📄 সুনিশ্চিত কাফিরকে তাকফির না করা স্বতন্ত্র কুফর
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কুফর অবলম্বনের পরও তাদের তাকফির না করার বড় একটি ক্ষতি হলো, কেউ সুনিশ্চিতভাবে কুফর করার পরও তাকে মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তার অনুসৃত দীন ও আদর্শকে 'ইসলাম' বলে আখ্যায়িত করা হয়। কুফরকে ইসলাম নামে নামকরণ করা যে কত বড় অপরাধ, তা আর বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে না। উপরন্তু ইমাম তাহাবির উল্লেখ করা ইল্লত (Cause)-এর আলোকে পর্যালোচনা করলে এটাকে স্বতন্ত্র কুফরই বলতে হয়। এমনকি ইমাম কাজي ইয়াজ রাহ. (মৃত্যু: ৫৪৪ হিজরি) এ ব্যাপারে উম্মাহর ইজমা উদ্ধৃত করেছেন যে, সুনিশ্চিত কাফিরকে তাকফির না করা কুফর। তিনি লেখেন,
قال محمد بن سحنون: أجمع العلماء أن شاتم النبي ﷺ المنتقص له كافر، والوعيد جار عليه بعذاب الله له، وحكمه عند الأمة فتل؛ ومن شك في كفره وعذابه كفر.
'ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সুহনুন রাহ. (মৃত্যু: ২৪০ হিজরি) বলেন, আলিমগণ এ ব্যাপারে ইজমা করেছেন-যে ব্যক্তি নবি ﷺ-কে গালি দেবে, তাঁর অবমাননা করবে, সে কাফির। তার ওপর আল্লাহর শাস্তির হুঁশিয়ারি প্রযোজ্য হবে। উম্মাহর কাছে তার বিধান হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। যে ব্যক্তি তার কুফর ও আজাবের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করবে, সে-ও কাফির হয়ে যাবে।
ইমামুল হারামাইন আবুল মাআলি জুওয়াইনি রাহ. (মৃত্যু : ৪৭৮ হিজরি) বলেন,
لأن إدخال كافر في الملة وإخراج مسلم عنها عظيم في الدين.
'কারণ, কোনো কাফিরকে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত করা এবং কোনো মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে দেওয়া, উভয়টিদীনিবিবেচনায় অত্যন্ত গুরুতর ব্যাপার।
টিকাঃ
১** আশ-শিফা বি তারিফি হুকুকিল মুসতাফা মাআ হাশিয়াতিশ শুমুন্নি: ২/২১৫।
১১২৬ প্রাগুক্ত: ২/২,৭৭।
📄 তাকফিরের ব্যাপারে সাহাবিগণের দায়িত্ববোধ
রাসুলের ইনতিকালের পর আরবে বসতির পর বসতি মুরতাদ হতে থাকে। কেউ বাপ-দাদার জাহিলি ধর্মে ফিরে যাচ্ছিল, কেউ মুসায়লিমা কাজজাব ও আসওয়াদ আনসির নবুওয়াতের ওপর ইমান এনে রাসুলের খতমে নবুওয়াত অস্বীকার করছিল। এভাবে হাজার হাজার মানুষ ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যেতে লাগল। এর মধ্যে এক দল এমন ছিল, যারা সালাত ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য করেছিল। তাদের ভ্রান্তির মূল উৎসই ছিল বাহ্যিকতাবাদ বা অক্ষরবাদ (Literalism)। তারা কিছু নুসুসের বাহ্যিক অর্থকে পুঁজি বানিয়ে জাকাতকে রাসুলের যুগের সঙ্গে বিশেষিত বলে প্রচার করত এবং দারুল খিলাফাহর প্রতিনিধির কাছে জাকাত তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানাত। সব ক্ষেত্রে অক্ষরবাদ ও বাহ্যিকতাবাদের চর্চা ব্যক্তির ধ্বংস ডেকে আনে। খারেজিরাও বিপথগামী হয়েছিল এই সূত্র ধরে। অক্ষরবাদ তাদের ভয়াবহ পর্যায়ের তাকফিরপ্রবণ বানিয়ে ছেড়েছিল।
আবু বকর রা. উল্লিখিত গোষ্ঠীকে তাকফির করে তাদের বিরুদ্ধে মুজাহিদ-বাহিনী পাঠিয়েছিলেন। সকল সাহাবিও তাঁর সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। শুরুতে উমর রা.-এর এ ব্যাপারে আপত্তি ছিল; তবে আবু বকর রা.-এর সঙ্গে আলোচনার পর তিনিও এর সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছিলেন। ইমাম বুখারি রাহ. তাঁর সহিহ গ্রন্থে আবু হুরায়রা রা. সূত্রে বর্ণনা করেন,
لَمَّا تُوُفِّيَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَاسْتُخْلِفَ أَبُو بَكْرٍ بَعْدَهُ، وَكَفَرَ مَنْ كَفَرَ مِنَ العَرَبِ، قَالَ عُمَرُ لِأَبِي بَكْرٍ: كَيْفَ تُقَاتِلُ النَّاسَ؟ وَقَدْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ : « أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَمَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ عَصَمَ مِنِّي مَالَهُ وَنَفْسَهُ، إِلَّا بِحَقِّهِ وَحِسَابُهُ عَلَى اللَّهِ ، فَقَالَ: وَاللَّهِ لَأُقَاتِلَنَّ مَنْ فَرَّقَ بَيْنَ الصَّلاةِ وَالزَّكَاةِ، فَإِنَّ الزَّكَاةَ حَقُّ المَالِ، وَاللَّهِ لَوْ مَنَعُونِي عِقَالًا كَانُوا يُؤَدُّونَهُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ لَقَاتَلْتُهُمْ عَلَى مَنْعِهِ، فَقَالَ عُمَرُ: «فَوَاللَّهِ مَا هُوَ إِلَّا أَنْ رَأَيْتُ اللَّهَ قَدْ شَرَحَ صَدْرَ أَبِي بَكْرٍ لِلْقِتَالِ، فَعَرَفْتُ أَنَّهُ الحَقُّ»
রাসুল যখন ইনতিকাল করলেন আর তার পরে আবু বকর রা.-কে খলিফা করা হলো এবং আরবের যারা কাফির হওয়ার তারা কাফির হয়ে গেল, তখন উমর রা. আবু বকর রা.-কে বললেন, আপনি কী করে লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন; অথচ রাসুল বলেছেন, আমি মানুষের সঙ্গে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার পূর্ব পর্যন্ত যুদ্ধ করতে নির্দেশপ্রাপ্ত। অতএব, যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলল, সে তার প্রাণ ও সম্পদকে আমার থেকে নিরাপদ করে নিল। তবে ইসলামি বিধানের আওতায় পড়লে আলাদা। তাদের প্রকৃত হিসাব আল্লাহর কাছে হবে। আবু বকর রা. বললেন, যারা সালাত ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য করে, আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। কারণ, জাকাত হলো সম্পদের হক। আল্লাহর শপথ, যদি তারা রাসুলের কাছে যে উটের বাচ্চা (জাকাত হিসেবে) আদায় করত, আমার কাছে তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলেও আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। উমর রা. বললেন, আল্লাহর কসম, আমি দেখছিলাম যে, যুদ্ধ করতে আল্লাহ তাআলা আবু বকরের বক্ষ উন্মোচিত করে দিয়েছিলেন। সুতরাং আমি বুঝতে পারলাম, এ সিদ্ধান্ত সঠিক।
আবু বকর রা. এ প্রসঙ্গেই স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো তাঁর সেই ঐতিহাসিক কথাটি বলেছিলেন,
إنه قد انقطع الوحي وتم الدين، أينقص وأنا حي؟
ওহির ধারা বন্ধ হয়েছে। দীন পরিপূর্ণ হয়েছে। আমি জীবিত থাকতে সেই দীন কি হ্রাসপ্রাপ্ত হতে পারে?
এর আলোকে প্রতিভাত হয়, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে রিদ্দাহ প্রকাশ পেলে আলিম ও আমিরের জন্য অপরিহার্য হলো, তাদের চিহ্নিত করা এবং তাদের ফিতনার ব্যাপারে উম্মাহকে সজাগ, সচেতন ও সতর্ক করা দরকার, যাতে করে মুসলিম জনসাধারণের ইমান সুরক্ষিত থাকে।
টিকাঃ
১২৭ সহিহ বুখারি: ৭২৮৪।
📄 সংশয় : হাদিসে নিষেধাজ্ঞার পরও আহলে কিবলাকে তাকফির করার যুক্তি কী
অনেক সময় কিছু ভাই অভিযোগ করেন, হাদিসে তো আহলে কিবলাকে তাকফির করতে নিষেধ করা হয়েছে, তাহলে আলিমগণ মানুষকে তাকফির করেন কেন? রাসূল বলেছেন,
مَنْ صَلَّى صَلَاتَنَا وَاسْتَقْبَلَ قِبْلَتَنَا، وَأَكَلَ ذَبِيحَتَنَا فَذَلِكَ الْمُسْلِمُ الَّذِي لَهُ ذِمَّةُ اللهِ وَذِمَّةُ رَسُولِهِ، فَلَا تُخْفِرُوا اللَّهَ فِي ذِمَّتِهِ
যে ব্যক্তি আমাদের মতো সালাত আদায় করে, আমাদের কিবলামুখী হয় এবং আমাদের জবাই করা প্রাণী খায়, সে-ই মুসলিম; যার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুল জিম্মাদার। সুতরাং তোমরা আল্লাহর জিম্মাদারিতে বিশ্বাসঘাতকতা করো না।
এর আলোকে আকিদা-শাস্ত্রবিদগণ এই মূলনীতি বের করেছেন যে, আহলে কিবলাকে গুনাহের কারণে তাকফির করা হবে না। যেমন, ইমাম তাহাবি রাহ. লেখেন,
وَلا نكفر أحدا من أهل القبلة بذنب ما لم يستحله.
'আমরা গুনাহের কারণে কোনো আহলে কিবলাকে তাকফির করি না, যতক্ষণ-না সে তা হালাল মনে করে।
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবুল হাসান আশআরি রাহ. প্রমুখ ইমামগণ এটাকে দীনের স্বীকৃত আকিদা বলে উল্লেখ করেছেন। অনেক দীনদার ভাই এসব আকিদা পাঠ করে 'আহলে কিবলা' শব্দ দেখে বিভ্রমে পড়ে যায়। তারা ধারণা করে বসে, যে ব্যক্তি কাবার দিকে ফিরে সালাত আদায় করে, সে যত বড় কুফরই করুক না কেন, যত জঘন্য রিদ্দাহে লিপ্ত হোক না কেন, তাকে কোনোভাবেই তাকফির করা যাবে না।
ইমামুল আসর আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমিরি রাহ. তাঁর জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ ইকফারুল মুলহিদিন এবং মুফতি শফি রাহ. ইমান ও কুফর কুরআন ও সুন্নাত কি রৌশনি মে গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে এ সংশয়ের অপনোদন করেছেন। তাঁদের সুদীর্ঘ আলোচনার সারকথা আমরা এখানে উপস্থাপন করছি। মূলত দুটি বিষয় বুঝে নিলে এই সংশয় এমনিতেই দূর হয়ে যায়। একটি হলো আহলে কিবলা কাকে বলে? অপরটি হলো আহলে কিবলাকে তাকফির করতে কেন নিষেধ করা হয়েছে?
১. আহলে কিবলা অর্থ
আহলে কিবলা শব্দের আক্ষরিক ও পারিভাষিক অর্থ ভিন্ন। আক্ষরিক অর্থে আহলে কিবলা বলা হয় সে-সকল ব্যক্তিকে, যারা কাবার দিকে ফিরে সালাত আদায় করে অথবা কাবাকে নিজের কিবলা মনে করে। কিন্তু এখানে এ শব্দ দ্বারা এর আক্ষরিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়; বরং পারিভাষিক অর্থ উদ্দেশ্য।
শরিয়তের পরিভাষায় আহলে কিবলা তাদের বলা হয়, যারা পূর্ণাঙ্গ ইসলাম ও তার অন্তর্ভুক্ত সব জরুরিয়াতে দীন সত্যায়ন করে এবং এর দ্বিধাহীন স্বীকারোক্তি প্রদান করে। কেউ যদি জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়ও অস্বীকার করে, তাহলে ইমামগণ তাকে আহলে কিবলার মধ্যে গণ্য করেন না।
আল্লামা আবদুল আজিজ ফারহাওয়ি রাহ. (মৃত্যু: ১২৩৯ হিজরি) লেখেন,
معناه اللغوي من يصلي إلى الكعبة أو يعتقدها قبلة، وفي اصطلاح المتكلمين من يصدق بضروريات الدين أي الأمور التي علم ثبوتها في الشرع واشتهر. فمن أنكر شيئا من الضروريات كحدوث العالم وعلم الله سبحانه بالجزئيات، لم يكن من أهل القبلة ولو كان مجاهدا في الطاعات، وكذلك من باشر شيئا من أمارات التكذيب كسجود الصنم والإهانة بأمر شرعي والاستهزاء عليه، فليس من أهل القبلة.
'আহলে কিবলার শাব্দিক অর্থ এমন ব্যক্তি, যে কাবার দিকে ফিরে সালাত আদায় করে; অথবা কাবাকে কিবলা মনে করে। আকিদা-বিশেষজ্ঞদের পরিভাষায় এর অর্থ হলো এমন ব্যক্তি, যে জরুরিয়াতে দীন সত্যায়ন করে। জরুরিয়াতে দীন হলো সেসব বিষয়, যা শরিয়তের বিধান হিসেবে সাব্যস্ত হওয়া সুবিদিত এবং সুপ্রসিদ্ধ। সুতরাং যে ব্যক্তি জরুরিয়াতে দীনের অন্তর্ভুক্ত কোনো বিষয় অস্বীকার করবে-যেমন : আল্লাহর অবিনশ্বরতা ও শাখাগত বিষয়গুলোর ব্যাপারে আল্লাহর জ্ঞান ইত্যাদি, সে আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত নয়; যদিও সে ইবাদত- বন্দেগিতে অধ্যবসায়ী হয়। অনুরূপ যে ব্যক্তি এমন কিছু করবে, যা (জরুরিয়াতে দীন) অস্বীকারের নিদর্শন- যেমন: মূর্তিকে সিজদা করা, শরয়ি কোনো বিষয়ের অবমাননা বা তাচ্ছিল্য করা, তাহলে সে আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত নয়।
ইমাম মুজানি রাহ. (মৃত্যু: ২৬৪ হিজরি) আহলুস সুন্নাহর আকিদার বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখেন,
الإمساك عن تكفير أهل القبلة والبراءة منهم فيما أحدثوا ما لم يبتدعوا ضلالا. فمن ابتدع منهم ضلالا كان عن أهل القبلة خارجا، ومن الدين مارقا. ويتقرب إلى الله عز وجل بالبراءة منه . ويهجر ويحتقر وتجتنب غدته، فهي أعدى من غدة الجرب.
'(আহলুস সুন্নাহর আকিদা হলো) আহলে কিবলাকে তাকফির করা থেকে বিরত থাকা এবং তারা (ধর্মীয় বিষয়ে) নিত্যনতুন যা কিছুর উদ্ভব ঘটায়, তার সঙ্গে সম্পর্ক না রাখা; যতক্ষণ-না তারা কোনো গোমরাহিপূর্ণ বিদআত উদ্ভাবন করে। তাদের মধ্যে যে-কেউ কোনো গোমরাহিপূর্ণ বিদআত উদ্ভাবন করবে, সে আহলে কিবলা থেকে বেরিয়ে যাবে এবং দীন থেকে বহিষ্কৃত হবে। তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা হবে। তাকে পরিত্যাগ করা হবে। লাঞ্ছিত করা হবে এবং তার সংক্রামক ব্যাধি থেকে সতর্কতা গ্রহণ করা হবে। কারণ, তা খোস-পাঁচড়া থেকেও অধিক সংক্রামক।
আল্লামা সাআদ তাফতাজানি রাহ. লেখেন,
ومعناه أن الذين اتفقوا على ما هو من ضروريات الإسلام كحدوث العالم وحشر الأجساد وما أشبه ذلك واختلفوا في أصول سواها كمسألة الصفات وخلق الأعمال وعموم الإرادة وقدم الكلام وجواز الرؤية ونحو ذلك مما لا نزاع فيه أن الحق فيها واحد هل يكفر المخالف للحق بذلك الاعتقاد وبالقول به أم لا وإلا فلا نزاع في كفر أهل القبلة المواظب طول العمر على الطاعات باعتقاد قدم العالم ونفي الحشر ونفي العلم بالجزئيات ونحو ذلك وكذا بصدور شيء من موجبات الكفر عنه
'যে আহলে কিবলাকে তাকফির করা নিয়ে মতবিরোধ হয়েছে, সে হচ্ছে এমন ব্যক্তি, যে জরুরিয়াতে দীন—যেমন : পৃথিবীর নশ্বরতা, (কিয়ামতের দিন) দৈহিক পুনরুত্থান ইত্যাদি—এর ব্যাপারে একমত, তবে শাখাগত কোনো বিষয়— যেমন : আল্লাহর সিফাতের মাসআলার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে। কোনো আহলে কিবলা নামধারী যদি সারা জীবন ইবাদত-বন্দেগিতে রত থাকে; কিন্তু এর পাশাপাশি জগতের অবিনশ্বরতা, (কিয়ামতের দিন) দৈহিক পুনরুত্থানের অস্বীকৃতি ও শাখাগত বিষয়সমূহের ব্যাপারে আল্লাহর জ্ঞান নেই বলে বিশ্বাস রাখে; কিংবা তার থেকে কুফর অপরিহার্যকারী কোনো বিষয় প্রকাশ হয়, তবে তার কাফির হওয়ার ব্যাপারে কোনো মতবিরোধ নেই।
২. আহলে কিবলাকে তাকফির করা নিষেধ কেন
আনাস ইবনু মালিক রা. বর্ণনা করেন; রাসুল বলেছেন,
ثَلَاثُ مِنْ أَصْلِ الْإِيمَانِ : الْكَفُّ عَمَّنْ قَالَ : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ، وَلَا نُكَفِّرُهُ بِذَنْبٍ، وَلَا تُخْرِجُهُ مِنَ الْإِسْلَامِ بِعَمَلٍ، وَالْجِهَادُ مَاضٍ مُنْذُ بَعَثَنِي اللَّهُ إِلَى أَنْ يُقَاتِلَ آخِرُ أُمَّتِي الدَّجَّالَ، لَا يُبْطِلُهُ جَوْرُ جَائِرٍ، وَلَا عَدْلُ عَادِلٍ، وَالْإِيمَانُ بِالْأَقْدَارِ
তিনটি বিষয় ইমানের মূলের অন্তর্ভুক্ত। (এক) যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পড়বে, তার ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা, কোনো গুনাহের কারণে তাকে তাকফির না করা এবং কোনো আমলের কারণে তাকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার না করা। (দুই) আমাকে (রাসুল করে) পাঠানোর সময় থেকে জিহাদ চালু রয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। অবশেষে উম্মাহর জিহাদকারী শেষ দল দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। কোনো অত্যাচারী শাসকের অত্যাচার অথবা কোনো ন্যায়পরায়ণ শাসকের ইনসাফ এটাকে রহিত করতে পারবে না। (তিন) তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস রাখা。
এই বর্ণনাটিকে যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যাচ্ছে, এখানে আহলে কিবলাকে স্রেফ গুনাহের কারণে তাকফির করতে নিষেধ করা হয়েছে। আর প্রকাশ থাকে যে, কুফর ও গুনাহ এককথা নয়। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো, যে ব্যক্তি পারিভাষিক সংজ্ঞা অনুসারে আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত, শুধু কোনো গুনাহের কারণে এমন ব্যক্তিকে তাকফির করা হবে না। তবে সে যদি স্পষ্ট ও অকাট্য কুফরে লিপ্ত হয়, যার দ্বারা সে আর আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত থাকে না-এমন ব্যক্তির বিধান এসব হাদিসে উল্লেখিত হয়নি। এ জন্য আকিদার বিভিন্ন গ্রন্থে যেখানে আহলে কিবলাকে তাকফির করার নিষেধাজ্ঞার কথা এসেছে, সেখানে এই গুনাহের কথাও উল্লেখিত হয়েছে। ইমাম তাহাবি রাহ. লেখেন,
وَلَا نُكَفِّرُ أَحَدًا مِنْ أَهْلِ الْقِبْلَةِ بِذَنْبِ مَا لَمْ يَسْتَحِلَّهُ.
'আমরা গুনাহের কারণে কোনো আহলে কিবলাকে তাকফির করি না, যতক্ষণ- না সে তা হালাল মনে করে。
ফকিহগণ যে ব্যক্তিকে তাকফির করেন, সে তো আহলে কিবলারই অন্তর্ভুক্ত নয়। আর তাকে তাকফির করার কারণ কোনো গুনাহ নয়; বরং সুস্পষ্ট কুফর। ইমাম ইবনু নুজায়ম রাহ. লেখেন,
لا يكفر أحد من أهل القبلة إلا بجحود ما أدخله فيه.
'কোনো আহলে কিবলাকে শুধু এমন বিষয় অস্বীকারের কারণেই তাকফির করা হয়, যার প্রতি সত্যায়ন তাকে আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত করেছিল।’
মোল্লা আলি কারি রাহ. বলেন,
إن المراد بعدم تكفير أحد من أهل القبلة عند أهل السنة أنه لا يكفر أحد ما لم يوجد شيئ من أمارات الكفر وعلاماته ولم يصدر عنه شيئ من موجباته.
'আহলুস সুন্নাহর দৃষ্টিতে আহলে কিবলাকে তাকফির না করার অর্থ হলো, কাউকে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকফির করা হবে না, যতক্ষণ-না তার থেকে কুফরের কোনো আলামত ও নিদর্শন পাওয়া যাবে এবং তার থেকে কুফর অপরিহার্যকারী কোনো বিষয় প্রকাশিত হবে。
আল্লামা ফারহাওয়ি রাহ. বলেন,
ومعنى عدم تكفير أهل القبلة أن لا يكفر بارتكاب المعاصي ولا بإنكار الأمور الخفية غير المشهورة، هذا ما حققه المحققون، فاحفظه.
'আহলে কিবলাকে তাকফির না করার অর্থ হলো, গুনাহে লিপ্ত হওয়া এবং অপ্রসিদ্ধ সূক্ষ্ম বিষয় অস্বীকারের কারণে তাকে তাকফির করা হবে না। মুহাক্কিকগণ এই তাহকিকই করেছেন, সুতরাং এটা মুখস্থ রেখো。
ইমাম ইবনু দাকিক আল-ইদ রাহ. লেখেন,
الحق أنه لا يكفر أحد من أهل القبلة إلا بإنكار متواتر من الشريعة عن صاحبها؛ فإنه يكون مكذبا للشرع.
'হক কথা হলো, আহলে কিবলাকে তাকফির করা হবে শুধু শরিয়তের কোনো মুতাওয়াতির (প্রজন্ম পরম্পরায় স্বীকৃত) বিষয় অস্বীকারের কারণে। কেননা, তখন সে শরিয়া প্রত্যাখ্যানকারী হচ্ছে。
ইমাম রাজি রাহ. লেখেন,
المختار عندنا أنه لا يكفر أحد من أهل القبلة إلا بدليل منفصل، ويدل عليه النصوص والمعقول.
'আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য অভিমত হলো, কোনো আহলে কিবলাকে স্বতন্ত্র দলিলের ভিত্তিতেই তাকফির করা যায়। নুসুস ও যুক্তির দ্বারা এটা প্রমাণিত।
টিকাঃ
১২৮ প্রাগুক্ত: ৩৯১।
*** আল-আকিদাতুত তাহাবিয়া, আকিদা : ৫৭।
১৩০ আন-নিবরাস: ৩৪১।
১১০১ শারহুস সুন্নাহ: ৮৪।
১১০২ শারহুল মাকাসিদ ফি ইলমিল কালাম: ২/২৬৯।
১৩০৩ সুনানু আবি দাউদ : ২৫৩২। ইমাম আবু দাউদ রাহ. হাদিসটি বর্ণনা করে নীরব থেকেছেন। ইমাম বায়হাকি রাহ. আল-ইতিকাদ গ্রন্থে (পৃ. ২২০) বলেছেন, এর কয়েকটি সমার্থক বর্ণনা রয়েছে। শায়খ শুয়াইব আরনাউত রাহ. বলেছেন, আনাস রা. থেকে যিনি এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, যার নাম ইয়াজিদ ইবনু আবি নুশায়বা, তিনি মাজহুল। তবে সনদের অন্য সকল বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য। [তাখরিজু শারহিত তাহাবিয়া : ৫৩০; তাখরিজুল আওয়াসিম ওয়াল কাওয়াসিম : ৪/৩৭০] তা ছাড়া হাদিসটির এই সনদে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও ফকিহগণের কাছে এটি সমাদৃত। এর আলোকে যুগে যুগে তাকফিরের নীতিমালা রচিত ও চর্চিত হয়েছে। সুতরাং এটি প্রমাণযোগ্য।
১৩০৪ আল-আকিদাতুত তাহাবিয়া, আকিদা: ৫৭।
১** আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়ির, কিতাবুস সিয়ার, বাবুর রিদ্দাহ: ১৫৯।
১০৬ শারহুল ফিকহিল আকবার: ২৫৮।
১** আন-নিবরাস: ৫৪৯।
*** ইহকামুল আহকাম শারহু উমদাতিল আহকাম: ২/২১০।
১৪৯ মাআলিমু উসুলিদ দীন: ১৩৭।
📄 তাকফির করা আলিমগণের ফরজ দায়িত্ব
হাম্বলি মুতাকাল্লিম শায়খ হাসান ইবনু আলি বারবাহারি রাহ. লেখেন,
ولا نخرج أحدا من أهل القبلة من الإسلام حتى يرد آية من كتاب الله، أو يرد شيئا من آثار رسول الله ﷺ، أو يذبح لغير الله، أو يصلي لغير الله، فإذا فعل شيئا من ذلك فقد وجب عليك أن تخرجه من الإسلام، وإذا لم يفعل شيئا من ذلك فهو مؤمن مسلم بالاسم لا بالحقيقة.
'আমরা কোনো আহলে কিবলাকে ইসলাম থেকে বের করে দেবো না, যতক্ষণ-না সে আল্লাহর কিতাবের কোনো আয়াত প্রত্যাখ্যান করে; অথবা রাসুলের কোনো হাদিস রদ করে; কিংবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে জবাই করে বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উদ্দেশে সালাত পড়ে। যখন সে এ জাতীয় কিছু করবে, তখন তোমার ওপর আবশ্যক হবে, তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেওয়া। আর যতক্ষণ সে এ জাতীয় কিছু না করবে, ততক্ষণ সে নামে মুমিন ও মুসলিম থাকবে; হাকিকিভাবে নয়।
টিকাঃ
১৪০ শারহুস সুন্নাহ: ১/৬৪।