📄 ঈমান ভঙ্গের কারণ
কুফরের ভিত্তি তিনটি : (ক) বিশ্বাস, (খ) উক্তি, (গ) কাজ। কোনো মুসলিমকে এই তিনটি বিষয়ের কোনোটির কুফরের কারণে তাকফির করা যায়। মানুষ কখনো এমন বিশ্বাস লালন করে, যা ইসলামের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। কখনো এমন হয়, ইসলামের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যক আকিদার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, যার কারণেও তাকে তাকফির করা হয়। কখনো-বা সে ইমান ভঙ্গের কারণ হয় এমন কথা বা কাজে জড়িয়ে যায়, তখন এর কারণেও তাকে তাকফির করা হয়। আকিদা ও বিশ্বাস সম্পর্কিত আলোচনা ইতিপূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। এখানে আমরা ইমান ভঙ্গের কারণ হয়, এমন উক্তি ও কাজসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করব।
এক. ইমান ভঙ্গের কারণ
যেসব উক্তি ও কাজ ইমান ভঙ্গের কারণ, তা মূলত দু-প্রকার:
ক. এমন উক্তি ও কাজ, যা বলা ও করা কুফর। যখন কোনো মুসলিম থেকে তা প্রকাশ পায়, তখন সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যায়। এতে আলাদা কোনো শর্ত নেই। যেমন: তা বৈধ মনে করে করতে হবে ইত্যাদি।
এটা তো অজানা নয় যে, আশআরি ও মাতুরিদি (তথা হানাফি, মালিকি ও শাফিয়ি) আলিমদের কাছে ইমান হলো অন্তরের তাসদিকের (সত্যায়নের) নাম। এ কারণে তাদের দৃষ্টিতে সত্তাগতভাবে কোনো কথা ও কাজ কুফর অপরিহার্য করে না, যতক্ষণ-না তা অন্তরের সত্যায়ন নষ্ট হয়ে যাওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। সুতরাং এখানে আমরা ইমান ভঙ্গের কারণ বলতে এমন কথা ও কাজ বোঝাচ্ছি, যা সুনিশ্চিত ও দ্ব্যর্থহীনভাবে অন্তরের সত্যায়ন নষ্ট হওয়ার নিদর্শন বহন করে।
খ. এমন সব উক্তি ও কাজ, যা সত্তাগতভাবে কুফর নয়। এগুলোর ক্ষেত্রে এর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য কোনো বিষয়ের ওপর কুফরের ভিত্তি থাকে। ফকিহগণ যখন এসব উক্তি ও কাজের কারণে তাকফির করেন, তখন তাকফিরের ভিত্তিও তাঁরা উল্লেখ করে দেন।
আলোচনার সুবিধার্থে দ্বিতীয় বিষয়টির ওপর আমরা প্রথমে আলোকপাত করব।
১. কিছু কথা ও কাজ কেন ইমান ভঙ্গের কারণ হয়
ফকিহগণ ফিকহ ও ফাতওয়ার গ্রন্থাবলিতে স্বতন্ত্র অধ্যায়ে কুফরি কথা ও কাজের এক দীর্ঘ ফিরিস্তি উল্লেখ করেন। কোনো কোনো গ্রন্থে এর সংখ্যা ৪০০ পর্যন্ত পৌঁছে যায়; কিন্তু এগুলোর অধিকাংশই এমন, যা সত্তাগতভাবে কুফর নয়। তবে ভিন্ন কারণে তা ইমান ভঙ্গের কারণ হয়ে যায়।
চার মাজহাবের মধ্যে হানাফি মাজহাবের বিশেষত্ব হলো, কুফর ও তাকফিরের ব্যাপারে হানাফি মাজহাব সবচেয়ে বেশি মৌলিক, প্রামাণিক ও সুদৃঢ় খিদমত আনজাম দিয়েছে। মুহাক্কিক ফকিহগণের মধ্যে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাইল বদরুর রাশিদ রাহ. প্রথমে এ বিষয়ে আলফাজুল কুফর নামে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। মোল্লা আলি কারি রাহ.-এর ব্যাখ্যাসহ তা প্রকাশিত হয়েছে। আল্লামা ইবনু আবিদিন শামি রাহ.-এর বিবরণ অনুসারে এ বিষয়ে সবচেয়ে ব্যাপক ও সুসংহত কাজ করেছেন ইমাম নিশানজিজাদা রাহ.। তিনি কুফর ও তাকফিরের ওপর একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং তাতে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনাসহ ফকিহগণের তাহকিক সংকলন করেছেন। তাঁর সেই গ্রন্থের নাম তানওয়িরুল জিনান ফি হিফজিল ইমান। তাঁর রচিত নুরুল আইন ফি ইসলাহি জামিয়িল ফুসুলাইন গ্রন্থের পরিশিষ্টে এটি সংকলিত রয়েছে। এ ছাড়াও ফাতাওয়া হিন্দিয়া, যা ফাতাওয়া আলমগিরি নামেও পরিচিত, তাতেও এ বিষয়ে বিস্তৃত ও উপকারী আলোচনা স্থান পেয়েছে। যেহেতু এর রচনাকাল অনেক পরে, তাই এতে কুফর ও তাকফিরের ব্যাপারে পূর্ববর্তী ফকিহগণের তাহকিকের অধিকাংশ সারনির্যাস স্থান পেয়েছে।
এই গ্রন্থসমূহ মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করলে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়, তাদের উল্লিখিত কিছু কথা ও কাজ এমন, যা ইমানের অপরিহার্য দাবি ও শর্তসমূহের সঙ্গে সুস্পষ্ট সাংঘর্ষিক। এ হিসেবে তা ইমান ভঙ্গের কারণ হিসেবে বিবেচিত। আর কিছু কথা ও কাজ এমন, যা সরাসরি ইমানের অপরিহার্য দাবি ও শর্তসমূহের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, তবে তাতে কুফর অপরিহার্যকারী তিনটি বিষয়ের যেকোনো একটি পাওয়া যায়। বিষয় তিনটি হচ্ছে: (ক) হালাল মনে করা, (খ) অবজ্ঞা করা, (গ) তাচ্ছিল্য করা। ইমাম বদরুর রাশিদ রাহ. যেসব কুফরি কথার বিবরণ উল্লেখ করেছেন, তার কোনোটির স্বতন্ত্র দলিল উল্লেখ করেননি। এর কারণ তিনি ভূমিকায় উল্লেখ করে দিয়েছেন। তিনি লেখেন,
وَمَا أُورِدُتُ الدَّلَائِلَ، لِأَنَّ دَلَائِلَهَا لَا تَخْلُو مِنْ إِحْدَى الثَّلَاثَةِ: إِمَّا بِالِاسْتِهْزَاءِ أَوْ . بِالِاسْتِخْفَافِ أَوْ بِالِاسْتِحْلَالِ.
‘আমি এ গ্রন্থে দলিল উল্লেখ করিনি। কারণ, এর দলিলগুলো এ তিনটির যেকোনো একটি থেকে মুক্ত নয় : (ক) তাচ্ছিল্য, (খ) অবজ্ঞা, (গ) হালাল মনে করা।’
২. ইমান ভঙ্গের কারণ: হারামকে হালাল মনে করা
কোনো হারামকে হালাল মনে করা ইমান ভঙ্গের কারণ। শরিয়া যেসব বিষয় নিষিদ্ধ করেছে, কেউ যদি সেগুলো সিদ্ধ ও বৈধ মনে করে কিংবা নিজেকে সে ব্যাপারে মুক্ত-স্বাধীন মনে করে, তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে পুরো উম্মাহ একমত। তবে এর অপরিহার্য কিছু শর্ত রয়েছে। কেউ যদি হারামকে হালাল মনে করে, তবে তাকে তাকফির করার পূর্বে এই শর্তগুলোর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক। ইমান ভঙ্গের মূলনীতির ব্যাপারে অনেকে অবগত থাকলেও এর ওপর ভিত্তি করে তাকফিরের আগে এ-সংক্রান্ত শর্তগুলোর ব্যাপারে প্রায় সবাই উদাসীন। আর এর প্রভাবে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে প্রান্তিকতা। কেউ করছে বাড়াবাড়ি, আর কেউ-বা ছাড়াছাড়ি। কেউ উগ্রতার শিকার, কেউ-বা শিথিলতার শিকার। অথচ ইসলাম ভারসাম্য ও মধ্যপন্থার নাম। কুরআনে আমাদের বৈশিষ্ট্যই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমরা মধ্যপন্থি জাতি।
আলোচনার সুবিধার্থে শর্তগুলোকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি : (ক) যেসব শর্ত মুসতাহিল (যে হালাল মনে করেছে)-এর মধ্যে বিবেচ্য। (খ) যেসব শর্ত মুসতাহাল (যে নিষিদ্ধ বিষয়কে হালাল মনে করা হয়েছে)-এর মধ্যে বিবেচ্য। (গ) যেসব শর্ত ইসতিহলাল (হালাল মনে করা)-এর ক্ষেত্রে বিবেচ্য।
টিকাঃ
২৮১ আলফাজুল কুফর (পান্ডুলিপি) : ৩।
📄 ‘মুসতাহিল’ (যে হালাল মনে করেছে)-এর শর্ত
একজন মুসলিমকে তাকফির করতে তার মধ্যে কোন কোন বিষয় লক্ষণীয়, এর আলোচনা পূর্বে গত হয়েছে। যেহেতু এখানে তাকফির করা হবে মুসতাহিলকে, তাই তার মধ্যে মুকাফফার (যাকে তাকফির করা হয়)-এর সব শর্ত উপস্থিত রয়েছে কি না, তা যাচাই করা একান্ত প্রয়োজন। যেহেতু পূর্বে এর আলোচনা গত হয়েছে, তাই এখানে আলোচনা করব না। তবে এখানে অতিরিক্ত দুটি শর্তের কথা উল্লেখ করব, যা মুসতাহিলকে তাকফির করার পূর্বে যাচাই করা জরুরি:
১. মাসআলার জ্ঞান থাকা
কোনো মুসতাহিলকে তাকফির করতে আবশ্যক হলো, সে যে নিষিদ্ধ বিষয় হালাল মনে করেছে-শরিয়তে যে তা মূলগত হারাম-এই জ্ঞান তার থাকতে হবে। সুতরাং কেউ যদি অজ্ঞতার কারণে হারামকে হালাল মনে করে, তাহলে তাকে তাকফির করা যাবে না। তবে বিষয়টি যদি জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে তখন অজ্ঞতার ওজর গ্রহণযোগ্য নয়; বরং তাকে নির্দ্বিধায় তাকফির করা হবে। আল্লামা তাফতাজানি রাহ. লেখেন,
لو قال للحرام: هذا حلال، لترويج السلعة أو بحكم الجهل لا يكفر.
'কেউ যদি বাজারে পণ্য চালানোর জন্য বা অজ্ঞতাবশত কোনো হারামের ব্যাপারে বলে যে, এটা হালাল, তাহলে সে কাফির হবে না।' এর ব্যাখ্যায় আল্লামা ফারহাওয়ي রাহ. লেখেন,
لترويج السلعة أو بحكم الجهل أو عدم العلم بكونه حراما لا يكفر لعدم تكذيب الشارع.
'পণ্য বেচার জন্য অজ্ঞতার কারণে কিংবা তা হারাম হওয়ার ব্যাপারে ইলম না থাকার কারণে সে যদি সেটাকে হালাল বলে, তাহলে কাফির হবে না। কারণ, সে মূলত শরিয়ত-প্রণেতাকে অস্বীকার করেনি।'
আল্লামা ইবনু নুজায়ম রাহ. ইয়াতিমাতুল ফাতাওয়া গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করেন,
ظن الجهله أن ما فعله من المحظورات حلال له، فإن كان مما يعلم من دين النبي ﷺ ضرورة كفر، وإلا فلا.
'কেউ অজ্ঞতার কারণে ধারণা করল, সে যে নিষিদ্ধ কাজ করেছে, তা তার জন্য হালাল। এখন বিষয়টা যদি জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। অন্যথায় কাফির হবে না।'
২. কোনো তাওয়িল (ব্যাখ্যা) না থাকা
কেউ যদি তাওয়িলের ভিত্তিতে কোনো নাজায়িজ বিষয়কে বৈধ মনে করে, তাহলে তাকে তাকফির করা হবে না। এমনকি তার তাওয়িল যদি উসুলুল ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য না-ও হয়, তবু তাকে তাকফির করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ইমামগণের মধ্যে যেসব মতভেদ রয়েছে, তন্মধ্যে বড় একটা অংশ হলো এসব নিয়ে। কারও কাছে একটা বিষয় হালাল, আবার কারও কাছে হারাম। কারও কাছে বৈধ, কারও কাছে অবৈধ।
তবে সবাই যেহেতু কুরআন-সুন্নাহ থেকেই এসব ইজতিহাদ করেছেন, তাই তাদের কাউকে তাকফির তো দূরের কথা; গোমরাহ বলারও সুযোগ নেই। সাহাবিদের জীবনীতেও এমন তাওয়িলের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। যদিও তাঁরা এসব ক্ষেত্রে তাকফির করেননি; বরং তাওয়িলের প্রতিবন্ধকতাকে বিবেচনায় নিয়েছেন।
ইমাম বায়হাকি রাহ. সনদসহ বর্ণনা করেছেন, সাহাবি কুদামা ইবনু মাজউন রা. মদপান করে মাতাল হয়েছিলেন। উমর রা.-এর কাছে এর বিচার পৌঁছলে তিনি তাঁকে ডেকে পাঠান। তিনি উপস্থিত হলে উমর রা. তাঁকে বললেন, 'আমি তোমার ওপর দণ্ড প্রয়োগ করব।' তখন কুদামা রা. বললেন, 'তাদের সাক্ষ্য অনুসারে আমি মদপান করে থাকলেও আমাকে বেত্রাঘাত করার অধিকার আপনাদের নেই!' উমর রা. বললেন, 'কেন?' তখন কুদামা তিলাওয়াত করলেন,
لَيْسَ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحْتِ جُنَاحٌ فِيمَا طَعِمُوا إِذَا مَا اتَّقَوْا وَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصُّلِحَتِ ثُمَّ اتَّقَوْا وَ آمَنُوا ثُمَّ اتَّقَوْا وَ أَحْسَنُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
যারা ইমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে, তারা পূর্বে যা কিছু পান করেছে, তার কারণে তাদের কোনো গুনাহ নেই। যদি তারা আগামীতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে, ইমান রাখে ও সৎকাজে রত থাকে এবং (পরবর্তীকালে যেসব বিষয় নিষেধ করা হবে তা থেকেও) বেঁচে থাকে, এরপর তাকওয়া ও ইহসান অবলম্বন করে। আল্লাহ ইহসান অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন। [সুরা মায়িদা (০৫) : ৯৩]
তাঁর কথা শুনে উমর রা. বললেন,
أَخْطَأْتَ التَّأْوِيلَ، إِنِ اتَّقَيْتَ اللَّهَ اجْتَنَبْتَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْكَ.
'তুমি ভুল তাওয়িল করেছ। যদি তুমি আল্লাহকে ভয় করতে, তাহলে আল্লাহ তোমার ওপর যা কিছু নিষিদ্ধ করেছেন, তা থেকে বেঁচে থাকতে।'
এরপর উমর রা. তাঁকে দণ্ডস্বরূপ বেত্রাঘাত করার সিদ্ধান্ত নেন। এ ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, উমর রা. তাঁকে তাকফির করেননি। সাহাবিরা যদি তাওয়িলকে তাকফিরের প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা না করতেন, তাহলে তিনি অবশ্যই তাঁকে তাকফির করতেন। আর তখন মদপানের দণ্ড না দিয়ে মুরতাদের শাস্তি প্রয়োগ করতেন। উমর রা.-এর এই অবস্থানের ব্যাপারে সাহাবিগণও আপত্তি করেননি। তাই বিষয়টি মৌন ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত হয়ে গেছে।
৩. খারেজিদের তাকফির করার বিধান:
খারেজিরা মুসলিমদের হত্যা করা, তাদের সম্পদ আত্মসাৎ করা এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে হালাল মনে করে। অথচ এ বিষয়গুলো নির্দ্বিধায় হারাম; কিন্তু এর পেছনে যেহেতু তাদের তাওয়িল রয়েছে, তাই এ কারণে উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিম ও ফকিহ তাদের তাকফির করেননি। ইমাম ইবনুল হুমام রাহ. আলি রা.-এর একটি বক্তব্য থেকে খারেজিদের বিধান উদ্ঘাটন করে লেখেন,
وَهُوَ قَوْلُ الْحَضْرَمِي: دَخَلْت مَسْجِدَ الْكُوفَةِ مِنْ قِبَلِ أَبْوَابِ كِنْدَةَ، فَإِذَا نَفَرُ خَمْسَةٌ يَشْتِمُونَ عَلِيًّا وَفِيهِمْ رَجُلٌ عَلَيْهِ بُرْنُسُ يَقُولُ: أُعَاهِدُ اللَّهَ لَأَقْتُلَنَّهُ، فَتَعَلَّقْت بِهِ وَتَفَرَّقَتْ أَصْحَابُهُ عَنْهُ، فَأَتَيْت بِهِ عَلِيًّا فَقُلْت : إِنِّي سَمِعْت هَذَا يُعَاهِدُ اللَّهَ لَيَقْتُلَنَّكَ، فَقَالَ: ادْنُ وَيْحَكَ مَنْ أَنْتَ؟ فَقَالَ: أَنَا سَوَّارُ الْمُنْقِرِيُّ، فَقَالَ عَلِيٌّ : خَلَّ عَنْهُ، فَقُلْت أُخَلَّى عَنْهُ وَقَدْ عَاهَدَ اللهَ لَيَقْتُلَنَّكَ؟ قَالَ: أَفَأَقْتُلُهُ وَلَمْ يَقْتُلْنِي؟ قُلْت: فَإِنَّهُ قَدْ شَتَمَكَ، قَالَ: فَاشْتُمْهُ إِنْ شِئْتِ أَوْ دَعْهُ. فَفِي هَذَا دَلِيلٌ عَلَى أَنَّ مَا لَمْ يَكُنْ لِلْخَارِجِينَ مَنَعَهُ لَا نَقْتُلُهُمْ، وَأَنَّهُمْ لَيْسُوا كُفَّارًا لَا بِشَتْم عَلَيَّ وَلَا بِقَتْلِهِ. قِيلَ إِلَّا إِذَا اسْتَحَلَّهُ، فَإِنَّ مَنْ اسْتَحَلَّ قَتْلَ مُسْلِمٍ فَهُوَ كَافِرُ، وَلَا بُدَّ مِنْ تَقْيِيدِهِ بِأَنْ لَا يَكُونَ الْقَتْلُ بِغَيْرِ حَقٌّ أَوْ عَنْ تَأْوِيلٍ وَاجْتِهَادٍ يُؤَدِّيهِ إِلَى الْحُكْمِ بِحِلَّهِ، بِخِلَافِ الْمُسْتَحِلَّ بِلَا تَأْوِيلِ، وَإِلَّا لَزِمَ تَكْفِيرُهُمْ؛ لِأَنَّ الْخَوَارِجَ يَسْتَحِلُّونَ الْقَتْلَ بِتَأْوِيلِهِمُ الْبَاطِلِ.
'হাজরামি রাহ. বলেন, আমি কিন্দার দরজা দিয়ে কুফার মসজিদে প্রবেশ করি। তখন দেখি, পাঁচ ব্যক্তি আলি রা.-এর ব্যাপারে কটূক্তি করছে। তাদের মধ্যে একজন বুরনুস (হুডিবিশিষ্ট একপ্রকার ঢিলা কোট) পরিহিত ব্যক্তি বলল, আল্লাহর কসম করে বলছি, নিশ্চয়ই আমি তাঁকে হত্যা করব। তখনই আমি তাকে ধরে ফেলি এবং তার সঙ্গীরা তাকে রেখে কেটে পড়ে। আমি তাকে নিয়ে আলির কাছে এসে তাঁকে জানাই-আমি এই লোককে বলতে শুনেছি, সে আল্লাহর কসম করে বলছে, নিশ্চয়ই সে আপনাকে মেরে ফেলবে। আলি রা. বললেন, কাছে এসো। ধিক তোমাকে, তুমি কে? সে বলে, আমি সাওয়ার মুনকিরي। আলি রা. বললেন, ওকে ছেড়ে দাও। আমি বলি, তাকে ছেড়ে দেবো; অথচ সে আল্লাহর নামে কসম করে বলেছে, অবশ্যই আপনাকে মেরে ফেলবে! আলি রা. বললেন, সে তো আমাকে হত্যা করেনি। এখন আমি কি তাকে হত্যা করব? আমি বলি, সে তো আপনাকে গালি দিয়েছে। তিনি বললেন, চাইলে তুমিও তাকে গালি দাও; অথবা এমনিই ছেড়ে দাও।
এই ঘটনায় দলিল রয়েছে যে, খারেজিদের যদি শক্তি ও ক্ষমতা না থাকে, তাহলে আমরা তাদের হত্যা করব না। আলি রা.-কে গালি দেওয়ার কারণে বা তাঁকে হত্যা করার কারণে তারা কাফির নয়। তবে কোনো কোনো ফকিহ বলেছেন, যদি হালাল মনে করে এগুলো করে, তাহলে ভিন্ন কথা। কারণ, কেউ যদি মুসলিম-হত্যা হালাল মনে করে, তাহলে সে কাফির। তবে এই কথাকে ব্যাপকতার ওপর রাখার সুযোগ নেই; বরং এটাকে সেই অবস্থার ওপর প্রয়োগ করা হবে, যখন হত্যা অন্যায়ভাবে না হবে এবং তার এমন কোনো তাওয়িল ও ইজতিহাদ না থাকবে, যা সেই হত্যা হালাল হওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়। যেই ব্যক্তি তাওয়িলের সঙ্গে হালাল মনে করে, তার বিষয়টি ভিন্ন। অন্যথায় খারেজিদের তাকফির করা অপরিহার্য ছিল। কারণ, তারা তাদের বাতিল তাওয়িলের ভিত্তিতে (মুসলিমদের) হত্যা হালাল মনে করে।'
বলা বাহুল্য, সব তাওয়িল তাকফিরের প্রতিবন্ধক নয়। পূর্বে স্বতন্ত্র শিরোনামে আমরা এ বিষয়ের ওপর বিস্তর আলোচনা করেছি।
৪. বিদআতিদের তাকফির করার বিধান
শরিয়তের দলিলের আলোকে যেসব বিষয়ের নিষিদ্ধতা প্রমাণিত, কেউ যদি সেগুলো বৈধ মনে করে, তাহলে তার ইমান নষ্ট হয়ে যায়। এই মূলনীতির আলোকে কোনো কোনো আলিম বিদআতকে সর্বাবস্থায় কুফর বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ, বিদআতের ভিত্তি সাধারণত কোনো নাজায়িজ জিনিসকে জায়িজ মনে করার ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। বিদআতি ব্যক্তি সেটাকে শুধু জায়িজই নয়; বরং অনেক সময় উত্তম মনে করে। এ কারণে তারা সকল বিদআতিকে কাফির বলেন; যেহেতু তারা কিছু অবৈধ জিনিসকে বৈধ বানিয়ে নিয়েছে।
কিন্তু উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিম তাদের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেননি। এই মূলনীতি তো স্বীকৃত যে, নিষিদ্ধ বিষয়কে বৈধ মনে করা কুফর। তবে এর শর্ত হলো, এই হালাল মনে করার বিষয়টি কোনো শরয়ি দলিলের কারণে হবে না; বরং অহংকার, বিদ্বেষ ও একগুঁয়েমিবশত হবে। যেহেতু বিদআতিরা কোনো না কোনো দলিলের ভিত্তিতে বিদআতকে অবলম্বন করে থাকে, তাই স্রেফ এ কারণে তাদের তাকফির করা সংগত নয়। তাদের দলিল যদি শরিয়তের নিক্তিতে চলনসই না-ও হয়, তবু এর কারণে তাদের বিভ্রান্ত ও গোমরাহ বলার সুযোগ থাকলেও কাফির বলার সুযোগ নেই। ইমাম ইবনু আমির হাজ রাহ. লেখেন,
(وَأُورِدَ اسْتِبَاحَةُ الْمَعْصِيَةِ كُفْرُ) وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ إِنْ لَمْ يَكُنْ عَامَّتَهُمْ يَسْتَبِيحُهَا فَيَكُونُونَ كُفَّارًا، (وَأُجِيبَ) بِأَنَّ عَدَّ فِعْلِهَا مُبَاحًا إِنَّمَا يَكُونُ كُفْرًا (إِذَا كَانَ عَنْ مُكَابَرَةٍ وَعَدَمٍ دَلِيلٍ بِخِلَافِ مَا يَكُونُ عَنْ دَلِيلٍ شَرْعِيَّ) ، فَإِنَّهُ لَا يَكُونُ كُفْرًا ( وَالْمُبْتَدِعُ مُخْطِئُ فِي تَمَسُّكِهِ بِمَا لَيْسَ عِنْدَ التَّحْقِيقِ بِدَلِيلٍ لِمَطْلُوبِهِ (لَا مُكَابِرُ) لِمُقْتَضَى الدَّلِيلِ وَاللَّهُ تَعَالَى أَعْلَمُ بِسَرَائِرِ عِبَادِهِ)
'আমাদের আলোচনার ওপর এ আপত্তি করা হয়েছে যে, গুনাহকে বৈধ মনে করা তো কুফর। বিদআতিদের সবাই না হলেও বিপুলসংখ্যক তো এমন যে, তারা গুনাহকে বৈধ মনে করে। তাহলে (মূলনীতি অনুসারে) তাদের তো কাফির হওয়া উচিত। এর জবাব হলো, কোনো নিষিদ্ধ কাজ বৈধ মনে করা তখন কুফর হয়, যখন তা অহংকার ও দলিলহীনতার কারণে হয়। তবে তা যদি কোনো শরয়ি দলিলের আলোকে হয়, তাহলে সেটা কুফর হবে না। বিদআতি এমন কিছুকে দলিল ভেবে ভুল করেছে, যা তাহকিক অনুসারে তার কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের দলিল হয় না। তবে সে দলিলের দাবির ব্যাপারে অহংকার প্রদর্শন করেনি। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অন্তরের কথা সম্পর্কে সম্যক অবগত।
টিকাঃ
২৮২ আন-নিবরাস: ৫৪৫।
২৮০ আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়ির: ২৬২।
২৮৪ আস-সুনানুল কুবরা, বায়হাকি: ১৭৫১৬।
২৮৫ ফাতহুল কাদির: ৬/১০০১।
২৮০ আত-তাকরির ওয়াত তাহবির আলা তাহরিরিল কামাল ইবনিল হুমাম: ৩/৩১৮।
📄 ‘মুসতাহাল’ (যে নিষিদ্ধ বিষয়কে হালাল মনে করা হয়েছে)-এর শর্ত
কোনো নিষিদ্ধ বিষয়কে হালাল মনে করাই কুফর নয়; বরং এরও কিছু অপরিহার্য শর্ত রয়েছে। যথা :
১. বিষয়টির নিষিদ্ধতা অকাট্যভাবে সাব্যস্ত হওয়া
যে নিষিদ্ধ বিষয় হালাল মনে করার কারণে কাউকে তাকফির করা যায়, তার অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে, তা এমন নুসুস দ্বারা সাব্যস্ত হতে হবে, যা প্রামাণিকতা ও অর্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন। এ কারণে মাকরুহে তাহরিমি বিষয়াদি যদিও নাজায়িজ; কিন্তু কেউ যদি তা বৈধ মনে করে, তবে এর কারণে তাকে তাকফির করা যায় না। কারণ, শরিয়তে মাকরুহে তাহরিমির বিধানগত মর্যাদা ওয়াজিবের মতো এবং তা এমন নুসুস দ্বারা সাব্যস্ত, যা প্রামাণিকতা ও অর্থ প্রকাশ কোনো একটির ক্ষেত্রে অকাট্য নয়। আল্লামা কাসিম কুনাওয়ي হানাফি রাহ. লেখেন,
والمكروه: ما ثبت النهي فيه مع العارض، وحكمه الثواب بتركه وخوف العقاب بالفعل، وعدم الكفر بالاستحلال.
'মাকরুহ হলো এমন গুনাহ, কোনো প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে যার নিষিদ্ধতা সাব্যস্ত। এর হুকুম হচ্ছে, ত্যাগ করলে সাওয়াব হবে এবং তাতে লিপ্ত হলে গুনাহের আশঙ্কা রয়েছে। তবে হালাল মনে করলে কাফির হবে না।'
কোনো গুনাহকে হেয়জ্ঞান করা কুফর-এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে আল্লামা তাফতাজানি রাহ. লেখেন,
ولا خفاء في أن المراد ما يثبت بقطعي.
'এতে কোনো অস্পষ্টতা নেই। এখানে সেই গুনাহ উদ্দেশ্য, যা কোনো অকাট্য দলিল দ্বারা সাব্যস্ত।'
এই শর্তারোপ করার কারণ ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। তাকফিরের ভিত্তি সুনিশ্চিত ও অকাট্য হওয়া আবশ্যক, যাতে ধারণাপ্রসূত কোনো বিষয়ের কারণে কাউকে তাকফির করা না হয়। যে বিষয়ের কারণে তাকফির করা হবে, তা শরিয়তের পক্ষ থেকে সুনিশ্চিতভাবে সাব্যস্ত থাকা জরুরি। এ জন্য কোনো কোনো ফকিহ এ শর্ত আরোপ করেছেন যে, কোনো গুনাহকে হালাল মনে করলে তাকফির করতে সেই গুনাহটি সর্বসম্মতভাবে 'গুনাহ' সাব্যস্ত হতে হবে। ফকিহগণের মধ্যে যদি তা গুনাহ হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার ব্যাপারে মতবিরোধ থাকে, তাহলে এর কারণে তাকফির করা যাবে না। আল্লামা সাইয়িদ শরিফ জুরজানি রাহ. লেখেন,
المحرم: ما ثبت النهي فيه بلا عارض، وحكمه الثواب بالترك لله تعالى، والعقاب بالفعل، والكفر بالاستحلال في المتفق.
'হারাম হলো এমন বিষয়, যাতে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়া নিষিদ্ধতা সাব্যস্ত হয়েছে। এর হুকুম হলো, আল্লাহর জন্য তা পরিত্যাগ করলে সাওয়াবপ্রাপ্ত হবে। এতে লিপ্ত হলে শাস্তিযোগ্য হবে। আর বিষয়টি সর্বসম্মত হলে তা হালাল মনে করার দ্বারা কাফির হয়ে যাবে।'
২. বিষয়টি সত্তাগত কারণে হারাম হওয়া
হারাম দু-প্রকার : (ক) সত্তাগত কারণে হারাম, (খ) প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম। দ্বিতীয়টির উদাহরণ হলো, স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস একটি বৈধ বিষয়; কিন্তু তার ঋতুস্রাবের সময় অপবিত্র থাকার কারণে তার সঙ্গে সহবাস করা হারাম। এই হারামটি সত্তাগত কারণে হয়নি; বরং প্রাসঙ্গিক কারণে হয়েছে।
হানাফি ফকিহদের মধ্যে ইমাম সারাখসি, ইবনু মাজাহ, বুখারি, মাওসিলি, ইবনুল হুমাম রাহ.-সহ অসংখ্য ইমামের মতানুসারে যেকোনো হারামকে হালাল মনে করা বা তার নিষিদ্ধতা অস্বীকার করা কুফর। তবে শর্ত হলো, তা এমন নুসুস দ্বারা সাব্যস্ত হবে, যা প্রামাণিকতা ও অর্থ প্রকাশ উভয় ক্ষেত্রে অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন হবে।
ইমাম তাহির ইবনু আবদুর রাশিদ এবং আল্লামা হাসকাফি রাহ. প্রমুখের মতে, বিষয়টি সত্তাগত কারণে হারাম হতে হবে; প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম হলে তার ভিত্তিতে তাকফির করা যাবে না। আল্লামা হাসকাফি রাহ. বলেন, 'অনেকের মতে, ঋতুমতী নারীর সঙ্গে সহবাস বা পায়ুপথে সঙ্গম করা বৈধ মনে করলে কাফির হয়ে যাবে। আবার কিছু ফকিহের মত হলো, কাফির হবে না। কারণ, এগুলো প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম; আর এটাই বিশুদ্ধ মত।'
আল্লামা তাফতাজানি রাহ. লেখেন, 'কেউ যদি হারামকে হালাল মনে করে; আর সেই হারামটি সত্তাগত কারণে হারাম এবং তা অকাট্য দলিল দ্বারা সাব্যস্ত হয়, তাহলে সেই ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে। আর তা যদি প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম হয়; কিংবা অকাট্য নয় এমন দলিল দ্বারা সাব্যস্ত হয়, তাহলে তা হালাল মনে করার দ্বারা ব্যক্তি কাফির হবে না। কিছু ফকিহ অবশ্য সত্তাগত কারণে হারাম আর প্রাসঙ্গিক কারণে হারামের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন না।
উভয় মতের দলিল বিশ্লেষণ করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহের মতকেই প্রণিধানযোগ্য মনে হয়। কারণ, কুফরের মূলকথা হচ্ছে অস্বীকার করা। কোনো বিষয় যখন অকাট্যভাবে সাব্যস্ত হয়, তা অস্বীকারের অর্থ হচ্ছে শরিয়তকেই প্রত্যাখ্যান করা। এ ক্ষেত্রে সত্তাগত কারণে হারাম আর প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম হওয়ার মধ্যে পার্থক্য নেই। আল্লামা আবদুল আজিজ ফারহাওয়ي রাহ. লেখেন,
ثم المختار أن المعصية أعم من أن تكون بعينها كأكل الدم، أو بغيرها كأكل المسروق.
'নির্বাচিত মত হলো, গুনাহ কথাটি ব্যাপক। তা সত্তাগত কারণে হোক—যেমন : রক্ত খাওয়া; কিংবা প্রাসঙ্গিক কারণে হোক—যেমন: চুরিকৃত বস্তু খাওয়া। (উভয় প্রকার গুনাহকে হালাল মনে করাই কুফর।)
কোনো কোনো ফকিহ আবার এ ক্ষেত্রে আলিম ও সাধারণ জনতার মধ্যে পার্থক্য করেন। এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো, আলিমগণ কোনটা সত্তাগত কারণে হারাম; আর কোনটা প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম, এই পার্থক্য বোঝেন। তারা যদি প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম কোনো বিষয়কে হালাল মনে করেন, তবে সেখানে তাওয়িলের অবকাশ থাকে। যেমন, তিনি প্রাসঙ্গিক বিষয়টিকে বিবেচনায় না নিয়ে মূল বিধান (প্রাসঙ্গিক বিষয় ব্যতীত আদতে জিনিসটি হালাল হওয়া) বর্ণনা করেছেন। পক্ষান্তরে একজন সাধারণ মানুষ যেহেতু এসব সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝে না, তাই তার ক্ষেত্রে এই বিভাজনও করা হবে না; বরং উভয় অবস্থায় বিষয়টির নিষিদ্ধতা যদি অকাট্য দলিল দ্বারা সাব্যস্ত হয়, তাহলে তার এই কাজকে শরিয়া অস্বীকারের নামান্তর হিসেবে গণ্য করা হবে। আল্লামা ইবনু নুজায়ম রাহ. লেখেন,
وَالْأَصْلُ أَنَّ مَنْ اعْتَقَدَ الْحَرَامَ حَلَالًا فَإِنْ كَانَ حَرَامًا لِغَيْرِهِ كَمَالِ الْغَيْرِ لَا يَكْفُرُ. وَإِنْ كَانَ لِعَيْنِهِ فَإِنْ كَانَ دَلِيلُهُ قَطْعِيًّا كَفَرَ وَإِلَّا فَلَا وَقِيلَ التَّفْصِيلُ فِي الْعَالِمِ أَمَّا الْجَاهِلُ فَلَا يُفَرِّقُ بَيْنَ الْحَلَالِ وَالْحَرَامِ لِعَيْنِهِ وَلِغَيْرِهِ وَإِنَّمَا الْفَرْقُ فِي حَقَّهِ إِنَّمَا كَانَ قَطْعِيًّا كَفَرَ بِهِ وَإِلَّا فَلَا فَيَكْفُرُ إِذَا قَالَ الْخَمْرُ لَيْسَ بِحَرَامٍ وَقَيَّدَهُ بَعْضُهُمْ بِمَا إِذَا كَانَ يَعْلَمُ حُرْمَتَهَا.
'মূলনীতি হলো, কেউ যদি হারামকে হালাল হিসেবে বিশ্বাস করে (তাহলে দেখতে হবে,) যদি তা প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম হয়—যেমন: অন্যের সম্পদকে নিজের জন্য বৈধ মনে করা, তবে সে কাফির হবে না। আর যদি তা সত্তাগত কারণে হারাম হয় এবং তার দলিল অকাট্য হয়, তাহলে সেই ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে। অন্যথায় কাফির হবে না। কেউ কেউ বলেছেন, আলিমের ক্ষেত্রে এই বিভাজন প্রযোজ্য। অজ্ঞ ব্যক্তি তো কোনটা হালাল আর কোনটা সত্তাগত কারণে হারাম কিংবা প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম, এগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। তার ক্ষেত্রে বিবেচনা হলো, বিষয়টি যদি অকাট্য হয়, তাহলে এর কারণে সে কাফির হবে; অন্যথায় কাফির হবে না। যেমন সে বলল, মদ হারাম নয় (তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। কারণ, মদ হারাম হওয়ার বিষয়টি অকাট্য)। কেউ কেউ আবার অজ্ঞ ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই শর্তও আরোপ করেছেন যে, তাকে তখনই (তাকফির) করা যাবে, যখন সে বিষয়টি হারাম হওয়া সম্পর্কে অবগত থাকবে।
কোনো কোনো ফকিহের মত হলো, কোনো হারামকে হালাল মনে করার কারণে কাউকে তখনই তাকফির করা যাবে, যখন বিষয়টি জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত হবে। স্বতন্ত্র শিরোনামে এ প্রসঙ্গে পূর্বে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
টিকাঃ
২৮৭ আনিসুল ফুকাহা ফি তারিফাতিল আলফাজিল মুতাদাওয়ালা বাইনাল ফুকাহা: ৩২।
২৮৮ শারহুল মাকাসিদ ফি ইলমিল কালাম: ২/২৭০।
২৮০ আত-তারিফাত: ২০৫।
২৯০ আদ-দুররুল মুখতার: ১/২৯৭।
১২৯১ শারহুল আকায়িদ: ৫৬৬।
১২৯২ আন-নিবরাস: ৫৪৪।
২৯০ আল-বাহরুর রায়িক: ৫/১৩২।
📄 ‘ইসতিহলাল’ (হারামকে হালাল মনে করা)-এর শর্ত
১. বিশ্বাসগত 'ইসতিহলাল'
ইসতিহলাল বলতে সাধারণভাবে বিশ্বাসগত ইসতিহলালই বোঝায়। আল্লামা তাফতাজানি রাহ. শারহুল আকায়িদ গ্রন্থে ইসতিহলালকে কুফর বলে আখ্যায়িত করেছেন। এর ব্যাখ্যায় আল্লামা ফারহাওয়ি রাহ. লিখেছেন,
" واستحلال المعصية أي اعتقاد كونها حلالا صغيرة كانت أو كبيرة"، لأنه تكذيب للشارع.
'গুনাহের ইসতিহলাল তথা তা হালাল বলে বিশ্বাস করা কুফর; তা ছোট কিংবা বড় গুনাহ হোক। কারণ, ইসতিহলাল শরিয়ত-প্রণেতাকে অস্বীকারের নামান্তর।'
ইমাম শাতিবি রাহ. লেখেন,
ثم لفظ الاستحلال إنما يستعمل في الأصل فيمن اعتقد الشيئ حلالا.
'ইসতিহলাল শব্দটি মৌলিকভাবে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যে কোনো নিষিদ্ধ বিষয়কে হালাল বলে বিশ্বাস করে।
ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহ. লেখেন,
أن من فعل المحارم مستحلا لها فهو كافر بالاتفاق فإنه ما آمن بالقرآن من استحل محارمه وكذلك لو استحلها بغير فعل والاستحلال اعتقاد أن الله لم يحرمها وتارة بعدم اعتقاد أن الله حرمها وهذا يكون الخلل في الإيمان بالربوبية أو الخلل في الإيمان بالرسالة.
'যে ব্যক্তি হালাল বলে বিশ্বাস করে হারাম কাজ করবে, সে সর্বসম্মতভাবে কাফির। কারণ, সেই ব্যক্তি কুরআনের ওপর ইমান আনেনি, যে তার হারামকে হালাল বলে বিশ্বাস করেছে। কাজে পরিণত না করেও সে যদি হারামকে হালাল বলে বিশ্বাস করে, তাহলেও একই বিধান। ইসতিহলাল অর্থই হচ্ছে এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ তা হারাম করেননি; অথবা এ বিশ্বাস পোষণ না করা যে, আল্লাহ তা হারাম করেছেন। আল্লাহর “রুবুবিয়াতের” (প্রভুত্বের) ব্যাপারে ইমানে ত্রুটি থাকার কারণে কিংবা রাসুলের রিসালাতের ব্যাপারে ইমানে সমস্যা থাকার কারণে এমনটি হয়ে থাকে。
শায়খ রাশিদ আহমাদ গাঙ্গুহি রাহ.-ও একই মত পোষণ করেছেন।
২. কর্মগত ইসতিহলাল
কোনো হারামে লিপ্ত হওয়ার অর্থই কর্মগত ইসতিহলাল নয়; বরং কেউ যদি কোনো হারামে এমনভাবে লিপ্ত হয়, যা বাহ্যিকভাবে এই নিদর্শন বহন করে যে, সে অন্তরেও সেই নিষিদ্ধ বিষয়কে বৈধ মনে করে, তাহলে এটা অস্বীকারের একটা প্রতীক এবং এর কারণে ব্যক্তি কাফির হয়ে যায়। আল্লামা তাফতাজানি রাহ. লেখেন,
مجرد الإقدام على الكبيرة لغلبة شهوة أو حمية أو أنفة أو كسل خصوصا إذا اقترن به خوف العقاب ورجاء العفو والعزم على التوبة لا ينافيه، نعم إذا كان بطريق الاستحلال والاستخفاف كان كفرا لكونه علامة للتكذيب.
'শুধু কুপ্রবৃত্তির প্রবল চাহিদা, অহমিকা, আত্মগরিমা বা অলসতার কারণে কবিরা গুনাহ করা ইমান-বিরোধী নয়; বিশেষত এর সঙ্গে যদি শাস্তির ভয়, ক্ষমাপ্রাপ্তির প্রত্যাশা এবং তাওবা করার দৃঢ়প্রত্যয় যুক্ত থাকে। তবে কেউ যদি ইসতিহলালের পদ্ধতিতে বা শরিয়তের বিধান অবজ্ঞা করে কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়, তাহলে তা কুফর হবে। কারণ, এটা অস্বীকারের নিদর্শন।
উপরিউক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যা করে শারহুল আকায়িদ গ্রন্থের প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাকার আল্লামা খায়ালি রাহ. লেখেন,
"بطريق الاستحلال" على وجه يفهم منه عده حلالا، فإن الكبيرة على هذا الوجه علامة عدم التصديق القلبي.
‘ইসতিহলালের পদ্ধতির অর্থ এমনভাবে কবিরা গুনাহ করা, যা থেকে বোঝা যায় যে, সে তা হালাল বলে গণ্য করে। কারণ, এভাবে কবিরা গুনাহ করা (শরিয়তের বিধানের প্রতি) আন্তরিক সত্যায়ন না থাকার নিদর্শন।
এটা হচ্ছে ব্যাপক মূলনীতি। তবে কোনো ব্যক্তিবিশেষের ব্যাপারে এর ভিত্তিতে তাকফিরের ফাতওয়া জারি করতে হলে পূর্বের অধ্যায়গুলোতে যেসব অপরিহার্য শর্তের কথা আলোচনা করা হয়েছে, তা যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে। বলা বাহুল্য, এটা শাস্ত্রজ্ঞ মুফতির কাজ; সাধারণ মানুষের কাজ নয়। এ ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন না করলে এই এক মূলনীতিকে কেন্দ্র করে তাকফিরের ক্ষেত্রে ভয়াবহ পর্যায়ের বাড়াবাড়ি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।
টিকাঃ
২৯৪ আন-নিবরাস: ৫৪৩।
২৯৫ আল-ইতিসাম: ২/৫৮২।
২৯৬ আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসুল: ৫২১।
২৯৭ ফাতাওয়া রাশিদিয়া (মুহাক্কাক ওয়া মুদাল্লাল): ৬২।
১২৯৮ শারহুল আকায়িদিন নাসাফিয়া: ৬৩।
علق عليه الشيخ عبد الحكيم السيالكوتي ما نصه: يعني أنه ليس المراد بالاستحلال عده حلالا، لأنه نفس تكذيب الشارع، والكلام فيما جعله الشارع علامة للتكذيب. انتهى. وقال العلامة عبد العزيز الفرهاوي ما يلي: " بطريق الاستحلال والاستخفاف" أي بوجه يدل على أنه يعتقدها حلالا أو خفيفا، كذا فسرهما المحققون؛ لأن الاستحلال والاستخفاف إن حملا على ظاهرهما، فهو عين التكذيب، والكلام في أماراته.