📘 কুফর ও তাকফির > 📄 তাকফিরের ক্ষেত্রে তাওয়িল বিবেচনার গুরুত্ব

📄 তাকফিরের ক্ষেত্রে তাওয়িল বিবেচনার গুরুত্ব


তাকফিরের ক্ষেত্রে তাওয়িল বিবেচনার গুরুত্ব অপরিসীম। সাহাবাযুগ থেকে বর্তমান শতাব্দী পর্যন্ত ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে এমন অসংখ্য ফিরকার আবির্ভাব হয়েছে, যারা ইসলামের অকাট্য অনেক বিষয়ের ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে; কিন্তু উম্মাহ তাদের তাকফির করেনি। এর একমাত্র কারণ হলো, তাদের তাওয়িল ছিল। ইমাম ইবনু কুদামা রাহ. লেখেন,
وَقَدْ عُرِفَ مِنْ مَذْهَبِ الْخَوَارِجِ تَكْفِيرُ كَثِيرٍ مِنْ الصَّحَابَةِ، وَمَنْ بَعْدَهُمْ، وَاسْتِحْلَالُ دِمَائِهِمْ، وَأَمْوَالِهِمْ، وَاعْتِقَادُهُمْ التَّقَرُّبَ بِقَتْلِهِمْ إِلَى رَبِّهِمْ، وَمَعَ هَذَا لَمْ يَحْكُمُ الْفُقَهَاءُ بِكُفْرِهِمْ : لِتَأْوِيلِهِمْ. وَكَذَلِكَ يُخَرَّجُ فِي كُلِّ مُحَرَّمٍ اسْتُحِلَّ بِتَأْوِيلٍ مِثْلِ هَذَا.
'খারেজিদের প্রসিদ্ধ মাজহাব হলো, তারা অনেক সাহাবি ও তৎপরবর্তী মনীষীকে কাফির বলে। তাঁদের রক্ত ও সম্পদকে হালাল মনে করে। তাদের বিশ্বাস হলো, সাহাবিদের হত্যা করলে তারা রবের নৈকট্য অর্জন করতে পারবে। এতৎসত্ত্বেও ফকিহগণ তাদের কাফির হওয়ার সিদ্ধান্ত আরোপ করেননি। কারণ, তাদের তাওয়িল ছিল। প্রত্যেক এমন হারাম কাজ, যা এ ধরনের তাওয়িলের ভিত্তিতে হালাল মনে করা হয়েছে, তার ক্ষেত্রে এমন বিধানই আরোপিত হবে।
হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানি রাহ. বলেন,
قَالَ الْعُلَمَاءُ كُلُّ مُتَأَوَّلِ مَعْذُورٌ بِتَأْوِيلِهِ لَيْسَ بِآئِم إِذَا كَانَ تَأْوِيلُهُ سَائِعًا فِي لِسَانِ الْعَرَبِ وَكَانَ لَهُ وَجْهُ فِي الْعِلْمِ
'আলিমগণ বলেছেন, প্রত্যেক তাওয়িলকারী মাজুর; পাপী নয়। তবে শর্ত হলো, তার তাওয়িল আরবিভাষার রীতি অনুসারে চলনসই হতে হবে এবং এর কোনো ইলমি ভিত্তি থাকতে হবে。
১. তাওয়িল-অস্বীকার নয়
ইমাম গাজালি রাহ. এ ব্যাপারে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থই রচনা করেছেন, যেখানে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন—তাওয়িল, অস্বীকার নয়; বরং এটা সত্যায়নের একটি পদ্ধতিমাত্র। তিনি প্রথমে লিখেছেন, ইমান হচ্ছে সত্যায়নের নাম; আর সত্যায়নের পদ্ধতি হচ্ছে পাঁচটি। এরপর লেখেন,
اعلم أن كل من نزل قولاً من أقوال صاحب الشرع على درجة من هذه الدرجات فهو من المصدقين، وإنما التكذيب أن ينفي جميع هذه المعاني، ويزعم أن ما قاله لا معنى له وإنما هو مكذب محض، وغرضه فيما قale التلبيس، أو مصلحة الدنيا، وذلك هو الكفر المحض والزندقة، ولا يلزم الكفر للمؤولين ماداموا يلازمون قانون التأويل
'জেনে রেখো, যে ব্যক্তি শরিয়ত-প্রণেতার কোনো কথাকে এই পাঁচ পদ্ধতির কোনো পদ্ধতিতে রাখবে, সে সত্যায়নকারীদের অন্তর্ভুক্ত। অস্বীকার হলো এর সব পদ্ধতি নাকচ করে এই দাবি করা যে, এগুলোর কোনো অর্থই নেই; বরং স্রেফ মিথ্যা। এ কথার দ্বারা তার উদ্দেশ্য হচ্ছে, সংশয় সৃষ্টি অথবা দুনিয়ার কোনো কল্যাণ অর্জন করা। এটা স্পষ্ট কুফর এবং ইলহাদ।'
মোটকথা, তাওয়িলকারীরা যতক্ষণ তাওয়িলের নীতি রক্ষা করবে, তাদের জন্য কুফর অপরিহার্য হবে না।
আল্লামা আবুল বাকা কাফাওয়ي হানাফি রাহ. লেখেন,
وَمُخْتَارُ جُمْهُورِ أَهْلِ السُنَّةِ مِنْهُمَا عَدَمُ إِكْفَارِ أَهْلِ السُنَّةِ مِنَ الْمُبْتَدِعَةِ الْمُؤَوِّلَةِ فِي غَيْرِ الضَّرُورِيَّةِ لِكَوْنِ التَّأْوِيلِ شُبْهَةً، كَمَا فِي خِزَانَةِ « الجِرْجَانِي، وَ « المُحِيط « البرهاني، و أَحْكَامُ « الرَّازِي، وَرَوَاهُ الْكَرْخِي وَالْحَاكِمُ الشَّهيدُ عَنِ الإِمَامِ أَبِي حَنِيفَةَ وَالْجُرْجَانِي عَنِ الحسن بن زياد وشارح ( المواقف والمقاصد ) والآمدي عن الشافعي والأشعري لا مُطلقا
'সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলুস সুন্নাহর অভিমত হলো, যে-সকল বিদআতপন্থি জরুরিয়াতে দীন ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে তাওয়িল করে, তাদের তাকফির করা হবে না। কারণ, তাওয়িল সন্দেহ সৃষ্টি করে। (আর সন্দেহের ভিত্তিতে তাকফির করা যায় না) অসংখ্য গ্রন্থে এমনটি বর্ণিত হয়েছে。
উপরিউক্ত উদ্ধৃতি থেকে এ বিষয়টিও বোঝা গেল যে, জরুরিয়াতে দীনের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার তাওয়িল গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং কেউ যদি জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত বিষয়ে তাওয়িল করে, তবে তা অস্বীকার হিসেবে বিবেচিত হবে। যেমন, আল্লাহ বলেছেন,
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّنَ وَكَانَ اللهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا
মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন। তিনি তো আল্লাহর রাসুল এবং সর্বশেষ নবি। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। [সুরা আহজাব (৩৩) : ৪০]
এই আয়াতে রাসুল -কে সর্বশেষ নবি সাব্যস্ত করা হয়েছে। সুতরাং তাঁর পর আর কোনো নবি আসবেন না। এ বিষয়টি জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত। এখন কেউ যদি কাদিয়ানিদের মতো এটিকে এভাবে তাওয়িল করে যে, রাসুলের পরে মূল নবি না এলেও জিল্লি ও বুরুজি নবি (ছায়ানবি) আসতে পারে, তাহলে সে সুনিশ্চিতভাবে কাফির। যেখানে বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা দুরূহ, শুধু সে ক্ষেত্রেই তাওয়িল করা যায়। এখানে তো বিষয়টি এমন নয়। উপরন্তু এর বাহ্যিক অর্থের ব্যাপারে উম্মাহর ইজমা রয়েছে। শুধু আলিমরাই নন; বরং সাধারণ মানুষও এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে অবগত। সুতরাং বিষয়টি অস্বীকার বা এর ভিন্ন তাওয়িল করা উভয়টিই বরাবর (অর্থাৎ কুফর)।
২. ইমাম আবু হানিফার তাকফিরের ফাতওয়াসংখ্যা
কাজি কামালুদ্দিন বায়াজি রাহ. তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ইশারাতুল মারামে লেখেন, ইমাম আবু হানিফা রাহ. মোট ২৩টি মাসআলায় কুফরের ফাতওয়া দিয়েছেন, যার মধ্যে ৬টি মাসআলা এমন, যাতে সরাসরি আল্লাহর দিকে কোনো ত্রুটি সম্পর্কিত করা হয়েছে। ১৬টি মাসআলা এমন, যাতে জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত কোনো বিষয় অস্বীকার করা হয়েছে। আর ১টি বিষয় ছিল এমন, যাতে জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের তাওয়িল করা হয়েছে。
এর দ্বারা বোঝা গেল, জরুরিয়াতে দীনের মধ্যে তাওয়িল কোনো ওজর নয় এবং এটি তাকফিরের প্রতিবন্ধকও নয়।

টিকাঃ
১১৯১ আল-মুগনি: ৯/১২১।
১১৯২ ফাতহুল বারি: ১২/৩০৪।
১৯৩ ফায়সালুত তাফরিকা বাইনাল ইসলামي ওয়াজ জানদাকা: ৪১।
১৯৪ আল-কুল্লিয়াত: ৭৬৬।
১৯০ ইশারাতুল মারাম: ৫১।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 জরুরিয়াতে দীন অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের তাওয়িল কুফর কেন

📄 জরুরিয়াতে দীন অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের তাওয়িল কুফর কেন


জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর তাওয়িল কুফর হওয়ার দুটি কারণ রয়েছে:
ক. শরিয়া কর্তৃক সে বিষয়টি বিধিবদ্ধ হওয়া।
খ. সে বিধানের স্বীকৃত স্বরূপ ও তত্ত্বকথা সর্বজনবিদিত হওয়া।
উভয় বিষয়ই মুতাওয়াতির হওয়ার কারণে অকাট্য ও সুনিশ্চিত। আলিম এবং সাধারণ জনতা সবার মধ্যেই সুপ্রসিদ্ধ। সবাই জানে, অমুক বিধান শরিয়া দ্বারা সাব্যস্ত এবং সেই বিধানের স্বরূপ হচ্ছে এরূপ। এখন কেউ যদি এর ভিন্ন ব্যাখ্যা (তাওয়িল) দাঁড় করায়, তাহলে সে প্রকারান্তরে মুতাওয়াতিরভাবে চলে আসা এই বিধানের স্বরূপ ও তত্ত্বকথাকে ভুল বলে আখ্যায়িত করল। বলা বাহুল্য, কোনো মুতাওয়াতির ও অকাট্য বিষয়ের স্বরূপ ও তত্ত্বকথা পরিবর্তন করা মূলত অস্বীকারের নামান্তর, যা নিঃসন্দেহে কুফর। আল্লামা তাফতাজানি রাহ. লেখেন,
(والنصوص) من الكتاب والسنة تحمل على ظواهرها) ما لم يصرف عنها دليل قطعي ... فالعدول عنها) أي عن الظواهر إلى معان يدعيها أهل الباطن.... (إلحاد)
(والنصوص) من الكتاب والسنة تحمل على ظواهرها) ما لم يصرف عنها دليل قطعي ... فالعدول عنها) أي عن الظواهر إلى معان يدعيها أهل الباطن.... (إلحاد)
آي ميل وعدول عن الإسلام، واتصال واتصاف بكفر، لكونه تكذيبا للنبي ﷺ فيما علم مجيئه به بالضرورة.
'কুরআন এবং সুন্নাহর নুসুসকে তার বাহ্যিক অর্থেই প্রয়োগ করা হবে, যতক্ষণ-না কোনো অকাট্য দলিল তাকে বাহ্যিক অর্থ থেকে ফেরাবে। সুতরাং বাহ্যিক অর্থ ছেড়ে শব্দকে এমন অর্থের দিকে ফেরানো, যা বাতিনিরা দাবি করে-তা ইলহাদ। ইলহাদ হচ্ছে, ইসলাম থেকে সরে যাওয়া এবং কুফরের সঙ্গে সংযুক্ত ও তার গুণে গুণান্বিত হওয়া। কারণ, এর দ্বারা নবি -কে এমন ব্যাপারে অস্বীকার করা হয়, যা নিয়ে তাঁর আগমন আবশ্যিকভাবে জানা গেছে।
এর দ্বারা বোঝা গেল, কোনো নসের একটি অর্থ যদি সুনির্দিষ্ট হয়, তবে গ্রহণযোগ্য কোনো দলিল ছাড়া সেই অর্থ পরিত্যাগ করে ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করা প্রকারান্তরে তা অস্বীকারের নামান্তর। জরুরিয়াতে দীনের স্বরূপ ও তত্ত্বকথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সর্বস্তরের দীনদার শ্রেণির মধ্যে অবিচ্ছিন্নতার সঙ্গে চলে আসার কারণে সর্বসম্মতভাবে অকাট্য হয়। যার কারণে এর ভিন্ন ব্যাখ্যা করা এবং মুতাওয়াতির স্বরূপ ও তত্ত্বকে বিকৃত করে ফেলা মূলত সেই বিধানের প্রতি সত্যায়ন না করারই নামান্তর।
আল্লামা কাজি বায়েজি রাহ. লেখেন,
فإن جمهور أهل السنة لم يكفروا أهل القبلة من المبتدعة المؤولة في غير الضرورة دون الضروريات؛ إذ المؤول في الضروريات الدين ليس كالمؤول في الأصول اليقينية؛ لأن من النصوص ما علم قطعاً من الدين أنه على ظاهره، فتأويله تكذيب للنبي ﷺ
'সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলুস সুন্নাহ বিদআতপন্থি আহলে কিবলাকে তাকফির করেননি, যারা জরুরিয়াতে দীন ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে তাওয়িল করে। জরুরিয়াতে দীনের মধ্যে তাওয়িল করা অন্যান্য সুনিশ্চিত মূলনীতির মধ্যে তাওয়িল করার মতো নয়। কেননা, কিছু নুসুস এমন রয়েছে, যার ব্যাপারে দ্ব্যর্থহীনভাবে জানা রয়েছে যে, তা বাহ্যিক অর্থের ওপর প্রযোজ্য। সুতরাং তার তাওয়িল করা নবি -কে অস্বীকারের নামান্তর।
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমিরি রাহ. লেখেন,
أن التصرف في ضروريات الدين، والتأول فيها، وتحويلها إلى غير ما كانت عليه، وإخراجها عن صورة ما تواترت عليه كفر، فإن ما تواتر لفظاً أو معنى، وكان مكسوف المراد, فقد تواتر مراده، فتأويله رد للشريعة القطعية، وهو كفر بواح، وإن لم يكذب صاحب الشريعة، وإنه ليس فيه إلا الاستتابة.
‘জরুরিয়াতে দীনের মধ্যে হস্তক্ষেপ করা, এর মধ্যে তাওয়িল করা, মুতাওয়াতিরভাবে চলে আসা এর স্বরূপ থেকে বের করে ভিন্ন রূপে পরিবর্তিত করা নিশ্চিতভাবে কুফর। কারণ, যা শাব্দিক বা অর্থগতভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পরম্পরায় মুতাওয়াতিরভাবে চলে এসেছে এবং যার অর্থও সুস্পষ্ট, তার উদ্দিষ্ট মর্মও মুতাওয়াতির। সুতরাং এর ভিন্ন ব্যাখ্যা করা অকাট্য শরিয়তকে প্রত্যাখ্যান করার নামান্তর, যা সুস্পষ্ট কুফর। যদিও সে প্রত্যক্ষভাবে শরিয়ত-প্রণেতাকে অস্বীকার করেনি। এ অপরাধের একমাত্র শাস্তি হলো, তাকে আবশ্যিকভাবে তাওবা করতে বলা হবে’।

টিকাঃ
১৯৬ শারহুল আকায়িদ : ৯৬।
১৯৭ ইশারাতুল মারাম: ৫১।
১৯৮ ইকফারুল মুলহিদিন: ১২৮।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 তাওয়িল বিবেচ্য হতে একটি অপরিহার্য শর্ত

📄 তাওয়িল বিবেচ্য হতে একটি অপরিহার্য শর্ত


তাওয়িল বিবেচ্য হতে একটি অপরিহার্য শর্ত হলো, সেই ব্যক্তির তাওয়িলের ইচ্ছা থাকতে হবে। কেউ যদি দীনের অকাট্য ও সুনিশ্চিত কোনো বিষয় অস্বীকার করে, তবে এর দাবি হচ্ছে, তাকে তৎক্ষণাৎ কাফির বলে ফাতওয়া দেওয়া হবে। কিন্তু এখানে একটি সংশয় থেকে যায়- সেই ব্যক্তি কি আদতেই বিধানটি অস্বীকার করেছে, নাকি এর ভিন্ন কোনো তাওয়িল করেছে? সে ক্ষেত্রে সতর্কতার দাবি হচ্ছে, তাকে তাকফির না করা। এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত অস্বীকারকারী তাওয়িলের ভিত্তিতে এমনটি করেছে বলে প্রমাণিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের থেকে এটাকে তাওয়িল হিসেবে ধরা হবে না; বরং অস্বীকার হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমিরি রাহ. লেখেন,
فعلم أن التأويل كما لا يقبل في ضروريات الدين كذلك لا يقبل في ما يظهر أنه احتيال في كلام الناس، وتمحل غير واقعي، وقد كان الأئمة رحمهم الله يعتبرون إرادة التأويل وقصده، فجاء المتسللون فاعتبروا إيجاده، ففي "جامع الفصولين"، وعن مالك رحمه الله أنه سئل عن من أراد أن يضرب أحداً؟ فقيل له: ألا تخاف الله تعالى؟ فقال: لا، قال: لا يكفر، إذ يمكنه أن يقول: التقوى فيما أفعله له، ولو قيل له ذلك في معصيته، فقال: لا أخافه يكفر، إذ لا يمكنه ذلك التأويل اهـ ونحوه في "الخانية" في قصة شداد بن حكيم مع زوجته، وذكرها في طبقات الحنفية من شداد عن محمد رحمه الله أيضاً، وهو أولى بالاعتبار مما ذكره من اعتبار مجرد الامكان، فإنه لا حجر فيه، وقالوا في الإكراه على كلمة الكفر: إن خطر بباله التورية ولم يور كفر، فاعتبروا القصد وإرادة التأويل في حقه، وإلا فالتمحل لا يعجز عنه أحد.
'সুতরাং জানা গেল, জরুরিয়াতে দীনের ক্ষেত্রে যেভাবে তাওয়িল গৃহীত হয় না, একইভাবে সেই ক্ষেত্রেও তাওয়িল গৃহীত হয় না, যেখানে এটা প্রকাশিত যে, তা মানুষের কথার মধ্যে কৃত্রিমতা এবং অবাস্তব মতলব বের করার রূপ ধারণ করছে। ইমামগণ তাওয়িলের উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা থাকাকে বিবেচনায় নিতেন। পরবর্তী সময়ে অপরিপক্ক লোকেরা এসে তাওয়িলের উদ্ভাবনকে বিবেচনায় নিতে শুরু করল। (অর্থাৎ, তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকলেও তারা তাকফির থেকে বিরত থাকতেন)
জামিউল ফুসুলাইন গ্রন্থে ইমাম মালিকের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে, তাঁকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, যে কাউকে মারতে ইচ্ছা করেছে। তখন তাকে বলা হলো, তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? সে বলল, না। ইমাম মালিক রাহ. বললেন, সে কাফির হবে না। কারণ, তার কথার এই ব্যাখ্যা হওয়া সম্ভব যে, উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে মারার মধ্যেই তাকওয়া রয়েছে। (হয়তো সে এমন কিছু করেছে, যার জন্য শরিয়তের দৃষ্টিতে সে শাস্তির উপযুক্ত) তবে কোনো গুনাহের ক্ষেত্রে যদি তাকে বলা হয়, তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? আর তখন সে বলে, না, আমি তাকে ভয় করি না। তবে সেই ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে। কারণ, এ ক্ষেত্রে সেই তাওয়িল সম্ভব নয়।... তাওয়িলের শুধু সম্ভাবনা থাকাই যথেষ্ট- ওই কথার চেয়ে এই মূলনীতিই বিবেচনার অধিক উপযুক্ত। কারণ, তাওয়িলের কোনো শেষ নেই। ফকিহগণ কুফরি কথার ওপর “ইকরাহ” (বাধ্য করা) অধ্যায়ে লিখেছেন, যদি তার অন্তরে তাওরিয়া (অন্য কিছু উদ্দেশ্য নেওয়া)-এর চিন্তা আসে, এরপরও সে তাওরিয়া না করে (কুফরি কথা বলে), তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে।'
সুতরাং এখানে দেখা যাচ্ছে, ফকিহগণ (শুধু সম্ভাবনা থাকাকেই যথেষ্ট মনে করেননি; বরং) এ ব্যাপারে তাওয়িলের উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা থাকাকে বিবেচনায় নিয়েছেন। কৃত্রিমতা করে তাওয়িল করতে চাইলে এটা তো কোনো জটিল ব্যাপার নয়। (সব ক্ষেত্রেই টেনেহিঁচড়ে এ ধরনের তাওয়িল করা সম্ভব; কিন্তু তা তাকফিরের প্রতিবন্ধক নয়।)

টিকাঃ
১৯৯ ইকফারুল মুলহিদিন: ৯০।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকা যথেষ্ট, নাকি ইচ্ছাও থাকা বিবেচ্য

📄 তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকা যথেষ্ট, নাকি ইচ্ছাও থাকা বিবেচ্য


জামিউল ফুসুলাইন গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে, ইমাম মাতুরিদি রাহ. বলেছেন,
وعن الماتريدي رحمه الله أن من قال لسلطان زماننا أنه عادل كفر بالله تعالى لأنه جائر بيقين ومن سمى الجور عدلاً كفر.
'যে ব্যক্তি আমাদের যুগের বাদশাহকে আদিল (ন্যায়পরায়ণ) বলবে, সে কাফির হয়ে যাবে। কারণ, এই যুগের বাদশাহ সুনিশ্চিতভাবে জালিম। আর যে ব্যক্তি জুলুমকে আদল (ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা) বলে অভিহিত করে, সে কাফির হয়ে যায়。
পরবর্তীকালের একদল ফকিহ এই কথাকে কুফর অপরিহার্যকারী হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁরা যুক্তি দেখিয়েছেন, এই কথাকে তাওয়িল করা সম্ভব। কারণ, 'আদিল' শব্দের এক অর্থ হচ্ছে ন্যায়পরায়ণ ও ইনসাফকারী; কিন্তু শব্দটি যখন আন (عن) অব্যয়যোগে ব্যবহৃত হয়, তখন এর অর্থ হয় পরিত্যাগকারী ও বিচ্যুত। সুতরাং এ বিবেচনায় শব্দটির অর্থ এ-ও হতে পারে যে, সে অন্যদের পরিত্যাগ করেছে বা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। যেহেতু এই কথায় গ্রহণযোগ্য তাওয়িল করার সুযোগ রয়েছে, তাই এর ভিত্তিতে তাকফির করা সংগত নয়।
জামিউল ফুসুলাইন গ্রন্থে একদল ফকিহের উপরিউক্ত ব্যাখ্যার আলোকে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকাও তাকফিরের প্রতিবন্ধক। সুতরাং কথক যদি তাওয়িল উদ্দেশ্য না নিয়ে থাকে; কিন্তু তার কথায় কুফরের সম্ভাবনা ছাড়াও ভিন্ন কোনো তাওয়িলের সুযোগ থাকে, তাহলে এর কারণে তাকে তাকফির করা যাবে না। গ্রন্থকারের ভাষ্য নিম্নরূপ,
أقول: هذا نص على أن مجرد إمكان التأويل يمنع التكفير وإن لم يظهر التأويل وعلى هذا ينبغي أن لا يكفر في مواضع كثيرة مما قيل بكفره فليتأمل.
'পরবর্তী একদল আলিমের এই কথা এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট দলিল যে, শুধু তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকা তাকফিরের পথে প্রতিবন্ধক; যদিও সেই তাওয়িল সুস্পষ্ট না হয়। সুতরাং এর ভিত্তিতে এমন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাকফির না করা উচিত, যেগুলোর ব্যাপারে কুফরের কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি ভালো করে বুঝে নাও।'
জামিউল ফুসুলাইন গ্রন্থের এই বক্তব্য আল্লামা কাশমিরির বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যাচ্ছে। এখানে বলা হচ্ছে, তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকাই তাকফিরের জন্য প্রতিবন্ধক। পক্ষান্তরে আল্লামা কাশমিরি রাহ. বলেছেন, শুধু তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকাই যথেষ্ট নয়; বরং ইচ্ছাও থাকা জরুরি।
এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দুটির মধ্যে এভাবে সমন্বয় করা যেতে পারে— জামিউল ফুসুলাইন গ্রন্থের বক্তব্যকে এর বাহ্যিক অর্থের ওপরই রাখা হবে; আর আল্লামা কাশমিরির বক্তব্যকে তাকফির অর্থে না ধরে কুফর অর্থে ধরা হবে। অর্থাৎ, কেউ যদি তাওয়িলের ইচ্ছা না করে, তবে আল্লাহর কাছে (দিয়ানাতান) সে কাফির বলে বিবেচিত হবে; কিন্তু তার কথায় যদি গ্রহণীয় কোনো তাওয়িলের সুযোগ থাকে, তবে আমরা (কাদ্বান) তাকে তাকফির করা থেকে বিরত থাকব। কারণ, তাকফিরের জন্য অকাট্য ভিত্তির প্রয়োজন হয়, যা তাকফিরের ফাতওয়ার ক্ষেত্রে মৌলিক শর্ত।
আল্লামা ইবনু নুজায়ম রাহ.-এর নিম্নবর্ণিত বক্তব্যের আলোকে এই সমন্বয়ের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি লেখেন,
وَإِنْ سُئِلَ عَنْ تَكَلُّم بِكُفْرٍ مُتَأَوَّلٍ قَالَ يَسْأَلُ إِنْ أَرَادَ كَذَا فَلَا شَيْءَ عَلَيْهِ، وَإِنْ أَرَادَ كَذَا فَيُسْتَتَابُ فَإِنْ تَابَ قُبِلَتْ تَوْبَتُهُ وَإِلَّا قُتِلَ
‘যে ব্যক্তি এমন কোনো কুফরি কথা বলে, যাতে তাওয়িল করার সুযোগ রয়েছে, তবে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে। সে যদি এর দ্বারা কুফরি নয় এমন কোনো ব্যাখ্যা দেয়, তাহলে তার ওপর কোনো শাস্তি আরোপ করা হবে না। আর যদি সে কোনো কুফরি ব্যাখ্যা দেয়, তাহলে তাকে আবশ্যিকভাবে তাওবা করতে বলা হবে। যদি সে তাওবা করে, তাহলে তার তাওবা গৃহীত হবে; আর তাওবা না করলে তাকে হত্যা করা হবে।’
এই উদ্ধৃতিতে দেখা যাচ্ছে, সম্ভাবনাপূর্ণ কথা বলার কারণে সরাসরি তাকফির করা হয়নি; বরং বিষয়টি তদন্ত করা হয়েছে। কথক নিজেই যদি এর দ্বারা কুফরি সম্ভাবনা উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে, তবে তাকে তাকফির করা হয়েছে। আর যদি সে কুফরি নয় এমন সম্ভাবনা উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে, তবে তাকে তাকফির করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

টিকাঃ
২০০ জামিউল ফুসুলাইন: ২/১৭৪।
২০১ প্রাগুক্ত: ২/১৭৪।
২০২ আল-বাহরুর রায়িক: ৬/২৯১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00