📄 এ যুগের মুজাহিদ
প্রত্যেক যুগে অসংখ্য হকপন্থি জামাআত ইসলামের পক্ষে ও মানবতার কল্যাণে কাজ করে থাকে। বর্তমানেও বিভিন্ন জামাআত এই মহান ব্রত পালন করে যাচ্ছেন। এই ধারা কিয়ামত পর্যন্ত ইনশাআল্লাহ জারি থাকবে। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে অসংখ্য দীনি জামাআতের মধ্যে একটি জামাআত সবচেয়ে বেশি কোণঠাসা। যদি জিজ্ঞেস করা হয়, সেই জামাআত কোনটি? তাহলে নির্দ্বিধায়-নিঃসংকোচে দীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে এমন যে-কেউ এর উত্তর দিতে পারবে।
এই মাজলুম জামাআত হলো মুজাহিদদের জামাআত, যারা নিজেদের জীবন আল্লাহর পথে উৎসর্গ করেছে। যাঁরা ইসলাম নামক বৃক্ষের গোড়ায় পানি নয়; বরং নিজেদের বুকের তাজা খুন সিঞ্চন করেছে। যাঁদের জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্য আল্লাহর দুনিয়ায় আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করা, তাগুতের সঙ্গে সর্বপ্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং আপসকামিতা পরিহার করে শাশ্বত ইসলাম বিজয়ী করা। এই মুজাহিদদের সঙ্গে সাধারণভাবে তিন ধরনের আচরণ করা হয় :
১. সাধ্যমতো তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়— হোক তা দৈহিক, মানসিক ও আর্থিক কিংবা অন্য কোনো উপায়ে। এমনকি তাঁদের মদদের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা বা নিদেনপক্ষে অন্তর থেকে তাঁদের সমর্থন করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
২. তাদের বিরোধিতা করা হয়। বিরোধিতার যত সুযোগ ও উপায় আছে, সাধ্যমতো তার কোনোটিই বাদ দেওয়া হয় না।
৩. মাঝামাঝি অবস্থান। না তাদের সহযোগিতা আর না তাদের বিরোধিতা। এরা মূলত মুজাহিদদের চূড়ান্ত পরিণাম দেখতে প্রতীক্ষারত। সমর্থকদের সমর্থন এবং বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধাচরণ দেখে এরা দোদুল্যমান। পরিশেষে বিজয় যাদের হবে, এরা তাদেরই দলে ভিড়বে, এটাই তাদের প্রত্যাশা।
নিশ্চয়ই আল্লাহর পথের সৈনিকরা ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। অন্যদের মতো তাদেরও ভুলত্রুটি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের বিচ্ছিন্ন কিছু ভুলকে কেন্দ্র করে তাদের থেকে জনসাধারণের আস্থা ও নির্ভরতা সরানোর প্রয়াস পরিণামের বিচারে ভালো কিছু বয়ে আনে না। এর দ্বারা মূলত তাগুতগোষ্ঠী, ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর শত্রুরাই উপকৃত হয়। মুজাহিদদের ভুল-সংশোধনের নববি পদ্ধতি রয়েছে। নবির অনুসারী দাবিদার এবং নববি ইলমের ধারক অর্থাৎ, হাদিসে নবিগণের উত্তরাধিকারী হিসেবে যাদের আখ্যায়িত করা হয়েছে, তাদের উচিত মুজাহিদদের ভুল-সংশোধনের ক্ষেত্রে নববি মানহাজ ও পদ্ধতি গ্রহণ করা, যাতে জীবনের অন্যান্য বিষয়ের মতো এ ক্ষেত্রেও সুন্নাহর ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা যায়। সর্বপ্রকার বিচ্যুতি ও স্থলন থেকে বাঁচা যায়। কারণ, এ যুগের মুজাহিদদের ভুলত্রুটি নতুন কোনো বিষয় নয়, খোদ সাহাবিদেরও জিহাদে ভুলত্রুটি হয়েছে। কিন্তু এ জন্য রাসুল ﷺ তাঁদের পুরো জিহাদকে বাতিল আখ্যা দেননি। যতটুকু প্রাপ্য তারচেয়ে বেশি নিন্দা করেননি; বরং তিনি আদর্শিক পন্থায় তাঁদের সতর্ক করেছেন, তাঁদের ভুলত্রুটি সংশোধন করে দিয়েছেন।
নীতির বুলি তো অনেকেই আওড়াতে পারে; কিন্তু খুব কম মানুষই সেগুলো কার্যে পরিণত করার সৎসাহস রাখে। এই যুগে মুজাহিদদের ঢালাও বিরোধিতা একটা ট্রেন্ড (রেওয়াজ) হয়ে গেছে। ইনসাফের সব নীতিকথা যেখানে এসে উপেক্ষিত হয়ে যায়। মধ্যপন্থার ফেরিওয়ালারাও এখানে এসে ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। অথচ আল্লাহর নির্দেশ ছিল— 'কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি যেন তোমাদের ইনসাফ পরিহার করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা ই করো। এটাই তাকওয়ার নিকটতর।' [সুরা মায়িদা : (০৫) ০২]
পেছনে পড়ে থাকা যে-সকল ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন কিছু ভুলত্রুটির কারণে জিহাদরত জামাআতগুলোর চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে ছাড়ে, প্রতিশোধপরায়ণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে উগ্র আচরণ করতে শুরু করে, তাদের উচিত নিজেদের পেছনে পড়া। মুজাহিদদের সার্বিক অসহযোগিতা, তাগুতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ, উম্মাহকে জিহাদের ওপর তারবিয়াত না করা, জিহাদ ফরজ না-হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে ইদাদের (প্রস্তুতিগ্রহণ) সার্বক্ষণিক ফরজ ত্যাগ করার দরুন নিজেরাই নিজেদের আরও বেশি নিন্দা, ভর্ৎসনা ও সমালোচনা করা। তবেই না সাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবে। অন্যথায় দ্বিমুখীনীতি অনুসরণের কারণে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে তারা অপরাধী হিসেবে বিবেচ্য হবে।