📘 কুফর ও তাকফির > 📄 তাওয়িলের শর্তাবলি

📄 তাওয়িলের শর্তাবলি


তাওয়িল বৈধ হতে তিনটি মৌলিক শর্ত রয়েছে:
১. শব্দের বাহ্যিক ও স্বাভাবিক অর্থ গ্রহণ করা অসম্ভব হওয়া
মূলনীতি হলো, স্বাভাবিকভাবে কুরআন-সুন্নাহর সব নুসুসের বাহ্যিক অর্থই উদ্দেশ্য নেওয়া হবে; কিন্তু কোনো নসে যদি বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা অসম্ভব হয়, তাহলে সেখানে মুনাসিব তাওয়িল করার সুযোগ রয়েছে। যেমন, উলামায়ে দেওবন্দের সর্বজনস্বীকৃত আকাবির শায়খুত তাফসির আল্লামা ইদরিস কান্ধলবি রাহ. তাঁর কালজয়ী রচনা আকায়িদুল ইসলাম গ্রন্থে লেখেন,
‘আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আলিমগণ বলেন, অকাট্য দলিল ও আকলি প্রমাণের আলোকে এ কথা তো স্বীকৃত যে, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির সাদৃশ্য ও অনুরূপ হওয়া থেকে, পরিমাণ ও আকৃতিবিশিষ্ট হওয়া থেকে এবং দিক ও স্থান থেকে পূতপবিত্র। এ কারণে যেসব আয়াত ও হাদিসে আল্লাহর সত্তাকে আকাশ অথবা আরশের দিকে নিসবত (সম্পর্কিত) করা হয়েছে, এগুলোর অর্থ কখনোই এটা নয় যে, আকাশ ও আরশ আল্লাহর অবস্থানস্থল বা অধিষ্ঠানের জায়গা। বরং এগুলোর দ্বারা আল্লাহর উচ্চ মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব, মহত্ত্ব ও অহংকার বর্ণনা করা উদ্দেশ্য। কারণ, সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে সমুন্নত হলো আরশে আজিম। আল্লাহর সামনে আরশ থেকে নিয়ে ফরশ (ভূমি) পর্যন্ত গোটা বিশ্বজগৎ যেখানে অণু পরিমাণ অবস্থানও রাখে না, সেখানে তিনি কীভাবে এর মধ্যে অধিষ্ঠিত হতে পারেন?
সবকিছু আল্লাহর সৃষ্টি। যা কিছু সৃষ্ট ও অনিত্য, তা কীভাবে নিত্য ও অবিনশ্বর সত্তার স্থান ও অধিষ্ঠানের জায়গা হতে পারে।
আল্লাহ এ থেকে পূতপবিত্র যে, তিনি আরশের ওপর কিংবা দেহ-কাঠামোবিশিষ্ট কোনো বস্তুর ওপর অবস্থান গ্রহণ করবেন। যেভাবে রাজা-বাদশাহর ব্যাপারে বলা হয়—রাজা সিংহাসনে সমাসীন হয়েছেন—আল্লাহর ক্ষেত্রে এরূপ বলা জায়িজ নয়। কারণ, আল্লাহ পরিসীমাবিশিষ্ট কোনো সত্তা নন। দেহ-কাঠামোবিশিষ্ট কোনো বস্তুর ওপর সেই জিনিসই আসন গ্রহণ করতে পারে, যা পরিমাণবিশিষ্ট হয়; আকারে তা থেকে বড় অথবা ছোট হয়; কিংবা তার বরাবর হয়। এই হ্রাস-বৃদ্ধির ধারণা আল্লাহর ক্ষেত্রে অসম্ভব ব্যাপার। বিবেক দ্বারা বিবেচনা করলেও এটা অসম্ভব মনে হয় যে, কোনো দেহ-কাঠামোবিশিষ্ট সৃষ্টি—যেমন: আরশ নিজ স্রষ্টাকে নিজের ওপরে বহন করবে, এরপর ফেরেশতা সেই দেহবিশিষ্ট সৃষ্টি (আরশ)-কে নিজেদের কাঁধে উঠাবে; যেমন, আল্লাহ বলেছেন,
﴿وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَنِيَةٌ﴾
সেদিন আটজন ফেরেশতা নিজেদের ওপরে আরশ বহন করবে। [সুরা হাক্কাহ (৬৯): ১৭]
সৃষ্ট সব বস্তুর মধ্যে আরশ সর্বোচ্চ এবং সর্বোত্তম, তাই আল্লাহ আরশের কথা উল্লেখ করে তাঁর ওপর নিজের সমুন্নত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ, তিনি শুধু আরশের ওপরই সমুন্নত নন; বরং গোটা সৃষ্টির ওপর সমুন্নত—এ বাস্তবতাই পরিষ্কার করা উদ্দেশ্য। বলা বাহুল্য, ‘সমুন্নত’ আল্লাহর গুণ। কারণ, তাঁর নামই হচ্ছে আলি, আলা এবং মুতাআলি। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহ. বলেন,
وَكَانَ يَقُول إِن الله عز وجل مستو على العرش المجيد... وحكى جماعة عَنهُ أَنه كَانَ يَقُولُ إِن الاسْتِوَاء من صفات الذات وَكَانَ يَقُول في معنى الاستواء هُوَ الْعُلُو والارتفاع ولم يزل الله تَعَالَى عَاليا رفيعا قبل أن يخلق عَرْشِه فَهُوَ فَوق كل شَيْء والعالي على كل شَيْءٍ وَإِنَّمَا خص الله الْعَرْشِ لِمَعْنِي فِيهِ مُخَالِف لِسَائِرِ الْأَشْيَاء والعرش أفضل الأشياء وأرفعها فامتدح الله نفسه بِأَنَّهُ على الْعَرْش ب استوى أَي عَلَيْهِ عَلا وَلَا يجوز أَن يُقال استوى بمماسة ولا بملاقاة تَعَالَى الله عَن ذَلِك علوا كبيرا والله تَعَالَى لم يلحقه تغير ولا تبدل وَلَا تلحقه الحدود قبل خلق الْعَرْشِ وَلَا بعد خلق الْعَرْشِ
নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ মহিমান্বিত আরশের ওপর সমুন্নত। ... ইসতিওয়ার অর্থ প্রসঙ্গে তিনি বলতেন, সমুন্নত হওয়া এবং সুউচ্চ হওয়া। আল্লাহ তাঁর আরশ সৃষ্টির পূর্ব থেকেই সুউচ্চ ও সমুন্নত। তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে, সবকিছুর ওপরে। আল্লাহ আরশকে বিশেষিত করেছেন। কারণ, অন্য সব জিনিসের বিপরীতে তার মধ্যে কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। আরশ সর্বোত্তম এবং সর্বোচ্চ জিনিস। এ কারণে আল্লাহ নিজের গুণ বর্ণনা করেছেন এ কথা বলে যে, তিনি আরশের ওপর ইসতিওয়া করেছেন। অর্থাৎ, তার ওপর সমুন্নত হয়েছেন। এ কথা বলা বৈধ হবে না যে, তিনি স্পর্শ করার দ্বারা বা সম্মুখস্থ হওয়ার দ্বারা সমুন্নত হয়েছেন। আল্লাহ এ সবকিছু থেকে চিরপবিত্র। আল্লাহর সঙ্গে কোনো পরিবর্তন ও রূপান্তর সম্পৃক্ত হয় না। আরশ সৃষ্টির আগে এবং আরশ সৃষ্টির পরে কোনো প্রকার সীমা-পরিধি তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়নি।
এর দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, আল্লাহ আরশের ওপরে থাকার অর্থ এ নয় যে, তিনি কোনো জায়গায় রয়েছেন; বরং এর দ্বারা আল্লাহর সমুন্নতি, মহিমা ও অমুখাপেক্ষিতা বোঝানো উদ্দেশ্য।
যুক্তির দাবিতে এটা অসম্ভব যে, কোনো সৃষ্টি-তা ফেরেশতা হোক কিংবা কোনো দেহবিশিষ্ট বস্তু-নিজ স্রষ্টাকে নিজেদের কাঁধে বহন করবে। স্রষ্টার কুদরত সৃষ্টিজগৎকে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে। সৃষ্টির এই শক্তি নেই যে, তা স্রষ্টাকে বহন বা ধারণ করবে। যেসব আয়াতে আল্লাহর সমুন্নত হওয়া ও ঊর্ধ্বে অবস্থানের কথা উল্লেখিত হয়েছে, এটা দ্বারা তাঁর মর্যাদাগত উচ্চতা এবং শক্তি ও ক্ষমতার প্রাবল্য উদ্দেশ্য; ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা স্থানিক উচ্চতা ও ঊর্ধ্বতা উদ্দেশ্য নয়। যেমন, আল্লাহ বলেন,
وَ هُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ
তিনি তাঁর বান্দাদের ওপর একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। [সুরা আনআম (৬): ১৮]
وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ
নিশ্চয়ই আল্লাহ সমুচ্চ, সুমহান। [সুরা হজ (২২): ৬২]
وَلَهُ الْمَثَلُ الْأَعْلَى فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ
আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে সর্বোচ্চ মর্যাদা তাঁরই জন্য। [সুরা রুম (৩০): ২৭]
নিচের দুটি আয়াত দ্রষ্টব্য:
وَفَوْقَ كُلِّ ذِي عِلْمٍ عَلِيمٌ
প্রত্যেক জ্ঞানীর ওপর রয়েছে মহাজ্ঞানী। [সুরা ইউসুফ (১২) : ৭৬]
وَإِنَّا فَوْقَهُمْ قُهِرُونَ﴾
আমরা তো তাদের ওপর প্রতাপশালী। [সুরা আরাফ (৭): ১২৭]
কুরআন মাজিদের এ দুই আয়াতে 'ওপর' দ্বারা মর্যাদাগত উচ্চতা এবং শক্তি ও ক্ষমতার উচ্চতা উদ্দেশ্য। উপরিউক্ত বিষয়টিও অনুরূপ। যেসব আয়াতে আল্লাহর নৈকট্য ও দূরত্বের কথা এসেছে, সেগুলোতেও রূপক নৈকট্য ও দূরত্ব উদ্দেশ্য। আল্লাহর নুজুল (নেমে আসা বা অবতরণ করা) দ্বারাও রহমত অবতরণ বা বান্দাদের দিকে অভিমুখী হওয়া উদ্দেশ্য; (নাউজুবিল্লাহ)-এর দ্বারা আল্লাহ উপর থেকে নিচের দিকে নেমে আসা উদ্দেশ্য নয়।
আমরা দুআর সময় আকাশের দিকে হাত এ জন্য উঠাই না যে, আকাশ আল্লাহর জায়গা বা স্থান; বরং এর কারণ হলো, আকাশ হচ্ছে দুআর কিবলা—যেমন : কাবা সালাতের কিবলা। কাবাকে যে বায়তুল্লাহ (আল্লাহর ঘর) বলা হয়, তা এই অর্থে যে, কাবা হলো ইবাদতের ঘর। এর অর্থ (নাউজুবিল্লাহ)- কখনোই এটা নয় যে, কাবা আল্লাহর স্থান এবং তাঁর অবস্থানস্থল। কিবলার দিক স্থির করা হয়েছে ইবাদতকারীদের ইবাদতের জন্য; (নাউজুবিল্লাহ) - তা কখনোই মাবুদের দিক নয়। সুতরাং কাবা যেমন সালাতের কিবলা, একইভাবে আকাশও দুআর কিবলা। উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহ এ থেকে পবিত্র যে, তিনি কাবার ভেতরে বা আকাশের অভ্যন্তরে স্থান গ্রহণ করে আছেন।
সারকথা, এসব সিফাত (গুণ)-কে 'সিফাতে তাসবিহি', 'সিফাতে তানজিহি' ও 'সিফাতে জালাল' বলা হয়। ইলম, কুদরত, শ্রবণ ও দর্শন ইত্যাদি সিফাতকে 'সিফাতে তাহমিদি' ও 'সিফাতে জামাল' বলা হয়।
মুজাসসিমা (দেহবাদী) ও মুশাববিহা (সাদৃশ্য নিরূপণকারী) গোষ্ঠী বলে, আরশ এক ধরনের সিংহাসন। আল্লাহ এর ওপর সমাসীন। অর্থাৎ, তিনি আরশের ওপর স্থিতি ও স্থান গ্রহণ করে আছেন। ফেরেশতারা এই আরশকেই বহন করেন। 'রহমান আরশের ওপর ইসতিওয়া করেছেন' [সুরা তোয়াহা (২০) : ৫]-এই আয়াতের বাহ্যিক শব্দ থেকে তারা এর পক্ষে দলিল দেয়। তাদের বক্তব্য হলো, 'আরশের ওপর ইসতিওয়া' দ্বারা আরশের ওপর উপবিষ্ট বা সমাসীন হওয়া উদ্দেশ্য।
কিছু লোক আবার এ কথা বলে যে, আল্লাহ সব জায়গায় আছেন। তিনি প্রতিটি স্থানে বিরাজমান। তারা কুরআনের এই আয়াতগুলো থেকে দলিল দেয়,
مَا يَكُونُ مِنْ نَّجْوَى ثَلَثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنى مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا
তিন ব্যক্তির এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না, যাতে চতুর্থজন হিসেবে আল্লাহ থাকেন না, আর পাঁচজনেরও হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক কিংবা বেশি হোক, তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন। [সুরা মুজাদালা (৫৮) : ৭]
وَ نَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী। [সুরা কাফ (৫০) : ১৬]
وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْكُمْ وَلَكِنْ لَّا تُبْصِرُونَ
আমি তোমাদের অপেক্ষা তার অধিক কাছে থাকি; কিন্তু তোমরা দেখো না। [সুরা ওয়াকিয়া (৫৬) : ৮৫]
هُوَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ الهُ وَفِي الْأَرْضِ الهُ
তিনিই সেই সত্তা, যিনি আকাশেও উপাস্য এবং পৃথিবীতেও উপাস্য। [সুরা জুখরুফ (৪৩) : ৮৪]
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বক্তব্য হলো, এ ধরনের যত আয়াত বিবৃত হয়েছে, এর দ্বারা আল্লাহর সুউচ্চ ও সমুন্নত মর্যাদা এবং তাঁর ইলম ও কুদরতের ব্যাপ্তি বর্ণনা করা উদ্দেশ্য। আল্লাহর ইলম ও কুদরত সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে পরিব্যাপ্ত করে আছে। যেমন, এক হাদিসে এসেছে; রাসুল বলেন,
إِنَّ الْقُلُوبَ بَيْنَ إِصْبَعَيْنِ مِنْ أَصَابِعِ الرَّحْمَنِ عَزَّ وَجَلَّ يُقَلِّبُهَا
অন্তরসমূহ মহিমান্বিত করুণাময়ের দু-আঙুলের মধ্যে অবস্থিত। তিনি সেগুলো ওলটপালট করেন。
সর্বসম্মতভাবে এই হাদিসে স্বাভাবিক, বাহ্যিক ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অর্থ উদ্দেশ্য নয়; বরং এর দ্বারা ওলটপালট করার ক্ষমতা বর্ণনা উদ্দেশ্য। অন্তরসমূহ আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তিনি যেভাবে চান, তা পরিবর্তন করেন। (আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. থেকে) বর্ণিত হয়েছে,
الْحَجَرُ الْأَسْوَدُ يَمِينُ اللَّهِ فِي الْأَرْضِ ، فَمَنْ صَافَحَهُ وَقَبَّلَهُ فَكَأَنَّمَا صَافَحَ اللهَ وَقَبَّلَ يَمِينَهُ
হাজরে আসওয়াদ পৃথিবীতে আল্লাহর ডান হাত। যে তার সঙ্গে মুসাফাহা করল এবং তাকে চুমু দিলো, সে যেন আল্লাহর সঙ্গে মুসাফাহা করল ও তাঁর ডান হাতে চুমু দিলো।
সর্বসম্মতিক্রমে এখানে বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়; বরং রূপক অর্থ উদ্দেশ্য। কুরআন মাজিদে এসেছে,
﴿إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ ﴾
নিশ্চয়ই যারা আপনাকে বায়আত দিচ্ছে, তারা তো আল্লাহকে বায়আত দিচ্ছে। [সুরা ফাতহ (৪৮) : ১০]
এখানেও সর্বসম্মতিক্রমে রূপক অর্থ উদ্দেশ্য। (নাউজুবিল্লাহ)-এর অর্থ এটা নয় যে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল উভয়ে এক ও অভিন্ন সত্তা। বিষয়টি এভাবেও বোঝা যেতে পারে- 'আরশের ওপর ইসতিওয়া করা' দ্বারা বাহ্যিক ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অর্থ উদ্দেশ্য নয় যে, তিনি আরশের ওপর সমাসীন; বরং এর দ্বারা আল্লাহর সুউচ্চ মর্যাদা এবং সমুন্নত মহত্ত্ব বর্ণনা করা উদ্দেশ্য। যেমন, তিনি বলেন,
رَفِيعُ الدَّرَجَتِ ذُو الْعَرْشِ
তিনি ইচ্ছা করেছেন, রাসুল -এর হাত বায়আতকারীদের হাতের উপর থাকবে। আর সেটাই আল্লাহর হাত। কারণ, আল্লাহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং শরীরের আকৃতি থেকে মুক্ত।
তিনি প্রথমাংশে সঠিক উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন; কিন্তু পরের অংশে আল্লাহকে নিরাকার সাব্যস্ত করেছেন।
শায়খ মুজাফফর এখানে প্রথমে আল্লামা জামাখশারি রাহ.-এর একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে এরপর সেটাকে দু-ভাগ করেন। প্রথম ভাগকে সঠিক এবং দ্বিতীয় ভাগকে ভুল বলে আখ্যায়িত করেন। প্রথম অংশ কী ছিল? 'তিনি ইচ্ছা করেছেন, রাসুল -এর হাত বায়আতকারীদের হাতগুলোর উপর থাকবে। আর সেটাই আল্লাহর হাত।' উদ্ধৃতিটা আরেকবার মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। 'আর সেটাই আল্লাহর হাত', অর্থাৎ রাসুল -এর হাতই আল্লাহর হাত-এটি সঠিক আকিদা! আর 'আল্লাহ তাআলা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং শরীরের আকৃতি থেকে মুক্ত'-এটি ভুল আকিদা! (নাউজুবিল্লাহ)।
প্রথম অংশকে সঠিক বলার অর্থ হলো, শায়খ হিন্দুয়ানি আকিদা হুলুলে বিশ্বাসী। হুলুল হলো আল্লাহর সত্তা অন্য কারও সত্তার মধ্যে অবতারিত হওয়া কিংবা অন্য কোনো সত্তা আল্লাহর সত্তার মধ্যে অবতারিত হয়ে যাওয়া। হিন্দুরা বিশ্বাস করে, প্রভু মানুষ, প্রাণী, গাছ, পাথরসহ সবকিছুর মধ্যে অবতারিত হন। তো শায়খও হিন্দুদের মতো আকিদা প্রচার করছেন যে, রাসুল -এর হাতই আল্লাহর হাত-এটাই উপরিউক্ত আয়াত দ্বারা আল্লাহর উদ্দেশ্য। আর এটাই সহিহ আকিদা। নাউজুবিল্লাহ। আর আল্লাহকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং দেহের গুণাগুণ থেকে মুক্ত ভাবা ভুল আকিদা।
শায়খ 'দেহের গুণাগুণ' শব্দটির অর্থ করেছেন 'দেহের আকৃতি'। অথচ এটাও শব্দের আক্ষরিক অর্থ নয়। শায়খ এতটাই দেহবাদে বিশ্বাসী যে, এই স্বীকৃত আকিদাটিকে তিনি ভুল বলে আখ্যায়িত করলেন। শুধু ভুলই নয়, আল্লাহর সত্তাকে নিরাকার সাব্যস্তকরণ বলে আখ্যায়িত করলেন। তার দৃষ্টিতে নিরাকার মনে করা মানে অস্তিত্বহীন বলে বিশ্বাস করা। তিনি তার ভ্রান্তির বেড়াজালে ইক্বামতে দ্বীন গ্রন্থে, পৃ. ১২১) তাবলিগ জামাআতের ভ্রান্তি আলোচনা প্রসঙ্গে লেখেন, 'তারা আল্লাহকে অস্তিত্বহীন নিরাকার মনে করে।'
নির্বিশেষে সকল ইমাম ও সালাফ বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও দেহের গুণাগুণ থেকে মুক্ত। কিন্তু সালাফি নামধারী এই দেহবাদীরা প্রচার করছে ঠিক এর উলটো। ইমাম তাহাবি রাহ. লেখেন,
وتعالى عن الحدود والغايات والأركان والأعضاء والأدوات
আর আল্লাহ সীমা-পরিধি থেকে ঊর্ধ্বে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও সাজ-সরঞ্জাম থেকে মুক্ত। [আকিদা তাহাবি: ৩৮]
অপরদিকে শায়খ আবদুর রাজ্জাক ইবনু ইউসুফ (হাদাহুল্লাহ) দেহবাদ ও অঙ্গবাদ প্রচার করে লেখেন, 'তিনটি বিষয়ের ওপর ইমান আনলে আল্লাহর প্রতি ইমান আনা হয়: (১) তাঁর দেহ ও শরীরগত অস্তিত্বের ওপর, (২) তাঁর গুণাবলির ওপর, (৩) তাঁর অধিকারের ওপর।' [কে বড় লাভবান: ১০]
'আল্লাহ হাসেন। হাসার মতো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাঁর রয়েছে, যা হাসার উপযোগী।' [প্রাগুক্ত]
তিনিই সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী, আরশের অধিপতি। [সুরা মুমিন/গাফির (৪০): ১৫]
একইভাবে যে হাদিসে আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে নুজুল করার (নেমে আসার) কথা বর্ণিত হয়েছে, (নাউজুবিল্লাহ) তা দ্বারা উদ্দেশ্য এটা নয় যে, তিনি কোনো দেহবান সত্তা, যা আরশ থেকে নেমে নিচের আকাশে আসে, বরং সেই বিশেষ সময়ে তাঁর রহমত অবতরণ করা বা রহমতের কোনো ফেরেশতা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসা উদ্দেশ্য।
উপরিউক্ত পুরো আলোচনার সারনির্যাস আমরা এক অনুচ্ছেদে তুলে ধরতে পারি। বিখ্যাত তাফসির ও হাদিস-বিশারদ আল্লামা আবদুল হক দেহলবি রাহ.-এর ভাষায়, 'আল্লাহর অস্তিত্ব ও অবস্থানের জন্য কোনো স্থানের প্রয়োজন নেই। কেননা, দেহ-কাঠামোবিশিষ্ট ও স্থানিক বস্তুর জন্যই কেবল অবস্থানের জায়গার প্রয়োজন হয়। মহান আল্লাহ দেহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। সুতরাং তিনি আকাশে থাকেন না, জমিনেও অবস্থান করেন না। পূর্ব-পশ্চিম কোথাও তিনি থাকেন না; বরং সমগ্র মহাবিশ্ব তাঁর কাছে অণু-পরমাণুতুল্য। সুতরাং তিনি এই ক্ষুদ্র সৃষ্টির মধ্যে কেন অবস্থান করবেন? তবে সৃষ্টির সবকিছুই আল্লাহর সামনে পূর্ণ উদ্ভাসিত। কোনো কিছুই তাঁর থেকে সুপ্ত বা অজ্ঞাত নয়। সব স্থান ও জায়গা আল্লাহর কাছে সমান।
কখন তাওয়িল করা যাবে
তিন অবস্থায় তাওয়িল করা যাবে :
১. যখন তাওয়িলের পক্ষে সুস্পষ্ট আকলি দলিল (সুস্থ বিবেকপ্রসূত যৌক্তিক দলিল) থাকবে। যেমন: কিছু আয়াত ও হাদিসে আল্লাহর দিকে এমন কিছু শব্দ সম্পর্কিত করা হয়েছে, যা বাহ্যত সৃষ্টির দেহ-কাঠামোর বিভিন্ন অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ বা আকার-আকৃতি বোঝায়; অথচ তা আল্লাহর শানবিরোধী। এর দ্বারা আল্লাহর জন্য দেহ-কাঠামোবিশিষ্ট হওয়া আবশ্যক হয়, সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার মুখাপেক্ষিতা বোঝায়, যা তাঁর জন্য ত্রুটি অপরিহার্য করে। বিবেকের এই সুদৃঢ় দলিলের কারণে নুসুসে বর্ণিত সেসব শব্দের বাহ্যিক অর্থ ছেড়ে আরবিভাষার নীতি রক্ষা করে রূপক অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, আল্লাহর এ ধরনের নাম ও গুণের ক্ষেত্রে তাওয়িল করার ভিত্তি শুধু আকলি দলিল নয়; বরং এর পেছনে কুরআন-সুন্নাহর পর্যাপ্ত দলিলও রয়েছে।
২. যখন তাওয়িলের পক্ষে অকাট্য আয়াত ও হাদিসের নির্দেশনা থাকবে। যেমন, কোনো একটি নসের বাহ্যিক অর্থ অসংখ্য দ্ব্যর্থহীন নসের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক হচ্ছে, তখন এই বাহ্যিক বিরোধ ও সংঘর্ষ রোধ করতে তাওয়িল করা হবে।
৩. সুনিশ্চিত ইজমা। সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের কাছে ইজমাও একটি অকাট্য দলিল। সুতরাং কোনো নসের বাহ্যিক অর্থ যদি সুনিশ্চিত ও অকাট্য ইজমার বিরোধী হয়, তাহলে উভয়টির মধ্যে সমন্বয়-সাধনে তাওয়িল করা হবে।
আল্লামা ফারহাওয়ি রাহ. অল্প কথায় পুরো বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি লেখেন,
قوله: (ما لم يصرف عنها دليل قطعي من برهان عقلي أو إجماع أو نص قاطع.
'তাওয়িলের জন্য অকাট্য দলিল থাকা জরুরি। আর তা হচ্ছে, (ক) সুস্পষ্ট আকলি দলিল, (খ) ইজমা, (গ) অকাট্য নস।
ইমাম আমিদি রাহ. লেখেন,
وَأَنْ يَكُونَ الدَّلِيلُ الصَّارِفُ لِلَّفْظِ عَنْ مَدْلُولِهِ الظَّاهِرِ رَاجِحًا عَلَى ظُهُورِ اللَّفْظِ فِي مَدْلُولِهِ لِيَتَحَقَّقَ صَرْفُهُ عَنْهُ إِلَى غَيْرِهِ، وَإِلَّا فَبِتَقْدِيرِ أَنْ يَكُونَ مَرْجُوحًا لَا يَكُونُ صَارِفًا وَلَا مَعْمُولًا بِهِ اتَّفَاقًا، وَإِنْ كَانَ مُسَاوِيًّا لِظُهُورِ اللَّفْظِ فِي الدَّلَالَةِ مِنْ غَيْرِ تَرْجِيحٍ، فَغَايَتُهُ إِيجَابُ التَّرَدُّدِ بَيْنَ الاحْتِمَالَيْنِ عَلَى السَّوِيَّةِ، وَلَا يَكُونُ ذَلِكَ تَأْوِيلًا غَيْرَ أَنَّهُ يُكْتَفَى بِذَلِكَ مِنَ الْمُعْتَرِضِ إِذَا كَانَ قَصْدُهُ إِيقَافَ دَلَالَةِ الْمُسْتَدِلَّ، وَلَا يُكْتَفَى بِهِ مِنَ الْمُسْتَدِلُّ دُونَ ظُهُورِهِ، وَعَلَى حَسَبِ قُوَّةِ الظُّهُورِ وَضَعْفِهِ وَتَوَسُّطِهِ يَجِبُ أَنْ يَكُونَ التَّأْوِيلُ.
অর্থাৎ, 'তাওয়িল সঠিক হতে শর্ত হচ্ছে, তাওয়িলের দাবিকারী দলিল সেই দলিলের তুলনায় শক্তিশালী হবে, যা বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নেওয়ার দাবি করে, যাতে বাহ্যিক অর্থ ছেড়ে অন্য অর্থ নেওয়া সঠিক হয়। অন্যথায় তাওয়িল সঠিক হবে না। আর যদি উভয় সম্ভাবনা বরাবর হয়, তাহলে সর্বোচ্চ এ কথা বলার সুযোগ রয়েছে যে, উভয় সম্ভাবনাকেই আমলে নেওয়া যায়। এটাকে তাওয়িল বলা হয় না।...'
২. তাওয়িলকারী যোগ্য হওয়া
নুসুসের অর্থের ক্ষেত্রে যে কারোরই তাওয়িল করার সুযোগ নেই। একমাত্র যোগ্যদের জন্যই তাওয়িল করার বৈধতা রয়েছে। ইমাম আমিদি রাহ. লেখেন,
وَشُرُوطُهُ أَنْ يَكُونَ النَّاظِرُ الْمُتَأَوَّلُ أَهْلًا لِذَلِكَ
'তাওয়িলের অন্যতম শর্ত হলো, তাওয়িলকারী গবেষক তাওয়িল করার যোগ্য হওয়া।'
৩. শব্দের ভেতরে তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকা
নুসুসের শব্দের ভেতরে বাহ্যিক অর্থ ছেড়ে যে ভিন্ন অর্থ নেওয়া হচ্ছে, তার সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকতে হবে। সুতরাং 'পৃথিবী' বলে 'আকাশ' উদ্দেশ্য নেওয়ার সুযোগ নেই। ইমাম আমিদি রাহ. লেখেন,
وَأَنْ يَكُونَ اللَّفْظُ قَابِلًا لِتَأْوِيلِ بِأَنْ يَكُونَ اللَّفْظُ ظَاهِرًا فِيمَا صُرِفَ عَنْهُ مُحْتَمِلًا لِمَا صُرِفَ إِلَيْهِ
'তাওয়িলের আরেকটি শর্ত হচ্ছে, শব্দ এভাবে তাওয়িল গ্রহণকারী হবে যে, তা বাহ্যিক অর্থে প্রকাশ্য হবে এবং ব্যাখ্যাকৃত অর্থেরও সম্ভাবনা রাখবে。

টিকাঃ
১৮০ এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন—আল্লামা ইদরিস কান্ধলবি রাহ. প্রণীত এবং আলী হাসান উসামা অনূদিত ইসলামি আকিদা।
*** ইমাম আবু হানিফা রাহ. লেখেন, لو كان في مكان محتاجا للجلوس والقرار فقبل خلق العرش أين كان الله তিনি যদি কোনো স্থানে থাকতেন, বসা ও অবস্থান গ্রহণ করার দিকে মুখাপেক্ষী হতেন, তাহলে আরশ সৃষ্টির আগে আল্লাহ কোথায় ছিলেন? [আল-ফিকহুল আবসাত]
আল্লাহ হলেন স্রষ্টা; আরশ হচ্ছে সৃষ্টি। আল্লাহ হচ্ছেন অনাদি; আরশের আদি ও সূচনা আছে। আল্লাহ নিত্য; আরশ অনিত্য। আল্লাহ সীমা-পরিসীমার বন্ধন থেকে মুক্ত; আরশ সীমা-পরিসীমার বন্ধনযুক্ত। আল্লাহ অবিনশ্বর; আরশ নশ্বর। আল্লাহ দেহ-কাঠামো থেকে পবিত্র; আরশ দেহ- কাঠামোবিশিষ্ট। আল্লাহ স্থান ও কালের বন্ধনমুক্ত; আরশ স্থান ও কালের বন্ধনযুক্ত। তাহলে আরশ কীভাবে আল্লাহর আসন হয়? আল্লাহর তো কোনো দেহই নেই; তাহলে আরশের ওপর তিনি কীভাবে সমাসীন ও উপবিষ্ট হন?
যে সময়ে আরশ ছিল না, তখনো আল্লাহ ছিলেন। তখন তিনি যেমন ছিলেন, এখনো তেমন আছেন। আরশ সৃষ্টির পরে তাঁর অবস্থার মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কারণ, আল্লাহর সব গুণও তাঁর সত্তার মতো অপরিবর্তনশীল। এমন না যে, আরশ সৃষ্টির আগে তাঁর এক গুণ ছিল; আর আরশ সৃষ্টির পরে তাঁর সেই গুণে পরিবর্তন এসেছে। ইমাম আবু হানিফা রাহ. বলেন, وصفاته كلها في الأزل بخلاف صفات المخلوقين আল্লাহর সব গুণ অনাদিকাল থেকেই রয়েছে; সৃষ্টির গুণের চেয়ে ব্যতিক্রম। [আল-উসুলুল মুনিফা]
ইমাম আবু হানিফা রাহ. বলেন, كان الله ولا مكان، كان قبل أن يخلق الخلق كان ولم يكن أين ولا خلق ولا شيء وهو خالق كل شيء যখন কোনো স্থানই ছিল না, তখনো আল্লাহ ছিলেন। মাখলুককে (সৃষ্টিকে) সৃষ্টির পূর্বে তিনি ছিলেন। তিনি তখনো ছিলেন, যখন 'কোথায়' বলার মতো জায়গা ছিল না, কোনো সৃষ্টি ছিল না এবং কোনো বস্তুই ছিল না। তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা। [আল-ফিকহুল আবসাত: ৫৭, আল্লামা জাহিদ ইবনুল হাসান কাউসারি রহ.-এর তালিক ও তাহকিককৃত]
ইমাম আবু হানিফা রাহ. বলেন, وليس قرب الله تعالى ولا بعده من طريق المسافة وقصرها ولكن على معنى الكرامة والهوان. والمطيع قريب منه بلا كيف، والعاصي بعيد عنه بلا كيف. (সৃষ্টি থেকে) আল্লাহর নৈকট্য ও দূরত্ব আয়তনের দৈর্ঘ্য ও সংক্ষিপ্ততার বিচারে নয়; বরং তা সম্মান ও তুচ্ছতার বিচারে। আনুগত্যকারী কোনো ধরন ছাড়া আল্লাহর নিকটবর্তী এবং পাপী কোনো ধরন ছাড়া আল্লাহ থেকে দূরবর্তী। [আল-উসুলুল মুনিফা]
১৮৬ আল্লাহ আছেন আরশের ওপরে। এই ওপরে থাকার কী অর্থ? 'স্থানিকভাবে ওপরে' বলার সুযোগ নেই। কারণ, আল্লাহ সর্বপ্রকার স্থান থেকে মুক্ত। তাহলে প্রথমে নিশ্চিতভাবে 'ওপরে' বলার দ্বারা যে স্থানিক উচ্চতা উদ্দেশ্য নয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, এটাই 'তানজিহ' তথা আল্লাহকে সৃষ্টির সাদৃশ্য ও সংমিশ্রণ ইত্যাদি থেকে মুক্ত ঘোষণা করার দাবি। তাহলে এর অর্থ কী? একদল বলবে, আমরা জানি না; এর প্রকৃত অর্থ আমরা আল্লাহর ইলমেই ন্যস্ত করছি। প্রথমে 'তানজিহ' করে যারা এ কথা বলবে, নিঃসন্দেহে তারা হক। আর কেউ বলবে, এর দ্বারা আল্লাহর মর্যাদাগত উচ্চতা বোঝানো উদ্দেশ্য। কারণ, আল্লাহ সুউচ্চ, সমুন্নত। আরশ সৃষ্টির পূর্ব থেকেই তিনি সুউচ্চ ও সমুন্নত। যেহেতু
*আকায়িদুল ইসলাম: ৩২।
১৮৬ সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩৮৩৪।
১৮৭ আহলে হাদিস শায়খ মুজাফফর বিন মুহসিন (হাদাহুল্লাহ) তার ভ্রান্ত আক্বীদা বনাম সঠিক আক্বীদা গ্রন্থে (পৃ. ৩৫) লেখেন, জামাখশারি (৪৬৭-৫৩৮ হিজরি) সুরা ফাতহের ১০ নং আয়াতের অর্থ করেছেন এভাবে-
يريد أن يد رسول الله التي تعلو أيدى المبايعين: هي يد الله، والله تعالى منزه عن الجوارح وعن صفات الأجسام.
১৯ নিবরাস: ৩৩৭।
*আল-ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম : ৩/৫৪।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 তাকফিরের ক্ষেত্রে তাওয়িল বিবেচনার গুরুত্ব

📄 তাকফিরের ক্ষেত্রে তাওয়িল বিবেচনার গুরুত্ব


তাকফিরের ক্ষেত্রে তাওয়িল বিবেচনার গুরুত্ব অপরিসীম। সাহাবাযুগ থেকে বর্তমান শতাব্দী পর্যন্ত ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে এমন অসংখ্য ফিরকার আবির্ভাব হয়েছে, যারা ইসলামের অকাট্য অনেক বিষয়ের ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে; কিন্তু উম্মাহ তাদের তাকফির করেনি। এর একমাত্র কারণ হলো, তাদের তাওয়িল ছিল। ইমাম ইবনু কুদামা রাহ. লেখেন,
وَقَدْ عُرِفَ مِنْ مَذْهَبِ الْخَوَارِجِ تَكْفِيرُ كَثِيرٍ مِنْ الصَّحَابَةِ، وَمَنْ بَعْدَهُمْ، وَاسْتِحْلَالُ دِمَائِهِمْ، وَأَمْوَالِهِمْ، وَاعْتِقَادُهُمْ التَّقَرُّبَ بِقَتْلِهِمْ إِلَى رَبِّهِمْ، وَمَعَ هَذَا لَمْ يَحْكُمُ الْفُقَهَاءُ بِكُفْرِهِمْ : لِتَأْوِيلِهِمْ. وَكَذَلِكَ يُخَرَّجُ فِي كُلِّ مُحَرَّمٍ اسْتُحِلَّ بِتَأْوِيلٍ مِثْلِ هَذَا.
'খারেজিদের প্রসিদ্ধ মাজহাব হলো, তারা অনেক সাহাবি ও তৎপরবর্তী মনীষীকে কাফির বলে। তাঁদের রক্ত ও সম্পদকে হালাল মনে করে। তাদের বিশ্বাস হলো, সাহাবিদের হত্যা করলে তারা রবের নৈকট্য অর্জন করতে পারবে। এতৎসত্ত্বেও ফকিহগণ তাদের কাফির হওয়ার সিদ্ধান্ত আরোপ করেননি। কারণ, তাদের তাওয়িল ছিল। প্রত্যেক এমন হারাম কাজ, যা এ ধরনের তাওয়িলের ভিত্তিতে হালাল মনে করা হয়েছে, তার ক্ষেত্রে এমন বিধানই আরোপিত হবে।
হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানি রাহ. বলেন,
قَالَ الْعُلَمَاءُ كُلُّ مُتَأَوَّلِ مَعْذُورٌ بِتَأْوِيلِهِ لَيْسَ بِآئِم إِذَا كَانَ تَأْوِيلُهُ سَائِعًا فِي لِسَانِ الْعَرَبِ وَكَانَ لَهُ وَجْهُ فِي الْعِلْمِ
'আলিমগণ বলেছেন, প্রত্যেক তাওয়িলকারী মাজুর; পাপী নয়। তবে শর্ত হলো, তার তাওয়িল আরবিভাষার রীতি অনুসারে চলনসই হতে হবে এবং এর কোনো ইলমি ভিত্তি থাকতে হবে。
১. তাওয়িল-অস্বীকার নয়
ইমাম গাজালি রাহ. এ ব্যাপারে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থই রচনা করেছেন, যেখানে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন—তাওয়িল, অস্বীকার নয়; বরং এটা সত্যায়নের একটি পদ্ধতিমাত্র। তিনি প্রথমে লিখেছেন, ইমান হচ্ছে সত্যায়নের নাম; আর সত্যায়নের পদ্ধতি হচ্ছে পাঁচটি। এরপর লেখেন,
اعلم أن كل من نزل قولاً من أقوال صاحب الشرع على درجة من هذه الدرجات فهو من المصدقين، وإنما التكذيب أن ينفي جميع هذه المعاني، ويزعم أن ما قاله لا معنى له وإنما هو مكذب محض، وغرضه فيما قale التلبيس، أو مصلحة الدنيا، وذلك هو الكفر المحض والزندقة، ولا يلزم الكفر للمؤولين ماداموا يلازمون قانون التأويل
'জেনে রেখো, যে ব্যক্তি শরিয়ত-প্রণেতার কোনো কথাকে এই পাঁচ পদ্ধতির কোনো পদ্ধতিতে রাখবে, সে সত্যায়নকারীদের অন্তর্ভুক্ত। অস্বীকার হলো এর সব পদ্ধতি নাকচ করে এই দাবি করা যে, এগুলোর কোনো অর্থই নেই; বরং স্রেফ মিথ্যা। এ কথার দ্বারা তার উদ্দেশ্য হচ্ছে, সংশয় সৃষ্টি অথবা দুনিয়ার কোনো কল্যাণ অর্জন করা। এটা স্পষ্ট কুফর এবং ইলহাদ।'
মোটকথা, তাওয়িলকারীরা যতক্ষণ তাওয়িলের নীতি রক্ষা করবে, তাদের জন্য কুফর অপরিহার্য হবে না।
আল্লামা আবুল বাকা কাফাওয়ي হানাফি রাহ. লেখেন,
وَمُخْتَارُ جُمْهُورِ أَهْلِ السُنَّةِ مِنْهُمَا عَدَمُ إِكْفَارِ أَهْلِ السُنَّةِ مِنَ الْمُبْتَدِعَةِ الْمُؤَوِّلَةِ فِي غَيْرِ الضَّرُورِيَّةِ لِكَوْنِ التَّأْوِيلِ شُبْهَةً، كَمَا فِي خِزَانَةِ « الجِرْجَانِي، وَ « المُحِيط « البرهاني، و أَحْكَامُ « الرَّازِي، وَرَوَاهُ الْكَرْخِي وَالْحَاكِمُ الشَّهيدُ عَنِ الإِمَامِ أَبِي حَنِيفَةَ وَالْجُرْجَانِي عَنِ الحسن بن زياد وشارح ( المواقف والمقاصد ) والآمدي عن الشافعي والأشعري لا مُطلقا
'সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলুস সুন্নাহর অভিমত হলো, যে-সকল বিদআতপন্থি জরুরিয়াতে দীন ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে তাওয়িল করে, তাদের তাকফির করা হবে না। কারণ, তাওয়িল সন্দেহ সৃষ্টি করে। (আর সন্দেহের ভিত্তিতে তাকফির করা যায় না) অসংখ্য গ্রন্থে এমনটি বর্ণিত হয়েছে。
উপরিউক্ত উদ্ধৃতি থেকে এ বিষয়টিও বোঝা গেল যে, জরুরিয়াতে দীনের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার তাওয়িল গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং কেউ যদি জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত বিষয়ে তাওয়িল করে, তবে তা অস্বীকার হিসেবে বিবেচিত হবে। যেমন, আল্লাহ বলেছেন,
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّنَ وَكَانَ اللهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا
মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন। তিনি তো আল্লাহর রাসুল এবং সর্বশেষ নবি। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। [সুরা আহজাব (৩৩) : ৪০]
এই আয়াতে রাসুল -কে সর্বশেষ নবি সাব্যস্ত করা হয়েছে। সুতরাং তাঁর পর আর কোনো নবি আসবেন না। এ বিষয়টি জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত। এখন কেউ যদি কাদিয়ানিদের মতো এটিকে এভাবে তাওয়িল করে যে, রাসুলের পরে মূল নবি না এলেও জিল্লি ও বুরুজি নবি (ছায়ানবি) আসতে পারে, তাহলে সে সুনিশ্চিতভাবে কাফির। যেখানে বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা দুরূহ, শুধু সে ক্ষেত্রেই তাওয়িল করা যায়। এখানে তো বিষয়টি এমন নয়। উপরন্তু এর বাহ্যিক অর্থের ব্যাপারে উম্মাহর ইজমা রয়েছে। শুধু আলিমরাই নন; বরং সাধারণ মানুষও এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে অবগত। সুতরাং বিষয়টি অস্বীকার বা এর ভিন্ন তাওয়িল করা উভয়টিই বরাবর (অর্থাৎ কুফর)।
২. ইমাম আবু হানিফার তাকফিরের ফাতওয়াসংখ্যা
কাজি কামালুদ্দিন বায়াজি রাহ. তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ইশারাতুল মারামে লেখেন, ইমাম আবু হানিফা রাহ. মোট ২৩টি মাসআলায় কুফরের ফাতওয়া দিয়েছেন, যার মধ্যে ৬টি মাসআলা এমন, যাতে সরাসরি আল্লাহর দিকে কোনো ত্রুটি সম্পর্কিত করা হয়েছে। ১৬টি মাসআলা এমন, যাতে জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত কোনো বিষয় অস্বীকার করা হয়েছে। আর ১টি বিষয় ছিল এমন, যাতে জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের তাওয়িল করা হয়েছে。
এর দ্বারা বোঝা গেল, জরুরিয়াতে দীনের মধ্যে তাওয়িল কোনো ওজর নয় এবং এটি তাকফিরের প্রতিবন্ধকও নয়।

টিকাঃ
১১৯১ আল-মুগনি: ৯/১২১।
১১৯২ ফাতহুল বারি: ১২/৩০৪।
১৯৩ ফায়সালুত তাফরিকা বাইনাল ইসলামي ওয়াজ জানদাকা: ৪১।
১৯৪ আল-কুল্লিয়াত: ৭৬৬।
১৯০ ইশারাতুল মারাম: ৫১।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 জরুরিয়াতে দীন অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের তাওয়িল কুফর কেন

📄 জরুরিয়াতে দীন অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের তাওয়িল কুফর কেন


জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর তাওয়িল কুফর হওয়ার দুটি কারণ রয়েছে:
ক. শরিয়া কর্তৃক সে বিষয়টি বিধিবদ্ধ হওয়া।
খ. সে বিধানের স্বীকৃত স্বরূপ ও তত্ত্বকথা সর্বজনবিদিত হওয়া।
উভয় বিষয়ই মুতাওয়াতির হওয়ার কারণে অকাট্য ও সুনিশ্চিত। আলিম এবং সাধারণ জনতা সবার মধ্যেই সুপ্রসিদ্ধ। সবাই জানে, অমুক বিধান শরিয়া দ্বারা সাব্যস্ত এবং সেই বিধানের স্বরূপ হচ্ছে এরূপ। এখন কেউ যদি এর ভিন্ন ব্যাখ্যা (তাওয়িল) দাঁড় করায়, তাহলে সে প্রকারান্তরে মুতাওয়াতিরভাবে চলে আসা এই বিধানের স্বরূপ ও তত্ত্বকথাকে ভুল বলে আখ্যায়িত করল। বলা বাহুল্য, কোনো মুতাওয়াতির ও অকাট্য বিষয়ের স্বরূপ ও তত্ত্বকথা পরিবর্তন করা মূলত অস্বীকারের নামান্তর, যা নিঃসন্দেহে কুফর। আল্লামা তাফতাজানি রাহ. লেখেন,
(والنصوص) من الكتاب والسنة تحمل على ظواهرها) ما لم يصرف عنها دليل قطعي ... فالعدول عنها) أي عن الظواهر إلى معان يدعيها أهل الباطن.... (إلحاد)
(والنصوص) من الكتاب والسنة تحمل على ظواهرها) ما لم يصرف عنها دليل قطعي ... فالعدول عنها) أي عن الظواهر إلى معان يدعيها أهل الباطن.... (إلحاد)
آي ميل وعدول عن الإسلام، واتصال واتصاف بكفر، لكونه تكذيبا للنبي ﷺ فيما علم مجيئه به بالضرورة.
'কুরআন এবং সুন্নাহর নুসুসকে তার বাহ্যিক অর্থেই প্রয়োগ করা হবে, যতক্ষণ-না কোনো অকাট্য দলিল তাকে বাহ্যিক অর্থ থেকে ফেরাবে। সুতরাং বাহ্যিক অর্থ ছেড়ে শব্দকে এমন অর্থের দিকে ফেরানো, যা বাতিনিরা দাবি করে-তা ইলহাদ। ইলহাদ হচ্ছে, ইসলাম থেকে সরে যাওয়া এবং কুফরের সঙ্গে সংযুক্ত ও তার গুণে গুণান্বিত হওয়া। কারণ, এর দ্বারা নবি -কে এমন ব্যাপারে অস্বীকার করা হয়, যা নিয়ে তাঁর আগমন আবশ্যিকভাবে জানা গেছে।
এর দ্বারা বোঝা গেল, কোনো নসের একটি অর্থ যদি সুনির্দিষ্ট হয়, তবে গ্রহণযোগ্য কোনো দলিল ছাড়া সেই অর্থ পরিত্যাগ করে ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করা প্রকারান্তরে তা অস্বীকারের নামান্তর। জরুরিয়াতে দীনের স্বরূপ ও তত্ত্বকথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সর্বস্তরের দীনদার শ্রেণির মধ্যে অবিচ্ছিন্নতার সঙ্গে চলে আসার কারণে সর্বসম্মতভাবে অকাট্য হয়। যার কারণে এর ভিন্ন ব্যাখ্যা করা এবং মুতাওয়াতির স্বরূপ ও তত্ত্বকে বিকৃত করে ফেলা মূলত সেই বিধানের প্রতি সত্যায়ন না করারই নামান্তর।
আল্লামা কাজি বায়েজি রাহ. লেখেন,
فإن جمهور أهل السنة لم يكفروا أهل القبلة من المبتدعة المؤولة في غير الضرورة دون الضروريات؛ إذ المؤول في الضروريات الدين ليس كالمؤول في الأصول اليقينية؛ لأن من النصوص ما علم قطعاً من الدين أنه على ظاهره، فتأويله تكذيب للنبي ﷺ
'সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলুস সুন্নাহ বিদআতপন্থি আহলে কিবলাকে তাকফির করেননি, যারা জরুরিয়াতে দীন ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে তাওয়িল করে। জরুরিয়াতে দীনের মধ্যে তাওয়িল করা অন্যান্য সুনিশ্চিত মূলনীতির মধ্যে তাওয়িল করার মতো নয়। কেননা, কিছু নুসুস এমন রয়েছে, যার ব্যাপারে দ্ব্যর্থহীনভাবে জানা রয়েছে যে, তা বাহ্যিক অর্থের ওপর প্রযোজ্য। সুতরাং তার তাওয়িল করা নবি -কে অস্বীকারের নামান্তর।
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমিরি রাহ. লেখেন,
أن التصرف في ضروريات الدين، والتأول فيها، وتحويلها إلى غير ما كانت عليه، وإخراجها عن صورة ما تواترت عليه كفر، فإن ما تواتر لفظاً أو معنى، وكان مكسوف المراد, فقد تواتر مراده، فتأويله رد للشريعة القطعية، وهو كفر بواح، وإن لم يكذب صاحب الشريعة، وإنه ليس فيه إلا الاستتابة.
‘জরুরিয়াতে দীনের মধ্যে হস্তক্ষেপ করা, এর মধ্যে তাওয়িল করা, মুতাওয়াতিরভাবে চলে আসা এর স্বরূপ থেকে বের করে ভিন্ন রূপে পরিবর্তিত করা নিশ্চিতভাবে কুফর। কারণ, যা শাব্দিক বা অর্থগতভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পরম্পরায় মুতাওয়াতিরভাবে চলে এসেছে এবং যার অর্থও সুস্পষ্ট, তার উদ্দিষ্ট মর্মও মুতাওয়াতির। সুতরাং এর ভিন্ন ব্যাখ্যা করা অকাট্য শরিয়তকে প্রত্যাখ্যান করার নামান্তর, যা সুস্পষ্ট কুফর। যদিও সে প্রত্যক্ষভাবে শরিয়ত-প্রণেতাকে অস্বীকার করেনি। এ অপরাধের একমাত্র শাস্তি হলো, তাকে আবশ্যিকভাবে তাওবা করতে বলা হবে’।

টিকাঃ
১৯৬ শারহুল আকায়িদ : ৯৬।
১৯৭ ইশারাতুল মারাম: ৫১।
১৯৮ ইকফারুল মুলহিদিন: ১২৮।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 তাওয়িল বিবেচ্য হতে একটি অপরিহার্য শর্ত

📄 তাওয়িল বিবেচ্য হতে একটি অপরিহার্য শর্ত


তাওয়িল বিবেচ্য হতে একটি অপরিহার্য শর্ত হলো, সেই ব্যক্তির তাওয়িলের ইচ্ছা থাকতে হবে। কেউ যদি দীনের অকাট্য ও সুনিশ্চিত কোনো বিষয় অস্বীকার করে, তবে এর দাবি হচ্ছে, তাকে তৎক্ষণাৎ কাফির বলে ফাতওয়া দেওয়া হবে। কিন্তু এখানে একটি সংশয় থেকে যায়- সেই ব্যক্তি কি আদতেই বিধানটি অস্বীকার করেছে, নাকি এর ভিন্ন কোনো তাওয়িল করেছে? সে ক্ষেত্রে সতর্কতার দাবি হচ্ছে, তাকে তাকফির না করা। এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত অস্বীকারকারী তাওয়িলের ভিত্তিতে এমনটি করেছে বলে প্রমাণিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের থেকে এটাকে তাওয়িল হিসেবে ধরা হবে না; বরং অস্বীকার হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমিরি রাহ. লেখেন,
فعلم أن التأويل كما لا يقبل في ضروريات الدين كذلك لا يقبل في ما يظهر أنه احتيال في كلام الناس، وتمحل غير واقعي، وقد كان الأئمة رحمهم الله يعتبرون إرادة التأويل وقصده، فجاء المتسللون فاعتبروا إيجاده، ففي "جامع الفصولين"، وعن مالك رحمه الله أنه سئل عن من أراد أن يضرب أحداً؟ فقيل له: ألا تخاف الله تعالى؟ فقال: لا، قال: لا يكفر، إذ يمكنه أن يقول: التقوى فيما أفعله له، ولو قيل له ذلك في معصيته، فقال: لا أخافه يكفر، إذ لا يمكنه ذلك التأويل اهـ ونحوه في "الخانية" في قصة شداد بن حكيم مع زوجته، وذكرها في طبقات الحنفية من شداد عن محمد رحمه الله أيضاً، وهو أولى بالاعتبار مما ذكره من اعتبار مجرد الامكان، فإنه لا حجر فيه، وقالوا في الإكراه على كلمة الكفر: إن خطر بباله التورية ولم يور كفر، فاعتبروا القصد وإرادة التأويل في حقه، وإلا فالتمحل لا يعجز عنه أحد.
'সুতরাং জানা গেল, জরুরিয়াতে দীনের ক্ষেত্রে যেভাবে তাওয়িল গৃহীত হয় না, একইভাবে সেই ক্ষেত্রেও তাওয়িল গৃহীত হয় না, যেখানে এটা প্রকাশিত যে, তা মানুষের কথার মধ্যে কৃত্রিমতা এবং অবাস্তব মতলব বের করার রূপ ধারণ করছে। ইমামগণ তাওয়িলের উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা থাকাকে বিবেচনায় নিতেন। পরবর্তী সময়ে অপরিপক্ক লোকেরা এসে তাওয়িলের উদ্ভাবনকে বিবেচনায় নিতে শুরু করল। (অর্থাৎ, তাওয়িলের সম্ভাবনা থাকলেও তারা তাকফির থেকে বিরত থাকতেন)
জামিউল ফুসুলাইন গ্রন্থে ইমাম মালিকের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে, তাঁকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, যে কাউকে মারতে ইচ্ছা করেছে। তখন তাকে বলা হলো, তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? সে বলল, না। ইমাম মালিক রাহ. বললেন, সে কাফির হবে না। কারণ, তার কথার এই ব্যাখ্যা হওয়া সম্ভব যে, উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে মারার মধ্যেই তাকওয়া রয়েছে। (হয়তো সে এমন কিছু করেছে, যার জন্য শরিয়তের দৃষ্টিতে সে শাস্তির উপযুক্ত) তবে কোনো গুনাহের ক্ষেত্রে যদি তাকে বলা হয়, তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? আর তখন সে বলে, না, আমি তাকে ভয় করি না। তবে সেই ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে। কারণ, এ ক্ষেত্রে সেই তাওয়িল সম্ভব নয়।... তাওয়িলের শুধু সম্ভাবনা থাকাই যথেষ্ট- ওই কথার চেয়ে এই মূলনীতিই বিবেচনার অধিক উপযুক্ত। কারণ, তাওয়িলের কোনো শেষ নেই। ফকিহগণ কুফরি কথার ওপর “ইকরাহ” (বাধ্য করা) অধ্যায়ে লিখেছেন, যদি তার অন্তরে তাওরিয়া (অন্য কিছু উদ্দেশ্য নেওয়া)-এর চিন্তা আসে, এরপরও সে তাওরিয়া না করে (কুফরি কথা বলে), তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে।'
সুতরাং এখানে দেখা যাচ্ছে, ফকিহগণ (শুধু সম্ভাবনা থাকাকেই যথেষ্ট মনে করেননি; বরং) এ ব্যাপারে তাওয়িলের উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা থাকাকে বিবেচনায় নিয়েছেন। কৃত্রিমতা করে তাওয়িল করতে চাইলে এটা তো কোনো জটিল ব্যাপার নয়। (সব ক্ষেত্রেই টেনেহিঁচড়ে এ ধরনের তাওয়িল করা সম্ভব; কিন্তু তা তাকফিরের প্রতিবন্ধক নয়।)

টিকাঃ
১৯৯ ইকফারুল মুলহিদিন: ৯০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00