📄 গাফলতির নিন্দা
এইতো কিছুকাল আগেও পৃথিবী ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রভিত্তিক জাতীয়তাকে বিদায় জানানোর দাবি তুলে গণতন্ত্র (Democracy), ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism), স্বাধীনতা (Liberation), সমানাধিকার (Equal Rights) ও মানবাধিকার (Human Rights) প্রভৃতি ফাঁকা বুলিকে খুব বেশি পরিমাণে মুখে আওড়িয়েছে। নিজেদের আদর্শের ভিত্তি এসব ঠুনকো জিনিসের ওপর দাঁড় করিয়েছে— One man, One vote। প্রত্যেক ব্যক্তি পৃথিবীর শৃঙ্খলা পরিচালনায় সমঅধিকারপ্রাপ্ত। প্রত্যেকেই নিজের পছন্দসই শাসনব্যবস্থা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার অধিকার রাখে। এগুলো এত বেশি উচ্চারিত হয়েছে যে, এখন পুরোই চর্বিতচর্বণ হয়ে গেছে।
প্রাচীন ধর্মভিত্তিক ধারার রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র (Nation States)-এর ধারার সূচনা করা হয়েছে; কিন্তু (তাদের ভাষ্য অনুসারে) ‘ঈশ্বরহীন এই পৃথিবী’তে ব্যাপকভাবে কল্পিত বা ক্ষুদ্র পরিসরে চর্চিত নীতির বাইরে গিয়েও আমরা বর্তমানে অনেক দেশে বেশকিছু কট্টর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক ধারার উত্থান দেখতে পাই। যেমন: ইসরাইলে ইয়াহুদিবাদের দুর্বার রাজত্ব, ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের হিংস্র শাসন আর চীন-মিয়ানমার প্রভৃতি রাষ্ট্রের দিকে তাকালে দেখতে পাই শান্তির স্লোগানধারী বৌদ্ধদের অশান্ত সহিংস রাজত্ব।
আমেরিকার ২০১৭-২০২০ মেয়াদের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজের ভাষ্য অনুসারেই হোয়াইট হাউজের ইতিহাসে ইসরাইলের স্বার্থের সর্বাধিক সংরক্ষণকারী। ট্রাম্প শুধু একজন ক্রুসেডারই নয়; বরং সে ছিল একজন শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীও। তার চার বছরের শাসনামলে (২০১৭-২০২০) শ্বেতাঙ্গদের হাতে প্রায় ২ হাজারেরও বেশি কৃষ্ণাঙ্গ নিহত হয়েছে। এমনকি কিছু হত্যাকাণ্ডের পেছনে মার্কিন পুলিশেরও প্রত্যক্ষ মদদ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ দ্বন্দ্ব ছিল বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ের অন্যতম। বিষয়টা ইতিমধ্যে সারা বিশ্বের দৃষ্টি কেড়েছে।
২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের প্রধানমন্ত্রীত্বের আসন গ্রহণ করে গেরুয়া সন্ত্রাসের (Saffron terror or Hindu extremism) উসকানিদাতা নরেন্দ্র মোদি। প্রথম দফার ক্ষমতার মেয়াদ সমাপ্ত করে সে এখন দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতার বাগডোর আগলে রেখেছে। এ সময়ে Mob Lynching, তিন তালাকের পরিবর্তিত আইন, গো-হত্যার বদলে মুসলিম হত্যা, সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বিলোপ করে কাশমিরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করা, কাশমিরে মুসলিম গণহত্যা অব্যাহত রাখা ও আগের চেয়েও ভয়ংকর জেনোসাইডের পথে হাঁটা, উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের স্থলে রাম মন্দির নির্মাণের পূর্বপ্রস্তুতি সম্পন্ন করা, তাজমহলের নাম পরিবর্তন করে তেজ মন্দির রাখার পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রভৃতি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে মোদির বিজেপি সরকার।
২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে জুমুআর সালাতে সমবেত মুসলিমদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। ঘাতক নিজেকে বিভিন্ন আলামতের দ্বারাই ক্রুসেড আদর্শের সৈনিক হিসেবে প্রকাশ করে। আক্রমণকারী তার অস্ত্র ও অন্যান্য সামগ্রীতে কালো কালি দিয়ে যাদের নাম লিখে রেখেছিল, তাদের মধ্যে একজন ছিল পোল্যান্ডের রাজা। এ বিষয়টির বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পোল্যান্ডের জনৈক মন্ত্রী বলে, 'এই রাজা আমাদের গর্ব, যিনি ইউরোপে মুসলিমদের (উসমানি সালতানাত) কপালে পরাজয়ের তিলক এঁকেছেন।'
নয়া পোল্যান্ডের অবস্থার দিকে নজর দিলেও দেখা যায়, সেখানকার আইনে স্পষ্ট বলা আছে, পোল্যান্ডের ইমিগ্রেশন পলিসি (অভিবাসন নীতি) মোতাবেক রাষ্ট্রে মুসলিম ও কৃষ্ণাঙ্গদের অবস্থানের ব্যাপারটি বিবেচনাধীন (অর্থাৎ, নিষিদ্ধ)।
ব্রিটেনের ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের পার্লামেন্ট নির্বাচনে 'ট্রাম্পের ব্রিটিশ ভার্সন' বরিস জনসনের (Boris Johnson) নেতৃত্বে কনজারভেটিভ পার্টি (রক্ষণশীল দল) জয়লাভ করে। বরিস জনসন একজন শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ-পূজারি, বিকৃত খ্রিষ্টধর্মের কট্টর অনুসারী এবং আপাদমস্তক মুসলিমবিরোধী।
শিনজিয়াং (পূর্ব তুর্কিস্তান)-এ বসবাসকারী ১ কোটিরও অধিক মুসলিমের ওপর চীনের ভয়াবহ নির্যাতন, কাজাখ অঞ্চলে বৌদ্ধদের তান্ডবলীলা, মুসলিম নারীদের পর্দার ওপর অবৈধ হস্তক্ষেপ, আল কুরআন বাতিল করার ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের কথা না-ই বা বললাম।
দুঃখ শুধু এটাই যে, বিভিন্ন ফাঁকা বুলি আওড়িয়ে এবং অলীক স্বপ্নের পেছনে তাড়িত করে নব্য ক্রুসেডার গোষ্ঠী এবং তাদের এজেন্টরা গোটা দুনিয়ার মুসলিমদের ভুলিয়ে রেখেছে। তবে নিজেরা ঠিকই যা হাসিল করার তা পুরোদস্তুর হাসিল করে নিচ্ছে। আফসোস, জাতি এখনো ঘুমে। কবে যে তাদের এই ঘুম ভাঙবে! জাতির আলিমরা কবে যে বাস্তবতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ও সচেতন হয়ে শক্ত হাতে ডুবুডুবু তরীর হাল ধরবে এবং দুর্বার প্রতিরোধ-আন্দোলন গড়ে তুলবে, তা আল্লাহই ভালো জানেন।
📄 এ যুগের মুজাহিদ
প্রত্যেক যুগে অসংখ্য হকপন্থি জামাআত ইসলামের পক্ষে ও মানবতার কল্যাণে কাজ করে থাকে। বর্তমানেও বিভিন্ন জামাআত এই মহান ব্রত পালন করে যাচ্ছেন। এই ধারা কিয়ামত পর্যন্ত ইনশাআল্লাহ জারি থাকবে। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে অসংখ্য দীনি জামাআতের মধ্যে একটি জামাআত সবচেয়ে বেশি কোণঠাসা। যদি জিজ্ঞেস করা হয়, সেই জামাআত কোনটি? তাহলে নির্দ্বিধায়-নিঃসংকোচে দীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে এমন যে-কেউ এর উত্তর দিতে পারবে।
এই মাজলুম জামাআত হলো মুজাহিদদের জামাআত, যারা নিজেদের জীবন আল্লাহর পথে উৎসর্গ করেছে। যাঁরা ইসলাম নামক বৃক্ষের গোড়ায় পানি নয়; বরং নিজেদের বুকের তাজা খুন সিঞ্চন করেছে। যাঁদের জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্য আল্লাহর দুনিয়ায় আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করা, তাগুতের সঙ্গে সর্বপ্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং আপসকামিতা পরিহার করে শাশ্বত ইসলাম বিজয়ী করা। এই মুজাহিদদের সঙ্গে সাধারণভাবে তিন ধরনের আচরণ করা হয় :
১. সাধ্যমতো তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়— হোক তা দৈহিক, মানসিক ও আর্থিক কিংবা অন্য কোনো উপায়ে। এমনকি তাঁদের মদদের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা বা নিদেনপক্ষে অন্তর থেকে তাঁদের সমর্থন করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
২. তাদের বিরোধিতা করা হয়। বিরোধিতার যত সুযোগ ও উপায় আছে, সাধ্যমতো তার কোনোটিই বাদ দেওয়া হয় না।
৩. মাঝামাঝি অবস্থান। না তাদের সহযোগিতা আর না তাদের বিরোধিতা। এরা মূলত মুজাহিদদের চূড়ান্ত পরিণাম দেখতে প্রতীক্ষারত। সমর্থকদের সমর্থন এবং বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধাচরণ দেখে এরা দোদুল্যমান। পরিশেষে বিজয় যাদের হবে, এরা তাদেরই দলে ভিড়বে, এটাই তাদের প্রত্যাশা।
নিশ্চয়ই আল্লাহর পথের সৈনিকরা ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। অন্যদের মতো তাদেরও ভুলত্রুটি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের বিচ্ছিন্ন কিছু ভুলকে কেন্দ্র করে তাদের থেকে জনসাধারণের আস্থা ও নির্ভরতা সরানোর প্রয়াস পরিণামের বিচারে ভালো কিছু বয়ে আনে না। এর দ্বারা মূলত তাগুতগোষ্ঠী, ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর শত্রুরাই উপকৃত হয়। মুজাহিদদের ভুল-সংশোধনের নববি পদ্ধতি রয়েছে। নবির অনুসারী দাবিদার এবং নববি ইলমের ধারক অর্থাৎ, হাদিসে নবিগণের উত্তরাধিকারী হিসেবে যাদের আখ্যায়িত করা হয়েছে, তাদের উচিত মুজাহিদদের ভুল-সংশোধনের ক্ষেত্রে নববি মানহাজ ও পদ্ধতি গ্রহণ করা, যাতে জীবনের অন্যান্য বিষয়ের মতো এ ক্ষেত্রেও সুন্নাহর ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা যায়। সর্বপ্রকার বিচ্যুতি ও স্থলন থেকে বাঁচা যায়। কারণ, এ যুগের মুজাহিদদের ভুলত্রুটি নতুন কোনো বিষয় নয়, খোদ সাহাবিদেরও জিহাদে ভুলত্রুটি হয়েছে। কিন্তু এ জন্য রাসুল ﷺ তাঁদের পুরো জিহাদকে বাতিল আখ্যা দেননি। যতটুকু প্রাপ্য তারচেয়ে বেশি নিন্দা করেননি; বরং তিনি আদর্শিক পন্থায় তাঁদের সতর্ক করেছেন, তাঁদের ভুলত্রুটি সংশোধন করে দিয়েছেন।
নীতির বুলি তো অনেকেই আওড়াতে পারে; কিন্তু খুব কম মানুষই সেগুলো কার্যে পরিণত করার সৎসাহস রাখে। এই যুগে মুজাহিদদের ঢালাও বিরোধিতা একটা ট্রেন্ড (রেওয়াজ) হয়ে গেছে। ইনসাফের সব নীতিকথা যেখানে এসে উপেক্ষিত হয়ে যায়। মধ্যপন্থার ফেরিওয়ালারাও এখানে এসে ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। অথচ আল্লাহর নির্দেশ ছিল— 'কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি যেন তোমাদের ইনসাফ পরিহার করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা ই করো। এটাই তাকওয়ার নিকটতর।' [সুরা মায়িদা : (০৫) ০২]
পেছনে পড়ে থাকা যে-সকল ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন কিছু ভুলত্রুটির কারণে জিহাদরত জামাআতগুলোর চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে ছাড়ে, প্রতিশোধপরায়ণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে উগ্র আচরণ করতে শুরু করে, তাদের উচিত নিজেদের পেছনে পড়া। মুজাহিদদের সার্বিক অসহযোগিতা, তাগুতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ, উম্মাহকে জিহাদের ওপর তারবিয়াত না করা, জিহাদ ফরজ না-হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে ইদাদের (প্রস্তুতিগ্রহণ) সার্বক্ষণিক ফরজ ত্যাগ করার দরুন নিজেরাই নিজেদের আরও বেশি নিন্দা, ভর্ৎসনা ও সমালোচনা করা। তবেই না সাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবে। অন্যথায় দ্বিমুখীনীতি অনুসরণের কারণে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে তারা অপরাধী হিসেবে বিবেচ্য হবে।