📘 কুফর ও তাকফির > 📄 বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে বর্ণিত কুফর শব্দের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহর অবস্থান

📄 বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে বর্ণিত কুফর শব্দের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহর অবস্থান


কুরআন ও হাদিসে বিভিন্ন কাজকে কুফর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বিভিন্ন গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিকে কাফির বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, রাসুল বলেন,
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقُ، وَقِتَالُهُ كُفْرُ মুসলিমকে গালি দেওয়া পাপ এবং তার সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়া কুফর।
ইমাম তিরমিজি রাহ. সাআদ ইবনু উবায়দা রাহ. থেকে বর্ণনা করেন,
أَنَّ ابْنَ عُمَرَ سَمِعَ رَجُلًا يَقُولُ: لَا وَالكَعْبَةِ، فَقَالَ ابْنُ عُمَرَ: لَا يُحْلَفُ بِغَيْرِ اللهِ، فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَقُولُ: «مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ»: هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ وَفُسِّرَ هَذَا الحَدِيثُ عِنْدَ بَعْضِ أَهْلِ العِلْمِ : أَنَّ قَوْلَهُ فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ عَلَى التَّغْلِيظ، وَالحُجَّةُ فِي ذَلِكَ حَدِيثُ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ سَمِعَ عُمَرَ يَقُولُ: وَأَبِي وَأَبِي، فَقَالَ: «أَلَا إِنَّ اللَّهَ يَنْهَاكُمْ أَنْ تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ، وَحَدِيثُ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ أَنَّهُ قَالَ: " مَنْ قَالَ فِي حَلِفِهِ وَاللَّاتِ، وَالعُزَّى فَلْيَقُلْ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ": هَذَا مِثْلُ مَا رُوِيَ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ أَنَّهُ [ص:111] قَالَ: «إِنَّ الرِّيَاءَ شِرْكَ» وَقَدْ فَسَّرَ بَعْضُ أَهْلِ العِلْمِ هَذِهِ الآيَةَ: ﴿فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَ لَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهَ أَحَدًا الآيَةَ، قَالَ: لَا يُرَائِي
ইবনু উমর রা. এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, 'না, কাবার শপথ!' ইবনু উমর রা. বললেন, আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে শপথ করা যাবে না। কারণ, আমি রাসুল-কে বলতে শুনেছি— ‘আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে যে শপথ করল, সে কুফরি অথবা শিরক করল।’
আবু ইসা তিরমিজি রাহ. বলেন, এটি হাসান হাদিস। এ হাদিসের ব্যাখ্যায় কয়েকজন অভিজ্ঞ আলিম বলেছেন, ‘সে কুফরি করল অথবা শিরক করল’ কথাটি রাসুল ধমক এবং শাসনের সুরে বলেছেন। তারা নিচের হাদিসটি নিজেদের দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন—উমর রা.-কে তাঁর পিতার নামে শপথ করতে শুনে রাসুল বললেন, ‘সাবধান! তোমাদের নিজেদের পিতার নামে শপথ করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। দ্বিতীয়ত, আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদিস—রাসুল বললেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের শপথে বলে ফেলে—লাত দেবতার শপথ! উজজা দেবতার শপথ! সে যেন বলে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ!’
আবু ইসা তিরমিজি রাহ. বলেন, এ হাদিসের তাৎপর্য এরূপ, যেমন রাসুল বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই রিয়া (লোক দেখানোর মনোবৃত্তি) শিরক।’ যেমন কয়েকজন অভিজ্ঞ আলিম সুরা কাহফের সর্বশেষ আয়াত—‘যে ব্যক্তি তার রবের সঙ্গে সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেন সৎকাজ করে এবং রবের ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক না করে।’—এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে যেন ইবাদত না করে।
বুরায়দা রা. বর্ণনা করেন; রাসুল বলেছেন,
الْعَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ
আমাদের ও তাদের (কাফিরদের) মধ্যে (মুক্তির) যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা হলো সালাত। অতএব, যে ব্যক্তি সালাত ত্যাগ করল, সে কুফরি করল।
ইমাম ইবনু আবি জামনিন মালিকি রাহ. (মৃত্যু: ৩৯৯ হিজরি) তাঁর জগদ্বিখ্যাত উসুলুস সুন্নাহ গ্রন্থে এ বিষয়ক হাদিসগুলো সুন্দর বিন্যাসে বিস্তর ব্যাখ্যাসহ সংকলন করেছেন। অধ্যায়ের শিরোনাম: ‘বাবুন ফিল আহাদিসিললাতি ফি-হা নাফয়ুল ইমানি বিজ-জুনুব’।
এসব হাদিসের বাহ্যিক দাবি হলো, কেউ এ ধরনের পাপ করলে তৎক্ষণাৎ কাফির হয়ে যাবে। আক্ষরিক অর্থের পেছনে লাগামহীনভাবে তাড়িত কেউ কেউ এসব হাদিসের আলোকে এ অভিমতই দিয়েছেন। যদিও উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমাম তাদের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেননি; বরং তাঁরা তাঁদের মূলনীতি অনুসারে এ ক্ষেত্রেও আগের মতো সতর্কতার পরিচয় দিয়েছেন। তারা এ ধরনের অল্প কিছু আয়াত ও হাদিসের ওপরই নিজেদের মাজহাবের ভিত্তি দাঁড় করাননি; বরং তারা সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে সব আয়াত ও হাদিস সামনে রেখেছেন। দু-একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে।
অসংখ্য আয়াত ও হাদিসে দেখা যায়, কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদেরও মুমিন বলে সম্বোধন করা হয়েছে। যেমন: কোনো মুসলিমকে হত্যা করা মারাত্মক গুনাহ। হাদিসে মুসলিমের সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়াকেই কুফর বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে হত্যা তো আরও গুরুতর ও জঘন্য ব্যাপার; কিন্তু কুরআনে মুসলিমের ঘাতককে 'হে কাফির' বলে সম্বোধন করা হয়নি; বরং 'হে মুমিন' বলে সম্বোধন করা হয়েছে। একই আয়াতে ঘাতককে নিহতের উত্তরাধিকারীর ভাই বলে উল্লেখ করা হয়েছে-
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ كُتِبَ عَلَيْكُمُ ٱلْقِصَاصُ فِى ٱلْقَتْلَى ۖ ٱلْحُرُّ بِٱلْحُرِّ وَٱلْعَبْدُ بِٱلْعَبْدِ وَٱلْأُنثَىٰ بِٱلْأُنثَىٰ ۚ فَمَنْ عُفِىَ لَهُۥ مِنْ أَخِيهِ شَىْءٌ فَٱتِّبَاعٌۢ بِٱلْمَعْرُوفِ وَأَدَآءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَٰنٍ ۗ ذَٰلِكَ تَخْفِيفٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ
হে মুমিনগণ, যাদের (ইচ্ছাকৃত অন্যায়ভাবে) হত্যা করা হয়েছে, তাদের ব্যাপারে তোমাদের প্রতি কিসাসের বিধান ফরজ করা হয়েছে-স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, গোলামের বদলে গোলাম, নারীর বদলে নারী। এরপর হত্যাকারীকে যদি তার ভাই (নিহতের অভিভাবক)-এর পক্ষ থেকে কিছুটা ক্ষমা করা হয়, তবে ন্যায়ানুগভাবে (রক্তপণ) দাবি করার অধিকার (অলির) আছে। আর উত্তমরূপে তা আদায় করা (হত্যাকারীর ওপর) ফরজ। এটা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এক লঘুকরণ এবং একটি রহমত। [সুরা বাকারা (২) : ১৭৮]
মুসলিমদের পারস্পরিক লড়াই অনেক বড় গুনাহ; হাদিসে যেটাকে কুফর বলে আখ্যায়িত করা হলেও কুরআন মাজিদে পারস্পরিক লড়াইয়ে লিপ্ত মুসলিমদের উভয় দলকে মুমিন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
إِنْ طَائِفَتْنِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا ۚ فَإِنْ بَغَتْ إِحْدُهُمَا عَلَى الْأُخْرَىٰ فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّىٰ تَفِيءَ إِلَىٰ أَمْرِ اللَّهِ ۚ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِٱلْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا ۖ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
মুমিনদের দুটি দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিয়ো। তারপর তাদের একটি দল যদি অন্য দলের ওপর বাড়াবাড়ি করে, তবে যে দল বাড়াবাড়ি করছে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ-না তারা আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে। সুতরাং যদি ফিরে আসে তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে মীমাংসা করে দাও এবং ইনসাফ করো। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন। মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও, আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও। [সুরা হুজুরাত (৪৯): ৯-১০]
চুরি করা ও ব্যভিচার করা কবিরা গুনাহ; কিন্তু চোর ও ব্যভিচারী মুমিন হলে রাসুল ﷺ তাকেও জান্নাতের সুসংবাদ শুনিয়েছেন, যার ওপর আবু জার রা. ঢের বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। আবু জার রা. বর্ণনা করেন,
أَتَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ وَعَلَيْهِ ثَوْبٌ أَبْيَضُ، وَهُوَ نَائِمُ، ثُمَّ أَتَيْتُهُ وَقَدِ اسْتَيْقَظَ، فَقَالَ: " مَا مِنْ عَبْدٍ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ، ثُمَّ مَاتَ عَلَى ذَلِكَ إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ " قُلْتُ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ؟ قَالَ: «وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ قُلْتُ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ؟ قَالَ: «وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ قُلْتُ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ؟ قَالَ: «وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ عَلَى رَغْمِ أَنْفِ أَبِي ذَرٍّ
আমি নবি ﷺ-এর কাছে এলাম। তাঁর পরনে সাদা পোশাক ছিল। তিনি তখন ঘুমে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর আবার এলাম, তখন তিনি জেগে গেছেন। তিনি বললেন, কোনো বান্দা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলবে এবং এ অবস্থার ওপর মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি বললাম, সে যদি ব্যভিচার করে, সে যদি চুরি করে? তিনি বললেন, যদি সে ব্যভিচার করে, যদি সে চুরি করে তবু। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সে যদি ব্যভিচার করে, সে যদি চুরি করে তবু? তিনি বললেন, হ্যাঁ, সে যদি ব্যভিচার করে, সে যদি চুরি করে তবু। আমি বললাম, যদি সে ব্যভিচার করে, যদি সে চুরি করে তবু? তিনি বললেন, যদি সে ব্যভিচার করে, সে যদি চুরি করে তবু। আবু জারের নাক ধুলোয় ধুসরিত হলেও।
এ ধরনের আরও অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। এ ছাড়াও সাহাবা, তাবিয়িন, তাবি- তাবিয়িন এবং উম্মাহর ইমামগণ থেকে কবিরা গুনাহে লিপ্ত কারও ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে রিদ্দাহর (দীনত্যাগের) ফাতওয়া পাওয়া যায় না। সুতরাং উম্মাহর তাআমুল ও তাওয়ারুস তথা অবিচ্ছিন্ন কর্মধারাও এ ক্ষেত্রে বাহ্যিক অর্থ গ্রহণের সম্ভাবনা নাকচ করে।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে উল্লিখিত কুফর ও কাফির শব্দদ্বয়ের অর্থ কী হবে? এ ব্যাপারে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইমামগণ থেকে কয়েকটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় :
ক. এসব নুসুসে কুফর শব্দ দ্বারা এর আক্ষরিক অর্থ 'অকৃতজ্ঞতা' উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর ইমানের দাবি ছিল, শরিয়তের বিধিবিধান ও আদেশ-নিষেধের ওপর আমল করা হবে; অথচ করা হয়েছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই এটা বান্দার পক্ষ থেকে চরম অকৃতজ্ঞতা। কুফর শব্দটি যেভাবে পারিভাষিক অর্থে ব্যবহৃত হয়, তেমনইভাবে শব্দটি আক্ষরিক অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যেমন, কুরআনে এসেছে,
لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ﴾
যদি তোমরা শোকর (কৃতজ্ঞতা) আদায় করো, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বেশি দেবো। আর যদি কুফর (অকৃতজ্ঞতা) করো, তাহলে নিশ্চিত জেনে রেখো, আমার শাস্তি কঠিন। [সুরা ইবরাহিম (১৪) : ০৭]
খ. এসব নুসুসে কুফর দ্বারা পারিভাষিক অর্থই উদ্দেশ্য, তবে এটা 'ইসতিহলালে'র ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ইসতিহলাল অর্থ হালাল মনে করা। আল্লাহ যে জিনিসকে হারাম করেছেন, বান্দা যদি তা হালাল মনে করে অবলীলায় করতে থাকে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে কুফর বলেই বিবেচিত হয়। কারণ, এর দ্বারা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট আয়াত ও হাদিসসমূহকে অস্বীকার করা হয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করা হয়।
এ ছাড়াও আরও কিছু ব্যাখ্যা ইমামগণ থেকে পাওয়া যায়। আল্লামা শাওকানি রাহ. (মৃত্যু: ১২৫০ হিজরি)-এর বক্তব্যে পুরো বিষয়টি সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। সালাত ত্যাগ এবং এ জাতীয় নির্দিষ্ট দু-একটি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কুফর ও কাফির শব্দের ব্যাখ্যায় এগুলো হচ্ছে উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের মত। আর সেই নির্দিষ্ট দু-চারটি বিষয় ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে এগুলো আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সবার মত। প্রথমোক্ত ক্ষেত্রে আল্লামা শাওকানি রাহ. যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠদের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেননি, এরপরও তিনি পুরো বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি লেখেন,
وسائر أحاديث الباب على أنه مستحق بترك الصلاة عقوبة الكافر وهي القتل، أو أنه محمول على المستحل، أو على أنه قد يؤول به إلى الكفر، أو على أن فعله فعل الكفار.
'এ অধ্যায়ের সবগুলো হাদিসের চারটি ব্যাখ্যা করা যায় : ক. সালাত ত্যাগের কারণে ব্যক্তি কাফিরদের শাস্তি-অর্থাৎ, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হবে। খ. অথবা এসব হাদিস ওই ব্যক্তির ব্যাপারে প্রযোজ্য, যে হালাল মনে করে এগুলো করে। গ. অথবা এসব গুনাহ পরিণামে তাকে কুফরের দিকে নিয়ে যাবে। ঘ. তার এসব কাজ কাফিরদের কাজের অনুরূপ। '

টিকাঃ
*** সুনানু ইবনি মাজাহ: ৬৯।
* সুনানুত তিরমিজি: ১৫৩৫।
** সুনানু ইবনি মাজাহ: ১০৭৯।
*** উসুলুস সুন্নাহ: ২২৭-২৫২।
১১১ সহিহ বুখারি: ৫৮২৭
১২০ কুরআন ও হাদিসের পাঠ (Text)।
১*১ নাইলুল আওতার, কিতাবুস সালাত, বাবু হুজ্জাতি মান কাফফারা তারিকাস সালাত : ১/৩৬১।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 কবিরা গুনাহের কারণে তাকফির

📄 কবিরা গুনাহের কারণে তাকফির


ইমাম আবু উবায়দ কাসিম ইবনু সাল্লাম রাহ. (মৃত্যু: ২২৪ হিজরি) আল-ইমান গ্রন্থে এ বিষয়ে বিশ্লেষণধর্মী সুদীর্ঘ আলোচনা করেছেন। প্রথমে তিনি সেসব বর্ণনা সংকলন করেছেন, যেগুলোতে কোনো কবিরা গুনাহের ব্যাপারে কুফর বা শিরক শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে; অথবা যেগুলোতে রাসুল কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যাপারে বলেছেন-সে বা তারা আমাদের দলভুক্ত নয়। এ ধরনের হাদিসসমূহ সংকলনের পর তিনি লেখেন, এসব হাদিসের ব্যাপারে উম্মাহর আলিমগণের পাঁচ ধরনের অভিমত রয়েছে:
প্রথম অভিমত
'এসব নুসুসে উল্লেখিত কুফর শব্দ দ্বারা অকৃতজ্ঞতা )كفران النعمة( উদ্দেশ্য।'
কিন্তু এই অভিমত সঠিক নয়। কারণ, আরবিভাষীরা কুফর শব্দ দ্বারা সর্বদা অকৃতজ্ঞতা উদ্দেশ্য নেয় না। কোথাও যদি পূর্বাপর প্রেক্ষাপট দ্বারা প্রতিভাত হয় যে, সেখানে আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ সম্বন্ধে আলোচনা হচ্ছে, তবে সেখানে এই ব্যাখ্যা চলতে পারে। কিন্তু ঢালাওভাবে সব জায়গায় এই ব্যাখ্যা উদ্দেশ্য নেওয়া আরবিভাষীদের কাছে পরিচিত ও সমর্থিত নয়।
দ্বিতীয় অভিমত
'এসব নুসুস ধমকি, কঠোরতা ও সতর্কবার্তা প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।' কিন্তু এই ব্যাখ্যাও ভুল। এরূপ ব্যাখ্যা মেনে নিলে এর দ্বারা মূল অর্থ নাকচ করা উদ্দেশ্য হয়। কারণ, এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, এই কাজগুলো বাস্তবে কুফর নয়। এগুলোর কারণে কেউ কাফির হয় না। স্রেফ মানুষকে সতর্ক করা এবং ভয় দেখাতে এরূপ বলা হয়েছে। রাসুলের শানে এমন সম্ভাবনা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরবর্তী ব্যাপার। বিশেষত ইমান ও কুফরের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এমনটা ভাবতে বিবেক সায় দেয় না।
তৃতীয় অভিমত
'এসব নুসুসের বাহ্যিক ও মূল অর্থ উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, যে বা যারা এমনটা করবে, তারা কাফির-মুরতাদ হয়ে যাবে।' খারেজিরা এই মাজহাব গ্রহণ করেছে; কিন্তু এটা পুরোপুরি ভুল। কারণ, হত্যা, ব্যভিচার ও মদপান থেকে শুরু করে অনেক গুনাহের ব্যাপারেই হাদিসে কুফর বা শিরক শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। এখন সব ক্ষেত্রে যদি মূল অর্থই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এর ওপর সবচেয়ে বড় যে আপত্তি দেখা দেবে, এসব অপরাধ যদি বাস্তবে কুফরই হয়, তাহলে কোনো মুসলিম এতে লিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও তার ওপর মুরতাদের দণ্ড কার্যকর করা অপরিহার্য হয় না কেন? উপরন্তু এ ধরনের ব্যক্তিদের ওপর মুরতাদের শাস্তি প্রয়োগ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়িজই নয়-এর কারণ কী?
মুরতাদের চূড়ান্ত শাস্তি হলো হত্যা; কিন্তু ব্যভিচারী যদি অবিবাহিত হয়, তাকে হত্যা করা নিষেধ। নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা চাইলে হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড মাফ করতে পারে; অথচ মুরতাদের শাস্তি অকাট্যভাবে অবধারিত। তা মাফ করার অধিকার কারও নেই। মদ্যপকে হত্যার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এসব কাজ যদি প্রকৃত অর্থেই কুফর হয় এবং এতে লিপ্ত ব্যক্তি যদি কাফির হয়ে যায়, তাহলে এদের জন্য শরিয়তে আলাদা দন্ড বিধিবদ্ধ করার কী তাৎপর্য থাকতে পারে? উপরন্তু এমনটা করা হলে তা মুতাওয়াতির বর্ণনা ও কর্মধারার বিরোধী হতো। কারণ, মুরতাদের শাস্তি যে হত্যাদণ্ড, তা মুতাওয়াতিরভাবে প্রমাণিত।
চতুর্থ অভিমত
'এসব নুসুসকে প্রত্যাখ্যান করা হবে।' এই অভিমত যে চূড়ান্ত পর্যায়ের ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা, তা প্রমাণের জন্য স্বতন্ত্র দলিলের প্রয়োজন নেই। এ কারনেই উম্মাহর সালাফ (পূর্বসূরি) ও খালাফের (উত্তরসূরি) মধ্য থেকে কোনো বিদগ্ধ আলিমই এই মত গ্রহণ করেননি। বরং কিছু বিদআতি-হাদিস ও উলুমুল হাদিসের সঙ্গে যাদের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই, তাদের কিছুসংখ্যক লোকই এই মত সাদরে গ্রহণ করেছে।
পঞ্চম অভিমত
আমাদের দৃষ্টিতে এসব গুনাহের কারণে কারও ইমান নষ্ট হয় না। এতে লিপ্ত হওয়ার কারণে কাউকে কাফির বলেও আখ্যায়িত করা যায় না। তবে এসব গুনাহের কারণে ইমানের হাকিকত ও ইখলাস ক্ষুণ্ণ হয়, তার বরকত ও ফলাফলে ভাটা পড়ে। শরিয়তের দৃষ্টিতে গুনাহের পরিমাণ অনুসারে মুমিন ব্যক্তি তার ইমানের বরকত থেকে বঞ্চিত হয়। এর পক্ষে অন্যতম প্রমাণ হলো, কুরআন মাজিদের অনেক জায়গায় ইমানের উপকারিতা ও ফলাফল লাভের জন্য নেক আমলের শর্তারোপ করা হয়েছে।

টিকাঃ
১২২ আল-ইমান, আল-মাকতাবুল ইসলামي প্রকাশিত, বাবুল খুরুজি মিনাল ইমানي বিল মাআসি: ৩৬-৪৮।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 আহলে কিবলাকে তাকফিরের ব্যাপারে সাহাবিদের সতর্কতা

📄 আহলে কিবলাকে তাকফিরের ব্যাপারে সাহাবিদের সতর্কতা


যে-সকল ব্যক্তি ইসলাম ও তার 'জরুরিয়াতে দীন' স্বীকার করে, তাদেরকে আহলে কিবলা বলা হয়। রাসুল ﷺ আহলে কিবলাকে তাকফির করতে নিষেধ করেছেন। এর আলোকে সাহাবিগণ তাকফিরের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। এক বর্ণনায় এসেছে,
سَأَلَ رَجُلٌ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ هَلْ كُنْتُمْ تُسَمُّونَ أَحَدًا مِنْ أَهْلِ الْقِبْلَةِ كَافِرًا؟ قَالَ: مَعَاذَ اللَّهِ، قَالَ: فَهَلْ تُسَمُّونَهُ مُشْرِكًا؟ قَالَ: لَا.
জনৈক ব্যক্তি জাবির ইবনু আবদিল্লাহ রা.-কে জিজ্ঞেস করে, আপনারা কি কোনো আহলে কিবলাকে কাফির আখ্যায়িত করেন? তিনি বললেন, আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। সেই ব্যক্তি জিজ্ঞেস করে, তাহলে আপনারা কি আহলে কিবলাকে মুশরিক বলেন? তিনি বললেন, না।
সাহাবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক মতবিরোধের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি কখনো এর পরিণতিতে যুদ্ধ-বিগ্রহ পর্যন্ত গড়িয়েছে। 'মুশাজারাতে সাহাবা' শিরোনামে যে বিষয়গুলো অদ্যাবধি ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত রয়েছে। এতৎসত্ত্বেও তারা কখনো এসবের জের ধরে অন্যায়ভাবে কাউকে তাকফির করেননি। কারও কুফর ও রিদ্দাহ সুনিশ্চ истиত ও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগে কখনো আহলে কিবলার ব্যাপারে কাফির-মুশরিক শব্দ প্রয়োগ করেননি। এ ব্যাপারে তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক। পরবর্তী উম্মাহও প্রজন্ম পরম্পরায় তাঁদের এ আদর্শ ধারণ করেছে। ইমাম আজদুদ্দিন ইজি রাহ. (মৃত্যু: ৭‎৫‎৬ হিজরি) লেখেন,
جمهور المتكلمين والفقهاء على أنه لا يكفر أحد من أهل القبلة.
'সংখ্যাগরিষ্ঠ মুতাকাল্লিম ও ফকিহ এই আদর্শের ওপর রয়েছেন যে, কোনো আহলে কিবলাকে তাকফির করা হবে না।

টিকাঃ
১২৩ উসুলুস সুন্নাহ, ইবনু আবি জামনিন : ১৪৪১
১২৪ শারহুল মাওয়াকিফ: ৮/৩৭০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00