📄 কাফিরের পার্থিব বিধান
পার্থিব বিবেচনায়ও মুসলিম ও কাফিরদের বিধানের মধ্যে বিস্তর তফাত রয়েছে। সহজে বোঝার জন্য এ বিষয়ক আলোচনাকে আমরা পাঁচটি শিরোনামে ভাগ করে নিতে পারি: (ক) কুফরের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, (খ) ইবাদতের বিবেচনায় মুসলিম ও কাফিরের পার্থক্য, (গ) আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে মুসলিম ও কাফিরের পার্থক্য, (ঘ) বিয়েশাদি এবং সামাজিক রীতি-বিবেচনায় মুসলিম ও কাফিরের পার্থক্য, (ঙ) অধিকার ও মালিকানার বিষয়ে মুসলিম ও কাফিরের পার্থক্য।
১. কুফরের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
১. প্রত্যেক মুসলিমের ওপর এই আকিদা ও বিশ্বাস রাখা অপরিহার্য যে, ইসলাম ছাড়া অন্য সব ধর্ম, মতবাদ ও জীবনব্যবস্থা বাতিল। ইসলাম পূর্বের সব শরিয়তকে রহিত করে দিয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত মুহাম্মাদ ﷺ -এর শরিয়তই সবার জন্য অবধারিত করে দেওয়া হয়েছে। কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে একমাত্র ইসলামই দীন হিসেবে গৃহীত হবে। আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ ۚ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَسِرِينَ
যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন অবলম্বনের আকাঙ্ক্ষা করবে, তার থেকে সে দীন কবুল করা হবে না এবং সে আখিরাতে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। [সুরা আলে ইমরান (৩) : ৮৫]
২. কুফর ও কুফফারের সঙ্গে সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করা অপরিহার্য। একজন মুসলমানের জন্য কুফরের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা বা কুফরকে সন্তুষ্টির চোখে দেখা স্বতন্ত্র কুফর। সুতরাং যারা কুফরি সংবিধানের আনুগত্য করে এ কথা বলে যে, সব ধর্ম সমমর্যাদার, তারা নিঃসন্দেহে কাফির। কাফিরদের সঙ্গে তাদের ধর্মের কারণে ভালোবাসা ও হৃদ্যতার সম্পর্ক রাখার মানসিকতা জঘন্য অপরাধ। আল্লাহ কুরআনে বলেন,
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةً فِي إِبْرَاهِيمَ وَ الَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَءُوا مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ
তোমাদের জন্য ইবরাহিম ও তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে, যখন সে নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের বলেছিল, তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাসনা করছ, তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের (আকিদা-বিশ্বাস, মতবাদ-মতাদর্শ, আইনকানুন সব) অস্বীকার করলাম। আমাদের ও তোমাদের মধ্যে চিরকালের জন্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রকাশ হয়ে গেছে, যতক্ষণ-না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ইমান আনবে। [সুরা মুমতাহিনা (৬০) : ৪]
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيْرَتَهُمْ أُولَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيْمَانَ وَأَيَّدَهُمْ بِرُوحٍ مِنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُولَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبُ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
যারা আল্লাহ ও আখিরাত-দিবসে ইমান রাখে, তাদের তুমি এমন পাবে না যে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখছে—হোক না তারা তাদের বাবা, পুত্র, ভাই কিংবা তাদের স্বগোত্রীয়। তারাই এমন, আল্লাহ যাদের অন্তরে ইমান খোদাই করে দিয়েছেন এবং নিজ রুহ দ্বারা তাদের সাহায্য করেছেন। ২১১ তিনি তাদের প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে, যার তলদেশে নহর প্রবাহিত থাকবে। তাতে তারা সর্বদা অবস্থান করবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তারা আল্লাহর দল। স্মরণ রেখো, আল্লাহর দলই কৃতকার্য হয়। [সুরা মুজাদালা (৫৮) : ২২]
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُوْنَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِّنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي * تُسِرُّونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ * وَ أَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمْ وَمَا أَعْلَنْتُمْ وَ مَنْ يَفْعَلْهُ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ ۞ إِنْ يَثْقَفُوكُمْ يَكُونُوا لَكُمْ أَعْدَاءٌ وَ يَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ وَالسِنَتَهُمْ بِالسُّوءِ وَوَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ
হে ইমানদাররা, তোমরা যদি আমার সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে আমার পথে জিহাদের জন্য বের হয়ে থাকো, তবে আমার শত্রু ও তোমাদের নিজেদের শত্রুকে এমন বন্ধু বানিয়ো না যে, তাদের কাছে ভালোবাসার বার্তা পৌঁছাতে শুরু করবে; অথচ তোমাদের কাছে যে সত্য এসেছে তারা তা এমনই প্রত্যাখ্যান করেছে যে, রাসুলকে এবং তোমাদের কেবল এই কারণে (মক্কা থেকে) বের করে দেয় যে, তোমরা তোমাদের রব আল্লাহর প্রতি ইমান এনেছ। তোমরা গোপনে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করো; অথচ তোমরা যা কিছু গোপনে করো ও যা কিছু প্রকাশ্যে করো, আমি তা ভালোভাবে জানি। তোমাদের মধ্যে কেউ এমন করলে সে সরল পথ থেকে বিচ্যুত হলো। তোমাদের বাগে পেলে তারা তোমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং নিজেদের হাত ও মুখ বিস্তার করে তোমাদের কষ্ট দেবে। তাদের কামনা এটাই যে, তোমরা কাফির হয়ে যাও। [সুরা মুমতাহিনা (৬০) : ১-২]
لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَفِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقْبَةً وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَإِلَى اللهِ الْمَصِيرُ
মুমিনরা যেন মুমিনদের ছেড়ে কাফিরদের নিজেদের বন্ধু না বানায়। যে এরূপ করবে, আল্লাহর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে তাদের (জুলুম) থেকে বাঁচতে যদি আত্মরক্ষামূলক কোনো পন্থা অবলম্বন করো, সেটা ভিন্ন কথা। ২১২ আল্লাহ তোমাদের নিজের (শাস্তির) ব্যাপারে সতর্ক করেন; আর তাঁরই কাছে সবার প্রত্যাবর্তন। [সুরা আলে ইমরান (৩) : ২৮]
কাফিরদের সঙ্গে এমন বন্ধুত্ব স্থাপন করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার দ্বারা দুজনের জীবনের লক্ষ্য ও লাভ-লোকসান অভিন্ন হয়ে যায়। সুরা নিসা (১৩৯, ১৪৪), সুরা মায়িদা (৫১, ৫৭, ৮১), সুরা তাওবা (৩৩)-সহ অসংখ্য আয়াতে এ ব্যাপারে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কোনো কোনো আয়াতে এটাকে ইমানের মাপকাঠি বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কাফিরদের সঙ্গে সম্পর্কের বিভিন্ন পর্যায় ও স্তর রয়েছে। এর কোনোটি বৈধ, কোনোটি নাজায়িজ আর কোনোটি তো সরাসরি কুফর। হাকিমুল উম্মাহ আশরাফ আলি থানবি রাহ. লেখেন,
'কাফিরদের সঙ্গে তিন ধরনের আচরণ হয় : (ক) মুওয়ালাত তথা বন্ধুত্ব। (খ) মুদারাত তথা বাহ্যিক সদাচার। (গ) মুওয়াসাত তথা অনুগ্রহ ও উপকার করা। এই তিনটির বিধান হলো, মুওয়ালাত তথা বন্ধুত্ব কোনো অবস্থায় জায়িজ নেই। আল্লাহর বাণী-
হে ইমানদাররা, তোমরা ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। যে তাদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হবে। [সুরা মায়িদা (৫) : ৫১]
হে ইমানদাররা, তোমরা আমার শত্রু ও তোমাদের নিজেদের শত্রুকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। [সুরা মুমতাহিনা (৬০): ০১]
এ দুই আয়াত দ্বারা মুওয়ালাত তথা বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ করা উদ্দেশ্য। মুদারাত তথা বাহ্যিক সদাচার তিন অবস্থায় জায়িজ-নিজের ক্ষতি রোধের উদ্দেশ্যে, দীনের কল্যাণকামনা অর্থাৎ, তাদের হিদায়াত গ্রহণের প্রত্যাশায় এবং আতিথেয়তা হিসেবে। ব্যক্তিগত কল্যাণ-বিবেচনা বা উপকার, সম্পদ ও খ্যাতি অর্জনের লক্ষ্যে মুদারাত বৈধ নয়। বিশেষত এর কারণে যদি দীনি ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে আরও অধিক গুরুত্বের সঙ্গে তা হারাম হবে।... আর মুওয়াসাতের হুকুম হলো, হারবিদের সঙ্গে তা বৈধ নয়। যারা হারবি নয়, তাদের সঙ্গে বৈধ।
আল্লাহ কুরআনে বলেন,
لَا يَنْهُكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَ لَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِّنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَ تُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ إِنَّمَا يَنْهُكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قُتَلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَ أَخْرَجُوكُمْ مِّنْ دِيَارِكُمْ وَ ظَهَرُوا عَلَى إِخْرَاجِكُمْ أَنْ تَوَلَّوْهُمْ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ
যারা দীনের ব্যাপারে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের সঙ্গে সদাচরণ করতে ও তাদের প্রতি ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন। আল্লাহ তোমাদের কেবল তাদের সঙ্গেই বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছেন, যারা দীনের ব্যাপারে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, তোমাদের তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে এবং তোমাদেরকে বের করার কাজে একে অন্যের সহযোগিতা করেছে। যারা তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, তারা জালিম। [সুরা মুমতাহিনা (৬০) : ৮-৯]
উপরিউক্ত দুই আয়াত দ্বারা বোঝা গেল, যে-সকল কাফির মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না এবং তাদের কোনোভাবে কষ্টও দেয় না, তাদের সঙ্গে বাহ্যিকভাবে ভালো ব্যবহার করা ও ইনসাফের পরিচয় দেওয়া উচিত। আর এটি আল্লাহরও অপছন্দ নয়; বরং মুসলিম ও সাধারণ কাফির নির্বিশেষে সবার সঙ্গেই ইনসাফ রক্ষা করা অবশ্য কর্তব্য। তবে হারবি কাফিরদের কথা ভিন্ন। তাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান আল্লাহ হারাম করেননি।
কুফর ও ইসলাম যেহেতু ব্যক্তির অন্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই কাফিরদের সঙ্গে কাউকে সম্পর্ক রাখতে দেখলেই ঢালাওভাবে কুফরের ফাতওয়া জারি করা সমীচীন নয়। কাফিরদের সঙ্গে কেউ যদি এ কারণে সুসম্পর্ক রাখে যে, সে তাদের দীন ও আদর্শকে ভালো মনে করে; অথবা কুফরের কারণেই কাফিরদের প্রতি ভালোবাসা রাখে, তাহলে এটা সন্দেহাতীতভাবে কুফর। কারণ, কুফরের প্রতি সন্তুষ্টিও কুফর এবং তা ইমান ভঙ্গের কারণ।
তবে সম্পর্কের ভিত্তি যদি অন্য কিছু হয়-যেমন: ব্যক্তিগত চাহিদা, পার্থিব উপকার ও উন্নতি অর্জনের লিপ্সা ইত্যাদি, তবে এসব ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক যদিও নাজায়িজ এবং বড় পাপ হিসেবে বিবেচিত হবে; কিন্তু এটাকে কুফর বলার সুযোগ নেই। ফকিহগণ বিভিন্ন কাফিরগোষ্ঠীর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত কাপড় পরিধানের ব্যাপারে লিখেছেন, তা হারাম এবং মারাত্মক পাপ তো বটে; কিন্তু আন্তরিক ভালোবাসা ব্যতিরেকে পরিধান করা হলে তা কুফর নয়। কুফর তখনই হবে, যখন এর প্রতি তার অন্তরের আকর্ষণ ও ভালোবাসা থাকবে। তবে অন্তরের অবস্থা যেহেতু দৃশ্যমান নয়, তাই এ ক্ষেত্রে তার মৌখিক স্বীকারোক্তিকে বিবেচনায় নেওয়া হবে। আল্লামা দারদির রাহ. লেখেন,
(وَشَدَّ زُنَّارِ) بِضَمِّ الزَّاي وَتَشْدِيدِ النُّونِ حِزَامُ ذُو خُيُوطٍ مُلَوَّنَةٍ يَشُدُّ بِهِ الذِّمِّيُّ وَسَطَهُ لِيَتَمَيَّزَ بِهِ عَنْ الْمُسْلِمِ وَالْمُرَادُ بِهِ مَلْبُوسُ الْكَافِر الخاص بِهِ أَيْ إِذَا فَعَلَهُ حُبًّا فِيهِ وَمَيْلًا لِأَهْلِهِ وَأَمَّا إِنْ لَبِسَهُ لَعِبًا فَحَرَامٌ وَلَيْسَ بِكُفْرٍ.
"জুননার" হলো এমন রঙিন ফিতা, মুসলিমদের থেকে আলাদা পরিচয় দিতে জিম্মি কাফিররা যা তাদের দেহের মধ্যভাগে পরিধান করে। এখানে "যা" দ্বারা কাফিরদের যেকোনো বিশেষ পোশাক উদ্দেশ্য। কোনো মুসলিম যদি কাফিরদের প্রতি ভালোবাসা ও দুর্বলতাবশত এ ধরনের প্রতীকী পোশাক পরিধান করে, তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। আর যদি দুষ্টুমিবশত পরিধান করে, তবে তা হারাম হবে; কুফর নয়।
ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়ায় অন্য এক প্রসঙ্গে এসেছে,
وَبِقَوْلِهِ لِمُعَامِلِهِ الْكُفْرُ خَيْرٌ مِمَّا أَنْتَ تَفْعَلُ عِنْدَ بَعْضِهِمْ مُطْلَقًا، وَقَيَّدَهُ الْفَقِيهُ أَبُو اللَّيْثِ بِأَنْ قَصَدَ تَحْسِينَ الْكُفْرِ لَا تَقْبِيحَ مُعَامَلَتِهِ.
'কেউ যদি তার সঙ্গে লেনদেনকারীকে বলে, তুমি যা করছ, এরচেয়ে কুফর উত্তম; তবে একদল ফকিহের কাছে সে নিঃশর্তভাবে কাফির হয়ে যাবে। কিন্তু ফকিহ আবুল লাইস সমরকন্দি রাহ. বলেছেন, কথক যদি এর দ্বারা এই উদ্দেশ্য নেয় যে, কুফর বাস্তবেই উত্তম, তবে সে কাফির হয়ে যাবে। আর যদি সে তার সঙ্গীর লেনদেনের জঘন্যতা প্রকাশের জন্য এরূপ বলে থাকে, তবে কাফির হবে না।
২, ৩. ইবাদত এবং পারস্পরিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ইসলাম ও কুফরের মৌলিক পার্থক্য
১. আল্লাহর কাছে ইবাদত কবুলের জন্য ইমান শর্ত। কাফিরের নেক আমলও আল্লাহর কাছে গৃহীত হয় না। এই নেক আমলের কারণে কাফির পরকালেও শাস্তি থেকে বাঁচতে পারে না। আল্লাহ বলেন,
وَمَا مَنَعَهُمْ أَنْ تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقْتُهُمْ إِلَّا أَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَبِرَسُولِهِ وَلَا يَأْتُونَ الصَّلوةَ إِلَّا وَهُمْ كُسَالَى وَلَا يُنْفِقُونَ إِلَّا وَهُمْ كُرِهُونَ﴾
তাদের দান কবুল হওয়ার পক্ষে বাধা এ ছাড়া আর কিছুই নয় যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কুফরি করেছে এবং তারা সালাতে এলে গড়িমসি করে আসে এবং (কোনো ভালোকাজে) অর্থ ব্যয় করলে তা অসন্তোষের সঙ্গে করে। [সুরা তাওবা (৯) : ৫৪]
২. শরিয়তের যেসব বিধানের সম্পর্ক ইমান-আকিদা, দণ্ডবিধি ও পারস্পরিক লেনদেনের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলোর ক্ষেত্রে মুসলিম ও কাফিরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। মুসলিম ও কাফির নির্বিশেষে সবাই এ ক্ষেত্রে আদেশ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং শরিয়া কর্তৃক সম্বোধিত। শুধু মদ ও শূকরের কেনা-বেচার বিধান এর ব্যতিক্রম। এ ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য। ইবাদত-সংক্রান্ত আয়াত ও হাদিসসমূহের ক্ষেত্রে কাফিররাও শরিয়া কর্তৃক সম্বোধিত কি না, আর যদি সম্বোধিত হয়, তবে তা শুধু পারলৌকিক বিচারে, নাকি ইহলৌকিক বিচারেও, এ নিয়ে আলিমগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য-উসুলুস সারাখসি : ১/৭৩; শারহু মুখতাসারিত তাহাবি : ১/৭৩৫।
৩. অমুসলিমকে জাকাত দিলে জাকাত আদায় হয় না।
৪. পারস্পরিক লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি পার্থক্য হলো, চুক্তিবদ্ধ কাফিররা যদি দারুল ইসলামে বসবাস করে, তাহলে তারা নিজেদের মধ্যে মদ ও শূকর কেনাবেচা করতে পারবে। পক্ষান্তরে মুসলিমদের জন্য এগুলোর কেনাবেচা জায়িজ নেই। শরিয়তের দৃষ্টিতে তারা নিজেরাও এগুলোর মালিক হয় না, কাউকে মালিক বানাতেও পারে না।
৪. বিয়েশাদি এবং সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে মুসলিম ও কাফিরের পার্থক্য
১. কোনো কাফির কোনো মুমিনের বিয়ের 'ওয়ালি' (অভিভাবক) হতে পারে না।
২. মুসলিম নারী কোনো অমুসলিম পুরুষকে বিয়ে করতে পারে না। আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكْتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَامَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِّنْ مُّشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ ۚ وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُّؤْمِنٌ خَيْرٌ مِّنْ مُشْرِكٍ وَ لَوْ أَعْجَبَكُمْ أُولَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ ۚ وَاللَّهُ يَدْعُوا إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ﴾
তোমরা মুশরিকদের সঙ্গে নিজেদের নারীদের বিয়ে দিয়ো না, যতক্ষণ- না তারা ইমান আনে। নিশ্চয়ই একজন মুমিন গোলাম যেকোনো মুশরিক থেকে শ্রেয়; যদিও সেই মুশরিক পুরুষকে তোমাদের পছন্দ হয়। তারা সবাই তো জাহান্নামের দিকে ডাকে, যখন আল্লাহ নিজ হুকুমে জান্নাত ও মাগফিরাতের দিকে ডাকেন। [সুরা বাকারা (২): ২২১]
৩. কাফির নারীদের সঙ্গেও মুসলিম পুরুষদের বিয়ে জায়িজ নেই। তবে তাওহিদবাদী আহলে কিতাব নারীদের মুসলিম পুরুষরা বিয়ে করতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো, সে শুধু নামধারী ইয়াহুদি-খ্রিষ্টানই হবে না; বরং ঐশী ধর্মের অনুসারী এবং আল্লাহর তাওহিদ ও আখিরাতের প্রতি যথাযথভাবে বিশ্বাসী হতে হবে। যদি এসব বিষয়ের প্রতি কারও ইমান না থাকে, তাহলে স্রেফ আদমশুমারিতে ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টান হিসেবে গণ্য হওয়ার কারণে কেউ আহলে কিতাব বলেও বিবেচিত হয় না এবং তার সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াও বৈধ হয় না।
৫. অধিকার এবং মালিকানার বিবেচনায় মুসলিম ও কাফিরের পার্থক্য
১. কাফির কখনো মুসলিমের পরিত্যক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না।
২. মুসলিমও কাফিরের পরিত্যক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না। কারণ, দীনের ভিন্নতা উত্তরাধিকারের প্রতিবন্ধক। তবে কোনো মুসলিম যদি মুরতাদ হয়ে যায় এবং মুরতাদ অবস্থায়ই সে মৃত্যুবরণ করে; কিংবা কাফিরদের রাষ্ট্রে আশ্রয় নেয়, তাহলে তার সম্পত্তি থেকে ঋণ পরিশোধের পর অবশিষ্টগুলো তার মুসলিম উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
হানাফি মাজহাবের স্বীকৃত ফাতওয়া হলো, মুরতাদ হওয়ার আগে এবং পরে স্থাবর ও অস্থাবর যত সম্পত্তি সে কামাই করেছে বা তার মালিকানায় ছিল, সবই উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হবে। তবে ইমাম আবু হানিফা রাহ.-এর ব্যক্তিগত মত হলো, তার মুরতাদ হওয়ার আগের সম্পত্তিগুলো উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হবে। আর মুরতাদ হওয়ার পরে অর্জিত সম্পত্তি বায়তুলমালের প্রাপ্য বলে বিবেচিত হবে।
৩. কাফির মুসলিমের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে পারে না।
৪. কাফিরের জবাইকৃত পশু হারাম। তবে কোনো প্রকৃত (নামধারী নয়) তাওহিদবাদী আহলে কিতাব যদি আল্লাহর নামে পশু জবাই করে, তবে তা হালাল হবে।
৫. মুরতাদের শাস্তি হলো হত্যাদণ্ড। শাসকের দায়িত্ব হলো, মুরতাদকে গ্রেপ্তারের পর তিন দিন পর্যন্ত অবকাশ দেওয়া। এই তিন দিনের মধ্যে তাকে ইসলামে প্রত্যাবর্তন করতে উৎসাহ দেওয়া হবে। তার কোনো সংশয় থাকলে তা অপনোদনের ব্যবস্থা করা হবে। প্রশ্ন থাকলে সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়া হবে। তিন দিনের মধ্যে যদি সে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে প্রাণে বেঁচে যাবে; অন্যথায় তাকে শাস্তিস্বরূপ হত্যা করা হবে। তবে মুরতাদ যদি পুরুষ না হয়ে নারী হয়, তাহলে হানাফিদের কাছে তাকে হত্যা করা হবে না; বরং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে। যদি কখনো ইসলাম গ্রহণ করে নেয়, তাহলে মুক্তি পাবে; অন্যথায় কারাগারেই তার মৃত্যু হবে।
টিকাঃ
২১১ অর্থাৎ, অদৃশ্য নুর দান করেছেন, যা দ্বারা তারা এক বিশেষ রকমের অতীন্দ্রিয় জীবন লাভ করে। অথবা রুহুল কুদুস তথা জিবরিল আ. দ্বারা তাদের সাহায্য করেছেন। [তাফসিরে উসমানি]
২১২ অর্থাৎ, কাফিরদের জুলুম ও নিপীড়ন থেকে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে যদি এমন কোনো পন্থা অবলম্বন করতে হয়, যা দ্বারা বাহ্যত মনে হয়, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করা হয়েছে, তবে তা করার অবকাশ আছে।
*২১৩ বায়ানুল কুরআন: ১/২২৬।
২১৪ আশ-শারহুল কাবির মাআ হাশিয়াতিদ দাসুকি: ৪/৩০১।
২১০ ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ২/২৭৬।
ফসল ফী বায়ান মুজেবি আল আমরি ফী হক্কিল কুফফার
২২০ কিতাবুস সালাত, বাব সিফাতিস সালাত
২২১ রাদ্দুল মুহতার: ২/৩৫১।