📘 কুফর ও তাকফির > 📄 ফিকহি মূলনীতির আলোকে তাকফিরের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনের গুরুত্ব

📄 ফিকহি মূলনীতির আলোকে তাকফিরের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনের গুরুত্ব


কেউ যখন কালিমা পাঠ করে ইসলামকে আন্তরিকভাবে পুরোপুরি গ্রহণ করে নেয়, শরিয়তের সামনে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেয়, তখন সুনিশ্চিতভাবে সে একজন মুসলিম হিসেবে বিবেচিত হয়। তার ওপর ইসলামের বিধিবিধান প্রযোজ্য হয়। সুতরাং যতক্ষণ তার থেকে এর বিপরীত কোনো বিষয় প্রকাশ না হবে, ততক্ষণ তাকে 'ইসতিসহাবুল হাল' তথা স্বাভাবিক অবস্থার দাবিতে মুসলিমই বলা হবে। এরপর কখনো যদি তার থেকে এমন কোনো কথা বা কাজ প্রকাশ পায়, যা ইসলাম ও কুফর উভয়টির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, তখন তাকে স্রেফ এই অনিশ্চিত বিষয়কে কেন্দ্র করে তাকফির করা যাবে না। কারণ, এই কথা বা কাজ প্রকাশ হওয়ার আগে সে নিশ্চিতভাবে মুসলিম ছিল। এখন সন্দেহ দেখা দিয়েছে-সে কি আগের মতো মুসলিমই রয়েছে, নাকি কাফির হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে ফকিহগণের সর্বজনস্বীকৃত একটি মূলনীতি হলো,
اليقين لا يزول بالشك.
সুনিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূরীভূত হয় না।
সুতরাং এ ধরনের সংশয়পূর্ণ অনিশ্চিত বিষয়ের কারণে কোনো মুসলিম পরিচয়ধারীকে তাকফির করার সুযোগ নেই। প্রখ্যাত হানাফি ফকিহ ইমাম ইবনু কাজি সামাওয়াহ রাহ. (মৃত্যু: ৮২৩ হিজরি) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ জামিউল ফুসুলাইন-এ কুফরি কথা ও কাজগুলোর বিবরণ নিয়ে আলাদা অধ্যায় সংকলন করেছেন, যাতে তিনি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী হানাফি ফকিহগণের উল্লিখিত অধিকাংশ কুফরি কথা ও কাজের বিবরণ একত্রিত করেছেন। সেই অধ্যায়ের শুরুতে তিনি এ বিষয়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতি লিপিবদ্ধ করেছেন, যার ওপর পুরো আলোচনার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত-
روى الطحاوي عن "ح" وأصحابنا أنه لا يخرج الرجل من الإيمان إلا جحود ما أدخله فيه، ثم ما يتيقن بأنه ردة يحكم بها له، وما يشك بأنه ردة لا يحكم بها. إذ الإسلام الثابت لا يزول بشك مع أن الإسلام يعلو.
'তাহাবি রাহ. ইমাম আবু হানিফা ও অন্যান্য হানাফি ফকিহ থেকে বর্ণনা করেছেন, যেসব বিষয় স্বীকার করার কারণে মানুষ ইমানদার হয়েছিল, সেসব বিষয় অস্বীকারের কারণেই মানুষ ইমান থেকে বেরিয়ে যায়। (তাকফিরের মূলনীতি হলো,) ব্যক্তির যেসব বিষয় “রিদ্দাহ” হওয়া নিশ্চিত, সেগুলোর কারণে তার ব্যাপারে মুরতাদ হওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। আর যেসব বিষয় “রিদ্দাহ” হওয়া সন্দেহপূর্ণ, সেগুলোর কারণে তার ব্যাপারে মুরতাদ হওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। কারণ, (আগ থেকে) সাব্যস্ত ইমান সন্দেহ দ্বারা বিলুপ্ত হয় না। তা ছাড়া ইসলাম সর্বদা সমুন্নত থাকে।
ইমাম তাহাবি রাহ. তাঁর সুপ্রসিদ্ধ আকিদাগ্রন্থেও এ বিষয়টির ওপর আলোকপাত করেছেন। তিনি লেখেন,
ولا ننزل أحدا منهم جنة ولا نارا، ولا نشهد عليهم بكفر ولا بشرك ولا بنفاق، ما لم يظهر منهم شيء من ذلك، ونذر سرائرهم إلى الله تعالى.
'আমরা কোনো মুসলিমকে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলে আখ্যায়িত করব না এবং তাদের কারও বিরুদ্ধে আমরা কুফর, শিরক বা নিফাকের সাক্ষ্য দেবো না, যতক্ষণ-না এগুলোর কোনো একটি তাদের মধ্যে প্রকাশ্যে দৃষ্টিগোচর হয়। তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার আমরা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিই।

টিকাঃ
১০২ জামিউল ফুসুলাইন, আল-ফাসলুস সামিনু ওয়াস সালাসুনা ফি মাসায়িলিল কালিমাতিল কুফরিয়া: ২/১৬৩।
১০০ আল-আকিদাতুত তাহাবিয়া: ৯৩।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 তাকফিরের ব্যাপারে ফকিহগণের সতর্কতা

📄 তাকফিরের ব্যাপারে ফকিহগণের সতর্কতা


কুরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনা এবং ফিকহি মূলনীতির প্রেক্ষিতে ফকিহগণ যুগে যুগে তাকফিরের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। আজকাল তো আলিম নন এমন অনেকে নির্দ্বিধায় তাকফিরের মেশিনগান নিয়ে বসে দেদারসে তাকফিরের গুলি ছোড়ে; অথচ সম্মানিত ফকিহগণ কারও কুফর শতভাগ স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত তার ব্যাপারে কাফির-মুরতাদ হওয়ার ফাতওয়া দিতেন না।
অধিকাংশ হানাফি ফকিহ এই মাসআলা উল্লেখ করেছেন যে, কারও থেকে যদি এমন কোনো কথা বা কাজ প্রকাশ হয়, যা সব বিবেচনায় কুফর হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, তবে একটিমাত্র বিবেচনায় তাকে মুসলিম গণ্য করার সুযোগ থাকে, তাহলে মুফতির জন্য অপরিহার্য হলো, ওই ব্যক্তির সুস্পষ্ট অবস্থা ও অবস্থান সামনে আসা অবধি তিনি সেই একটি দিককে প্রাধান্য দিয়ে তার ব্যাপারে কুফরের ফাতওয়া দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন।
এখানে প্রসঙ্গত একটি বিষয় উল্লেখ্য, যা আল্লামা ইদরিস কান্ধলবি রাহ. আকায়িদুল ইসলাম গ্রন্থে লিখেছেন,
'আলিমগণের মধ্যে এমন একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, কেউ শতকরা ৯৯ ভাগ কুফরিতে লিপ্ত এবং মাত্র ১ ভাগ ইমানের মধ্যে রয়েছে, তাকে কাফির বলা যাবে না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, কেউ দীনের ৯৯টি কথা অস্বীকার ও মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে এবং মাত্র ১টি কথা স্বীকার করে, তাহলে তাকে কাফির বলা যাবে না। এটা চরম ভুল। কেননা, এ কথার ভিত্তিতে তো ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টানদের কাফির বলা যাবে না। কারণ, ইয়াহুদি-খ্রিষ্টানরাও তো ইসলামের কমপক্ষে ৫০ ভাগ বিষয় মানে। ইসলামের সব কথা অস্বীকার করে, এমন কোনো কাফির দুনিয়াতে নেই।
আলিমগণের এই বক্তব্যের অর্থ হলো, কারও মুখ থেকে যদি সংক্ষিপ্ত ও সংশয়পূর্ণ কোনো কথা বেরিয়ে যায়, যার মধ্যে ৯৯ ভাগ কুফরির সম্ভাবনা থাকে এবং ১ ভাগ ইমানের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে এমন সংশয় ও সন্দেহমূলক কথার ওপর ভিত্তি করে তাকে কাফির বলা যাবে না। কিন্তু তাদের কথার অর্থ এ নয় যে, যদি কেউ শরিয়তের ৩০০ হুকুম মানে, কেবল তিনটি ছাড়া-যেমন, ব্যভিচার করা, মদপান করা ও ঘুস খাওয়া হালাল মনে করে, তবে কি সে কাফির হবে না? সে তো কেবল এক শতাংশ হুকুমই অমান্য করেছে; আর বাকি ৯৯ শতাংশ হুকুমই তো মেনেছে। যে ব্যক্তি রাষ্ট্রের ১০০টি আইনের মধ্যে ৯৯টিই মানে, কেবল একটি আইন মানে না, সে ব্যক্তি প্রশাসনের কাছে বিদ্রোহী বলে বিবেচিত এবং ফাঁসি বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড তার জন্য অবধারিত। অথচ সে ৯৯টি আইন মেনে কেবল ১টি আইনের বিরোধিতার কারণে তাকে এই শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে।
দীনের সর্বজনবিদিত বিষয় দ্বারা সেসব বিষয় উদ্দেশ্য, যা রাসুল থেকে মুতাওয়াতির পর্যায়ে বর্ণিত ও প্রমাণিত এবং সাধারণভাবে মুসলিমরা সেসব বিষয় সম্পর্কে অবহিত। অর্থাৎ, সে বিষয়ের জ্ঞান কেবল নবিগণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা সাধারণ মানুষের জ্ঞানের আওতাভুক্ত। যেসব বিষয় দীনের সর্বজনবিদিত বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত, যে-কেউ তার কোনোটি অমান্য ও অস্বীকার করলে কিংবা তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ পোষণ করলে সে আর মুসলিম থাকবে না; কাফির হয়ে যাবে। ইমান ও ইসলামের জন্য দীনের সব অপরিহার্য বিষয় মেনে চলা একান্ত আবশ্যক।
যে ব্যক্তি সরকারের সব আইনকানুন মেনে চলে, সে-ই বিশ্বস্ত। কেউ যদি সরকারের ৯৯টি নির্দেশ মানে; কিন্তু ১টি নির্দেশের ক্ষেত্রে বলে যে, এই নির্দেশ আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংশয় ও সন্দেহ পোষণ করে এমনসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুরু করে, যা সরকার ও শাসকগোষ্ঠীর ন্যায়বিচারের ধারেকাছেও আসে না, তাহলে এমন ব্যক্তিকে সরকারের অনুগত না বলে বিদ্রোহী বলাই সংগত।
দীনের অপরিহার্যতা এবং নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত ইসলামি অনুশাসনসমূহের কোনো একটিকে অস্বীকার করা যেমন কুফর, তেমনই সেসব বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হওয়াও কুফর। কারণ, নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত বিষয়সমূহে বিতর্ক ও সংশয় প্রকাশ করা অস্বীকৃতির নামান্তর।
সালাত ও সিয়াম ফরজ হওয়াকে অস্বীকার করা যেমন কুফর, তেমনই সালাত, সিয়াম ও জাকাতের নির্দেশ সম্পর্কে কোনো বিতর্কে লিপ্ত হওয়াও কুফর। যেখানে কোনো সংশয় দেখা দেয়, সেখানে কেবল বিতর্ক ও পর্যালোচনা প্রযোজ্য হয়। যেসব বিষয় নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত বা দিবালোকের মতো স্পষ্ট, সেসব বিষয়ে বিতর্ক শুধু অস্বীকারই নয়; বরং ঠাট্টা ও উপহাসের নামান্তর।'
ইমাম ইবনু কাজি সামাওয়াহ রাহ. (মৃত্যু: ৮২৩ হিজরি) তাঁর কালজয়ী জামিউল ফুসুলাইন গ্রন্থে লেখেন,
اعلم أنه لو كان في مسألة وجوه توجب الكفر ووجه واحد يمنع التكفير، فعلى المفتي أن يميل إلى الوجه الذي يمنع التكفير تحسينا للظن بالمسلم، ثم لو كانت نية القائل ذلك فهو مسلم، ولو كانت نيته الوجه الذي يوجب الكفر لا ينفعه حمل المفتي كلامه، فيؤمر بالتوبة وتجديد النكاح.
'জেনে রেখো, যদি কোনো মাসআলায় এমন অনেক সম্ভাবনা থাকে, যা কুফর অপরিহার্য করে; আর একটি সম্ভাবনা এমন থাকে, যা কুফর রোধ করে, তাহলে মুফতির জন্য অপরিহার্য হলো, মুসলিমের প্রতি সুধারণাবশত তিনি সেই সম্ভাবনার দিকে ঝুঁকবেন, যা তাকফির রোধ করে। কথকের উদ্দেশ্যও যদি সেটাই হয়, তাহলে সে একজন মুসলিম। আর তার নিয়ত যদি এমন হয়, যা কুফর অপরিহার্য করে, তাহলে মুফতি কর্তৃক তার কথাকে ভালো অর্থে প্রয়োগ করা তার কোনো উপকারে আসবে না; বরং তাকে (কুফর থেকে) তাওবা করার এবং বিয়ে নবায়নের নির্দেশ দেওয়া হবে।

টিকাঃ
১০৪ একই ধরনের কথা হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলি থানবি রাহ.-ও একাধিক জায়গায় লিখেছেন।
১১o৫ জামিউল ফুসুলাইন, আল-ফাসলুস সামিনু ওয়াস সালাসুনা ফি মাসায়িলিল কালিমাতিল কুফরিয়া: ২/১৬৩।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 কুফর ও তাকফিরের মধ্যে পার্থক্যের গুরুত্ব

📄 কুফর ও তাকফিরের মধ্যে পার্থক্যের গুরুত্ব


উপরিউক্ত আলোচনা থেকে প্রতিভাত হলো, কুফর এবং তাকফির দুটি ভিন্ন বিষয়। কেউ যদি এমন কিছু বলে বা এমন কিছু করে, যাতে ইমান ও কুফর উভয় সম্ভাবনাই থাকে; আর তার উদ্দেশ্য সেই কুফরই হয়ে থাকে, তাহলে সে তৎক্ষণাৎ কাফির হয়ে যাবে। তবে মুফতি যেহেতু বাহ্যিক অবস্থার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেওয়ার দায়বদ্ধ, তাই তার জন্য নিরেট সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে সুনিশ্চিত বিষয়ের বিপরীত ফাতওয়া প্রদানের সুযোগ নেই। সুতরাং সংশয়পূর্ণ কথা বা কাজের ক্ষেত্রে কথক যতক্ষণ পর্যন্ত বাহ্যিকভাবে কুফর অবধারিত করে না নেবে, ততক্ষণ মুফতি সুনিশ্চিতভাবে তার ব্যাপারে কুফরের ফাতওয়া জারি করতে পারবেন না।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 লুজুম ও ইলতিজামের মধ্যে পার্থক্য করা : সতর্কতার অন্যতম বহিঃপ্রকাশ

📄 লুজুম ও ইলতিজামের মধ্যে পার্থক্য করা : সতর্কতার অন্যতম বহিঃপ্রকাশ


মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে তিনটি শব্দ বুঝে নেওয়া দরকার: লুজুম, লাজিম ও ইলতিজাম। 'লুজুম' অর্থ-কোনো কিছু নিজে নিজে আবশ্যক ও অপরিহার্য হওয়া। আর যা আবশ্যক ও অপরিহার্য হয়, তাকে বলা হয় 'লাজিম'। যেমন: কাউকে আঘাত করলে সে ব্যথা পাবে। এই ব্যথা পাওয়াটা আঘাতের লুজুম, ব্যথা হলো লাজিম। আর 'ইলতিজাম' অর্থ-নিজেই কোনো কিছু অবলম্বন, আবশ্যক ও অবধারিত করে নেওয়া।
কেউ এমন কোনো কথা বলল বা এমন কোনো কাজ করল, যা সত্তাগতভাবে কুফর নয়; তবে তার দ্বারা কুফর লাজিম হয়, তাহলে এর কারণে কি সেই ব্যক্তিকে তাকফির করা যাবে? কারণ, ফিকহের একটি স্বীকৃত মূলনীতি হলো,
إذا ثبت الشيئ ثبت بلوازمه.
'কোনো কিছু সাব্যস্ত হলে তার যত লাজিম আছে, তা-সহ সাব্যস্ত হয়।'
এ ক্ষেত্রে মুহাক্কিক ফকিহ ও উসুলশাস্ত্র-বিশেষজ্ঞগণের মত হলো, কেউ যতক্ষণ-না নিজে কুফর 'ইলতিজাম' করে নেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত স্রেফ 'লুজুমে'র কারণে তাকে তাকফির করা হবে না। উদাহরণ দিয়ে বোঝালে বিষয়টি উপলব্ধি করতে সহজ হবে।
মুতাজিলা অভিমত হলো, আল্লাহর সত্তার সঙ্গে ইলম গুণ প্রতিষ্ঠিত নয়। অথচ অসংখ্য আয়াত ও হাদিস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, আল্লাহর ইলম গুণ রয়েছে। তিনি আলিম (علیم), সর্বজ্ঞ। সবকিছু নিজ জ্ঞান দ্বারা পরিব্যাপ্ত করে রেখেছেন (محيط بكل شيئ علما)। সৃষ্টি করা যেমন তাঁর একটি গুণ, জ্ঞানও তেমনই তাঁর একটি গুণ। তিনি যেমন অনাদি ও অনন্ত, তাঁর গুণসমূহও তেমনই অনাদি ও অনন্ত।
আল্লাহর 'ইলম গুণ' অস্বীকার করার 'লাজিম' হলো, আল্লাহর অস্তিত্বই অস্বীকার করা। কারণ, আল্লাহ হচ্ছেন সেই সত্তা, যিনি পূর্ণতার অন্যান্য গুণের পাশাপাশি ইলমের দ্বারাও গুণান্বিত। জ্ঞানহীন কেউ রব হওয়ার উপযুক্ততাই রাখে না। সুতরাং যখন কেউ আল্লাহর সত্তার সঙ্গে এই গুণ প্রতিষ্ঠিত মনে করবে না, তখন কেমন যেন সে রবের অস্তিত্বই স্বীকার করল না, যা সুস্পষ্ট কুফর।
একইভাবে দু-চারজন পূর্ববর্তী আলিম এবং আক্ষরিক অর্থের পেছনে লাগামহীনভাবে তাড়িত বর্তমানের অসংখ্য ব্যক্তির আকিদা হলো, আল্লাহর জন্য 'দিক' প্রমাণিত। পূর্ববর্তী দুজন আলিম তো এ ব্যাপারে সুদীর্ঘ গ্রন্থও রচনা করে বসেছেন, যাতে তারা দলিলের পসরা সাজিয়ে এ কথা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, আল্লাহর জন্য অন্তত ‘উপর দিক' সাব্যস্ত রয়েছে। অথচ বিষয়টি সর্বসম্মত যে, 'দিক' সাব্যস্ত করা দেহ-কাঠামো ও সীমাবদ্ধতার অস্তিত্ব অপরিহার্য করে, যা কোনো প্রান্তে বা কোনো দিকে অবস্থিত, তা অপরিহার্যভাবে দেহ-কাঠামোবিশিষ্টই হয়ে থাকে। তার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও বেধ সুনির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে। আল্লাহর শানে এসব জিনিস সাব্যস্ত করা সুস্পষ্ট কুফর।
এসব 'লাজিম' সামনে থাকার পরও উম্মাহর নির্ভরযোগ্য আলিমরা না মুতাজিলাদের তাকফির করেছেন; আর না আল্লাহর জন্য 'উপর দিক' সাব্যস্তকারীদের সুনির্দিষ্টভাবে কাফির বলেছেন। এর মূল কারণ হলো, যদিও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মতাদর্শের কারণে কুফর লাজিম আসে; কিন্তু তারা তা ইলতিজাম না করে বরং স্পষ্ট ভাষায় সেসব লাজিমকে অস্বীকার করে। তাদের সামনে কেউ সেই লাজিমগুলো তুলে ধরলে তারা দৃঢ়ভাবে সেগুলোর সঙ্গে সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করে।
যেমন, কোনো মুতাজিলিকে যদি বলা হয়, তুমি তো আল্লাহর ইলম গুণকে অস্বীকার করো, সুতরাং এর লাজিম হলো তুমি আল্লাহর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করো। তাহলে তৎক্ষণাৎ সে এই লাজিমকে অস্বীকার করবে এবং এর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে নিজের সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করবে। একইভাবে যারা আল্লাহর জন্য 'উপর দিক' সাব্যস্ত করে, তাদের যদি বলা হয়, এর লাজিম হলো, আল্লাহর জন্য দেহ-কাঠামোবিশিষ্ট হওয়া সাব্যস্ত রয়েছে। তাহলে দেখা যাবে, তৎক্ষণাৎ প্রচণ্ড দৃঢ়তার সঙ্গে তারা সেই লাজিমকে অস্বীকার করবে এবং এর সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করবে।
সুতরাং বোঝা গেল, ফকিহগণ তাকফিরের ক্ষেত্রে ইলতিজামকে বিবেচনা করেছেন; লুজুমকে বিবেচনা করেননি। কারণ, লুজুম হচ্ছে সন্দেহ ও সম্ভাবনাপূর্ণ; সুনিশ্চিত ও অকাট্য কিছু নয়। অথচ তাকফিরের জন্য সুনিশ্চিত, দ্ব্যর্থহীন ও অকাট্য ভিত্তি প্রয়োজন। যেহেতু ব্যক্তির ইসলাম সুনিশ্চিত, তাই সুনিশ্চিত কুফরের ভিত্তিতেই কেবল তা নষ্ট হওয়ার ফাতওয়া দেওয়া যাবে; ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে নয়। এ কারণে যারা আল্লাহর জন্য স্থান বা দেহ-কাঠামোবিশিষ্ট হওয়া সাব্যস্ত করে, ফকিহগণ তাদের তাকফির করেছেন। যেহেতু তারা কুফরকে ইলতিজাম করেছে। তবে যাদের কথার ফলস্বরূপ লাজিম হিসেবে আল্লাহর জন্য স্থান বা দেহ- কাঠামোবিশিষ্ট হওয়া সাব্যস্ত হয়; কিন্তু তারা তা ইলতিজাম করে না; উপরন্তু তারা স্পষ্ট ভাষায় এসব লাজিমকে অস্বীকার করে এবং এগুলোর সঙ্গে সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করে, ফকিহগণ তাদেরও তাকফির করা থেকে বিরত থেকেছেন।

টিকাঃ
১০০ মুতাজিলা (আরবি: معتزلة।) হলো ইসলামি ধর্মতত্ত্বের একটি ভ্রান্ত শাখা। এটি কারণ ও যুক্তির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীতে বসরা ও বাগদাদে এর প্রাধান্য ছিল। কুরআনকে আল্লাহর মাখলুক (সৃষ্ট) বলার কারণে তারা বেশি আলোচিত। তাদের মতে, কুরআন আল্লাহর সঙ্গে একই অস্তিত্বে ছিল না; বরং তা আল্লাহর সৃষ্ট। উমাইয়া খিলাফতের যুগে মুতাজিলা মতবাদের আবির্ভাব হয়। ওয়াসিল ইবনু আতাকে মুতাজিলা মতবাদের জনক হিসেবে ধরা হয়। তিনি ছিলেন হাসান বসরির শিষ্য। একটি মাসআলাকে কেন্দ্র করে তিনি হাসান বসরির মজলিস থেকে বের হয়ে নিজে একটি মতাদর্শ চালু করেন, যা মুতাজিলা মতবাদ নামে পরিচিতি পায়। মুতাজিলা শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় 'যে নিজেকে আলাদা করে নেয় বা কিছু থেকে প্রত্যাহার করে নেয়'।
আব্বাসি খিলাফতের যুগে এটি রাজনৈতিকভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। কারণ, আব্বাসি খলিফা আল মামুন এই মতবাদ গ্রহণ করেন। কিন্তু এই মতবাদকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে ধর্মীয় নিপীড়ন শুরু হয় আহলুস সুন্নাহর আলিমদের ওপর এবং অন্য যারা এই মতবাদ গ্রহণ করেনি, তাদের ওপর। এ নীতি ১৫ বছর (৮৩৩-৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) ধরে চলে এবং এ সময়ের মধ্যে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহ. কারারুদ্ধ হন। মুতাজিলা মতবাদের আলিমরাও এসবের প্রতিবাদ না করে নীরব থাকেন। পরে আল মুতাওয়াক্কিল (দশম আব্বাসি খলিফা) ক্ষমতায় এলে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল মুক্তি পান।
মুতাজিলাদের চিন্তাধারাকে পাঁচটি মূলনীতির মধ্যে সংক্ষিপ্ত করা যায়। যার প্রথমটি হলো, তারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলি তথা সিফাতসমূহকে আল্লাহর সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত স্বীকার করে না। তারা যুক্তি দেয়, আল্লাহকে কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। তাই এগুলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যাবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00