📄 তাকফির করা কার দায়িত্ব
কুরআন মাজিদের অসংখ্য আয়াতে আলিমগণের ওপর এই দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছে, তাঁরা যেন দীনের প্রতিটি বিধান সুস্পষ্টভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেন এবং ইসলামের সীমা ও গণ্ডি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেন। কোথাও স্পষ্টভাবে এসব কথা ঘোষণা করা হয়েছে, কোথাও আহলে কিতাবের আলিমদের দীন গোপন করা, দীনি বিধিবিধানের অপব্যাখ্যা ও বিকৃতি সাধনের কথা উল্লেখ করে নিন্দা ও তিরস্কার করা হয়েছে। বিভিন্নভাবেই উম্মাহর আলিমগণকে যথাযথভাবে দীনের সংরক্ষণ ও প্রচারের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
ইমাম আজুররি রাহ. মুআজ ইবনু জাবাল রা. সূত্রে রাসুল থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেন,
إِذَا حَدَثَ فِي أُمَّتِي الْبِدَعُ وَشُتِمَ أَصْحَابِي فَلْيُظْهِرِ الْعَالِمُ عِلْمَهُ فَمَنْ لَمْ يَفْعَلْ ذَلِكَ مِنْهُمْ فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
আমার উম্মাহর মধ্যে যখন বিদআত উদ্ভাবন এবং আমার সাহাবিদের গালিগালাজ করা হবে, তখন আলিম যেন তার ইলম প্রকাশ করে দেয়। যে তা করবে না, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা এবং সকল মানুষের অভিশাপ。
যেহেতু ইমান ও কুফরের ওপর শরিয়তের অসংখ্য বিধানের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে, তাই কে কাফির আর কে মুমিন, তা স্পষ্ট করে দেওয়া ফকিহগণের গুরুদায়িত্ব। অন্যথায় সমাজে অনেক ভ্রান্তি অনুপ্রবেশ করবে এবং উম্মাহ মারাত্মক ফিতনায় নিপতিত হবে। যেখানে বিদআত দেখেই নীরব থাকতে হাদিসে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে, সেখানে ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত জিনিস কুফর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দুশমন কাফিরদের চিহ্নিত করে দেওয়া কত বেশি গুরুত্ব বহন করে, তা বলাই বাহুল্য। উদাহরণস্বরূপ, কাদিয়ানিদের যদি তাকফির করা না হতো, তাহলে পৃথিবীর লাখো-কোটি মানুষের ইমান হুমকির মধ্যে পড়ে যেত। জিন্দিকরা যেহেতু প্রকাশ্যে নিজেদের মুসলিম বলে পরিচয় দেয়, তাই তাদের চিহ্নিত করে না দেওয়া হলে মানুষের অজান্তেই তারা ইমানকে কুফর দ্বারা বদলে দিত। কারণ, তারা নিজেদের কুফরকে ইসলামের ব্যানারেই উপস্থাপন করে থাকে। হ্যাঁ, তাকফির যেহেতু ফাতওয়ার বিষয় এবং অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর একটি অধ্যায়, তাই এ গুরুদায়িত্ব যোগ্য, বিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ মুফতিদের ওপরই সমর্পিত থাকবে। যার-তার জন্য তাকফিরের দায়িত্ব পালন করতে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার কোনোই সুযোগ নেই।
টিকাঃ
*** আশ-শারিয়া: ২০৭৫।
📄 কুফর ও রিদ্দাহর ভিত্তি
কুফর ও রিদ্দাহর ভিত্তি হচ্ছে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান। ইমান আনার জন্য যে বিষয়গুলো সত্যায়ন করা জরুরি, তার কোনোটি যদি কেউ অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে সে কাফির। যদি শুরু থেকেই সে এই অবস্থার ওপর বেড়ে ওঠে, তাহলে তাকে কাফিরে আসলি তথা আদি কাফির বলা হয়। আর কেউ যদি পূর্বে মুসলিম থাকার পর কুফর অবলম্বনের কারণে কাফির হয়ে যায়, তাহলে তাকে মুরতাদ বলা হয়। এই অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান যে মৌখিকভাবেই হতে হবে, এটা জরুরি নয়; বরং কেউ যদি এমন কিছু বলে বা করে, যা অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যানের স্পষ্ট প্রতিভূ, তবে এর কারণেও সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যাবে। সুতরাং বোঝা গেল, কুফর ও রিদ্দাহ শুধু কথার দ্বারাই হয় না; বরং কাজের দ্বারাও হতে পারে।
📄 তাকফিরের শর্তাবলি
তাকফির বাস্তবায়নের জন্য তিন জিনিসের প্রয়োজন: (ক) মুকাফফির। অর্থাৎ, যে তাকফির করবে। (খ) মুকাফফার। অর্থাৎ, যাকে তাকফির করা হবে। (গ) যে কথা বা কাজের ভিত্তিতে তাকফির করা হবে, তার শর্ত। প্রতিটির স্বতন্ত্র শর্ত রয়েছে। তাকফির যেহেতু ফাতওয়ার অংশ, তাই কেউ 'মুফতি'রূপে পরিগণিত হতে যা কিছু শর্ত, মুকাফফিরের জন্যও তা শর্ত। এখানে আমরা সংক্ষেপে বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করছি।
📄 মুফতি ও মুকাফফিরের জন্য শর্তাবলি
১. মুকাল্লাফ হওয়া
মুকাল্লাফ বলা হয় এমন ব্যক্তিকে, যে শরিয়ত-পালনে আদিষ্ট। যে ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক, বিবেকবান এবং মুসলিম, সে শরিয়তের মুকাল্লাফ। সুতরাং প্রাপ্তবয়স্ক বালক, বিবেকহীন এবং নিজেই মুসলিম নয় এমন ব্যক্তি মুকাফফির হওয়ার উপযুক্ততা রাখে না।
২. সৎ হওয়া
অনেক ইমামের দৃষ্টিতে মুফতি হতে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হওয়া অপরিহার্য শর্ত। তাঁদের দৃষ্টিতে ফাসিকের (পাপিষ্ঠ)র ফাতওয়া অগ্রহণযোগ্য। হানাফি অনেক ফকিহের মতানুসারে মুফতির জন্য সততা ও ন্যায়পরায়ণতা মৌলিক শর্ত নয়; তবে পূর্ণতা অর্জনের জন্য তা থাকা সংগত। তাঁদের দৃষ্টিতে ফাসিকও যদি উসুল অনুসারে ফাতওয়া দেয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে। আল্লামা ইবনু আবিদিন শামি রাহ. লেখেন,
(وَالْفَاسِقُ لَا يَصْلُحُ مُفْتِيًا) لِأَنَّ الْفَتْوَى مِنْ أُمُورِ الدِّينِ، وَالْفَاسِقُ لَا يُقْبَلُ قَوْلُهُ فِي الدِّيَانَاتِ ابْنُ مَلَكٍ زَادَ الْعَيْنِيُّ وَاخْتَارَهُ كَثِيرٌ مِنْ الْمُتَأَخَّرِينَ وَجَزَمَ بِهِ صَاحِبُ الْمَجْمَعِ فِي مَتْنِهِ وَلَهُ فِي شَرْحِهِ عِبَارَاتٌ بَلِيغَةُ وَهُوَ قَوْلُ الْأَئِمَّةِ الثَّلَاثَةِ أَيْضًا وَظَاهِرُ مَا فِي التَّحْرِيرِ أَنَّهُ لَا يَحِلُّ اسْتِفْتَاؤُهُ اتَّفَافًا كَمَا بَسَطَهُ الْمُصَنِّفُ (وَقِيلَ نَعَمْ يَصْلُحُ) وَبِهِ جَزَمَ فِي الْكَنْزِ؛ لِأَنَّهُ يَجْتَهِدُ حَذَارِ نِسْبَةِ الْخَطَأ
'ফাসিক মুফতি হওয়ার উপযুক্ত নয়। কারণ, ফাতওয়া দীনের বিষয়। আর দীনি বিষয়ে ফাসিকের বক্তব্য গৃহীত হয় না। পরবর্তী অধিকাংশ ফকিহ এই মত গ্রহণ করেছেন। (ইমাম আবু হানিফা রাহ. ছাড়া অপর) তিন ইমামের মতও এটা। আত-তাহরির গ্রন্থের বাহ্যিক বক্তব্য হলো, ফাসিকের কাছে ফাতওয়া জিজ্ঞেস করাই জায়িজ নয়। কেউ কেউ বলেছেন, ফাসিকও মুফতি হতে পারে। কারণ, সে ভুলের ব্যাপারে সতর্ক থেকেই গবেষণা করবে。
এই মতবিরোধ আপন জায়গায় স্বীকৃত। তবে সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, কোনো মুফতি যদি তাকফিরের ব্যাপারে ফিসক (অন্যায় ও পাপাচার) প্রকাশ করে, তবে তার ফাতওয়া একেবারে অগ্রহণযোগ্য। এমনকি ইমাম ইবনুল হুমাম রাহ.-সহ অনেক উসুল-শাস্ত্রবিদ এমন মুফতির কাছে কোনো ফাতওয়া, বিশেষত ইমান ও কুফরের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করা নাজায়িজ বলে মত প্রকাশ করেছেন।
৩. মনোযোগী ও সতর্ক হওয়া
মুফতির জন্য অনেকেই এই শর্ত আরোপ করেছেন। ভুল, অলসতা ও উদাসীনতা যার স্বভাববৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে, সে মুফতি পদের যোগ্য নয়। আল্লামা ইবনু আবিদিন শামি রাহ. লেখেন,
(قَوْلُهُ: وَشَرَطَ بَعْضُهُمْ تَيَقُظَهُ احْتِرَارًا عَمَّنْ غَلَبَ عَلَيْهِ الْغَفْلَةُ وَالسَّهْوُ، قُلْت: وَهَذَا شَرْطُ لَازِمُ فِي زَمَانِنَا، فَإِنَّ الْعَادَةَ الْيَوْمَ أَنَّ مَنْ صَارَ بِيَدِهِ فَتْوَى الْمُفْتِي اسْتَطَالَ عَلَى خَصْمِهِ وَقَهَرَهُ بِمُجَرَّدِ قَوْلِهِ أَفْتَانِي الْمُفْتِي، بِأَنَّ الحَقَّ مَعِي وَالْخَصْمُ جَاهِلُ لَا يَدْرِي مَا فِي الْفَتْوَى، فَلَا بُدَّ أَنْ يَكُونَ الْمُفْتِي مُتَيَقِظًا يَعْلَمُ حِيَلَ النَّاسِ وَدَسَائِسَهُمْ.
'কেউ কেউ মনোযোগ ও সতর্কতাকে শর্ত করেছেন। যাদের গাফলতি ও ভুল প্রবল, তারা তাদের মুফতি হওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করেননি। আমি বলব, আমাদের সময়ে এটি একটি অপরিহার্য শর্ত। কারণ, আজকাল মানুষের রীতি হয়ে গেছে-যার হাতে কোনো মুফতির ফাতওয়া থাকে, সে তার বিরোধীদের শুধু এ কথা বলে দমিয়ে রাখে যে, আমি হকের ওপর আছি। বিরোধী পক্ষ সাধারণত অজ্ঞ থাকে, তারা আদৌ জানে না যে, ফাতওয়ায় কী আছে। এ কারণে মুফতির জন্য সতর্ক হওয়া অপরিহার্য, যিনি মানুষের কূটকৌশল ও চক্রান্ত সম্পর্কে অবগত থাকবেন。
৪. যুগের আচার-প্রথা সম্পর্কে অবগত থাকা
যুগের রীতি, প্রচলন, আচার-ব্যবহার ও পরিভাষার সঙ্গে তাকফিরের সুগভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষত, কোন কথাকে কুফরি কথা হিসেবে বিবেচনা করা হবে, এ বিষয়টি বিবেচনা করতে হয় যুগপ্রথার আলোকে। কিতাবপত্রে যেসব কথাকে কুফরি কথা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে যথাযথ অবগতি একান্ত প্রয়োজন। কখনো এক এলাকার গালি অপর এলাকায় হয়ে যায় সাধারণ বুলি। সুতরাং যে ব্যক্তি যুগের আচার-প্রথা সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞাত নয়, সে কখনো যথাযথভাবে তাকফিরের ফাতওয়া দিতে পারবে না। ফাতাওয়া হাক্কানিয়া গ্রন্থ থেকে একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি সহজে বোঝানো যায়। ফাতাওয়া হাক্কানিয়ার আকায়িদ অধ্যায়ে (১/২৭১) রয়েছে—
প্রশ্ন : এক দীনদার ব্যক্তি মসজিদে আল্লাহর ইবাদত সমাপ্ত করে যখন ঘরে আসে, তখন কোনো ব্যাপার নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া হয়। সে সময় রাগের মাথায় তার মুখ থেকে পশতু ভাষায় এ কথা বেরিয়ে আসে- چہ مونگاه... مسجد میں عبادت کر کے جب گھر آتا ہو تو سب کچھ تم چودیتی ہو۔ 'এখন এ কথাটি কি কুফরি কথা হবে? আর এর কারণে কি সেই ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে?'
উত্তর : যদিও বাহ্যিক বিবেচনায় এ কথা বলা কখনোই সঠিক নয়; কিন্তু এ কথাটি পশতু ভাষার বাকধারা অনুসারে কোনো জিনিস ধ্বংস ও অর্থহীন সাব্যস্ত করতে ব্যবহৃত হয়। তবে এর দ্বারা কোনো জিনিসের তাচ্ছিল্য ও অবমাননা উদ্দেশ্য হয় না। এ কারণে প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে এই দীনদার ব্যক্তি মুসলিম; তার ব্যাপারে কুফরের সন্দেহ বা সংশয় পোষণ করা যাবে না।
টিকাঃ
১** আদ-দুররুল মুখতার মাআ রাদ্দিল মুহতার, দারুল ফিকর বৈরুত: ৫/৩৫১।