📄 আল্লামা শামির দৃষ্টিতে লুজুম ও ইলতিজামের পার্থক্য
আল্লামা ইবনু আবিদিন শামি রাহ. (মৃত্যু: ১২৫২ হিজরি) লেখেন,
أما المعتزلة فمقتضى الوجه حل مناكحتهم؛ لأن الحق عدم تكفير أهل القبلة، وإن وقع إلزاما في المباحث اه. وقوله: "وإن وقع إلزاما في المباحث" معناه: وإن وقع التصريح بكفر المعتزلة ونحوهم عند البحث معهم في رد مذهبهم بأنه كفر، أي يلزم من قولهم بكذا الكفر، ولا يقتضي ذلك كفرهم؛ لأن لازم المذهب ليس بمذهبهم.
'দলিলের দাবি হলো, মুতাজিলাদের সঙ্গে বিয়ে বৈধ হবে। কারণ, হক মত হলো, আহলে কিবলাকে তাকফির করা হবে না; যদিও বিভিন্ন অধ্যায়ে লাজিম হিসেবে তাদের তাকফিরের কথা এসেছে। অর্থাৎ, মুতাজিলাদের খন্ডন প্রসঙ্গে ফকিহগণের বিভিন্ন আলোচনায় এরূপ কথা এসেছে যে, এটা (মুতাজিলা মতবাদের ১. অন্তর্ভুক্ত বিষয়) কুফর। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদের এ কথার কারণে কুফর লাজিম (অপরিহার্য) হয়; কিন্তু এ কারণে তারা কাফির হবে না। কারণ, মাজহাবের লাজিম মূল মাজহাব নয়। (তাই স্রেফ এর ভিত্তিতে তাকফির হয় না।)'
টিকাঃ
১১০ হাশিয়াতু ইবনি আবিদিন আলাদ দুররিল মুখতার, কিতাবুন নিকাহ, ফাসলুন ফিল মুহাররামাত: ৩/৪৫।
📄 সুস্পষ্ট লুজুম ইলতিজামের অনুরূপ
এখানে একটি বিষয় ভালোভাবে বোঝা দরকার। উপরিউক্ত পুরো আলোচনা সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেখানে লুজুম পুরোপুরি নিশ্চিত ও অকাট্য নয় এবং তার কারণে কুফরের যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে তা-ও একেবারে স্পষ্ট নয়। কারণ, ধারণা, অনুমান বা সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে তাকফির করা যায় না। পক্ষান্তরে কোথাও যদি লুজুম পুরোপুরি সুনিশ্চিত এবং লাজিম একেবারে স্পষ্ট ও সুবিদিত হয়, তাহলে তা ইলতিজামের অনুরূপ বলেই বিবেচিত হয়। এর ভিত্তিতে তাকফিরও করা যায়। সুতরাং কুফরি কথা বা কাজ ইলতিজাম করার দ্বারা ব্যক্তি যেমন কাফির হয়ে যায়, অনুরূপ এমন কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণেও ব্যক্তি কাফির বলে বিবেচিত হয়, যার সঙ্গে কুফর এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে, প্রত্যেক বিবেকবান মানুষ সে সম্পর্কে জ্ঞাত। ইমাম আবু বাকা কাফাওয়ি রাহ. (মৃত্যু : ১০৯৪ হিজরি) লেখেন,
لزوم الكفر المعلوم كفر، لأن اللزوم إذا كان بينا فهو في الالتزام، لا اللزوم مع عدم العلم به.
'কুফরের সুবিদিত “লুজুম” ও কুফর। কারণ, লুজুম যদি সুস্পষ্ট হয় তা ইলতিজামের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হবে। তবে লুজুম সুবিদিত না হলে তা কুফর নয়।”
টিকাঃ
১১১ আল-কুল্লিয়াত, ফাসলুল কাফ, কুফর: ৭৬৬।
📄 তাকফিরের ব্যাপারে সালাফিদের সতর্কতা
ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলি রা. বলেন,
وَالَّذِي فَلَقَ الْحَبَّةَ، وَبَرَأَ النَّسَمَةَ، إِنَّهُ لَعَهْدُ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ ﷺ إِلَيَّ: «أَنْ لَا يُحِبَّنِي إِلَّا مُؤْمِنٌ، وَلَا يُبْغِضَنِي إِلَّا مُنَافِقٌ
'সেই মহান সত্তার কসম, যিনি বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম করেন এবং জীবকুল সৃষ্টি করেন, আমার প্রতি উম্মি নবি ﷺ -এর প্রতিশ্রুতি ছিল যে, মুমিন ব্যক্তিই আমাকে ভালোবাসবে আর মুনাফিক ব্যক্তি আমার সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করবে।”
এই হাদিসটি সন্দেহাতীতভাবে সহিহ। আলি রা. নিজেই যেহেতু এটি বর্ণনা করছেন, তাই তিনিও এ ব্যাপারে বিশদ জানেন। এতৎসত্ত্বেও খারেজিরা যখন তাঁর প্রতি চরম শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করেছে, তিনি তাদের কাফির তো দূরের কথা, মুনাফিক বলেও আখ্যা দেননি। অথচ হাদিসের বাহ্যিক অর্থের দাবিতে এমনটি করলে তাতে সমস্যার কিছু ছিল না। উপরন্তু এ ব্যাপারে তিনি কতটা সতর্ক ছিলেন, তা নিচের বর্ণনা থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়—
لَمَّا قَتَلَ عَلِيٌّ الْحَرُورِيَّةَ, قَالُوا: مَنْ هَؤُلَاءِ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ أَكْفَارُ هُمْ؟ قَالَ: «مِنَ الْكُفْرِ فَرُّوا قِيلَ: فَمُنَافِقُونَ؟ قَالَ: «إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا وَهَؤُلَاءِ يَذْكُرُونَ اللهَ كَثِيرًا قِيلَ: فَمَا هُمْ؟ قَالَ: «قَوْمُ أَصَابَتْهُمْ فِتْنَةٌ فَعَمُوا فِيهَا وَصُمُّوا»
'আলি রা. যখন খারেজিদের হত্যা করেন তখন মানুষজন জিজ্ঞেস করল, “আমিরুল মুমিনিন, এরা কারা? এরা কি কাফির?” তিনি বললেন, “তারা কুফর থেকে পালিয়েছে।” জিজ্ঞেস করা হলো, “তাহলে মুনাফিক?” তিনি বললেন, “মুনাফিকরা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে; অথচ তারা আল্লাহকে প্রচুর স্মরণ করে।” জিজ্ঞেস করা হলো, “তাহলে তারা কী?” তিনি বললেন, “এমন কিছু লোক, যারা ফিতনায় আক্রান্ত হয়েছে। ফলে তারা তাতে নিপতিত হয়ে অন্ধ ও বধির হয়ে গেছে।”
আলি রা. তাঁর এই প্রজ্ঞাপূর্ণ জবাব দ্বারা উম্মাহকে এ শিক্ষা দিয়েছেন যে, ব্যক্তিগত শত্রুতার জের ধরে শরিয়তের নির্দেশ লঙ্ঘন সমীচীন নয় এবং তাকফিরের ব্যাপারে অসতর্ক আচরণও কোনো মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়।
টিকাঃ
১১২ সহিহ মুসলিম: ১৩১।
* মুসান্নাফু আবদির রাজ্জাক: ১৮৬৫৬।
📄 একটি সংশয় নিরসন
পূর্বে আলোচনা করেছি, কেউ যদি কোনো মুসলিমকে অন্যায় তাকফির করে; আর বাস্তবে সে কাফির না হয়, তাহলে সেই কুফর খোদ তাকফিরকারীর ওপর বর্তায়। এ-সংক্রান্ত হাদিসটি এত অধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, যা মুতাওয়াতিরের স্তরে পৌঁছে যায়। এসব হাদিসের দাবি তো এটাই যে, অন্যায় তাকফিরকারী ব্যক্তি নিশ্চিত কাফির হয়ে যাবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ফকিহগণ এমন ব্যক্তিকে কাফির ও ইসলামের গন্ডি থেকে খারিজ বলে ফাতওয়া দেন না; বরং তাঁরা তাকে আগের মতো মুসলিমই গণ্য করেন। অথচ মুতাওয়াতির হাদিসের দ্বারা সুনিশ্চিত জ্ঞান অর্জিত হয়। তা দ্বারা আকিদাও প্রমাণিত হয়। সুতরাং এ ব্যাপারে মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদিস থাকা সত্ত্বেও এই ব্যক্তিকে তাকফির করা হয় না কেন?
শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু মুরতাজা ইয়ামানি ইবনুল ওয়াজির রাহ. (মৃত্যু: ৮৮০ হিজরি) উপরিউক্ত সংশয় উল্লেখ করে প্রায় ২৫ পৃষ্ঠাজুড়ে এর বিস্তারিত আলোচনা করে অন্তর প্রশান্তকারী জবাব দিয়েছেন। আমরা এখানে তাঁর সুদীর্ঘ আলোচনার সারসংক্ষেপ উল্লেখ করছি।
ফকিহগণ এমন ব্যক্তিকে তাকফির করা থেকে বিরত থেকেছেন মৌলিক তিনটি কারণে:
সাহাবিগণ এমন ব্যক্তিকে তাকফির করেননি। এখন কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে, মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদিস থাকা সত্ত্বেও খোদ সাহাবিগণ কেন তাকফির করেননি? এর জবাব হলো, ব্যাপক তাকফির এবং ব্যক্তিবিশেষকে সুনির্দিষ্টভাবে তাকফির করার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। কোনো কথা বা কাজকে কুফর আখ্যায়িত করা এক কথা, আর ব্যক্তিবিশেষকে চিহ্নিত করে তাকফির করা আরেক কথা। রাসুল ﷺ থেকেই কুফর ও তাকফিরের মধ্যে পার্থক্য করার দৃষ্টান্ত প্রমাণিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে সামনে বিস্তারিত আলোচনা আসছে।
রাসুলের কর্মপন্থা সামনে রাখলে অনুমিত হয়, এসব গুনাহের কারণে কাউকে তাকফির করার বিধান সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; বরং কেউ যদি কোনো প্রকার ব্যাখ্যা ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুসলিমকে তাকফির করে, কেবল সে ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য। ইমাম তাহাবির উদ্ধৃতিতে এ আলোচনা পূর্বে গত হয়েছে। এ ছাড়াও এর পক্ষে নবিজীবনে অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন: উমর রা. হাতিব ইবনু আবি বালতাআ রা.-কে মুনাফিক বলেছিলেন। নিফাক কুফরেরই একটি জঘন্য প্রকার। কাউকে মুনাফিক বলা তাকে তাকফির করার নামান্তর। অনুরূপভাবে মুআজ ইবনু জাবাল রা. অতি দীর্ঘ সালাত আদায়কারী এক ইমামকে মুনাফিক বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। রাসুল ﷺ নিজে উভয় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। এতৎসত্ত্বেও তিনি উমর বা মুআজ রা.-কে তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে তাকফির করেননি এবং নতুন করে ইমান নবায়নেরও নির্দেশ দেননি।
কুফর শব্দটি কুফরে আকবার বোঝানোর জন্য সবসময় ব্যবহৃত হয় না; বরং কখনো তা দ্বারা কুফরে আসগারও উদ্দেশ্য হয়—মুহাদ্দিসগণ যেটাকে তাদের গ্রন্থাবলিতে 'কুফরুন দু-না কুফরিন' শিরোনামে উল্লেখ করে থাকেন। কুফরে আকবার (বড় কুফর) বলা হয় এমন কুফরকে, যা ব্যক্তিকে ইসলামের চৌহদ্দি থেকে বের করে দেয়। কুফরে আসগার (ছোট কুফর) বলা হয় এমন কুফরকে, যা ব্যক্তিকে পাপী বানালেও ইসলাম থেকে বের করে না। সুতরাং হতে পারে, আলোচ্য হাদিসে কুফর শব্দটি কুফরে আসগার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।