📘 কুফর ও তাকফির > 📄 যাকে তাকফির করা হবে, তার শর্ত

📄 যাকে তাকফির করা হবে, তার শর্ত


১. বিবেকবান হওয়া
এ কারণে কোনো উন্মাদ বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি কুফরি কথা বললে বা কুফরি কাজ করলেও তাকে তাকফির করা হবে না। বেহুঁশ বা মাতাল অবস্থায়ও যদি কারও থেকে কুফর প্রকাশ পায়, তাহলে এর ভিত্তিতে তাকফির করা যাবে না।
২. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া
সুতরাং অপ্রাপ্তবয়স্ক কাউকে তাকফির করা যাবে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই মাসআলার ক্ষেত্রে ইমামগণ থেকে তিন ধরনের মত বর্ণিত হয়েছে :
ক. ইমান ও কুফর উভয় ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া শর্ত। সুতরাং কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক যদি ইমান আনে কিংবা কুফর করে, তাহলে তার ইমান ও কুফর কোনোটিই গৃহীত হবে না; বরং সে পূর্বাবস্থায়ই বহাল থাকবে।
খ. ইমান ও কুফর কোনোটির জন্যই প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া শর্ত নয়; বরং আকল (বুদ্ধি-বিবেক) থাকা ও ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে পারাই যথেষ্ট।
খ. ইমানের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া শর্ত নয়, তবে কুফরের জন্য শর্ত। সুতরাং কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক ইমান গ্রহণ করলে তা বিবেচ্য হবে; কিন্তু সে যদি কুফরি করে, তবে তাকে মুরতাদ বলা হবে না।
প্রথম মতটি ইমাম শাফিয়ি ও ইমাম জুফার রাহ. থেকে বর্ণিত। দ্বিতীয় মতটি ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক ও ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. থেকে বর্ণিত। তৃতীয় মতটি ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. থেকে বর্ণিত。

টিকাঃ
* দ্রষ্টব্য—আল-মুগনি, ইবনু কুদামা : ৯/১৩; বাদায়িউস সানায়ি: ৬/১১৭; আত-তাশরিউল জিনায়িয়্যুল ইসলামي: ২/৫৮৭।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 ইছাকৃত ও সন্তুষ্টিচিত্তে কুফর করা

📄 ইছাকৃত ও সন্তুষ্টিচিত্তে কুফর করা


কোনো মুসলিম থেকে যখন কুফর প্রকাশ পায়, তখন তাকে তাকফির করার আগে যাচাই করে নেওয়া জরুরি যে, সে কি ইচ্ছাকৃতভাবে এবং সন্তুষ্টচিত্তে কুফর করেছিল, নাকি তাকে সে ব্যাপারে বাধ্য করা হয়েছে। কাউকে যদি কুফর করতে বাধ্য করা হয় এবং কুফরি করা ছাড়া তার নিরাপদে বেঁচে আসা দুরূহ হয়ে যায়, তাহলে ইমানের ব্যাপারে অন্তর প্রশান্ত রেখে বাহ্যিকভাবে কুফর করা তার জন্য বৈধ বলে বিবেচিত হয়।
রাসুলের সময়ে সাহাবি আম্মার ইবনু ইয়াসির রা.-কে মুশরিকরা নির্যাতন করে কুফরি কথা বলতে বাধ্য করে। তিনি অন্তরের অপছন্দনীয়তার সঙ্গে মৌখিকভাবে কুফরি উক্তি করে তাদের হাত থেকে ছুটে আসেন। আল্লাহ তখন তাঁর এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আয়াত নাজিল করেন,
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيْمَانِةٍ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنَّ بِالْإِيْمَانِ وَلَكِنْ مَّنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴾
যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ইমান আনার পর তাঁর কুফরিতে লিপ্ত হয়, অবশ্য সে নয়, যাকে কুফরির জন্য বাধ্য করা হয়েছে এবং তার অন্তর ইমানে স্থির রয়েছে; বরং সেই ব্যক্তি, যে কুফরির জন্য নিজ হৃদয় খুলে দিয়েছে-এরূপ লোকের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে গজব নাজিল হবে এবং তাদের জন্য মহা শাস্তি প্রস্তুত রয়েছে। [সুরা নাহল (১৬) : ১০৬]
রাসুল ﷺ আম্মার রা. রাসুলের কাছে এ ঘটনার বিবরণ তুলে ধরলে তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করেন,
كَيْفَ تَجِدُ قَلْبَكَ؟ 'তুমি তোমার অন্তরকে কেমন পাচ্ছ?'
আম্মার রা. বললেন, مطمئنا بالإيمان 'ইমান দ্বারা প্রশান্ত।' রাসুল বলেন,
فإن عادُوا فَعُدْ
'তারা যদি পুনরায় একই আচরণ করে, তবে তুমিও এর পুনরাবৃত্তি করতে পারো।
সুতরাং এর আলোকে প্রমাণিত হলো, কারও যদি প্রাণনাশের আশঙ্কা দেখা দেয়, কুফরি কথা উচ্চারণ না করলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়, তবে তাকে মাজুর (অক্ষম) হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রাণরক্ষার্থে সে মৌখিকভাবে কুফরি কথা উচ্চারণ করলে ক্ষমাযোগ্য হবে। তবে অপরিহার্য শর্ত হলো, তার অন্তর ইমানের ব্যাপারে অবিচল থাকতে হবে। কিন্তু কেউ যদি স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে আন্তরিকভাবে কুফরি কথা বলে, তবে তার ওপর আল্লাহর গজব নাজিল হবে এবং মুকাফফার হওয়ার উপযুক্ত সাব্যস্ত হবে।

টিকাঃ
১১৪৮ জামিউল বায়ান, তাবারি, শায়খ আহমাদ শাকির তাহকিককৃত : ১৭/৩০৪।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 ভুলবশত কুফর করে ফেলার বিধান

📄 ভুলবশত কুফর করে ফেলার বিধান


কেউ যদি ভুলবশত কুফরি কথা বলে ফেলে, যা তার উদ্দেশ্য ছিল না; কিন্তু অনিচ্ছাকৃতভাবে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে, তবে তাকে তাকফির করা যাবে না। সহিহ মুসলিমের এক হাদিসে এসেছে; রাসুল বলেন,
اللهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ حِينَ يَتُوبُ إِلَيْهِ مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضِ فَلَاةٍ فَانْفَلَتَتْ مِنْهُ وَعَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ فَأَيْسَ مِنْهَا فَأَتَى شَجَرَةً فَاضْطَجَعَ فِي ظِلَّهَا قَدْ أَيْسَ مِنْ رَاحِلَتِهِ فَبَيْنَا هُوَ كَذَلِكَ إِذَا هُوَ بِهَا قَائِمَةٌ عِنْدَهُ فَأَخَذَ بِخِطَامِهَا ثُمَّ قَالَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ اللَّهُمَّ أَنْتَ عَبْدِي وَأَنَا رَبُّكَ أَخْطَأَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ .
বান্দা যখন আল্লাহর কাছে তাওবা করে, তখন আল্লাহ ওই লোকের চেয়েও বেশি আনন্দিত হন, যে মরুভূমিতে নিজ সওয়ারির উপর আরোহী ছিল। তারপর সওয়ারিটি তার থেকে হারিয়ে যায়, যে সওয়ারির উপর তার খাদ্য ও পানীয় ছিল। এরপর নিরাশ হয়ে সে একটি গাছের ছায়ায় এসে আরাম করে এবং উটের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় হঠাৎ উটটি তার কাছে এসে দাঁড়ায়। অমনিই সে তার লাগাম ধরে ফেলে। এরপর সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলে ফেলে, হে আল্লাহ! তুমি আমার বান্দা, আমি তোমার রব। মূলত আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে ভুল করে ফেলেছে。
وأما الخاطئ إذا جرى على لسانه كلمة الكفر خطأ بأن كان أراد أن يتكلم بما ليس بكفر فجرى على لسانه كلمة الكفر خطأ لم يكن ذلك كفرا عند الكل بخلاف الهازل لأن الهازل يقول قصدا إلا أنه لا يريد حكمه والخاطئ من يجري على لسانه من غير قصد كلمة مكان كلمة.
'ভুলবশত কোনো ভুলকারীর মুখ থেকে কুফরি কথা বেরিয়ে গেছে—মূলত সে কুফর নয় এমন কিছু বলতে চেয়েছিল; কিন্তু ভুলবশত তার মুখে কুফরি কথা জারি হয়ে গেছে—সবার কাছে তা কুফর নয়। ঠাট্টাকারীর বিষয়টি ভিন্ন। কারণ, ঠাট্টাকারী ইচ্ছাকৃতভাবেই বলে, তবে সে কথার হুকুম উদ্দেশ্য নেয় না। আর ভুলকারীর মুখ ফসকে ভুলবশত এক শব্দের স্থলে অন্য শব্দ বেরিয়ে যায়。

টিকাঃ
* সহিহ মুসলিম: ২৭১৭১।
** ফাতাওয়া কাজিখান: ৩/৩৬২।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 অর্থ জানা নেই এমন কুফরি বাক্য বলার বিধান

📄 অর্থ জানা নেই এমন কুফরি বাক্য বলার বিধান


কেউ যদি এমন কোনো কুফরি কথা বলে ফেলে, যার অর্থ ও মর্ম তার অজানা, এমনকি এই কথা যে কুফরি কথা, সেটাও তার ধারণায় নেই, তাহলে এর কী বিধান? এ ব্যাপারে হানাফি ফকিহগণের মতানৈক্য রয়েছে। একদল ফকিহ এটাকেও কুফর বলে আখ্যায়িত করেছেন। আরেক দল ফকিহ এই অজ্ঞতাকে ওজর হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
যেহেতু কুফরের ভিত্তি অস্বীকারের ওপর। কুফরি কথাকে কুফর অপরিহার্যকারী হিসেবে আখ্যায়িত করার মূল কারণ হলো, তা অন্তরের অস্বীকৃতির প্রমাণ বহন করে। সুতরাং আলোচ্য ক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তিকে তাকফির না করাই যুক্তির দাবি। মোল্লা আলি কারি রাহ. বলেন, 'ফাতাওয়া জাহিরিয়াতে রয়েছে, এ ধরনের কথা যারা বলে, তাদের অর্থ জানা থাক বা না-থাক, অধিকাংশ ইমামের কাছে সর্বাবস্থায় তারা কাফির হয়ে যায়। আমি বলব, এভাবে সর্বাবস্থায় কাফির বলা মুশকিল। কারণ, সে যখন কোনো অনারবি কথা শুনবে এবং তার অর্থ জানার আগেই অনারবদের মতো তা বলে বসবে, তখন তাকে কীভাবে কাফির বলা সম্ভব? অথচ তার (এমন বক্তব্য দ্বারা) কুফরি অর্থ (নেওয়া) উদ্দেশ্য নয়।
ইমাম ইবনু নুজায়ম রাহ. লেখেন,
ولا خلاف أنه لو جرى على لسانه الكفر مخطئا لا يكفر كما في الخانية أيضا، وكذا إذا تلفظ به غير عالم بمعناه.
'এ ব্যাপারে কোনো মতবিরোধ নেই যে, যদি ভুলক্রমে কারও মুখ থেকে কুফরি কথা বেরিয়ে যায়, তাহলে সে কাফির হয় না। অনুরূপ কেউ যদি অর্থ না জেনে কুফরি কথা বলে ফেলে, সে-ও কাফির হয় না।
ইমাম ইজুদ্দিন ইবনু আবদিস সালাম রাহ.-ও এ মত দিয়েছেন।

টিকাঃ
১১৫১ শারহুল ইমাম আলি কারি আলা আলফাজিল কুফর: ২২৩১।
১১৫২ আল-বাহরুর রায়িক: ৩/২৭৭।
১১৫৩ কাওয়ায়িদুল আহকাম ফি মাসালিহিল আনাম: ২/১২০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00