📄 কাদিয়ানি এবং অন্য কাফিরদের মধ্যে পার্থক্য
ইসলামের আলোকে কাদিয়ানিরা আদি কাফির (কাফিরে আসলি) নাকি মুরতাদ বা জিন্দিক?
আলিমগণ জানেন, ইসলামের এই পরিভাষাত্রয় ভিন্ন ভিন্ন মর্মের জন্য ব্যবহৃত হয়। আর এগুলোর বিধানও ভিন্ন ভিন্ন।
কাদিয়ানিরা কখনোই আদি কাফির নয়। কারণ, তারা পূর্ব থেকেই নিজেদের মুসলিম বলত। আবার মুরতাদও নয়। মুরতাদ এ জন্য নয় যে, তারা কুফরিতে লিপ্ত থাকার পরও নিজেদের কাফির বলত না; বরং ভ্রান্ত চিন্তাধারা লালন করা সত্ত্বেও নিজেদের মুসলিম প্রমাণ করতে অনমনীয় ও একগুঁয়ে ছিল। এ কারণে তাদের ওপর কেবল জিন্দিকের সংজ্ঞাই প্রযোজ্য হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, শরিয়তে জিন্দিকের হুকুম কী? সকল আহলে ইলমের কাছে জিন্দিকের হুকুম হলো, গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তাওবা করলে তার তাওবা গৃহীত হবে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাওবা করলে তা আর গৃহীত হবে না। গ্রেপ্তারের পর তাকে হত্যা করা হবে।
কিন্তু পাকিস্তানে কাদিয়ানিদের কাফির ঘোষণা করে তাদের জিম্মির মান দেওয়া হয়েছে। তাদের জানমালের জন্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অথচ শরিয়তের হুকুম ছিল, প্রথমে তাদেরকে তাদের আকিদা থেকে তাওবা করার নির্দেশ দেওয়া। তাওবা করে খাঁটি মুসলিম হয়ে গেলে তো ঠিক আছে; অন্যথায় তাদের হত্যা করা। কাদিয়ানি বা আহমাদি মুসলিম জামাআত হিসেবে তাদের স্থান দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় ও আইনি নিরাপত্তা প্রদানের অর্থ তাদের ইলহাদের ওপর রাজি থাকা এবং দলীয়ভাবে তাদের নিরাপত্তা প্রদান করতে রাষ্ট্রকে নির্দেশ করা। অথচ এ বিষয়ের ওপর উম্মাহর ইজমা রয়েছে যে, মুহাম্মাদ ﷺ-এর সঙ্গে যারা বেয়াদবি করবে, তারা ওয়াজিবুল কতল। তাদের হত্যা করা অপরিহার্য।
ইসলামি রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়াও যদি কেউ তাদের হত্যা করে, তবে এর জন্য তাকে অভিযুক্ত করা হবে না।
এবার একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবুন, যাদের ব্যাপারে শরিয়তের এই নির্দেশ ছিল যে, তাদের প্রাণ ও সম্পদ মুসলিমদের জন্য মুবাহ (বৈধ)। কোনো মুসলিম যদি রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়াও তাদের হত্যা করে, তাদের ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করে, এ কারণে সে শরিয়তের দৃষ্টিতে অপরাধী হবে না। এখন এই শ্রেণির মানুষের প্রাণ ও সম্পদকে সম্মানিত ঘোষণা করে রাষ্ট্রের ওপর তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। অথচ এখনো তারা আগের মতো জিন্দিক ও মুলহিদই রয়েছে। তাদের উপাসনালয় আগের চেয়ে বেড়েছে। তাদের ধর্মপ্রচার আগের তুলনায় আরও প্রকাশ্যে হচ্ছে।
এবার আপনারাই ভাবুন, কাদিয়ানিদের জন্য ব্যাপারটা মন্দ হয়েছে নাকি ভালো হয়েছে? আপনারা এমন একটা দলকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, যারা কোনো অবস্থায়ই দেশে থাকার অনুমতি পেতে পারে না। এরা আদি কাফির থেকেও নিকৃষ্ট। কারণ, আদি কাফিররা জিম্মি (জিজয়া দেওয়ার শর্তে চুক্তিবদ্ধ) হয়ে মুসলিম দেশে থাকতে পারে; কিন্তু জিন্দিক ও মুরতাদরা থাকতে পারে না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এরা শুধু দেশে আছে এমন নয়; বরং এরা অন্য সবার মতো রাষ্ট্রীয় কাজের সঙ্গেও জড়িত রয়েছে।
যদি এ কথা বলা হয় যে, কাদিয়ানিরা আগে মুরতাদ ছিল; আর এখন তাদের সন্তানেরা আদি কাফিরের হুকুমে, তাদের এই ধারণাও ভুল। কারণ, কাদিয়ানিরা না আগে মুরতাদ ছিল, না এখন আদি কাফির; বরং শরিয়তের দৃষ্টিতে তারা আগেও জিন্দিক ছিল, এখনো জিন্দিক রয়েছে।
স্মরণ করা যেতে পারে, মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রেমে পাগলপারা মুজাহিদরা যখন লাহোরে কাদিয়ানিদের কেন্দ্রে আক্রমণ করে, তখন কিছুসংখ্যক মানুষ এ কথা বলে আক্রমণের নিন্দা জানিয়েছিল যে, কাদিয়ানিদের যেহেতু কাফির ঘোষণা করা হয়েছে, সুতরাং তারা এখন জিম্মি। এমনকি ইলমের বোঝা বহনকারী কতিপয় লোক এমনও বলেন যে, কিয়ামতের দিন রাসুল ﷺ কাদিয়ানিদের সঙ্গে দাঁড়াবেন, তাদের সঙ্গে থাকবেন! অথচ আহলে ইলমগণ জানেন যে, কাদিয়ানিরা জিন্দিক। আর জিন্দিকরা কখনো জিম্মি হতে পারে না। সুতরাং যে ব্যক্তি রাসুলের বিরুদ্ধে এত বড় অপবাদ আরোপ করেছে যে, খাতামুন নাবিয়্যিন ﷺ কিয়ামতের দিন এ সকল মালাউন ও অভিশপ্তদের সঙ্গে থাকবেন, যারা কিনা খতমে নবুওয়াতের আকিদাকে রক্তাক্ত করেছে, যারা রাসুলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শত্রুতা প্রদর্শন করেছে। যারা এমন মারাত্মক কথা বলেছে, তাদের তাওবা করা উচিত। অন্যথায় কাদিয়ানিদের প্রতি সম্প্রীতি লালনের অপরাধে তাদের সঙ্গেই এ সকল লোকের হাশর হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।
এক. কাদিয়ানি এবং অন্য কাফিরদের মধ্যে পার্থক্য
আমাদের অনেক ভাই ও বোনের মাথায় এই প্রশ্ন আসে যে, কাদিয়ানি এবং অন্য কাফিরদের মধ্যে পার্থক্য কী? কাদিয়ানিদের মধ্যে এমন কী বিশেষত্ব আছে, যার কারণে অন্য সকল কাফির-দলের চেয়ে তাদের বিষয়টা বেশি খারাপ ও ভয়াবহ? যেখানে অন্য কাফিরদের সঙ্গে (তাদের লালনকৃত কুফরের প্রতি অন্তরপ্রসূত বিদ্বেষ রাখার শর্তে বাহ্যিক) সৌজন্যমূলক সহাবস্থান ও প্রয়োজনীয় সম্পর্ক রাখা এবং আর্থিক লেনদেন করা বৈধ, সেখানে কাদিয়ানিদের সঙ্গে এসবের কোনোকিছুরই অনুমতি নেই। পৃথিবীতে কাদিয়ানি ছাড়াও রয়েছে আরও অনেক কাফির-সম্প্রদায়। যেমন : ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান, হিন্দু ও শিখ প্রভৃতি; কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বিশেষভাবে এই কাদিয়ানিদের মোকাবিলা করতে সারা বিশ্বে 'খতমে নবুওয়াত সংরক্ষণ পরিষদ' নামে এবং এ ধরনের আরও বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক খতমে নবুওয়াত সংরক্ষণ পরিষদ নিজেদের ওপর এই দায়িত্ব অপরিহার্য করে নিয়েছে, যেখানে যেখানে কাদিয়ানিরা পৌঁছে গেছে, আল্লাহর দীনের সাহায্য এবং মুসলিমদের সহযোগিতার জন্য তারাও ঠিক সেখানে সেখানে পৌঁছে যাবে। এরপর তারা মুসলিম জনসাধারণের সামনে কাদিয়ানিদের মুখোশ উন্মোচন করবে। অন্যান্য কাফির সম্প্রদায়ের মোকাবিলার জন্য এরকম বৈশ্বিক কোনো সংগঠন নেই।
ইমামুল আসর আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি রাহ. এবং পির মেহের আলি শাহ রাহ. থেকে শুরু করে আমিরে শরিয়ত সাইয়িদ আতাউল্লাহ শাহ বুখারি রাহ. পর্যন্ত এবং শায়খুল ইসলাম মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ বানুরি রাহ. থেকে শুরু করে মাওলানা খাজা খান মুহাম্মাদ রাহ. পর্যন্ত সকল বিদগ্ধ আলিম এই কাদিয়ানি ফিতনা দমনের ওপর অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন এবং তাদের জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ এই ফিতনা দমনের পেছনে ব্যয় করেছেন। জনসম্মুখে খুলে খুলে কাদিয়ানিদের দাবিদাওয়ার অসারতা বয়ান করেছেন। এ সবেরই-বা কী কারণ! এককথায়, কাদিয়ানি এবং অন্য কাফিরদের মধ্যে আদতে পার্থক্য কী?
অবশ্যই কাদিয়ানি এবং অন্য কাফিরদের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্যের কারণেই অন্য কাফিরদের সঙ্গে (তাদের লালনকৃত কুফরের প্রতি অন্তরপ্রসূত বিদ্বেষ রাখার শর্তে বাহ্যিক) সৌজন্যমূলক সহাবস্থান এবং প্রয়োজনীয় সম্পর্ক রাখার অনুমতি থাকলেও কাদিয়ানিদের ক্ষেত্রে এগুলো বৈধ নয়। কাদিয়ানিরা মুরতাদ ও জিন্দিক।
মুরতাদ বলা হয় সেই ব্যক্তিকে, যে ইসলাম ত্যাগ করে অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করে নেয়। আর জিন্দিক হলো ওই ব্যক্তি, যে নিজের কুফরি আকিদা-বিশ্বাসকে ইসলামের নামে চালায়। সুতরাং এ জাতীয় ব্যক্তিরা হলো ইসলামের প্রতি বিদ্রোহী। পৃথিবীতে কোনো রাষ্ট্রের প্রতি বিদ্রোহকারীরা কোনো ধরনের গুরুত্ব ও শিথিলতাপ্রাপ্তির উপযুক্ততা রাখে না। উপরন্তু যারা তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, পৃথিবীর আইনে তারাও গ্রেপ্তার হওয়ার উপযুক্ত হয়ে যায়। কাদিয়ানিরাও যেহেতু জিন্দিক ও মুরতাদ, সুতরাং ইসলামি শিক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে তারা কোনো ধরনের গুরুত্ব বা শিথিলতাপ্রাপ্তির উপযুক্ততা রাখে না।
রাসুল ইয়াহুদি-খ্রিষ্টানের সঙ্গে (দাওয়াহর) সম্পর্ক রেখেছেন, তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তিও করেছেন; কিন্তু নবুওয়াতের দাবিদার (মুসায়লিমা কাজজাব ও আসওয়াদ আনসির সঙ্গে সম্পর্ক রাখাকে শুধু নাজায়িজ বলেই আখ্যায়িত করেননি; বরং সাহাবি ফায়রুজ দায়লামি রা.-এর বাহিনী পাঠিয়ে আসওয়াদ আনসিকে হত্যা করিয়েছেন এবং মুসায়লিমা কাজজাবকে আবু বকর সিদ্দিক রা. জাহান্নামে পৌঁছিয়েছেন।
অন্য কাফিররা নিজেদের কুফর স্বীকার করে এবং নিজেদের অমুসলিম বলে পরিচয় দেয়, মুসলিমদের থেকে নিজেদের আলাদা জাতি হিসেবে ঘোষণা করে। অপরদিকে কাদিয়ানিরা নিজেদের আকিদার ব্যাপারে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে মুসলিমদের ধোঁকায় ফেলে এবং নিজেদেরও মুসলিম হিসেবে উপস্থাপন করে।
এই মাসআলা তো সবার জানা আছে যে, শরিয়তে মদপান নিষিদ্ধ। মদ পান করা, মদ তৈরি করা, মদ বিক্রি করা-এ সবই হারাম কাজ। এটাও জানা আছে যে, শূকর হারাম এবং সত্তাগতভাবে নাপাক। শূকরের গোশত বিক্রি করা, শূকরের লেনদেন করা, শূকরের কোনো অংশ খাওয়া বা পান করা অকাট্যভাবে হারাম। এখন কেউ মদ বিক্রি করলে নিশ্চয়ই সে অপরাধী সাব্যস্ত হবে। পক্ষান্তরে আরেক ব্যক্তি মদ শুধু বিক্রি-ই করছে না; বরং মদের গায়ে জমজমের পানির লেভেল লাগিয়ে তা বাজারজাত করছে, মানুষকে জমজমের পানির নামে মদ খাওয়াচ্ছে।
অপরাধী তো দুজনই; কিন্তু উভয় অপরাধীর মধ্যে পার্থক্য কী? এটা নিশ্চয়ই আপনাদের খুব ভালো করে জানা আছে।
বাজারে একব্যক্তি শূকরের গোশতকে শূকরের গোশত বলেই বিক্রি করছে। ক্রেতাকে আগেই স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে যে, এটা কিন্তু শূকরের গোশত। যার ইচ্ছা কিনে নাও; আর যার ইচ্ছা নিয়ো না। নিশ্চয়ই এই ব্যক্তি শূকরের গোশত বিক্রির অপরাধে অপরাধী। অপরদিকে আরেক ব্যক্তি শূকর ও কুকুরের গোশত বিক্রি করছে ছাগলের গোশত বলে। অপরাধী তো দুজনই; কিন্তু উভয়ের অপরাধে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। একজন হারাম জিনিস বিক্রি করছে হারাম নামেই, যে নাম শুনলে মুসলিমদের ঘৃণা আসে। অপরজন হারাম জিনিস বিক্রি করছে হালাল নামে, যে নাম শুনে সবাই ধোঁকায় পড়ে যায়। ছাগলের গোশত ভেবে বাসায় কিনে নিয়ে গিয়ে হালাল মনে করেই খায়। শূকরের গোশতকে শূকরের গোশত বলে বিক্রি করা; আর একই গোশতকে ছাগল বা দুম্বার গোশত বলে চালানোর মধ্যে যে পার্থক্য, ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান, হিন্দু, শিখ প্রভৃতি গোষ্ঠী এবং কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের মধ্যেও একই পার্থক্য।
কুফর সর্বাবস্থায় কুফর। ইসলামের বিপরীত বিষয়ই কুফর। পৃথিবীর অন্য কাফিররা নিজেদের কুফরের ওপর ইসলামের লেভেল লাগায় না এবং মানুষের সামনে নিজেদের কুফরকে ইসলামের নামে উপস্থাপন করে না; কিন্তু কাদিয়ানিরা নিজেদের কুফরের ওপর ইসলামের লেভেল লাগিয়ে মানুষকে ধোঁকা দিতে বলে বেড়ায়, কাদিয়ানি ধর্মমতই হলো প্রকৃত ইসলাম।
টিকাঃ
২৭৬ পড়ুন- আস-সারিমুল মাসলুল, ইমাম ইবনু তাইমিয়া; ফিতনার বজ্রধ্বনি, আলী হাসান উসামা।
২৭৭ আদইয়ান কে জং, মাওলানা আবদুল্লাহ আসিম উমর রাহি.।
📄 কাফিরদের প্রকার
এখন বিষয়টা তাত্ত্বিকভাবে বুঝে নেন। কাফিরদের অনেক প্রকার আছে; কিন্তু কাফিরদের তিনটি প্রকার হলো একেবারে স্পষ্ট :
১. সাধারণ কাফির
কাফির বলা হয় ওই ব্যক্তিকে, যে প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল মুহাম্মাদ-কে অস্বীকার করে; অথবা খোল্লমখোলা কুফরে লিপ্ত হয়। এ ধরনের কাফির ব্যক্তিকে সাধারণ কাফির বলা হয়। এর মধ্যে ইয়াহুদি-খ্রিষ্টান-হিন্দু-শিখ-জৈন প্রভৃতি সবাই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মক্কার মুশরিকরাও এ প্রকারের কাফির ছিল।
২. মুনাফিক
দ্বিতীয় প্রকারের কাফিরদের মুনাফিক বলা হয়। এরা মৌখিকভাবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে; কিন্তু ভেতরে কুফর লালন করে। এদের ব্যাপারে আল্লাহ কুরআনের ২৮ নম্বর পারার সুরা মুনাফিকুনের প্রথম আয়াতে বলেন,
إِذَا جَاءَكَ الْمُنْفِقُونَ قَالُوا نَشْهَدُ إِنَّكَ لَرَسُولُ اللَّهِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُهُ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنْفِقِينَ لَكَذِبُونَ
যখন আপনার কাছে মুনাফিকরা আসে তখন তারা বলে, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসুল। আল্লাহ জানেন বাস্তবেই আপনি তাঁর রাসুল। আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন, নিশ্চয়ই মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী। [সুরা মুনাফিকুন (৬৩) : ১]
মুনাফিকদের কুফর সাধারণ কাফিরদের চেয়ে গুরুতর ও জঘন্য। কারণ, তারা একই সঙ্গে কুফর ও মিথ্যার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েছে। তারা মুখে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে সুপ্ত কুফর লালন করা ও মিথ্যা বলার পাপে লিপ্ত হয়েছে।
৩. জিন্দিক বা মুলহিদ
মুনাফিকদের চেয়েও বড় অপরাধী হলো জিন্দিক। একে তো তারা কাফির; উপরন্তু তারা নিজেদের কুফরকে ইসলাম নামে আখ্যায়িত করে। নিখাদ কুফরকে তারা ইসলামের নামে বাজারজাতের অপচেষ্টা করে। এমনকি তারা কুরআন মাজিদের আয়াত, প্রিয়নবি ﷺ-এর পবিত্র হাদিস এবং সাহাবি ও বুজুর্গদের বাণীর অপব্যাখ্যা করে তার আলোকে নিজেদের কুফরকে ইসলাম হিসেবে সাব্যস্ত করার অপপ্রয়াস চালায়। এ ধরনের লোকদের শরিয়তের পরিভাষায় ‘জিন্দিক’ বা মুলহিদ বলা হয়।
এবার আসি জিনদিক ও মুরতাদের মধ্যে পার্থক্য প্রসঙ্গে। ‘রাদ্দুল মুহতার’ (ফাতাওয়া শামি) গ্রন্থে এসেছে,
وَالْفَرْقُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْمُرْتَدُّ الْعُمُومُ الْوَجْهِي لِأَنَّهُ قَدْ لَا يَكُونُ مُرْتَدًا، كَمَا لَوْ كَانَ زِنْدِيقًا أَصْلِيًا غَيْرَ مُنْتَقِلٍ عَنْ دِينِ الْإِسْلَامِ، وَالْمُرْتَدُّ قَدْ لَا يَكُونُ زِنْدِيقًا كَمَا لَوْ تَنَصَرَ أَوْ تَهَوَّدَ، وَقَدْ يَكُونُ مُسْلِمًا فَيَتَزَنْدَقُ. وَأَمَّا فِي اصْطِلاحِ الشَّرْعِ، فَالْفَرْقُ أَظْهَرُ لِاعْتِبَارِهِمْ فِيهِ إِبْطَانَ الْكُفْرِ وَالاعْتِرَافَ بِنُبُوَّةِ نَبِيِّنَا ﷺ عَلَى مَا فِي شَرْحِ الْمَقَاصِدِ، لَكِنَّ الْقَيْدَ الثَّانِيَ فِي الزِّنْدِيقِ الْإِسْلَامِي بِخِلَافِ غَيْرِهِ.
'(আক্ষরিক অর্থের বিবেচনায়) মুরতাদ ও জিনদিকের মধ্যে 'উমুম ও খুসুস মিন ওয়াজহিন'-এর সম্পর্ক। কারণ এমনও হতে পারে যে, জিনদিক ব্যক্তি মুরতাদ নয়। যেমন, একজন ব্যক্তি ইসলাম থেকে রূপান্তরিত না হয়ে আদি জিনদিক হতে পারে। আবার মুরতাদ যে হবে, সে জিনদিক না-ও হতে পারে। যেমন, সে খ্রিষ্টধর্ম বা ইহুদিধর্ম গ্রহণ করে নিল। আবার এমনও হতে পারে, সে মুসলিম ছিল, পরে জিনদিক হয়েছে। আর শরিয়ার পরিভাষার বিবেচনায় পার্থক্য তো একেবারেই স্পষ্ট। কারণ, ফকিহগণ জিনদিকের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছেন তা হলো, সে কুফর গোপন করে রাখে এবং আমাদের নবি ﷺ-এর নবুওয়াত স্বীকার করে। শারহুল মাকাসিদ গ্রন্থে এমনটিই এসেছে। তবে দ্বিতীয় শর্তটি (অর্থাৎ, নবি ﷺ-এর নবুওয়াত স্বীকার করা) সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যে মুসলিম নামধারী জিনদিক। অন্যদের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়।'
আল্লামা ইবনু আবিদিন শামি রাহ. অন্যত্র জিনদিকের পরিচয় আরও স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন,
فَإِنَّ الزِّنْدِيقَ يُمَوِّهُ كُفْرَهُ وَيُرَوِّجُ عَقِيدَتَهُ الْفَاسِدَةَ وَيُخْرِجُهَا فِي الصُّورَةِ الصَّحِيحَةِ، وَهَذَا مَعْنَى إِبْطَانِ الْكُفْرِ
'জিনদিক ব্যক্তি তার কুফরকে ছদ্মাবরণ দ্বারা লুকিয়ে রাখে এবং তার বাতিল আকিদাকে বিশুদ্ধ রূপের আকৃতি পরিয়ে সমাজে প্রচার করে। এটাই হলো তার কুফর গোপন করার অর্থ।'
📄 কাফিরদের বিধান
১. মুরতাদের বিধান
চার মাজহাবের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, যে ব্যক্তি ইসলামগ্রহণের পর মুরতাদ হবে, ইসলাম ত্যাগ করবে, তাকে তার রিদ্দাহ থেকে তাওবার জন্য তিন দিনের অবকাশ দেওয়া হবে। এই তিন দিনের মধ্যে ইসলামের যে বিধান নিয়ে তার সংশয়, তা দূর করার চেষ্টা চালানো হবে। তাকে ভালোভাবে বোঝানো হবে। যদি এই তিন দিনে তার বোধোদয় ঘটে এবং সে ইসলামে পুনরায় ফিরে আসে, তাহলে তো ভালো। অন্যথায় চতুর্থ দিনে আল্লাহর জমিনকে তার অস্তিত্ব থেকে পবিত্র করা হবে। এই মাসআলাকে 'মুরতাদ হত্যা'র মাসআলা বলা হয়। এই মাসআলার ব্যাপারে ইমামগণের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই।
সব ধর্ম, দেশ, সরকার এবং সভ্য আইনে বিদ্রোহীর শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড। ইসলামের বিদ্রোহী সেই ব্যক্তি, যে ইসলাম থেকে বিমুখ হয়, মুসলিম থেকে মুরতাদ হয়। এ কারণে ইসলামে মুরতাদের শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। তবে এ ক্ষেত্রেও ইসলাম লক্ষ রেখেছে, তাকে যেন তিন দিনের অবকাশ দেওয়া হয়। এই তিন দিনের মধ্যে সে যদি ইসলামের যে বিধান অস্বীকারের দরুন মুরতাদ হয়েছিল, তা বুঝে ফেলে এবং তাওবা ও ক্ষমাপ্রার্থনা করে, তাহলে তাকে আর শাস্তির সম্মুখীন করা হবে না। পৃথিবীতে অন্যরা বিদ্রোহীকে এ ধরনের সুযোগও দেয় না। তার ক্ষেত্রে শিথিলতার প্রতি কোনো লক্ষ রাখে না। পরিতাপের বিষয়, এরপরও মুরতাদের ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশিত শাস্তির ব্যাপারে আপত্তি করা হয়।
আমেরিকার সরকারের প্রতি বিদ্রোহকারী কেউ যদি তাদের গদি উলটে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই সে গ্রেপ্তার হয়, তাহলে তার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হয়। এ ব্যাপারে কেউ কোনো আপত্তি তুলে না; কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, মুহাম্মাদ-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারীদের ব্যাপারে যদি মৃত্যুদণ্ড জারি করা হয়, তাহলে মানুষ মন্তব্য করা শুরু করে—এই শাস্তি হওয়া উচিত নয়!
কারও হাতে পচন ধরলে ডাক্তার তার হাত কেটে ফেলে। কারও আঙুলে পচন ধরলে ডাক্তার সেই আঙুল হাত থেকে আলাদা করে ফেলে। পৃথিবীবাসী জানে, এটা কোনো অবিচার নয়। এটা কোনো জুলুম নয়; বরং এটা হচ্ছে স্নেহ, দয়া, বাৎসল্য, অনুগ্রহ ও মায়া। কারণ, সময়মতো যদি পচে যাওয়া অঙ্গ না কাটে, তাহলে এর বিষাক্ত প্রভাব সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়বে। পচনের ক্রিয়া থেকে বাঁচতে পচে যাওয়া অঙ্গ কেটে ফেলতে হয় এবং এটাই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। রিদ্দাহ (ধর্মত্যাগ)-ও ইসলামের গাত্রে এক ধরনের পচন। মুরতাদকে তাওবার 'তালকিন' করার পরও সে যখন ইসলামে প্রত্যাবর্তন করা পছন্দ করে না, তখন তার অস্তিত্ব বিনাশ করে দেওয়া অপরিহার্য। অন্যথায় তার বিষ ধাপে ধাপে পুরো উম্মাহর মধ্যে ছড়িয়ে যাবে।
মোদ্দাকথা, চার ইমামের এবং উম্মাহর সকল আলিম ও ফকিহের কাছে মুরতাদের বিধান একমাত্র মৃত্যুদণ্ড। বিবেক ও বুদ্ধির দাবিও তা-ই। আর এতেই রয়েছে উম্মাহর নিরাপত্তা।
২. জিন্দিকের বিধান
জিন্দিক-যে নিজের কুফরকে ইসলাম হিসেবে সাব্যস্ত করতে প্রচেষ্টারত, তার বিষয় মুরতাদের চেয়েও জঘন্য ও ভয়াবহ। ইমাম শাফিয়ি রাহ. এবং প্রসিদ্ধ মত অনুসারে ইমাম আহমাদ রাহ. বলেন, জিন্দিকের বিধান মুরতাদের বিধানের অনুরূপ। অর্থাৎ, তাকে তাওবার সুযোগ দেওয়া হবে। যদি সে তিন দিনের মধ্যে তাওবা করে, তাহলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। আর যদি সে তাওবা না করে, তাহলে সে ওয়াজিবুল কতল সাব্যস্ত হবে। সুতরাং এই দুই ইমামের দৃষ্টিতে মুরতাদ ও জিন্দিকের বিধান অভিন্ন। অপরদিকে ইমাম মালিক রাহ. বলেন,
لَا أَقْبَلُ تَوْبَةَ الزَّنْدِيْقِ.
'আমি জিন্দিকের তাওবা কবুল করব না।'
অর্থাৎ, তার ওপর অপরিহার্যভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। সুতরাং কারও ব্যাপারে যদি জানা যায় সে জিন্দিক, সে নিজের কুফরকে ইসলামের নামে চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। আর এই অপরাধে সে গ্রেপ্তার হয়। এরপর সে নিজের ভুল স্বীকার করে বলে, আমি তাওবা করছি। আর কখনো এরূপ করব না। তাহলে তার তাওবা কবুল করা আল্লাহর কাজ। আমরা অপরিহার্যভাবে তার ওপর আইনের শাস্তি জারি করব। পৃথিবীপৃষ্ঠে তার অস্তিত্ব বাকি রাখব না— যেভাবে ব্যভিচার ও ধর্ষণের শাস্তির ক্ষেত্রে তাওবার দ্বারা ক্ষমা হয় না; সর্বাবস্থায় তার ওপর শাস্তি প্রযোজ্য হয়। ব্যক্তি তাওবা করুক বা না করুক, কোনো অবস্থায়ই পার্থিব শাস্তি থেকে সে নিষ্কৃতি পায় না। কেউ যদি চুরি করে ধরা খায়, তবে সে শত তাওবা করলেও অপরিহার্যভাবে তার হাত কাটা হবে।
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহ.-এর মত হলো, জিন্দিক ওয়াজিবুল কতল। তাকে হত্যা করা অপরিহার্য। গ্রেপ্তারের পর তার তাওবা গ্রহণ করা হবে না। হ্যাঁ, কোনো জিন্দিক যদি স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজ থেকে এসে তাওবা করে, অন্য কেউ আদৌ জানতই না যে, সে একজন জিন্দিক, সে নিজেই তার জিন্দিক হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করে এবং আন্তরিকভাবে তাওবা করে, তাহলে তার তাওবা গৃহীত হবে। অনুরূপ কারও ব্যাপারে যদি এটা জানা থাকে যে, সে জিন্দিক; কিন্তু গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই আল্লাহ তাকে হিদায়াত দান করেছেন, ফলে সে নিজেই আত্মসমর্পণ করে অনুতপ্ত হয় এবং তাওবা করে জিন্দিক থেকে পুনরায় মুমিন হয়ে যায়, তবে তার তাওবাও গৃহীত হবে। তার ওপর মুরতাদের দণ্ড প্রয়োগ করা হবে না। তবে গ্রেপ্তার হওয়ার পর কেউ যদি শতবারও তাওবা করে, তার তাওবা আর গৃহীত হবে না।
বিষয়টি ভালো করে বোঝা উচিত— কাদিয়ানি হচ্ছে জিন্দিক। কারণ, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, সে কাফির। অকাট্যভাবে কাফির। যেভাবে কালিমা তাইয়িবা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ'-এর মধ্যে কোনো সন্দেহ নেই যে, এটা আমাদের কালিমা এবং যে এই কালিমার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে সে কাফির; একইভাবে মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানি ও তার অনুসারীরা কাফির হওয়ার ব্যাপারেও কোনো সন্দেহ নেই। যে তাদের কাফির হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ করবে, সে-ও মুসলিম থাকবে না।
কাদিয়ানিরা কাফির হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের কুফরকে ইসলামের নামে উপস্থাপন করে। তারা নিজেদের পরিচয় দেয় এই বলে, আমরা 'আহমদিয়া মুসলিম জামাআত'। তাদের দাবি অনুসারে তারা মুসলিম। লন্ডনে তাদের বসতির নাম পর্যন্ত রেখেছে ইসলামাবাদ। তারা বলে বেড়ায়, আমরা তো ইসলাম প্রচার করি। যখন কোনো মুসলিমের সঙ্গে তাদের কথা হয়, তখন তারা এই বলে ধোঁকা দেয়, দেখো, মোল্লারা কীভাবে মানুষের মধ্যে ভুল প্রচার করে এবং আমাদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ায়। এই দেখো, আমরা সালাত পড়ি। রোজা রাখি। এই করি, সেই করি। এমনকি আমরা রাসুল -কে সর্বশেষ নবি হিসেবেও বিশ্বাস করি। আমাদের বায়আতের শর্তের মধ্যেই লেখা রয়েছে, আমরা অন্তরের সত্যায়নের সঙ্গে মুহাম্মাদ -কে 'খাতামুন নাবিয়্যিন' তথা শেষ নবি হিসেবে মানি।
এ কারনেই কাদিয়ানিরা (যাদের মির্জায়িও বলা হয়) জিন্দিক। কারণ, তারা নিজেদের কুফরের ওপর ইসলামের প্রলেপ লাগায়। তারা যেন মদ এবং পেশাবের ওপর জমজমের লেভেল লাগায়। তারা যেন কুকুরের গোশতকে হালাল পশুর গোশত বলে চালিয়ে দেয়। পৃথিবীবাসী জানে, মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর প্রেরিত শেষ নবি। এটি মুসলিমদের এমন একটি আকিদা, যে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ বা সংশয় রাখার অবকাশ নেই। বিদায়হজের ভাষণে রাসুল বলেছেন, 'হে মানুষসকল, আমি সর্বশেষ নবি এবং তোমরা সর্বশেষ উম্মত।'
দুই শতাধিক হাদিস এমন, যাতে বিভিন্ন শিরোনামে, বিভিন্ন পন্থায়, বিভিন্ন পদ্ধতি ও উপস্থাপনায় রাসুলের খতমে নবুওয়াতের মাসআলা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, রাসুলের পর আর কোনো নবি নেই। তার পর আর কাউকে নবুওয়াত প্রদান করা হবে না।
'আখেরি নবি' বা 'খাতামুন নাবিয়্যিন' অর্থ হলো, রাসুলের পর আর কারও মাথায় নবুওয়াতের মুকুট রাখা হবে না। এর পর কেউই নবুওয়াতের মসনদে পা রাখবে না। যাঁরা পূর্বে নবি ছিলেন, তাঁদের সবার ওপর তো আমাদের আগে থেকেই ইমান আছে। মুহাম্মাদ আল্লাহর সর্বশেষ নবি। তাঁর পরে আর কেউ নবুওয়াতের মর্যাদায় ভূষিত হবে না। সুতরাং উম্মাহর জন্যও রাসুলের পরে আর কারও রিসালাতের ওপর ইমান আনার প্রয়োজন পড়বে না। মোদ্দাকথা, 'খাতামুন নাবিয়্যিন' অর্থ হলো, রাসুলের আগমনের মাধ্যমে নবি আগমনের ধারা বন্ধ হয়ে গেছে। নবুওয়াতের ধারার ওপর মোহর লেগে গেছে। খামের ওপর সিল মেরে দেওয়া হয়েছে। এখন আর কোনো প্রকার নবির আগমন ঘটবে না। যাঁরা আগে থেকে নবি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, তাঁদের কাউকেও আর বের করা যাবে না।
মির্জা গোলাম কাদিয়ানি মুসলিমদের এই শাশ্বত আকিদার অপব্যাখ্যা করে। সে বলে, 'খাতামুন নাবিয়্যিন' অর্থ এটা নয় যে, রাসুল শেষ নবি কিংবা তাঁর পর নবুওয়াতের দরজা বন্ধ! বরং এর অর্থ হচ্ছে, আগামী দিনে রাসুলের মোহর থেকে নবি বানানো হবে। পূর্বে নবুওয়াত আল্লাহ নিজে প্রদান করতেন; কিন্তু এখন এই দায়িত্ব আল্লাহ রাসুল -কে সোপর্দ করেছেন। এখন নবি চাইলে যে-কারও ওপর মোহর লাগাতে পারেন এবং তাকে নবি বানাতে পারেন।
এটাই হচ্ছে ইলহাদ ও জানদাকা। তারা নাম ব্যবহার করে ইসলামের; কিন্তু নিজেদের কুফরি আকিদার ওপর কুরআনের আয়াতের অপব্যবহার করে। এছাড়াও নিজেদের অসংখ্য কুফরি আকিদাকে ইসলামের নামে উপস্থাপন করে।
মির্জা বশির আহমাদ লিখেছে,
যে ব্যক্তি মুসাকে মানে কিন্তু ইসাকে মানে না অথবা ইসাকে মানে; কিন্তু মুহাম্মাদ -কে মানে না, উপরন্তু প্রতিশ্রুত মাহদি (মির্জা কাদিয়ানি)-কে মানে না, সে শুধু কাফিরই নয়; বরং পাক্কা কাফির এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে খারিজ。
কাদিয়ানিরা দাবি করে, মুহাম্মাদ ﷺ -এর দুইবার পৃথিবীতে আগমন নির্ধারিত ছিল। প্রথমবার তিনি মক্কা মুকাররামায় এসেছেন। তাঁর এই আগমন ১৩০০ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে তিনি মির্জা কাদিয়ানির রূপে কাদিয়ান নামক গ্রামে দ্বিতীয়বার প্রেরিত হয়েছেন। এ জন্য তাদের দৃষ্টিতে গোলাম কাদিয়ানি স্বয়ং মুহাম্মাদ রাসুল। কালিমা তাইয়িবায় উল্লিখিত 'মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ' দ্বারা উদ্দেশ্য মির্জা গোলাম কাদিয়ানি। মির্জা বশির আহমাদ লিখেছে,
প্রতিশ্রুত মাহদি (মির্জা কাদিয়ানি) স্বয়ং মুহাম্মাদ রাসুল , যিনি ইসলাম প্রচারের জন্য দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় আগমন করেছেন। এ জন্য আমাদের নতুন কোনো কালিমার দরকার নেই। হ্যাঁ, মুহাম্মাদ রাসুলের স্থলে যদি অন্য কেউ আসত, তাহলে এর প্রয়োজন দেখা দিত。
সুতরাং তাদের দৃষ্টিতে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ' অর্থ 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মির্জা রাসুলুল্লাহ', যে দ্বিতীয়বার কাদিয়ান নামক গ্রামে আবির্ভূত হয়েছে। তারা আলাদা নবি বানিয়েছে। স্বতন্ত্র ধর্মীয় গ্রন্থ গ্রহণ করেছে, যার নাম তাজকিরা। কাদিয়ানিদের দৃষ্টিতে এই তাজকিরার মর্যাদা তাওরাত, জবুর, ইনজিল ও কুরআনের অনুরূপ। কাদিয়ানিরা আলাদা উম্মাহও গঠন করেছে। তারা স্বতন্ত্র শরিয়া বানিয়েছে। ইসলামের কালিমা ভিন্ন অর্থে গ্রহণ করেছে। তারা নিজেদের ধর্মের নামও ইসলাম রেখেছে এবং আমাদের ধর্মের নাম রেখেছে কুফর।
৩. মুরতাদ এবং তার বংশধরের বিধান
মূলনীতি হলো, মুরতাদকে তিন দিনের অবকাশ দেওয়ার পর সে রিদ্দাহ থেকে ইসলামে প্রত্যাবর্তন না করলে চতুর্থ দিন তাকে হত্যা করা হবে। তবে যদি এমন হয় যে, মুরতাদরা একটা দলে পরিণত হলো। ইসলামি সরকার তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলো না। এ কারণে তাদের ওপর মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। এভাবে নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পর এই মুরতাদরা মৃত্যুবরণ করল; কিন্তু তাদের বংশধররা রয়ে গেল। উদাহরণস্বরূপ, কোনো সম্প্রদায়ের লোকেরা পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে খ্রিষ্টান হয়ে গেল; কিন্তু কেউ তাদের হত্যা করল না, তারা গ্রেপ্তারও হলো না। এভাবে নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তারা সবাই মরে গেল। তাদের বংশধর যারা ছিল, তারা মুসলিম থেকে খ্রিষ্টান হয়নি; বরং তারা ছিল বাপ-দাদা থেকে চলে আসা বংশানুক্রমিকভাবে খ্রিষ্টান। মুরতাদদের সন্তানসন্ততির ব্যাপারে ইসলামের বিধান হলো, তাদের বন্দি ও প্রহার করে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হবে। তবে হত্যা করা হবে না। কারণ, মুরতাদের সন্তান মুরতাদ হিসেবে গণ্য হয় না; বরং তারা সাধারণ কাফির হিসেবে বিবেচিত হয়।
৪. জিন্দিক কাদিয়ানি এবং তার বংশধরের বিধান
কাদিয়ানিদের ব্যাপারটি সাধারণ মুরতাদদের চেয়ে ভিন্ন। তাদের বংশধারা যদি ১০০ পুরুষ পর্যন্তও চলে যায়, এরপরও তাদের ওপর জিন্দিক ও মুরতাদের বিধানই প্রযোজ্য হবে; সাধারণ কাফিরদের বিধিবিধান প্রযোজ্য হবে না। কারণ, তাদের অপরাধ হলো ইলহাদ ও জানদাকা। অর্থাৎ, কুফরকে ইসলাম এবং ইসলামকে কুফর বলে আখ্যায়িত করা। এই অপরাধ শত পুরুষ অতিবাহিত হওয়ার পরও সব প্রজন্মের মধ্যেই জারি থাকে। সুতরাং সকল কাদিয়ানির বিধান অভিন্ন—চাই তারা ইসলাম ত্যাগ করে কাদিয়ানি ধর্মমত গ্রহণ করার দ্বারা মুরতাদ ও জিন্দিক হোক; কিংবা তাদের দাবি অনুসারে জন্মগতভাবে আহমাদি হোক।
কাদিয়ানি বাবা-মায়ের ঘরে জন্মগ্রহণের দ্বারা উত্তরাধিকারসূত্রে এই ধর্মমতের অধিকারী হলেও তারা মুরতাদ ও জিন্দিক বলেই আখ্যায়িত হবে। কারণ, তাদের অপরাধ শুধু এটা নয় যে, তারা ইসলাম ত্যাগ করে কাফির হয়েছে; বরং তাদের অপরাধ হলো, তারা ইসলামকে কুফর নামে আখ্যায়িত করেছে এবং নিজেদের কুফরি ধর্মকে ইসলাম বলে অভিহিত করেছে। এই অপরাধ প্রত্যেক কাদিয়ানির মধ্যেই পাওয়া যায়-চাই সে ইসলাম ত্যাগ করে কাদিয়ানি হোক; কিংবা জন্মগতভাবে কাদিয়ানি হোক। মাসআলাটি খুব ভালোভাবে বুঝে নিন। অনেক মানুষ কাদিয়ানিদের হাকিকত সম্বন্ধে জানে না।
মুসলিমদের আত্মমর্যাদাবোধের দাবি হলো, দুনিয়াতে একজন কাদিয়ানিও প্রাণে বাঁচবে না। প্রত্যেককে ধরে ধরে জাহান্নামে পাঠাবে। জজবার ভিত্তিতে আমি এই কথা বলছি না; বরং বাস্তবতা এটাই। ইসলামের ফাতওয়াও এই কথা বলে। মুরতাদ ও জিন্দিকের ব্যাপারে ইসলামের বিধানও এটাই; কিন্তু এটা মুসলিমদের প্রতিনিধি রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব। ব্যক্তিগতভাবে আমরা প্রত্যেকে এই কাজ করতে সমর্থ নই। এ জন্য কমপক্ষে এতটুকু তো হওয়া উচিত, আমরা কাদিয়ানিদের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সম্পর্ক ছিন্ন করব। আমাদের কোনো মজলিসে বা কোনো মাহফিলে আমরা তাদের সহ্য করব না। সব ক্ষেত্রে আমরা তাদের মোকাবিলা করব।
اے مسلمان! جب تو کسی قادیانی سے ملتا ہے تو گنبد خضری میں دل مصطفی ﷺ دکھتا ہے
হে মুসলিম, যখন তুমি কোনো কাদিয়ানির সাথে মিলিত হও, তখন সবুজ গম্বুজের ভেতর নবি মুসতাফা ﷺ -এর অন্তর ব্যথিত হয়।
টিকাঃ
২৮ কালিমাতুল ফাসল: ১১০।
২৭৯ কালিমাতুল ফাসল: ১৫৮।
২৮০ কাদিয়ানি বিষয়ক আলোচনাটি ইউসুফ লুধিয়ানবি শহিদ রাহ.-এর এ-সংক্রান্ত উর্দু রিসালা থেকে সংগৃহীত ও সংক্ষেপিত।