📄 কুফরের নিদর্শনের কারণে তাকফির করা : একটি সংশয় নিরসন
কিছু অবুঝ ভাইয়ের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে এই আপত্তি করা হয় যে, ইমান ও কুফর হলো অন্তরের বিষয়, যা অদৃশ্য ও গোপন। সুতরাং বাহ্যিক নিদর্শন দেখে কাউকে তাকফির করা কোনো অবস্থাতেই সংগত নয়। তারা ফকিহগণের এসব দীর্ঘ আলোচনাকে একবাক্যে অনর্থক, অর্থহীন ও সীমালঙ্ঘন বলে সাব্যস্ত করেন। নিজেদের এমন মানসিকতার কারণে দুনিয়ার কোনো মুসলিম পরিচয়ধারীকে তারা কাফির বলতে রাজি নন।
কুরআন খুললে আমরা দেখতে পাই, অসংখ্য আয়াত ও হাদিসে কুফরের নিদর্শনের কারণে তাকফির করা হয়েছে। যেমন: কয়েক পৃষ্ঠা আগে সুরা তাওবার উদ্ধৃতিতে একদল মুসলিম পরিচয়ধারীকে আল্লাহ কর্তৃক তাকফির করার বৃত্তান্ত উল্লেখ করেছি। তারা তাদের এহেন কুফরি আচরণের পক্ষে ওজরও পেশ করেছিল; কিন্তু তাদের ওজর আল্লাহ গ্রহণ করেননি। রাসুলের পরে খুলাফায়ে রাশিদিনের যুগেও সর্বসম্মতভাবে এই পন্থা চলেছে। তারা কখনোই কারও অন্তর চিঁড়ে দেখে তাকফিরের ফাতওয়া জারি করেননি। কাউকে মুসলিম বলার জন্য যেমন তার অন্তর চিঁড়ে দেখা হয় না, কারও থেকে কুফরের সুদৃঢ় বাহ্যিক নিদর্শন বা প্রতীক প্রকাশিত হলে তাকে কাফির বলার জন্যও অন্তর চিঁড়ে দেখার প্রয়োজন পড়ে না। সহিহ বুখারি গ্রন্থে বর্ণিত জাকাত অস্বীকারকারীদের ব্যাপারে আবু বকর ও উমর রা.-এর কথোপকথন এবং এরপর সকল সাহাবির তা মেনে নেওয়ার ঘটনা দ্বারা বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।
এ ছাড়াও একটি স্বীকৃত মূলনীতি হচ্ছে, যে বিষয়গুলো অদৃশ্য, যা অন্তর চিঁড়ে দেখা সম্ভব নয়, সেসব ক্ষেত্রে বাহ্যিক নিদর্শন দ্বারাই প্রকৃত অবস্থার বিবেচনা করা হয়। খুশি, বেদনা, ক্ষোভ, বিষাদ ইত্যাদি বিষয় মানুষ বাহ্যিক অবস্থা দেখেই বোঝে। একই কথা ইসলাম ও কুফরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদিও ইসলাম ও কুফর মৌলিকভাবে অন্তরের বিষয়; কিন্তু শক্তিশালী বাহ্যিক কিছু নিদর্শনকে এর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আল্লামা মাওসিলি রাহ. লেখেন,
ان الإتيان بخاصية الكفر يدل على الكفر، فإن من سجد لصنم أو تزيا بزنار أو لبس قلنسوة المجوس يحكم بكفره.
'কুফরের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য পালন বা ধারণ করা কুফরের প্রমাণ বহন করে। সুতরাং যে ব্যক্তি কোনো মূর্তিকে সিজদা করবে, (বিধর্মীদের) বিশেষ ফিতা বা বেল্ট ব্যবহার করবে; কিংবা মাজুসিদের (অগ্নিপূজারিদের) টুপি পরিধান করবে, তার ব্যাপারে কুফরের সিদ্ধান্ত প্রদান করা হবে。
আল্লামা কাসিম ইবনু কুতলুবুগা রাহ. বলেন,
إن الشارع اعتبر في إثبات الكفر وجود علامة التكذيب فقط.
'কুফর সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে শরিয়ত-প্রণেতা শুধু অস্বীকারের নিদর্শন পাওয়াকেই বিবেচনা করেছেন。
আল্লামা খায়ালি রাহ. লেখেন,
إن أمارة الأمور الخفية كافية في ضحة إطلاق اللفظ على سبيل الحقيقة كالغضبان والفرحان.
'যেসব বিষয় অদৃশ্য-যেমন, ক্রোধ ও খুশি, সেগুলোর মর্মপ্রকাশক শব্দ প্রকৃত অর্থে ব্যবহারের জন্য বাহ্যিক নির্দেশের বিবেচনাই যথেষ্ট。
টিকাঃ
৩১২ আল-ইখতিয়ার লি তালিলিল মুখতার: ৪/১৫০।
৩১৩ হাশিয়াতুল ইমাম কাসিম আলাল মুসায়ারা: ২৮১।
৩১৪ খায়ালি আলা শারহিল আকায়িদ: ১৩৩।
📄 মুজাহিদদের তাকফিরনীতি
পাঠক, ইতিমধ্যে আপনি তাকফিরের মূলনীতি সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত হয়েছেন। গ্রন্থের শেষ পর্যায়ে এসে আমরা আপনার ছোট্ট একটা পরীক্ষা নেব। পুরো বই অধ্যয়ন করে আপনি কী হাসিল করলেন, তার একটা সমীক্ষা এখানে হয়ে যাবে। নিচে আমরা মুজাহিদদের গ্লোবাল মানহাজের তাকফিরনীতি সম্পর্কে আলোচনা করব। শায়খ আবু মুসআব সুরি রচিত 'দাওয়াতুল মুকাওয়ামা'র আলোকে আমরা তাকফিরনীতির ধারাগুলো তুলে ধরব। এখন আপনার কাজ হচ্ছে, তাকফিরনীতিটি ভালোভাবে অধ্যয়ন করা এবং পূর্বের মূলনীতিগুলোর সঙ্গে এগুলো মিলিয়ে দেখা। তাহলে আসুন, প্রথমে মানহাজটি দেখে নিই। এরপর বাকি কাজ আপনার জিম্মায় :
১. দাওয়াতুল মুকাওয়ামার আকিদা হলো আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের তাত্ত্বিক, প্রায়োগিক ও ফিকহি মাজহাবের সবগুলোই গ্রহণীয়। দাওয়াতুল মুকাওয়ামা প্রত্যেক এমন মুসলিমকে সাহায্যের আহ্বান করে, যারা তাওহিদের কালিমার সাক্ষ্য দেয় এবং কুরআনকে নিজেদের কিতাব, কাবাকে নিজেদের কিবলা ও মুসলিম উম্মাহকে নিজেদের উম্মাহ মনে করে। কাজেই দাওয়াতুল মুকাওয়ামা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতকে সঙ্গে নিয়ে জিহাদ করে, আহলে কিবলাকে সঙ্গে নিয়ে উম্মাহর মদদ করে এবং ইসলামি রাজনীতির নিয়ম-পদ্ধতি অনুসারে মুসলিমদের ওপর আগ্রাসী শত্রুর প্রতিরোধের জন্য প্রত্যেক ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তির কাছে সাহায্য কামনা করে।
২. দাওয়াতুল মুকাওয়ামা বিশ্বাস করে, মুসলিমদের ওপর আগ্রাসী কাফিরদের প্রতিহত করতে ধনী-গরিব, আমির-ফকির নির্বিশেষে সর্বস্তরের মুসলিমদের মধ্য থেকে প্রত্যেক নেককার ও বদকারকে সঙ্গে নিয়ে জিহাদ করার শরয়ি অনুমোদন বা বৈধতা রয়েছে। আর এটি আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মূল আকিদার অন্তর্ভুক্ত বিষয়।
৩. দাওয়াতুল মুকাওয়ামা বিশ্বাস করে, মুসলিমদের ওপর আগ্রাসী জায়নবাদী ও খ্রিষ্টবাদী (Christianist) ক্রুসেডারদের আক্রমণ নিম্নবর্ণিত শক্তিগুলোর সম্মিলিত পদক্ষেপ :
• ইয়াহুদি (Jew) ও জায়নবাদী (Zionist) বৈশ্বিক শক্তি; যাদের নেতৃত্বে রয়েছে ইসরাইল।
• বিশ্বব্যাপী ক্রুসেডীয় বা খ্রিষ্টবাদী শক্তি; যাদের নেতৃত্বে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এরপর রাশিয়া ও ন্যাটো জোটভুক্ত রাষ্ট্রসমূহ; আর তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ ক্রুসেডার রাষ্ট্রসমূহ।
• মুরতাদ (নাস্তিক্যবাদী, ইসলামত্যাগী, ইসলামবিরোধী) অপশক্তি; যার নেতৃত্বে রয়েছে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর পুতুল সরকার এবং বিশ্বব্যাপী তাদের প্রতিষ্ঠিত আইন ও সংবিধান।
• মুনাফিক শক্তি; যার নেতৃত্বে রয়েছে কিছু প্রথাগত দীনি সংস্থা; আর রয়েছে দরবারি আলিম ও মুনাফিক ফকিহরা। আরও রয়েছে বিভিন্ন হলুদ মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, যারা মুসলিমদের ওপর শত্রুদের হামলা সমর্থন করে।
মোটকথা, বিশ্বব্যাপী আমাদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন পরিচালনাকারী শক্তিগুলো হলো ইয়াহুদিবাদী শক্তি, যার নেতৃত্ব দিচ্ছে ইসরাইল। বিশ্বব্যাপী ক্রুসেডীয় শক্তি, যা আমেরিকা, ব্রিটেন, ন্যাটো জোট ও রাশিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। মুরতাদদের প্রতিষ্ঠানসমূহ, ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বুদ্ধিজীবী ও তাদের সাংস্কৃতিক প্রচারমাধ্যম। মুনাফিক আলিম ও যুদ্ধরত সশস্ত্র বাহিনীগুলো।
৪. দাওয়াতুল মুকাওয়ামা মনে করে, ইয়াহুদি, ক্রুসেডার, মুরতাদ ও মুনাফিকদের এই সম্মিলিত জোটের বিরুদ্ধে জিহাদ করা তাওহিদের কালিমার সাক্ষ্য দেয়—এমন প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজে আইন। আর এই ফরজ আদায়কারী সাওয়াবের অধিকারী হবে এবং তা পরিত্যাগকারী গুনাহগার হবে।
৫. দাওয়াতুল মুকাওয়ামা মনে করে, ইয়াহুদি, ক্রুসেডার, মুরতাদ এবং আরও যারা তাদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ, তাদের প্রতিরোধের মাধ্যম হলো সশস্ত্র লড়াই। আর মুনাফিক শক্তি তথা উলামায়ে সু, দরবারি ফকিহ এবং তাগুতি মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মোকাবিলার মাধ্যম হলো তাত্ত্বিক ও তাথ্যিক লড়াই।
৬. আল্লাহ বলেন, 'তুমি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে থাকো। তুমি শুধু তোমার নিজের ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত। আর মুমিনদের উদ্বুদ্ধ করতে থাকো।' [সুরা নিসা: (০৪) ৮৪]
এ আয়াতকে মূল ধরে দাওয়াতুল মুকাওয়ামা মনে করে, জিহাদ করা এবং জিহাদের দাওয়াত দেওয়া প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজে আইন এবং প্রত্যেকে এ ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসিত হবে। আর এ লক্ষ্যে প্রাথমিক যাবতীয় প্রচেষ্টাকে আগ্রাসী অপশক্তির বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য সহযোগিতা হিসেবে গণ্য হবে। কাজেই এ মানহাজ হলো মুসলিম উম্মাহর জিহাদি মানহাজ। এটা কোনো বিশেষ দল-গোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট নয়।
৭. দাওয়াতুল মুকাওয়ামা মনে করে, মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং তাদের সহযোগী যুদ্ধরত জোট যেভাবে ব্যাপক ও সর্বাত্মক পরিকল্পনা নিয়ে আগ্রাসী আক্রমণে লিপ্ত, তেমনই মুসলিম উম্মাহরও উচিত অনুরূপ সর্বাত্মক পরিকল্পনার আওতায় জিহাদের শরিয়তসম্মত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করা। সামরিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, নগরায়ণ থেকে শুরু করে সব বিষয়ের নিখুঁত পরিকল্পনা করা, যে পরিকল্পনা মুসলিম ভূমি থেকে তাদের হটে যেতে বাধ্য করবে এবং অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হওয়ার ভয়ে তাদের ভীত করে রাখবে।
৮. মুসলিমবিশ্বের ওই সকল শাসক, যারা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর সুস্পষ্ট শত্রু-আমেরিকা এবং তার সহযোগী ইয়াহুদি ও ক্রুসেডারদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে, আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান ব্যতীত মানবরচিত মনগড়া সংবিধান দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং মুসলিমদের জন্য আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে নিজেরা আইন প্রণয়ন করে-দাওয়াতুল মুকাওয়ামা তাদের কাফির ও মুরতাদ সাব্যস্ত করে এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে মুসলিম উম্মাহর ওপর তাদের কোনো কর্তৃত্ব ও অভিভাবকত্ব প্রতিষ্ঠিত নেই বলে মনে করে। দাওয়াতুল মুকাওয়ামা এ বিশ্বাস লালন করে যে, এ সকল শাসক কাফির, জালিম ও ফাসিক। কারণ, আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمُ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكُفِرُونَ﴾ ﴿هُمُ الظَّلِمُونَ﴾ ﴿هُمُ الْفُسِقُونَ
'যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুসারে বিচার-ফায়সলা করে না তারাই কাফির, তারাই জালিম এবং তারাই ফাসিক।' [সুরা মায়িদা : (৫) ৪৪, ৪৫, ৪৭]
তারা এ আয়াতের উপযুক্ত নয়-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ
'হে ইমানদাররা, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং আনুগত্য করো রাসুলের ও তোমাদের মধ্য থেকে যারা কর্তৃত্বের অধিকারী তাদের।' [সুরা নিসা: (৪) ৫৯]
এ আয়াতে আল্লাহ (مِنْكُمْ )তোমাদের মধ্য থেকে) বলে আমাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত শাসকদের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ এ সকল শাসক আমাদের থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে আমাদের শত্রুদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। যেমন, আল্লাহ নিচের আয়াতে বলেছেন,
وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ ﴾
'তোমাদের মধ্য যে-কেউ বন্ধুরূপে তাদের গ্রহণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।' [সুরা মায়িদা: (৫) ৫১]
উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক মুফাসসির ও আলিম বলেছেন যে, (مِنْهُمْ )তাদের অন্তর্ভুক্ত) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, অবিকল তাদের মতো কাফির হয়ে যাবে।
উবাদা ইবনুস সামিত রা. থেকে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
'রাসুল ﷺ আমাদের ডাকলেন। তখন আমরা তাঁর কাছে বায়আত দিলাম। যে বিষয়ের ওপর আমরা তাঁর হাতে বায়আত দিয়েছিলাম তা হলো, আমরা যেন শুনি এবং আনুগত্য করি আমাদের পছন্দনীয় এবং অপছন্দীয় বিষয়ে, সচ্ছলতায় এবং অসচ্ছলতায়, নিজের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দেওয়ার পরিস্থিতিতেও। আর আমরা যেন শাসকদের সঙ্গে শাসনকার্য নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে না পড়ি। এর সঙ্গে তিনি বলেছেন, “তবে তোমরা যদি (শাসকের মধ্যে) প্রকাশ্য কুফর দেখতে পাও এবং সে ব্যাপারে তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দলিল থাকে, (তাহলে ভিন্ন কথা)।”
এখন আপনারাই বলুন, মুসলিমদের শত্রুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করা, মুসলিমদের বিরুদ্ধে আগ্রাসীদের সাহায্য করা, মুসলিমদের ভূমিতে তাদের ঘাঁটি করতে দেওয়া, দীনি ভাইদের হত্যা করতে সৈন্য দিয়ে তাদের সাহায্য করা, এ বিষয়গুলোর চেয়ে সুস্পষ্ট কুফর আর কী-ই-বা আছে!
মিল্লাতে ইসলাম এবং মুসলিমদের হুকুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কাফিরদের সংবিধান গ্রহণ করা, উম্মাহর দীন ও মানহাজ পরিবর্তন করা, সর্ববিষয়ে কাফিরদের আনুগত্য করা, এগুলোর চেয়ে সুস্পষ্ট কুফরের নিদর্শন আর কী-ই-বা হতে পারে! মুসলিম হওয়ার হুকুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এবং তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে আল্লাহর কালাম ও রাসুলের সুন্নাহ তো সুস্পষ্ট দলিল। এমনকি তাদের হত্যার ব্যাপারেও তো রাসুল নির্দেশ দিয়েছেন,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ.
'ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুল বলেছেন, যে তার দীনকে পরিবর্তন করেছে, তাকে হত্যা করো। '
৯. দাওয়াতুল মুকাওয়ামা প্রত্যেক এমন চুক্তি, নিরাপত্তা, প্রতিশ্রুতি ও জিম্মার বৈধতা বাতিল করে, যা মুসলিম রাষ্ট্রের শাসকরা কাফিরদের সঙ্গে সম্পাদন করেছে। এর কারণ হলো, এই শাসকরা মিল্লাতে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে। মুসলিমদের ওপর তাদের অভিভাবকত্ব বিলুপ্ত হয়েছে। তারা কাফিরদের বন্ধু এবং মুসলিমদের বিপক্ষে কাফিরদের সাহায্যকারী। সুতরাং তাদের নিজেদেরও কোনো বৈধতা নেই এবং তাদের চুক্তি, নিরাপত্তা ও প্রতিশ্রুতিরও কোনো বৈধতা নেই। এটা তত দিন পর্যন্ত বহাল থাকবে, যত দিন পর্যন্ত শরিয়াসম্মত ইমাম প্রতিষ্ঠিত না হবে এবং ইমাম কর্তৃক তারা নিরাপত্তাপ্রাপ্ত না হবে; আর সব চুক্তি, প্রতিশ্রুতি ও পারস্পরিক সম্পর্ক ইসলামি শরিয়তের আওতায় না হবে।
১০. প্রত্যেক এমন ব্যক্তি, যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত শত্রু—যেমন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সঙ্গে জোটভুক্ত ক্রুসেডার রাষ্ট্রসমূহ-এর নাগরিকদের এভাবে সাহায্য করে যে, সে তাদের হয়ে যুদ্ধ করে অথবা যুদ্ধে তাদের সাহায্য করে বা তাদের পক্ষে দালালি ও রাজাকারি (Spying) করে; কিংবা মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদের কোনো প্রকার সহায়তা প্রদান করে—তা শলা-পরামর্শ দিয়ে হোক বা ত্রাণসামগ্রী দিয়ে হোক-সে মুরতাদ, কাফির এবং মিল্লাতে ইসলাম থেকে খারিজ। তাকে হত্যা করা ওয়াজিব। তবে সে যদি এ ধরনের কাজ থেকে ফিরে আসে এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করে, তাহলে ভিন্ন কথা।
আর তার অবস্থা যদি এমন হয় যে, সে অনবরত তার কাজ চালিয়েই যাচ্ছে, তাহলে মুরতাদের সব বিধানই তার ওপর প্রয়োগ হবে। যেমন : বিয়ে- বিচ্ছেদ, মিরাসের সম্পদ থেকে বঞ্চিত হওয়া, তার জানাজার সালাত না পড়া, মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন না করা। এ ছাড়াও ফকিহগণ মুরতাদের যত বিধান বর্ণনা করেছেন, তা সবই তার ওপর প্রযোজ্য হবে।
এ ধরনের মুরতাদদের হত্যা করা ওয়াজিব নাকি জায়েজ, এ ব্যাপারে মতবিরোধ থাকলেও আমাদের বিবেচনা করতে হবে লাভ-ক্ষতির দিকটি। মুজাহিদরা তাকে হত্যা করুক বা না করুক, এ বিষয়টি সকল মুসলিমকে জানতে হবে যে, অমুক ব্যক্তি এ কাজের কারণে মুরতাদ হয়ে গেছে।
১১. প্রত্যেক এমন ব্যক্তি, যে মুরতাদ শাসকদের সাহায্য করে এবং তাদের সঙ্গে থেকে সেনাবাহিনী, পুলিশবাহিনী, সীমান্তরক্ষীবাহিনী বা আনসারবাহিনীতে যোগ দিয়ে মুজাহিদদেরকে গ্রেপ্তার বা হত্যার ব্যাপারে পরামর্শ দিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে এবং মুজাহিদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তাদের প্রত্যেকেই যে কাফির, এরূপ সিদ্ধান্ত আমরা দিই না। তবে আমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করি এই ভিত্তিতে যে, তারা দলগতভাবে মুরতাদ। এখন তাদের মধ্যে কে অজ্ঞ, আর কে বাধ্য হয়ে দলে এসেছে; আর কে ভুল ব্যাখ্যার কারণে তাদের দলভুক্ত হয়েছে, লড়াইয়ের ক্ষেত্রে আমরা তা বিবেচনা করি না। কারণ, গ্রাম্য ও শহুরে, জ্ঞানী ও মূর্খ সবাই জানে যে, এই শাসকরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রজোটের অনুগত। তাদের ছত্রছায়ায় ও নির্দেশে এরা মুসলিম যুবক ও মুজাহিদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
১২. দাওয়াতুল মুকাওয়ামা হলো, আমাদের সঙ্গে যুদ্ধরত ঔপনিবেশিক আগ্রাসী শত্রু ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে জিহাদের আহ্বান। এটি কখনোই মুসলিমদের তাকফির করার আবেদন নয়। সুতরাং যে ব্যক্তিই কালিমার সাক্ষ্য দেবে, তার জানমাল নিরাপদ হয়ে যাবে। তবে যদি সে অর্থদণ্ড পাওয়ার মতো বা হত্যাযোগ্য কোনো অপরাধ করে থাকে, তাহলে ভিন্নকথা। আর তার হিসাব-নিকাশের বিষয়টি আল্লাহর জিম্মায় ন্যস্ত।
মুসলিমদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে গোমরাহ, ভ্রষ্ট, কাফির, বিদআতি বা ফাসিক সাব্যস্ত করা দাওয়াতুল মুকাওয়ামার উদ্দেশ্য নয়; বরং এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য আলিমদের কাছে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিশ্বব্যাপী আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধরত দাওয়াতুল মুকাওয়ামার সৈনিকদের কাজ এটা নয়।
১৩. দাওয়াতুল মুকাওয়ামার কৌশল হলো, দখলদার শক্তির সৈন্যবাহিনী এবং মুসলিম দেশে মুসলিমদের স্বার্থের বিরুদ্ধে ও সরাসরি তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত আগ্রাসী তৎপরতার যাবতীয় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক (Offensive), প্রতিরোধমূলক (Defensive) ও সর্বপ্রকার সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
আর মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনীসমূহ ও তাদের সহযোগী ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে শুধু আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। যদিও তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক যুদ্ধ চালানো বৈধ। শরিয়াসম্মত উপায়ে তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ও আত্মরক্ষামূলক উভয় প্রকার যুদ্ধেরই বৈধতা রয়েছে।
উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণের কথা বিবেচনা করে এই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে কাফিরদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে সমগ্র উম্মাহ একই কাতারে শামিল হতে পারে এবং যাতে উম্মাহর প্রত্যেক সদস্যের মধ্যে সহমর্মিতার মনোভাব ফুটে ওঠে। তারা উম্মাহর সঙ্গে একতা প্রতিষ্ঠিত করে শত্রুর প্রতিরোধে রুখ দাঁড়ায় এবং উম্মাহর মধ্যে ফিতনার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষমতার দাপটে সংঘটিত গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনাও নিঃশেষ হয়ে যায়। এর পাশাপাশি ভ্রষ্টতার দিকে আহ্বানকারী ব্যক্তি ও সংস্থা এবং তাগুতি মিডিয়ায় আগ্রাসী তৎপরতা (Propaganda) পরিচালনাকারীদের মতো যারা মুজাহিদ ও সাধারণ উম্মাহর মধ্যে বিরোধ ও দূরত্ব সৃষ্টি করতে চায়, তাদের রাস্তাও যাতে বন্ধ হয়ে যায়। এ জন্য দাওয়াতুল মুকাওয়ামা মুজাহিদদের মুসলিম সেনাবাহিনী, পুলিশবাহিনী, সীমান্তরক্ষীবাহিনী ও নিরাপত্তাবাহিনীর কোনো একক সদস্যকে হত্যার টার্গেট এড়িয়ে চলার আহ্বান জানায়; তাদের শুধু আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে বলে। এর পাশাপাশি তাদের বন্দি ও আহতদের হত্যা না করে তাদের প্রতি সদাচার করতে এবং কল্যাণের দিকে তাদের আহ্বান করতে বলে, যাতে তারা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার লক্ষ্যে উম্মাহর কাতারে একত্রে শামিল হয়।
অপরদিকে সেনাবাহিনী, পুলিশবাহিনী, সীমান্তরক্ষীবাহিনীর সদস্য ও নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের আহ্বান করতে হবে, তারা মুসলিদের বিরুদ্ধে দুশমনি এবং মুসলিমদের চিরশত্রু কাফিরদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে কোনোক্রমেই যেন তাদের নেতৃবর্গের আনুগত্য না করে।
তাদের আহ্বান করতে হবে, তারা যেন তাদের শত্রু কাফির ও মুরতাদদের নেতৃবর্গকে হত্যা করে; আর নেককার মুসলিমদের হত্যা না করে।
এটি আমাদের মানহাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা কল্যাণকর বিষয়কে গ্রহণ ও ক্ষতিকর বিষয়কে প্রতিরোধের কৌশলের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর এগুলো আমাদের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতারও ফসল। দখলদার আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদের মাধ্যমে এবং শরিয়াসম্মত সম্ভাব্য সব উপায়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-জিহাদ শুরু হওয়ার পর দাওয়াতুল মুকাওয়ামার জন্য এ বিষয়গুলো মৌলিক ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৪. দাওয়াতুল মুকাওয়ামা মুসলিমদের দীন, জান, মাল ও ইজ্জতের ওপর আক্রমণকারীকে প্রতিরোধ করতে বলে; এমনকি সে আক্রমণকারী যদি মুসলিমও হয়। এর ভিত্তি হলো রাসুলের হাদিস, যেখানে তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি তার মাল রক্ষার্থে নিহত হয়, সে শহিদ। যে ব্যক্তি তার নিজের জীবন রক্ষার্থে নিহত হয়, সে শহিদ। যে ব্যক্তি তার দীন রক্ষার্থে নিহত হয়, সে শহিদ। আর যে ব্যক্তি তার পরিবার রক্ষার্থে নিহত হয়, সে-ও শহিদ।'
সুনানুন নাসায়ি গ্রন্থের এক হাদিসে এসেছে, 'যে ব্যক্তি নিজের ওপর জুলুম প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহিদ।'
এসব দলিলের ভিত্তিতে দাওয়াতুল মুকাওয়ামা মুজাহিদ ও প্রতিরোধ-যোদ্ধাদের আহ্বান করে, তারা যেন সে-সকল তাগুত বাহিনী ও ঔপনিবেশিক শাসকদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে নিজেদের সঁপে না দেয়, যারা মুজাহিদদের হত্যা বা নির্যাতনের ইচ্ছা রাখে; বরং আত্মরক্ষার্থে তারা যেন তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে ও তাদের হত্যা করে। তবে এই নির্দেশনা যেন তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক জিহাদে উৎসাহিত না করে; বরং রাজনৈতিক আত্মরক্ষামূলক কৌশলের মধ্যেই তাদের সীমাবদ্ধ রাখে।
১৫. প্রত্যেক ঔপনিবেশিক সরকার এবং দখলদার সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে দাওয়াতুল মুকাওয়ামা দখলদার বাতিল সরকার বলে বিবেচনা করে এবং জিহাদের মাধ্যমে তাদের উৎখাত করা ওয়াজিব মনে করে। এ বিষয়টি ওয়াজিব হওয়ার সর্বনিম্ন কারণ হলো, আমরা বিশ্বাস করি, এ ধরনের সরকারব্যবস্থা শরিয়াসম্মত নয়। তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করাও শরিয়াসম্মত নয়। আর এ ব্যাপারে তাদের কোনো ওজর-আপত্তিও গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন: কেউ মনে করতে পারে যে, এ ধরনের সরকারব্যবস্থা দেশ ও জনগণের কল্যাণের অভিপ্রায় ও মানুষের জীবনযাত্রা সহজীকরণের ইচ্ছায় করা হয়েছে। এগুলোকে শরিয়তের দৃষ্টিতে বাতিল ওজর সাব্যস্ত করা হবে এবং আকলের বিবেচনায় বিবেকবর্জিত ধরা হবে।
মনে রাখতে হবে, ঔপনিবেশিক শাসন অকল্যাণ ব্যতীত কল্যাণ এনে দিতে পারে না; আর তাদের দীন গ্রহণ করা ব্যতীত তারা কিছুতেই খুশি হয় না। যেমন, আল্লাহ বলেন,
﴿وَلَنْ تَرْضَى عَنْكَ الْيَهُودُ وَلَا النَّصْرَى حَتَّى تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ ﴾
'ইয়াহুদি-খ্রিষ্টানরা কখনোই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ-না আপনি তাদের দীন অনুসরণ করেন।' [সুরা বাকারা (২) : ১২০]
১৬. আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান ব্যতীত অন্য বিধান দ্বারা শাসন পরিচালনাকারী শাসকবর্গ, যারা মুসলিম উম্মাহর দুশমনদের সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক স্থাপন করে রেখেছে, দাওয়া তুল মুকাওয়ামা তাদের কাফির ও মুরতাদ বলে বিশ্বাস করে। সুতরাং এ জাতীয় সরকারের স্থপতিদের তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করে। যথা : প্রথমত, কার্যনির্বাহী পরিষদ। এরা হলো সরকার ও মন্ত্রী। দ্বিতীয়ত, আইন প্রণয়নকারী পরিষদ। এরা হলো সংসদ সদস্য বা পার্লামেন্ট মেম্বার। তৃতীয়ত, বিচারবিভাগ। এরা হলো আল্লাহর আইন ব্যতিরেকে ভিন্ন আইন দ্বারা বিচার-ফায়সলাকারী বিচারক।
এদের ব্যাপারে হুকুম হলো, এরা হারাম আমলকারী এবং এদের যাবতীয় কার্যকলাপ কুফরি। এদের সর্বনিম্ন স্তরের ব্যক্তি অবশ্যই গুনাহগার অথবা কাফির হবে।
কে শুধু গুনাহগার আর কে কাফির হবে, তা নিরূপিত হবে তার দায়িত্বের স্বরূপ, অপরাধের মাত্রা এবং তার ওজর, ব্যাখ্যার ধরণ ও মাত্রা বিবেচনা করে।
দাওয়াতুল মুকাওয়ামা সাধারণভাবে সকল মুসলিমকে আর বিশেষভাবে আলিমগণ ও ইসলামপন্থি সব দলকে আহ্বান করে, তারা যেন মুরতাদ ও উপনিবেশবাদী আগ্রাসী তাগুতকে বয়কট করেন, উল্লিখিত তাগুতি কাজের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত না করেন এবং মুসলিমদের ফিতনায় না ফেলেন।
১৭. দাওয়াতুল মুকাওয়ামা মনে করে, গণতন্ত্রের মূলনীতি হলো, আল্লাহর প্রতি কুফর এবং তাওহিদের কালিমার সাক্ষ্য ভঙ্গকারী বিষয়। আর গণতন্ত্রের দাওয়াত দেওয়া এবং তা চর্চা করা কুফরি কাজ। এ কাজ সম্পাদনকারী গুনাহগার হবে। এমন গুনাহ, যা তাকে মিল্লাতে ইসলাম থেকে বের করে দিতে পারে। গণতন্ত্রের কারণে সে মুরতাদ সাব্যস্ত হবে কি না, তা নির্ণীত হবে গণতন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে তার আকিদা-বিশ্বাস, চর্চার পন্থা এবং অজ্ঞতা ও ব্যাখ্যার ধরনের ওপর ভিত্তি করে। দাওয়াতুল মুকাওয়ামা সকল মুসলিমকে গণতান্ত্রিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হতে এবং তার দিকে মানুষকে আহ্বান না করতে আবেদন জানায়-চাই তা দখলদার শক্তিকে সাহায্যের মাধ্যমে হোক; অথবা মুরতাদ শাসকদের সহযোগিতার মাধ্যমে হোক।
দাওয়াতুল মুকাওয়ামা যেভাবে মুসলিম জনসাধারণকে গণতন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে নিষেধ করে, একইভাবে এর সঙ্গে সব ধরনের বয়কট অব্যাহত রাখা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর আওতার মধ্যে থেকে দূরাচারী অথবা সৎ ব্যক্তিকে ভোট না দেওয়ারও আহ্বান জানায়।
দাওয়াতুল মুকাওয়ামা বেসরকারি আঞ্চলিক সংস্থাসমূহ ও নাগরিক সংঘসমূহের মধ্যে থেকে যারা ইসলামপন্থি এবং যারা ইসলামি ধারার সংস্কারমূলক পদক্ষেপের আহ্বায়ক, তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি কাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে কর্মতৎপরতা (Activity) পরিচালনার আহ্বান জানায়। এই কর্মতৎপরতার লক্ষ্য হবে সমাজ সংস্কার করা এবং কুফরি আগ্রাসন ও অনুপ্রবেশ রোধের মাধ্যমে সমাজকে কলুষমুক্ত রাখা। এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হবে তাগুত বর্জন করা এবং ফিতনা-ফ্যাসাদ ও অপকর্মের সর্বপ্রকার ব্যবস্থা দূর করা। এমন সংস্কারমূলক তৎপরতা সামাজিক ও রাজনৈতিক তথা সর্বক্ষেত্রেই পরিচালিত হওয়া উচিত।
১৮. ইসলামি জাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রত্যেক মুখলিস ব্যক্তির প্রচেষ্টা-যেমন : দাওয়াতি কার্যক্রম, ইসলাহি কার্যক্রম, ইসলামي খিদমাত এবং শরিয়াসম্মত যেকোনো দীনি খিদমাত এবং ওই সব খিদমাত, যা দ্বারা ইসলামি পূনর্জাগরণমূলক মারকাজসমূহ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। যেমন : দাওয়াত ও তাবলিগ, সালাফি সংগঠনসমূহ, ইখওয়ানুল মুসলিমিন, হিজবুত তাহরির, জাতীয় সংগঠনসমূহ, উলামা হজরত, দীনের দায়ি, আত্মশুদ্ধির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের চেষ্টা-প্রচেষ্টাসহ দীনি পূণর্জাগরণের ক্ষেত্রে যৎসামান্য সহযোগিতাকারীকেও দাওয়াতুল মুকাওয়ামা ইসলাহে হাল ও দীন রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং উম্মাহর সবাইকে পূণ্যকাজ, আল্লাহভীতি ও প্রতিরোধমূলক জিহাদের সমর্থনমূলক পদক্ষেপে পারস্পরিক সহযোগিতার আহ্বান জানায়।
দাওয়াতুল মুকাওয়ামা দীনের দাওয়াতের ক্ষেত্রে তাদের চেষ্টা-প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে। এটাকে উম্মাহর প্রতিরোধ-শক্তির শিকড় গণ্য করে এবং দীনের ভিত্তিসমূহ সংরক্ষণের নিয়ামক বিবেচনা করে। মুসলিম উম্মাহর উপর আপতিত বর্তমানের এই কঠিন বিপদসংকুল অবস্থায় দাওয়াতুল মুকাওয়ামা মতানৈক্যের বিষয়গুলো এড়িয়ে চলে পারস্পরিক হৃদ্যতা ও সম্প্রীতি গড়ে তুলতে সবার কাছে উদাত্ত আহ্বান জানায়।
যারা দীনের কিয়দাংশে তুষ্ট, দাওয়াতুল মুকাওয়ামা তাদের তুষ্টতার মুখোশ খুলে এ বিষয়টি পুনঃবিবেচনা করে আহ্বান করে—তারা যেন ক্রুসেডার-গোষ্ঠী, জায়নবাদী ইয়াহুদি ও তাদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনকারী, তাদের সহযোগী ও তাদের সঙ্গে থেকে একত্রে যুদ্ধকারী শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ করে। কারণ, শরিয়তসম্মত ওজর ছাড়া প্রত্যেক সক্ষম মুসলিমের ওপর জিহাদ ফরজে আইন। আর অন্যান্য নেক আমল দ্বারা কখনোই এই ফরজে আইন রহিত হবে না। অন্য কিছু তার স্থলাভিষিক্তও হবে না। যেমন, জাকাত কখনো সালাতের স্থলাভিষিক্ত হয় না।
১৯. তাওহিদের কালিমার সাক্ষ্যদানকারী প্রত্যেক মুসলিম-ফকিহগণ যাদের 'আহলে কিবলা' বলেন, তাদের মধ্যে মাজহাব ও দল-উপদলের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও দাওয়াতুল মুকাওয়ামা সবাইকে ইসলামের গণ্ডিভুক্ত মনে করে এবং আকিদা, মাজহাব ও দল-উপদলগত মতভেদপূর্ণ বিষয়সমূহের ফায়সালার জন্য 'আহলে ইলম' তথা আলিমদের কাছে উপস্থাপনের নির্দেশ দেয়। নিঃসন্দেহে এর পরিধি বা সীমা-পরিসীমার মাত্রা কেবল এতটুকু যে, হক নিয়ে আলোচনা করা, হিকমাহ পর্যালোচনা করা এবং উত্তম নসিহাহ করা পর্যন্তই একে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। যেমন, আল্লাহ বলেন,
فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ
'তোমাদের মধ্যে মতভেদ হলে তা আল্লাহ ও তার রাসুলের কাছে উপস্থাপন করো।' [সুরা নিসা (০৪) ৫৯]
তবে অবশ্যই মুসলিমদের মধ্যে ফিতনা ও অনৈক্য সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আর দাওয়াতুল মুকাওয়ামা প্রত্যেক মুসলিমকে-সে বাহিনীভুক্ত হোক বা জামাআতবদ্ধ হোক বা একাকী হোক-আগ্রাসী বাহিনীর প্রতিরোধকল্পে মুসলিম দেশে হামলাকারী কাফির শত্রুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত জিহাদে সাহায্য করার আহ্বান জানায়। এ ছাড়া মুসলিম দেশে গৃহযুদ্ধ বাধে এমন যেকোনো কারণ, হেতু, উদ্দেশ্য ও উপলক্ষ্য থেকে বিরত থাকতে দাওয়াতুল মুকাওয়ামা সবাইকে নির্দেশনা দেয়। কেননা, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে মুসলিম দেশে আক্রমণকারী কাফির শত্রুদেরই উপকার বয়ে আনবে।
২০. দাওয়াতুল মুকাওয়ামা ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের ভিত্তিগুলো- যথা: সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামি আদর্শ-বহির্ভূত অন্য সব মতবাদকে কুফর ও ভ্রষ্টতার দিকে আহ্বানকারী মতবাদ মনে করে। আর প্রত্যেকটি মতবাদকে শরিয়তের মানদণ্ড অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস করে।
এতৎসত্ত্বেও এসব মতবাদের অধিকাংশ মুসলিম অনুসারীকে দীন সম্পর্কে অজ্ঞ ও চিন্তাচেতনায় বিভ্রান্ত মুসলিম মনে করে এবং এটি বিবেচনা করে যে, এরা পশ্চিমা সাংস্কৃতিক মতবাদ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার, যা উম্মাহকে ব্যাপকভাবে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আর এদের অধিকাংশই দীনের অনুরাগী এবং দীনের ভিত্তিসমূহকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করে, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরোধিতা করে এবং বহিঃআক্রমণ প্রতিরোধে বিজয়ের আশা করে। সুতরাং আমাদের আহ্বান হলো, এদের মধ্যে মধ্যমপন্থিদের ক্ষেত্রে ইসলামি পূনর্জাগরণমূলক মারকাজ এবং ইসলামি প্রতিরোধ-জিহাদের বিভিন্ন শাখাসমূহ যেন উত্তম পন্থায় দাওয়াত ও আলোচনার পদ্ধতি অবলম্বন করে। তেমনইভাবে জাতীয়তাবাদী, দেশপ্রেমিক শক্তি ও উম্মাহর সম্মানী ব্যক্তিবর্গকে দীনি শিক্ষা প্রদান, দীনের হাকিকত বোঝানো এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কুফফার ও তাদের সহযোগী শক্তির বিরুদ্ধে পরিচালিত জিহাদে সহযোগিতার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে আহ্বান জানায় এবং সম্মিলিতভাবে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হয়ে ইসলাম ও মুসলিমদের রক্ষায় সবার প্রতি উদাত্ত আহ্বান করে।
২১. দাওয়াতুল মুকাওয়ামা প্রত্যেক এমন মুসলিম, যে তাওহিদের কালিমার সাক্ষ্য দিয়েছে, তার জান ও মালকে নিরাপদ মনে করে। মুসলিমদের রক্তকে সর্বাধিক পবিত্র মনে করে এবং তা রক্ষা করাকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফরজ সাব্যস্ত করে এবং এ ব্যাপারে ইসলামি শরিয়তের হুকুম খুবই কঠোর।
বিদায়হজের ভাষণে রাসুল বলেছেন, 'নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্ভ্রম তোমাদের ওপর হারাম, যেমন হারাম তোমাদের এই শহর, এই মাস ও এই দিন। তোমরা খুব শীঘ্রই তোমাদের রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। তারপর তিনি তোমাদেরকে তোমাদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। সাবধান! আমার ইনতিকালের পর তোমরা পরস্পরের গর্দান কেটে কুফরের অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করো না। সাবধান! উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তিকে এ সংবাদ পৌঁছে দেয়।'
এটি এ বিষয়ের ক্ষেত্রে স্রষ্টাপ্রদত্ত সংবিধান ও নবি থেকে উৎসারিত এক অকাট্য নস, যা সাধারণভাবে প্রত্যেক মুসলিম আর বিশেষভাবে প্রত্যেক মুজাহিদকে সকল মুসলিমের জান, মাল ও ইজ্জত হিফাজত করতে নির্দেশ দেয়।
আল্লাহর পথের প্রত্যেক এমন মুজাহিদ, যে আল্লাহর রাস্তায় নিজের জান, মাল ও প্রচেষ্টা ব্যয় করে এবং যুদ্ধরত ক্রুসেডার ইয়াহুদি ও তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, দাওয়াতুল মুকাওয়ামা তাদেরকে আল্লাহর এই আয়াতের প্রতি মনোনিবেশ করতে আহ্বান জানায়,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَبَيَّنُوا
'হে ইমানদারগণ, তোমরা যখন আল্লাহর রাস্তায় অভিযানে বের হও, তখন তাহকিক করো।' [সুরা নিসা (৪) : ৯৪]
দাওয়াতুল মুকাওয়ামা তাদের এ আহ্বানও জানায়, তারা যেন প্রত্যেক মুসলিমকে কষ্ট দেওয়া থেকে বেঁচে থাকে, আল্লাহকে ভয় করে এবং রাসুল -এর এই বাণী নিয়ে চিন্তাভাবনা করে। রাসুল বলেন,
'যে ব্যক্তি (আমিরের) আনুগত্য থেকে বেরিয়ে গেল এবং জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, সে জাহিলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল। আর যে ব্যক্তি লক্ষ্যহীন নেতৃত্বের পতাকাতলে যুদ্ধ করে, গোত্রপ্রীতির জন্য ক্রুদ্ধ হয়; অথবা গোত্রপ্রীতির দিকে আহ্বান করে; অথবা গোত্রের সাহায্যার্থে যুদ্ধ করে (আল্লাহর সন্তুষ্টির কোনো ব্যাপার থাকে না); আর তাতে নিহত হয়, সে জাহিলিয়াতের মৃত্যু বরণ করে। আর যে ব্যক্তি আমার উম্মাহর ওপর আক্রমণ করে, আমার উম্মাহর ভালোমন্দ সবাইকেই নির্বিচারে হত্যা করে; মুমিনকেও রেহাই দেয় না এবং যার সঙ্গে সে ওয়াদাবদ্ধ হয়, তার ওয়াদাও রক্ষা করে না, সে আমার কেউ নয়, আমিও তার কেউ নই।’
২২. মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসরত ধর্মভিত্তিক অমুসলিম জাতিগোষ্ঠী-যেমন : খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ও অন্যান্য-এদের দাওয়াতুল মুকাওয়ামা সেরূপ নাগরিক মনে করে, যেরূপ নাগরিকদের অধিকার সংরক্ষণের জিম্মাদারি ইসলামি শরিয়া গ্রহণ করেছে। শরিয়ার নিয়মকানুনের আওতাভুক্ত থেকেই তারা মুসলিমদের মধ্যে বসবাস করবে। শরিয়া আইন অনুযায়ী তাদের সঙ্গে ওঠাবসা, লেনদেন ও বিচার-ফায়সালা করা হবে। আর ইমামুল মুসলিমিন এগুলো বাস্তবায়ন করবেন।
বর্তমান অবস্থায় দাওয়াতুল মুকাওয়ামা তাদেরকে জিহাদি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু মনে করে না, যতক্ষণ-না তারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত শত্রুদের সাহায্য করে। জিহাদ তো কেবল ইয়াহুদি, ক্রুসেডার ও তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ সেসব শক্তির বিরুদ্ধে, যারা আমাদের বিপক্ষে যুদ্ধরত।
দাওয়াতুল মুকাওয়ামা এ ধরনের ধর্মীয় অমুসলিম সংখ্যালঘু নাগরিকদের আহ্বান জানায়, তারা যেন ঔপনিবেশিক শক্তি ও আমাদের সঙ্গে যুদ্ধরত শত্রুদের বর্জন করে এবং তাদের সন্তানাদি ও সদস্যদের এদের সাহায্য না করার আহ্বান জানায়।
অনুরূপভাবে দাওয়াতুল মুকাওয়ামা মুজাহিদদের আহ্বান জানায়, তারা যেন এ জাতীয় লোকদের ক্ষেত্রে এমন কোনো পদক্ষেপ না নেয়, যাতে করে তাদের সামনে ও পেছনে উভয় দিকে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে, যা প্রতিরোধ-জিহাদে ও আগ্রাসী শক্তিকে প্রতিরোধে বাধা সৃষ্টি করে।
২৩. দাওয়াতুল মুকাওয়ামা সেসব মুসলিম রাষ্ট্রসমূহকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সঙ্গে জোটভুক্ত ক্রুসেডার ও ইয়াহুদিবাদি শক্তিসমূহের বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালনার ক্ষেত্র মনে করে, যে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে সেসবঔপনিবেশিক যুদ্ধরত শক্তিগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দখল করে রেখেছে এবং সেখানে তাদের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে; অথবা সেখান থেকে জল, স্থল ও আকাশসীমা ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। সেখানে তারা তাদের লুণ্ঠনকাজ ও অর্থনৈতিক উপনিবেশবাদী কর্মকাণ্ড সম্পাদন করে থাকে। এ ছাড়াও সেখানে তারা তাদের ঔপনিবেশিক কর্মযজ্ঞের মৌলিক বিভিন্ন ক্ষেত্র— যেমন: নিরাপত্তা-সংক্রান্ত, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি কার্যক্রম ছড়িয়ে দেয়। এগুলো হলো ঔপনিবেশিক লক্ষ্যবস্তু। ইসলামি দুনিয়ার সর্বত্রই এগুলো মুজাহিদদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা ওয়াজিব।
২৪. দাওয়াতুল মুকাওয়ামা মনে করে, মৌলিকভাবে যুদ্ধ কেবল ওইসব রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে হবে, যারা আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার ও জায়নবাদী জোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর প্রত্যেক ওইসব রাষ্ট্র, যারা তাদের (আমেরিকা ও তাদের জোট) যুদ্ধের কাজের সঙ্গে শরিক হয় এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের সাহায্য করে, তারাও আমাদের প্রতিরোধ- জিহাদের লক্ষ্যবস্তু হবে। এর শীর্ষে রয়েছে ন্যাটো-জোট, যারা তাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষাচুক্তিতে আবদ্ধ। অনুরূপভাবে সেসব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালনা করতে দাওয়াতুল মুকাওয়ামা আহ্বান জানায়, যারা মুসলিমদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালায়; তা যেকোনো দেশ বা স্থানে হোক না কেন।
তবে যেসব কাফির রাষ্ট্র ইসলাম ও মুসলিমদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের কাজে জড়িয়ে পড়েনি, তারা এই যুদ্ধের আওতাভুক্ত নয় এবং ইসলামি প্রতিরোধ-শক্তির লক্ষ্যবস্তুও নয়।
২৫. যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সরকারগোষ্ঠীর সঙ্গে জিহাদ করাটা দাওয়াতুল মুকাওয়ামা মৌলিক জিহাদ মনে করে; তবে তার জনগণের সঙ্গে নয়। এটি কেবল তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে মৌলিক প্রতিরোধের লক্ষ্য ও জিহাদের ক্ষেত্রে পরিণত করা হবে। দাওয়াতুল মুকাওয়ামা মুজাহিদদের আহ্বান করে, তাঁরা যেন শরিয়তের উসুল ও জিহাদের আহকাম অনুসারে প্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাজনীতির নিয়মকানুনের ভিত্তিতে কাফিরদের দেশেই তাদের সরকার ও যুদ্ধরত ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহ ও তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ রাষ্ট্রসমূহের বিরুদ্ধে জিহাদি কার্যক্রম পরিচালনা করে। ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য কার্যক্রমের লাভ-ক্ষতির ফলাফল বিবেচনায় এনে এ সিদ্ধান্ত দেওয়া হলো।
২৬. দাওয়াতুল মুকাওয়ামা মুজাহিদিন, জিহাদি সংগঠন এবং প্রতিরোধ-শক্তির কার্যক্রমগুলো বহিরাগত আগ্রাসী শত্রুর মোকাবিলা করার মধ্যে সীমিত রাখার আহ্বান করে এবং জিহাদি প্রবণতার কারণে পুরাতন ধ্যানধারণা অনুযায়ী মুসলিম দেশসমূহে বিপ্লবের অভিপ্রায়ে দেশের আমলা ও মুরতাদবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধের ক্ষেত্র বা ময়দান না খোলার প্রতি আহ্বান জানায়।
আমাদের মতে যদিও তারা মুরতাদ। আর আইম্মাতুল কুফরের মধ্য থেকে বড় মাপের মুরতাদকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর মধ্যে সীমিত থাকতে আহ্বান জানায়। কেননা, এরা এতে বহিঃশত্রু উভয়কে সাহায্য করার প্রয়াস পায়। এ ধরনের নীতি অবলম্বনের উদ্দেশ্য হলো, আগ্রাসী শক্তিসমূহকে পরাভূত করতে শক্তিসমূহ পুঞ্জীভূত করা, যা ইনশাআল্লাহ আল্লাহর সাহায্যে শীঘ্রই কার্যকর পরাভূতকারী ব্যাপক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
২৭. দাওয়াতুল মুকাওয়ামা মুজাহিদিন ও প্রতিরোধ-যোদ্ধাদের জিহাদি কাজের মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে ফিতনা-ফ্যাসাদ, ফিসক-অপরাধ, অবাধ্যতা, বিদআত ও ধর্মীয় পদস্থলনমূলক কাজে সহায়তাদানকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও লড়াইয়ে আগ বাড়িয়ে উদ্যোগী না হতে আহ্বান করছে। আর এগুলো তাগুত ফ্যাসাদকারী শাসকদের এমন সহায়ক বিষয়, যা বহিঃআগ্রাসী যুদ্ধরত কুফরি শক্তিকে আরও শানিত ও মজবুত করে থাকে।
দাওয়াতুল মুকাওয়ামা নিম্নবর্ণিত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানায় :
• মুসলিমের রক্ত হারাম; এমনকি সে ফাসিক ও গুনাহগার এবং যেকোনো গুনাহ করলেও, যতক্ষণ-না সে কুফরি করে।
• মুসলিমদের ওপর হুদুদ তথা দণ্ডবিধি প্রয়োগ ও শরয়ি আইন বাস্তবায়ন করার অধিকার কেবল শরিয়তসম্মত প্রতিষ্ঠিত ইমাম বা শাসকেরই রয়েছে। আর বর্তমান বিশ্বে এ ধরনের শাসক নেই। নিঃসন্দেহে দাওয়াতুল মুকাওয়ামার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো, কুফরি শক্তিগুলোর আগ্রাসন প্রতিরোধের পর শরয়ি ইমাম প্রতিষ্ঠা করা।
• এখন আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং প্রথম ও সর্বপ্রধান শরয়ي ফরজ দায়িত্ব হলো, মুসলিম ভূখণ্ড থেকে আগ্রাসী কাফিরবাহিনীকে হটিয়ে দেওয়া।
২৮. শরয়ি আহকাম বিবেচনায় ফকিহদের বর্ণনা অনুসারে দেশ তিন প্রকার :
• ইসলামি দেশ। এটি এমন দেশ, যা ইসলামি আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
• কুফরি দেশ। এটি এমন দেশ, যা কুফরি আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
• বিশেষ অবস্থার দেশ। এটি এমন দেশ, যার অধিবাসীরা মুসলিম; কিন্তু সেখানে কুফরি আইন চলমান।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্বের দেশসমূহকে চার ভাগে বিভক্ত করা যায়:
* ইসলামি দেশ, যার অধিবাসী মুসলিম। এটি এমন দেশ, যার অধিকাংশ অধিবাসী মুসলিম এবং দেশটি ইসলামি আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এ ধরনের দেশ বর্তমান বিশ্বে নেই। (লেখক তাঁর সময়ের কথা বলেছেন।)
* ইসলামি দেশ, যার অধিবাসীরা কাফির। এটি এমন দেশ, যা ইসলামি আইন দ্বারা পরিচালিত হয় এবং এর অধিকাংশ অধিবাসী কাফির। এ ধরনের দেশের উদাহরণ হলো, প্রথম যুগে মুসলিমরা যেসব দেশ জয় করেছিলেন; কিন্তু তার অধিবাসীরা তখনো মুসলিম হয়নি।
* কুফরি দেশ, যার অধিবাসীরা মুসলিম। বর্তমানে সব মুসলিম দেশ এই শ্রেণিভুক্ত, যেগুলো পরিচালিত হয় কুফরি আইনে মুরতাদ শাসকদের দ্বারা; আর অধিকাংশ মুসলিমই তার অনুগামী।
* কুফরি দেশ, যার অধিবাসীরা কাফির। মুসলিমবিশ্ব ব্যতীত সব কাফির দেশই এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
শ্রেণি-বিন্যস্ত এই দেশসমূহের ক্ষেত্রে শরিয়তের অনেক বিধান রয়েছে, যা জানা আমাদের ওপর ওয়াজিব। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে, বর্তমানে মুসলিমদের সিয়াসি (রাজনৈতিক) অবস্থান অনুপস্থিত এবং ইমামুল মুসলিমিন নেই। সুতরাং ইসলাম বিজয়ী থাকা এবং খলিফাতুল মুসলিমিন থাকা অবস্থায় বিভিন্ন দেশের যে হুকুম ছিল, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা যাবে না। কারণ, এখন খলিফা নেই, ইসলামও বিজয়ী নেই। তবে এ কথা বলা যাবে না যে, বর্তমান শাসকদের আনুগত্য ওয়াজিব।
২৯. গুরুত্বপূর্ণ কিছু শরয়ি আহ্বান নিচে উল্লেখ করা হলো :
* মুসলিমরা যে দেশে বা যেখানেই থাকুক না কেন, তাওহিদের কালিমার সাক্ষ্য দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের জান, মাল ও ইজ্জত নিরাপদ। তাদের নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না এবং তাদের ওপর কোনো সীমালঙ্ঘনও করা যাবে না।
* মুসলিম দেশসমূহে ইমামুল মুসলিমিন প্রতিষ্ঠা করা ওয়াজিব।
• বর্তমান মুসলিম দেশসমূহের শাসকবৃন্দ, যারা আল্লাহর আইন অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তাদের কোনো ধরনের আনুগত্য করা হবে না এবং তাদের দায়িত্ব ও নিরাপত্তার কোনো পরোয়া করা হবে না।
• স্বেচ্ছায় তাদের সহযোগিতা করা ও তাদের সম্পদের কর দেওয়া হারাম। তাদের অবাধ্যতার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা, তাদের অপসারণে কাজ করা, পর্যাপ্ত শক্তি ও সামর্থ্য থাকলে সম্ভাব্য এলাকায় তাদের পরিবর্তন করে ইমামুল মুসলিমিন প্রতিষ্ঠা করা ওয়াজিব।
৩০. কাফিরদের দেশে মুসলিমদের অবস্থান করা ও মুশরিক সমাজে বসবাস করাকে দাওয়াতুল মুকাওয়ামা হারাম সাব্যস্ত করে। এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট হাদিসের বর্ণনা রয়েছে।
সুনানু আবি দাউদে সামুরা রা. থেকে হাসান পর্যায়ের এক মারফু হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, 'যে ব্যক্তি মুশরিকদের সঙ্গে একত্রে বসবাস করে, সে তাদের মতোই।' সুনানুন নাসায়ির এক হাসান হাদিসে এসেছে, 'ইসলামগ্রহণের পরও কোনো মুসলিমের কোনো আমল আল্লাহ কবুল করবেন না, যতক্ষণ-না সে মুশরিকদের থেকে আলাদা হয়।'
রাসুল বলেছেন, 'মুশরিকদের দেশে মুশরিকদের সঙ্গে বসবাসকারী ব্যক্তি থেকে আমরা দায়মুক্ত।'
মুশরিকদের দেশে বসবাসকারী মুসলিমদের এবং তাদের সন্তানদের দীনদারির ওপর ব্যাপক ধ্বংসাত্মক ও নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি তো এমন যে, এখন ক্রুসেড চলছে এবং মুসলিম দেশে মুজাহিদরা ক্রুসেডারদের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আর এ যুদ্ধের কার্যক্রমগুলো সীমান্ত পেরিয়ে তাদের দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে, যার প্রতিক্রিয়া সেখানে প্রকাশিত হচ্ছে-মুসলিমদের ওপর জুলুমের মাধ্যমে, দীনের ব্যাপারে তাদের বিভ্রান্ত করার মাধ্যমে, মুসলিম নারীদের হিজাব নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করার মাধ্যমে, যার ফলশ্রুতিতে কাফিরদের ভয়ে কিছু মুসলিম তো সেখানে দীনের মৌলিক বিষয়গুলোও পরিত্যাগ করার প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। তাদের (কাফিরদের) সঙ্গে বন্ধুত্বের ভাব দেখাতে শুরু করেছে এবং মুজাহিদদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের বিষয়টি তুলে ধরেছে।
এ কারনেই দাওয়াতুল মুকাওয়ামা পশ্চিমা কাফির দেশে অবস্থানরত মুসলিমদের নিম্নবর্ণিত দুটি বিষয়ের যেকোনো একটি গ্রহণ করতে আহ্বান করছে:
১. কুফরি ও শিরকি রাষ্ট্র থেকে মুসলিম রাষ্ট্রের উদ্দেশে হিজরত করা; যদিও এতে দুনিয়াবি লোকসান বা ক্ষতি রয়েছে এবং মুসলিম রাষ্ট্রের মুরতাদ শাসক দ্বারা জুলুমের সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা, কারও পক্ষে কোনো স্থানে দীনদারিতে নিরাপত্তা না থাকলে তার ও সন্তানদের দীন রক্ষার বিষয়টি দুনিয়াদারি ও আরামের জিন্দেগি অবলম্বনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
২. পশ্চিমা দেশে বসবাসকারী বা সেসব দেশের নাগরিক প্রতিটি মুসলিমকে এই বিষয়ে দাওয়াত দেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা যে, মার্কিন ও ইয়াহুদি জোটের অন্তর্ভুক্ত হয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত সব কাফির রাষ্ট্রের সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ করা অন্যান্য স্থানের মুসলিমের মতো তাদের ওপরও ফরজে আইন। বাস্তবতা হলো, তাদের জন্য ওসব এলাকায় জিহাদ করা অধিকতর সহজ সে-সকল মুজাহিদদের তুলনায়, যারা সেখানে বসবাস করে না; কিন্তু সেসব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে আগ্রহী।
তাদের জন্য সেসব রাষ্ট্রের সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ করা, তাদের উন্নয়নমূলক প্রকল্প ধ্বংস করা এবং তাদের শাসকদের লক্ষ্যবস্তু করে আক্রমণ ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এগুলো অবশ্যই শরিয়তের নিয়মকানুনের মধ্যে থেকে করতে হবে। কাকে আক্রমণের লক্ষ্য বানাতে হবে আর কাকে বানানো যাবে না, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
টিকাঃ
৩৬৬ সহিহ বুখারি: ৭১৯৯, ৭২০০; সহিহ মুসলিম: ১৭০৯।
*** সহিহ বুখারি।
আবু দাউদ, মুসনাদু আহমাদ।
৩৬৯ সহিহ মুসলিম।