📘 কুফর ও তাকফির > 📄 ঈমান ভঙ্গের কারণ : তাচ্ছিল্য ও উপহাস করা

📄 ঈমান ভঙ্গের কারণ : তাচ্ছিল্য ও উপহাস করা


কুরআন-সুন্নাহর অসংখ্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল -কে তাচ্ছিল্য করা কুফর। ফকিহগণ দীনের প্রমাণিত সব বিধান ও ইসলামের সব প্রতীককে এই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সুতরাং দীনের কোনো বিধানের তাচ্ছিল্য করা ইমান ভঙ্গের কারণ। তাচ্ছিল্যের মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া জরুরি নয়; আকারে-ইঙ্গিতেও হতে পারে। ইসলামের কোনো বিধান নিয়ে হাসি-ঠাট্টা ও তাচ্ছিল্য করা কুফর। মোল্লা আলি কারي রাহ. লেখেন,
الاستهزاء بحكم من أحكام الشرع كفر.
'শরিয়তের কোনো বিধান নিয়ে হাসিঠাট্টা করা কুফর。
ইমাম গাজালি রাহ. লেখেন;
وَمَعْنَى السُّخْرِيَةِ الاسْتِهَانَةُ وَالتَّحْقِيرُ وَالتَّنْبِيهُ عَلَى الْعُيُوبِ والنقائص عَلَى وَجْهِ يُضْحَكُ مِنْهُ وَقَدْ يَكُونُ ذَلِكَ بالمحاكاة في الفعل والقول وقد يكون بالإشارة والإيماء.
'তাচ্ছিল্য অর্থ হচ্ছে, তুচ্ছ ও অবজ্ঞা করা এবং হাসি-কৌতুকের সঙ্গে ভুলত্রুটির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা- কখনো তা কথা ও কাজের দ্বারা; আর কখনো ইশারা-ইঙ্গিতে হয়ে থাকে。
রাসুল যখন সাহাবিদের শাম বিজয়ের সুসংবাদ শুনিয়েছিলেন, তখন একদল মুনাফিক বিষয়টি নিয়ে হাসিঠাট্টা করেছিল। তারা বলাবলি করছিল, শুনেছ, এই লোকের হাতে নাকি শাম বিজিত হবে! এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কুরআনের এই আয়াত নাজিল করে আল্লাহ নিজেই তাদের তাকফির করেছেন,
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَايْتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِعُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ إِن نَّعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةٌ بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ ﴾
আপনি যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন, তাহলে তারা অবশ্যই বলবে, আমরা তো হাসিতামাশা ও ফুর্তি করছিলাম। আপনি বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসুলকে নিয়ে ফুর্তি করছিলে? অজুহাত দেখিয়ো না। তোমরা ইমান জাহির করার পর কুফরিতে লিপ্ত হয়েছ। আমি তোমাদের মধ্যে এক দলকে ক্ষমা করলেও অন্য দলকে অবশ্যই শাস্তি দেবো। কেননা, তারা অপরাধী। [সুরা তাওবা (৯): ৬৫-৬৬]
ইমাম জাসসাস রাহ. এই আয়াতের তাফসিরে লেখেন,
فِيهِ الدَّلَالَةُ عَلَى أَنَّ اللَّاعِبَ وَالْجَادَّ سَوَاءٌ فِي إِظْهَارِ كَلِمَةِ الْكُفْرِ عَلَى غَيْرِ وَجْهِ الْإِكْرَاءِ لِأَنَّ هَؤُلَاءِ الْمُنَافِقِينَ ذَكَرُوا أَنَّهُمْ قَالُوا ما قالوا لَعِبًا فَأَخْبَرَ اللَّهُ عَنْ كُفْرِهِمْ بِاللَّعِبِ بِذَلِكَ وَرُوِيَ عَنْ الْحَسَنِ وَقَتَادَةَ أَنَّهُمْ قَالُوا فِي غَزْوَةِ تَبُوكَ أَيَرْجُو هَذَا الرَّجُلُ أَنْ يَفْتَحَ قُصُورَ الشَّامَ وَحُصُونَهَا هَيْهَاتَ هَيْهَاتَ فَأَطْلَعَ اللهُ نَبِيَّهُ عَلَى ذَلِكَ فَأَخْبَرَ أَنَّ هَذَا الْقَوْلَ كُفْرُ مِنْهُمْ عَلَى أَيَّ وَجْهِ قَالُوهُ من جد أو هزل فدل عَلَى اسْتِوَاءِ حُكْمِ الْجَادٌ وَالْهَازِلِ فِي إِظْهَارِ كَلِمَةِ الْكُفْرِ وَدَلَّ أَيْضًا عَلَى أَنَّ الاِسْتِهْزَاءَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَبِشَيْءٍ مِنْ شَرَائِعِ دِينِهِ كُفْرُ مِنْ فَاعِلِهِ.
'এই আয়াত দ্বারা প্রতিভাত হয়, কাউকে বাধ্য না করা হলে কুফরি কথা বলার ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে তা বলে; আর যে ঠাট্টাচ্ছলে বলে, উভয়ই সমান। কারণ, এ সকল মুনাফিক উল্লেখ করেছিল, তারা যা কিছু বলেছে, তা ঠাট্টাচ্ছলে বলেছে। কিন্তু এই ঠাট্টা করার কারণে তারা যে কাফির হয়ে গেছে, আল্লাহ কুরআনে তা জানিয়ে দিয়েছেন।
হাসান বসরি ও কাতাদা রাহ. থেকে বর্ণিত হয়েছে, মুনাফিকরা তাবুকযুদ্ধ চলাকালে বলেছিল, এই লোক কি প্রত্যাশা করে, সে শামের প্রাসাদ ও দুর্গগুলো বিজয় করে ফেলবে? অসম্ভব! অসম্ভব! তখন আল্লাহ তাঁর নবিকে এ ব্যাপারে অবগত করলেন। তিনি জানিয়ে দিলেন, তারা এ কথাটি আন্তরিকভাবে বলুক আর ঠাট্টাচ্ছলে বলুক, সর্বাবস্থায় এটা কুফর হিসেবে গণ্য হবে। এ দ্বারা প্রমাণিত হলো, কুফরি কথা বলার ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি তা আন্তরিকভাবে বলে; আর যে ঠাট্টাচ্ছলে বলে, উভয়ের বিধান অভিন্ন। এ দ্বারা আরও প্রমাণিত হলো, আল্লাহর আয়াতসমূহ বা তাঁর শরিয়তের কোনো বিষয় নিয়ে উপহাস করা কর্তা থেকে প্রকাশিত কুফর হিসেবে গণ্য হবে। '
ইমানের একটি অপরিহার্য অংশ হচ্ছে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। যে ব্যক্তি শরিয়তের কোনো বিধান নিয়ে অথবা আল্লাহর কোনো প্রতীক নিয়ে উপহাস বা হাসিঠাট্টা করে, তার ইমানের মৌলিক একটি ভিত্তি ধসে যায়। যার পর তাকে আর মুমিনদের কাতারে গণ্য করার সুযোগ থাকে না। এ জন্য শুধু ফরজ বা ওয়াজিব বিধান নয়, কেউ যদি কোনো সুন্নাত বিধান নিয়েও উপহাস বা হাসিঠাট্টা করে, তাহলে সে কাফির হয়ে যায়। আল্লামা দামাদ আফিন্দি রাহ. লেখেন,
ومن استخف بسنة أو حديث من أحاديثه عليه الصلاة والسلام، كفر.
'যে ব্যক্তি কোনো সুন্নাতকে অথবা রাসুলের হাদিসসমূহের মধ্য থেকে কোনো হাদিসকে অবজ্ঞা করবে, সে কাফির হয়ে যাবে。

টিকাঃ
১৩০৩ শারহুল ইমাম আলি আল-কারি আলা কিতাবি আলফাজিল কুফর: ১৬৭।
১৩০৪ ইহইয়াউ উলুমিদ দীন: ৩/১৩১।
৩০৫ অর্থাৎ, মুনাফিকদের মধ্যে যারা তাওবা করবে, তাদেরকে ক্ষমা করা হবে। আর যারা তাওবা করবে না, তারা অবশ্যই শাস্তিপ্রাপ্ত হবে।
আহকামুল কুরআন: ৪/৩৪৮।
وهـنـا تـنـبـيـه هـام لـطـلـبـة الـعـلـم. قـال الـعـلامـة ابـن نـجـيـم عـلـيـه الـرحـمـة فـي كـتـابـه مـشـكـاة الأنـوار فـي أصـول الـمـنـار ،(ص: ٢٥٣) مـا نـصـه: وقـد ظـهـر لـي أن مـعـنـى الاسـتـخـفـاف مـخـتـلـف، فـمـراد الأصـولـيـيـن بـه الإنـكـار بـغـيـر تـأويـل مـع رسـوخ الأدب، ومـراد الـفـقـهـاء الإنـكـار مـع الاسـتـهـزاء، ولا شـك فـي كـون الـثـانـي كـفـرا. انـتـهـى.
মাজমাউল আনহুর: ১/৬৯২।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 তাচ্ছিল্য ও উপহাসের কারণে কাউকে তাকফির করার শর্ত

📄 তাচ্ছিল্য ও উপহাসের কারণে কাউকে তাকফির করার শর্ত


ক. তাচ্ছিল্য ও উপহাসের কারণে কাউকে তখনই তাকফির করা যাবে, যখন শরিয়তের বিধানের তাচ্ছিল্য ও উপহাস করাই তার উদ্দেশ্য হবে। যদি এমন হয়, শরিয়তের বিধানের তাচ্ছিল্য ও উপহাস করা তার উদ্দেশ্য নয়, তবে যে বিষয়ের তাচ্ছিল্য ও উপহাস করছে, তা শরিয়তের অন্তর্ভুক্ত বা শরিয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাহলে এর দ্বারা তার ইমান ঝুঁকিতে পড়ে গেলেও স্রেফ এর ভিত্তিতে কাউকে তাকফির করা সংগত নয়। যেমন: কারও দাড়ি সর্বদা অগোছালো ও এলোমেলো থাকে। এটা দেখে কেউ তার এই অবস্থা নিয়ে হাসিঠাট্টা করল। শরিয়তের বিধান হিসেবে দাড়ি নিয়ে হাসিঠাট্টা করা তার উদ্দেশ্য ছিল না। তাহলে এর কারণে তাকে তাকফির করা যাবে না।
একইভাবে কেউ যদি দীনের হকপন্থي কোনো আলিমকে তাচ্ছিল্য ও অবমাননা করে, তাহলে দেখতে হবে তাচ্ছিল্য ও অবমাননাকারীর মূল উদ্দেশ্য কী। সে যদি আলিমের ব্যক্তিগত দোষত্রুটির কারণে এমনটি করে থাকে, তাহলে তা কবিরা গুনাহ হলেও কুফর হবে না। আর যদি সে আলিমকে কেবলই দীন ও ইলমের ধারক-বাহক হওয়ার কারণেই এই তাচ্ছিল্য ও অবমাননা করে থাকে, তাহলে সে নিঃসন্দেহে কাফির হয়ে যাবে। আল্লামা ইবনু কাজি সামাওয়া রাহ. লেখেন,
أبغض عالماً أو فقيهاً بلا سبب ظاهر خيف عليه الكفر... جلس على مكان مرتفع وتشبه بالمذكرين ويتمسخر والقوم يضحكون كفروا وكذا من تشبه بالمعلمين في مجمع ويضحك القوم كفروا جميعاً.
'কেউ যদি কোনো আলিম বা ফকিহকে প্রকাশ্য কারণ ছাড়া ঘৃণা করে, তাহলে তার ওপর কুফরের আশঙ্কা রয়েছে। ... কেউ যদি কোনো উঁচু স্থানে বসে বক্তাদের সাদৃশ্য ধারণ করে হাসিঠাট্টা করে; আর উপস্থিত সবাই হাসতে থাকে, তাহলে তারা সবাই কাফির হয়ে যাবে। একইভাবে কেউ যদি কোনো সভায় দীনের শিক্ষকদের সাদৃশ্য ধারণ করে আর উপস্থিত সবাই হাসাহাসি করতে থাকে, তাহলে তারা সবাই কাফির হয়ে যাবে।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, প্রথম সুরতের ব্যাপারে বলা হলো, 'কুফরের আশঙ্কা রয়েছে' আর পরের দুই সুরতে নিশ্চিতভাবে বলা হলো, 'কাফির হয়ে যাবে'। এই পার্থক্যের কারণ হলো, প্রথম সুরতে দীন ও ইলমকে তাচ্ছিল্য করাই যে তার উদ্দেশ্য ছিল, এটা সুনিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। পরবর্তী দুই সুরতে বিষয়টি সুস্পষ্ট ও সুনিশ্চিত। আল্লামা ইবনু নুজায়ম রাহ. লেখেন,
يَكْفُرُ الْجَمِيعُ لِاسْتِخْفَافِهِمْ بِالشَّرْعِ، وَكَذَا لَوْ لَمْ يَجْلِسْ عَلَى مَكَانَ مُرْتَفِعٍ وَلَكِنْ يَسْتَهْزِئُ بِالْمُذَكَّرِينَ وَيَتَمَشَّى وَالْقَوْمُ يَضْحَكُونَ.
'শরিয়তের অবজ্ঞা করার কারণে তারা সবাই কাফির হয়ে যাবে। একইভাবে কেউ যদি উঁচু স্থানে না বসেও দীনের উপদেশদাতাদের উপহাস করে, তাদের নকল করে বিদ্রূপের হাঁটা হাঁটে এবং উপস্থিত সবাই তা দেখে হাসাহাসি করে, তাহলে তারা সবাই কাফির হয়ে যাবে。
হাসলেও কাফির হবে এ কারণে যে, হাসি হচ্ছে বিদ্রুপের প্রতীক। তবে কেউ যদি বিদ্রুপের কারণে না হাসে; বরং উপদেশদাতা বক্তার কথা ও অভিনয়টিই এমন হয় যে, তা দেখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাসি আটকে রাখতে পারেনি, তাহলে কাফির হবে না। আল্লামা মোল্লা খসরু রাহ. লেখেন,
وَمَنْ تَكَلَّمَ بِكَلِمَةِ الْكُفْرِ وَضَحِكَ غَيْرُهُ يَكْفُرُ الضَّاحِكُ إِلَّا أَنْ يَكُونَ الضَّحِكُ ضَرُورِيًّا بِأَنْ يَكُونَ الْكَلَامُ مُضْحِكًا.
কেউ যদি কুফরি কথা বলে আর অন্যরা হাসে, তাহলে যে হাসবে সে কাফির হয়ে যাবে। তবে হাসা যদি জরুরি হয়, তাহলে ভিন্ন কথা। যেমন, কথাটিই এমন, যা হাসতে বাধ্য করে।
খ. যে ব্যক্তি শরিয়তের কোনো বিধান নিয়ে তাচ্ছিল্য ও উপহাস করছে, সেটা যে শরিয়তের বিধান এ ব্যাপারে তার ইলম থাকতে হবে। যদি অজ্ঞতার কারণে না বুঝে এরূপ করে থাকে, তাহলে শুধু এর কারণে তাকে তাকফির করা যাবে না। তবে তাকে এ ব্যাপারে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি অবগত করার পরও সে যদি নিজ অবস্থার ওপর অবিচলতা প্রদর্শন করে, তাহলে তাকে তাকফির করা হবে। পূর্বে এ বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে।

টিকাঃ
* জামিউল ফুসুলাইন: ২/১৭১।
** আল-বাহরুর রায়িক: ৫/১৩২
*” দুরারুল হুক্কাম শারহু গুরারিল আহকাম : ১/৩২৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00