📘 কুফর ও তাকফির > 📄 যাচাইবিহীন তাকফিরের ব্যাপারে রাসূলের সতর্কবার্তা

📄 যাচাইবিহীন তাকফিরের ব্যাপারে রাসূলের সতর্কবার্তা


ইমাম মুসলিম রাহ. তাঁর সহিহ গ্রন্থে বর্ণনা করেন,
عَنِ الْمِقْدَادِ بْنِ الأَسْوَدِ، أَنَّهُ أَخْبَرَهُ أَنَّهُ ، قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ إِنْ لَقِيتُ رَجُلاً مِنَ الْكُفَّارِ فَقَاتَلَنِي فَضَرَبَ إِحْدَى يَدَيَّ بِالسَّيْفِ فَقَطَعَهَا. ثُمَّ لَأَذَ مِنِّي بِشَجَرَةٍ فَقَالَ أَسْلَمْتُ لِلهِ أَفَأَقْتُلُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ بَعْدَ أَنْ قَالَهَا قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ لَا تَقْتُلْهُ". قَالَ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهُ قَدْ قَطَعَ يَدِي ثُمَّ قَالَ ذَلِكَ بَعْدَ أَنْ قَطَعَهَا أَفَأَقْتُلُهُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَا تَقْتُلْهُ فَإِنْ قَتَلْتَهُ فَإِنَّهُ بِمَنْزِلَتِكَ قَبْلَ أَنْ تَقْتُلَهُ وَإِنَّكَ بِمَنْزِلَتِهِ قَبْلَ أَنْ يَقُولَ كَلِمَتَهُ الَّتِي قَالَ".
মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'আল্লাহর রাসুল, আপনার কী মত-যদি আমি কোনো কাফিরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হই আর সে তরবারি দ্বারা আক্রমণ করে আমার এক হাত কেটে ফেলে। তারপর আমার আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য সে এক গাছের আড়ালে গিয়ে এ কথা বলে যে, আমি আল্লাহর জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছি! আল্লাহর রাসুল, তার এ কথা বলার পর আমি কি তাকে হত্যা করব'
রাসুল বললেন, 'না, তাকে হত্যা করো না।' আমি বলি, 'আল্লাহর রাসুল, সে তো আমার একটি হাত কেটে ফেলেছে; আর হাত কাটার পর ওই কথা বলছে! এমতাবস্থায় আমি কি তাকে হত্যা করব?' এবারও রাসুল বললেন, 'তাকে হত্যা করো না। কারণ, যদি তুমি তাকে হত্যা করো তাহলে তাকে হত্যার পূর্বে তুমি যে অবস্থায় ছিলে, সে তোমার সেই অবস্থায় এসে যাবে। আর ওই কালিমা পড়ার পূর্বে সে যে অবস্থায় ছিল, তুমি সে অবস্থায় উপনীত হবে!’
হাদিসটি যদিও হত্যাকাণ্ডের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে বিবৃত হয়েছে, তবে রক্তপাতের বৈধতা-অবৈধতা নির্ভর করে ইমান গৃহীত হওয়া বা না-হওয়ার ওপর। অঙ্গ কর্তনকারী যদি তার কথার দ্বারা মুসলিম হয়ে থাকে, তাহলে তাকে হত্যা করা নিষিদ্ধ হবে। আর যদি সে ওই কথার কারণে মুসলিম না হয়ে থাকে, তাহলে তাকে হত্যা করা বৈধ বলেই বিবেচিত হবে। সুতরাং এই হাদিসের আলোকে প্রতিভাত হচ্ছে, কেউ যদি ইমানের ঘোষণা দেয়, তাহলে তার ওপর কুফরের বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা সমীচীন নয়; বরং তাকে তাকফির করতে হলেও এর জন্য যথাযথ তাহকিক লাগবে। সুস্পষ্ট ও সুনিশ্চিত দলিল-প্রমাণ থাকলে তবেই তাকে তাকফির করা যাবে; অন্যথায় নয়।
সহিহ মুসলিমের অপর একটি হাদিস থেকেও এ বিষয়টির পক্ষে সুদৃঢ় প্রমাণ মেলে। উসামা ইবনু জায়েদ রা. বর্ণনা করেন,
بَعَثَنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي سَرِيَّةٍ فَصَبَّحْنَا الْحُرَقَاتِ مِنْ جُهَيْنَةَ فَأَدْرَكْتُ رَجُلاً فَقَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ . فَطَعَنْتُهُ فَوَقَعَ فِي نَفْسِي مِنْ ذَلِكَ فَذَكَرْتُهُ لِلنَّبِيِّ ﷺ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ " أَقَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَقَتَلْتَهُ " . قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّمَا قَالَهَا خَوْفًا مِنَ السَّلاحِ . قَالَ " أَفَلَا شَقَقْتَ عَنْ قَلْبِهِ حَتَّى تَعْلَمَ أَقَالَهَا أَمْ لَا " . فَمَازَالَ يُكَرِّرُهَا عَلَى حَتَّى تَمَنَّيْتُ أَنِّي أَسْلَمْتُ يَوْمَئِذٍ . قَالَ فَقَالَ سَعْدٌ وَأَنَا وَاللَّهِ لَا أَقْتُلُ مُسْلِمًا حَتَّى يَقْتُلَهُ ذُو الْبُطَيْنِ . يَعْنِي أُسَامَةً قَالَ قَالَ رَجُلٌ أَلَمْ يَقُلِ اللَّهُ ﴿وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَ يَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ﴾ فَقَالَ سَعْدُ قَدْ قَاتَلْنَا حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَأَنْتَ وَأَصْحَابُكَ تُرِيدُونَ أَنْ تُقَاتِلُوا حَتَّى تَكُونَ فِتْنَةٌ
রাসুল ﷺ আমাদের এক জিহাদি অভিযানে পাঠালে আমরা ভোরে জুহায়নার (একটি শাখা গোত্র) আল হুরাকায় গিয়ে পৌঁছি। তখন আমি এক ব্যক্তির পিছু নিয়ে তাকে ধরে ফেলি। অবস্থা বেগতিক দেখে সে বলে ওঠে, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'; কিন্তু আমি বর্শা দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করে ফেলি। কালিমা পড়ার পর আমি তাকে হত্যা করেছি বিধায় আমার মনে সংশয়ের উদ্রেক হয়। তাই ঘটনাটি আমি নবিজির কাছে উল্লেখ করি। তিনি বললেন, 'তুমি কি তাকে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলার পর হত্যা করেছ?' আমি বলি, 'আল্লাহর রাসুল, সে অস্ত্রের ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে এরূপ বলেছে!' তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, 'তুমি তার অন্তর ছিঁড়ে দেখেছ, যার দ্বারা তুমি জানতে পারলে যে, সে এ কথাটি ভয়ে বলেছিল?'
(বর্ণনাকারী বলেন), তিনি এ কথাটি বার বার আবৃত্তি করতে থাকেন। আর আমি মনে মনে অনুশোচনা করতে থাকি-হায়, যদি আমি আজই ইসলাম গ্রহণ করতাম। বর্ণনাকারী বলেন, এ সময় সাআদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রা. বলেন, আল্লাহর কসম, আমি কখনো কোনো মুসলিমকে হত্যা করব না, যেভাবে এ ভুড়িওয়ালা (উসামা) মুসলিমকে হত্যা করেছে। বর্ণনাকারী বলেন, তখন জনৈক ব্যক্তি বললেন, আল্লাহ কি এ কথা বলেননি যে, 'তোমরা তাদের (কাফিরদের) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ-না ফিতনা দূরীভূত হয়; আর দীন পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর জন্য না হয়ে যায়?' এর জবাবে সাআদ রা. বললেন, 'অবশ্যই আমরা যুদ্ধ করেছি এবং ফিতনা নির্মূল হয়েছে। কিন্তু তুমি আর তোমার সঙ্গীরা এ উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করতে চাও, যেন ফিতনা সৃষ্টি হয়!’
কোনো কোনো বর্ণনায় দেখা যায়, উসামা রা. এ কথাও বলেছিলেন, (যাকে হত্যা করেছি) সে কোনো সাধারণ কাফির ছিল না। সে কয়েকজন মুসলিমকে নিজ হাতে হত্যা করেছে। কুফরের পক্ষে বীরদর্পে লড়াই করেছে। এরপর যখন তাকে পাকড়াও করি, তখন প্রাণরক্ষার তাগিদে মুসলিম সাজার ভান করেছে। এতৎসত্ত্বেও রাসুল ﷺ অত্যন্ত মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে বলেছিলেন, 'তুমি তার অন্তর ছিঁড়ে দেখেছ যে, সে এ কথাটি ভয়ে বলেছিল?'
এর দ্বারা বোঝা গেল, কাউকে মুসলিম হিসেবে বিবেচনার জন্য তার মৌখিক স্বীকারোক্তিই যথেষ্ট; কিন্তু কাউকে কাফির বলার জন্য সুস্পষ্ট ও সুনিশ্চিত অকাট্য দলিলের প্রয়োজন। কারণ, ইমান ও কুফরের ভিত্তি হলো অন্তরের ওপর। যেহেতু অন্তর দৃশ্যমান ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, তাই শরিয়া মৌখিক স্বীকারোক্তিকে বিবেচনায় নিয়েছে। সুতরাং যে-কেউ নিজেকে মুসলিম বলে পরিচয় দেবে, শক্ত দলিল ছাড়া তাকে তাকফির করা অনেক বড় অপরাধ। হাদিসে এসেছে,
بَعَثَ بَعْثًا مِنَ الْمُسْلِمِينَ إِلَى قَوْمٍ مِنَ الْمُشْرِكِينَ وَإِنَّهُمُ الْتَقَوْا فَكَانَ رَجُلُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ إِذَا شَاءَ أَنْ يَقْصِدَ إِلَى رَجُلٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ قَصَدَ لَهُ فَقَتَلَهُ وَإِنَّ رَجُلًا مِنَ الْمُسْلِمِينَ قَصَدَ غَفْلَتَهُ قَالَ وَكُنَّا تُحَدَّثُ أَنَّهُ أُسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ فَلَمَّا رَفَعَ عَلَيْهِ السَّيْفَ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ. فَقَتَلَهُ فَجَاءَ الْبَشِيرُ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ فَسَأَلَهُ فَأَخْبَرَهُ حَتَّى أَخْبَرَهُ خَبَرَ الرَّجُلِ كَيْفَ صَنَعَ فَدَعَاهُ فَسَأَلَهُ فَقَالَ لِمَ قَتَلْتَهُ". قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهَ أَوْجَعَ فِي الْمُسْلِمِينَ وَقَتَلَ فُلَانًا وَفُلَانًا - وَسَمَّى لَهُ نَفَرًا - وَإِنِّي حَمَلْتُ عَلَيْهِ فَلَمَّا رَأَى السَّيْفَ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ. قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَقَتَلْتَهُ". قَالَ نَعَمْ. قَالَ فَكَيْفَ تَصْنَعُ بِلا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ إِذَا جَاءَتْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ" . قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ اسْتَغْفِرْ لِي. قَالَ وَكَيْفَ تَصْنَعُ بِلا إِلَهَ إِلَّا اللهُ إِذَا جَاءَتْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ" . قَالَ فَجَعَلَ لَا يَزِيدُهُ عَلَى أَنْ يَقُولَ كَيْفَ تَصْنَعُ بِلا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ إِذَا جَاءَتْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ".
রাসুল ﷺ মুশরিকদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের একটি বাহিনী পাঠান। উভয় দল পরস্পর মুখোমুখি হয়। মুশরিকবাহিনীর এক ব্যক্তি ছিল, সে যখনই কোনো মুসলিমের ওপর হামলার ইচ্ছা করত, তাকে লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়ে শহিদ করে ফেলত। একজন মুসলিম তখন তার অসতর্ক মুহূর্তের অপেক্ষা করতে লাগলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমাদের বলা হলো, সে ব্যক্তি ছিলেন উসামা ইবনু জায়েদ। তিনি তার ওপর তলোয়ার উত্তোলন করলে সে বলে ওঠে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। তবু উসামা রা. তাকে হত্যা করেন। যুদ্ধে জয়লাভের সুসংবাদ নিয়ে দূত নবিজির খিদমতে উপস্থিত হয়। তিনি তার কাছে যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। দূত সব ঘটনাই বর্ণনা করে, এমনকি উসামার ঘটনাটিও বলে যে, তিনি কী করেছিলেন।
নবিজি উসামাকে ডেকে পাঠিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি সে ব্যক্তিকে হত্যা করলে কেন?' উসামা বললেন, 'আল্লাহর রাসুল, সে অনেক মুসলিমকে আঘাত করেছে এবং অমুক অমুককে শহিদ করেছে!' এ বলে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন। 'আমিতাকে আক্রমণ করতে যখন তলোয়ার উত্তোলন করি, অমনি সে বলে ওঠে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” রাসুল বললেন, 'তুমি তাকে মেরে ফেললে?' তিনি বললেন, 'জি হ্যাঁ।' রাসুল বললেন, 'কিয়ামতের দিন যখন (তার) "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” সামনে আসবে, তখন তুমি কী করবে?' তিনি আরজ করলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমার মাগফিরাতের জন্য দুআ করুন।' রাসুল বললেন, 'কিয়ামতের দিন যখন (তার) “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” সামনে আসবে, তখন তুমি কী করবে?' তারপর তিনি কেবল এ কথাই বলছিলেন- 'কিয়ামতের দিন যখন (তার) “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” সামনে আসবে, তখন তুমি কী করবে? কিয়ামতের দিন যখন (তার) "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” সামনে আসবে, তখন তুমি কী করবে?' তিনি এর অতিরিক্ত কিছু বলেননি।

টিকাঃ
* সহিহ মুসলিম: ৯৫।
* সহিহ মুসলিম: ৯৬।
* সহিহ মুসলিম: ৯৭।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 গুনাহের কারণে তাকফিরের ব্যাপারে হাদিসের নির্দেশনা

📄 গুনাহের কারণে তাকফিরের ব্যাপারে হাদিসের নির্দেশনা


আনাস ইবনু মালিক রা. বর্ণনা করেন; রাসুল বলেছেন,
ثَلَاثُ مِنْ أَصْلِ الْإِيمَانِ : الْكَفُّ عَمَّنْ قَالَ : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَلَا نُكَفِّرُهُ بِذَنْبٍ، وَلَا تُخْرِجُهُ مِنَ الْإِسْلَامِ بِعَمَلٍ، وَالْجِهَادُ mَاضٍ مُنْذُ بَعَثَنِي اللهُ إِلَى أَنْ يُقَاتِلَ آخِرُ أُمَّتِي الدَّجَّالَ، لَا يُبْطِلُهُ جَوْرُ جَائِرٍ، وَلَا عَدْلُ عَادِلٍ، وَالْإِيمَانُ بِالْأَقْدَارِ
তিনটি বিষয় ইমানের মূলের অন্তর্ভুক্ত। (এক) যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পড়বে, তার ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা। কোনো গুনাহের কারণে তাকে তাকফির না করা এবং কোনো আমলের কারণে তাকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার না করা। (দুই) আমাকে (রাসুল হিসেবে) পাঠানোর সময় থেকে জিহাদ চালু রয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। আর উম্মতের জিহাদকারী সর্বশেষ দল দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। কোনো অত্যাচারী শাসকের অত্যাচার অথবা কোনো ন্যায়পরায়ণ শাসকের ইনসাফ এটাকে রহিত করতে পারবে না। (তিন) তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস রাখা।

টিকাঃ
*কুফরের কারণে তাকফির করা যায়; গুনাহের কারণে নয়। খারেজিদের সঙ্গে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের পার্থক্য এখানেই। খারেজিরা গুনাহের কারণে ব্যক্তিকে তাকফির করে। আর আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত কুফরের কারণে সংশ্লিষ্ট সব শর্ত ও বিধানের প্রতি লক্ষ রাখে এবং প্রতিবন্ধকতাসমূহ যাচাই করে এরপর কাউকে তাকফির করে।
১০০ সুনানু আবি দাউদ: ২৫৩২। ইমাম আবু দাউদ রাহ. হাদিসটি বর্ণনা করে নীরব থেকেছেন। ইমাম বায়হাকি রাহ. আল-ইতিকাদ গ্রন্থে (পৃ. ২২০) বলেছেন, এর কয়েকটি সমার্থক বর্ণনা রয়েছে। শায়খ শুয়াইব আরনাউত রাহ. বলেছেন, আনাস রা. থেকে যিনি এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন- যার নাম ইয়াজিদ ইবনু আবি নুশায়বা—তিনি মাজহুল। তবে সনদের অন্য সকল বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য। [তাখরিজু শারহিত তাহাবিয়া : ৫৩০; তাখরিজুল আওয়াসিম ওয়াল কাওয়াসিম: ৪/৩৭০] তা ছাড়া হাদিসটির এই সনদে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও ফকিহগণের কাছে এটি সমাদৃত। এর আলোকে যুগে যুগে তাকফিরের নীতিমালা রচিত ও চর্চিত হয়েছে। সুতরাং এটি প্রমাণযোগ্য।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 ভিত্তিহীন তাকফির নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা প্রমাণিত

📄 ভিত্তিহীন তাকফির নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা প্রমাণিত


ধারাবাহিকভাবে বিপুলসংখ্যক বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত হাদিসকে মুতাওয়াতির হাদিস বলে। এটি হলো এমন বর্ণনা, যার সনদের (বর্ণনাসূত্র) শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব স্তরে এত বিপুলসংখ্যক বর্ণনাকারী থাকে যে, মিথ্যার ওপর তাদের ঐকমত্য পোষণ করা অকল্পনীয়। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে, মুতাওয়াতির হাদিসে বর্ণিত বিধিবিধানের আইনগত অবস্থান কুরআনে বর্ণিত বিধানের সমান। এটি সুনিশ্চিত জ্ঞান (ইয়াকিন) প্রদান করে এবং মুতাওয়াতির বর্ণনার মাধ্যমে লব্ধ জ্ঞান ইন্দ্রিয়ানুভূতির মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানের সমান।
শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু মুরতাজা ইয়ামানি রাহ. (মৃত্যু: ৮৪০ হিজরি) তাকফির- বিষয়ক হাদিসের ওপর দীর্ঘ তাহকিকি আলোচনা করে প্রমাণ করেছেন যে, কোনো মুসলিমকে তাকফির করা গুরুতর অপরাধ। অসংখ্য হাদিসে এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে। এমনকি বিপুলসংখ্যক সাহাবি রাসুল থেকে বর্ণনা করেছেন যে, কোনো মুসলিমকে অন্যায়ভাবে তাকফির করলে নিজের ক্ষেত্রে কুফর অপরিহার্য হয়। আবু জার গিফারি, আবু হুরায়রা, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ, আবদুল্লাহ ইবনু উমর, আবু সায়িদ খুদরি রা. প্রমুখ সাহাবি থেকে এ বিষয়ক হাদিস এত অধিকসংখ্যক সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, মুহাক্কিকগণের দৃষ্টিতে তা মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

📘 কুফর ও তাকফির > 📄 ফিকহি মূলনীতির আলোকে তাকফিরের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনের গুরুত্ব

📄 ফিকহি মূলনীতির আলোকে তাকফিরের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনের গুরুত্ব


কেউ যখন কালিমা পাঠ করে ইসলামকে আন্তরিকভাবে পুরোপুরি গ্রহণ করে নেয়, শরিয়তের সামনে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেয়, তখন সুনিশ্চিতভাবে সে একজন মুসলিম হিসেবে বিবেচিত হয়। তার ওপর ইসলামের বিধিবিধান প্রযোজ্য হয়। সুতরাং যতক্ষণ তার থেকে এর বিপরীত কোনো বিষয় প্রকাশ না হবে, ততক্ষণ তাকে 'ইসতিসহাবুল হাল' তথা স্বাভাবিক অবস্থার দাবিতে মুসলিমই বলা হবে। এরপর কখনো যদি তার থেকে এমন কোনো কথা বা কাজ প্রকাশ পায়, যা ইসলাম ও কুফর উভয়টির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, তখন তাকে স্রেফ এই অনিশ্চিত বিষয়কে কেন্দ্র করে তাকফির করা যাবে না। কারণ, এই কথা বা কাজ প্রকাশ হওয়ার আগে সে নিশ্চিতভাবে মুসলিম ছিল। এখন সন্দেহ দেখা দিয়েছে-সে কি আগের মতো মুসলিমই রয়েছে, নাকি কাফির হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে ফকিহগণের সর্বজনস্বীকৃত একটি মূলনীতি হলো,
اليقين لا يزول بالشك.
সুনিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূরীভূত হয় না।
সুতরাং এ ধরনের সংশয়পূর্ণ অনিশ্চিত বিষয়ের কারণে কোনো মুসলিম পরিচয়ধারীকে তাকফির করার সুযোগ নেই। প্রখ্যাত হানাফি ফকিহ ইমাম ইবনু কাজি সামাওয়াহ রাহ. (মৃত্যু: ৮২৩ হিজরি) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ জামিউল ফুসুলাইন-এ কুফরি কথা ও কাজগুলোর বিবরণ নিয়ে আলাদা অধ্যায় সংকলন করেছেন, যাতে তিনি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী হানাফি ফকিহগণের উল্লিখিত অধিকাংশ কুফরি কথা ও কাজের বিবরণ একত্রিত করেছেন। সেই অধ্যায়ের শুরুতে তিনি এ বিষয়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতি লিপিবদ্ধ করেছেন, যার ওপর পুরো আলোচনার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত-
روى الطحاوي عن "ح" وأصحابنا أنه لا يخرج الرجل من الإيمان إلا جحود ما أدخله فيه، ثم ما يتيقن بأنه ردة يحكم بها له، وما يشك بأنه ردة لا يحكم بها. إذ الإسلام الثابت لا يزول بشك مع أن الإسلام يعلو.
'তাহাবি রাহ. ইমাম আবু হানিফা ও অন্যান্য হানাফি ফকিহ থেকে বর্ণনা করেছেন, যেসব বিষয় স্বীকার করার কারণে মানুষ ইমানদার হয়েছিল, সেসব বিষয় অস্বীকারের কারণেই মানুষ ইমান থেকে বেরিয়ে যায়। (তাকফিরের মূলনীতি হলো,) ব্যক্তির যেসব বিষয় “রিদ্দাহ” হওয়া নিশ্চিত, সেগুলোর কারণে তার ব্যাপারে মুরতাদ হওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। আর যেসব বিষয় “রিদ্দাহ” হওয়া সন্দেহপূর্ণ, সেগুলোর কারণে তার ব্যাপারে মুরতাদ হওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। কারণ, (আগ থেকে) সাব্যস্ত ইমান সন্দেহ দ্বারা বিলুপ্ত হয় না। তা ছাড়া ইসলাম সর্বদা সমুন্নত থাকে।
ইমাম তাহাবি রাহ. তাঁর সুপ্রসিদ্ধ আকিদাগ্রন্থেও এ বিষয়টির ওপর আলোকপাত করেছেন। তিনি লেখেন,
ولا ننزل أحدا منهم جنة ولا نارا، ولا نشهد عليهم بكفر ولا بشرك ولا بنفاق، ما لم يظهر منهم شيء من ذلك، ونذر سرائرهم إلى الله تعالى.
'আমরা কোনো মুসলিমকে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলে আখ্যায়িত করব না এবং তাদের কারও বিরুদ্ধে আমরা কুফর, শিরক বা নিফাকের সাক্ষ্য দেবো না, যতক্ষণ-না এগুলোর কোনো একটি তাদের মধ্যে প্রকাশ্যে দৃষ্টিগোচর হয়। তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার আমরা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিই।

টিকাঃ
১০২ জামিউল ফুসুলাইন, আল-ফাসলুস সামিনু ওয়াস সালাসুনা ফি মাসায়িলিল কালিমাতিল কুফরিয়া: ২/১৬৩।
১০০ আল-আকিদাতুত তাহাবিয়া: ৯৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00