📄 কবিরা গুনাহের কারণে তাকফির
ইমাম আবু উবায়দ কাসিম ইবনু সাল্লাম রাহ. (মৃত্যু: ২২৪ হিজরি) আল-ইমান গ্রন্থে এ বিষয়ে বিশ্লেষণধর্মী সুদীর্ঘ আলোচনা করেছেন। প্রথমে তিনি সেসব বর্ণনা সংকলন করেছেন, যেগুলোতে কোনো কবিরা গুনাহের ব্যাপারে কুফর বা শিরক শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে; অথবা যেগুলোতে রাসুল কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যাপারে বলেছেন-সে বা তারা আমাদের দলভুক্ত নয়। এ ধরনের হাদিসসমূহ সংকলনের পর তিনি লেখেন, এসব হাদিসের ব্যাপারে উম্মাহর আলিমগণের পাঁচ ধরনের অভিমত রয়েছে:
প্রথম অভিমত
'এসব নুসুসে উল্লেখিত কুফর শব্দ দ্বারা অকৃতজ্ঞতা )كفران النعمة( উদ্দেশ্য।'
কিন্তু এই অভিমত সঠিক নয়। কারণ, আরবিভাষীরা কুফর শব্দ দ্বারা সর্বদা অকৃতজ্ঞতা উদ্দেশ্য নেয় না। কোথাও যদি পূর্বাপর প্রেক্ষাপট দ্বারা প্রতিভাত হয় যে, সেখানে আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ সম্বন্ধে আলোচনা হচ্ছে, তবে সেখানে এই ব্যাখ্যা চলতে পারে। কিন্তু ঢালাওভাবে সব জায়গায় এই ব্যাখ্যা উদ্দেশ্য নেওয়া আরবিভাষীদের কাছে পরিচিত ও সমর্থিত নয়।
দ্বিতীয় অভিমত
'এসব নুসুস ধমকি, কঠোরতা ও সতর্কবার্তা প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।' কিন্তু এই ব্যাখ্যাও ভুল। এরূপ ব্যাখ্যা মেনে নিলে এর দ্বারা মূল অর্থ নাকচ করা উদ্দেশ্য হয়। কারণ, এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, এই কাজগুলো বাস্তবে কুফর নয়। এগুলোর কারণে কেউ কাফির হয় না। স্রেফ মানুষকে সতর্ক করা এবং ভয় দেখাতে এরূপ বলা হয়েছে। রাসুলের শানে এমন সম্ভাবনা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরবর্তী ব্যাপার। বিশেষত ইমান ও কুফরের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এমনটা ভাবতে বিবেক সায় দেয় না।
তৃতীয় অভিমত
'এসব নুসুসের বাহ্যিক ও মূল অর্থ উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, যে বা যারা এমনটা করবে, তারা কাফির-মুরতাদ হয়ে যাবে।' খারেজিরা এই মাজহাব গ্রহণ করেছে; কিন্তু এটা পুরোপুরি ভুল। কারণ, হত্যা, ব্যভিচার ও মদপান থেকে শুরু করে অনেক গুনাহের ব্যাপারেই হাদিসে কুফর বা শিরক শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। এখন সব ক্ষেত্রে যদি মূল অর্থই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এর ওপর সবচেয়ে বড় যে আপত্তি দেখা দেবে, এসব অপরাধ যদি বাস্তবে কুফরই হয়, তাহলে কোনো মুসলিম এতে লিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও তার ওপর মুরতাদের দণ্ড কার্যকর করা অপরিহার্য হয় না কেন? উপরন্তু এ ধরনের ব্যক্তিদের ওপর মুরতাদের শাস্তি প্রয়োগ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়িজই নয়-এর কারণ কী?
মুরতাদের চূড়ান্ত শাস্তি হলো হত্যা; কিন্তু ব্যভিচারী যদি অবিবাহিত হয়, তাকে হত্যা করা নিষেধ। নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা চাইলে হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড মাফ করতে পারে; অথচ মুরতাদের শাস্তি অকাট্যভাবে অবধারিত। তা মাফ করার অধিকার কারও নেই। মদ্যপকে হত্যার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এসব কাজ যদি প্রকৃত অর্থেই কুফর হয় এবং এতে লিপ্ত ব্যক্তি যদি কাফির হয়ে যায়, তাহলে এদের জন্য শরিয়তে আলাদা দন্ড বিধিবদ্ধ করার কী তাৎপর্য থাকতে পারে? উপরন্তু এমনটা করা হলে তা মুতাওয়াতির বর্ণনা ও কর্মধারার বিরোধী হতো। কারণ, মুরতাদের শাস্তি যে হত্যাদণ্ড, তা মুতাওয়াতিরভাবে প্রমাণিত।
চতুর্থ অভিমত
'এসব নুসুসকে প্রত্যাখ্যান করা হবে।' এই অভিমত যে চূড়ান্ত পর্যায়ের ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা, তা প্রমাণের জন্য স্বতন্ত্র দলিলের প্রয়োজন নেই। এ কারনেই উম্মাহর সালাফ (পূর্বসূরি) ও খালাফের (উত্তরসূরি) মধ্য থেকে কোনো বিদগ্ধ আলিমই এই মত গ্রহণ করেননি। বরং কিছু বিদআতি-হাদিস ও উলুমুল হাদিসের সঙ্গে যাদের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই, তাদের কিছুসংখ্যক লোকই এই মত সাদরে গ্রহণ করেছে।
পঞ্চম অভিমত
আমাদের দৃষ্টিতে এসব গুনাহের কারণে কারও ইমান নষ্ট হয় না। এতে লিপ্ত হওয়ার কারণে কাউকে কাফির বলেও আখ্যায়িত করা যায় না। তবে এসব গুনাহের কারণে ইমানের হাকিকত ও ইখলাস ক্ষুণ্ণ হয়, তার বরকত ও ফলাফলে ভাটা পড়ে। শরিয়তের দৃষ্টিতে গুনাহের পরিমাণ অনুসারে মুমিন ব্যক্তি তার ইমানের বরকত থেকে বঞ্চিত হয়। এর পক্ষে অন্যতম প্রমাণ হলো, কুরআন মাজিদের অনেক জায়গায় ইমানের উপকারিতা ও ফলাফল লাভের জন্য নেক আমলের শর্তারোপ করা হয়েছে।
টিকাঃ
১২২ আল-ইমান, আল-মাকতাবুল ইসলামي প্রকাশিত, বাবুল খুরুজি মিনাল ইমানي বিল মাআসি: ৩৬-৪৮।
📄 আহলে কিবলাকে তাকফিরের ব্যাপারে সাহাবিদের সতর্কতা
যে-সকল ব্যক্তি ইসলাম ও তার 'জরুরিয়াতে দীন' স্বীকার করে, তাদেরকে আহলে কিবলা বলা হয়। রাসুল ﷺ আহলে কিবলাকে তাকফির করতে নিষেধ করেছেন। এর আলোকে সাহাবিগণ তাকফিরের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। এক বর্ণনায় এসেছে,
سَأَلَ رَجُلٌ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ هَلْ كُنْتُمْ تُسَمُّونَ أَحَدًا مِنْ أَهْلِ الْقِبْلَةِ كَافِرًا؟ قَالَ: مَعَاذَ اللَّهِ، قَالَ: فَهَلْ تُسَمُّونَهُ مُشْرِكًا؟ قَالَ: لَا.
জনৈক ব্যক্তি জাবির ইবনু আবদিল্লাহ রা.-কে জিজ্ঞেস করে, আপনারা কি কোনো আহলে কিবলাকে কাফির আখ্যায়িত করেন? তিনি বললেন, আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। সেই ব্যক্তি জিজ্ঞেস করে, তাহলে আপনারা কি আহলে কিবলাকে মুশরিক বলেন? তিনি বললেন, না।
সাহাবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক মতবিরোধের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি কখনো এর পরিণতিতে যুদ্ধ-বিগ্রহ পর্যন্ত গড়িয়েছে। 'মুশাজারাতে সাহাবা' শিরোনামে যে বিষয়গুলো অদ্যাবধি ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত রয়েছে। এতৎসত্ত্বেও তারা কখনো এসবের জের ধরে অন্যায়ভাবে কাউকে তাকফির করেননি। কারও কুফর ও রিদ্দাহ সুনিশ্চ истиত ও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগে কখনো আহলে কিবলার ব্যাপারে কাফির-মুশরিক শব্দ প্রয়োগ করেননি। এ ব্যাপারে তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক। পরবর্তী উম্মাহও প্রজন্ম পরম্পরায় তাঁদের এ আদর্শ ধারণ করেছে। ইমাম আজদুদ্দিন ইজি রাহ. (মৃত্যু: ৭৫৬ হিজরি) লেখেন,
جمهور المتكلمين والفقهاء على أنه لا يكفر أحد من أهل القبلة.
'সংখ্যাগরিষ্ঠ মুতাকাল্লিম ও ফকিহ এই আদর্শের ওপর রয়েছেন যে, কোনো আহলে কিবলাকে তাকফির করা হবে না।
টিকাঃ
১২৩ উসুলুস সুন্নাহ, ইবনু আবি জামনিন : ১৪৪১
১২৪ শারহুল মাওয়াকিফ: ৮/৩৭০।