📄 তাকফির করা আলিমগণের ফরজ দায়িত্ব
হাম্বলি মুতাকাল্লিম শায়খ হাসান ইবনু আলি বারবাহারি রাহ. লেখেন,
ولا نخرج أحدا من أهل القبلة من الإسلام حتى يرد آية من كتاب الله، أو يرد شيئا من آثار رسول الله ﷺ، أو يذبح لغير الله، أو يصلي لغير الله، فإذا فعل شيئا من ذلك فقد وجب عليك أن تخرجه من الإسلام، وإذا لم يفعل شيئا من ذلك فهو مؤمن مسلم بالاسم لا بالحقيقة.
'আমরা কোনো আহলে কিবলাকে ইসলাম থেকে বের করে দেবো না, যতক্ষণ-না সে আল্লাহর কিতাবের কোনো আয়াত প্রত্যাখ্যান করে; অথবা রাসুলের কোনো হাদিস রদ করে; কিংবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে জবাই করে বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উদ্দেশে সালাত পড়ে। যখন সে এ জাতীয় কিছু করবে, তখন তোমার ওপর আবশ্যক হবে, তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেওয়া। আর যতক্ষণ সে এ জাতীয় কিছু না করবে, ততক্ষণ সে নামে মুমিন ও মুসলিম থাকবে; হাকিকিভাবে নয়।
টিকাঃ
১৪০ শারহুস সুন্নাহ: ১/৬৪।
📄 ফিকহের গ্রন্থাদিতে উল্লিখিত কুফরি কথার কারণে তাকফির করার বিধান
ফিকহ ও ফাতওয়ার গ্রন্থাদিতে দেখা যায়, কিতাবুস সিয়ারের অধীনে রিদ্দাহ সম্পর্কিত একটি অধ্যায় থাকে। সেখানে স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদে কুফরি কথা নিয়ে আলোচনা থাকে। যেগুলোকে 'কালিমাতুল কুফর' বা 'আলফাজুল কুফর' শিরোনামে তারা উল্লেখ করে থাকেন। একেক পরিচ্ছেদে কোনো কোনো গ্রন্থে কয়েকশ কুফরি শব্দ ও বাক্য উল্লেখিত থাকে। এখন প্রশ্ন হলো, কেউ যদি এ জাতীয় কথা মুখে উচ্চারণ করে, তাকে কি এর ভিত্তিতে তাকফির করা যাবে?
কারও কারও ধারণা, এই কথাগুলো কুফর হওয়ার বিষয়টি অকাট্য। যার কারণে কেউ যদি এ জাতীয় কোনো কথা মুখে উচ্চারণ করে, তারা তাকে নির্দ্বিধায় তাকফির করে বসে। তারা তালাকের মাসআলার মতো করে কারও মুখে বাংলার এ জাতীয় কথা শুনলে ফিকহ-ফাতওয়ার গ্রন্থে আরবি, ফার্সি বা উর্দুতে সংকলিত বাক্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। যদি এর অনুরূপ বা কাছাকাছি ধরনের বাক্য পেয়ে যায়, তাহলে নির্দ্বিধায় তাকফির করে ফেলে এবং নিচে তথ্যসূত্র হিসেবে এসব গ্রন্থের নাম লিখে দেয়।
আরেক দল আছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে। তারা ফকিহগণ কর্তৃক উল্লেখিত এসব বাক্যকে হিসাবেই ধরে না। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, এই বাক্যগুলোকে 'কুফরি কথা' শিরোনামে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো সতর্কবার্তা ও হুঁশিয়ারি জানানো। বাস্তবে এসব কথা বললে কেউ কাফির হয় না।
উপরিউক্ত উভয় দলই প্রান্তিকতার শিকার। তাদের এসব ধারণা অমূলক ও অবাস্তব। আল্লামা বাজজাজি রাহ. বিষয়টি পরিষ্কার করে লেখেন,
يحكى عن بعض من لا سلف له أنه كان يقول: ما ذكر في الفتاوى أنه يكفر بكذا وكذا للتخويف والتهويل، لا لحقيقة الكفر، وهذا كلام باطل. وحاشا أن يلعب. أمناء الله أعني علماء الأحكام بالحلال والحرام والكفر والإسلام؛ بل لا يقولون إلا الحق الثابت عن سيد الأنام عليه الصلاة والسلام، وما أدي اجتهاد الإمام أخذا من نص القرآن. وما حررته هو مختار مشايخ الشافين لداء العقام، وكل من أتى بعدهم من علماء الدهر والأيام ما بقي دين الإسلام.
'যাদের কোনো সালাফ নেই এমন কারও কারও থেকে বর্ণিত আছে; তারা বলত, “ফাতওয়াসমূহে যে লেখা থাকে—এই এই কারণে মানুষ কাফির হয়ে যায়—এগুলো ভীতি ও হুঁশিয়ারি প্রদর্শনের জন্য বলা হয়; বাস্তবিক কুফর বোঝানোর জন্য নয়।” এটা একটা বাতিল কথা। আল্লাহর আমানতদার ফকিহ আলিমদের শানে এটা তো অবাস্তব ভাবনা যে, তারা হালাল-হারাম ও কুফর-ইসলামকে খেলায় পরিণত করে ফেলবেন। তারা তো শুধু হক কথাই বলেন, যেগুলো রাসুল থেকে প্রমাণিত রয়েছে; অথবা তারা কুরআনের আয়াত থেকে ইজতিহাদ করে উদ্ভাবন করেছেন। আমি যা লিখলাম, তা-ই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল শায়খের মত।’
উপরিউক্ত উদ্ধৃতি দ্বারা স্পষ্ট হলো, মুজতাহিদ ইমামগণ যখন কোনো শব্দ বা বাক্যের ব্যাপারে অভিমত দেন যে—এটা কুফরি কথা—তখন এর দ্বারা বাস্তবিক কুফরই উদ্দেশ্য হয়। তবে যারা ফিকহ-ফাতওয়ার গ্রন্থ থেকে এসব অধ্যায় পাঠ করেছেন, তাদের অজানা নয় যে, পরবর্তীদের গ্রন্থাদিতে সংকলিত সব কুফরি কথা মুজতাহিদ ইমামগণ থেকে বর্ণিত নয়; বরং তার অধিকাংশই পরবর্তীদের সংযোজন। যে কারণে অধিকাংশ কথাই এমন, যাতে স্রেফ কুফরের বাহ্যিক সম্ভাবনা আছে। আমরা পূর্বে আলোচনা করে এসেছি যে, শুধু সম্ভাবনার ভিত্তিতে কখনো তাকফির করা যায় না। এ কারণেই আল্লামা ইবনু নুজায়ম রাহ. নিজের ব্যাপারে বলেন যে, বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখিত এসব কুফরি কথার ভিত্তিতে আমি কাউকে তাকফির করি না। তিনি প্রথমে অন্যান্য ফকিহের রীতি অনুসারে কয়েক পৃষ্ঠাব্যাপী কুফরি কথার ফিরিস্তি উল্লেখ করেন। এরপর এগুলোর শরয়ি বিধান বর্ণনা করেন। সবশেষে তিনি তার সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য দেন,
فعلى هذا فأكثر ألفاظ التكفير المذكورة لا يفتى بالتكفير بها، ولقد ألزمت نفسي أن لا أفتي بشيئ منها.
'উল্লিখিত অধিকাংশ কুফরি কথার কারণেই তাকফিরের ফাতওয়া দেওয়া হবে না। আমি নিজের ওপর আবশ্যক করে নিয়েছি যে, এর কোনোটির কারণেই আমি তাকফিরের ফাতওয়া দেবো না।'
এ ব্যাপারে সবচেয়ে ইনসাফসম্মত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন ইমাম ইবনুল হুমام রাহ.। তিনি কুফরি কথাগুলোকে দু-ভাগে ভাগ করেছেন— (ক) যে কথাগুলো ইমামগণ থেকে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোর কারণে তাকফির করা যাবে। (খ) যে কথাগুলো ইমামগণ থেকে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়নি; বরং পরবর্তীরা সংযোজন করেছে, সেগুলোর ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। তিনি লেখেন,
نعم يقع في كلام أهل المذاهب تكفير كثير، ولكن ليس من كلام الفقهاء الذين هم المجتهدون، بل من غيرهم. ولا عبرة بغير الفقهاء. والمنقول عن المجتهدين ما ذكرنا.
'মাজহাবসমূহের মুফতিগণের কথায় অনেক তাকফির পাওয়া যায়; কিন্তু এগুলো সে-সকল ফকিহের বক্তব্য থেকে গৃহীত নয়, যাঁরা মুজাহিদ ছিলেন; বরং এগুলো অন্যদের থেকে বর্ণিত। অথচ ফকিহ (মুজতাহিদ) ছাড়া অন্যদের কোনো বিবেচনা নেই। মুজতাহিদগণ থেকে সে কথাগুলোই বর্ণিত, যা আমরা উল্লেখ করেছি।
স্মর্তব্য, সতর্কতা অবলম্বনের অর্থ কখনোই এ নয় যে, যে কথাগুলো মুজতাহিদদের থেকে কুফর হিসেবে বর্ণিত হয়নি, সেগুলো কুফরি কথা হিসেবে আখ্যা দেওয়া অপরাধ; বরং এর অর্থ হলো, এসব কথার ব্যাপারে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেওয়া অনুচিত। উসুল এবং নীতির আলোকে এগুলো নিয়ে গবেষণা করতে হবে। যদি কোনো বাক্যের ব্যাপারে উসুল ও নীতির আলোকে প্রতিবন্ধকতা চোখে পড়ে, তাহলে এর ভিত্তিতে কথককে তাকফির করা যাবে না। তবে কোথাও যদি কুফর হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন হয়, তাহলে এর ভিত্তিতে অবশ্যই কথককে তাকফির করা যাবে।
টিকাঃ
১*১ আল-ফাতাওয়াল বাজজাজিয়া আলা হামিশিল হিন্দিয়া: ৬/৩৬০।
১৪২ আল-বাহরুর রায়িক, কিতাবুস সিয়ার, বাবু আহকামিল মুরতাদ্দিন: ৫/১৩৫।
১৪০ ফাতহুল কাদির, কিতাবুস সিয়ার, বাবুল বুগাত : ৬/১০০।