📘 কুফর ও তাকফির > 📄 ব্যাখ্যা থাকা

📄 ব্যাখ্যা থাকা


যেকোনো ব্যাখ্যাই তাকফিরের প্রতিবন্ধক নয়। কিছু ব্যাখ্যা শরিয়া কর্তৃক অনুমোদিত আর কিছু ব্যাখ্যা অবৈধ। বাহ্যিক অর্থের বাইরে নুসুসের যদি এমন কোনো অর্থ নেওয়া হয়, যা কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে বিরোধপূর্ণ নয়; বরং শব্দের মধ্যেই এই অর্থ প্রদানের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তা অনুমোদিত তাওয়িল (ব্যাখ্যা)।
আর যদি এমন কোনো অর্থ নেওয়া হয়, যা কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং আরবিভাষারীতি অনুসারেও তা চলনসই নয়, তবে তা বর্জিত ও প্রত্যাখ্যাত হবে। আল্লামা সাইয়িদ শরিফ জুরজানি রাহ. লেখেন,
التأويل ... وفي الشرع: صرف اللفظ عن معناه الظاهر إلى معنى يحتمله، إذا كان المحتمل الذي يراه موافقا للكتاب والسنة
‘শরিয়তের পরিভাষায় তাওয়িল বলা হয় শব্দকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে এমন কোনো অর্থের দিকে ফেরানো, শব্দের ভেতরেই যার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শর্ত হলো, সেই সম্ভাব্য অর্থ কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
ইমাম আমিদি রাহ. (মৃত্যু : ৬৩১ হিজরি) লেখেন,
والحق في ذلك أن يقال: وأما التأويل المقبول الصحيح فهو حمل اللفظ على غير مدلوله الظاهر منه مع احتماله له بدليل يعضده.
'এ ব্যাপারে হক, বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য তাওয়িল হলো, শব্দকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে এমন অর্থে প্রয়োগ করা, শব্দের ভেতরে যার সম্ভাবনা রয়েছে এবং কোনো দলিল এ ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনাকে সুদৃঢ় করছে।
ইমাম ইবনু কুদামা রাহ. (মৃত্যু : ৬২০ হিজরি) তাওয়িলের পরিচয় দিতে গিয়ে লেখেন,
والتأويل صرف اللفظ عن الاحتمال الظاهر إلى احتمال مرجوح به لاعتضاده بدلیل یصیر به أغلب على الظن من المعنى الذي دل عليه الظاهر إلا أن الاحتمال يقرب تارة ويبعد أخرى وقد يكون الاحتمال بعيدا جدا فيحتاج إلى دليل في غاية القوة وقد يكون قريبا فيكفيه أدنى دليل وقد يتوسط بين الدرجتين فيحتاج دليلا متوسطا
'তাওয়িল হলো শব্দকে প্রকাশ্য সম্ভাবনা থেকে সরিয়ে কোনো অপ্রধান সম্ভাবনার দিকে ফেরানো। আর সেই অপ্রধান সম্ভাবনা কোনো দলিলের আলোকে শক্তিশালী হবে, যে দলিলের ভিত্তিতে শাব্দিক অর্থের তুলনায় তা ধারণার ওপর প্রবল হয়। তবে সম্ভাবনা কখনো নিকটবর্তী, কখনো দূরবর্তী এবং কখনো খুব বেশি দূরবর্তী হয়। সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শক্তিশালী দলিলের প্রয়োজন হয়। আর কখনো সেই সম্ভাবনা নিকটবর্তী হয়, তখন সাধারণ দলিলই এর জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। আর কখনো তা মাঝামাঝি পর্যায়ের হয়, তখন মাঝামাঝি পর্যায়ের দলিলের প্রয়োজন হয়।
ইমাম তুফি রাহ. (মৃত্যু : ৭১৬ হিজরি) লেখেন,
صرف اللفظ عن ظاهره لدليل يصير به المرجوح راجحا. فالظواهر الواردة في الكتاب والسنة في صفات البارئ جل جلاله، لنا أن نسكت عنها، ولنا أن نتكلم فيها. فإن سكتنا عنها قلنا: تمر كما جائت، كما نقل عن الإمام أحمد رضي الله عنه وسائر أعيان أئمة السلف، وإن تكلمنا فيها، قلنا: هي على ظواهرها من غير تحريف مالم يقم دليل يترجح عليها بالتأويل.
'শব্দকে এমন কোনো দলিলের কারণে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে দেওয়া, যার দ্বারা অপ্রধান সম্ভাবনা প্রাধান্যপ্রাপ্ত হয়। সুতরাং কুরআন-সুন্নাহে আল্লাহর গুণাবলির ব্যাপারে যেসব বাহ্যিক শব্দ এসেছে, সে ব্যাপারে আমাদের নীরব থাকা এবং কথা বলার সুযোগ রয়েছে। যদি আমরা নীরব থাকি, তাহলে বলব, শব্দগুলো যেভাবে এসেছে, সেভাবে রেখে দেওয়া হবে; যেমনটা ইমাম আহমাদ রাহ.-সহ সালাফের সকল বিশিষ্ট ইমাম থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর যদি কথা বলি, তাহলে আমরা বলব, শব্দগুলো কোনো প্রকার বিকৃতি ছাড়া তার বাহ্যিক অর্থে প্রযোজ্য হবে, যতক্ষণ-না এমন দলিল প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বাহ্যিক অর্থের ওপর তাওয়িলকে প্রাধান্য দেয়।'
ইমাম মারয়ি কারয়ي হাম্বলি রাহ.-ও (মৃত্যু: ১০৩৩ হিজরি) একই কথা লেখেন,
والتأويل هو أن يراد باللفظ ما يخالف ظاهره أو هو صرف اللفظ عن ظاهره المعنى آخر. وهو في القرآن كثير؛ ومن ذلك آيات الصفات المقدسة، وهي من الآيات المتشابهات.
'তাওয়িল হলো কোনো শব্দ দ্বারা এমন অর্থ উদ্দেশ্য নেওয়া, যা তার বাহ্যিক অর্থের বিপরীত অথবা তাওয়িল হলো, শব্দকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে অন্য কোনো অর্থের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া। কুরআনে তা প্রচুর রয়েছে। তন্মধ্যে আল্লাহর পবিত্র গুণাবলি-সংক্রান্ত আয়াতসমূহও অন্তর্ভুক্ত। আর সিফাতের এসব আয়াত মুতাশাবিহ (দ্ব্যর্থবোধক) আয়াতসমূহের অন্তর্ভুক্ত।'
আল্লামা ইবনুন নাজ্জার রাহ.-ও (মৃত্যু: ৯৭২ হিজরি) শারহুল কাওকাবিল মুনির গ্রন্থে একই কথা লিখেছেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আল্লাহর সিফাতে মুতাশাবিহাত বর্ণনার ক্ষেত্রে আশআরি ও মাতুরিদিরা যেই তাওয়িল গ্রহণ করেছে, তা হলো এই তাওয়িল। অন্যথায় তাও Lawfe ফাসিদ তথা ভুল তাওয়িল যেটা, তা তারা কখনোই গ্রহণ করেনি। সেগুলো গ্রহণ করেছে রাফিজিসহ অন্য গোমরাহ সম্প্রদায়। যেমন, সুরা রাহমানের ১৯ নম্বর আয়াতের 'বাহরাইন' (দুই সমুদ্র) শব্দের তাওয়িল তারা করেছে আলি ও ফাতিমা রা.। একই সুরার ২২ নম্বর আয়াতের 'আল-লু-লু ওয়াল মারজান' শব্দের তাওয়িল তারা করেছে হাসান ও হুসাইন রা.। সুরা বাকারার ২০৫ নম্বর আয়াতের নিন্দিত লোকটির তাওয়িল করেছে মুআবিয়া রা.। এ ধরনের মনগড়া তাওয়িলের ব্যাপারে ইমামগণ সর্বদা সতর্ক করে গেছেন। কিন্তু আশআরি-মাতুরিদিরা কিছু ক্ষেত্রে যে তাওয়িল করেছে, তা কখনোই এরকম নয়; বরং তা উল্লিখিত সংজ্ঞাসমূহে বিবৃত তাওয়িল। এ ধরনের তাওয়িল শুধু তারাই উদ্ভাবন করেননি; বরং সাহাবাযুগ থেকেই তা চলে আসছে। এর ওপর কেউ আপত্তি তুললে সেই আপত্তি সাহাবিদের গায়ে গিয়েও পড়বে।
ইমাম আমিদি রাহ. (মৃত্যু: ৬৩১ হিজরি) লেখেন,
وإذا عرف معنى التأويل فهو مقبول معمول به إذا تحقق بشروطه، ولم يزل علماء الأمصار في كل عصر من عهد الصحابة رضي الله عنهم إلى زمننا عاملين به من غير نكير.
'তাওয়িলের অর্থ যখন জানা হলো, (তখন এ কথাও জেনে রাখা প্রয়োজন যে,) যখন শর্ত বাস্তবায়িত হবে, তখন তাওয়িল গ্রহণযোগ্য ও আমলযোগ্য হবে। সাহাবাযুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত সর্বযুগে সব এলাকার আলিমরা কোনো ধরনের আপত্তি ছাড়া এর ওপর অব্যাহতভাবে আমল করে আসছেন।
তাওয়িলের উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে তিনটি বিষয় প্রতিভাত হলো :
১. শব্দকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে সম্ভাব্য অন্য কোনো অর্থে প্রয়োগ করার নাম তাওয়িল। সুতরাং কোনো শব্দের যদি মূল অর্থই একাধিক থাকে, তবে তার কোনো একটি গ্রহণ করাকে তাওয়িল বলা হবে না।
২. আরবিভাষার নিয়ম অনুসারে শব্দ থেকে সেই অর্থ গ্রহণের সুযোগ থাকতে হবে। সুতরাং কেউ যদি কোনো শব্দ থেকে এমন অর্থ গ্রহণ করে, যা আরবিভাষার নিয়মনীতি দ্বারা সমর্থিত নয়, তবে তা তাওয়িল নয়; বরং তাহরিফ (অপব্যাখ্যা)।
৩. শব্দের বাহ্যিক অর্থ ছেড়ে এই ভিন্ন অর্থ গ্রহণের পেছনে স্বতন্ত্র কোনো দলিল থাকতে হবে, যা এই সম্ভাবনাকে সুদৃঢ় করবে। যদি কোনো দলিল ছাড়া শুধু অনুমানের ভিত্তিতে কোনো শব্দের বাহ্যিক অর্থ ছেড়ে দূরবর্তী অর্থ গ্রহণ করা হয়, তবে তা ভুল ব্যাখ্যা।
আল্লামা তাফতাজানি রাহ. লেখেন,
لأن النقل خلاف الأصل، لا يصار إليه إلا بدليل.
'শব্দকে অন্য অর্থে স্থানান্তর করা স্বাভাবিক অবস্থার ব্যতিক্রম ব্যবহার। সুতরাং এর জন্য স্বতন্ত্র দলিলের প্রয়োজন।
(والنصوص) من الكتاب والسنة تحمل على ظواهرها) ما لم يصرف عنها دليل قطعي... (فالعدول عنها) أي عن الظواهر (إلى معان يدعيها أهل الباطن)... (إلحاد)
আয় মেইল ওয়াদুল আনিল ইসলাম, ওয়াত্তেসাফ বিকফর, লেকুনাহু তাকদিবান লিন্ নবী। ফিমা এলেম মাজিইহু বিদ্দোরুরা।
'কুরআন এবং সুন্নাহর নুসুসকে তার বাহ্যিক অর্থেই প্রয়োগ করা হবে, যতক্ষণ না কোনো অকাট্য দলিল তাকে বাহ্যিক অর্থ থেকে ফেরাবে। সুতরাং বাহ্যিক অর্থ ছেড়ে শব্দকে এমন অর্থের দিকে ফেরানো, যা বাতিনিরা দাবি করে-তা ইলহাদ। ইলহাদ হচ্ছে, ইসলাম থেকে সরে যাওয়া এবং কুফরের সঙ্গে সংযুক্ত ও তার গুণে গুণান্বিত হওয়া। কারণ, এর দ্বারা নবি -কে এমন ব্যাপারে অস্বীকার করা হয়, যা নিয়ে তাঁর আগমন আবশ্যিকভাবে জানা গেছে।
ইমাম গাজালি রাহ. লেখেন,
إنك إذا فتحت هذا الباب، وهو أن تريد باللفظ غير ما وضع اللفظ له ويدل عليه في التفاهم لم يكن لما تريد به حصر.
'তুমি যদি একবার এই দুয়ার উন্মুক্ত করে দাও যে, শব্দকে যেই অর্থের জন্য গঠন করা হয়েছে এবং পারস্পরিক বোধ-উপলব্ধিতে তা যে অর্থের প্রতি নির্দেশ করে, এর বাইরের ভিন্ন অর্থ উদ্দেশ্য নেবে, তাহলে তোমার চাওয়ার তো কোনো সীমা-পরিসীমা থাকবে না। (এর দ্বারা পুরো শরিয়াই নফসের অনুগামী এবং খেলতামাশার বস্তুতে পরিণত হবে।)'

টিকাঃ
১৭০ আত-তারিফাত: ৫০।
১৭৪ আল-ইহকাম: ৩/৫৯।
১৭৫ রাওজাতুন নাজির: ১৭৮।
১৭৬ শারহু মুখতাসারির রাওজা: ৫৬২।
১৭৭ আকাওয়িলুস সিকাত: ৪৮।
১৮ উদাহরণস্বরূপ দ্রষ্টব্য- আল-বুরহান: ২/১৫২।
১১৯ আল-ইহকাম: ৩/৬০।
১১০ শারহুল মাকাসিদ: ৩/৫২৪।
*১ শারহুল আকায়িদ: ৯৬।
*২ আল-ইকতিসাদ ফিল ইতিকাদ: ৩৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00