتَّى يُدْرِكَكَ المَوْتُ وَأَنْتَ عَلَى ذَلِكَ»
হুজায়ফা ইবনুল ইয়ামান থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, লোকেরা রাসুল-কে কল্যাণের বিষয়াদি জিজ্ঞেস করত; কিন্তু আমি তাঁকে অকল্যাণের বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম এ ভয়ে যে, অকল্যাণ আমাকে পেয়ে না বসে। আমি জিজ্ঞেস করি, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমরা তো জাহিলিয়াতেও অকল্যাণের মধ্যে ছিলাম। এরপর আল্লাহ আমাদের এ কল্যাণের মধ্যে নিয়ে এলেন। এ কল্যাণের পর আবারও কি অকল্যাণ আসবে?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' আমি জিজ্ঞেস করি, 'সে অকল্যাণের পর আবার কি কোনো কল্যাণ আসবে?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, তবে এর মধ্যে কিছুটা ধূম্রাচ্ছন্নতা থাকবে।' আমি প্রশ্ন করি, 'এর ধূম্রাচ্ছন্নতাটা কীরূপ?' তিনি বললেন, 'এক জামাআত আমার পথ ছেড়ে অন্য পথ অবলম্বন করবে। তাদের থেকে ভালোেকাজও দেখবে এবং মন্দকাজও দেখবে।'
আমি জিজ্ঞেস করি, 'সে কল্যাণের পর কি আবার অকল্যাণ আসবে?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, জাহান্নামের দুয়ারের ওপর দাঁড়ানো আহ্বানকারী এক সম্প্রদায় হবে। যে ব্যক্তি তাদের আহ্বানে সাড়া দেবে, তাকে তারা জাহান্নামে নিক্ষেপ করে ছাড়বে।' আমি বলি, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, তাদের কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা আমাদের বর্ণনা করুন।' তিনি বললেন, 'তারা আমাদের লোকই এবং তারা আমাদের ভাষায়ই কথা বলবে।' আমি বলি, 'যদি এরূপ পরিস্থিতি আমাকে পেয়ে বসে, তাহলে কী করতে নির্দেশ দেন?' তিনি বললেন, 'মুসলিমদের জামাআত ও ইমামকে আঁকড়ে থাকবে।' আমি বলি, 'যদি তখন মুসলিমদের কোনো (সংঘবদ্ধ) জামাআত ও ইমাম না থাকে?' তিনি বললেন, 'তখন সব দলমত পরিত্যাগ করে সম্ভব হলে কোনো গাছের শিকড় কামড়ে পড়ে থাকবে, যতক্ষণ-না সে অবস্থায় তোমার মৃত্যু উপস্থিত হয়。
সেই হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দী থেকেই মুসলিমদের আকিদায় পচন ধরতে শুরু করেছে। এরপর ক্রমান্বয়ে ফিতনা, বিদআত ও আপদ বাড়ছে। বিশেষ করে ক্ষমতাধর শ্রেণির ঔদ্ধত্য এবং পাপিষ্ঠ জ্ঞানীদের দাগাবাজি ও অনৈতিকতার কারণে, যারা হবে উপরিউক্ত হাদিসে উল্লেখিত 'জাহান্নামের দুয়ারের ওপর দাঁড়ানো আহ্বানকারী'-এর যথার্থ প্রয়োগক্ষেত্র। আল্লাহ বলেছেন,
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِّنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ ﴾
হে মুমিনরা, নিশ্চয় আলিম ও দরবেশদের অনেকেই ভুয়া কাজের মাধ্যমে মানুষের সম্পদ গ্রাস করে থাকে আর আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে। [সুরা তাওবা (৯) : ৩৪]
রাসুল বলেন,
إِنَّمَا أَخَافُ عَلَى أُمَّتِي الْأَئِمَّةَ الْمُضِلِّينَ
নিশ্চয়ই আমি আমার উম্মাহর ওপর পথভ্রষ্টকারী নেতাদের আশঙ্কা করি。
এখানে 'পথভ্রষ্টকারী নেতা' শব্দের ব্যাপকতার মধ্যে ফ্যাসিবাদী জালিম শাসক, অসাধু আলিম ও ভ্রান্ত সুফি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যেমন, রাসুল বলেন,
أَخْوَفُ مَا أَخَافُ عَلَى أُمَّتِي كُلِّ مُنَافِقٍ عَلِيمُ اللِّسَانِ
আমি আমার উম্মাহর ওপর যা কিছুর আশঙ্কা করি, তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো প্রত্যেক এমন মুনাফিক, যারা জ্ঞানী জিহ্বার অধিকারী。
জিয়াদ ইবনু হুদায়র রাহ. বর্ণনা করেন,
قَالَ لِي عُمَرُ : «هَلْ تَعْرِفُ مَا يَهْدِمُ الْإِسْلَامَ؟» قَالَ: قُلْتُ: لَا ، قَالَ: «يَهْدِمُهُ زَلَّةُ الْعَالِمِ، وَجِدَالُ الْمُنَافِقِ بِالْكِتَابِ وَحُكْمُ الْأَئِمَّةِ الْمُضِلِّينَ»
উমর রা. আমাকে বললেন, 'তুমি কি জানো, কোন জিনিস ইসলামকে ধ্বংস করে?' আমি বলি, 'জি না।' তিনি বললেন, 'ইসলামকে ধ্বংস করে আলিমের পদস্খলন, কুরআন নিয়ে মুনাফিকের বিবাদ এবং পথভ্রষ্টকারী নেতাদের শাসন。
ইমাম সুফয়ান ইবনু উয়ায়না রাহ. বলেন,
كَانُوا يَقُولُونَ : مَنْ فَسَدَ مِنْ عُلَمَائِنَا فَفِيهِ شَبَهُ مِنْ الْيَهُودِ، وَمَنْ فَسَدَ مِنْ عُبَّادِنَا فَفِيهِ شَبَهُ مِنْ النَّصَارَى.
সালাফগণ বলতেন, আমাদের আলিমদের মধ্যে যারা নষ্ট হয়ে যায়, তাদের মধ্যে ইয়াহুদিদের সাদৃশ্য রয়েছে। আর আমাদের ইবাদতকারীদের মধ্যে যারা নষ্ট হয়ে যায়, তাদের মধ্যে খ্রিষ্টানদের সাদৃশ্য রয়েছে।
জনৈক সালাফ বলেছেন,
احْذَرُوا فِتْنَةَ الْعَالِمِ الْفَاجِرِ وَالْعَابِدِ الْجَاهِلِ، فَإِنَّ فِتْنَتَهُمَا فِتْنَةٌ لِكُلِّ مَفْتُونٍ
তোমরা পাপিষ্ঠ আলিম এবং অজ্ঞ আবিদ থেকে সতর্ক থেকো। কারণ, তাদের ফিতনা প্রত্যেক ফিতনাক্রান্ত ব্যক্তির জন্য বড় ফিতনা。
ইমাম আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহ. কতই-না সুন্দর বলেছেন,
وهل أفسد الدين إلا الملوك *** وأحبار سوء ورهبانها
দীনকে নষ্ট করে ফেলেছে রাজা-বাদশাহ, মন্দ আলিম ও দুনিয়াবিরাগী দরবেশ-সুফিরা।
বর্তমান যুগের আলিম, তালিবুল ইলম এবং দীনি বিভিন্ন মেহনতের সঙ্গে সম্পৃক্ত অধিকাংশ লোকের মধ্যেই পূর্বসূরিদের আদর্শের দেখা পাওয়া যায় না। হ্যাঁ, কিয়ামত পর্যন্ত একদল মানুষ পরিমাণে কম হলেও সর্বদা হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে—এমন সুসংবাদ রাসুল -ই আমাদের শুনিয়ে গেছেন—হাদিসে যাদের 'গুরাবা' নামে নামকরণ করা হয়েছে। এই যুগে যে-সকল আলিম বিদআত, ভ্রষ্টতা এবং বিভিন্ন ভ্রান্ত দল ও মতবাদ থেকে মুক্ত থাকতে পেরেছেন, তারাও সাধারণত ইরজার ভয়াবহ ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকতে পারেননি।
সুতরাং বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ তাগুতের ছত্রছায়ায় থেকে, জিহাদের চেতনার প্রতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অস্বীকৃতি জানিয়ে কেবল ইসলামের উদারতার দাওয়াত ও শান্তির বুলি প্রচার করেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়, মুসলিমদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে চায়, লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার অতল সমুদ্র থেকে নিজেদের উদ্ধার করতে চায়। কেউ চায় আত্মশুদ্ধি বা জ্ঞানবিজ্ঞান প্রচার-প্রসারের দ্বারা এই লক্ষ্য অর্জন করতে। কেউ-বা এই আদর্শ প্রচার করে যে, বর্তমান শাসকরা তাদের সব প্রকার কুফর এবং দীনের বিরোধিতা সত্ত্বেও নিখাদ মুসলিম; উম্মাহর ওপর তাদের আদেশ-নিষেধ শোনা ও তার আনুগত্য করা অকাট্য ফরজ।
তবে এ ক্ষেত্রে মুজাহিদদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তারা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার একমাত্র কার্যকর ও বাস্তবমুখী পথ হলো জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ। রাসুল বলেন,
إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِينَةِ، وَأَخَذْتُمْ أَذْنَابَ الْبَقَرِ، وَرَضِيتُمْ بِالزَّرْعِ، وَتَرَكْتُمُ الْجِهَادَ، سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ ذُلَّا لَا يَنْزِعُهُ حَتَّى تَرْجِعُوا إِلَى دِينِكُمْ
যখন তোমরা 'ইনা' (সুদের বিশেষ রূপ) পদ্ধতিতে ব্যবসা করবে, গরুর লেজ আঁকড়ে ধরবে, কৃষিকাজেই সন্তুষ্ট থাকবে এবং জিহাদ ছেড়ে দেবে, তখন আল্লাহ তোমাদের ওপর লাঞ্ছনা ও অপমান চাপিয়ে দেবেন। তোমরা তোমাদের দীনে (অর্থাৎ, জিহাদে) ফিরে না-আসা পর্যন্ত এই লাঞ্ছনা-অপমান থেকে আল্লাহ তোমাদের মুক্তি দেবেন না。
সুতরাং হাদিসের আলোকেই স্পষ্ট প্রতিভাত হলো, আল্লাহর পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেওয়া লাঞ্ছনা ও অপমান থেকে নিষ্কৃতির একমাত্র পথ হলো জিহাদ। আল্লাহ বলেন,
قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنْصُرُكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُّؤْمِنِينَ وَيُذْهِبْ غَيْظَ قُلُوبِهِمْ وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ) أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تُتْرَكُوا وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَهَدُوا مِنْكُمْ وَلَمْ يَتَّخِذُوا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلَا رَسُولِهِ وَلَا الْمُؤْمِنِينَ وَلِيجَةً وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ﴾
তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো, যাতে আল্লাহ তোমাদের হাতে তাদের শাস্তি প্রদান করেন, তাদের লাঞ্ছিত করেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেন এবং মুমিনদের অন্তর জুড়িয়ে দেন ও তাদের মনের ক্ষোভ দূর করেন। আল্লাহ যার ব্যাপারে ইচ্ছা করেন, তার তাওবা কবুল করেন। আল্লাহর সর্বজ্ঞ, মহা প্রজ্ঞাবান। তোমরা কি মনে করেছ তোমাদের এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে; অথচ আল্লাহ এখনো দেখে নেননি তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদ করে এবং আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও মুমিনদের ছাড়া অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু বানায় না। তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ তা পূর্ণভাবে জানেন। [সুরা তাওবা (৯) : ১৪-১৬]
যারা দীনি বিভিন্ন কাজকে জিহাদের সমতুল্য মনে করে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে এবং জিহাদে পিছিয়ে থাকার মধ্যেই গৌরব বোধ করে, তাদের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করে আল্লাহ বলেন,
أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِّ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجْهَدَ فِي سَبِيلِ اللهِ لَا يَسْتَوْنَ عِنْدَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ ) الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجْهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ﴾
তোমরা কি হাজিদের পানি পান করানো ও মসজিদুল হারামকে আবাদ করার কাজকে সেই ব্যক্তির (কার্যাবলির) সমান মনে করো, যে আল্লাহ ও পরকালে ইমান এনেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে? আল্লাহর কাছে এরা সমতুল্য হতে পারে না। আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছান না। যারা ইমান এনেছে, আল্লাহর পথে হিজরত করেছে এবং নিজেদের জানমাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর কাছে মর্যাদায় অনেক শ্রেষ্ঠ এবং তারাই সফল। [সুরা তাওবা (৯) : ১৯-২০]
এ আয়াতে মূলনীতি বলে দেওয়া হয়েছে যে, সব সৎকাজ সমমর্যাদার হয় না। কেউ যদি তার ওপর অবধারিত ফরজসমূহ আদায় না করে নফল ইবাদতে লিপ্ত থাকে, তবে এটা কোনো সৎকাজ হিসেবেই গণ্য হবে না। নিশ্চয়ই হাজিদের পানি পান করানো একটি মহৎ কাজ; কিন্তু মর্যাদা হিসেবে তা নফল বই কিছু নয়। অনুরূপ মসজিদুল হারামের তত্ত্বাবধানও অবস্থাভেদে ফরজে কিফায়া কিংবা একটি নফল ইবাদত। পক্ষান্তরে ইমান তো মানুষের মুক্তির মৌলিক শর্ত। আর জিহাদ কখনো ফরজে আইন এবং কখনো ফরজে কিফায়া। এর নিচে তা কখনো নামে না। সুতরাং প্রথমোক্ত কাজ দুটির তুলনায় এ দুটির মর্যাদা অনেক উপরে। তাই ইমান ও জিহাদ ব্যতিরেকে দীনি বিভিন্ন কাজের অজুহাত দেখিয়ে কেউ মুমিন ও মুজাহিদদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারে না। যারা ইমান ও জিহাদের পথে অবিচল থাকে, একমাত্র তারাই সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী এবং তারাই সফল। আল্লাহ বলেন,
لَا يَسْتَوِي الْقُعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ وَالْمُجْهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فَضَّلَ اللَّهُ الْمُجْهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ عَلَى الْقُعِدِينَ دَرَجَةً وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَفَضَّلَ اللَّهُ الْمُجْهِدِينَ عَلَى الْقُعِدِينَ أَجْرًا عَظِيمًا دَرَجَتٍ مِّنْهُ وَمَغْفِرَةً وَرَحْمَةً وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا
যে-সকল মুমিন কোনো (শরয়ি) ওজর না থাকা সত্ত্বেও (জিহাদে যোগদান না করে ঘরে) বসে থাকে তারা এবং আল্লাহর পথে নিজেদের সম্পদ ও প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে, তারা সমান নয়। যারা নিজেদের সম্পদ ও প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে, আল্লাহ বসে থাকা লোকদের ওপর মর্যাদায় তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তবে আল্লাহ সবাইকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর যারা ঘরে বসে থাকে, আল্লাহ তাদের ওপর মুজাহিদদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে মহা পুরস্কার দ্বারা গৌরবান্বিত করেছেন। অর্থাৎ, বিশেষভাবে নিজের পক্ষ থেকে উচ্চ মর্যাদা, ক্ষমা ও রহমত। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সুরা নিসা (৪) : ৯৫-৯৬]
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, উপরিউক্ত আয়াতে যে বলা হয়েছে 'আল্লাহবসে থাকা লোকদের ওপর মর্যাদায় তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তবে আল্লাহ সবাইকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন'- এটা সব অবস্থার ওপর প্রযোজ্য নয়; বরং জিহাদ যখন সবার ওপর ফরজে আইন থাকে না, এটা সেই অবস্থার কথা।
সে ক্ষেত্রে যারা জিহাদে না গিয়ে ঘরে বসে থাকে, যদিও তাদের কোনো গুনাহ নেই এবং ইমান ও অন্যান্য সৎকাজের কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে; কিন্তু তাদের চেয়ে যারা জিহাদে যোগদান করে, তাদের মর্যাদা অনেক বেশি। তবে জিহাদ যখন ফরজে আইন হয়ে যায় অর্থাৎ, মুসলিমদের নেতা যখন সকল মুসলিমকে জিহাদে যোগদানের নির্দেশ দেন; কিংবা শত্রুবাহিনী যখন মুসলিমদের ওপর চড়াও হয়, তখন ঘরে বসে থাকা হারাম হয়ে যায়। সে সময়ও যারা ধর্মীয় বিভিন্ন কাজের অজুহাত দেখিয়ে ঘরে বসে থাকে, তাদের জন্য কোনো সুসংবাদের প্রতিশ্রুতি তো দূরের কথা, উলটো শাস্তির সতর্কবাণী রয়েছে। ফরজ সালাতের সময় হলে এই কথা বলে তা এড়িয়ে যাওয়া যায় না যে, আমি রোজাদার, রোজার ফরজের ওপর আমল করছি; কিংবা আমি জাকাত আদায়কারী, জাকাতের ফরজ আমল আমার দ্বারা সম্পন্ন হয়েছে। তাই কর্মবণ্টন নীতি অনুসারে আমি রোজা বা জাকাত নিয়ে থাকি; আর তুমি থাকো তোমার সালাত নিয়ে। কারণ, ফরজে আইন বিধানের ব্যাপারে কর্মবণ্টন নীতি প্রযোজ্য হয় না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ফরজে আইন জিহাদের ব্যাপারে এই অসার অজুহাত প্রদর্শন করতে অনেককেই দেখা যায়; অথচ ফরজে কিফায়া জিহাদ থেকেও যারা পিছিয়ে থাকে-শুধু কুরআনেই নয়, অসংখ্য হাদিসেও তাদের নিন্দা করা হয়েছে। এখান থেকে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে, মুজাহিদ এবং মুজাহিদ নয় এমন ব্যক্তি কখনো সমান হতে পারে না। হাদিসে এসেছে,
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ ، فَقَالَ: دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ يَعْدِلُ الجِهَادَ؟ قَالَ: «لا أَجِدُهُ» قَالَ: «هَلْ تَسْتَطِيعُ إِذَا خَرَجَ المُجَاهِدُ أَنْ تَدْخُلَ مَسْجِدَكَ فَتَقُومَ وَلَا تَفْتُرَ، وَتَصُومَ وَلَا تُفْطِرَ؟»، قَالَ: وَمَنْ يَسْتَطِيعُ ذَلِكَ؟، قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: «إِنَّ فَرَسَ المُجَاهِدِ لَيَسْتَنُّ فِي طِوَلِهِ، فَيُكْتَبُ لَهُ حَسَنَاتٍ
একব্যক্তি আল্লাহর রাসুলের কাছে এসে বলে, আমাকে এমন কাজের কথা বলে দেন, যা জিহাদের সমতুল্য হয়। তিনি বলেন, আমি তা পাচ্ছি না। (তারপর বললেন,) তুমি কি এতে সক্ষম হবে যে, মুজাহিদ যখন বেরিয়ে যায়, তখন থেকে তুমি মসজিদে প্রবেশ করবে এবং দাঁড়িয়ে ইবাদত করবে এবং আলস্য করবে না; আর সিয়াম পালন করতে থাকবে এবং সিয়াম ভাঙবে না। ব্যক্তিটি বলল, এটা কে পারবে? আবু হুরাইরা রা. বলেন, মুজাহিদের ঘোড়া রশির দৈর্ঘ্য পর্যন্ত ঘোরাফেরা করে, এতেও তার জন্য নেকি লেখা হয়。
সহিহ মুসলিমে এ হাদিসের শেষাংশ এভাবে এসেছে,
مَثَلُ الْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللهِ كَمَثَلِ الصَّائِمِ الْقَائِمِ الْقَانِتِ بِآيَاتِ اللَّهِ، لَا يَفْتُرُ مِنْ صِيَامٍ، وَلَا صَلَاةٍ، حَتَّى يَرْجِعَ الْمُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ تَعَالَى
আল্লাহর পথের মুজাহিদের দৃষ্টান্ত হলো রোজাদার এবং আল্লাহর আয়াত পাঠে অনুগত সালাতে দণ্ডায়মান ব্যক্তির মতো, যে রোজা ও সালাতে কোনো রকম আলসেমি করে না-যতক্ষণ-না আল্লাহর পথের মুজাহিদ প্রত্যাবর্তন করে。
রাসুল আরও বলেন,
مَنْ مَاتَ وَلَمْ يَغْزُ، وَلَمْ يُحَدِّثْ بِهِ نَفْسَهُ، مَاتَ عَلَى شُعْبَةٍ مِنْ نِفَاقٍ
যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করল যে, সে কখনো জিহাদ করেনি এবং অন্তরে জিহাদের সংকল্পও রাখেনি, সে একপ্রকার মুনাফিক হয়ে মারা গেল。
مَنْ لَقِيَ اللَّهَ بِغَيْرِ أَثَرٍ مِنْ جِهَادٍ لَقِيَ اللَّهَ وَفِيهِ ثُلْمَةُ.
যে ব্যক্তি জিহাদের কোনো চিহ্ন ছাড়া আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, সে আল্লাহর সঙ্গে এমতাবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে, তার মধ্যে ত্রুটি থাকবে。
জিহাদ পরিত্যাগকারীরা শুধু যে পরকালে শাস্তিপ্রাপ্ত হয় তা নয়; বরং ইহকালেও তারা পথপ্রদর্শন থেকে বঞ্চিত থাকে এবং উদ্ভ্রান্ত হয়ে পৃথিবীতে ইতস্তত বিচরণ করতে থাকে। মুসা আ. যখন বনি ইসরাইলকে নিয়ে মিসর ত্যাগ করেন তখন তারা এক মরুভূমিতে যাত্রাবিরতি করেছিলেন। সে সময় আল্লাহ তাদের নির্দেশ দেন, এখন তোমরা পবিত্র ভূমি অর্থাৎ, ফিলিস্তিনের ওপর আক্রমণ করো। তোমরা বিজয়ীর বেশে শহরে প্রবেশ করবে। বনি ইসরাইল জিহাদ করতে অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি তারা বলতে লাগল- 'সুতরাং তুমি আর তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ করো। আমরা এখানে বসে থাকব।' [সুরা মায়িদা (৫) : ২৪]
জিহাদ পরিত্যাগের শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাদের পথপ্রদর্শন থেকে বঞ্চিত করলেন। আল্লাহ বলেন,
فَإِنَّهَا مُحَرَّمَةٌ عَلَيْهِمْ أَرْبَعِينَ سَنَةً يَتِيهُونَ فِي الْأَرْضِ ۚ فَلَا تَأْسَ عَلَى الْقَوْمِ الْفَٰسِقِينَ
তাহলে (সিদ্ধান্ত এই যে,) তা (পবিত্র ভূমি) ৪০ বছর তাদের জন্য নিষিদ্ধ রইল। তারা পৃথিবীতে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে। সুতরাং তুমি সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের জন্য দুঃখ করো না। [সুরা মায়িদা (৫): ২৬]
আল্লাহর এই শাস্তি অবতীর্ণ হওয়ার পর ৬ লাখ জনতার বিশাল সে জাতি মাত্র ৯০ মাইল দৈর্ঘ্য ও ২৭ মাইল প্রস্থ একটি অঞ্চল থেকে লাগাতার ৪০ বছর পর্যন্ত বের হওয়ার চেষ্টা করেছে; কিন্তু বের হওয়ার কোনো পথ তারা খুঁজে পায়নি। যে স্থান অতিক্রম করে পূর্বে তারা বহুবার নিজ দেশ মিসরে গিয়েছিল, সে স্থান থেকে মিসরে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ তারা খুঁজে পায়নি। সারা দিন পথ চলে সন্ধ্যাবেলায় ঠিক সেখানে এসে উপনীত হতো, যেখান থেকে ভোরবেলা যাত্রা শুরু করেছিল। এই ৪০ বছরে তাদের নবি মুসা ও হারুন আ.-এরও মৃত্যু হয়ে যায়। তাদের যে কাপুরুষেরা মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে জিহাদ পরিত্যাগ করেছিল, কালের বিবর্তনে তাদেরও জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। এরপর ক্রমশ জিহাদি প্রেরণায় উজ্জীবিত নতুন এক প্রজন্ম গড়ে ওঠে। তখন আল্লাহ তাআলা ইউশা ইবনু নুন আ.-কে নবি বানিয়ে তাদের মধ্যে পাঠান। তাঁর নেতৃত্বে মুজাহিদরা শহরে আক্রমণ করে এবং আল্লাহর সাহায্যে বিজয়ীবেশে ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করে।
জিহাদ কতকাল পর্যন্ত ফরজ থাকবে? আল্লাহ নিজেই এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছেন,
وَقَٰتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ ۚ
তোমরা তাদের সঙ্গে লড়াই করতে থাকো, যত দিন-না ফিতনা নির্মূল হয় এবং দীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। [সুরা আনফাল (৮): ৩৯]
কুফর ও শিরকের চেয়ে বড় ফিতনা আর কিছু হতে পারে না। সুতরাং যত দিন পর্যন্ত কুফর ও শিরকের অস্তিত্ব থাকবে এবং দীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য না হবে, তত দিন পর্যন্ত জিহাদ জারি থাকবে। এটা তো যে-কেউ স্বীকার করতে বাধ্য, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দেওয়া আইনের বিপরীতে প্রণীত মানবরচিত আইনকানুন সুস্পষ্ট কুফর। সুতরাং যত দিন পর্যন্ত মুসলিমদের ওপর এই কুফর আরোপিত থাকবে, তত দিন পর্যন্ত এ কথা বলার কোনোই অবকাশ নেই যে, পৃথিবী ফিতনামুক্ত হয়েছে এবং দীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়েছে। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহ. বলেন,
فإذا كان بعض الدين الله وبعضه لغير الله، وجب القتال حتى يكون الدين كله لله.
'আংশিক দীন যদি আল্লাহর জন্য থাকে; আর আংশিক যদি থাকে গাইরুল্লাহর জন্য, তবে যুদ্ধ অপরিহার্য হয়ে যায়, যতক্ষণ-না দীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়。
মুজাহিদদের দৃষ্টিতে জিহাদ শুধু প্রকাশ্য কাফিরদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়; বরং তা মুরতাদ শাসকগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। উবাদা ইবনু সামিত রা. বলেন,
بَايَعَنَا عَلَى... وَأَنْ لَا نُنَازِعَ الأَمْرَ أَهْلَهُ، إِلَّا أَنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاحًا، عِنْدَكُمْ مِنَ اللَّهِ فِيهِ بُرْهَانُ
'আমরা রাসুলের কাছে আরও বায়আত করলাম, আমরা ক্ষমতা-সংক্রান্ত বিষয়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হব না। (তবে তিনি বলে দিলেন,) কিন্তু যদি এমন স্পষ্ট কুফর দেখো, তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান, তবে ভিন্ন কথা。
যেহেতু কুরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে আমাদের বর্তমান লাঞ্ছনাকর পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ ও নিষ্কৃতির পন্থা বাতলে দেওয়া হয়েছে, সুতরাং এ বিষয়ে ভিন্ন কোনো ব্যাখ্যা ও দর্শনের পেছনে ছোটা অর্থহীন। কাফির ও মুরতাদদের লোমশ বাহু ও নৃশংস নখরের আওতা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে, উম্মাহকে চূড়ান্ত লাঞ্ছনা ও অপদস্থতা থেকে মুক্ত করতে চাইলে আমাদের সামনে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।
কেউ যদি এবার জিজ্ঞেস করে, এ যুগে তো মুজাহিদের চেয়ে মুজাহিদ নয় এমন ব্যক্তির সংখ্যা ঢের গুণ বেশি। জিহাদের ময়দানে রয়েছে পর্যাপ্ত জনসংখ্যার অনুপস্থিতি। পুরো উম্মাহই যখন এই মাজলুম ফরজ বিস্মৃত হয়ে আছে, আমি একা আর কী-ই-বা করতে পারি? তাহলে আমরা তাকে আল্লাহর এই শাশ্বত বাণী শুনিয়ে দেবো,
(فَقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا تُكَلَّفُ إِلَّا نَفْسَكَ وَحَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ عَسَى اللَّهُ أَنْ يَكُفَّ بَأْسَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَاللَّهُ أَشَدُّ بَأْسًا وَأَشَدُّ تَنْكِيلًا)
সুতরাং তুমি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো। তোমার ওপর তোমার নিজের ছাড়া অন্য কারও দায়ভার নেই। অবশ্য মুমিনদের উৎসাহ দিতে থাকো। অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ কাফিরদের যুদ্ধ-ক্ষমতা নিঃশেষ করে দেবেন। আল্লাহর শক্তি সর্বাপেক্ষা প্রচন্ড এবং তাঁর শাস্তি অতি কঠোর। [সুরা নিসা (৪) : ৮৪]
এবার কেউ যদি বলে বসে যে, আমরা তখনই কেবল জিহাদ করব, যখন আমাদের জিহাদ কাজে আসবে। যখন এর দ্বারা কাফিরদের যুদ্ধ-ক্ষমতা চূর্ণ হবে এবং বিজয়ের সম্ভাবনা থাকবে। যেহেতু শক্তি-সামর্থ্যের বড় ধরনের তফাতের দরুন আমাদের অসম জিহাদ করার দ্বারা কাফিরদের যুদ্ধ-ক্ষমতা চূর্ণ হবে না এবং তাতে বিজয়ের সম্ভাবনাও থাকবে না, তাই আমরা জিহাদ করব না। আমরা তাকে বলব, যুদ্ধে এসবের সম্ভাবনা আছে নাকি নেই, এ ফলাফল কে নির্ধারণ করবে? যারা কোনো দিন রণাঙ্গনের ধারেকাছেও যায়নি, কোনো দিন বিজয়ের উপকরণ দু-হাতে ছুঁয়েও দেখেনি, যারা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রে পশ্চিমা মিডিয়ার ওপর চূড়ান্ত নির্ভরশীল, তারা নাকি মুজাহিদরা-যারা রণাঙ্গনের ব্যাপারে সর্বাধিক অবগত, শত্রুবাহিনীর স্বরূপ সম্বন্ধে সবচেয়ে বেশি অবহিত এবং যারা প্রকৃত বাস্তবতার প্রত্যক্ষদর্শী ও কালের সাক্ষী?
আজকাল তো মানুষ কারামাত খুঁজে পায় না। এই যুগে মুষ্টিমেয় কিছু মোল্লার হাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের শ্বেত-ভাল্লুক, যুগের হোবল আমেরিকা এবং ৪৯টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত ক্রুসেডার বাহিনীর নির্মম হার ও পরাজয়ের চেয়ে বড় কোনো কারামাত কেউ কি দেখাতে পারবে? মানুষ ইতিহাসের পাতা উলটে ৯০০ বছর আগের সালাহুদ্দিন আইয়ুবিকে খুঁজে বের করে হাপিত্যেশ করে; কিন্তু এই যুগের সালাহুদ্দিন যে তার সামনেই ইসলামের ঝান্ডাকে উড্ডীন করে, এটা যেন সে দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। আমরা কুফফারগোষ্ঠীকে দুর্জয়-অক্ষয় অব্যয় অপ্রতিরোধ্য ভেবে নিয়েছি; কিন্তু মুজাহিদদের সামনে তারা তো এতটাই দুর্বল যে, মুখের সামান্য ফুঁৎকারে ধসে পড়ে তাদের গর্ব ও গৌরবের গগনচুম্বী প্রাসাদ। মুসলমানের বুকের তপ্ত খুনে নয়া পৃথিবীর লাল মানচিত্র আঁকার স্বপ্ন নিয়ে আফগানের পাথুরে ভূমিতে এসে চারদিকে সরষেফুল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না, মৃত্যু থেকে পালিয়ে বেড়ানোর সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষাবধি মৃত্যুর ভয়াল থাবা থেকে কোনোভাবেই নিজেদের মুক্ত করতে পারে না।
বস্তুত ওহির খবরের ওপর আমাদের যতটা বিশ্বাস, তারচেয়ে আমরা অনেক বেশি সুদৃঢ় বিশ্বাস লালন করি পশ্চিমা মিডিয়ার ওপর। যে কারণে আল্লাহর ক্ষমতার ওপর আমাদের যতটা আস্থা, তারচেয়ে কুফফারগোষ্ঠীর বাহ্যশক্তির ওপর আমাদের শতগুণ বেশি নির্ভরতা। তাই তো আমরা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করেও তাদের আশ্রয় পেয়ে যাওয়াকে ইহকালের বড় সফলতা হিসেবে বিবেচনা করি।
এই যুগে জিহাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যে-সকল আলিম মাঝেমধ্যে মন্তব্য করেন, বিবৃতি প্রদান করেন, কলাম লেখেন, ফাতওয়া দেন কিংবা বয়ান-বক্তৃতা করেন– তাদের উচিত প্রথমে মুজাহিদদের সঙ্গে পরামর্শ করা। কারণ, তারাই এ বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত ও অবহিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে হলে তারা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সঙ্গে ঠিকই শলাপরামর্শ করেন, তাদের থেকে প্রকৃত তথ্য জেনে নেন বা নিজের জানা বিষয়গুলো যাচাই করে নেন; কিন্তু জিহাদের ক্ষেত্রে এসে কেন যেন তারা এই পরম সত্য ও ধ্রুব বাস্তবতা বেমালুম ভুলে যান। এ যেন এক বেওয়ারিশ বিষয়। অথচ এটা শুধু অনধিকারচর্চাই নয়; বরং অভব্যতাও বটে। ইলম ও ইনসাফের সব মূলনীতি এখানে এসে উবে যায়, হারিয়ে যায় সব শাশ্বত সত্য, সুর পালটে যায় সবার; আর চারদিকে চোখে পড়ে শুধুই দ্বিমুখী নীতি।
দুই বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি আল মাহমুদ একজন সাধারণ মুসলিম হয়েও এই পরম সত্যকে তাঁর লেখায় এভাবে তুলে ধরেছেন,
'আজ যে যত তর্কই করুন না কেন, মার্কসীয় দর্শনে বিশ্বাসী কোনো পার্টি বা রাষ্ট্র পৃথিবীতে বিপ্লবী শক্তি হিসেবে আর নিজেদের দাবি করতে পারে না; বরং আগ্রাসী শক্তি হিসেবে সমাজতান্ত্রিক সর্বগ্রাসী লোলুপতা চারদিকে তার জিহ্বা বিস্তার করতে চাইছে। আফগানিস্তানে রুশ সৈন্যরা কি বিপ্লবী বাহিনী? না কম্বোডিয়ায় ভিয়েতনামি বাহিনী বিপ্লবী? আফ্রিকার শৃঙ্গে এসব বিপ্লবীর গতিবিধি নিয়ে এই মহাদেশটি আজ এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। কোনো একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য যদি একদল লোক বারুদ ও গন্ধকের পথ বেছে নেয়, তবে তাকেই বিপ্লবী শক্তি বলার কমিউনিস্টদের তথাকথিত প্রবণতাকে যদি আজও কেউ মূল্য দেয়, তবে অবশ্য সাম্প্রতিককালের বিশ্বব্যাপী ঘাত-সংঘাতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মার্কসবাদের সম্পূর্ণ বিরোধী শক্তি ইসলামকেই বিপ্লবী শক্তি বলতে হবে। কারণ, পবিত্র কুরআন-প্রদর্শিত পথে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামি পদ্ধতিতে জীবনযাপনের জন্য কয়েকটি মানবগোষ্ঠী বারুদ, গন্ধক ও রক্তের পথে অগ্রসর হয়েছে। কোথাও তারা প্যালেস্টাইনি গেরিলা, কোথাও আবার পলিসারিও বা মিন্দানাও গেরিলা নামে আখ্যায়িত হলেও উদ্দেশ্য তাদের একই। ... যেখানে রক্তদান ও আত্মত্যাগ নেই, সেখানে ইসলাম আসে না।
ইসলামি রেনেসাঁর মাজলুম কবি, ন্যায়ের পথের নিঃসঙ্গ যাত্রী ফররুখ আহমদের কবিতার নিচের স্তবকটি আলোচ্য বিষয়ে প্রাসঙ্গিক- যদিও শ্বাপদ তোলে বিষাক্ত ফণা, যদিও এখানে অসহ্য হলো হীনতার যন্ত্রণা, তবু বহু দূরে ডাক দিলো আজ হেরার শিখর চূড়া ডেরার কপাট খোলো আজ, বন্ধুরা; পাশবিকতার ললাটে তীক্ষ্ণ তির উদ্যত করো এই সংগ্রাম... জেহাদে বৃহত্তরো- প্রগাঢ় রক্তপাপড়ি খোলার মতো একটি নিমেষ দাও মোরে অন্তত。
কবি অন্যত্র বলেন,
জিহাদের মাঝে জানি শুধু আছে জিন্দেগানি,
চলো সেই পথে মুক্ত প্রাণের হে সন্ধানী!
পাড়ি দাও স্রোত কঠিন প্রয়াসে অকুতোভয়,
এই নিশীথের তীরে হবে ফের সূর্যোদয়。
টিকাঃ
৩০৫ আস-সুন্নাহ, খাল্লাল: ১৩৪৮।
৩৩৬ মুসনাদু আহমাদ: ৯/১৭০।
৩০৭ মুসতাদরাকে হাকিম: ৭৯১১। ইমাম হাকিম রাহ. বলেন, هَذَا حَدِيثُ صَحِيحُ الْإِسْنَادِ وَلَمْ يُخَرِّجَاهُ। ইমাম জাহাবিও তাঁর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেননি।
মুসনাদু আহমাদ: ১৮৪০৬।
280 আস-সুনানুল ওয়ারিদা ফিল-ফিতান: ৪২০।
১০৪১ সহিহ বুখারি: ৭০৮৪; সহিহ মুসলিম: ১৮৪৭।
১০৪২ সুনানু আবি দাউদ: ৪২৫২; সুনানুত তিরমিজি: ২২২৯। ইমাম তিরমিজি বলেন, هَذَا حَدِيثُ حَسَنٌ صَحِيحُ
৩৪৩ মুসনাদু আহমাদ: ১৪৩।
৩৪৪ সুনানুদ দারিমি: ২২০১।
৩৪৫ মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনি তাইমিয়া: ১/১৯৭।
৩৪৬ সুনানু আবি দাউদ: ৩৪৬২।
৩৪৭ সহিহ বুখারি: ২৭৮৫।
৩৪৮ সহিহ মুসলিম: ১৮৭৮।
৩৪৯ সহিহ মুসলিম: ১৯১০; সুনানু আবি দাউদ: ২৫০২।
৫৫০ সুনানুত তিরমিজি: ১৬৬৬; আল-মুসতাদরাক, হাকিম: ২৪২০।
৩৫১ দ্রষ্টব্য- তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন।
৩৫২ দ্রষ্টব্য-তাফসিরে তাবারি এবং তাফসিরে ইবনু কাসির থেকে আলোচ্য আয়াতের তাফসির। আয়াতের এই তাফসির রায়িসুল মুফাসসিরিন আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে এবং এটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ তাফসির।
*** আল-ফাতাওয়াল কুবরা: ৫/৫০৪।
*** সহিহ বুখারি: ৭০৫৬; সহিহ মুসলিম: ১৭০৯।
৩৫৫ আল মাহমুদ-শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ: ৫৭-৫৮। কবির কণ্ঠে যেন উচ্চকিত হয়েছে উর্দু কবিতার সেই সুর- 'ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কে বাদ।'
৩৫৬ কবিতা: এই সংগ্রাম, সিরাজাম মুনিরা কাব্যগ্রন্থ।
৩৫৭ কাফেলা কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার অংশ।