📄 সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হলেও তা অস্বীকারের কারণে তাকফির করা যাবে না
চার মাজহাবের অধিকাংশ ফকিহের মত সামনে রাখলে প্রতিভাত হয়, কেউ শুধু জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত কোনো বিষয় অস্বীকার করলেই কেবল তাকফিরের উপযুক্ত হয়। কোনো বিষয় যদি জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত না হয়, তবে অকাট্য ও সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হলেও তা অস্বীকারের কারণে কাউকে তাকফির করা যাবে না। এখানে আমরা উদাহরণস্বরূপ তিনজন ইমামের বক্তব্য উল্লেখ করতে পারি।
ইমাম গাজালি রাহ. লেখেন,
وَأَمَّا الْفِقْهِيَّةُ فَالْقَطْعِيَّةُ مِنْهَا وُجُوبُ الصَّلَوَاتِ الْخَمْسِ وَالزَّكَاةِ وَالْحَجِّ وَالصَّوْمِ وَتَحْرِيمِ الزِّنَا وَالْقَتْلِ وَالسَّرِقَةِ وَالشَّرْبِ، وَكُلَّ مَا عُلِمَ قَطْعًا مِنْ دِينِ اللَّهِ فَالْحَقُّ فِيهَا وَاحِدٌ وَهُوَ الْمَعْلُومُ وَالْمُخَالِفُ فِيهَا آثِمٌ. ثُمَّ يُنْظَرُ فَإِنْ أَنْكَرَ مَا عُلِمَ ضَرُورَةً مِنْ مَقْصُودٍ الشَّارِعِ كَإِنْكَارِ تَحْرِيمِ الْخَمْرِ وَالسَّرِقَةِ وَوُجُوبِ الصَّلَاةِ وَالصَّوْمِ فَهُوَ كَافِرُ؛ لِأَنَّ هَذَا الْإِنْكَارَ لَا يَصْدُرُ إِلَّا عَنْ مُكَذِّبِ بِالشَّرْعِ ، إِنْ عُلِمَ قَطْعًا بِطَرِيقِ النَّظَرِ لَا بِالضَّرُورَةِ كَكَوْنِ الْإِجْمَاعِ حُجَّةً وَكَوْنِ الْقِيَاسِ وَخَبَرِ الْوَاحِدِ حُجَّةً وَكَذَلِكَ الْفِقْهِيَّاتُ الْمَعْلُومَةُ بِالْإِجْمَاعِ فَهِيَ قَطْعِيَّةٌ فَمُنْكِرُهَا لَيْسَ بِكَافِرٍ لَكِنَّهُ آثِمٌ مُخْطِئُ.
'অকাট্য ফিকহি মত-যেমন: পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, জাকাত, হজ ও রোজার আবশ্যকতা এবং ব্যভিচার, হত্যা, চুরি ও মদপানের নিষিদ্ধতা এবং আল্লাহর দীনের অকাট্যভাবে বিদিত আরও যত বিষয় রয়েছে, এগুলোর ক্ষেত্রে হক স্রেফ একটাই। আর তা সুবিদিত। এর বিরোধিতাকারীরা পাপী। লক্ষ করা হবে, বিরোধিতাকারী যদি জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত কোনো বিষয় অস্বীকার করে-যেমন : মদ ও চুরির নিষিদ্ধতা অথবা সালাত ও সিয়ামের অপরিহার্যতা অস্বীকার করল, তাহলে সে কাফির। কারণ, এগুলো সে ব্যক্তিই অস্বীকার করতে পারে, যে শরিয়া অস্বীকার করেছে। আর কোনো বিষয় যদি গবেষণার দ্বারা অকাট্যভাবে জানা যায়, জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দ্বারা নয়- যেমন : ইজমা একটি প্রমাণ, কিয়াস ও খবরে ওয়াহিদও প্রমাণ, একইভাবে ইজমার দ্বারা বিদিত ফিকহি বিধিবিধান—তবে তা অকাট্য; কিন্তু এর অস্বীকারকারী কাফির নয়; বরং পাপী ও ভুলকারী।'
আল্লামা ইবনু নুজায়ম রাহ. লেখেন,
فَالْحَاصِلُ أَنَّ الْمَذْهَبَ عَدَمُ تَكْفِيرِ أَحَدٍ مِنْ الْمُخَالِفِينَ فِيمَا لَيْسَ مِنْ الْأُصُولِ الْمَعْلُومَةِ مِنْ الدِّينِ ضَرُورَةً.
'মোটকথা, মাজহাব হচ্ছে জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, এমন মৌলিক বিষয়ে বিরোধিতাকারী কাউকে তাকফির করা হবে না。
ইমাম নববি রাহ. লেখেন,
قُلْتُ: أَطْلَقَ الْإِمَامُ الرَّافِعِيُّ الْقَوْلَ بِتَكْفِيرِ جَاحِدِ الْمُجْمَعَ عَلَيْهِ، وَلَيْسَ هُوَ عَلَى إِطْلَاقِهِ، بَلْ مَنْ جَحَدَ مُجْمَعًا عَلَيْهِ فِيهِ نَصٌّ ، وَهُوَ مِنْ أُمُورِ الْإِسْلَامِ الظَّاهِرَةِ الَّتِي يَشْتَرِكُ فِي مَعْرِفَتِهَا الْخَوَاصُّ وَالْعَوَامُّ، كَالصَّلَاةِ، أَوِ الزَّكَاةِ، أَوِ الْحَجِّ، أَوْ تَحْرِيمِ الْخَمْرِ، أَوِ الزِّنَا، وَنَحْوِ ذَلِكَ، فَهُوَ كَافِرُ. وَمَنْ جَحَدَ مُجْمَعًا عَلَيْهِ لَا يَعْرِفُهُ إِلَّا الْخَوَاصُّ، كَاسْتِحْقَاقِ بِنْتِ الابْنِ السُّدُسَ مَعَ بِنْتِ الصُّلْبِ، وَتَحْرِيمِ نِكَاحِ الْمُعْتَدَّةِ، وَكَمَا إِذَا أَجْمَعَ أَهْلُ عَصْرٍ عَلَى حُكْمِ حَادِثَةٍ، فَلَيْسَ بِكَافِرِ، لِلْعُذْرِ، بَلْ يَعْرِفُ الصَّوَابَ لِيَعْتَقِدَهُ. وَمَنْ جَحَدَ مُجْمَعًا عَلَيْهِ، ظَاهِرًا، لَا نَصَّ فِيهِ. فَفِي الْحُكْمِ بِتَكْفِيرِهِ خِلَافُ يَأْتِي - إِنْ شَاءَ اللهُ تَعَالَى - بَيَانُهُ فِي بَابِ الرَّدَّةِ.
'ইমাম রাফিয়ي রাহ. কথাটি সাধারণভাবে বলেছেন, যে ব্যক্তি সর্বসম্মত কোনো বিষয় অস্বীকার করবে, সে কাফির হয়ে যাবে; কিন্তু কথাটি ব্যাপকতার ওপর প্রযোজ্য নয়। বরং যে ব্যক্তি এমন কোনো সর্বসম্মত বিষয় অস্বীকার করবে, যে ব্যাপারে কোনো নস রয়েছে এবং তা ইসলামের এমন সুপ্রকাশিত বিষয়, যা আলিম ও জনসাধারণ সবাই জানে। যেমন: সালাত, জাকাত, হজ, মদ ও জিনার নিষিদ্ধতা ইত্যাদি-সে কাফির হয়ে যাবে। আর কেউ যদি এমন কোনো সর্বসম্মত বিষয় অস্বীকার করে, যা শুধু আলিমরাই জানে-যেমন: মিরাসে নিজের কন্যা থাকলে পুত্রের ঘরের কন্যা পাবে এক-ষষ্ঠাংশ, ইদ্দত পালনকারী নারীকে বিয়ে করা হারাম। এভাবে কোনো যুগের আলিমরা যদি সেই যুগে নতুন সৃষ্ট কোনো বিষয়ে ইজমা করেন, তবে এর অস্বীকারকারী ওজর থাকার কারণে কাফির নয়; বরং তাকে সঠিকটা জানিয়ে দেওয়া হবে, যাতে সে তা বিশ্বাস করে নিতে পারে। তবে কেউ যদি এমন কোনো সর্বসম্মত বিষয় অস্বীকার করে, যা সর্বজনবিদিত; কিন্তু সে ব্যাপারে কোনো নস নেই, তাহলে এমন অস্বীকারকারীর তাকফির নিয়ে ইখতিলাফ রয়েছে, যার বিবরণ রিদ্দাহ অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ。
তবে এ ক্ষেত্রে দলিলের বিচারে অধিক শক্তিশালী মত এটা নয়; বরং শক্তিশালী মত হলো, শরিয়তের যেকোনো অকাট্য বিষয় অস্বীকার করলেই ব্যক্তিকে তাকফির করা হবে। যেমন, ইমাম ইবনুল হুমام রাহ. লেখেন,
أما ما ثبت قطعا ولم يبلغ حد الضرورة كاستحقاق بنت الابن السدس من البنت بإجماع المسلمين فظاهر كلام الحنفية الإكفار بجحده؛ لأنهم لم يشترطوا سوى القطع في الثبوت.
'যে বিষয়গুলো অকাট্যভাবে প্রমাণিত, তবে জরুরিয়াতে দীনের পর্যায়ে পৌঁছায়নি-যেমন: নিজের কন্যার সঙ্গে পুত্রের ঘরের নাতনি মিরাসের হকদার হবে, এ বিষয়টি মুসলিমদের ইজমা দ্বারা প্রমাণিত-হানাফি ফকিহদের বক্তব্যের বাহ্যিক দাবি হচ্ছে, এর অস্বীকারকারীকে তাকফির করা হবে। কারণ, তারা তাকফির করতে বিধানটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত হওয়া ছাড়া কোনো শর্তারোপ করেননি। '
আল্লামা কাশমিরি রাহ.-ও তাঁর গ্রন্থে ইমাম ইবনুল হুমাম রাহ.-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে এর সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেছেন এবং দলিলের বিচারে এটাকেই শক্তিশালী মত বলে উল্লেখ করেছেন。
ইমাম বদরুদ্দিন জারকাশি রাহ. লেখেন,
وَالْحَقُّ أَنَّهُ لَا يُكَفَّرُ أَحَدٌ مِنْ أَهْلِ الْقِبْلَةِ إِلَّا بِإِنْكَارٍ مُتَوَاتِرٍ مِنْ الشَّرِيعَةِ عَنْ صَاحِبُهَا فَإِنَّهُ يَكُونُ حِينَئِذٍ مُكَذِّبًا لِلشَّرْعِ وَلَيْسَ مُخَالَفَةُ الْقَوَاطِعِ مَأْخَذَ التَّكْفِيرِ، وَإِنَّمَا مَأْخَذُهُ مُخَالَفَةُ الْقَوَاعِدِ السَّمْعِيَّةِ الْقَطْعِيَّةِ طَرِيقًا وَدَلَالَةٌ.
'হক কথা হলো, আহলে কিবলার কাউকে তাকফির করা হবে না। তবে রাসুল থেকে প্রমাণিত শরিয়তের কোনো মুতাওয়াতির বিধান অস্বীকারের কারণে তাকফির করা হবে। কারণ, তখন সে শরিয়া অস্বীকারকারী হয়ে যাবে। সব অকাট্য বিষয়ের বিরোধিতা করাই তাকফিরের সূত্র নয়; বরং তাকফিরের সূত্র হলো, সেসব মূলনীতির বিরোধিতা করা, যা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত এবং যার বক্তব্যও দ্ব্যর্থহীন。
সুতরাং এ ব্যাপারে শক্তিশালী মত হলো, শরিয়তের যেসব বিধান রাসুল থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত এবং যার বক্তব্য ও নির্দেশনা সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন, তা জরুরিয়াতে দীনের পর্যায়ে না পৌঁছালেও কেউ যদি তা অস্বীকার করে, তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে তাকফির করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বিষয়টির বাস্তবতা বোঝানো জরুরি। বোঝানোর পরে সে যদি সঠিক আকিদা পোষণ করে, তাহলে তাকে আর তাকফির করা হবে না। তবে বিষয়টি ঠিকভাবে অনুধাবনের পরও সে যদি গোঁড়ামি করে (অস্বীকারের ওপর অটল থাকে), তাহলে তাকে নির্দ্বিধায় তাকফির করা হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কেন সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের বাইরে গিয়ে মুহাক্কিক আলিমগণের এই অভিমত প্রাধান্য দিলাম? এখানে আমরা ধারাবাহিকভাবে এর আটটি মৌলিক কারণ উল্লেখ করব।
১. তাকফিরের ভিত্তি বিদ্যমান থাকা
যেহেতু ইমান ও কুফরের ভিত্তি হচ্ছে সত্যায়ন ও অসত্যায়নের ওপর, এ জন্য স্বাভাবিক যুক্তির দাবি তো ছিল, শরিয়তের যেকোনো বিধান অস্বীকারের কারণেই ব্যক্তিকে তাকফির করা হবে। এমনকি এতে অকাট্য এবং অকাট্য নয়, মুতাওয়াতির এবং মুতাওয়াতির নয়, এগুলোর মধ্যেও পার্থক্য করা হবে না। এ কারণেই ইমাম ইবনু হাজার হাইতামি রাহ. ২৫২ ও ইমাম ইবনুল হুমام রাহ. ২৫৩ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লিখেছেন, রাসুলের যুগে কেউ ইসলামের যেকোনো বিধান অস্বীকার করলে নির্দ্বিধায় তাকফির করা হবে; কিন্তু পরবর্তী যুগগুলোতে যেকোনো বিধান অস্বীকারের ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে এই ফাতওয়া দেওয়া হয় না; বরং তাকফিরের জন্য কমপক্ষে মুতাওয়াতির বিধানের অস্বীকার বিবেচনায় নেওয়া হয়। দুই অবস্থার মধ্যে পার্থক্য হলো, রাসুলের সময়ে বিদ্যমান ব্যক্তি যখন শরিয়তের কোনো বিধান অস্বীকার করল, তখন সে সুনিশ্চিতভাবেই রাসুলের শিক্ষা অস্বীকার করল, যা সে নিজ কানেই শুনেছে; কিন্তু পরবর্তী যুগের লোকেরা সরাসরি রাসুল থেকে ইসলামের শিক্ষা পায়নি; বরং বিভিন্ন মাধ্যম ও সূত্র হয়ে তাদের কাছে এই শিক্ষাগুলো পৌঁছেছে। এ জন্য প্রথমে নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক যে, এই শিক্ষাগুলো আদতেই রাসুল থেকে বর্ণিত হয়েছে কি না। আর এটা তখনই সম্ভব, যখন বিষয়টি মুতাওয়াতির বা অকাট্য হবে। কারণ, ফিকহের মূলনীতি হচ্ছে : اليقين لا يزول بالشك. 'সন্দেহ দ্বারা সুনিশ্চিত বিষয় দূর হয় না।'
আমরা পূর্বেও আলোচনা করেছি, তাকফিরের জন্য সুনিশ্চিত ও সুদৃঢ় ভিত্তি প্রয়োজন। খবরে ওয়াহিদ বা কিয়াস দ্বারা সুনিশ্চিত জ্ঞান অর্জিত হয় না। সুতরাং দীনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো বিষয় অস্বীকার করলেই ঢালাওভাবে তাকফিরের ফাতওয়া আরোপ করা যাবে না।
জরুরিয়াতে দীন অস্বীকার করলে তাকফিরের মূল কারণ কী? উপরে ইমাম গাজালির বক্তব্যে বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনি লেখেন,
لِأَنَّ هَذَا الْإِنْكَارَ لَا يَصْدُرُ إِلَّا عَنْ مُكَذِّبِ بِالشَّرْعِ
'কারণ, এগুলো সেই ব্যক্তিই অস্বীকার করতে পারে, যে শরিয়াকে অস্বীকার করেছে।
এ কারণটি শুধু জরুরিয়াতে দীনের ব্যাপারেই নয়; বরং সব অকাট্য বিধানের ব্যাপারেই প্রযোজ্য হয়। সুতরাং তাকফির বৈধ হতে অকাট্য বিধান অস্বীকারের শর্ত উল্লেখ করা তো যৌক্তিক; কিন্তু এটাকে শুধু জরুরিয়াতে দীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার সুদৃঢ় কোনো যুক্তি নেই।
২. জরুরিয়াতে দীন এবং অকাট্য বিধানের মধ্যে পার্থক্য করার তাৎপর্য
জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি বিধানই অকাট্য। তবে প্রতিটি অকাট্য বিধানই ২৫০ আল-মুসতাসফা: ৩৪৮।
৩. তাকফিরের ভিত্তি জরুরিয়াতে দীন অস্বীকারের ওপর রাখার আসল রহস্য
যে-সকল ফকিহ জরুরিয়াতে দীন অস্বীকারের ওপর তাকফিরের ভিত্তি রেখেছেন, তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, হুজ্জত কায়িম (প্রমাণ প্রতিষ্ঠা) ও সর্বস্তরে বিধান পৌঁছার ব্যাপারে নিশ্চয়তা। যে ব্যক্তি এমন কোনো বিধান অস্বীকার করবে, যা সর্বজনবিদিত, সে কিছুতেই নিজের ব্যাপারে অজ্ঞতার ওজর দেখাতে পারবে না। এ কারণে পূর্বে আমরা আলোচনা করে দেখিয়েছি যে, ফকিহগণের বক্তব্যের আলোকে জরুরিয়াতে দীন নয় এমন অকাট্য বিধান অস্বীকারের ক্ষেত্রে তাকফির করার আগে অস্বীকারকারীকে সঠিক বিষয় সম্পর্কে অবগত করা অপরিহার্য। আল্লামা আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ হামাওয়ي রাহ. লেখেন,
إِذَا لَمْ يَعْرِفْ أَنَّ مُحَمَّدًا آخِرَ الْأَنْبِيَاءِ فَلَيْسَ بِمُسْلِمٍ؛ لِأَنَّهُ مِنْ الضَّرُورِيَّاتِ يَعْنِي وَالْجَهْلُ بِالضَّرُورِيَّاتِ فِي بَابِ الْمُكَفِّرَاتِ لَا يَكُونُ عُذْرًا بِخِلَافٍ غَيْرِهَا، فَإِنَّهُ يَكُونُ عُذْرًا عَلَى الْمُفْتَى بِهِ كَمَا تَقَدَّمَ وَاللَّهُ أَعْلَمُ.
'কেউ যদি এটা না জানে যে, মুহাম্মাদ ﷺ সর্বশেষ নবি, তাহলে সে মুসলিম নয়। কারণ, এটা জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত। আর তাকফিরের অধ্যায়ে জরুরিয়াতে দীনের ব্যাপারে অজ্ঞতা ওজর হয় না। যেসব বিষয় জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, সেগুলোর কথা ভিন্ন। কারণ, গৃহীত ফাতওয়া অনুসারে সেগুলোর ক্ষেত্রে অজ্ঞতা ওজর হয়।
এর দ্বারা বোঝা গেল, যে বিষয়গুলো শরিয়তে অকাট্য হওয়া সত্ত্বেও জরুরিয়াতে দীনের পর্যায়ে পৌঁছায়নি, সেগুলোর ক্ষেত্রে অজ্ঞতা ওজর হতে পারে। কারণ, ইমান আনয়নের জন্য পুরো শরিয়তের ওপর সংক্ষিপ্তভাবে ইমান আনাই যথেষ্ট; প্রতিটি বিধান সম্পর্কে সবিস্তারে জ্ঞান অর্জন করে বিশ্বাস স্থাপন করা আবশ্যক নয়।
আল্লামা মুরতাজা ইবনুল ওয়াজির ইয়ামানি রাহ. লেখেন,
أن المتواترات نوعان: أحدهما: ما عَلِمَهُ العامة مع الخاصة، كمثل كلمة التوحيد، وأركان الإسلام، فيكفر جاحده مطلقاً، لأنه قد بلغه التنزيل، وإنما رده بالتأويل، وإن لم يعلم هو ثبوت ما جحده من الدين بسبب ما دخل فيه من البدع والشبه التي ربما أدت إلى الشك في الضرورات، ودفع العلوم والحجة على التكفير بذلك مع الشك قوله تعالى: ﴿لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ ثَالِثُ ثَلَثَة﴾، والمعلوم أنهم ما قصدوا تكذيب عيسى، بل قصدوا تصديقه، ويدل على هذا التعليل بالبلوغ، وعلى أن الجهل قبله عذر لا بعده قوله تعالى: ﴿ذلِكَ أَن لَّمْ يَكُن رَّبُّكَ مُهْلِكَ الْقُرَى بِظُلْمٍ وَ أَهْلُهَا غُفِلُونَ﴾ وهي من أوضح الأدلة على ذلك ولله الحمد
وثانيهما: ما لا يعرف تواتره إلا الخاصة، فلا يُكفر مستحله من العامة، لأنه لم يبلغه، وإنما يكفر من استحله وهو يعلم حرمته بالضرورة، مثل: تحريم الصلاة على الحائض إلى أمثال لذلك كثيرة، وقد شرب الخمر مستحلاً متأولاً قدامة بن مظعون الصحابي البدري فجلده عمر، ولم يقتله ويجعل ذلك ردةً، وأقرت الصحابة عمر على ذلك، وكان شبهته في ذلك قوله تعالى بعد آية الخمر في المائدة: ﴿لَيْسَ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ جُنَاحٌ فِيمَا طَعِمُوا﴾ فدل على أنَّ الشبهة قد تدخل في بعض الضروريات.
'মুতাওয়াতির দু-প্রকার : ১. যা আলিমদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষজনও জানে। যেমন, তাওহিদের কালিমা এবং ইসলামের রুকনসমূহ। এগুলো কেউ অস্বীকার করলে তাকে নিঃশর্তভাবে তাকফির করা হবে। কারণ, তার কাছে কুরআন পৌঁছেছে আর সে তাওয়িল দ্বারা তা প্রত্যাখ্যান করেছে। যদি এমনও হয় যে, সে দীনের যে বিষয়টি অস্বীকার করেছে, তা যে শরিয়তের বিধান হিসেবে সাব্যস্ত, এটা সে জানতেই পারেনি। যেহেতু দীনের মধ্যে অনেক বিদআত ও সংশয় ঢুকে পড়েছে, যা মানুষকে জরুরিয়াতে দীনের মধ্যেও সন্দেহ পোষণের দিকে ঠেলে দেয়। তবে এ ক্ষেত্রে সন্দেহ থাকলেও ইলম এবং হুজ্জতের (প্রমাণের) দাবিতে তাকে তাকফির করা হবে। আল্লাহ কুরআনে বলেন, "সে-সকল লোক কাফির হয়ে গেছে যারা বলে, আল্লাহ তিনজনের মধ্যে তৃতীয়জন।” [সুরা মায়িদা : (৫) ৭৩] অথচ এটা তো জানা বিষয় যে, তারা ঈসা আ.-কে অস্বীকার করতে চায়নি; বরং তাকে সত্যায়নই করতে চেয়েছে। তাকফিরের ইল্লত (Cause) যে “বিধান পৌঁছা” এবং 'অজ্ঞতা' বিধান পৌঁছার পূর্বে ওজর হয়, তার পরে নয়, এর পক্ষে কুরআনের এই আয়াতটিও প্রমাণ বহন করে, “নবি পাঠানোর ধারা ছিল এ জন্য যে, কোনো জনপদকে সীমালঙ্ঘনের কারণে এ অবস্থায় ধ্বংস করা তোমার রবের পছন্দ নয় যে, তার অধিবাসীরা অনবহিত থাকবে।” [সুরা আনআম: (৬) ১৩১] আলোচ্য বিষয়ে এই আয়াতটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট প্রমাণ আলহামদুলিল্লাহ।
২. যেসব মুতাওয়াতির শুধু আলিমরাই জানেন। সুতরাং জনসাধারণের কেউ এ ধরনের বিষয় অস্বীকার করলে তাকে তাকফির করা হবে না। কারণ, এই বিধানের জ্ঞান তার কাছে পৌঁছায়নি। যে ব্যক্তি আবশ্যিকভাবে কোনো বিষয় হারাম হওয়া সম্পর্কে জ্ঞাত থেকেও তা হালাল মনে করবে, তাকে তাকফির করা হবে। যেমন, ঋতুমতী নারীর ওপর সালাত পড়া হারাম। সে যদি এটাকে হালাল মনে করে, তাহলে তাকে তাকফির করা হবে। সাহাবি কুদামা ইবনু মাজউন রা. তাওয়িলের ভিত্তিতে মদপানকে হালাল মনে করে তা পান করেছিলেন, তখন উমর রা. তাকে বেত্রাঘাত করেছিলেন; কিন্তু তিনি তাকে হত্যা করেননি এবং এ বিষয়টাকে রিদ্দাহ হিসেবেও বিবেচনা করেননি। উমর রা.-এর এ সিদ্ধান্তে সাহাবিগণও কোনো দ্বিমত পোষণ করেননি। এ ক্ষেত্রে সেই সাহাবির সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল মদপানের নিষিদ্ধতা-সংবলিত আয়াতের পরবর্তী আয়াত থেকে, যেখানে আল্লাহ বলেন, "যারা ইমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে, তারা যা কিছু পান করেছে, তার কারণে তাদের কোনো গুনাহ নেই।” [সুরা মায়িদা: (৫) ৯৩] এর দ্বারা বোঝা গেল, জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত কোনো বিষয়েও কখনো সংশয় দেখা দিতে পারে।'
৪. জরুরিয়াতে দীন পরিবর্তিত হয়
জরুরিয়াতে দীনের ভিত্তি হচ্ছে প্রসিদ্ধির ওপর। যে কারণে এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যা পূর্ববর্তী যুগে জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তার উদাহরণ প্রসঙ্গে প্রাচীন গ্রন্থাদিতেও এর বিবরণ উল্লেখিত হয়েছে; কিন্তু আমাদের সময়ে এসে তা জনসাধারণ জানা তো দূরের কথা, সাধারণ আলিমদের জন্যও তা উপলব্ধি করা দুরূহ হয়ে ওঠে। সুতরাং তাকফিরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে এমন অস্পষ্ট ও আপেক্ষিক বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল রাখা যুক্তিযুক্ত নয়।
৫. অনেক ফকিহের কাছে অকাট্য ও জরুরিয়াতে দীন শব্দ দুটি সমার্থক।
অনেক বিদগ্ধ ফকিহ ও আকিদা-বিশেষজ্ঞ আলিমের কাছে অকাট্য ও জরুরিয়াতে দীন শব্দ দুটি সমার্থক। সুতরাং তাদের দৃষ্টিতে উভয়টি অস্বীকার বা অপব্যাখ্যার বিধানও অভিন্ন হওয়াটাই যুক্তির দাবি। আল্লামা আবুশ শাকুর সালিমি রাহ. লেখেন,
قال أهل السنة والجماعة: شرائط الإيمان ما يجب الإيمان به ولا يصح بدونه ويكفر بالإنكار والرد، وهو كل ما ثبت بالنص أو بالمتواتر أو بإجماع الأمة، فإنه يوجب القبول والاعتقاد به.
'আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইমামগণ বলেছেন, ইমানের শর্ত হচ্ছে সেসব বিষয়, যার ওপর ইমান আনা অবশ্যক, যা ছাড়া ইমান বিশুদ্ধ হয় না এবং যা অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করলে মানুষ কাফির হয়ে যায়-তা হচ্ছে এমন সব বিষয়, যা নুসুস কিংবা মুতাওয়াতির অথবা উম্মাহর ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত। সুতরাং তা গ্রহণ করে তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা অপরিহার্য।
ইমাম কাজি ইসা ইবনু আবান রাহ. লেখেন,
وَالْعِلْمُ بِهَذِهِ الْأَشْيَاءِ عِلْمُ اضْطِرَارٍ وَإِلْزَامِ، لِمَا ذَكَرْنَا مِنْ جُمْلَةِ هَذِهِ الشَّرَائِعِ، رَدًّا عَلَى النَّبِيِّ - عَلَيْهِ السَّلَامُ - ، كَأَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ - عَلَيْهِ السَّلَامُ - يَقُولُ ذَلِكَ فَرَدَّهُ عَلَيْهِ، فَيَكُونُ بِذَلِكَ كَافِرًا، خَارِجًا عَنْ مِلَّةِ الْإِسْلَامِ، لِأَنَّ الْعِلْمَ كَانَ عِلْمُ ضَرُورِيُّ، كَالْعِلْمِ بِالْمَحْسُوسَاتِ وَالْمُشَاهَدَاتِ، وَكَالْعِلْمِ بِأَنَّهُ قَدْ كَانَ قَبْلَنَا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا قَوْمُ، وَأَنَّ الْمَوْجُودِينَ أَوْلَادُ أُولَئِكَ، وَكَالْعِلْمِ بِأَنَّ السَّمَاءَ كَانَتْ مَوْجُودَةٌ قَبْلَ وِلَادَتِنَا، وَمَا جَرَى مَجْرَى ذَلِكَ.
'মুতাওয়াতির বিষয়গুলোর ইলম হচ্ছে আবশ্যিক ও অপরিহার্য ইলম। কারণ, এ বিষয়গুলো এতটা অকাট্য ও সুনিশ্চিত যে, কেউ তা প্রত্যাখ্যান করলে সে যেন সরাসরি নবি-এর মুখ থেকে শোনা সত্ত্বেও বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করল। সুতরাং এর দ্বারা সে কাফির হয়ে যাবে। ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে। কারণ, এই ইলম ছিল আবশ্যিক ইলম। যেমন আবশ্যিক হচ্ছে ইন্দ্রিয়লব্ধ ও প্রত্যক্ষ বিষয়ের ইলম। যেমন আবশ্যিক হচ্ছে, আমাদের পূর্বে এই দুনিয়ায় অনেক সম্প্রদায় গত হয়েছে এবং এখন যারা রয়েছে, তারা সেই পূর্ববর্তীদেরই উত্তরসূরি—এই ইলম। যেমন আবশ্যিক হচ্ছে, আকাশ আমাদের জন্মের আগ থেকেই বিদ্যমান রয়েছে ইত্যাদি বিষয়ক ইলম।
শাহ আবদুল আজিজ দেহলবি রাহ. লেখেন,
التحقيق أن المراد "بأهل القبلة" في هذه القاعدة: هم الذين لا ينكرون ضروريات الدين، لا من يوجه وجهه إلى القبلة في الصلاة. قال الله تعالى: ﴿وَلَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ إلخ فمن أنكر ضروريات الدين لم يبق من أهل القبلة، لأن ضروريات الدين عندهم منحصرة في ثلاثة
১. مدلول الكتاب بشرط أن يكون نصا ثريحا لا بمكن تأويله، كتحريم الخمر والميسر وإثبات العلم والقدرة والإرادة والكلام له تعالى وكون السابقين الأولين من المهاجرين والأنصار مرضيين عند الله تعالى وأنه لا يجوز إهانتهم والاستخفاف بهم.
২. مدلول السنة المتواترة لفظا أو معنى، سواء كان من الاعتقاديات أو من العمليات، وسواء كان فرضا أو نفلا، كوجوب محبة أهل البيت من الأزواج والبنات والجمعة والعيدين.
৩. والمجمع عليه إجماعا قطعيا، كخلافة الصديق والفاروق ونحو ذلك، ولا شبهة أن من أنكر أمثال هذه الأمور لم يصح إيمانه بالكتاب والنبيين، إذ في تخطئة الإجماع تضليل لجميع الأمة، فيكون إنكاراً لقول تعالى: ﴿كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ وقوله تعالى: ﴿وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ ولقوله تعالى : "لا تجتمع أمتي على الضلالة"، وهو متواتر معنوي، فلا يكون منكر هذه الأمور من أهل القبلة.
'তাহকিক হলো, “আহলে কিবলাকে তাকফির করা হবে না” মর্মে যে মূলনীতি প্রসিদ্ধ রয়েছে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য এমন সব ব্যক্তি, যারা জরুরিয়াতে দীন অস্বীকার করে না। উদ্দেশ্য এটা নয় যে, তারা সালাতে কিবলার দিকে অভিমুখী হয়। আল্লাহ বলেন, “পুণ্য তো কেবল তা নয় যে, তোমরা নিজেদের চেহারা পূর্ব বা পশ্চিম দিকে ফেরাবে; বরং পুণ্য হচ্ছে মানুষ ইমান আনবে আল্লাহর প্রতি, শেষ দিবসের প্রতি এবং...।” [সুরা বাকারা: (২) ১৭৭] সুতরাং যে ব্যক্তি জরুরিয়াতে দীন অস্বীকার করবে, সে আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। কারণ, আলিমগণের কাছে জরুরিয়াতে দীন তিন বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ :
১. কুরআন দ্বারা প্রমাণিত বিধান। তবে শর্ত হলো, তা সুস্পষ্ট নস হতে হবে, যাতে তাওয়িলের কোনো সম্ভাবনা থাকবে না। যেমন: মদ ও জুয়া হারাম হওয়া, আল্লাহর জন্য ইলম (জ্ঞান), কুদরত (ক্ষমতা-কর্তৃত্ব), ইরাদা (ইচ্ছা) ও কালাম (কথা)-এর গুণ সাব্যস্ত হওয়া, মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের মধ্যে প্রথমসারির মুমিনরা আল্লাহর কাছে সন্তোষভাজন হওয়া এবং তাঁদের অবমাননা বা অবজ্ঞা অবৈধ হওয়া।
২. মুতাওয়াতির সুন্নাহ দ্বারা শব্দগত বা অর্থগতভাবে প্রমাণিত বিধান—তা আকিদা বিষয়ক হোক কিংবা আমল বিষয়ক। তা ফরজ হোক কিংবা নফল। যেমন : আহলে বাইত তথা রাসুলের স্ত্রী ও কন্যাদের ভালোবাসা এবং জুমুআ ও দুই ইদের আবশ্যকতা।
৩. অকাট্য ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত বিধান। যেমন: আবু বকর ও উমর রা.-এর খিলাফত প্রভৃতি।
যারা এ জাতীয় বিষয় অস্বীকার করবে, আসমানি কিতাব ও নবিগণের ওপর তার ইমান বিশুদ্ধ বলে বিবেচিত হবে না। কারণ, ইজমাকে ভুল আখ্যায়িত করার অর্থ হচ্ছে গোটা উম্মাহকে বিভ্রান্ত বলা। এর দ্বারা প্রকারান্তরে আল্লাহর এই আয়াতের অস্বীকার হয়-“তোমরা সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাহ, যাদের বের করা হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য।” এবং এই আয়াত- “যে ব্যক্তি তার সামনে হিদায়াত স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করবে ও মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য কোনো পথ অনুসরণ করবে...।” এ ছাড়া রাসুলের এই হাদিস- “আমার উম্মাহ গোমরাহির ওপর ঐক্যবদ্ধ হবে না”- এই হাদিসটি অর্থগতভাবে মুতাওয়াতির। সুতরাং যে ব্যক্তি জরুরিয়াতে দীন অস্বীকার করবে, সে আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত নয়।’
আল্লামা কাশমিরি রাহ.-ও তাঁর কালজয়ী ইকফারুল মুলহিদিন গ্রন্থে শাহ আবদুল আজিজ দেহলবি রাহ.-এর উপরিউক্ত উদ্ধৃতিটি উল্লেখ করে এর সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, জরুরিয়াতে দীনের অর্থ হচ্ছে, বিষয়গুলো শরিয়ত-প্রণেতার পক্ষ থেকে দ্ব্যর্থহীনভাবে সাব্যস্ত এবং সবার কাছে সুপ্রসিদ্ধ। যে ব্যক্তি শরিয়তের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবে, তার কাছে এ বিষয়গুলো সুস্পষ্ট ও সুপ্রকাশিত। বলা বাহুল্য, যে বিধানগুলো অকাট্যভাবে প্রমাণিত, যার অর্থ ও মর্ম সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন এবং তাতে ভিন্ন কোনো সম্ভাবনাও গোপন নেই, এমন বিষয়গুলোর অবস্থাও অনুরূপ। আল্লামা ইউসুফ বানুরি রাহ. লেখেন,
‘যে বিষয় মুতাওয়াতির হয়ে যায়, তা জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, মুতাওয়াতির দ্বারা এমন ইলম অর্জিত হয়, যা আবশ্যক, অকাট্য ও স্বীকৃত। সুতরাং কারও যদি এটা জানা থাকে যে, হাদিসটি মুতাওয়াতির অথবা এই বিষয়টি মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত, তাহলে এর ওপর ইমান আনা আবশ্যক। তার সম্পর্ক অতীতের কোনো বিষয়ের সঙ্গে হোক কিংবা ভবিষ্যতের অদৃশ্য কোনো বিষয়ের সঙ্গে। তার সম্পর্ক হোক আকিদার সঙ্গে কিংবা বিধিবিধানের সঙ্গে। রিসালাতের সত্যায়নের জন্য এ ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। অন্যথায় রিসালাত অস্বীকার যে কুফর, তা আলাদা দলিল দ্বারা প্রমাণ করে দেখানোর প্রয়োজন নেই। সর্বাবস্থায় ইমানের জন্য রাসুলকে সত্যায়ন করা আবশ্যক হওয়া এবং তাঁকে অস্বীকার দ্বারা কুফর অপরিহার্য হওয়াও জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত বিষয়。
তবে শরিয়তে অকাট্য বিধানের সংখ্যা যেহেতু অনেক বেশি, তাই জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন যেকোনো অকাট্য বিধান অস্বীকার করতে দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে তাকফির না করে এ ক্ষেত্রে একটি করণীয় রয়েছে। ইমাম ইবনুল হুমাম ও ইমাম আবুল মাআলি কামালুদ্দিন মাকদিসি রাহ. লেখেন,
(ويجب حمله) أي حمل الإكفار الذي هو ظاهر كلامهم (على ما إذا علم المنكر ثبوته قطعا لا على ما يعم علم المنكر ثبوته قطعا وجهله بذلك لأن مناط التكفير وهو التكذيب أو الاستخفاف بالدين عند ذلك يكون) أي إنما يكون عند العلم بثبوت ذلك الأمر قطعا (أما إذا لم يعلم) ثبوت ذلك الأمر الذي أنكره قطعا (فلا) يكفر إذ لم يتحقق منه تكذيب ولا إنكار اللهم (إلا أن يذكر له أهل العلم ذلك) أي أن ذلك الأمر من الدين قطعا (فيلج) بفتح اللام والجيم أي يتمادى فيما هو فيه عنادا فيحكم في هذه الحالة بكفره لظهور التكذيب.
'তাকফির সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যখন অস্বীকারকারী জানবে যে, তা অকাট্যভাবে সাব্যস্ত। যে ক্ষেত্রে তার অজ্ঞতা থাকবে, সে জানবে না যে, বিধানটি শরিয়তে অকাট্যভাবে সাব্যস্ত, সে ক্ষেত্রে এই তাকফির প্রযোজ্য হবে না। কারণ, তাকফিরের ভিত্তি হচ্ছে অস্বীকার ও দীনকে অবজ্ঞা করা। আর এটা তখন হয়, যখন সেই বিধান যে অকাট্যভাবে শরিয়তের অন্তর্ভুক্ত, এটা তার জানা থাকে। আর যদি জানা না থাকে, তাহলে তাকে তাকফির করা হবে না; যেহেতু (অজ্ঞ হওয়ায়) তার থেকে অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান (হিসেবে) সাব্যস্ত হয়নি। তবে আলিমগণ তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পরও সে যদি তার অবস্থার ওপর একগুঁয়েমিবশত অনড় থাকে, তাহলে তাকে তাকফির করা হবে। কারণ, এ ক্ষেত্রে তার থেকে অস্বীকার প্রকাশ পেয়েছে।
ইমাম ইবনু হাজার হাইতামি রাহ.-ও হানাফিদের এই অবস্থানের কথা তাঁর আলোচনায় তুলে ধরেছেন। তিনি লেখেন,
وَلا يَكْفُرُ بِإِنْكَارِ قَطْعِيٍّ غَيْرِ ضَرُورِيٍّ كَاسْتِحْقَاقِ بِنْتِ الابْنِ السُّدُسَ مَعَ بِنْتِ الصُّلْبِ، وَظَاهِرُ كَلَامِ الْحَنَفِيَّة كُفْرُه وَيَجِبُ حَمْلُه أي بناء على قواعدهم على منكر عَلِم أَنه قَطْعِي وَإِلَّا فَلَا يكفر إِلَّا إذا ذكر لَهُ أهل العلم أنه من الدين، وَأَنه قَطْعِي، فتتمادى فِيمَا هُوَ عَلَيْهِ عناداً فيكفر لظهور التكذيب مِنْهُ حِينَئِذٍ كَمَا دَلَّ عَلَيْهِ كَلَام إِمَامِ الْحَرَمَيْنِ.
'যে বিষয়টি অকাট্য তবে জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, তা অস্বীকারের কারণে কাফির হবে না। (যেমন, নিজের মেয়ে থাকলে পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে ছেলের ঘরের নাতনি এক-ষষ্ঠমাংশ পাবে।) হানাফি ফকিহদের মতামতের বাহ্যিক দাবি হলো, সে কাফির হয়ে যাবে। তবে এই তাকফির সেই অস্বীকারকারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যে তা অকাট্য বিধান হিসেবে জানে। অন্যথায় সে কাফির হবে না। তবে আলিমগণ যদি তাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, তা অকাট্য এবং দীনের অন্তর্ভুক্ত। এরপরও সে বিদ্বেষবশত তার অস্বীকারের ওপর অটল থাকে, তাহলে তাকে তাকফির করা হবে। কারণ, এ ক্ষেত্রে তার থেকে অস্বীকারের বিষয়টি স্পষ্ট। যেমনটা ইমামুল হারামাইন রাহ. বলেছেন।'
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমিরি রাহ. লেখেন,
إن إنكار القطعي كفر، ولا يشترط أن يعلم ذلك المنكر قطعيته ثم ينكر فيكون بذلك كافرا، على ما يتوهمه الخائلون، بل يشترط قطعيته في الواقع، فإذا جحد شخص ذلك القطعي استتيب، فإن تاب وإلا قتل على الكفر، وليس وراء الاستتابة مذهب. كما قال القائل: وليس وراء الله للمرء مذهب.
“অকাট্য বিধান অস্বীকার করা কুফর। এটা শর্ত নয় যে, অস্বীকারকারী পূর্ব থেকেই তা অকাট্য হওয়ার ব্যাপারে জানবে এবং সে জেনেবুঝে তা অস্বীকার করবে। ফলে এর দ্বারা সে কাফির হবে। কল্পনাবিলাসীরা এমনটাই ধারণা করে থাকে; বরং শর্ত হলো, বিষয়টি বাস্তবে অকাট্য হতে হবে। যখন কেউ এমন অকাট্য বিধান অস্বীকার করবে, তখন তাকে তাওবা করতে বলা হবে। যদি সে তাওবা করে, তাহলে তা গৃহীত হবে। অন্যথায় তাকে কুফরের অপরাধে হত্যা করা হবে। এ ক্ষেত্রে তাওবা করতে বলা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। যেমন: কবি বলেন, “মানুষের জন্য আল্লাহ ছাড়া আর কোনো পথ নেই।”
শায়খ জাহিদ কাউসারি রাহ.-ও কিরাআত নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে কিরাআতকে দু-ভাগে ভাগ করেন :
১. এমন কিরাআত, যা মুতাওয়াতির হওয়ার পাশাপাশি অধিকাংশ মুসলিমের কাছে সুস্পষ্টভাবে জ্ঞাত।
২. এমন কিরাআত, যা বর্ণনাগতভাবে মুতাওয়াতির হলেও সর্বজনবিদিত নয়।
এরপর তিনি উভয় প্রকারের হুকুম লেখেন,
فإنكار شيئ من القسم الأول كفر بالاتفاق، وأما الثاني فإنما يعد كفرا بعد إقامة الحجة على المنكر وتعنته بعد ذلك.
'প্রথম প্রকারকে অস্বীকার করা সর্বসম্মতভাবে কুফর। আর দ্বিতীয় প্রকার তখন কুফর হবে, যখন অস্বীকারকারীর ওপর দলিল কায়েম করা হবে (যে, এটি মুতাওয়াতির কিরাআত) এবং এরপরও সে একগুঁয়েমির ওপর অটল থাকবে।'
সুতরাং বোঝা গেল, জরুরিয়াতে দীন অস্বীকার করলে যেভাবে কাফির হয়, অকাট্য মুতাওয়াতির বিধান অস্বীকার করলেও সেভাবে কাফির হয়। তবে দ্বিতীয় প্রকারের ক্ষেত্রে শর্ত হলো, তাকফির করার পূর্বে দলিল কায়েম করে নিতে হবে। অর্থাৎ, অস্বীকারকারীর সামনে মূল বিষয়টি তুলে ধরা হবে। এরপর সব জেনেবুঝেও যদি সে অস্বীকারের ওপর অনড় থাকে, তাহলে তাকে নির্দ্বিধায় তাকফির করা হবে।
আর জরুরিয়াতে দীনের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে দলিল কায়েমের কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, ব্যাপক প্রসিদ্ধির কারণে তা সর্বজনবিদিত। সুতরাং এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অজ্ঞতা ওজর নয়।
৬. ফকিহগণের স্পষ্ট বর্ণনা
অনেক ফকিহের আলোচনায় উঠে এসেছে, যেকোনো মুতাওয়াতির ও অকাট্য বিষয়ের অস্বীকার কুফর। বিষয়টিকে তাঁরা জরুরিয়াতে দীনের সঙ্গে সীমাবদ্ধ করেননি। ফকিহগণের বক্তব্যের প্রতিটি শব্দ ও বাক্য সুচিন্তিত হয়ে থাকে। তাই তাদের ব্যাপক কথাকে ব্যাপকতার ওপর প্রয়োগ না করে সীমাবদ্ধ করে ফেলা যুক্তিযুক্ত নয়। আল্লামা বদরুর রাশিদ রাহ. লেখেন,
في المحيط: من أنكر الأخبار المتواترة في الشريعة كفر، مثل حرمة لبس الحرير على الرجال.
'যে ব্যক্তি শরিয়তের মুতাওয়াতির বর্ণনাসমূহ অস্বীকার করবে, সে কাফির হয়ে যাবে। যেমন, পুরুষের জন্য রেশমি পোশাক নিষিদ্ধ হওয়ার বর্ণনা।’
ফাতাওয়া হিন্দিয়া গ্রন্থে এসেছে,
وَمَنْ أَنْكَرَ الْمُتَوَاتِرَ فَقَدْ كَفَرَ، وَمَنْ أَنْكَرَ الْمَشْهُورَ يَكْفُرُ عِنْدَ الْبَعْضِ، وَقَالَ عِيسَى بْنُ أَبَانَ: يُضَلَّلُ وَلَا يُكَفِّرُ ، وَهُوَ الصَّحِيحُ وَمَنْ أَنْكَرَ خَبَرَ الْوَاحِدِ لَا يَكْفُرُ غَيْرَ أَنَّهُ يَأْثَمُ بِتَرْكِ الْقَبُولِ هَكَذَا فِي الظَّهِيرِيَّةِ.
'যে ব্যক্তি মুতাওয়াতির অস্বীকার করবে, সে কাফির হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি মাশহুর অস্বীকার করবে, কারও কারও মতে সে-ও কাফির হবে। ইসা ইবনু আবান রাহ. বলেন, তাকে গোমরাহ বলা হবে; তাকফির করা হবে না। এটিই সহিহ মত। আর যে ব্যক্তি খবরে ওয়াহিদ অস্বীকার করবে, সে কাফির হবে না; তবে গ্রহণ না করার কারণে গুনাহগার হবে।
কাজি ইয়াজ রাহ. লেখেন,
وَكَذَلِكَ نَقْطَع بتكفير كل من كذب وأنكر قاعِدَة من قَوَاعِدَ الشَّرْعِ وَمَا عُرِف يَقِينًا بالنقل المتواتر من فِعْل الرَّسُول وَوَقَع الإجماع الْمُتَّصِل عَلَيْهِ كمن أَنْكَرَ وُجُوبِ الصلوات الخمس وعدد ركعاتها وسَجَداتِها وَيَقُول إِنَّمَا أَوْجَب اللهُ عَلَيْنَا فِي كِتابِه الصَّلَاةِ عَلَى الْجُمْلَةِ وَكَوْنُها خَمْسًا وَعَلَى هَذِهِ الصفات والشروط لَا أَعْلَمُه.
'আমরা প্রত্যেক এমন ব্যক্তিকে অকাট্যভাবে তাকফির করি, যে শরিয়তের মূলনীতিসমূহের মধ্য থেকে কোনো একটি মূলনীতি; অথবা রাসুল থেকে তাওয়াতুরের সঙ্গে বর্ণিত সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত কোনো কাজ অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করে। যেমন: কেউ পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের আবশ্যকতা এবং তার রাকাআত ও সিজদাসংখ্যা অস্বীকার করে বলল, আল্লাহ তাঁর কিতাবে আমাদের ওপর শুধু সালাত ফরজ করেছেন; কিন্তু সেই সালাত যে পাঁচ ওয়াক্ত হতে হবে এবং এসব গুণ ও শর্তবিশিষ্ট হতে হবে, এমন কিছু আমি জানি না (তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে)।
ইমাম ইবনু দাকিক আল-ইদ রাহ. লেখেন,
وَالْحَقُّ أَنَّهُ لَا يَكْفُرُ أَحَدٌ مِنْ أَهْلِ الْقِبْلَةِ، إِلَّا بِإِنْكَارِ مُتَوَاتِرٍ مِنْ الشَّرِيعَةِ عَنْ صَاحِبِهَا، فَإِنَّهُ حِينَئِذٍ يَكُونُ مُكَذِّبًا لِلشَّرْعِ، وَلَيْسَ مُخَالَفَةُ الْقَوَاطِعِ مَأْخَذًا لِلتَّكْفِيرِ وَإِنَّمَا مَأْخَذُهُ مُخَالَفَةُ الْقَوَاعِدِ السَّمْعِيَّةِ الْقَطْعِيَّةِ طَرِيقًا وَدَلَالَةً.
'হক কথা হলো, কোনো আহলে কিবলাকে তাকফির করা হবে না। তবে সে যদি শরিয়তের এমন কোনো বিধান অস্বীকার করে, যা শরিয়ত-প্রণেতা থেকে মুতাওয়াতিরভাবে প্রমাণিত, তাহলে তাকে তাকফির করা হবে। কারণ, তখন সে শরিয়া-অস্বীকারকারী সাব্যস্ত হবে। সব অকাট্য বিষয়ের বিরোধিতা তাকফিরের সূত্র হয় না; বরং তাকফিরের সূত্র হয় কুরআন-হাদিসের সেসব মূলনীতির বিরোধিতা, যা সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে অকাট্য এবং অর্থ প্রকাশ করার ক্ষেত্রেও অকাট্য (সুস্পষ্ট দ্ব্যর্থহীন)।’
ইমাম আবদুল ওয়াহহাব ইবনু আহমাদ শারানি রাহ. লেখেন,
الكفر هو التكذيب، لأنه مخالفة نص مقطوع به أو مخالفة الإجماع، وفيهما جميعا تكذيب الرسول.
'কুফর মানে অস্বীকার করা। কারণ, তা হচ্ছে অকাট্য কোনো নসের বিরোধিতা কিংবা ইজমার বিরোধিতা। আর উভয় ক্ষেত্রেই রাসুল-কে অস্বীকার করা হয়।'
ইমাম ইবনু হাজম জাহিরي রাহ. লেখেন,
من قال بنبي بعد النبي عليه الصلاة والسلام أو جحد شيئا صح عنده بأن النبي ﷺ قاله فهو كافر.
'যে ব্যক্তি বলবে, রাসুলের পরে আর কোনো নবি আসতে পারে কিংবা সে রাসুলের এমন কোনো বাণী অস্বীকার করবে, যা তার কাছে সঠিকভাবে সাব্যস্ত, তাহলে সে কাফির।
টিকাঃ
২৪৬ আল-মুসতাসফা: ৩৪৮।
২৪৭ আল-বাহরুর রায়িক: ১/৩৬৪।
২৪৮ রাওজাতুত তালিবিন: ২/১৪৬।
২৪৯ আল-মুসায়ারা: ৩০০।
২৫০ ইকফারুল মুলহিদিন: ৭।
২৫১ আল-মানসুর ফিল কাওয়ায়িদিল ফিকহিয়া: ৩/৯১।
২৫২ আল-ফাতাওয়াল হাদিসিয়া: ২৬৭।
২৫৩ আল-মুসামারা মাআল মুসায়ারা: ২৯৯।
২৫০ আল-মুসতাসফা: ৩৪৮।
২৫৪ জরুরিয়াতে দীন পরিবর্তিত হয়
জরুরিয়াতে দীনের ভিত্তি হচ্ছে প্রসিদ্ধির ওপর। যে কারণে এমন অনেক বিষয়
২০০ গামজু উয়ুনিল বাসায়ির: ২/২০৭।
২৬৬ আলফাজুল কুফর মাআ শারহিল ইমাম মোল্লা আলি কারي: ১১৮।
২৬৭ আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়া: ২/২৬৫।
২৬৮ আশ-শিফা বি তারিফি হুকুকিল মুসতাফা: ২/২৮৭।
*২*৯ ইহকামুল আহকাম শরহু উমদাতিল আহকাম: ২/২১০।
২০ আল-ইয়াকিতু ওয়াল জাওয়াহির ফি বায়ানি আকায়িদিল আকাবির: ২/১১০।
২৭১ আল-ফিসাল ফিল মিলাল: ৩/১৪২।
📄 জরুরিয়াতে দীনের প্রকার
ইমাম তাকিউদ্দিন সুবকি রাহ. লেখেন,
لَكِنِّي أُنَبِّهُ هُنَا عَلَى شَيْءٍ وَهُوَ أَنَّ الْمَعْلُومَ بِالضَّرُورَةِ مِنْ الشَّرْعِ قِسْمَانِ: أَحَدُهُمَا يَعْرِفُهُ الْخَاصُّ وَالْعَامُ، وَالثَّانِي: قَدْ يَخْفَى عَلَى بَعْضِ الْعَوَامِّ، وَلَا يُنَافِي هَذَا قَوْلُنَا: إِنَّهُ مَعْلُومُ بِالضَّرُورَةِ؛ لِأَنَّ الْمُرَادَ أَنَّ مَنْ مَارَسَ الشَّرِيعَةَ وَعَلِمَ مِنْهَا مَا يَحْصُلُ بِهِ الْعِلْمُ الضَّرُورِيُّ بِذَلِكَ وَهَذَا قَدْ يَحْصُلُ لِبَعْضِ النَّاسِ دُونَ بَعْضٍ بِحَسَبِ الْمُمَارَسَةِ وَكَثْرَتِهَا أَوْ قِلَّتِهَا أَوْ عَدَمِهَا فَالْقِسْمُ الْأَوَّلُ مَنْ أَنْكَرَهُ الْعَوَامُّ أَوْ الْخَوَاصُّ فَقَدْ كَفَرَ؛ لِأَنَّهُ مُكَذِّبُ لِلنَّبِيِّ ﷺ فِي خَبَرِهِ.
وَمِنْ هَذَا الْقِسْمِ إِنْكَارُ وُجُوبِ الصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ وَالصَّوْمِ وَالْحَجِّ وَنَحْوِهَا وَتَخْصِيصُ رِسَالَتِهِ بِبَعْضِ الْإِنْسِ. فَمَنْ قَالَ ذَلِكَ فَلَا شَكٍّ فِي كُفْرِهِ وَإِنْ اعْتَرَفَ بِأَنَّهُ رَسُولُ إِلَيْهِ لِأَنَّ عُمُومَ رِسَالَتِهِ إِلَى جَمِيعِ الْإِنْسِ مِمَّا يَعْلَمُهُ الْخَوَاصُّ وَالْعَوَامُّ بِالضَّرُورَةِ مِنْ الدِّينِ، وَالْقِسْمُ الثَّانِي مَنْ أَنْكَرَهُ مِنْ الْعَوَامِّ الَّذِينَ لَمْ يَحْصُلْ لَهُمْ مِنْ مُمَارَسَتِهِ الشَّرْعَ مِمَّا يَحْصُلُ لَهُ بِهِ الْعِلْمُ الضَّرُورِيُّ وَإِنْ كَانَتْ كَثْرَةُ الْمُمَارَسَةِ أَوْجَبَتْ لِلْعُلَمَاءِ الْعِلْمَ الضَّرُورِيَّ بِذَلِكَ، وَمِنْ هَذَا الْقِسْمِ عُمُومُ رِسَالَتِهِ ﷺ إِلَى الْجِنِّ فَإِنَّا نَعْلَمُ بِالضَّرُورَةِ ذَلِكَ لِكَثْرَةِ مُمَارَسَتِنَا لِأَدِلَّةِ الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ وَأَخْبَارِ الْأُمَّةِ.
وَأَمَّا الْعَامِّيُّ الَّذِي لَمْ يَحْصُلْ لَهُ ذَلِكَ إِذَا أَنْكَرَ ذَلِكَ فَإِنْ قَيَّدَ الشَّهَادَةَ بِالرِّسَالَةِ إِلَى الْإِنْسِ خَاصَّةٌ خَشِيت عَلَيْهِ الْكُفْرَ كَمَا قَدَّمْته فِي أَوَّلِ هَذِهِ الْفَتْوَى، وَإِنْ أَطْلَقَ الشَّهَادَةَ بِأَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ وَلَمْ يَنْتَبِهُ؛ لِأَنَّ إِنْكَارَهُ لِعُمُومِ الدَّعْوَى لِلْجِنِّ يُخَالِفُ ذَلِكَ فَلَا أَرَى الْحُكْمَ بِكُفْرِهِ وَلَكِنْ يُؤَدِّبُ عَلَى كَلَامِهِ فِي الدِّيْنِ بِالْجَهْلِ وَيُؤْمَرُ بِأَنْ يَتَعَلَّمَ الْحَقَّ فِي ذَلِكَ لِتَزُولَ عَنْهُ الشَّبْهَةُ الَّتِي أَوْجَبَتْ الْإِنْكَارَ.
‘একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শরিয়তে জরুরিয়াতে দীনসমূহ দু-প্রকার : (ক) যা আলিম ও সাধারণ মানুষ সবাই জানে। (খ) যা কিছুসংখ্যক সাধারণ মানুষের কাছে অস্পষ্ট থাকে। আমরা এটাকে যে জরুরিয়াতে দীন বলছি, এর সঙ্গে এ বিষয়টি সাংঘর্ষিক নয়। কারণ, জরুরিয়াতে দীন সর্বজনবিদিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, যারা শরিয়তের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে এবং শরিয়তের এতটুকু ইলম হাসিল করে, যা দ্বারা জরুরিয়াতে দীনের জ্ঞান অর্জিত হয়, বিষয়গুলো তাদের কাছে সুবিদিত।
এটা কিছু মানুষের অর্জিত হবে আর কিছু মানুষের হবে না। শরিয়তের সঙ্গে সম্পর্কের আধিক্য, স্বল্পতা বা মোটেও সম্পর্ক না থাকার ভিত্তিতে এর তারতম্য হবে। প্রথম প্রকারকে যে আলিম বা সাধারণ মানুষ অস্বীকার করবে, সে কাফির হয়ে যাবে। কারণ, সে রাসুল -কে তাঁর সংবাদের ক্ষেত্রে অস্বীকার করেছে।
এই প্রকারের উদাহরণ হলো, সালাত, জাকাত, সিয়াম ও হজ ইত্যাদির আবশ্যকতা অস্বীকার করা এবং রাসুলের রিসালাতকে কিছু মানুষের সঙ্গে সীমাবদ্ধ বলে অভিহিত করা। যে ব্যক্তি এরূপ কথা বলবে, তার কুফরের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এমনকি সে যদি এ কথাও স্বীকার করে যে, রাসুল তার কাছে রাসুল, তবু সে কাফির। কারণ, তিনি ব্যাপকভাবে সকল মানুষের কাছে প্রেরিত হওয়ার বিষয়টি জরুরিয়াতে দীন, যা আলিম ও সাধারণ জনতা সবাই জানে।
দ্বিতীয় প্রকার হলো, কোনো সাধারণ মানুষ যদি তা অস্বীকার করে, শরিয়তের সঙ্গে যার এতটুকু সম্পর্ক নেই, যা দ্বারা জরুরিয়াতে দীনের জ্ঞান অর্জন হয়। যদিও শরিয়তের সঙ্গে অধিক সম্পর্ক আলিমদের জন্য এসব ব্যাপারে আবশ্যিক জ্ঞান অপরিহার্য করে। এ প্রকারের উদাহরণ হলো, জিনদের উদ্দেশে রাসুলের রিসালাতের ব্যাপকতা। কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমার দলিলসমূহের সঙ্গে আমাদের অধিক সম্পর্ক থাকার সুবাদে আমরা আবশ্যিকভাবে বিষয়টি জানি; কিন্তু যে-সকল সাধারণ মানুষের এই জ্ঞান অর্জিত হয়নি, সে যদি বিষয়টি অস্বীকার করে আর রাসুলের রিসালাত শুধু মানবজাতির জন্য সীমাবদ্ধ বলে কালিমার সাক্ষ্য দেয়, তাহলে আমি তার ওপর কুফরের আশঙ্কা করি, যেমনটা এই ফাতওয়ার শুরুতে বলে এসেছি। আর সে যদি শুধু এই সাক্ষ্য দেয় যে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ আর এই সাক্ষ্যকে সীমাবদ্ধ করে ফেলার দিকে মনোযোগ না দেয়, তাহলে আমি তার ওপর কুফরের ফাতওয়া আরোপ করা সংগত মনে করি না। কারণ, কালিমার সাক্ষ্যকে ব্যাপক রাখলে জিনদের জন্য রাসুলের দাওয়াতের ব্যাপকতা অস্বীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়। তবে এ ক্ষেত্রে তাকে তাকফির না করা হলেও দীনের ব্যাপারে এই অজ্ঞতাপ্রসূত মন্তব্যের কারণে আদব শিখিয়ে দেওয়া হবে এবং তাকে আদেশ করা হবে, সে যেন এ ব্যাপারে হক বিষয়টি জেনে নেয়, যাতে তার সংশয় দূর হয়, যা (এ ব্যাপারে তার) অস্বীকার অপরিহার্য করেছিল।
টিকাঃ
২৭২ যেমন: সে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ একমাত্র মানবজাতির নবি।
১৯৭ ফাতাওয়াস সুবকি: ২/৬২১; আল-ফাতাওয়াল হাদিসিয়া: ২৬৯।
📄 উসুলুল ফিকহের বিশ্লেষণ
হানাফি মাজহাবের উসুলুল ফিকহের গ্রন্থসমূহ যারা পড়েছেন, তাদের অজানা নয় যে, হানাফি ফকিহগণ ফরজ ও ওয়াজিব পরিভাষার মধ্যে পার্থক্য করে থাকেন। যেসব বিধান এমন নুসুস দ্বারা সাব্যস্ত, যা প্রামাণিকতার বিচারে অকাট্য এবং অর্থ প্রকাশেও অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন, সেগুলোকে তারা ফরজ বলে থাকেন। পক্ষান্তরে প্রামাণিকতা বা অর্থ প্রকাশ-কোনো একটির ক্ষেত্রে যদি অকাট্যতা না থাকে, তবে অপরটি অকাট্য হয়, তাহলে ফকিহগণ সেটাকে ওয়াজিব বলেন। ফরজ বিধান আকিদা ও আমল উভয়টি অপরিহার্য করে। সুতরাং কেউ যদি তা অস্বীকার করে, তাহলে সে কাফির হয়ে যায়। অপরদিকে ওয়াজিব বিধান আমল অপরিহার্য করলেও আকিদা অপরিহার্য করে না। তাই কেউ তা অস্বীকার করলে ফাসিক ও গোমরাহ হলেও কাফির হয় না। ১৯৭৪ এর দ্বারা বোঝা গেল, উসুলুল ফিকহ শাস্ত্রবিদগণ তাকফিরের ভিত্তি রেখেছেন অকাট্য বিধান অস্বীকারের ওপর; এটাকে তারা জরুরিয়াতে দীন অস্বীকারের সঙ্গে সীমাবদ্ধ করেননি।
একইভাবে মুতাওয়াতির ও মাশহুর সুন্নাহ এবং ইজমা প্রসঙ্গেও তারা তাকফিরের আলোচনা করে থাকেন। সেখানেও তাকফিরের মূল কারণ হিসেবে অকাট্য বিধান অস্বীকারের কথা বলেন। যেহেতু ইজমা ও মুতাওয়াতির উভয়টিই অকাট্য ইলম অপরিহার্য করে আর মাশহুরকেও অনেকে মুতাওয়াতিরের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করে থাকেন, তাই এগুলো অস্বীকারের কারণে তারা তাকফিরের ফাতওয়া আরোপ করেন。
টিকাঃ
১৯৭৪ দ্রষ্টব্য-উসুলুস সারাখসি : ১/১১০; উসুলুল বাজদাওয়ি মাআ কাশফিল আসরার: ২/৩০৩।
১৯৯০ দ্রষ্টব্য-নুরুল আনওয়ার: ৬২৯, ৫০৩; উসুলুশ শাশি : ২৭২।