📘 কুফর ও তাকফির > 📄 তাওয়িল বিবেচ্য হতে একটি অপরিহার্য শর্ত

📄 তাওয়িল বিবেচ্য হতে একটি অপরিহার্য শর্ত


তাওয়িল বিবেচ্য হতে একটি অপরিহার্য শর্ত হলো, সেই ব্যক্তির তাওয়িলের ইচ্ছা থাকতে হবে। কেউ যদি দীনের অকাট্য ও সুনিশ্চিত কোনো বিষয় অস্বীকার করে, তবে এর দাবি হচ্ছে, তাকে তৎক্ষণাৎ কাফির বলে ফাতওয়া দেওয়া হবে। কিন্তু এখানে একটি সংশয় থেকে যায়- সেই ব্যক্তি কি আদতেই বিধানটি অস্বীকার করেছে, নাকি এর ভিন্ন কোনো তাওয়িল করেছে? সে ক্ষেত্রে সতর্কতার দাবি হচ্ছে, তাকে তাকফির না করা। এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত অস্বীকারকারী তাওয়িলের ভিত্তিতে এমনটি করেছে বলে প্রমাণিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের থেকে এটাকে তাওয়িল হিসেবে ধরা হবে না; বরং অস্বীকার হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমিরি রাহ. লেখেন,
فعلم أن التأويل كما لا يقبل في ضروريات الدين كذلك لا يقبل في ما يظهر أنه احتيال في كلام الناس، وتمحل غير واقعي، وقد كان الأئمة رحمهم الله يعتبرون إرادة التأويل وقصده، فجاء المتسللون فاعتبروا إيجاده، ففي "جامع الفصولين"، وعن مالك رحمه الله أنه سئل عن من أراد أن يضرب أحداً؟ فقيل له: ألا تخاف الله تعالى؟ فقال: لا، قال: لا يكفر، إذ يمكنه أن يقول: التقوى فيما أفعله له، ولو قيل له ذلك في معصيته، فقال: لا أخافه يكفر، إذ لا يمكنه ذلك التأويل اهـ ونحوه في "الخانية" في قصة شداد بن حكيم مع زوجته، وذكرها في طبقات الحنفية من شداد عن محمد رحمه الله أيضاً، وهو أولى بالاعتبار مما ذكره من اعتبار مجرد الامكان، فإنه لا حجر فيه، وقالوا في الإكراه على كلمة الكفر: إن خطر بباله التورية ولم يور كفر، فاعتبروا القصد وإرادة التأويل في حقه، وإلا فالتمحل لا يعجز عنه أحد.
'সুতরাং জানা গেল, জরুরিয়াতে দীনের ক্ষেত্রে যেভাবে তাওয়িল গৃহীত হয় না, একইভাবে সেই ক্ষেত্রেও তাওয়িল গৃহীত হয় না, যেখানে এটা প্রকাশিত যে, তা মানুষের কথার মধ্যে কৃত্রিমতা এবং অবাস্তব মতলব বের করার রূপ ধারণ করছে। ইমামগণ তাওয়িলের উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা থাকাকে বিবেচনায় নিতেন। পরবর্তী সময়ে অপরিপক্ক লোকেরা এসে তাওয়িলের উদ্ভাবনকে বিবেচনায় নিতে শুরু করল। (অর্থাৎ, তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকলেও তারা তাকফির থেকে বিরত থাকতেন)
জামিউল ফুসুলাইন গ্রন্থে ইমাম মালিকের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে, তাঁকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, যে কাউকে মারতে ইচ্ছা করেছে। তখন তাকে বলা হলো, তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? সে বলল, না। ইমাম মালিক রাহ. বললেন, সে কাফির হবে না। কারণ, তার কথার এই ব্যাখ্যা হওয়া সম্ভব যে, উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে মারার মধ্যেই তাকওয়া রয়েছে। (হয়তো সে এমন কিছু করেছে, যার জন্য শরিয়তের দৃষ্টিতে সে শাস্তির উপযুক্ত) তবে কোনো গুনাহের ক্ষেত্রে যদি তাকে বলা হয়, তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? আর তখন সে বলে, না, আমি তাকে ভয় করি না। তবে সেই ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে। কারণ, এ ক্ষেত্রে সেই তাওয়িল সম্ভব নয়।... তাওয়িলের শুধু সম্ভাবনা থাকাই যথেষ্ট- ওই কথার চেয়ে এই মূলনীতিই বিবেচনার অধিক উপযুক্ত। কারণ, তাওয়িলের কোনো শেষ নেই। ফকিহগণ কুফরি কথার ওপর “ইকরাহ” (বাধ্য করা) অধ্যায়ে লিখেছেন, যদি তার অন্তরে তাওরিয়া (অন্য কিছু উদ্দেশ্য নেওয়া)-এর চিন্তা আসে, এরপরও সে তাওরিয়া না করে (কুফরি কথা বলে), তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে।'
সুতরাং এখানে দেখা যাচ্ছে, ফকিহগণ (শুধু সম্ভাবনা থাকাকেই যথেষ্ট মনে করেননি; বরং) এ ব্যাপারে তাওয়িলের উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা থাকাকে বিবেচনায় নিয়েছেন। কৃত্রিমতা করে তাওয়িল করতে চাইলে এটা তো কোনো জটিল ব্যাপার নয়। (সব ক্ষেত্রেই টেনেহিঁচড়ে এ ধরনের তাওয়িল করা সম্ভব; কিন্তু তা তাকফিরের প্রতিবন্ধক নয়।)

টিকাঃ
১৯৯ ইকফারুল মুলহিদিন: ৯০।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকা যথেষ্ট, নাকি ইচ্ছাও থাকা বিবেচ্য

📄 তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকা যথেষ্ট, নাকি ইচ্ছাও থাকা বিবেচ্য


জামিউল ফুসুলাইন গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে, ইমাম মাতুরিদি রাহ. বলেছেন,
وعن الماتريدي رحمه الله أن من قال لسلطان زماننا أنه عادل كفر بالله تعالى لأنه جائر بيقين ومن سمى الجور عدلاً كفر.
'যে ব্যক্তি আমাদের যুগের বাদশাহকে আদিল (ন্যায়পরায়ণ) বলবে, সে কাফির হয়ে যাবে। কারণ, এই যুগের বাদশাহ সুনিশ্চিতভাবে জালিম। আর যে ব্যক্তি জুলুমকে আদল (ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা) বলে অভিহিত করে, সে কাফির হয়ে যায়。
পরবর্তীকালের একদল ফকিহ এই কথাকে কুফর অপরিহার্যকারী হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁরা যুক্তি দেখিয়েছেন, এই কথাকে তাওয়িল করা সম্ভব। কারণ, 'আদিল' শব্দের এক অর্থ হচ্ছে ন্যায়পরায়ণ ও ইনসাফকারী; কিন্তু শব্দটি যখন আন (عن) অব্যয়যোগে ব্যবহৃত হয়, তখন এর অর্থ হয় পরিত্যাগকারী ও বিচ্যুত। সুতরাং এ বিবেচনায় শব্দটির অর্থ এ-ও হতে পারে যে, সে অন্যদের পরিত্যাগ করেছে বা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। যেহেতু এই কথায় গ্রহণযোগ্য তাওয়িল করার সুযোগ রয়েছে, তাই এর ভিত্তিতে তাকফির করা সংগত নয়।
জামিউল ফুসুলাইন গ্রন্থে একদল ফকিহের উপরিউক্ত ব্যাখ্যার আলোকে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকাও তাকফিরের প্রতিবন্ধক। সুতরাং কথক যদি তাওয়িল উদ্দেশ্য না নিয়ে থাকে; কিন্তু তার কথায় কুফরের সম্ভাবনা ছাড়াও ভিন্ন কোনো তাওয়িলের সুযোগ থাকে, তাহলে এর কারণে তাকে তাকফির করা যাবে না। গ্রন্থকারের ভাষ্য নিম্নরূপ,
أقول: هذا نص على أن مجرد إمكان التأويل يمنع التكفير وإن لم يظهر التأويل وعلى هذا ينبغي أن لا يكفر في مواضع كثيرة مما قيل بكفره فليتأمل.
'পরবর্তী একদল আলিমের এই কথা এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট দলিল যে, শুধু তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকা তাকফিরের পথে প্রতিবন্ধক; যদিও সেই তাওয়িল সুস্পষ্ট না হয়। সুতরাং এর ভিত্তিতে এমন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাকফির না করা উচিত, যেগুলোর ব্যাপারে কুফরের কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি ভালো করে বুঝে নাও।'
জামিউল ফুসুলাইন গ্রন্থের এই বক্তব্য আল্লামা কাশমিরির বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যাচ্ছে। এখানে বলা হচ্ছে, তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকাই তাকফিরের জন্য প্রতিবন্ধক। পক্ষান্তরে আল্লামা কাশমিরি রাহ. বলেছেন, শুধু তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকাই যথেষ্ট নয়; বরং ইচ্ছাও থাকা জরুরি।
এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দুটির মধ্যে এভাবে সমন্বয় করা যেতে পারে— জামিউল ফুসুলাইন গ্রন্থের বক্তব্যকে এর বাহ্যিক অর্থের ওপরই রাখা হবে; আর আল্লামা কাশমিরির বক্তব্যকে তাকফির অর্থে না ধরে কুফর অর্থে ধরা হবে। অর্থাৎ, কেউ যদি তাওয়িলের ইচ্ছা না করে, তবে আল্লাহর কাছে (দিয়ানাতান) সে কাফির বলে বিবেচিত হবে; কিন্তু তার কথায় যদি গ্রহণীয় কোনো তাওয়িলের সুযোগ থাকে, তবে আমরা (কাদ্বান) তাকে তাকফির করা থেকে বিরত থাকব। কারণ, তাকফিরের জন্য অকাট্য ভিত্তির প্রয়োজন হয়, যা তাকফিরের ফাতওয়ার ক্ষেত্রে মৌলিক শর্ত।
আল্লামা ইবনু নুজায়ম রাহ.-এর নিম্নবর্ণিত বক্তব্যের আলোকে এই সমন্বয়ের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি লেখেন,
وَإِنْ سُئِلَ عَنْ تَكَلُّم بِكُفْرٍ مُتَأَوَّلٍ قَالَ يَسْأَلُ إِنْ أَرَادَ كَذَا فَلَا شَيْءَ عَلَيْهِ، وَإِنْ أَرَادَ كَذَا فَيُسْتَتَابُ فَإِنْ تَابَ قُبِلَتْ تَوْبَتُهُ وَإِلَّا قُتِلَ
‘যে ব্যক্তি এমন কোনো কুফরি কথা বলে, যাতে তাওয়িল করার সুযোগ রয়েছে, তবে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে। সে যদি এর দ্বারা কুফরি নয় এমন কোনো ব্যাখ্যা দেয়, তাহলে তার ওপর কোনো শাস্তি আরোপ করা হবে না। আর যদি সে কোনো কুফরি ব্যাখ্যা দেয়, তাহলে তাকে আবশ্যিকভাবে তাওবা করতে বলা হবে। যদি সে তাওবা করে, তাহলে তার তাওবা গৃহীত হবে; আর তাওবা না করলে তাকে হত্যা করা হবে।’
এই উদ্ধৃতিতে দেখা যাচ্ছে, সম্ভাবনাপূর্ণ কথা বলার কারণে সরাসরি তাকফির করা হয়নি; বরং বিষয়টি তদন্ত করা হয়েছে। কথক নিজেই যদি এর দ্বারা কুফরি সম্ভাবনা উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে, তবে তাকে তাকফির করা হয়েছে। আর যদি সে কুফরি নয় এমন সম্ভাবনা উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে, তবে তাকে তাকফির করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

টিকাঃ
২০০ জামিউল ফুসুলাইন: ২/১৭৪।
২০১ প্রাগুক্ত: ২/১৭৪।
২০২ আল-বাহরুর রায়িক: ৬/২৯১।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 কোনো কথা ও কাজ কুফর হিসেবে বিবেচ্য হওয়ার শর্ত

📄 কোনো কথা ও কাজ কুফর হিসেবে বিবেচ্য হওয়ার শর্ত


কোনো কথা ও কাজ কুফর হিসেবে বিবেচ্য হতে পাঁচটি মৌলিক শর্ত রয়েছে:
১. কুফর অপরিহার্যকারী হওয়া
যে কথা বা কাজের কারণে কাউকে তাকফির করা হবে, বাস্তবেই তা কুফর অপরিহার্যকারী হতে হবে। কারণ, গুনাহের কারণে তাকফির করা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মতাদর্শ নয়। কোন কোন বিষয়ের কারণে কাউকে তাকফির করা যাবে; আর কোন কোন বিষয়ের কারণে তাকফির করা যাবে না, এ বিষয়ে স্বতন্ত্র অধ্যায়ে আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ।
২. কুফর ও তাকফিরের ভিত্তি যাচাই করা
ইমান ও কুফরের ভিত্তি হচ্ছে অন্তর থেকে সত্যায়ন করা বা না করা। অন্তরের সত্যায়ন ও অসত্যায়ন উভয়টিই অদৃশ্য বিষয়। সুতরাং কোনো কথা বা কাজের কারণে কাউকে তাকফির করার ক্ষেত্রে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে হবে যে, তা অন্তরের অসত্যায়নের দিকে নির্দেশ করছে। যেসব কথা ও কাজ আন্তরিক অস্বীকারের সুনিশ্চিত প্রমাণ বহন করবে, একমাত্র সেগুলোর কারণেই কোনো মুসলিম পরিচয়দাতাকে তাকফির করা যাবে। যেমন : কোনো মুসলিম যদি ব্যভিচার করে, মদপান কিংবা সুদভিত্তিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে তা এই প্রমাণ বহন করে যে, তার অন্তরে আল্লাহর বড়ত্ব ও মাহাত্ম্য কম রয়েছে। আখিরাত, কবর ও হাশরের ব্যাপারেও তার বিশ্বাসে ঘাটতি রয়েছে। যদি তার পরিপূর্ণ ইমান থাকত, তাহলে দুনিয়ার তুচ্ছ স্বার্থে কখনোই নিজের আখিরাত ধ্বংস করত না; কিন্তু এর কারণে কাউকে তাকফির করা যাবে না। কারণ, এ ক্ষেত্রে অন্তরের অস্বীকারের বিষয়টি নিশ্চিত নয়। অসংখ্য মানুষ অন্তরে সত্যায়ন রেখেই বিভিন্ন কারণে এসব অপরাধে লিপ্ত হয়। কাউকে তাকফির করতে এর ভিত্তি সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন হতে হয়; ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে কখনো তাকফির করা যায় না। ইমাম গাজালি রাহ. লেখেন,
ولكن يعرف اعتقاده تعظيم الصنم تارة بتصريح لفظه، وتارة بالإشارة إن كان أخرساً، وتارة بفعل يدل عليه دلالة قاطعة كالسجود حيث لا يحتمل أن يكون السجود لله وإنما الصنم بين يديه كالحائط وهو غافل عنه أو غير معتقد تعظيمه، وذلك يعرف بالقرائن.
'মূর্তির প্রতি শ্রদ্ধা লালনের আকিদা কখনো স্পষ্ট কথার দ্বারা জানা যাবে। বোবা হলে ইশারার দ্বারা জানা যাবে। কখনো এমন কাজের দ্বারাও জানা যেতে পারে, যা অকাট্যভাবে তার প্রমাণ বহন করবে। যেমন, সিজদা। কারণ, মূর্তি দেয়ালের মতো সামনে থাকা অবস্থায় তো এই তাওয়িলের সুযোগ নেই যে, হয়তো এর দ্বারা আল্লাহকে সিজদা করা উদ্দেশ্য ছিল; সামনে থাকা মূর্তির ব্যাপারে সে উদাসীন ছিল; অথবা মূর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা তার উদ্দেশ্য ছিল না। আলামতের দ্বারাই এ বিষয়টি জানা হয়ে যায়。
৩. কুফর প্রকাশিত হওয়ার ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ থাকা
সাবিত ইবনু জাহহাক রা. বর্ণনা করেন, রাসুল বলেন,
وَلَعْنُ الْمُؤْمِنِ كَقَتْلِهِ، وَمَنْ رَمَى مُؤْمِنًا بِكُفْرٍ فَهُوَ كَقَتْلِهِ
ইমানদারকে লানত করা (অভিশাপ দেওয়া) তাকে হত্যার সমতুল্য। আর কেউ কোনো ইমানদারকে কুফরির অপবাদ দিলে সেটাও তাকে হত্যা করার সমতুল্য হবে。
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আল্লামা আইনি রাহ. লেখেন,
(ومن رمى مؤمنا بكفر فَهُوَ كقتله) يَعْنِي فِي الْحُرْمَة، وقيل: لأن نسبته إلى الكفر الموجب لقتله كالقتل لأن المتسبب للشَّيء كفاعله.
“কেউ কোনো ইমানদারকে কুফরির অপবাদ দিলে, তা-ও তাকে হত্যার সমতুল্য হবে।” এর দ্বারা হারাম-বিবেচনায় উভয়টি সমতুল্য হওয়ার কথা বোঝানো হয়েছে। এর আরেক ব্যাখ্যা হলো, কাউকে কুফরের দিকে সম্পর্কিত করা, যা তাকে হত্যা করা অপরিহার্য করবে, তা মূলত তাকে হত্যা করার মতোই। কারণ, যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ের কারণ হয়, সে তার কর্তার মতোই。
কোনো মুসলিমকে কাফির বলার অর্থ হচ্ছে, তার ওপর কুফরের বিধিবিধান প্রযোজ্য হবে। একজন মুসলিম ইসলাম ছেড়ে কুফর গ্রহণ করলে তার ওপর হত্যাদণ্ড আরোপ হয়। সুতরাং তাকে কাফির বলা তার হত্যাযোগ্য হওয়ার কারণ। এ কারণে কাউকে হত্যার আগে যথাযথভাবে এই বিষয়ের যাচাই আবশ্যক যে, সেই ব্যক্তি আসলেই অপরাধী কি না। যদি অপরাধী হয়েও থাকে, তবে সেই অপরাধ এতটা গুরুতর কি না, যার জন্য সে হত্যাযোগ্য হতে পারে। এসব বিষয় নিশ্চিত হওয়ার পরই কাউকে হত্যা করা যায়। কাউকে তাকফির করার ক্ষেত্রেও একই ধরনের তাহকিক আবশ্যক।
৪. তাকফিরের প্রতিবন্ধক না থাকা
কারও থেকে কুফর প্রকাশিত হতে দেখলে তাকে তাকফির করার আগে এ বিষয়টি যাচাই করে নেওয়া জরুরি যে, তার মধ্যে কুফরের প্রতিবন্ধক কোনো বিষয় আছে কি না। অন্যায়ভাবে তাকফিরের গুনাহ থেকে বাঁচতে ইতিপূর্বে উল্লিখিত তাকফিরের প্রতিবন্ধকগুলো নিবিড়ভাবে যাচাই করে নেওয়া একান্ত আবশ্যক।
৫. যার ভিত্তিতে তাকফির করা হচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে কুফর হওয়া
যে আকিদা বা আমলের কারণে কাউকে কাফির আখ্যায়িত করা হচ্ছে, তা সুনিশ্চিতভাবে কুফর হওয়া জরুরি। অনিশ্চিত বা সম্ভাবনাপূর্ণ কোনো বিষয়ের ভিত্তিতে কাউকে কাফির আখ্যায়িত করা জায়িজ নয়। এ কারণেই ফকিহগণ লিখেছেন, কোনো বিষয়ের মধ্যে যদি অধিকাংশ কুফরের সম্ভাবনাই প্রবল থাকে; কিন্তু কোনো একটি সম্ভাবনা এমন থাকে, যার কারণে তা কুফর হিসেবে বিবেচিত হয় না, তাহলে এমন অনিশ্চিত বিষয়ের কারণে কাউকে তাকফির করা যাবে না। হ্যাঁ, কথক বা কর্তা যদি নিজেই কুফরের বিষয়টি নিশ্চিত করে, তবে তা সুনিশ্চিত ও অকাট্য হয়ে যাবে। তখন এর কারণে তাকে নির্দ্বিধায় তাকফির করা যাবে।
এ কারণেই আল্লামা ইবনু নুজায়ম রাহ.-সহ অনেক ফকিহ লিখেছেন, কোনো কাজের ভিত্তিতে কাউকে তাকফির করতে অপরিহার্য শর্ত হলো, সেই কাজটি কুফর হওয়ার ব্যাপারে ফকিহগণের মধ্যে কোনো মতভিন্নতা থাকবে না। আর যদি তাঁদের মধ্যে কোনো মতভিন্নতা থাকে, তবে তা যেহেতু সুনিশ্চিতভাবে কুফর অপরিহার্যকারী হিসেবে বিবেচ্য হয় না, সুতরাং এ কারণে কাউকে তাকফিরও করা যাবে না। তাঁর ভাষ্য নিম্নরূপ,
وَفِي الْخُلَاصَةِ وَغَيْرِهَا إِذَا كَانَ فِي الْمَسْأَلَةِ وُجُوهُ تُوجِبُ التَّكْفِيرَ وَوَجْهُ وَاحِدٌ يَمْنَعُ التَّكْفِيرَ فَعَلَى الْمُفْتِي أَنْ يَمِيلَ إِلَى الْوَجْهِ الَّذِي يَمْنَعُ التَّكْفِيرَ تَحْسِينًا لِلظَّنِّ بِالْمُسْلِمِ زَادَ فِي الْبَزَارِيَّةِ إِلَّا إِذَا صَرَّحَ بِإِرَادَةِ مُوجِبِ الْكُفْرِ فَلَا يَنْفَعُهُ التَّأْوِيلُ حِينَئِذٍ وَفِي التَّتَارْخَانِيَّةِ لَا يَكْفُرُ بِالْمُحْتَمَلِ لِأَنَّ الْكُفْرَ نِهَايَةُ فِي الْعُقُوبَةِ فَيَسْتَدْعِي نِهَايَةً فِي الْجِنَايَةِ وَمَعَ الاحْتِمَالِ لَا نِهَايَةَ اهـ
'খুলাসাতুল ফাতাওয়া এবং অন্যান্য গ্রন্থে রয়েছে, যখন কোনো মাসআলায় কুফর অপরিহার্যকারী এমন অনেক দিক থাকে; আর একটিমাত্র দিক কুফরের প্রতিবন্ধক হয়, তাহলে মুফতির জন্য অপরিহার্য হলো, তিনি মুসলিমের প্রতি সুধারণাবশত সেই দিকের উদ্দেশ্যে ঝুঁকবেন, যা কুফরের প্রতিবন্ধক। ফাতাওয়া বাজজাজিয়া গ্রন্থে অতিরিক্ত এ কথাও এসেছে যে, তবে সেই ব্যক্তিই যদি কুফর অপরিহার্যকারী দিক উদ্দেশ্য নেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে, তাহলে তখন তাওয়িল তার কোনো উপকারে আসবে না। ফাতাওয়া তাতারখানিয়া গ্রন্থে এসেছে, সম্ভাবনাপূর্ণ বিষয়ের কারণে তাকফির করা যাবে না। কারণ, কুফর সর্বোচ্চ অপরাধ। তাই এর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তিরও প্রয়োজন। সম্ভাবনা থাকলে কোনো বিষয় চূড়ান্ত হয় না।
আল্লামা ইবনু আবিদিন শামি রাহ. লেখেন,
وَالَّذِي تَحَرَّرَ أَنَّهُ لَا يُفْتَى بِكُفْرٍ مُسْلِمٍ أَمْكَنَ حَمْلُ كَلَامِهِ عَلَى تَحْمَلٍ حَسَنٍ أَوْ كَانَ في كُفْرِهِ اخْتِلَافُ وَلَوْ رِوَايَةٌ ضَعِيفَةٌ
'যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মুসলিমের কথার কোনো উত্তম ব্যাখ্যা করা সম্ভব; অথবা সেই কথা কুফর হওয়ার ব্যাপারে মতভিন্নতা থাকে, এমনকি যদি সেই ভিন্নমতের বর্ণনা দুর্বলও হয়ে থাকে, ততক্ষণ তাকে তাকফির করা হবে না।
আল্লামা হামাওয়ي রাহ. এ কথাও বলেছেন যে, যদি সেই কথা বা কাজ কুফর হওয়ার ব্যাপারে নিজ মাজহাবের ফকিহদের ঐকমত্য থাকে; কিন্তু অন্য মাজহাবের ফকিহদের মতভিন্নতা থাকে, তাহলে সেই ভিন্নমতকে আমলে নিয়ে তাকফির করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তাঁর ভাষ্য নিম্নরূপ :
قَوْلُهُ: مَتَى وُجِدَتْ رِوَايَةٌ أَنَّهُ لَا يَكْفُرُ: يَعْنِي وَلَوْ كَانَتْ تِلْكَ الرِّوَايَةُ ضَعِيفَةٌ كَمَا فِي شَرْحِ الْمُصَنِّف - رَحِمَهُ اللهُ تَعَالَى - عَلَى الْكَنْزِ. أَقُولُ: وَلَوْ كَانَتْ تِلْكَ الرِّوَايَةُ لِغَيْرِ أَهْلِ مَذْهَبِنَا، وَيَدُلُّ عَلَى ذَلِكَ اشْتِرَاطُ كَوْنِ مَا يُوجِبُ الْكُفْرَ مُجْمَعًا عَلَيْهِ.
'আল্লামা ইবনু নুজায়ম রাহ. বলেছেন, যখন (কুফর সাব্যস্ত করার পক্ষে মতানৈক্যপূর্ণ) কোনো বর্ণনা পাওয়া যাবে, তখন সে (কথক বা কর্তা) কাফির হবে না। এর ব্যাখ্যা হলো, (কুফর সাব্যস্ত করার পক্ষে মতানৈক্যপূর্ণ) সেই বর্ণনা যদি দুর্বলও হয়—যেমনটা লেখক কানজুদ দাকায়িকের ব্যাখ্যাগ্রন্থে লিখেছেন— তবু তাকফির করা হবে না। আমি বলব, সেই বর্ণনা যদি অন্য মাজহাবের ফকিহদেরও হয়ে থাকে, তবু তাকফির করা হবে না। এ কথার দলিল হলো, কুফর অপরিহার্যকারী বিষয়ের জন্য একটি শর্ত হচ্ছে, তা সর্বসম্মত হতে হবে।

টিকাঃ
২০৩ আল-ইকতিসাদ ফিল ইতিকাদ: ১৩৮।
২০৪ সহিহ বুখারি: ৬১০৫।
২০০৫ উমদাতুল কারি: ২৩/১৮০।
২০৬ আল-বাহরুর রায়িক: ৫/১৩৪।
২০৭ রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৪।
২০৮ গামজু উয়ুনিল বাসায়ির: ২/১৯০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00