📄 অজ্ঞতা
শরিয়তের বিধান দু-ধরনের:
১. জরুরিয়াতে দীন তথা যুগ-পরম্পরায় অব্যাহতভাবে চলে আসা এমন সব অকাট্য বিধান, যা শরিয়তের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে যেকোনো শ্রেণির দীনদার ব্যক্তিমাত্রই জ্ঞান রাখে। এ ধরনের বিধান অস্বীকারের কারণে তাকফির করার ক্ষেত্রে অজ্ঞতা ওজর হিসেবে বিবেচিত হয় না।
২. এমন সব বিধান, যা প্রথম প্রকারের মতো এতটা প্রসিদ্ধ নয় এবং সকল দীনদার মুসলিম যার ব্যাপারে জানে না। এ ধরনের বিধান যদি কেউ অস্বীকার করে, তাহলে তৎক্ষণাৎ তার ওপর কুফরের ফাতওয়া আরোপ করা হবে না; বরং প্রথমে তাকে জানানো হবে, এটা শরিয়তের স্বীকৃত বিধান। এরপরও যদি সে তা প্রত্যাখ্যান করে এবং প্রত্যাখ্যাত বিষয়টা অকাট্য ও সুনিশ্চিতভাবে শরিয়তের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে তাকে তাকফির করা হবে।
ইমাম ইবনু নুজায়ম রাহ. লেখেন,
وفي آخر اليتيمة ظن الجهله أن ما فعله من المحظورات حلال له، فإن كان مما يعلم من দীলুন্নাবী ﷺ জরুরাতু কুফর, ওয়া ইল্লা ফালা।
'কেউ যদি অজ্ঞতার কারণে মনে করে, সে যে নিষিদ্ধ কাজ করেছে, তা তার জন্য হালাল। যদি সেই নিষিদ্ধ কাজ এমন হয়, যা নবি ﷺ-এর আনীত দীনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি আবশ্যিকভাবে বিদিত, তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। আর এমন না হলে কাফির হবে না।'
বলা বাহুল্য, উপরিউক্ত বিধান এমন ব্যক্তির ব্যাপারে প্রযোজ্য, যে মুসলিমসমাজে বাস করে। ফলে চেতনে বা অবচেতনে ইসলামের মৌলিক ও শাশ্বত বিধিবিধান সম্পর্কে তার অবগতি থাকে। সুতরাং কোনো মুসলিম যদি ঘটনাক্রমে মানবসমাজ থেকে দূরে কোনো জনমানবহীন প্রান্তরে আজন্ম অবস্থান করে, যেখানে কখনো দীনের দাওয়াত ও শিক্ষা পৌঁছায়নি; অথবা যদি কোনো দারুল হারবে বসবাস করে, যেখানে ইসলামের মৌলিক জ্ঞান ও সভ্যতা-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সহজসাধ্য কোনো ব্যবস্থা নেই, তবে এমন ব্যক্তির জরুরিয়াতে দীন সম্পর্কে অজ্ঞতাও তাকফিরের প্রতিবন্ধক তথা ওজর হিসেবে বিবেচ্য হবে। আল্লামা জুরজানি রাহ. লেখেন,
وقيد العلم ليخرج عنه المحرمات الصادرة عمن لم تبلغه دعوة نبي أو عمن هو قريب العهد بالإسلام
'(তাকফির করার জন্য অস্বীকৃত বিষয় সম্পর্কে) জ্ঞাত হওয়ার শর্ত এ জন্য আরোপ করা হয়েছে, যাতে এমন ব্যক্তি থেকে প্রকাশিত হারাম কাজ এ থেকে বেরিয়ে যায়, যার কাছে কোনো নবির দাওয়াত পৌঁছায়নি কিংবা যে নওমুসলিম। (অর্থাৎ, এমন ব্যক্তিকে তাকফির করা যাবে না।)
উপরিউক্ত আলোচনার ওপর পাঠকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, তাসদিক (সত্যায়ন) না করাই যেহেতু কুফর, সুতরাং এই ব্যক্তি কাফির বলে বিবেচিত হওয়াই তো যুক্তির দাবি। এর উত্তর হলো, কাউকে কাফির বলার দুই অর্থ হতে পারে: এক. পার্থিব বিবেচনায় কাফিরের বিধিবিধান প্রযোজ্য হওয়া। দুই. পারলৌকিক বিবেচনায় কাফিরের বিধান প্রযোজ্য হওয়া। আলোচ্য ব্যক্তিকে কাফির না বলার অর্থ হলো, পরকালে তার ওপর কাফিরের শাস্তি প্রযোজ্য হবে না। আল্লাহ বলেন,
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
আল্লাহ কারও ওপর তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব চাপান না। [সুরা বাকারা (২): ২৮৬]
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ
তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি। [সুরা হজ (২২) : ৭৮]
وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا
আমি কখনো কাউকে শাস্তি দিই না, যতক্ষণ-না (তার কাছে) কোনো রাসুল পাঠাই। [সুরা বনি ইসরাইল (১৭) : ১৫]
ইমাম তাবারি রাহ. এই আয়াতের তাফসিরে লেখেন,
وقوله وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا) يقول تعالى ذكره: وما كنا مهلكي قوم إلا بعد الإعذار إليهم بالرسل، وإقامة الحجة عليهم بالآيات التي تقطع عذرهم. كما حدثنا بشر، قال: ثنا يزيد، قال: ثنا سعيد، عن قتادة، قوله ﴿وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا : إن الله تبارك وتعالى ليس يعذب أحدا حتى يسبق إليه من الله خبر، أو يأتيه من الله بينة، وليس معذبا أحدا إلا بذنبه.
'আল্লাহ বলছেন, আমি কোনো সম্প্রদায়ের লোকদের ধ্বংস করি না, যতক্ষণ-না তাদের কাছে রাসুল পাঠানোর দ্বারা ওজর প্রদর্শনের পথ বন্ধ করি এবং তাদের ওপর এমন সব আয়াত অবতীর্ণ করার দ্বারা প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করি, যা তাদের ওজর নিঃশেষ করে দেয়। কাতাদা রাহ. বলেন, নিশ্চয়ই মহিমান্বিত আল্লাহ কাউকে শাস্তি দেন না, যতক্ষণ-না তার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সংবাদ আসে; কিংবা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ আসে। আল্লাহ কাউকে শুধু তার পাপের কারণেই শাস্তি দিয়ে থাকেন।
ইমাম শাতিবি রাহ. লেখেন,
عَدَمُ الْمُؤَاخَذَةِ قَبْلَ الْإِنْذَارِ، وَدَلَّ عَلَى ذَلِكَ إِخْبَارُهُ تَعَالَى عَنْ نَفْسِهِ بِقَوْلِهِ: ﴿وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا ؛ فَجَرَتْ عَادَتُهُ فِي خَلْقِهِ أَنَّهُ لَا يُؤَاخِذُ بِالْمُخَالَفَةِ إِلَّا بَعْدَ إِرْسَالِ الرُّسُلِ، فَإِذَا قَامَتِ الْحُجَّةُ عَلَيْهِمْ فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْ مِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرُ)
'আল্লাহর রীতি হলো, তিনি সতর্ক করার পূর্বে পাকড়াও করেন না। এর প্রমাণ হলো, আল্লাহ নিজের ব্যাপারে কুরআনে বলেন, “আমি কখনো কাউকে শাস্তি দিই না, যতক্ষণ-না (তার কাছে) কোনো রাসুল পাঠাই।” [সুরা বনি ইসরাইল (১৭) : ১৫] সৃষ্টিজগতের ব্যাপারে আল্লাহর রীতি হলো, তিনি রাসুল পাঠানোর পরে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ হলে তখনই কেবল পাকড়াও করেন। যখন তাদের ওপর প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়-“তখন যার ইচ্ছা হবে, ইমান আনবে; আর যার ইচ্ছা হবে, কুফর অবলম্বন করবে।” [সুরা কাহফ (১৮) : ২৯]
হাদিসেও এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রাসুল বলেন,
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَا يَسْمَعُ بِي أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ يَهُودِيُّ وَلَا نَصْرَانِي ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ إِلَّا كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ
সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! ইয়াহুদি হোক আর খ্রিষ্টান হোক, এই উম্মাহর যেকোনো ব্যক্তি আমার রিসালাতের খবর শোনার পরও আমি যা কিছুসহ প্রেরিত হয়েছি তার ওপর ইমান না এনে মৃত্যুবরণ করবে, অবশ্যই সে জাহান্নামি হবে。
সুতরাং আলোচ্য ব্যক্তিকে কাফির না বলার অর্থ হলো, পরকালে তার ওপর কাফিরের বিধান প্রযোজ্য হবে না। তবে দুনিয়াতে তার ওপর কাফিরের বিধিবিধানই প্রযোজ্য হবে। কারণ, মুসলিমের পার্থিব বিধিবিধান প্রযোজ্য হতে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম সত্যায়ন করার স্বীকারোক্তি প্রদান করা অপরিহার্য। এ ধরনের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জিহাদি অভিযান পরিচালনার আগে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো জরুরি। কারণ, তারা হঠকারিতা ও একগুঁয়েমিবশত কুফর অবলম্বন করেনি; বরং ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে কাফির অবস্থায় রয়েছে। হতে পারে, সত্য দীনের দাওয়াত পৌঁছলে তারা ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করবে।
আল্লামা হামাওয়ি রাহ. লেখেন, এক ব্যক্তি বলল, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টানদের শাস্তি দেবেন। এ কথা শুনে জনৈক মহিলা বলে উঠল, ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টানরাও আল্লাহর বান্দা। সুতরাং আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না। বলা বাহুল্য, ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টানরা যে পরকালে শাস্তিপ্রাপ্ত হবে, এ বিষয়টা জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং উক্ত মহিলাকে তৎক্ষণাৎ তাকফির করাই ছিল স্বাভাবিক যুক্তির দাবি; কিন্তু এই মাসআলা ইমাম মুহাম্মাদ রাহ.-এর কাছে পৌঁছলে তিনি সমাধান দিলেন, এই মহিলা কাফির নয়। তবে সে অজ্ঞ। সুতরাং তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দাও। এরপর যখন তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়া হলো, তখন সে ঠিকই বুঝে গেল।
ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. ছিলেন দ্বিতীয় শতাব্দীর মনীষী। তাঁর এবং আমাদের মধ্যে ১২০০ বছরেরও অধিক সময়ের ব্যবধান। তার সময়ে দীনি ব্যাপারে মানুষের যতটুকু অজ্ঞতা ছিল, বর্তমানে তা লাখো গুণ বেশি। আমাদের এই যুগে দীনি ব্যাপারে অজ্ঞতা রীতিমতো মহামারির আকার ধারণ করেছে। সুতরাং বর্তমানে কেউ যদি হঠকারিতা বা একগুঁয়েমির কারণে নয়; বরং স্রেফ অজ্ঞতার কারণে দীনের কোনো মৌলিক বিধানও অস্বীকার করে বসে, তবে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে তাকফির না করে প্রথমে সে ব্যাপারে শরিয়তের শিক্ষা সম্পর্কে তাকে অবগত করা উচিত। হ্যাঁ, অবগতিলাভের পরও সে যদি পূর্বের মতো এ ব্যাপারে তার অস্বীকৃতির ওপর অটল থাকে, তবে তাকে নির্দ্বিধায় তাকফির করা হবে। কিন্তু তাকে এ ব্যাপারে শরিয়ার শিক্ষা অবগত করার আগে তাড়াহুড়ো করে তাকফির করা সমীচীন হবে না। এতে আশঙ্কা রয়েছে, তাকফিরের ফাতওয়া তার আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত হানবে এবং তার ক্রোধ ও অহংকার জাগ্রত করবে। ফলে সে আগের চেয়ে আরও বেশি উদ্ধত হয়ে উঠবে এবং প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে নিজ অবস্থানের ওপর আরও অধিক অনমনীয়ভাব প্রদর্শন করবে। সার্বিক বিচারে তার এহেন আচরণের কারণে উম্মাহর উপকারের চাইতে অপকারই বরং বেশি হবে।
টিকাঃ
১৬২ শারহুল মাওয়াকিফ: ৮/২০৫।
১৬০ জামিউল বায়ান, আহমাদ শাকির তাহকিককৃত: ১৭/৪০২।
১৬৪ আল-মুওয়াফাকাত: ৪/২০০১।
১৬৫ এখানে 'উম্মাহ' দ্বারা উম্মাতে দাওয়াত উদ্দেশ্য; উম্মাতে ইজাবাত নয়। অমুসলিমরা উম্মাতে দাওয়াত। কারণ, তাদের দাওয়াত দেওয়ার জিম্মাদারি রাসুলের ওপর অর্পিত ছিল। আর মুসলিমরা হচ্ছে উম্মাতে ইজাবাত। ইজাবাত অর্থ সাড়া দেওয়া। মুসলিমরা রাসুলের দাওয়াতে সাড়া দেওয়ার কারণে তাদের উম্মাতে ইজাবাত বলা হয়।
১৬৬ সহিহ মুসলিম: ২৭৯।
১৬৭ গামজু উয়ুনিল বাসায়ির ফি শরহিল আশবাহি ওয়ান নাজায়ির: ৩/৩০৪।
📄 বাধ্য হওয়া
ইমান ও কুফরের ভিত্তি হলো সত্যায়ন ও প্রত্যাখ্যানের ওপর। ফকিহগণ যেসব কথা ও কাজকে ইমান ভঙ্গের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তা সবই অন্তরের অসত্যায়ন ও প্রত্যাখ্যানের প্রমাণ বহন করে। কাউকে কুফর অবলম্বন করতে তখনই বাধ্য করা হয়, যখন তার অন্তর কুফর গ্রহণের ব্যাপারে সম্মত না থাকে। তাই এ বিষয়টিকেও তাকফিরের প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ইমাম কাসানি রাহ. লিখেছেন, কোনো কাফিরকে যদি জোরপূর্বক মুসলিম বানানো হয়, এরপর সুযোগমতো সে পুনরায় মুরতাদ হয়ে যায়, তাহলে এই ব্যক্তিকে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হবে। তবে অন্যান্য মুরতাদের সব বিধান তার ওপর প্রযোজ্য হবে না। এমনকি তাকে হত্যাও করা যাবে না। কারণ, তাকে যেহেতু জোরপূর্বক মুসলিম বানানো হয়েছে, তাই তার কালিমা আন্তরিক সত্যায়নের প্রতিনিধিত্ব করেনি। প্রাণের ভয়ে কিংবা অন্য কোনো আশঙ্কায় সে-ই ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। এ কারণে দ্বিতীয় বার কুফর অবলম্বনের পরও তার ওপর সাধারণ মুরতাদের বিধিবিধান প্রয়োগ করা যাবে না।
সুতরাং কাউকে যদি কুফর করার ব্যাপারে বাধ্য করা হয়, তবে সেই কুফরের কারণে তাকে তাকফির করা সমীচীন নয়।
বাধ্য হওয়ার দুই সুরত হতে পারে: (ক) যদি কুফর না করে, তাহলে প্রাণ বা অঙ্গহানির আশঙ্কা রয়েছে। পরিভাষায় এই সুরতকে 'ইকরাহে মুলজি' বা 'ইকরাহে তাম' বলা হয়। (খ) যদি কুফর না করে, তাহলে প্রাণ বা অঙ্গহানির আশঙ্কা নেই; তবে এর নিচুপর্যায়ের নির্যাতনের আশঙ্কা রয়েছে। পরিভাষায় এই সুরতকে 'ইকরাহে গাইরে মুলজি' বা 'ইকরাহে নাকিস' বলা হয়। ইকরাহের এ দুই সুরতের মধ্যে স্রেফ প্রথম সুরতটি তাকফিরের প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচিত হয়। দ্বিতীয় সুরতে ব্যক্তি কুফরে লিপ্ত হলে তাকে কাফির বলেই ফাতওয়া দেওয়া হয়। ইমাম কাসানি রাহ. লেখেন,
هَذَا إِذَا كَانَ الْإِكْرَاهُ عَلَى الْكُفْرِ تَامًّا، فَأَمَّا إِذَا كَانَ نَاقِصًا يُحْكَمُ بِكُفْرِهِ؛ لِأَنَّهُ لَيْسَ بِمُكْرَه فِي الْحَقِيقَةِ؛ لِأَنَّهُ مَا فَعَلَهُ لِلضَّرُورَةِ بَلْ لِدَفْعِ الْغَمِّ عَنْ نَفْسِهِ، وَلَوْ قَالَ: كَانَ قَلْبِي مُطْمَئِنَّا بِالْإِيمَانِ لَا يُصَدَّقُ فِي الْحُكْمِ؛ لِأَنَّهُ خِلَافُ الظَّاهِرِ كَالطَّائِعِ إِذَا أَجْرَى الْكَلِمَةَ ثُمَّ قَالَ: كَانَ قَلْبِي مُطْمَئِنَّا بِالْإِيمَانِ وَيُصَدِّقُ فِيمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ اللَّهِ تَعَالَى.
'এই বিধান তখন প্রযোজ্য হবে, যখন কুফরের ওপর "ইকরাহে তাম” করা হবে। আর যদি তা "ইকরাহে নাকিস” হয়, তাহলে ব্যক্তিকে কাফির বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। কারণ, এ ক্ষেত্রে সে এমন কেউ নয়, যাকে বাধ্য করা হয়েছে। সে (শরিয়তের দৃষ্টিতে বিবেচ্য) জরুরতের কারণে এমনটা করেনি; বরং নিজের দুশ্চিন্তা প্রতিরোধের জন্য করেছে। সে যদি বলে, আমার অন্তর ইমানের ব্যাপারে প্রশান্ত ছিল, তবু হুকুম আরোপের ক্ষেত্রে তাকে সত্যায়ন করা হবে না। কারণ, তা বাহ্যিক অবস্থার বিপরীত। তার অবস্থা ওই ব্যক্তির মতো, যে স্বেচ্ছায় কুফরি বাক্য বলে এরপর দাবি করছে, আমার অন্তর ইমানের ব্যাপারে প্রশান্ত ছিল। (সে তার দাবিতে সত্যবাদী হলে) আল্লাহর কাছে তাকে সত্যায়ন করা হবে; (দুনিয়ায় নয়)।
কাউকে যদি কুফরি কথা বলার জন্য বা কুফরি কাজ করতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তার জন্য ইমানের ব্যাপারে অন্তর প্রশান্ত রেখে বাহ্যিকভাবে কুফর করা বৈধ; তবে এটা তার জন্য অপরিহার্য নয়। সে যদি ওই অবস্থায়ও ইমানের ওপর অটল থাকে এবং এ কারণে তাকে হত্যা করা হয়, তবে সে আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদান পাবে। সাহাবিদের মধ্যে আম্মার এবং খুবায়ব রা. এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন। আম্মার রা. রুখসত (ছাড়) গ্রহণ করেছিলেন। খুবায়ব রা. আজিমত (দৃঢ়তা) অবলম্বন করেছিলেন। ফলস্বরূপ, রাসুল ﷺ এবং সাহাবিগণের কাছে আম্মার রা.-এর তুলনায় খুবায়ব রা. অধিক মর্যাদাবান ছিলেন। ইমাম জাসসাস রাহ. লেখেন,
وَقَوْلُهُ لِعَمَّارٍ إِنْ عَادُوا فَعُدْ إِنَّمَا هُوَ عَلَى وَجْهِ الإباحة لا على وجهة الْإِيجَابِ وَلَا عَلَى النَّدْبِ وَقَالَ أَصْحَابُنَا الْأَفْضَلُ أَنْ لَا يُعْطِيَ التَّقِيَّةَ وَلَا يُظْهِرَ الْكُفْرَ حَتَّى يُقْتَلُ وَإِنْ كَانَ غَيْرُ ذَلِكَ مُبَاحًا لَهُ وَذَلِكَ لِأَنَّ حُبَيبَ بْنَ عَدِيٌّ لَمَّا أَرَادَ أَهْلُ مَكَّةَ أَنْ يَقْتُلُوهُ لَمْ يُعْطِهِمُ التَّقِيَّةَ حَتَّى قُتِلَ فَكَانَ عِنْدَ النَّبِيِّ ﷺ وَعِنْدَ الْمُسْلِمِينَ أَفْضَلَ مِنْ عمار في إِعْطَائِهِ التَّقِيَّةَ وَلِأَنَّ فِي تَرْكِ إِعْطَاءِ التَّقِيَّةِ إِعْزَازًا لِلدِّينِ وَغَيْظًا لِلْمُشْرِكِينَ فَهُوَ بِمَنْزِلَةِ مَنْ قَاتَلَ الْعَدُوَّ حَتَّى قُتِلَ فَحَظِّ الْإِكْرَاءِ فِي هَذَا الْمَوْضِعِ إِسْقَاطُ الْمَأْثَمِ عَنْ قَائِلِ هَذَا الْقَوْلِ حَتَّى يَكُونَ بِمَنْزِلَةِ مَنْ لَمْ يَقُلْ
'রাসুল ﷺ আম্মার রা.-কে বলেছিলেন, তারা পুনরায় তোমার সঙ্গে একই আচরণ করলে তুমিও পুনরায় একই পন্থা গ্রহণ করতে পারবে—এর দ্বারা বৈধতা (রুখসত) বোঝানো উদ্দেশ্য; ওয়াজিব বা মুসতাহাব নয়। আমাদের ফকিহগণ লিখেছেন, এসব ক্ষেত্রে তাকিয়ার আশ্রয় নিয়ে কুফর প্রকাশ না করে প্রয়োজনে মৃত্যুবরণ করাই অধিক উত্তম; যদিও এর ভিন্নটিও তার জন্য বৈধ। কারণ, মক্কাবাসী যখন খুবায়ব ইবনু আদি রা.-কে হত্যা করতে চেয়েছিল, তিনি তাদের সঙ্গে তাকিয়া করেননি; ফলে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। এ কারণে রাসুল ﷺ এবং মুসলিমদের দৃষ্টিতে আম্মারের চেয়ে খুবায়ব রা. উত্তম ছিলেন; যেহেতু তিনি (আম্মার রা.) মুশরিকদের সঙ্গে তাকিয়া করেছিলেন (অথচ খুবায়ব রা. তাকিয়া করেননি)। তা ছাড়া তাকিয়া না করার মধ্যে রয়েছে দীনের সম্মান এবং মুশরিকদের ক্রোধ। যার কারণে তিনি (খুবায়ব রা.) ছিলেন সেই ব্যক্তির পর্যায়ে, যে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে নিহত হয়েছে, সুতরাং এ ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি বাধ্য হয়ে কুফরি কথা বলবে, তার শুধু পাপ মোচন করে দেওয়া হবে, যেন সে ওই ব্যক্তির পর্যায়ে গণ্য হয়, যে কুফরি কথা বলেনি। (এরচেয়ে বেশি কিছু নয়।)
এই উদ্ধৃতির পরে ইমাম জাসসাস রাহ. আরও বিস্তৃতভাবে আলোচনা করে স্পষ্ট করেন যে, এ ধরনের অবস্থায় রুখসত গ্রহণ করা বৈধ হলেও আজিমতের ওপর অটল থাকাই উত্তম।
কোনো কোনো শাফিয়ি ফকিহ বিষয়টিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ইমাম নববি রাহ. আল-মাজমু গ্রন্থে লেখেন,
وَمَنْ أُكْرِهَ عَلَى كَلِمَةِ الْكُفْرِ فَالْأَفْضَلُ أَنْ لَا يَأْتِيَ بِهَا لِمَا رَوَى أَنَسُ (أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عليه وسلم قال: ثلاث من كن فيه وجد حلاوة الايمان: أن يكون الله ورسوله أحب إليه مما سواهما، وأن يجب للمرء لا يحبه الا الله عز وجل، وأن يكره أن يعود في الكفر كما يكره أن توقد نار فيقذف فيها) وروى خباب بن الارت إِنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ (أن كان الرجل ممن كان قبلكم ليحفر له في الارض فيجعل فيها، فيجاء بمنشار فتوضح على رأسه ويشق باثنتين، فلا يمنعه ذلك عن دينه، ويمشط بأمشاط الحديد ما دون عظمه من لحم وعصب ما يصده ذلك عن دينه ومن أصحابنا من قال: إن كان ممن يرجو النكاية في العدو أو القيام بأحكام الشرع فالافضل له أن يدفع القتل عن نفسه، ويتلفظ بكلمة الكفر، لما في بقائه من صلاح المسلمين، وإن كان لا يرجو ذلك اختار القتل.
'যে ব্যক্তিকে কুফরি কথা বলার জন্য বাধ্য করা হয়, তার জন্য উত্তম হলো তা না বলা। কারণ, আনাস রা. বর্ণনা করেছেন, রাসুল বলেন, “তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকবে, সে ইমানের মিষ্টতা পাবে। তার কাছে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল অন্য সবকিছুর চেয়ে অধিক প্রিয় হবে। সে কাউকে ভালোবাসলে একমাত্র মহামহিম আল্লাহর জন্য ভালোবাসবে। আর সে কুফরে ফিরে যেতে তেমনটাই অপছন্দ করবে, আগুন জ্বালিয়ে তাকে সেখানে নিক্ষেপ করা যেমনটা অপছন্দ করবে।”
খাব্বাব ইবনুল আরাত রা. বর্ণনা করেন; নবি বলেছেন, “তোমাদের পূর্বে যাঁরা ছিল, তাঁদের একজনকে ধরে আনা হতো। এরপর তাঁর জন্য মাটিতে গর্ত খোঁড়া হতো। তারপর করাত এনে করাত দিয়ে তাঁর মাথা চিরে দ্বিখণ্ডিত করা হতো। এতৎসত্ত্বেও তা তাঁকে তাঁর দীন থেকে বিচ্যুত করতে পারত না। আর লোহার কাঁটাযুক্ত চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে হাড় থেকে শরীরের মাংস ও মাংসপেশী বিচ্ছিন্ন করা হতো। এরপরও তা তাঁকে তাঁর দীন থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারত না।”
আমাদের কোনো কোনো ফকিহ বলেছেন, যদি সেই ব্যক্তিটি এমন হয়, যার দ্বারা শত্রুর ক্ষতি বা দীনের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠার আশা করা যায়, তাহলে তার জন্য উত্তম হবে মৃত্যু প্রতিরোধ করা এবং কুফরি কথা মুখে উচ্চারণ করা। কারণ, সে জীবিত থাকলে মুসলিমদের কল্যাণ হবে। আর যদি তার থেকে এমন কিছুর প্রত্যাশা না থাকে, তাহলে সে মৃত্যুই বেছে নেবে।
যদি কেউ প্রাণ বা অঙ্গহানির ভয়ে একান্ত বাধ্য হয়েও কুফরি কথা বলে, তবু তার জন্য পারতপক্ষে তাওরিয়া করা উচিত। অর্থাৎ, সরাসরি কুফরি কথা বলা থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে; বরং এমন ঘোরপ্যাঁচমূলক শব্দ বলতে হবে, যাতে এ মুসিবত দূর হয়ে যায়, তবে কথাটি পুরোপুরি কুফর হয় না। এটাকে শরিয়তের পরিভাষায় 'তারিজ' এবং 'তাওরিয়া' বলা হয়। এ ক্ষেত্রে এমন শব্দ ও বাক্য প্রয়োগ করা হবে, যা বাহ্যিকভাবে বাধ্যকারীর কাঙ্ক্ষিত অর্থ প্রকাশ করে। তবে কথক মনে মনে শব্দের মূল অর্থকেই চিত্রিত রাখবে। এভাবে বহুমুখী অর্থ প্রকাশ করে-এমন কথা বলে নিজেকে সরাসরি কুফরে লিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করবে। যেমন, কাউকে রাসুলের শানে মন্দ কথা বলতে বাধ্য করা হলো। এখন সে যদি রুখসতের ওপর আমল করে, তবু তার জন্য উচিত হবে 'মুহাম্মাদ' শব্দ বলার সময় রাসুল -কে উদ্দেশ্য না নিয়ে মনে মনে অন্য কোনো 'মুহাম্মাদ' নামের ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য নেবে। এতে মুসলিম ভাইকে গালি দেওয়ার কারণে পাপ হলেও রাসুল -কে গালি দেওয়ার কুফর থেকে সে বেঁচে যাবে। ফকিহগণের কাছে এই তাওরিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ইমাম জাসসাস রাহ. লেখেন,
وَيُعَارِضَ بِهَا غَيْرَهُ إِذَا خَطَرَ ذَلِكَ بِبَالِهِ فَإِنْ لَمْ يَفْعَلْ ذَلِكَ مَعَ خُطُورِهِ بِبَالِهِ كَانَ كَافِرًا قَالَ مُحَمَّدُ بْنُ الْحَسَنِ إِذَا أَكْرَهَهُ الْكُفَّارُ عَلَى أَنْ يَشْتُمَ مُحَمَّدًا فَخَطَرَ بباله أن يشتم محمدا آخر غيره فَلَمْ يَفْعَلْ وَقَدْ شَتَمَ النَّبِيَّ ﷺ كَانَ كَافِرًا وَكَذَلِكَ لَوْ قِيلَ لَهُ لَتَسْجُدَنَّ لِهَذَا الصَّلِيبِ فَخَطَرَ بِبَالِهِ أَنْ يَجْعَلَ السُّجُودَ لِلَّهِ فَلَمْ يَفْعَلْ وَسَجَدَ لِلصَّلِيبِ كَانَ كَافِرًا فَإِنْ أَعْجَلُوهُ عَنْ الرَّوِيَّةِ وَلَمْ يَخْطُرُ بِبَالِهِ شَيْءٌ وَقَالَ مَا أُكْرِهَ عَلَيْهِ أَوْ فَعَلَ لَمْ يَكُنْ كَافِرًا إِذَا كَانَ قَلْبُهُ مُطْمَئِنَّا بِالْإِيمَانِ قَالَ أَبُو بَكْرٍ وَذَلِكَ لِأَنَّهُ إِذَا خَطَرَ بِبَالِهِ مَا ذَكَرْنَا فَقَدْ أَمْكَنَهُ أَنْ يَفْعَلَ الشَّتِيمَةَ لِغَيْرِ النَّبِيِّ صَلَّى الله عليه وسلّم إِذا لَمْ يَكُنْ مُكْرَهًا عَلَى الضَّمِيرِ وَإِنَّمَا كَانَ مُكْرَهًا عَلَى الْقَوْلِ وَقَدْ أَمْكَنَهُ صَرْفُ الضَّمِيرِ إِلَى غَيْرِهِ فَمَتَى لَمْ يَفْعَلْهُ فَقَدْ اخْتَارَ إِظْهَارَ الْكُفْرِ مِنْ غَيْرِ إِكْرَاهِ فَلَزِمَهُ حُكْمُ الْكُفْرِ
'তার অন্তরে (রাসুলের শানে মন্দ বলার) এই ভাবনা জাগলে সে অন্যকে উদ্দেশ্যে নিয়ে তাওরিয়া করবে। অন্তরে উদ্রেক হওয়া সত্ত্বেও সে যদি তাওরিয়া না করে, তবে সে কাফির হয়ে যাবে। ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান রাহ. বলেন, কাফিররা যদি কাউকে মুহাম্মাদ-কে গালি দিতে বাধ্য করে, সে সময় তার অন্তরে যদি অন্য কোনো মুহাম্মাদকে গালি দেওয়ার চিন্তা আসা সত্ত্বেও সে তা না করে নবি -কে গালি দিয়ে বসে, তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। অনুরূপ তাকে যদি বলা হয়, তুমি অবশ্যই এই ক্রুশকে সিজদা করবে। সে সময় তার অন্তরে এই ভাবনার উদ্রেক হলো যে, সে সিজদা আল্লাহর উদ্দেশ্যে করবে; এরপরও সে ক্রুশকেই (উদ্দেশ্য করে) সিজদা করল, তবে সে কাফির হয়ে যাবে। তবে তাওরিয়া করার মতো সময় পাওয়ার আগেই যদি তার ওপর নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে এবং সে সময় তার অন্তরে অন্য কিছু না জাগে, ফলে তাকে যে কুফরি কথা বা কাজের ব্যাপারে বাধ্য করা হয়েছে, সে তাতে লিপ্ত হয়ে যায়, তাহলে সে কাফির হবে না; যদি তার অন্তর ইমানের ব্যাপারে প্রশান্ত থাকে। জাসসাস রাহ. বলেন, এর কারণ হলো, যখন তার অন্তরে উল্লেখিত বিষয় উদ্রেক হবে, তখন তার পক্ষে নবি-কে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে গালি দেওয়া সম্ভব। কারণ, অন্তরের ওপর কারও জোরজবরদস্তি ছিল না; জোরজবরদস্তি ছিল মুখের কথার ওপর। এ কারণে তার পক্ষে অন্য কারও দিকে সর্বনাম ফেরানোর সুযোগ ছিল। এরপরও সে যখন তা করেনি, তখন সে আদতে কোনো চাপ প্রয়োগ ছাড়াই কুফরকে বেছে নিয়েছে। তাই তার জন্য কুফরের হুকুম আরোপ করা অপরিহার্য হয়ে গেছে।
এই বক্তব্যের দ্বারা বোঝা গেল, সরাসরি কুফরে লিপ্ত হওয়া থেকে বাঁচার কোনো কৌশল যদি মাথায় আসে এবং সেই কৌশল প্রয়োগ করেই প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়, তাহলে তা প্রয়োগ করা অপরিহার্য। সেটাকে বাদ দিয়ে সরাসরি কুফরে পা বাড়ালে তার ওপর তাকফির আরোপিত হবে। কারণ, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ না করে ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরে লিপ্ত হওয়া কুফরের প্রতি সন্তুষ্টির প্রমাণ বহন করে, যা নিঃসন্দেহে কুফর বলে গণ্য হয়।
টিকাঃ
*** বাদায়িউস সানায়ি: ৭/১৭৮, ১৭৯।
** ইমানের ব্যাপারে অন্তর প্রশান্ত রেখে আত্মরক্ষার্থে মুখে কুফরি কথা বলা।
১৭০ আহকামুল কুরআন, জাসসাস : ২/২৯০।
১৭১ আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব: ১৯/২২৪।
১** আহকামুল কুরআন: ৩/২৮৩।
📄 ব্যাখ্যা থাকা
যেকোনো ব্যাখ্যাই তাকফিরের প্রতিবন্ধক নয়। কিছু ব্যাখ্যা শরিয়া কর্তৃক অনুমোদিত আর কিছু ব্যাখ্যা অবৈধ। বাহ্যিক অর্থের বাইরে নুসুসের যদি এমন কোনো অর্থ নেওয়া হয়, যা কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে বিরোধপূর্ণ নয়; বরং শব্দের মধ্যেই এই অর্থ প্রদানের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তা অনুমোদিত তাওয়িল (ব্যাখ্যা)।
আর যদি এমন কোনো অর্থ নেওয়া হয়, যা কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং আরবিভাষারীতি অনুসারেও তা চলনসই নয়, তবে তা বর্জিত ও প্রত্যাখ্যাত হবে। আল্লামা সাইয়িদ শরিফ জুরজানি রাহ. লেখেন,
التأويل ... وفي الشرع: صرف اللفظ عن معناه الظاهر إلى معنى يحتمله، إذا كان المحتمل الذي يراه موافقا للكتاب والسنة
‘শরিয়তের পরিভাষায় তাওয়িল বলা হয় শব্দকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে এমন কোনো অর্থের দিকে ফেরানো, শব্দের ভেতরেই যার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শর্ত হলো, সেই সম্ভাব্য অর্থ কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
ইমাম আমিদি রাহ. (মৃত্যু : ৬৩১ হিজরি) লেখেন,
والحق في ذلك أن يقال: وأما التأويل المقبول الصحيح فهو حمل اللفظ على غير مدلوله الظاهر منه مع احتماله له بدليل يعضده.
'এ ব্যাপারে হক, বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য তাওয়িল হলো, শব্দকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে এমন অর্থে প্রয়োগ করা, শব্দের ভেতরে যার সম্ভাবনা রয়েছে এবং কোনো দলিল এ ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনাকে সুদৃঢ় করছে।
ইমাম ইবনু কুদামা রাহ. (মৃত্যু : ৬২০ হিজরি) তাওয়িলের পরিচয় দিতে গিয়ে লেখেন,
والتأويل صرف اللفظ عن الاحتمال الظاهر إلى احتمال مرجوح به لاعتضاده بدلیل یصیر به أغلب على الظن من المعنى الذي دل عليه الظاهر إلا أن الاحتمال يقرب تارة ويبعد أخرى وقد يكون الاحتمال بعيدا جدا فيحتاج إلى دليل في غاية القوة وقد يكون قريبا فيكفيه أدنى دليل وقد يتوسط بين الدرجتين فيحتاج دليلا متوسطا
'তাওয়িল হলো শব্দকে প্রকাশ্য সম্ভাবনা থেকে সরিয়ে কোনো অপ্রধান সম্ভাবনার দিকে ফেরানো। আর সেই অপ্রধান সম্ভাবনা কোনো দলিলের আলোকে শক্তিশালী হবে, যে দলিলের ভিত্তিতে শাব্দিক অর্থের তুলনায় তা ধারণার ওপর প্রবল হয়। তবে সম্ভাবনা কখনো নিকটবর্তী, কখনো দূরবর্তী এবং কখনো খুব বেশি দূরবর্তী হয়। সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শক্তিশালী দলিলের প্রয়োজন হয়। আর কখনো সেই সম্ভাবনা নিকটবর্তী হয়, তখন সাধারণ দলিলই এর জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। আর কখনো তা মাঝামাঝি পর্যায়ের হয়, তখন মাঝামাঝি পর্যায়ের দলিলের প্রয়োজন হয়।
ইমাম তুফি রাহ. (মৃত্যু : ৭১৬ হিজরি) লেখেন,
صرف اللفظ عن ظاهره لدليل يصير به المرجوح راجحا. فالظواهر الواردة في الكتاب والسنة في صفات البارئ جل جلاله، لنا أن نسكت عنها، ولنا أن نتكلم فيها. فإن سكتنا عنها قلنا: تمر كما جائت، كما نقل عن الإمام أحمد رضي الله عنه وسائر أعيان أئمة السلف، وإن تكلمنا فيها، قلنا: هي على ظواهرها من غير تحريف مالم يقم دليل يترجح عليها بالتأويل.
'শব্দকে এমন কোনো দলিলের কারণে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে দেওয়া, যার দ্বারা অপ্রধান সম্ভাবনা প্রাধান্যপ্রাপ্ত হয়। সুতরাং কুরআন-সুন্নাহে আল্লাহর গুণাবলির ব্যাপারে যেসব বাহ্যিক শব্দ এসেছে, সে ব্যাপারে আমাদের নীরব থাকা এবং কথা বলার সুযোগ রয়েছে। যদি আমরা নীরব থাকি, তাহলে বলব, শব্দগুলো যেভাবে এসেছে, সেভাবে রেখে দেওয়া হবে; যেমনটা ইমাম আহমাদ রাহ.-সহ সালাফের সকল বিশিষ্ট ইমাম থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর যদি কথা বলি, তাহলে আমরা বলব, শব্দগুলো কোনো প্রকার বিকৃতি ছাড়া তার বাহ্যিক অর্থে প্রযোজ্য হবে, যতক্ষণ-না এমন দলিল প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বাহ্যিক অর্থের ওপর তাওয়িলকে প্রাধান্য দেয়।'
ইমাম মারয়ি কারয়ي হাম্বলি রাহ.-ও (মৃত্যু: ১০৩৩ হিজরি) একই কথা লেখেন,
والتأويل هو أن يراد باللفظ ما يخالف ظاهره أو هو صرف اللفظ عن ظاهره المعنى آخر. وهو في القرآن كثير؛ ومن ذلك آيات الصفات المقدسة، وهي من الآيات المتشابهات.
'তাওয়িল হলো কোনো শব্দ দ্বারা এমন অর্থ উদ্দেশ্য নেওয়া, যা তার বাহ্যিক অর্থের বিপরীত অথবা তাওয়িল হলো, শব্দকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে অন্য কোনো অর্থের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া। কুরআনে তা প্রচুর রয়েছে। তন্মধ্যে আল্লাহর পবিত্র গুণাবলি-সংক্রান্ত আয়াতসমূহও অন্তর্ভুক্ত। আর সিফাতের এসব আয়াত মুতাশাবিহ (দ্ব্যর্থবোধক) আয়াতসমূহের অন্তর্ভুক্ত।'
আল্লামা ইবনুন নাজ্জার রাহ.-ও (মৃত্যু: ৯৭২ হিজরি) শারহুল কাওকাবিল মুনির গ্রন্থে একই কথা লিখেছেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আল্লাহর সিফাতে মুতাশাবিহাত বর্ণনার ক্ষেত্রে আশআরি ও মাতুরিদিরা যেই তাওয়িল গ্রহণ করেছে, তা হলো এই তাওয়িল। অন্যথায় তাও Lawfe ফাসিদ তথা ভুল তাওয়িল যেটা, তা তারা কখনোই গ্রহণ করেনি। সেগুলো গ্রহণ করেছে রাফিজিসহ অন্য গোমরাহ সম্প্রদায়। যেমন, সুরা রাহমানের ১৯ নম্বর আয়াতের 'বাহরাইন' (দুই সমুদ্র) শব্দের তাওয়িল তারা করেছে আলি ও ফাতিমা রা.। একই সুরার ২২ নম্বর আয়াতের 'আল-লু-লু ওয়াল মারজান' শব্দের তাওয়িল তারা করেছে হাসান ও হুসাইন রা.। সুরা বাকারার ২০৫ নম্বর আয়াতের নিন্দিত লোকটির তাওয়িল করেছে মুআবিয়া রা.। এ ধরনের মনগড়া তাওয়িলের ব্যাপারে ইমামগণ সর্বদা সতর্ক করে গেছেন। কিন্তু আশআরি-মাতুরিদিরা কিছু ক্ষেত্রে যে তাওয়িল করেছে, তা কখনোই এরকম নয়; বরং তা উল্লিখিত সংজ্ঞাসমূহে বিবৃত তাওয়িল। এ ধরনের তাওয়িল শুধু তারাই উদ্ভাবন করেননি; বরং সাহাবাযুগ থেকেই তা চলে আসছে। এর ওপর কেউ আপত্তি তুললে সেই আপত্তি সাহাবিদের গায়ে গিয়েও পড়বে।
ইমাম আমিদি রাহ. (মৃত্যু: ৬৩১ হিজরি) লেখেন,
وإذا عرف معنى التأويل فهو مقبول معمول به إذا تحقق بشروطه، ولم يزل علماء الأمصار في كل عصر من عهد الصحابة رضي الله عنهم إلى زمننا عاملين به من غير نكير.
'তাওয়িলের অর্থ যখন জানা হলো, (তখন এ কথাও জেনে রাখা প্রয়োজন যে,) যখন শর্ত বাস্তবায়িত হবে, তখন তাওয়িল গ্রহণযোগ্য ও আমলযোগ্য হবে। সাহাবাযুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত সর্বযুগে সব এলাকার আলিমরা কোনো ধরনের আপত্তি ছাড়া এর ওপর অব্যাহতভাবে আমল করে আসছেন।
তাওয়িলের উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে তিনটি বিষয় প্রতিভাত হলো :
১. শব্দকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে সম্ভাব্য অন্য কোনো অর্থে প্রয়োগ করার নাম তাওয়িল। সুতরাং কোনো শব্দের যদি মূল অর্থই একাধিক থাকে, তবে তার কোনো একটি গ্রহণ করাকে তাওয়িল বলা হবে না।
২. আরবিভাষার নিয়ম অনুসারে শব্দ থেকে সেই অর্থ গ্রহণের সুযোগ থাকতে হবে। সুতরাং কেউ যদি কোনো শব্দ থেকে এমন অর্থ গ্রহণ করে, যা আরবিভাষার নিয়মনীতি দ্বারা সমর্থিত নয়, তবে তা তাওয়িল নয়; বরং তাহরিফ (অপব্যাখ্যা)।
৩. শব্দের বাহ্যিক অর্থ ছেড়ে এই ভিন্ন অর্থ গ্রহণের পেছনে স্বতন্ত্র কোনো দলিল থাকতে হবে, যা এই সম্ভাবনাকে সুদৃঢ় করবে। যদি কোনো দলিল ছাড়া শুধু অনুমানের ভিত্তিতে কোনো শব্দের বাহ্যিক অর্থ ছেড়ে দূরবর্তী অর্থ গ্রহণ করা হয়, তবে তা ভুল ব্যাখ্যা।
আল্লামা তাফতাজানি রাহ. লেখেন,
لأن النقل خلاف الأصل، لا يصار إليه إلا بدليل.
'শব্দকে অন্য অর্থে স্থানান্তর করা স্বাভাবিক অবস্থার ব্যতিক্রম ব্যবহার। সুতরাং এর জন্য স্বতন্ত্র দলিলের প্রয়োজন।
(والنصوص) من الكتاب والسنة تحمل على ظواهرها) ما لم يصرف عنها دليل قطعي... (فالعدول عنها) أي عن الظواهر (إلى معان يدعيها أهل الباطن)... (إلحاد)
আয় মেইল ওয়াদুল আনিল ইসলাম, ওয়াত্তেসাফ বিকফর, লেকুনাহু তাকদিবান লিন্ নবী। ফিমা এলেম মাজিইহু বিদ্দোরুরা।
'কুরআন এবং সুন্নাহর নুসুসকে তার বাহ্যিক অর্থেই প্রয়োগ করা হবে, যতক্ষণ না কোনো অকাট্য দলিল তাকে বাহ্যিক অর্থ থেকে ফেরাবে। সুতরাং বাহ্যিক অর্থ ছেড়ে শব্দকে এমন অর্থের দিকে ফেরানো, যা বাতিনিরা দাবি করে-তা ইলহাদ। ইলহাদ হচ্ছে, ইসলাম থেকে সরে যাওয়া এবং কুফরের সঙ্গে সংযুক্ত ও তার গুণে গুণান্বিত হওয়া। কারণ, এর দ্বারা নবি -কে এমন ব্যাপারে অস্বীকার করা হয়, যা নিয়ে তাঁর আগমন আবশ্যিকভাবে জানা গেছে।
ইমাম গাজালি রাহ. লেখেন,
إنك إذا فتحت هذا الباب، وهو أن تريد باللفظ غير ما وضع اللفظ له ويدل عليه في التفاهم لم يكن لما تريد به حصر.
'তুমি যদি একবার এই দুয়ার উন্মুক্ত করে দাও যে, শব্দকে যেই অর্থের জন্য গঠন করা হয়েছে এবং পারস্পরিক বোধ-উপলব্ধিতে তা যে অর্থের প্রতি নির্দেশ করে, এর বাইরের ভিন্ন অর্থ উদ্দেশ্য নেবে, তাহলে তোমার চাওয়ার তো কোনো সীমা-পরিসীমা থাকবে না। (এর দ্বারা পুরো শরিয়াই নফসের অনুগামী এবং খেলতামাশার বস্তুতে পরিণত হবে।)'
টিকাঃ
১৭০ আত-তারিফাত: ৫০।
১৭৪ আল-ইহকাম: ৩/৫৯।
১৭৫ রাওজাতুন নাজির: ১৭৮।
১৭৬ শারহু মুখতাসারির রাওজা: ৫৬২।
১৭৭ আকাওয়িলুস সিকাত: ৪৮।
১৮ উদাহরণস্বরূপ দ্রষ্টব্য- আল-বুরহান: ২/১৫২।
১১৯ আল-ইহকাম: ৩/৬০।
১১০ শারহুল মাকাসিদ: ৩/৫২৪।
*১ শারহুল আকায়িদ: ৯৬।
*২ আল-ইকতিসাদ ফিল ইতিকাদ: ৩৪।