📄 ‘মুসতাহাল’ (যে নিষিদ্ধ বিষয়কে হালাল মনে করা হয়েছে)-এর শর্ত
কোনো নিষিদ্ধ বিষয়কে হালাল মনে করাই কুফর নয়; বরং এরও কিছু অপরিহার্য শর্ত রয়েছে। যথা :
১. বিষয়টির নিষিদ্ধতা অকাট্যভাবে সাব্যস্ত হওয়া
যে নিষিদ্ধ বিষয় হালাল মনে করার কারণে কাউকে তাকফির করা যায়, তার অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে, তা এমন নুসুস দ্বারা সাব্যস্ত হতে হবে, যা প্রামাণিকতা ও অর্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন। এ কারণে মাকরুহে তাহরিমি বিষয়াদি যদিও নাজায়িজ; কিন্তু কেউ যদি তা বৈধ মনে করে, তবে এর কারণে তাকে তাকফির করা যায় না। কারণ, শরিয়তে মাকরুহে তাহরিমির বিধানগত মর্যাদা ওয়াজিবের মতো এবং তা এমন নুসুস দ্বারা সাব্যস্ত, যা প্রামাণিকতা ও অর্থ প্রকাশ কোনো একটির ক্ষেত্রে অকাট্য নয়। আল্লামা কাসিম কুনাওয়ي হানাফি রাহ. লেখেন,
والمكروه: ما ثبت النهي فيه مع العارض، وحكمه الثواب بتركه وخوف العقاب بالفعل، وعدم الكفر بالاستحلال.
'মাকরুহ হলো এমন গুনাহ, কোনো প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে যার নিষিদ্ধতা সাব্যস্ত। এর হুকুম হচ্ছে, ত্যাগ করলে সাওয়াব হবে এবং তাতে লিপ্ত হলে গুনাহের আশঙ্কা রয়েছে। তবে হালাল মনে করলে কাফির হবে না।'
কোনো গুনাহকে হেয়জ্ঞান করা কুফর-এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে আল্লামা তাফতাজানি রাহ. লেখেন,
ولا خفاء في أن المراد ما يثبت بقطعي.
'এতে কোনো অস্পষ্টতা নেই। এখানে সেই গুনাহ উদ্দেশ্য, যা কোনো অকাট্য দলিল দ্বারা সাব্যস্ত।'
এই শর্তারোপ করার কারণ ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। তাকফিরের ভিত্তি সুনিশ্চিত ও অকাট্য হওয়া আবশ্যক, যাতে ধারণাপ্রসূত কোনো বিষয়ের কারণে কাউকে তাকফির করা না হয়। যে বিষয়ের কারণে তাকফির করা হবে, তা শরিয়তের পক্ষ থেকে সুনিশ্চিতভাবে সাব্যস্ত থাকা জরুরি। এ জন্য কোনো কোনো ফকিহ এ শর্ত আরোপ করেছেন যে, কোনো গুনাহকে হালাল মনে করলে তাকফির করতে সেই গুনাহটি সর্বসম্মতভাবে 'গুনাহ' সাব্যস্ত হতে হবে। ফকিহগণের মধ্যে যদি তা গুনাহ হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার ব্যাপারে মতবিরোধ থাকে, তাহলে এর কারণে তাকফির করা যাবে না। আল্লামা সাইয়িদ শরিফ জুরজানি রাহ. লেখেন,
المحرم: ما ثبت النهي فيه بلا عارض، وحكمه الثواب بالترك لله تعالى، والعقاب بالفعل، والكفر بالاستحلال في المتفق.
'হারাম হলো এমন বিষয়, যাতে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়া নিষিদ্ধতা সাব্যস্ত হয়েছে। এর হুকুম হলো, আল্লাহর জন্য তা পরিত্যাগ করলে সাওয়াবপ্রাপ্ত হবে। এতে লিপ্ত হলে শাস্তিযোগ্য হবে। আর বিষয়টি সর্বসম্মত হলে তা হালাল মনে করার দ্বারা কাফির হয়ে যাবে।'
২. বিষয়টি সত্তাগত কারণে হারাম হওয়া
হারাম দু-প্রকার : (ক) সত্তাগত কারণে হারাম, (খ) প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম। দ্বিতীয়টির উদাহরণ হলো, স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস একটি বৈধ বিষয়; কিন্তু তার ঋতুস্রাবের সময় অপবিত্র থাকার কারণে তার সঙ্গে সহবাস করা হারাম। এই হারামটি সত্তাগত কারণে হয়নি; বরং প্রাসঙ্গিক কারণে হয়েছে।
হানাফি ফকিহদের মধ্যে ইমাম সারাখসি, ইবনু মাজাহ, বুখারি, মাওসিলি, ইবনুল হুমাম রাহ.-সহ অসংখ্য ইমামের মতানুসারে যেকোনো হারামকে হালাল মনে করা বা তার নিষিদ্ধতা অস্বীকার করা কুফর। তবে শর্ত হলো, তা এমন নুসুস দ্বারা সাব্যস্ত হবে, যা প্রামাণিকতা ও অর্থ প্রকাশ উভয় ক্ষেত্রে অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন হবে।
ইমাম তাহির ইবনু আবদুর রাশিদ এবং আল্লামা হাসকাফি রাহ. প্রমুখের মতে, বিষয়টি সত্তাগত কারণে হারাম হতে হবে; প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম হলে তার ভিত্তিতে তাকফির করা যাবে না। আল্লামা হাসকাফি রাহ. বলেন, 'অনেকের মতে, ঋতুমতী নারীর সঙ্গে সহবাস বা পায়ুপথে সঙ্গম করা বৈধ মনে করলে কাফির হয়ে যাবে। আবার কিছু ফকিহের মত হলো, কাফির হবে না। কারণ, এগুলো প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম; আর এটাই বিশুদ্ধ মত।'
আল্লামা তাফতাজানি রাহ. লেখেন, 'কেউ যদি হারামকে হালাল মনে করে; আর সেই হারামটি সত্তাগত কারণে হারাম এবং তা অকাট্য দলিল দ্বারা সাব্যস্ত হয়, তাহলে সেই ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে। আর তা যদি প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম হয়; কিংবা অকাট্য নয় এমন দলিল দ্বারা সাব্যস্ত হয়, তাহলে তা হালাল মনে করার দ্বারা ব্যক্তি কাফির হবে না। কিছু ফকিহ অবশ্য সত্তাগত কারণে হারাম আর প্রাসঙ্গিক কারণে হারামের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন না।
উভয় মতের দলিল বিশ্লেষণ করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহের মতকেই প্রণিধানযোগ্য মনে হয়। কারণ, কুফরের মূলকথা হচ্ছে অস্বীকার করা। কোনো বিষয় যখন অকাট্যভাবে সাব্যস্ত হয়, তা অস্বীকারের অর্থ হচ্ছে শরিয়তকেই প্রত্যাখ্যান করা। এ ক্ষেত্রে সত্তাগত কারণে হারাম আর প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম হওয়ার মধ্যে পার্থক্য নেই। আল্লামা আবদুল আজিজ ফারহাওয়ي রাহ. লেখেন,
ثم المختار أن المعصية أعم من أن تكون بعينها كأكل الدم، أو بغيرها كأكل المسروق.
'নির্বাচিত মত হলো, গুনাহ কথাটি ব্যাপক। তা সত্তাগত কারণে হোক—যেমন : রক্ত খাওয়া; কিংবা প্রাসঙ্গিক কারণে হোক—যেমন: চুরিকৃত বস্তু খাওয়া। (উভয় প্রকার গুনাহকে হালাল মনে করাই কুফর।)
কোনো কোনো ফকিহ আবার এ ক্ষেত্রে আলিম ও সাধারণ জনতার মধ্যে পার্থক্য করেন। এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো, আলিমগণ কোনটা সত্তাগত কারণে হারাম; আর কোনটা প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম, এই পার্থক্য বোঝেন। তারা যদি প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম কোনো বিষয়কে হালাল মনে করেন, তবে সেখানে তাওয়িলের অবকাশ থাকে। যেমন, তিনি প্রাসঙ্গিক বিষয়টিকে বিবেচনায় না নিয়ে মূল বিধান (প্রাসঙ্গিক বিষয় ব্যতীত আদতে জিনিসটি হালাল হওয়া) বর্ণনা করেছেন। পক্ষান্তরে একজন সাধারণ মানুষ যেহেতু এসব সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝে না, তাই তার ক্ষেত্রে এই বিভাজনও করা হবে না; বরং উভয় অবস্থায় বিষয়টির নিষিদ্ধতা যদি অকাট্য দলিল দ্বারা সাব্যস্ত হয়, তাহলে তার এই কাজকে শরিয়া অস্বীকারের নামান্তর হিসেবে গণ্য করা হবে। আল্লামা ইবনু নুজায়ম রাহ. লেখেন,
وَالْأَصْلُ أَنَّ مَنْ اعْتَقَدَ الْحَرَامَ حَلَالًا فَإِنْ كَانَ حَرَامًا لِغَيْرِهِ كَمَالِ الْغَيْرِ لَا يَكْفُرُ. وَإِنْ كَانَ لِعَيْنِهِ فَإِنْ كَانَ دَلِيلُهُ قَطْعِيًّا كَفَرَ وَإِلَّا فَلَا وَقِيلَ التَّفْصِيلُ فِي الْعَالِمِ أَمَّا الْجَاهِلُ فَلَا يُفَرِّقُ بَيْنَ الْحَلَالِ وَالْحَرَامِ لِعَيْنِهِ وَلِغَيْرِهِ وَإِنَّمَا الْفَرْقُ فِي حَقَّهِ إِنَّمَا كَانَ قَطْعِيًّا كَفَرَ بِهِ وَإِلَّا فَلَا فَيَكْفُرُ إِذَا قَالَ الْخَمْرُ لَيْسَ بِحَرَامٍ وَقَيَّدَهُ بَعْضُهُمْ بِمَا إِذَا كَانَ يَعْلَمُ حُرْمَتَهَا.
'মূলনীতি হলো, কেউ যদি হারামকে হালাল হিসেবে বিশ্বাস করে (তাহলে দেখতে হবে,) যদি তা প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম হয়—যেমন: অন্যের সম্পদকে নিজের জন্য বৈধ মনে করা, তবে সে কাফির হবে না। আর যদি তা সত্তাগত কারণে হারাম হয় এবং তার দলিল অকাট্য হয়, তাহলে সেই ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে। অন্যথায় কাফির হবে না। কেউ কেউ বলেছেন, আলিমের ক্ষেত্রে এই বিভাজন প্রযোজ্য। অজ্ঞ ব্যক্তি তো কোনটা হালাল আর কোনটা সত্তাগত কারণে হারাম কিংবা প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম, এগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। তার ক্ষেত্রে বিবেচনা হলো, বিষয়টি যদি অকাট্য হয়, তাহলে এর কারণে সে কাফির হবে; অন্যথায় কাফির হবে না। যেমন সে বলল, মদ হারাম নয় (তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। কারণ, মদ হারাম হওয়ার বিষয়টি অকাট্য)। কেউ কেউ আবার অজ্ঞ ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই শর্তও আরোপ করেছেন যে, তাকে তখনই (তাকফির) করা যাবে, যখন সে বিষয়টি হারাম হওয়া সম্পর্কে অবগত থাকবে।
কোনো কোনো ফকিহের মত হলো, কোনো হারামকে হালাল মনে করার কারণে কাউকে তখনই তাকফির করা যাবে, যখন বিষয়টি জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত হবে। স্বতন্ত্র শিরোনামে এ প্রসঙ্গে পূর্বে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
টিকাঃ
২৮৭ আনিসুল ফুকাহা ফি তারিফাতিল আলফাজিল মুতাদাওয়ালা বাইনাল ফুকাহা: ৩২।
২৮৮ শারহুল মাকাসিদ ফি ইলমিল কালাম: ২/২৭০।
২৮০ আত-তারিফাত: ২০৫।
২৯০ আদ-দুররুল মুখতার: ১/২৯৭।
১২৯১ শারহুল আকায়িদ: ৫৬৬।
১২৯২ আন-নিবরাস: ৫৪৪।
২৯০ আল-বাহরুর রায়িক: ৫/১৩২।
📄 ‘ইসতিহলাল’ (হারামকে হালাল মনে করা)-এর শর্ত
১. বিশ্বাসগত 'ইসতিহলাল'
ইসতিহলাল বলতে সাধারণভাবে বিশ্বাসগত ইসতিহলালই বোঝায়। আল্লামা তাফতাজানি রাহ. শারহুল আকায়িদ গ্রন্থে ইসতিহলালকে কুফর বলে আখ্যায়িত করেছেন। এর ব্যাখ্যায় আল্লামা ফারহাওয়ি রাহ. লিখেছেন,
" واستحلال المعصية أي اعتقاد كونها حلالا صغيرة كانت أو كبيرة"، لأنه تكذيب للشارع.
'গুনাহের ইসতিহলাল তথা তা হালাল বলে বিশ্বাস করা কুফর; তা ছোট কিংবা বড় গুনাহ হোক। কারণ, ইসতিহলাল শরিয়ত-প্রণেতাকে অস্বীকারের নামান্তর।'
ইমাম শাতিবি রাহ. লেখেন,
ثم لفظ الاستحلال إنما يستعمل في الأصل فيمن اعتقد الشيئ حلالا.
'ইসতিহলাল শব্দটি মৌলিকভাবে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যে কোনো নিষিদ্ধ বিষয়কে হালাল বলে বিশ্বাস করে।
ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহ. লেখেন,
أن من فعل المحارم مستحلا لها فهو كافر بالاتفاق فإنه ما آمن بالقرآن من استحل محارمه وكذلك لو استحلها بغير فعل والاستحلال اعتقاد أن الله لم يحرمها وتارة بعدم اعتقاد أن الله حرمها وهذا يكون الخلل في الإيمان بالربوبية أو الخلل في الإيمان بالرسالة.
'যে ব্যক্তি হালাল বলে বিশ্বাস করে হারাম কাজ করবে, সে সর্বসম্মতভাবে কাফির। কারণ, সেই ব্যক্তি কুরআনের ওপর ইমান আনেনি, যে তার হারামকে হালাল বলে বিশ্বাস করেছে। কাজে পরিণত না করেও সে যদি হারামকে হালাল বলে বিশ্বাস করে, তাহলেও একই বিধান। ইসতিহলাল অর্থই হচ্ছে এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ তা হারাম করেননি; অথবা এ বিশ্বাস পোষণ না করা যে, আল্লাহ তা হারাম করেছেন। আল্লাহর “রুবুবিয়াতের” (প্রভুত্বের) ব্যাপারে ইমানে ত্রুটি থাকার কারণে কিংবা রাসুলের রিসালাতের ব্যাপারে ইমানে সমস্যা থাকার কারণে এমনটি হয়ে থাকে。
শায়খ রাশিদ আহমাদ গাঙ্গুহি রাহ.-ও একই মত পোষণ করেছেন।
২. কর্মগত ইসতিহলাল
কোনো হারামে লিপ্ত হওয়ার অর্থই কর্মগত ইসতিহলাল নয়; বরং কেউ যদি কোনো হারামে এমনভাবে লিপ্ত হয়, যা বাহ্যিকভাবে এই নিদর্শন বহন করে যে, সে অন্তরেও সেই নিষিদ্ধ বিষয়কে বৈধ মনে করে, তাহলে এটা অস্বীকারের একটা প্রতীক এবং এর কারণে ব্যক্তি কাফির হয়ে যায়। আল্লামা তাফতাজানি রাহ. লেখেন,
مجرد الإقدام على الكبيرة لغلبة شهوة أو حمية أو أنفة أو كسل خصوصا إذا اقترن به خوف العقاب ورجاء العفو والعزم على التوبة لا ينافيه، نعم إذا كان بطريق الاستحلال والاستخفاف كان كفرا لكونه علامة للتكذيب.
'শুধু কুপ্রবৃত্তির প্রবল চাহিদা, অহমিকা, আত্মগরিমা বা অলসতার কারণে কবিরা গুনাহ করা ইমান-বিরোধী নয়; বিশেষত এর সঙ্গে যদি শাস্তির ভয়, ক্ষমাপ্রাপ্তির প্রত্যাশা এবং তাওবা করার দৃঢ়প্রত্যয় যুক্ত থাকে। তবে কেউ যদি ইসতিহলালের পদ্ধতিতে বা শরিয়তের বিধান অবজ্ঞা করে কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়, তাহলে তা কুফর হবে। কারণ, এটা অস্বীকারের নিদর্শন।
উপরিউক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যা করে শারহুল আকায়িদ গ্রন্থের প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাকার আল্লামা খায়ালি রাহ. লেখেন,
"بطريق الاستحلال" على وجه يفهم منه عده حلالا، فإن الكبيرة على هذا الوجه علامة عدم التصديق القلبي.
‘ইসতিহলালের পদ্ধতির অর্থ এমনভাবে কবিরা গুনাহ করা, যা থেকে বোঝা যায় যে, সে তা হালাল বলে গণ্য করে। কারণ, এভাবে কবিরা গুনাহ করা (শরিয়তের বিধানের প্রতি) আন্তরিক সত্যায়ন না থাকার নিদর্শন।
এটা হচ্ছে ব্যাপক মূলনীতি। তবে কোনো ব্যক্তিবিশেষের ব্যাপারে এর ভিত্তিতে তাকফিরের ফাতওয়া জারি করতে হলে পূর্বের অধ্যায়গুলোতে যেসব অপরিহার্য শর্তের কথা আলোচনা করা হয়েছে, তা যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে। বলা বাহুল্য, এটা শাস্ত্রজ্ঞ মুফতির কাজ; সাধারণ মানুষের কাজ নয়। এ ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন না করলে এই এক মূলনীতিকে কেন্দ্র করে তাকফিরের ক্ষেত্রে ভয়াবহ পর্যায়ের বাড়াবাড়ি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।
টিকাঃ
২৯৪ আন-নিবরাস: ৫৪৩।
২৯৫ আল-ইতিসাম: ২/৫৮২।
২৯৬ আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসুল: ৫২১।
২৯৭ ফাতাওয়া রাশিদিয়া (মুহাক্কাক ওয়া মুদাল্লাল): ৬২।
১২৯৮ শারহুল আকায়িদিন নাসাফিয়া: ৬৩।
علق عليه الشيخ عبد الحكيم السيالكوتي ما نصه: يعني أنه ليس المراد بالاستحلال عده حلالا، لأنه نفس تكذيب الشارع، والكلام فيما جعله الشارع علامة للتكذيب. انتهى. وقال العلامة عبد العزيز الفرهاوي ما يلي: " بطريق الاستحلال والاستخفاف" أي بوجه يدل على أنه يعتقدها حلالا أو خفيفا، كذا فسرهما المحققون؛ لأن الاستحلال والاستخفاف إن حملا على ظاهرهما، فهو عين التكذيب، والكلام في أماراته.
📄 ঈমান ভঙ্গের কারণ : অবজ্ঞা ও হেয়জ্ঞান করা
অবজ্ঞা ও হেয়জ্ঞান দুই পদ্ধতিতে হতে পারে :
ক. শরিয়া যেসব বিষয়কে সম্মানিত করেছে, সেগুলোর অবমাননা করা বা তুচ্ছজ্ঞান করা। যেমন, কুরআন মাজিদের অবমাননা করা। কুরআনকে তুচ্ছজ্ঞান করা বা তাচ্ছিল্য ও অহংকারের সঙ্গে তা মাটিতে ছুড়ে ফেলা। আল্লাহর সব প্রতীকের ক্ষেত্রেই এই কথা।
কাজি ইয়াজ রাহ. লেখেন,
وَاعْلَمْ أَنَّ مَنِ اسْتَخَفَّ بِالْقُرْآنِ، أَوِ الْمُصْحَفِ، أَوْ بِشَيْءٍ مِنْهُ، أَوْ سَبَّهُمَا، أَوْ جَحَدَهُ، أَوْ حَرْفًا مِنْهُ، أَوْ آيَةً أَوْ كَذَّبَ به، أو بشيء منه.. أو بِشَيْءٍ مِمَّا صُرِّحَ بِهِ فِيهِ مِنْ حُكْمٍ، أَوْ خَبَرٍ، أَوْ أَثْبَتَ مَا نَفَاهُ، أَوْ نَفَى مَا أَثْبَتَهُ.. عَلَى عِلْمٍ مِنْهُ بِذَلِكَ، أَوْ شَكٍّ فِي شَيْءٍ مِنْ ذَلِكَ، فَهُوَ كَافِرُ عِنْدَ أَهْلِ الْعِلْمِ بِإِجْمَاعِ.
'জেনে রেখো, যে ব্যক্তি স্বয়ং কুরআন বা মুসহাফ কিংবা তার কোনো অংশের অবজ্ঞা করে; অথবা এর ব্যাপারে কটূক্তি করে কিংবা পুরো কুরআন, তার কোনো একটি অক্ষর বা আয়াত অস্বীকার করে; কিংবা পুরো কুরআন বা তার কোনো একটি অংশকে অথবা কুরআনে স্পষ্টভাবে বিবৃত কোনো বিধান বা সংবাদ অস্বীকার করে; অথবা কুরআন যা নাকচ করেছে জেনেবুঝে তা সাব্যস্ত করে বা কুরআন যা সাব্যস্ত করেছে তা নাকচ করে; কিংবা কুরআনের কোনো ব্যাপারে সংশয় পোষণ করে, তাহলে সে আলিমগণের কাছে সর্বসম্মতভাবে কাফির。
আল্লামা তাফতাজানি রাহ. লেখেন,
وأما استحلال المعصية بمعنى اعتقاد حلها فكفر صغيرة كانت أو كبيرة، وكذا الاستهانة بها بمعنى عدها هيئة ترتكب من غير مبالاة وتجرى مجرى المباحات.
'গুনাহকে হালাল মনে করা কুফর; তা ছোট গুনাহ হোক বা বড়। এভাবে তা তুচ্ছজ্ঞান করাও কুফর। অর্থাৎ, তা এমন হালকা ব্যাপার মনে করা যে, কোনো প্রকার ভ্রূক্ষেপ না করে তাতে লিপ্ত হওয়া যায় এবং তার সঙ্গে বৈধ বিষয়গুলোর মতো আচরণ করা হয়。
ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতে একটি মিশনারি স্কুলে মুসলিম ছাত্রীদের দ্বারা ইসা আ.-এর ব্যাপারে কুফরি কথা বলানো হতো। এ বিষয়ে শায়খ রাশিদ আহমাদ গাঙ্গুহি রাহ.-এর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সেটাকে ইমান ভঙ্গের কারণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি সেই ফাতওয়ায় বলেন, এই ভয়াবহ বাক্যগুলো বলতে পরোয়া না করা এবং এগুলোকে হালকা বিষয় মনে করাও কুফর。
টিকাঃ
৩০০ আশ-শিফা বি তারিফি হুকুকিল মুসতাফা: ২/৩০৪।
৩০১ শারহুল মাকাসিদ ফি ইলমিল কালাম: ২/২৭০।
৩০২ তালিফাতে রাশিদিয়া: ৬৬।
📄 ঈমান ভঙ্গের কারণ : তাচ্ছিল্য ও উপহাস করা
কুরআন-সুন্নাহর অসংখ্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল -কে তাচ্ছিল্য করা কুফর। ফকিহগণ দীনের প্রমাণিত সব বিধান ও ইসলামের সব প্রতীককে এই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সুতরাং দীনের কোনো বিধানের তাচ্ছিল্য করা ইমান ভঙ্গের কারণ। তাচ্ছিল্যের মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া জরুরি নয়; আকারে-ইঙ্গিতেও হতে পারে। ইসলামের কোনো বিধান নিয়ে হাসি-ঠাট্টা ও তাচ্ছিল্য করা কুফর। মোল্লা আলি কারي রাহ. লেখেন,
الاستهزاء بحكم من أحكام الشرع كفر.
'শরিয়তের কোনো বিধান নিয়ে হাসিঠাট্টা করা কুফর。
ইমাম গাজালি রাহ. লেখেন;
وَمَعْنَى السُّخْرِيَةِ الاسْتِهَانَةُ وَالتَّحْقِيرُ وَالتَّنْبِيهُ عَلَى الْعُيُوبِ والنقائص عَلَى وَجْهِ يُضْحَكُ مِنْهُ وَقَدْ يَكُونُ ذَلِكَ بالمحاكاة في الفعل والقول وقد يكون بالإشارة والإيماء.
'তাচ্ছিল্য অর্থ হচ্ছে, তুচ্ছ ও অবজ্ঞা করা এবং হাসি-কৌতুকের সঙ্গে ভুলত্রুটির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা- কখনো তা কথা ও কাজের দ্বারা; আর কখনো ইশারা-ইঙ্গিতে হয়ে থাকে。
রাসুল যখন সাহাবিদের শাম বিজয়ের সুসংবাদ শুনিয়েছিলেন, তখন একদল মুনাফিক বিষয়টি নিয়ে হাসিঠাট্টা করেছিল। তারা বলাবলি করছিল, শুনেছ, এই লোকের হাতে নাকি শাম বিজিত হবে! এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কুরআনের এই আয়াত নাজিল করে আল্লাহ নিজেই তাদের তাকফির করেছেন,
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَايْتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِعُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ إِن نَّعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةٌ بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ ﴾
আপনি যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন, তাহলে তারা অবশ্যই বলবে, আমরা তো হাসিতামাশা ও ফুর্তি করছিলাম। আপনি বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসুলকে নিয়ে ফুর্তি করছিলে? অজুহাত দেখিয়ো না। তোমরা ইমান জাহির করার পর কুফরিতে লিপ্ত হয়েছ। আমি তোমাদের মধ্যে এক দলকে ক্ষমা করলেও অন্য দলকে অবশ্যই শাস্তি দেবো। কেননা, তারা অপরাধী। [সুরা তাওবা (৯): ৬৫-৬৬]
ইমাম জাসসাস রাহ. এই আয়াতের তাফসিরে লেখেন,
فِيهِ الدَّلَالَةُ عَلَى أَنَّ اللَّاعِبَ وَالْجَادَّ سَوَاءٌ فِي إِظْهَارِ كَلِمَةِ الْكُفْرِ عَلَى غَيْرِ وَجْهِ الْإِكْرَاءِ لِأَنَّ هَؤُلَاءِ الْمُنَافِقِينَ ذَكَرُوا أَنَّهُمْ قَالُوا ما قالوا لَعِبًا فَأَخْبَرَ اللَّهُ عَنْ كُفْرِهِمْ بِاللَّعِبِ بِذَلِكَ وَرُوِيَ عَنْ الْحَسَنِ وَقَتَادَةَ أَنَّهُمْ قَالُوا فِي غَزْوَةِ تَبُوكَ أَيَرْجُو هَذَا الرَّجُلُ أَنْ يَفْتَحَ قُصُورَ الشَّامَ وَحُصُونَهَا هَيْهَاتَ هَيْهَاتَ فَأَطْلَعَ اللهُ نَبِيَّهُ عَلَى ذَلِكَ فَأَخْبَرَ أَنَّ هَذَا الْقَوْلَ كُفْرُ مِنْهُمْ عَلَى أَيَّ وَجْهِ قَالُوهُ من جد أو هزل فدل عَلَى اسْتِوَاءِ حُكْمِ الْجَادٌ وَالْهَازِلِ فِي إِظْهَارِ كَلِمَةِ الْكُفْرِ وَدَلَّ أَيْضًا عَلَى أَنَّ الاِسْتِهْزَاءَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَبِشَيْءٍ مِنْ شَرَائِعِ دِينِهِ كُفْرُ مِنْ فَاعِلِهِ.
'এই আয়াত দ্বারা প্রতিভাত হয়, কাউকে বাধ্য না করা হলে কুফরি কথা বলার ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে তা বলে; আর যে ঠাট্টাচ্ছলে বলে, উভয়ই সমান। কারণ, এ সকল মুনাফিক উল্লেখ করেছিল, তারা যা কিছু বলেছে, তা ঠাট্টাচ্ছলে বলেছে। কিন্তু এই ঠাট্টা করার কারণে তারা যে কাফির হয়ে গেছে, আল্লাহ কুরআনে তা জানিয়ে দিয়েছেন।
হাসান বসরি ও কাতাদা রাহ. থেকে বর্ণিত হয়েছে, মুনাফিকরা তাবুকযুদ্ধ চলাকালে বলেছিল, এই লোক কি প্রত্যাশা করে, সে শামের প্রাসাদ ও দুর্গগুলো বিজয় করে ফেলবে? অসম্ভব! অসম্ভব! তখন আল্লাহ তাঁর নবিকে এ ব্যাপারে অবগত করলেন। তিনি জানিয়ে দিলেন, তারা এ কথাটি আন্তরিকভাবে বলুক আর ঠাট্টাচ্ছলে বলুক, সর্বাবস্থায় এটা কুফর হিসেবে গণ্য হবে। এ দ্বারা প্রমাণিত হলো, কুফরি কথা বলার ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি তা আন্তরিকভাবে বলে; আর যে ঠাট্টাচ্ছলে বলে, উভয়ের বিধান অভিন্ন। এ দ্বারা আরও প্রমাণিত হলো, আল্লাহর আয়াতসমূহ বা তাঁর শরিয়তের কোনো বিষয় নিয়ে উপহাস করা কর্তা থেকে প্রকাশিত কুফর হিসেবে গণ্য হবে। '
ইমানের একটি অপরিহার্য অংশ হচ্ছে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। যে ব্যক্তি শরিয়তের কোনো বিধান নিয়ে অথবা আল্লাহর কোনো প্রতীক নিয়ে উপহাস বা হাসিঠাট্টা করে, তার ইমানের মৌলিক একটি ভিত্তি ধসে যায়। যার পর তাকে আর মুমিনদের কাতারে গণ্য করার সুযোগ থাকে না। এ জন্য শুধু ফরজ বা ওয়াজিব বিধান নয়, কেউ যদি কোনো সুন্নাত বিধান নিয়েও উপহাস বা হাসিঠাট্টা করে, তাহলে সে কাফির হয়ে যায়। আল্লামা দামাদ আফিন্দি রাহ. লেখেন,
ومن استخف بسنة أو حديث من أحاديثه عليه الصلاة والسلام، كفر.
'যে ব্যক্তি কোনো সুন্নাতকে অথবা রাসুলের হাদিসসমূহের মধ্য থেকে কোনো হাদিসকে অবজ্ঞা করবে, সে কাফির হয়ে যাবে。
টিকাঃ
১৩০৩ শারহুল ইমাম আলি আল-কারি আলা কিতাবি আলফাজিল কুফর: ১৬৭।
১৩০৪ ইহইয়াউ উলুমিদ দীন: ৩/১৩১।
৩০৫ অর্থাৎ, মুনাফিকদের মধ্যে যারা তাওবা করবে, তাদেরকে ক্ষমা করা হবে। আর যারা তাওবা করবে না, তারা অবশ্যই শাস্তিপ্রাপ্ত হবে।
আহকামুল কুরআন: ৪/৩৪৮।
وهـنـا تـنـبـيـه هـام لـطـلـبـة الـعـلـم. قـال الـعـلامـة ابـن نـجـيـم عـلـيـه الـرحـمـة فـي كـتـابـه مـشـكـاة الأنـوار فـي أصـول الـمـنـار ،(ص: ٢٥٣) مـا نـصـه: وقـد ظـهـر لـي أن مـعـنـى الاسـتـخـفـاف مـخـتـلـف، فـمـراد الأصـولـيـيـن بـه الإنـكـار بـغـيـر تـأويـل مـع رسـوخ الأدب، ومـراد الـفـقـهـاء الإنـكـار مـع الاسـتـهـزاء، ولا شـك فـي كـون الـثـانـي كـفـرا. انـتـهـى.
মাজমাউল আনহুর: ১/৬৯২।