📄 লুজুম ও ইলতিজামের মধ্যে পার্থক্য করা : সতর্কতার অন্যতম বহিঃপ্রকাশ
মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে তিনটি শব্দ বুঝে নেওয়া দরকার: লুজুম, লাজিম ও ইলতিজাম। 'লুজুম' অর্থ-কোনো কিছু নিজে নিজে আবশ্যক ও অপরিহার্য হওয়া। আর যা আবশ্যক ও অপরিহার্য হয়, তাকে বলা হয় 'লাজিম'। যেমন: কাউকে আঘাত করলে সে ব্যথা পাবে। এই ব্যথা পাওয়াটা আঘাতের লুজুম, ব্যথা হলো লাজিম। আর 'ইলতিজাম' অর্থ-নিজেই কোনো কিছু অবলম্বন, আবশ্যক ও অবধারিত করে নেওয়া।
কেউ এমন কোনো কথা বলল বা এমন কোনো কাজ করল, যা সত্তাগতভাবে কুফর নয়; তবে তার দ্বারা কুফর লাজিম হয়, তাহলে এর কারণে কি সেই ব্যক্তিকে তাকফির করা যাবে? কারণ, ফিকহের একটি স্বীকৃত মূলনীতি হলো,
إذا ثبت الشيئ ثبت بلوازمه.
'কোনো কিছু সাব্যস্ত হলে তার যত লাজিম আছে, তা-সহ সাব্যস্ত হয়।'
এ ক্ষেত্রে মুহাক্কিক ফকিহ ও উসুলশাস্ত্র-বিশেষজ্ঞগণের মত হলো, কেউ যতক্ষণ-না নিজে কুফর 'ইলতিজাম' করে নেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত স্রেফ 'লুজুমে'র কারণে তাকে তাকফির করা হবে না। উদাহরণ দিয়ে বোঝালে বিষয়টি উপলব্ধি করতে সহজ হবে।
মুতাজিলা অভিমত হলো, আল্লাহর সত্তার সঙ্গে ইলম গুণ প্রতিষ্ঠিত নয়। অথচ অসংখ্য আয়াত ও হাদিস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, আল্লাহর ইলম গুণ রয়েছে। তিনি আলিম (علیم), সর্বজ্ঞ। সবকিছু নিজ জ্ঞান দ্বারা পরিব্যাপ্ত করে রেখেছেন (محيط بكل شيئ علما)। সৃষ্টি করা যেমন তাঁর একটি গুণ, জ্ঞানও তেমনই তাঁর একটি গুণ। তিনি যেমন অনাদি ও অনন্ত, তাঁর গুণসমূহও তেমনই অনাদি ও অনন্ত।
আল্লাহর 'ইলম গুণ' অস্বীকার করার 'লাজিম' হলো, আল্লাহর অস্তিত্বই অস্বীকার করা। কারণ, আল্লাহ হচ্ছেন সেই সত্তা, যিনি পূর্ণতার অন্যান্য গুণের পাশাপাশি ইলমের দ্বারাও গুণান্বিত। জ্ঞানহীন কেউ রব হওয়ার উপযুক্ততাই রাখে না। সুতরাং যখন কেউ আল্লাহর সত্তার সঙ্গে এই গুণ প্রতিষ্ঠিত মনে করবে না, তখন কেমন যেন সে রবের অস্তিত্বই স্বীকার করল না, যা সুস্পষ্ট কুফর।
একইভাবে দু-চারজন পূর্ববর্তী আলিম এবং আক্ষরিক অর্থের পেছনে লাগামহীনভাবে তাড়িত বর্তমানের অসংখ্য ব্যক্তির আকিদা হলো, আল্লাহর জন্য 'দিক' প্রমাণিত। পূর্ববর্তী দুজন আলিম তো এ ব্যাপারে সুদীর্ঘ গ্রন্থও রচনা করে বসেছেন, যাতে তারা দলিলের পসরা সাজিয়ে এ কথা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, আল্লাহর জন্য অন্তত ‘উপর দিক' সাব্যস্ত রয়েছে। অথচ বিষয়টি সর্বসম্মত যে, 'দিক' সাব্যস্ত করা দেহ-কাঠামো ও সীমাবদ্ধতার অস্তিত্ব অপরিহার্য করে, যা কোনো প্রান্তে বা কোনো দিকে অবস্থিত, তা অপরিহার্যভাবে দেহ-কাঠামোবিশিষ্টই হয়ে থাকে। তার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও বেধ সুনির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে। আল্লাহর শানে এসব জিনিস সাব্যস্ত করা সুস্পষ্ট কুফর।
এসব 'লাজিম' সামনে থাকার পরও উম্মাহর নির্ভরযোগ্য আলিমরা না মুতাজিলাদের তাকফির করেছেন; আর না আল্লাহর জন্য 'উপর দিক' সাব্যস্তকারীদের সুনির্দিষ্টভাবে কাফির বলেছেন। এর মূল কারণ হলো, যদিও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মতাদর্শের কারণে কুফর লাজিম আসে; কিন্তু তারা তা ইলতিজাম না করে বরং স্পষ্ট ভাষায় সেসব লাজিমকে অস্বীকার করে। তাদের সামনে কেউ সেই লাজিমগুলো তুলে ধরলে তারা দৃঢ়ভাবে সেগুলোর সঙ্গে সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করে।
যেমন, কোনো মুতাজিলিকে যদি বলা হয়, তুমি তো আল্লাহর ইলম গুণকে অস্বীকার করো, সুতরাং এর লাজিম হলো তুমি আল্লাহর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করো। তাহলে তৎক্ষণাৎ সে এই লাজিমকে অস্বীকার করবে এবং এর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে নিজের সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করবে। একইভাবে যারা আল্লাহর জন্য 'উপর দিক' সাব্যস্ত করে, তাদের যদি বলা হয়, এর লাজিম হলো, আল্লাহর জন্য দেহ-কাঠামোবিশিষ্ট হওয়া সাব্যস্ত রয়েছে। তাহলে দেখা যাবে, তৎক্ষণাৎ প্রচণ্ড দৃঢ়তার সঙ্গে তারা সেই লাজিমকে অস্বীকার করবে এবং এর সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করবে।
সুতরাং বোঝা গেল, ফকিহগণ তাকফিরের ক্ষেত্রে ইলতিজামকে বিবেচনা করেছেন; লুজুমকে বিবেচনা করেননি। কারণ, লুজুম হচ্ছে সন্দেহ ও সম্ভাবনাপূর্ণ; সুনিশ্চিত ও অকাট্য কিছু নয়। অথচ তাকফিরের জন্য সুনিশ্চিত, দ্ব্যর্থহীন ও অকাট্য ভিত্তি প্রয়োজন। যেহেতু ব্যক্তির ইসলাম সুনিশ্চিত, তাই সুনিশ্চিত কুফরের ভিত্তিতেই কেবল তা নষ্ট হওয়ার ফাতওয়া দেওয়া যাবে; ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে নয়। এ কারণে যারা আল্লাহর জন্য স্থান বা দেহ-কাঠামোবিশিষ্ট হওয়া সাব্যস্ত করে, ফকিহগণ তাদের তাকফির করেছেন। যেহেতু তারা কুফরকে ইলতিজাম করেছে। তবে যাদের কথার ফলস্বরূপ লাজিম হিসেবে আল্লাহর জন্য স্থান বা দেহ- কাঠামোবিশিষ্ট হওয়া সাব্যস্ত হয়; কিন্তু তারা তা ইলতিজাম করে না; উপরন্তু তারা স্পষ্ট ভাষায় এসব লাজিমকে অস্বীকার করে এবং এগুলোর সঙ্গে সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করে, ফকিহগণ তাদেরও তাকফির করা থেকে বিরত থেকেছেন।
টিকাঃ
১০০ মুতাজিলা (আরবি: معتزلة।) হলো ইসলামি ধর্মতত্ত্বের একটি ভ্রান্ত শাখা। এটি কারণ ও যুক্তির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীতে বসরা ও বাগদাদে এর প্রাধান্য ছিল। কুরআনকে আল্লাহর মাখলুক (সৃষ্ট) বলার কারণে তারা বেশি আলোচিত। তাদের মতে, কুরআন আল্লাহর সঙ্গে একই অস্তিত্বে ছিল না; বরং তা আল্লাহর সৃষ্ট। উমাইয়া খিলাফতের যুগে মুতাজিলা মতবাদের আবির্ভাব হয়। ওয়াসিল ইবনু আতাকে মুতাজিলা মতবাদের জনক হিসেবে ধরা হয়। তিনি ছিলেন হাসান বসরির শিষ্য। একটি মাসআলাকে কেন্দ্র করে তিনি হাসান বসরির মজলিস থেকে বের হয়ে নিজে একটি মতাদর্শ চালু করেন, যা মুতাজিলা মতবাদ নামে পরিচিতি পায়। মুতাজিলা শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় 'যে নিজেকে আলাদা করে নেয় বা কিছু থেকে প্রত্যাহার করে নেয়'।
আব্বাসি খিলাফতের যুগে এটি রাজনৈতিকভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। কারণ, আব্বাসি খলিফা আল মামুন এই মতবাদ গ্রহণ করেন। কিন্তু এই মতবাদকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে ধর্মীয় নিপীড়ন শুরু হয় আহলুস সুন্নাহর আলিমদের ওপর এবং অন্য যারা এই মতবাদ গ্রহণ করেনি, তাদের ওপর। এ নীতি ১৫ বছর (৮৩৩-৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) ধরে চলে এবং এ সময়ের মধ্যে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহ. কারারুদ্ধ হন। মুতাজিলা মতবাদের আলিমরাও এসবের প্রতিবাদ না করে নীরব থাকেন। পরে আল মুতাওয়াক্কিল (দশম আব্বাসি খলিফা) ক্ষমতায় এলে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল মুক্তি পান।
মুতাজিলাদের চিন্তাধারাকে পাঁচটি মূলনীতির মধ্যে সংক্ষিপ্ত করা যায়। যার প্রথমটি হলো, তারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলি তথা সিফাতসমূহকে আল্লাহর সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত স্বীকার করে না। তারা যুক্তি দেয়, আল্লাহকে কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। তাই এগুলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যাবে না।
📄 ইমাম ইজ্জুদ্দিন ইবনু আবদিস সালামের দৃষ্টিতে লুজুম ও ইলতিজামের পার্থক্য
ইমাম ইজ্জুদ্দিন ইবনু আবদিস সালাম রাহ. (মৃত্যু: ৬৬০ হিজরি) বলেন,
فإن قيل: يلزم من الاختلاف في كونه سبحانه في جهة أن يكون حادثا؟ قلنا: لازم المذهب ليس بمذهب، لأن المجسمة جازمون بأنه في جهة، وجازمون بأنه قديم أزلي، ليس بمحدث. فلا يجوز أن ينسب إلى مذهب من يصرح بخلافه، وإن كان لا زما من قوله.
'যদি প্রশ্ন করা হয়, আল্লাহকে কোনো দিকে অবস্থিত বলার দ্বারা তো এটা অপরিহার্য হচ্ছে যে, তিনি অনিত্য (নশ্বর)। আমরা এর জবাবে বলব, কোনো মাজহাবের লাজিম (অপরিহার্য বিষয়) মূল মাজহাব নয়। কারণ, মুজাসসিমা (দেহবাদী) গোষ্ঠী মনে করে, আল্লাহ কোনো দিকে অবস্থিত। অথচ তারা এ-ও বিশ্বাস করে, তিনি নিত্য (অবিনশ্বর) ও চিরন্তন; অনিত্য (নশ্বর) নন। সুতরাং কারও মাজহাবের দিকে এমন কোনো কথা সম্পৃক্ত করা বৈধ হবে না, যে স্পষ্টভাষায় যার বিপরীত বক্তব্য দেয়; যদিও তার কথার লাজিম তা-ই হয়।
টিকাঃ
১০৭ কাওয়ায়িদুল আহকাম ফি মাসালিহিল আনাম, কায়িদাতুন ফি বায়ানি মুতাআল্লিকাতিল আহকাম: ১/২০৩।
📄 ইমাম শাতিবির দৃষ্টিতে লুজুম ও ইলতিজামের পার্থক্য
ইমাম শাতিবি রাহ. (মৃত্যু: ৭৯০ হিজরি) লেখেন,
الذي كنا نسمعه من الشيوخ أن مذهب المحققين من أهل الأصول أن الكفر بالمآل ليس بكفر في الحال، كيف والكافر ينكر ذلك المآل أشد الإنكار ويرمي مخالفه به، ولو تبين له وجه لزوم الكفر من مقالته لم يقل بها على حال.
'আমরা শায়খদের থেকে শুনে আসছি যে, উসুল-শাস্ত্রবিদ মুহাক্কিক আলিমগণের মাজহাব হলো, কোনো কথা বা কাজের লাজিম কুফর হলে সেটাকে তৎক্ষণাৎ কুফর বলার সুযোগ নেই। সেটাকে কুফর বলা কীভাবে সম্ভব, যেখানে সেই ব্যক্তি এসব লাজিমকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে এবং তার বিরোধীদের সেই অভিযোগ ছুঁড়ে মারে। এমনকি তার সামনে যদি স্পষ্ট হয়ে যেত যে, তার কথার লাজিম হিসেবে কুফর সাব্যস্ত হচ্ছে, তাহলে সে কোনো অবস্থাতেই সেই কথা বলত না।’
টিকাঃ
** আল-ইতিসাম, মাসায়িল ফি হাদিসি ইফতিরাকিল উম্মাতি আলা সালাসিন ওয়া সাবইনা ফিরকাতান: ২/৭০৮।
📄 ইবনু তাইমিয়ার দৃষ্টিতে লুজুম ও ইলতিজামের পার্থক্য
ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহ. (মৃত্যু : ৭২৮ হিজরি) লেখেন,
لا يلزم إذا كان القول كفرا أن يكفر كل من قاله مع الجهل والتأويل؛ فإن ثبوت الكفر في حق الشخص المعين كثبوت الوعيد في الآخرة في حقه، وذلك له شروط وموانع.
'কোনো কথা কুফর হওয়ার দ্বারা এটা অপরিহার্য হয় না যে, যারাই অজ্ঞতা বা তাওয়িলের (ব্যাখ্যা) সঙ্গেও সেই কথা বলবে, তাদের সবাইকে তাকফির করা হবে। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে কুফর সাব্যস্ত হওয়া আখিরাতে তার ব্যাপারে শান্তি সাব্যস্ত হওয়ার মতোই। আর এর অনেক শর্ত ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
টিকাঃ
*** মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়া, ফাসলু কালামি রাফিজি আলা দালালাতিল আকলি ইনদাহু আলাল আফআলিল ইখতিয়ারিয়া ওয়ার রাদ্দি আলাইহি : ৫/২৪০।