📘 কুফর ও তাকফির > 📄 সংশয় : হাদিসে নিষেধাজ্ঞার পরও আহলে কিবলাকে তাকফির করার যুক্তি কী

📄 সংশয় : হাদিসে নিষেধাজ্ঞার পরও আহলে কিবলাকে তাকফির করার যুক্তি কী


অনেক সময় কিছু ভাই অভিযোগ করেন, হাদিসে তো আহলে কিবলাকে তাকফির করতে নিষেধ করা হয়েছে, তাহলে আলিমগণ মানুষকে তাকফির করেন কেন? রাসূল বলেছেন,
مَنْ صَلَّى صَلَاتَنَا وَاسْتَقْبَلَ قِبْلَتَنَا، وَأَكَلَ ذَبِيحَتَنَا فَذَلِكَ الْمُسْلِمُ الَّذِي لَهُ ذِمَّةُ اللهِ وَذِمَّةُ رَسُولِهِ، فَلَا تُخْفِرُوا اللَّهَ فِي ذِمَّتِهِ
যে ব্যক্তি আমাদের মতো সালাত আদায় করে, আমাদের কিবলামুখী হয় এবং আমাদের জবাই করা প্রাণী খায়, সে-ই মুসলিম; যার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুল জিম্মাদার। সুতরাং তোমরা আল্লাহর জিম্মাদারিতে বিশ্বাসঘাতকতা করো না।
এর আলোকে আকিদা-শাস্ত্রবিদগণ এই মূলনীতি বের করেছেন যে, আহলে কিবলাকে গুনাহের কারণে তাকফির করা হবে না। যেমন, ইমাম তাহাবি রাহ. লেখেন,
وَلا نكفر أحدا من أهل القبلة بذنب ما لم يستحله.
'আমরা গুনাহের কারণে কোনো আহলে কিবলাকে তাকফির করি না, যতক্ষণ-না সে তা হালাল মনে করে।
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবুল হাসান আশআরি রাহ. প্রমুখ ইমামগণ এটাকে দীনের স্বীকৃত আকিদা বলে উল্লেখ করেছেন। অনেক দীনদার ভাই এসব আকিদা পাঠ করে 'আহলে কিবলা' শব্দ দেখে বিভ্রমে পড়ে যায়। তারা ধারণা করে বসে, যে ব্যক্তি কাবার দিকে ফিরে সালাত আদায় করে, সে যত বড় কুফরই করুক না কেন, যত জঘন্য রিদ্দাহে লিপ্ত হোক না কেন, তাকে কোনোভাবেই তাকফির করা যাবে না।
ইমামুল আসর আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমিরি রাহ. তাঁর জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ ইকফারুল মুলহিদিন এবং মুফতি শফি রাহ. ইমান ও কুফর কুরআন ও সুন্নাত কি রৌশনি মে গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে এ সংশয়ের অপনোদন করেছেন। তাঁদের সুদীর্ঘ আলোচনার সারকথা আমরা এখানে উপস্থাপন করছি। মূলত দুটি বিষয় বুঝে নিলে এই সংশয় এমনিতেই দূর হয়ে যায়। একটি হলো আহলে কিবলা কাকে বলে? অপরটি হলো আহলে কিবলাকে তাকফির করতে কেন নিষেধ করা হয়েছে?
১. আহলে কিবলা অর্থ
আহলে কিবলা শব্দের আক্ষরিক ও পারিভাষিক অর্থ ভিন্ন। আক্ষরিক অর্থে আহলে কিবলা বলা হয় সে-সকল ব্যক্তিকে, যারা কাবার দিকে ফিরে সালাত আদায় করে অথবা কাবাকে নিজের কিবলা মনে করে। কিন্তু এখানে এ শব্দ দ্বারা এর আক্ষরিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়; বরং পারিভাষিক অর্থ উদ্দেশ্য।
শরিয়তের পরিভাষায় আহলে কিবলা তাদের বলা হয়, যারা পূর্ণাঙ্গ ইসলাম ও তার অন্তর্ভুক্ত সব জরুরিয়াতে দীন সত্যায়ন করে এবং এর দ্বিধাহীন স্বীকারোক্তি প্রদান করে। কেউ যদি জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়ও অস্বীকার করে, তাহলে ইমামগণ তাকে আহলে কিবলার মধ্যে গণ্য করেন না।
আল্লামা আবদুল আজিজ ফারহাওয়ি রাহ. (মৃত্যু: ১২৩৯ হিজরি) লেখেন,
معناه اللغوي من يصلي إلى الكعبة أو يعتقدها قبلة، وفي اصطلاح المتكلمين من يصدق بضروريات الدين أي الأمور التي علم ثبوتها في الشرع واشتهر. فمن أنكر شيئا من الضروريات كحدوث العالم وعلم الله سبحانه بالجزئيات، لم يكن من أهل القبلة ولو كان مجاهدا في الطاعات، وكذلك من باشر شيئا من أمارات التكذيب كسجود الصنم والإهانة بأمر شرعي والاستهزاء عليه، فليس من أهل القبلة.
'আহলে কিবলার শাব্দিক অর্থ এমন ব্যক্তি, যে কাবার দিকে ফিরে সালাত আদায় করে; অথবা কাবাকে কিবলা মনে করে। আকিদা-বিশেষজ্ঞদের পরিভাষায় এর অর্থ হলো এমন ব্যক্তি, যে জরুরিয়াতে দীন সত্যায়ন করে। জরুরিয়াতে দীন হলো সেসব বিষয়, যা শরিয়তের বিধান হিসেবে সাব্যস্ত হওয়া সুবিদিত এবং সুপ্রসিদ্ধ। সুতরাং যে ব্যক্তি জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত কোনো বিষয় অস্বীকার করবে-যেমন : আল্লাহর অবিনশ্বরতা ও শাখাগত বিষয়গুলোর ব্যাপারে আল্লাহর জ্ঞান ইত্যাদি, সে আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত নয়; যদিও সে ইবাদত- বন্দেগিতে অধ্যবসায়ী হয়। অনুরূপ যে ব্যক্তি এমন কিছু করবে, যা (জরুরিয়াতে দীন) অস্বীকারের নিদর্শন- যেমন: মূর্তিকে সিজদা করা, শরয়ি কোনো বিষয়ের অবমাননা বা তাচ্ছিল্য করা, তাহলে সে আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত নয়।
ইমাম মুজানি রাহ. (মৃত্যু: ২৬৪ হিজরি) আহলুস সুন্নাহর আকিদার বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখেন,
الإمساك عن تكفير أهل القبلة والبراءة منهم فيما أحدثوا ما لم يبتدعوا ضلالا. فمن ابتدع منهم ضلالا كان عن أهل القبلة خارجا، ومن الدين مارقا. ويتقرب إلى الله عز وجل بالبراءة منه . ويهجر ويحتقر وتجتنب غدته، فهي أعدى من غدة الجرب.
'(আহলুস সুন্নাহর আকিদা হলো) আহলে কিবলাকে তাকফির করা থেকে বিরত থাকা এবং তারা (ধর্মীয় বিষয়ে) নিত্যনতুন যা কিছুর উদ্ভব ঘটায়, তার সঙ্গে সম্পর্ক না রাখা; যতক্ষণ-না তারা কোনো গোমরাহিপূর্ণ বিদআত উদ্ভাবন করে। তাদের মধ্যে যে-কেউ কোনো গোমরাহিপূর্ণ বিদআত উদ্ভাবন করবে, সে আহলে কিবলা থেকে বেরিয়ে যাবে এবং দীন থেকে বহিষ্কৃত হবে। তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা হবে। তাকে পরিত্যাগ করা হবে। লাঞ্ছিত করা হবে এবং তার সংক্রামক ব্যাধি থেকে সতর্কতা গ্রহণ করা হবে। কারণ, তা খোস-পাঁচড়া থেকেও অধিক সংক্রামক।
আল্লামা সাআদ তাফতাজানি রাহ. লেখেন,
ومعناه أن الذين اتفقوا على ما هو من ضروريات الإسلام كحدوث العالم وحشر الأجساد وما أشبه ذلك واختلفوا في أصول سواها كمسألة الصفات وخلق الأعمال وعموم الإرادة وقدم الكلام وجواز الرؤية ونحو ذلك مما لا نزاع فيه أن الحق فيها واحد هل يكفر المخالف للحق بذلك الاعتقاد وبالقول به أم لا وإلا فلا نزاع في كفر أهل القبلة المواظب طول العمر على الطاعات باعتقاد قدم العالم ونفي الحشر ونفي العلم بالجزئيات ونحو ذلك وكذا بصدور شيء من موجبات الكفر عنه
'যে আহলে কিবলাকে তাকফির করা নিয়ে মতবিরোধ হয়েছে, সে হচ্ছে এমন ব্যক্তি, যে জরুরিয়াতে দীন—যেমন : পৃথিবীর নশ্বরতা, (কিয়ামতের দিন) দৈহিক পুনরুত্থান ইত্যাদি—এর ব্যাপারে একমত, তবে শাখাগত কোনো বিষয়— যেমন : আল্লাহর সিফাতের মাসআলার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে। কোনো আহলে কিবলা নামধারী যদি সারা জীবন ইবাদত-বন্দেগিতে রত থাকে; কিন্তু এর পাশাপাশি জগতের অবিনশ্বরতা, (কিয়ামতের দিন) দৈহিক পুনরুত্থানের অস্বীকৃতি ও শাখাগত বিষয়সমূহের ব্যাপারে আল্লাহর জ্ঞান নেই বলে বিশ্বাস রাখে; কিংবা তার থেকে কুফর অপরিহার্যকারী কোনো বিষয় প্রকাশ হয়, তবে তার কাফির হওয়ার ব্যাপারে কোনো মতবিরোধ নেই।
২. আহলে কিবলাকে তাকফির করা নিষেধ কেন
আনাস ইবনু মালিক রা. বর্ণনা করেন; রাসুল বলেছেন,
ثَلَاثُ مِنْ أَصْلِ الْإِيمَانِ : الْكَفُّ عَمَّنْ قَالَ : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ، وَلَا نُكَفِّرُهُ بِذَنْبٍ، وَلَا تُخْرِجُهُ مِنَ الْإِسْلَامِ بِعَمَلٍ، وَالْجِهَادُ مَاضٍ مُنْذُ بَعَثَنِي اللَّهُ إِلَى أَنْ يُقَاتِلَ آخِرُ أُمَّتِي الدَّجَّالَ، لَا يُبْطِلُهُ جَوْرُ جَائِرٍ، وَلَا عَدْلُ عَادِلٍ، وَالْإِيمَانُ بِالْأَقْدَارِ
তিনটি বিষয় ইমানের মূলের অন্তর্ভুক্ত। (এক) যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পড়বে, তার ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা, কোনো গুনাহের কারণে তাকে তাকফির না করা এবং কোনো আমলের কারণে তাকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার না করা। (দুই) আমাকে (রাসুল করে) পাঠানোর সময় থেকে জিহাদ চালু রয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। অবশেষে উম্মাহর জিহাদকারী শেষ দল দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। কোনো অত্যাচারী শাসকের অত্যাচার অথবা কোনো ন্যায়পরায়ণ শাসকের ইনসাফ এটাকে রহিত করতে পারবে না। (তিন) তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস রাখা。
এই বর্ণনাটিকে যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যাচ্ছে, এখানে আহলে কিবলাকে স্রেফ গুনাহের কারণে তাকফির করতে নিষেধ করা হয়েছে। আর প্রকাশ থাকে যে, কুফর ও গুনাহ এককথা নয়। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো, যে ব্যক্তি পারিভাষিক সংজ্ঞা অনুসারে আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত, শুধু কোনো গুনাহের কারণে এমন ব্যক্তিকে তাকফির করা হবে না। তবে সে যদি স্পষ্ট ও অকাট্য কুফরে লিপ্ত হয়, যার দ্বারা সে আর আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত থাকে না-এমন ব্যক্তির বিধান এসব হাদিসে উল্লেখিত হয়নি। এ জন্য আকিদার বিভিন্ন গ্রন্থে যেখানে আহলে কিবলাকে তাকফির করার নিষেধাজ্ঞার কথা এসেছে, সেখানে এই গুনাহের কথাও উল্লেখিত হয়েছে। ইমাম তাহাবি রাহ. লেখেন,
وَلَا نُكَفِّرُ أَحَدًا مِنْ أَهْلِ الْقِبْلَةِ بِذَنْبِ مَا لَمْ يَسْتَحِلَّهُ.
'আমরা গুনাহের কারণে কোনো আহলে কিবলাকে তাকফির করি না, যতক্ষণ- না সে তা হালাল মনে করে。
ফকিহগণ যে ব্যক্তিকে তাকফির করেন, সে তো আহলে কিবলারই অন্তর্ভুক্ত নয়। আর তাকে তাকফির করার কারণ কোনো গুনাহ নয়; বরং সুস্পষ্ট কুফর। ইমাম ইবনু নুজায়ম রাহ. লেখেন,
لا يكفر أحد من أهل القبلة إلا بجحود ما أدخله فيه.
'কোনো আহলে কিবলাকে শুধু এমন বিষয় অস্বীকারের কারণেই তাকফির করা হয়, যার প্রতি সত্যায়ন তাকে আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত করেছিল।’
মোল্লা আলি কারি রাহ. বলেন,
إن المراد بعدم تكفير أحد من أهل القبلة عند أهل السنة أنه لا يكفر أحد ما لم يوجد شيئ من أمارات الكفر وعلاماته ولم يصدر عنه شيئ من موجباته.
'আহলুস সুন্নাহর দৃষ্টিতে আহলে কিবলাকে তাকফির না করার অর্থ হলো, কাউকে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকফির করা হবে না, যতক্ষণ-না তার থেকে কুফরের কোনো আলামত ও নিদর্শন পাওয়া যাবে এবং তার থেকে কুফর অপরিহার্যকারী কোনো বিষয় প্রকাশিত হবে。
আল্লামা ফারহাওয়ি রাহ. বলেন,
ومعنى عدم تكفير أهل القبلة أن لا يكفر بارتكاب المعاصي ولا بإنكار الأمور الخفية غير المشهورة، هذا ما حققه المحققون، فاحفظه.
'আহলে কিবলাকে তাকফির না করার অর্থ হলো, গুনাহে লিপ্ত হওয়া এবং অপ্রসিদ্ধ সূক্ষ্ম বিষয় অস্বীকারের কারণে তাকে তাকফির করা হবে না। মুহাক্কিকগণ এই তাহকিকই করেছেন, সুতরাং এটা মুখস্থ রেখো。
ইমাম ইবনু দাকিক আল-ইদ রাহ. লেখেন,
الحق أنه لا يكفر أحد من أهل القبلة إلا بإنكار متواتر من الشريعة عن صاحبها؛ فإنه يكون مكذبا للشرع.
'হক কথা হলো, আহলে কিবলাকে তাকফির করা হবে শুধু শরিয়তের কোনো মুতাওয়াতির (প্রজন্ম পরম্পরায় স্বীকৃত) বিষয় অস্বীকারের কারণে। কেননা, তখন সে শরিয়া প্রত্যাখ্যানকারী হচ্ছে。
ইমাম রাজি রাহ. লেখেন,
المختار عندنا أنه لا يكفر أحد من أهل القبلة إلا بدليل منفصل، ويدل عليه النصوص والمعقول.
'আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য অভিমত হলো, কোনো আহলে কিবলাকে স্বতন্ত্র দলিলের ভিত্তিতেই তাকফির করা যায়। নুসুস ও যুক্তির দ্বারা এটা প্রমাণিত।

টিকাঃ
১২৮ প্রাগুক্ত: ৩৯১।
*** আল-আকিদাতুত তাহাবিয়া, আকিদা : ৫৭।
১৩০ আন-নিবরাস: ৩৪১।
১১০১ শারহুস সুন্নাহ: ৮৪।
১১০২ শারহুল মাকাসিদ ফি ইলমিল কালাম: ২/২৬৯।
১৩০৩ সুনানু আবি দাউদ : ২৫৩২। ইমাম আবু দাউদ রাহ. হাদিসটি বর্ণনা করে নীরব থেকেছেন। ইমাম বায়হাকি রাহ. আল-ইতিকাদ গ্রন্থে (পৃ. ২২০) বলেছেন, এর কয়েকটি সমার্থক বর্ণনা রয়েছে। শায়খ শুয়াইব আরনাউত রাহ. বলেছেন, আনাস রা. থেকে যিনি এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, যার নাম ইয়াজিদ ইবনু আবি নুশায়বা, তিনি মাজহুল। তবে সনদের অন্য সকল বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য। [তাখরিজু শারহিত তাহাবিয়া : ৫৩০; তাখরিজুল আওয়াসিম ওয়াল কাওয়াসিম : ৪/৩৭০] তা ছাড়া হাদিসটির এই সনদে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও ফকিহগণের কাছে এটি সমাদৃত। এর আলোকে যুগে যুগে তাকফিরের নীতিমালা রচিত ও চর্চিত হয়েছে। সুতরাং এটি প্রমাণযোগ্য।
১৩০৪ আল-আকিদাতুত তাহাবিয়া, আকিদা: ৫৭।
১** আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়ির, কিতাবুস সিয়ার, বাবুর রিদ্দাহ: ১৫৯।
১০৬ শারহুল ফিকহিল আকবার: ২৫৮।
১** আন-নিবরাস: ৫৪৯।
*** ইহকামুল আহকাম শারহু উমদাতিল আহকাম: ২/২১০।
১৪৯ মাআলিমু উসুলিদ দীন: ১৩৭।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 তাকফির করা আলিমগণের ফরজ দায়িত্ব

📄 তাকফির করা আলিমগণের ফরজ দায়িত্ব


হাম্বলি মুতাকাল্লিম শায়খ হাসান ইবনু আলি বারবাহারি রাহ. লেখেন,
ولا نخرج أحدا من أهل القبلة من الإسلام حتى يرد آية من كتاب الله، أو يرد شيئا من آثار رسول الله ﷺ، أو يذبح لغير الله، أو يصلي لغير الله، فإذا فعل شيئا من ذلك فقد وجب عليك أن تخرجه من الإسلام، وإذا لم يفعل شيئا من ذلك فهو مؤمن مسلم بالاسم لا بالحقيقة.
'আমরা কোনো আহলে কিবলাকে ইসলাম থেকে বের করে দেবো না, যতক্ষণ-না সে আল্লাহর কিতাবের কোনো আয়াত প্রত্যাখ্যান করে; অথবা রাসুলের কোনো হাদিস রদ করে; কিংবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে জবাই করে বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উদ্দেশে সালাত পড়ে। যখন সে এ জাতীয় কিছু করবে, তখন তোমার ওপর আবশ্যক হবে, তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেওয়া। আর যতক্ষণ সে এ জাতীয় কিছু না করবে, ততক্ষণ সে নামে মুমিন ও মুসলিম থাকবে; হাকিকিভাবে নয়।

টিকাঃ
১৪০ শারহুস সুন্নাহ: ১/৬৪।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 ফিকহের গ্রন্থাদিতে উল্লিখিত কুফরি কথার কারণে তাকফির করার বিধান

📄 ফিকহের গ্রন্থাদিতে উল্লিখিত কুফরি কথার কারণে তাকফির করার বিধান


ফিকহ ও ফাতওয়ার গ্রন্থাদিতে দেখা যায়, কিতাবুস সিয়ারের অধীনে রিদ্দাহ সম্পর্কিত একটি অধ্যায় থাকে। সেখানে স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদে কুফরি কথা নিয়ে আলোচনা থাকে। যেগুলোকে 'কালিমাতুল কুফর' বা 'আলফাজুল কুফর' শিরোনামে তারা উল্লেখ করে থাকেন। একেক পরিচ্ছেদে কোনো কোনো গ্রন্থে কয়েকশ কুফরি শব্দ ও বাক্য উল্লেখিত থাকে। এখন প্রশ্ন হলো, কেউ যদি এ জাতীয় কথা মুখে উচ্চারণ করে, তাকে কি এর ভিত্তিতে তাকফির করা যাবে?
কারও কারও ধারণা, এই কথাগুলো কুফর হওয়ার বিষয়টি অকাট্য। যার কারণে কেউ যদি এ জাতীয় কোনো কথা মুখে উচ্চারণ করে, তারা তাকে নির্দ্বিধায় তাকফির করে বসে। তারা তালাকের মাসআলার মতো করে কারও মুখে বাংলার এ জাতীয় কথা শুনলে ফিকহ-ফাতওয়ার গ্রন্থে আরবি, ফার্সি বা উর্দুতে সংকলিত বাক্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। যদি এর অনুরূপ বা কাছাকাছি ধরনের বাক্য পেয়ে যায়, তাহলে নির্দ্বিধায় তাকফির করে ফেলে এবং নিচে তথ্যসূত্র হিসেবে এসব গ্রন্থের নাম লিখে দেয়।
আরেক দল আছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে। তারা ফকিহগণ কর্তৃক উল্লেখিত এসব বাক্যকে হিসাবেই ধরে না। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, এই বাক্যগুলোকে 'কুফরি কথা' শিরোনামে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো সতর্কবার্তা ও হুঁশিয়ারি জানানো। বাস্তবে এসব কথা বললে কেউ কাফির হয় না।
উপরিউক্ত উভয় দলই প্রান্তিকতার শিকার। তাদের এসব ধারণা অমূলক ও অবাস্তব। আল্লামা বাজজাজি রাহ. বিষয়টি পরিষ্কার করে লেখেন,
يحكى عن بعض من لا سلف له أنه كان يقول: ما ذكر في الفتاوى أنه يكفر بكذا وكذا للتخويف والتهويل، لا لحقيقة الكفر، وهذا كلام باطل. وحاشا أن يلعب. أمناء الله أعني علماء الأحكام بالحلال والحرام والكفر والإسلام؛ بل لا يقولون إلا الحق الثابت عن سيد الأنام عليه الصلاة والسلام، وما أدي اجتهاد الإمام أخذا من نص القرآن. وما حررته هو مختار مشايخ الشافين لداء العقام، وكل من أتى بعدهم من علماء الدهر والأيام ما بقي دين الإسلام.
'যাদের কোনো সালাফ নেই এমন কারও কারও থেকে বর্ণিত আছে; তারা বলত, “ফাতওয়াসমূহে যে লেখা থাকে—এই এই কারণে মানুষ কাফির হয়ে যায়—এগুলো ভীতি ও হুঁশিয়ারি প্রদর্শনের জন্য বলা হয়; বাস্তবিক কুফর বোঝানোর জন্য নয়।” এটা একটা বাতিল কথা। আল্লাহর আমানতদার ফকিহ আলিমদের শানে এটা তো অবাস্তব ভাবনা যে, তারা হালাল-হারাম ও কুফর-ইসলামকে খেলায় পরিণত করে ফেলবেন। তারা তো শুধু হক কথাই বলেন, যেগুলো রাসুল থেকে প্রমাণিত রয়েছে; অথবা তারা কুরআনের আয়াত থেকে ইজতিহাদ করে উদ্ভাবন করেছেন। আমি যা লিখলাম, তা-ই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল শায়খের মত।’
উপরিউক্ত উদ্ধৃতি দ্বারা স্পষ্ট হলো, মুজতাহিদ ইমামগণ যখন কোনো শব্দ বা বাক্যের ব্যাপারে অভিমত দেন যে—এটা কুফরি কথা—তখন এর দ্বারা বাস্তবিক কুফরই উদ্দেশ্য হয়। তবে যারা ফিকহ-ফাতওয়ার গ্রন্থ থেকে এসব অধ্যায় পাঠ করেছেন, তাদের অজানা নয় যে, পরবর্তীদের গ্রন্থাদিতে সংকলিত সব কুফরি কথা মুজতাহিদ ইমামগণ থেকে বর্ণিত নয়; বরং তার অধিকাংশই পরবর্তীদের সংযোজন। যে কারণে অধিকাংশ কথাই এমন, যাতে স্রেফ কুফরের বাহ্যিক সম্ভাবনা আছে। আমরা পূর্বে আলোচনা করে এসেছি যে, শুধু সম্ভাবনার ভিত্তিতে কখনো তাকফির করা যায় না। এ কারণেই আল্লামা ইবনু নুজায়ম রাহ. নিজের ব্যাপারে বলেন যে, বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখিত এসব কুফরি কথার ভিত্তিতে আমি কাউকে তাকফির করি না। তিনি প্রথমে অন্যান্য ফকিহের রীতি অনুসারে কয়েক পৃষ্ঠাব্যাপী কুফরি কথার ফিরিস্তি উল্লেখ করেন। এরপর এগুলোর শরয়ি বিধান বর্ণনা করেন। সবশেষে তিনি তার সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য দেন,
فعلى هذا فأكثر ألفاظ التكفير المذكورة لا يفتى بالتكفير بها، ولقد ألزمت نفسي أن لا أفتي بشيئ منها.
'উল্লিখিত অধিকাংশ কুফরি কথার কারণেই তাকফিরের ফাতওয়া দেওয়া হবে না। আমি নিজের ওপর আবশ্যক করে নিয়েছি যে, এর কোনোটির কারণেই আমি তাকফিরের ফাতওয়া দেবো না।'
এ ব্যাপারে সবচেয়ে ইনসাফসম্মত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন ইমাম ইবনুল হুমام রাহ.। তিনি কুফরি কথাগুলোকে দু-ভাগে ভাগ করেছেন— (ক) যে কথাগুলো ইমামগণ থেকে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোর কারণে তাকফির করা যাবে। (খ) যে কথাগুলো ইমামগণ থেকে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়নি; বরং পরবর্তীরা সংযোজন করেছে, সেগুলোর ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। তিনি লেখেন,
نعم يقع في كلام أهل المذاهب تكفير كثير، ولكن ليس من كلام الفقهاء الذين هم المجتهدون، بل من غيرهم. ولا عبرة بغير الفقهاء. والمنقول عن المجتهدين ما ذكرنا.
'মাজহাবসমূহের মুফতিগণের কথায় অনেক তাকফির পাওয়া যায়; কিন্তু এগুলো সে-সকল ফকিহের বক্তব্য থেকে গৃহীত নয়, যাঁরা মুজাহিদ ছিলেন; বরং এগুলো অন্যদের থেকে বর্ণিত। অথচ ফকিহ (মুজতাহিদ) ছাড়া অন্যদের কোনো বিবেচনা নেই। মুজতাহিদগণ থেকে সে কথাগুলোই বর্ণিত, যা আমরা উল্লেখ করেছি।
স্মর্তব্য, সতর্কতা অবলম্বনের অর্থ কখনোই এ নয় যে, যে কথাগুলো মুজতাহিদদের থেকে কুফর হিসেবে বর্ণিত হয়নি, সেগুলো কুফরি কথা হিসেবে আখ্যা দেওয়া অপরাধ; বরং এর অর্থ হলো, এসব কথার ব্যাপারে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেওয়া অনুচিত। উসুল এবং নীতির আলোকে এগুলো নিয়ে গবেষণা করতে হবে। যদি কোনো বাক্যের ব্যাপারে উসুল ও নীতির আলোকে প্রতিবন্ধকতা চোখে পড়ে, তাহলে এর ভিত্তিতে কথককে তাকফির করা যাবে না। তবে কোথাও যদি কুফর হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন হয়, তাহলে এর ভিত্তিতে অবশ্যই কথককে তাকফির করা যাবে।

টিকাঃ
১*১ আল-ফাতাওয়াল বাজজাজিয়া আলা হামিশিল হিন্দিয়া: ৬/৩৬০।
১৪২ আল-বাহরুর রায়িক, কিতাবুস সিয়ার, বাবু আহকামিল মুরতাদ্দিন: ৫/১৩৫।
১৪০ ফাতহুল কাদির, কিতাবুস সিয়ার, বাবুল বুগাত : ৬/১০০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00