📄 তাকফিরের ব্যাপারে অনীহা ও গাফলতি
পূর্বের অধ্যায়ের দীর্ঘ আলোচনা থেকে কেউ আবার এই সংশয়ে নিপতিত হতে পারেন যে, এত বেশি সতর্কতা যেহেতু আরোপ করা হয়েছে, তাই তাকফিরের দরজাই মনে হয় পুরোপুরি বন্ধ। কারও অন্তর চিড়ে দেখা অবধি কোনোভাবেই তাকফির করা যাবে না। অথবা তাকফিরের সব শর্ত পাওয়া গেলেও তাকফির এড়িয়ে চলাই সম্ভবত তাকওয়া ও সতর্কতার দাবি। না, বিষয়টি এমন নয়। বিনা দলিলে তাকফির করা; আর সব শর্ত পাওয়ার পরও কাউকে তাকফির না করে মুসলিম বলতে বাধ্য করা উভয়টিই প্রান্তিক আচরণ। প্রথমটা বাড়াবাড়ি, শেষেরটা ছাড়াছাড়ি। হক এ দুটির মধ্যখানে অবস্থিত।
📄 তাকফির প্রসঙ্গে আহলুস সুন্নাহর ভারসাম্যপূর্ণ মানহাজ
এসব কারণে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান হলো, সাধারণভাবে কোনো মুসলিমকে কাফির বলা হবে না। কেউ যদি এমন অস্পষ্ট কিছু করে, যা অনেক বিবেচনায় কুফর হওয়ার আশঙ্কা এবং কিছু বিবেচনায় তা ইমানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ারও সম্ভাবনা রাখে, তাহলে এর ভিত্তিতে তাকে তাকফির করা যাবে না। তবে এ ক্ষেত্রে সে নিজেই যদি স্পষ্টভাবে কুফরের দিক অবধারিত করে নেয়, তাহলে তখন তাকে তাকফির করা হবে। অনুরূপ কেউ যদি এমন কিছু বলে বা করে, যা সুনিশ্চিতভাবে কুফর অপরিহার্য করে এবং তাকে তাকফির করতে শরয়ি কোনো বাধাবিপত্তি না থাকে, তাহলে সেই ব্যক্তিকে তাকফির করা আবশ্যক বলে বিবেচিত হবে, যাতে করে ইমান ও কুফরের সীমারেখা সংরক্ষিত থাকে এবং উভয়টির স্বতন্ত্র বিধান প্রয়োগে মুসলিম জনসাধারণের সামনে কোনো ধোঁয়াশা না থাকে।
📄 সুনিশ্চিত কাফিরকে তাকফির না করা স্বতন্ত্র কুফর
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কুফর অবলম্বনের পরও তাদের তাকফির না করার বড় একটি ক্ষতি হলো, কেউ সুনিশ্চিতভাবে কুফর করার পরও তাকে মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তার অনুসৃত দীন ও আদর্শকে 'ইসলাম' বলে আখ্যায়িত করা হয়। কুফরকে ইসলাম নামে নামকরণ করা যে কত বড় অপরাধ, তা আর বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে না। উপরন্তু ইমাম তাহাবির উল্লেখ করা ইল্লত (Cause)-এর আলোকে পর্যালোচনা করলে এটাকে স্বতন্ত্র কুফরই বলতে হয়। এমনকি ইমাম কাজي ইয়াজ রাহ. (মৃত্যু: ৫৪৪ হিজরি) এ ব্যাপারে উম্মাহর ইজমা উদ্ধৃত করেছেন যে, সুনিশ্চিত কাফিরকে তাকফির না করা কুফর। তিনি লেখেন,
قال محمد بن سحنون: أجمع العلماء أن شاتم النبي ﷺ المنتقص له كافر، والوعيد جار عليه بعذاب الله له، وحكمه عند الأمة فتل؛ ومن شك في كفره وعذابه كفر.
'ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সুহনুন রাহ. (মৃত্যু: ২৪০ হিজরি) বলেন, আলিমগণ এ ব্যাপারে ইজমা করেছেন-যে ব্যক্তি নবি ﷺ-কে গালি দেবে, তাঁর অবমাননা করবে, সে কাফির। তার ওপর আল্লাহর শাস্তির হুঁশিয়ারি প্রযোজ্য হবে। উম্মাহর কাছে তার বিধান হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। যে ব্যক্তি তার কুফর ও আজাবের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করবে, সে-ও কাফির হয়ে যাবে।
ইমামুল হারামাইন আবুল মাআলি জুওয়াইনি রাহ. (মৃত্যু : ৪৭৮ হিজরি) বলেন,
لأن إدخال كافر في الملة وإخراج مسلم عنها عظيم في الدين.
'কারণ, কোনো কাফিরকে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত করা এবং কোনো মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে দেওয়া, উভয়টিদীনিবিবেচনায় অত্যন্ত গুরুতর ব্যাপার।
টিকাঃ
১** আশ-শিফা বি তারিফি হুকুকিল মুসতাফা মাআ হাশিয়াতিশ শুমুন্নি: ২/২১৫।
১১২৬ প্রাগুক্ত: ২/২,৭৭।
📄 তাকফিরের ব্যাপারে সাহাবিগণের দায়িত্ববোধ
রাসুলের ইনতিকালের পর আরবে বসতির পর বসতি মুরতাদ হতে থাকে। কেউ বাপ-দাদার জাহিলি ধর্মে ফিরে যাচ্ছিল, কেউ মুসায়লিমা কাজজাব ও আসওয়াদ আনসির নবুওয়াতের ওপর ইমান এনে রাসুলের খতমে নবুওয়াত অস্বীকার করছিল। এভাবে হাজার হাজার মানুষ ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যেতে লাগল। এর মধ্যে এক দল এমন ছিল, যারা সালাত ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য করেছিল। তাদের ভ্রান্তির মূল উৎসই ছিল বাহ্যিকতাবাদ বা অক্ষরবাদ (Literalism)। তারা কিছু নুসুসের বাহ্যিক অর্থকে পুঁজি বানিয়ে জাকাতকে রাসুলের যুগের সঙ্গে বিশেষিত বলে প্রচার করত এবং দারুল খিলাফাহর প্রতিনিধির কাছে জাকাত তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানাত। সব ক্ষেত্রে অক্ষরবাদ ও বাহ্যিকতাবাদের চর্চা ব্যক্তির ধ্বংস ডেকে আনে। খারেজিরাও বিপথগামী হয়েছিল এই সূত্র ধরে। অক্ষরবাদ তাদের ভয়াবহ পর্যায়ের তাকফিরপ্রবণ বানিয়ে ছেড়েছিল।
আবু বকর রা. উল্লিখিত গোষ্ঠীকে তাকফির করে তাদের বিরুদ্ধে মুজাহিদ-বাহিনী পাঠিয়েছিলেন। সকল সাহাবিও তাঁর সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। শুরুতে উমর রা.-এর এ ব্যাপারে আপত্তি ছিল; তবে আবু বকর রা.-এর সঙ্গে আলোচনার পর তিনিও এর সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছিলেন। ইমাম বুখারি রাহ. তাঁর সহিহ গ্রন্থে আবু হুরায়রা রা. সূত্রে বর্ণনা করেন,
لَمَّا تُوُفِّيَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَاسْتُخْلِفَ أَبُو بَكْرٍ بَعْدَهُ، وَكَفَرَ مَنْ كَفَرَ مِنَ العَرَبِ، قَالَ عُمَرُ لِأَبِي بَكْرٍ: كَيْفَ تُقَاتِلُ النَّاسَ؟ وَقَدْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ : « أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَمَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ عَصَمَ مِنِّي مَالَهُ وَنَفْسَهُ، إِلَّا بِحَقِّهِ وَحِسَابُهُ عَلَى اللَّهِ ، فَقَالَ: وَاللَّهِ لَأُقَاتِلَنَّ مَنْ فَرَّقَ بَيْنَ الصَّلاةِ وَالزَّكَاةِ، فَإِنَّ الزَّكَاةَ حَقُّ المَالِ، وَاللَّهِ لَوْ مَنَعُونِي عِقَالًا كَانُوا يُؤَدُّونَهُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ لَقَاتَلْتُهُمْ عَلَى مَنْعِهِ، فَقَالَ عُمَرُ: «فَوَاللَّهِ مَا هُوَ إِلَّا أَنْ رَأَيْتُ اللَّهَ قَدْ شَرَحَ صَدْرَ أَبِي بَكْرٍ لِلْقِتَالِ، فَعَرَفْتُ أَنَّهُ الحَقُّ»
রাসুল যখন ইনতিকাল করলেন আর তার পরে আবু বকর রা.-কে খলিফা করা হলো এবং আরবের যারা কাফির হওয়ার তারা কাফির হয়ে গেল, তখন উমর রা. আবু বকর রা.-কে বললেন, আপনি কী করে লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন; অথচ রাসুল বলেছেন, আমি মানুষের সঙ্গে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার পূর্ব পর্যন্ত যুদ্ধ করতে নির্দেশপ্রাপ্ত। অতএব, যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলল, সে তার প্রাণ ও সম্পদকে আমার থেকে নিরাপদ করে নিল। তবে ইসলামি বিধানের আওতায় পড়লে আলাদা। তাদের প্রকৃত হিসাব আল্লাহর কাছে হবে। আবু বকর রা. বললেন, যারা সালাত ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য করে, আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। কারণ, জাকাত হলো সম্পদের হক। আল্লাহর শপথ, যদি তারা রাসুলের কাছে যে উটের বাচ্চা (জাকাত হিসেবে) আদায় করত, আমার কাছে তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলেও আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। উমর রা. বললেন, আল্লাহর কসম, আমি দেখছিলাম যে, যুদ্ধ করতে আল্লাহ তাআলা আবু বকরের বক্ষ উন্মোচিত করে দিয়েছিলেন। সুতরাং আমি বুঝতে পারলাম, এ সিদ্ধান্ত সঠিক।
আবু বকর রা. এ প্রসঙ্গেই স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো তাঁর সেই ঐতিহাসিক কথাটি বলেছিলেন,
إنه قد انقطع الوحي وتم الدين، أينقص وأنا حي؟
ওহির ধারা বন্ধ হয়েছে। দীন পরিপূর্ণ হয়েছে। আমি জীবিত থাকতে সেই দীন কি হ্রাসপ্রাপ্ত হতে পারে?
এর আলোকে প্রতিভাত হয়, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে রিদ্দাহ প্রকাশ পেলে আলিম ও আমিরের জন্য অপরিহার্য হলো, তাদের চিহ্নিত করা এবং তাদের ফিতনার ব্যাপারে উম্মাহকে সজাগ, সচেতন ও সতর্ক করা দরকার, যাতে করে মুসলিম জনসাধারণের ইমান সুরক্ষিত থাকে।
টিকাঃ
১২৭ সহিহ বুখারি: ৭২৮৪।