📄 তাকফিরের শর্তাবলি
তাকফির বাস্তবায়নের জন্য তিন জিনিসের প্রয়োজন: (ক) মুকাফফির। অর্থাৎ, যে তাকফির করবে। (খ) মুকাফফার। অর্থাৎ, যাকে তাকফির করা হবে। (গ) যে কথা বা কাজের ভিত্তিতে তাকফির করা হবে, তার শর্ত। প্রতিটির স্বতন্ত্র শর্ত রয়েছে। তাকফির যেহেতু ফাতওয়ার অংশ, তাই কেউ 'মুফতি'রূপে পরিগণিত হতে যা কিছু শর্ত, মুকাফফিরের জন্যও তা শর্ত। এখানে আমরা সংক্ষেপে বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করছি।
📄 মুফতি ও মুকাফফিরের জন্য শর্তাবলি
১. মুকাল্লাফ হওয়া
মুকাল্লাফ বলা হয় এমন ব্যক্তিকে, যে শরিয়ত-পালনে আদিষ্ট। যে ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক, বিবেকবান এবং মুসলিম, সে শরিয়তের মুকাল্লাফ। সুতরাং প্রাপ্তবয়স্ক বালক, বিবেকহীন এবং নিজেই মুসলিম নয় এমন ব্যক্তি মুকাফফির হওয়ার উপযুক্ততা রাখে না।
২. সৎ হওয়া
অনেক ইমামের দৃষ্টিতে মুফতি হতে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হওয়া অপরিহার্য শর্ত। তাঁদের দৃষ্টিতে ফাসিকের (পাপিষ্ঠ)র ফাতওয়া অগ্রহণযোগ্য। হানাফি অনেক ফকিহের মতানুসারে মুফতির জন্য সততা ও ন্যায়পরায়ণতা মৌলিক শর্ত নয়; তবে পূর্ণতা অর্জনের জন্য তা থাকা সংগত। তাঁদের দৃষ্টিতে ফাসিকও যদি উসুল অনুসারে ফাতওয়া দেয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে। আল্লামা ইবনু আবিদিন শামি রাহ. লেখেন,
(وَالْفَاسِقُ لَا يَصْلُحُ مُفْتِيًا) لِأَنَّ الْفَتْوَى مِنْ أُمُورِ الدِّينِ، وَالْفَاسِقُ لَا يُقْبَلُ قَوْلُهُ فِي الدِّيَانَاتِ ابْنُ مَلَكٍ زَادَ الْعَيْنِيُّ وَاخْتَارَهُ كَثِيرٌ مِنْ الْمُتَأَخَّرِينَ وَجَزَمَ بِهِ صَاحِبُ الْمَجْمَعِ فِي مَتْنِهِ وَلَهُ فِي شَرْحِهِ عِبَارَاتٌ بَلِيغَةُ وَهُوَ قَوْلُ الْأَئِمَّةِ الثَّلَاثَةِ أَيْضًا وَظَاهِرُ مَا فِي التَّحْرِيرِ أَنَّهُ لَا يَحِلُّ اسْتِفْتَاؤُهُ اتَّفَافًا كَمَا بَسَطَهُ الْمُصَنِّفُ (وَقِيلَ نَعَمْ يَصْلُحُ) وَبِهِ جَزَمَ فِي الْكَنْزِ؛ لِأَنَّهُ يَجْتَهِدُ حَذَارِ نِسْبَةِ الْخَطَأ
'ফাসিক মুফতি হওয়ার উপযুক্ত নয়। কারণ, ফাতওয়া দীনের বিষয়। আর দীনি বিষয়ে ফাসিকের বক্তব্য গৃহীত হয় না। পরবর্তী অধিকাংশ ফকিহ এই মত গ্রহণ করেছেন। (ইমাম আবু হানিফা রাহ. ছাড়া অপর) তিন ইমামের মতও এটা। আত-তাহরির গ্রন্থের বাহ্যিক বক্তব্য হলো, ফাসিকের কাছে ফাতওয়া জিজ্ঞেস করাই জায়িজ নয়। কেউ কেউ বলেছেন, ফাসিকও মুফতি হতে পারে। কারণ, সে ভুলের ব্যাপারে সতর্ক থেকেই গবেষণা করবে。
এই মতবিরোধ আপন জায়গায় স্বীকৃত। তবে সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, কোনো মুফতি যদি তাকফিরের ব্যাপারে ফিসক (অন্যায় ও পাপাচার) প্রকাশ করে, তবে তার ফাতওয়া একেবারে অগ্রহণযোগ্য। এমনকি ইমাম ইবনুল হুমাম রাহ.-সহ অনেক উসুল-শাস্ত্রবিদ এমন মুফতির কাছে কোনো ফাতওয়া, বিশেষত ইমান ও কুফরের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করা নাজায়িজ বলে মত প্রকাশ করেছেন।
৩. মনোযোগী ও সতর্ক হওয়া
মুফতির জন্য অনেকেই এই শর্ত আরোপ করেছেন। ভুল, অলসতা ও উদাসীনতা যার স্বভাববৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে, সে মুফতি পদের যোগ্য নয়। আল্লামা ইবনু আবিদিন শামি রাহ. লেখেন,
(قَوْلُهُ: وَشَرَطَ بَعْضُهُمْ تَيَقُظَهُ احْتِرَارًا عَمَّنْ غَلَبَ عَلَيْهِ الْغَفْلَةُ وَالسَّهْوُ، قُلْت: وَهَذَا شَرْطُ لَازِمُ فِي زَمَانِنَا، فَإِنَّ الْعَادَةَ الْيَوْمَ أَنَّ مَنْ صَارَ بِيَدِهِ فَتْوَى الْمُفْتِي اسْتَطَالَ عَلَى خَصْمِهِ وَقَهَرَهُ بِمُجَرَّدِ قَوْلِهِ أَفْتَانِي الْمُفْتِي، بِأَنَّ الحَقَّ مَعِي وَالْخَصْمُ جَاهِلُ لَا يَدْرِي مَا فِي الْفَتْوَى، فَلَا بُدَّ أَنْ يَكُونَ الْمُفْتِي مُتَيَقِظًا يَعْلَمُ حِيَلَ النَّاسِ وَدَسَائِسَهُمْ.
'কেউ কেউ মনোযোগ ও সতর্কতাকে শর্ত করেছেন। যাদের গাফলতি ও ভুল প্রবল, তারা তাদের মুফতি হওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করেননি। আমি বলব, আমাদের সময়ে এটি একটি অপরিহার্য শর্ত। কারণ, আজকাল মানুষের রীতি হয়ে গেছে-যার হাতে কোনো মুফতির ফাতওয়া থাকে, সে তার বিরোধীদের শুধু এ কথা বলে দমিয়ে রাখে যে, আমি হকের ওপর আছি। বিরোধী পক্ষ সাধারণত অজ্ঞ থাকে, তারা আদৌ জানে না যে, ফাতওয়ায় কী আছে। এ কারণে মুফতির জন্য সতর্ক হওয়া অপরিহার্য, যিনি মানুষের কূটকৌশল ও চক্রান্ত সম্পর্কে অবগত থাকবেন。
৪. যুগের আচার-প্রথা সম্পর্কে অবগত থাকা
যুগের রীতি, প্রচলন, আচার-ব্যবহার ও পরিভাষার সঙ্গে তাকফিরের সুগভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষত, কোন কথাকে কুফরি কথা হিসেবে বিবেচনা করা হবে, এ বিষয়টি বিবেচনা করতে হয় যুগপ্রথার আলোকে। কিতাবপত্রে যেসব কথাকে কুফরি কথা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে যথাযথ অবগতি একান্ত প্রয়োজন। কখনো এক এলাকার গালি অপর এলাকায় হয়ে যায় সাধারণ বুলি। সুতরাং যে ব্যক্তি যুগের আচার-প্রথা সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞাত নয়, সে কখনো যথাযথভাবে তাকফিরের ফাতওয়া দিতে পারবে না। ফাতাওয়া হাক্কানিয়া গ্রন্থ থেকে একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি সহজে বোঝানো যায়। ফাতাওয়া হাক্কানিয়ার আকায়িদ অধ্যায়ে (১/২৭১) রয়েছে—
প্রশ্ন : এক দীনদার ব্যক্তি মসজিদে আল্লাহর ইবাদত সমাপ্ত করে যখন ঘরে আসে, তখন কোনো ব্যাপার নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া হয়। সে সময় রাগের মাথায় তার মুখ থেকে পশতু ভাষায় এ কথা বেরিয়ে আসে- چہ مونگاه... مسجد میں عبادت کر کے جب گھر آتا ہو تو سب کچھ تم چودیتی ہو۔ 'এখন এ কথাটি কি কুফরি কথা হবে? আর এর কারণে কি সেই ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে?'
উত্তর : যদিও বাহ্যিক বিবেচনায় এ কথা বলা কখনোই সঠিক নয়; কিন্তু এ কথাটি পশতু ভাষার বাকধারা অনুসারে কোনো জিনিস ধ্বংস ও অর্থহীন সাব্যস্ত করতে ব্যবহৃত হয়। তবে এর দ্বারা কোনো জিনিসের তাচ্ছিল্য ও অবমাননা উদ্দেশ্য হয় না। এ কারণে প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে এই দীনদার ব্যক্তি মুসলিম; তার ব্যাপারে কুফরের সন্দেহ বা সংশয় পোষণ করা যাবে না।
টিকাঃ
১** আদ-দুররুল মুখতার মাআ রাদ্দিল মুহতার, দারুল ফিকর বৈরুত: ৫/৩৫১।
📄 যাকে তাকফির করা হবে, তার শর্ত
১. বিবেকবান হওয়া
এ কারণে কোনো উন্মাদ বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি কুফরি কথা বললে বা কুফরি কাজ করলেও তাকে তাকফির করা হবে না। বেহুঁশ বা মাতাল অবস্থায়ও যদি কারও থেকে কুফর প্রকাশ পায়, তাহলে এর ভিত্তিতে তাকফির করা যাবে না।
২. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া
সুতরাং অপ্রাপ্তবয়স্ক কাউকে তাকফির করা যাবে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই মাসআলার ক্ষেত্রে ইমামগণ থেকে তিন ধরনের মত বর্ণিত হয়েছে :
ক. ইমান ও কুফর উভয় ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া শর্ত। সুতরাং কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক যদি ইমান আনে কিংবা কুফর করে, তাহলে তার ইমান ও কুফর কোনোটিই গৃহীত হবে না; বরং সে পূর্বাবস্থায়ই বহাল থাকবে।
খ. ইমান ও কুফর কোনোটির জন্যই প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া শর্ত নয়; বরং আকল (বুদ্ধি-বিবেক) থাকা ও ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে পারাই যথেষ্ট।
খ. ইমানের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া শর্ত নয়, তবে কুফরের জন্য শর্ত। সুতরাং কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক ইমান গ্রহণ করলে তা বিবেচ্য হবে; কিন্তু সে যদি কুফরি করে, তবে তাকে মুরতাদ বলা হবে না।
প্রথম মতটি ইমাম শাফিয়ি ও ইমাম জুফার রাহ. থেকে বর্ণিত। দ্বিতীয় মতটি ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক ও ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. থেকে বর্ণিত। তৃতীয় মতটি ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. থেকে বর্ণিত。
টিকাঃ
* দ্রষ্টব্য—আল-মুগনি, ইবনু কুদামা : ৯/১৩; বাদায়িউস সানায়ি: ৬/১১৭; আত-তাশরিউল জিনায়িয়্যুল ইসলামي: ২/৫৮৭।
📄 ইছাকৃত ও সন্তুষ্টিচিত্তে কুফর করা
কোনো মুসলিম থেকে যখন কুফর প্রকাশ পায়, তখন তাকে তাকফির করার আগে যাচাই করে নেওয়া জরুরি যে, সে কি ইচ্ছাকৃতভাবে এবং সন্তুষ্টচিত্তে কুফর করেছিল, নাকি তাকে সে ব্যাপারে বাধ্য করা হয়েছে। কাউকে যদি কুফর করতে বাধ্য করা হয় এবং কুফরি করা ছাড়া তার নিরাপদে বেঁচে আসা দুরূহ হয়ে যায়, তাহলে ইমানের ব্যাপারে অন্তর প্রশান্ত রেখে বাহ্যিকভাবে কুফর করা তার জন্য বৈধ বলে বিবেচিত হয়।
রাসুলের সময়ে সাহাবি আম্মার ইবনু ইয়াসির রা.-কে মুশরিকরা নির্যাতন করে কুফরি কথা বলতে বাধ্য করে। তিনি অন্তরের অপছন্দনীয়তার সঙ্গে মৌখিকভাবে কুফরি উক্তি করে তাদের হাত থেকে ছুটে আসেন। আল্লাহ তখন তাঁর এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আয়াত নাজিল করেন,
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيْمَانِةٍ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنَّ بِالْإِيْمَانِ وَلَكِنْ مَّنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴾
যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ইমান আনার পর তাঁর কুফরিতে লিপ্ত হয়, অবশ্য সে নয়, যাকে কুফরির জন্য বাধ্য করা হয়েছে এবং তার অন্তর ইমানে স্থির রয়েছে; বরং সেই ব্যক্তি, যে কুফরির জন্য নিজ হৃদয় খুলে দিয়েছে-এরূপ লোকের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে গজব নাজিল হবে এবং তাদের জন্য মহা শাস্তি প্রস্তুত রয়েছে। [সুরা নাহল (১৬) : ১০৬]
রাসুল ﷺ আম্মার রা. রাসুলের কাছে এ ঘটনার বিবরণ তুলে ধরলে তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করেন,
كَيْفَ تَجِدُ قَلْبَكَ؟ 'তুমি তোমার অন্তরকে কেমন পাচ্ছ?'
আম্মার রা. বললেন, مطمئنا بالإيمان 'ইমান দ্বারা প্রশান্ত।' রাসুল বলেন,
فإن عادُوا فَعُدْ
'তারা যদি পুনরায় একই আচরণ করে, তবে তুমিও এর পুনরাবৃত্তি করতে পারো।
সুতরাং এর আলোকে প্রমাণিত হলো, কারও যদি প্রাণনাশের আশঙ্কা দেখা দেয়, কুফরি কথা উচ্চারণ না করলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়, তবে তাকে মাজুর (অক্ষম) হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রাণরক্ষার্থে সে মৌখিকভাবে কুফরি কথা উচ্চারণ করলে ক্ষমাযোগ্য হবে। তবে অপরিহার্য শর্ত হলো, তার অন্তর ইমানের ব্যাপারে অবিচল থাকতে হবে। কিন্তু কেউ যদি স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে আন্তরিকভাবে কুফরি কথা বলে, তবে তার ওপর আল্লাহর গজব নাজিল হবে এবং মুকাফফার হওয়ার উপযুক্ত সাব্যস্ত হবে।
টিকাঃ
১১৪৮ জামিউল বায়ান, তাবারি, শায়খ আহমাদ শাকির তাহকিককৃত : ১৭/৩০৪।