📄 কাউকে কাফির বলার ব্যাপারে কুরআনের নির্দেশনা
কুরআন মাজিদ মুসলিমদের নির্দেশনা দিয়েছে, পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে এবং যথাযথ তাহকিক না করে মুসলিম পরিচয়ধারী কাউকে কাফির আখ্যায়িত করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। বিশেষত জিহাদের ময়দানে এটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর সঙ্গে সরাসরি অস্ত্রধারণের সম্পর্ক রয়েছে। বর্ণিত হয়েছে,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَبَيَّنُوا وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ أَلْقَى إِلَيْكُمُ السَّلَامَ لَسْتَ مُؤْمِنًا تَبْتَغُونَ عَرَضَ الْحَيُوةِ الدُّنْيَا فَعِنْدَ اللَّهِ مَغَانِمُ كَثِيرَةٌ كَذلِكَ كُنتُمْ مِّنْ قَبْلُ فَمَنَّ اللهُ عَلَيْكُمْ فَتَبَيَّنُوا إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا
হে মুমিনরা, তোমরা যখন আল্লাহর পথে (জিহাদে) সফর করবে, তখন তাহকিক (যাচাই-বাছাই) করে দেখবে। কেউ তোমাদের সালাম দিলে পার্থিব জীবনের উপকরণ (গনিমত) লাভের আকাঙ্ক্ষায় তাকে বলবে না যে, 'তুমি মুমিন নও'। কারণ, আল্লাহর কাছে প্রচুর গনিমত রয়েছে। তোমরাও تو পূর্বে এ রকমই ছিলে। এরপর আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করলেন। সুতরাং যাচাই-বাছাই করে দেখবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবগত। [সুরা নিসা (৪) : ৯৪]
এই আয়াতের শানে নুজুল (অবতরণের প্রেক্ষাপট) লক্ষ করলে এর মর্মার্থ হৃদয়ঙ্গম করা সহজ হবে। একবার জিহাদের সময় কিছুসংখ্যক অমুসলিম নিজেদের মুসলিম প্রমাণে সাহাবিদের সালাম দেয়। সাহাবিরা মনে করলেন, তারা কেবল নিজেদের প্রাণ রক্ষার উদ্দেশ্যেই সালাম দিয়েছে; প্রকৃতপক্ষে তারা ইসলাম গ্রহণ করেনি। এই ধারণার ভিত্তিতে তাঁরা তাদের হত্যা করে ফেলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। এতে মূলনীতি বলে দেওয়া হলো, কেউ যদি আমাদের সামনে ইসলাম গ্রহণ করে এবং ইসলামের সমস্ত আকিদা-বিশ্বাস স্বীকার করে নেয়, তবে আমরা তাকে মুসলিম মনে করে তার মনের অবস্থা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেবো। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আয়াতে আদৌ এরূপ বলা হয়নি-কেউ কুফরি আকিদা-বিশ্বাস পোষণ করা সত্ত্বেও কেবল 'আস-সালামু আলাইকুম' বলার কারণে তাকে মুসলিম বলে গণ্য করতে হবে। সুতরাং এ আয়াতের অপব্যাখ্যা করে মুলহিদ ও জিন্দিকদের ব্যাপারে কোনোভাবেই আয়াতে বর্ণিত ছাড়ের বিধান আরোপের সুযোগ নেই।
এ আয়াতে আল্লাহ তাকফিরের ব্যাপারে মুসলিমদের তাহকিক করার নির্দেশ দিয়েছেন। মুফাসসিরগণ লিখেছেন, এখানে (জিহাদের) সফরের কথা বলা হয়েছে প্রাসঙ্গিক হিসেবে; যেহেতু জিহাদের সফরেই এ ধরনের পরিস্থিতির বেশি সম্মুখীন হতে হয়। তবে এখানে সীমাবদ্ধকরণ উদ্দেশ্য নয়, তাই তাহকিকের অপরিহার্যতার বিধান সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
আয়াতের পরবর্তী অংশে দেখা যাচ্ছে, কারও থেকে যদি ইসলাম-সংশ্লিষ্ট আচরণ প্রকাশ পায়-যেমন, উদাহরণস্বরূপ সালামের কথা বলা হলো—তাহলে তাকে তাকফির করার পূর্বে তাহকিক করা জরুরি। কারণ, সাধারণভাবে বাহ্যিক অবস্থা-ই বিবেচিত হয়। বাহ্যিক অবস্থার বিপরীত মতপ্রদানে শক্ত দলিলের প্রয়োজন হয়। সেই দলিল সন্ধানের জন্য এখানে অপরিহার্যভাবে তাহকিকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ, কারও কুফর নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত বাহ্যিক অবস্থার বিবেচনায় তাকে মুসলিমই গণ্য করা হয়। এ কারণে কালিমা পাঠ করার পরও উসামা ইবনু জায়েদ রা. যখন (হয়তো সে প্রাণ বাঁচানোর জন্য মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে-এই) সন্দেহবশত একব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলেন, তখন তাঁকে তিরস্কার করে রাসুল বলেছিলেন, 'তুমি একজন মুসলিম হত্যা করলে?”
টিকাঃ
* দ্রষ্টব্য- তাফসিরে তাওযীহুল কুরআন, সুরা নিসার ৯৪ নম্বর আয়াতের টীকা।
১০ দ্রষ্টব্য-আহকামুল কুরআন, জাসসাস, দারুল কিতাব কোয়েটা প্রকাশিত: ২/৩৫০।
📄 তাকফিরের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনের ব্যাপারে হাদিসের নির্দেশনা
রাসুল বিভিন্ন হাদিসে সুনিশ্চিত ও সুস্পষ্ট দলিল ছাড়া কাউকে তাকফির করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। অনেক বর্ণনার আলোকে প্রতীয়মান হয়, কেউ যদি অন্য কাউকে তাকফির করে; আর যদি সেই ব্যক্তির (যাকে তাকফির করা হয়েছে) আকিদা, কথা বা কাজে সুস্পষ্ট কুফরের প্রকাশ থাকে, তাহলে এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু কারও থেকে কুফর অপরিহার্যকারী কোনো বিষয় প্রকাশ না-হওয়া সত্ত্বেও কেউ যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে তাকফির করে, তাহলে সেই কুফর তাকফিরকারীর দিকে ফিরবে।
ইমাম বুখারি রাহ. আবদুল্লাহ ইবনু উমর রা.-এর সূত্রে রাসুল থেকে বর্ণনা করেন,
أَيُّمَا رَجُلٍ قَالَ لأَخِيهِ يَا كَافِرُ، فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا.
কেউ তার ভাইকে কাফির বললে তাদের দুজনের একজনের ওপর তা বর্তাবে।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহ. আরও বিস্তৃতভাবে হাদিসটি উল্লেখ করেন,
إِذَا قَالَ الرَّجُلُ لِصَاحِبِهِ: يَا كَافِرُ، فَإِنَّهَا تَجِبُ عَلَى أَحَدِهِمَا، فَإِنْ كَانَ الَّذِي قِيلَ لَهُ كَافِرُ فَهُوَ كَافِرُ، وَإِلَّا رَجَعَ إِلَيْهِ مَا قَالَ.
কেউ যখন তার সঙ্গীকে বলে 'হে কাফির', তখন সুনিশ্চিতভাবে তা তাদের একজনের ওপর অবধারিত হয়। যাকে কাফির বলা হয়েছে সে যদি বাস্তবেই কাফির হয়, তাহলে তো সে কাফির। অন্যথায় সে যা বলেছে, তা তার দিকে ফিরবে।
ইমাম তাহাবি রাহ. আবু জার রা. সূত্রে রাসুল থেকে বর্ণনা করেন,
لَا يَرْمِي رَجُلٌ رَجُلًا بِالْفِسْقِ، أَوِ الْكُفْرِ إِلَّا ارْتَدَّتْ عَلَيْهِ إِنْ لَمْ يَكُنْ صَاحِبُهُ كَذَلِكَ
কেউ অপর কারও ব্যাপারে পাপাচার বা কুফরের অভিযোগ আরোপ করলে তা তার দিকে ফেরে, যদি তার সঙ্গী সেরূপ না হয়।
এসব বর্ণনার আলোকে প্রতিভাত হলো, তাকফিরের ব্যাপারে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সতর্কতা জরুরি। বলা বাহুল্য, মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তাকফির যেহেতু একটি ইজতিহাদি (গবেষণানির্ভর) বিষয়, তাই এ ক্ষেত্রে কখনো অনিচ্ছাসত্ত্বেও ভুল হয়ে যেতে পারে। তাহকিকে মানবীয় সাধ্যের ভেতর থেকে কোনো গাফলতি না থাকলে আল্লাহ এ ধরনের অনিচ্ছাকৃত ইজতিহাদি ভুলত্রুটি মাফ করবেন ইনশাআল্লাহ। তবে তাহকিকে গাফলতি থাকলে আরোপিত কুফর খোদ তাকফিরকারীর দিকে ফিরবে। কোনো কোনো মুহাদ্দিস এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, হাদিসে গুরুত্ব বোঝানোর জন্য কঠোর বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে। সুতরাং অন্যায় তাকফিরকারীর ওপর মারাত্মক গুনাহ আপতিত হলেও কুফর আপতিত হবে না। তবে ইমাম তাহাবি রাহ. থেকে বর্ণিত একটি হাদিস সামনে রাখলে এই ব্যাখ্যা যথাযথ বলে মনে হয় না। আবু সায়িদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত; রাসুল বলেন,
مَا شَهِدَ رَجُلٌ عَلَى رَجُلٍ بِالْكُفْرِ إِلَّا بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا إِنْ كَانَ كَافِرًا فَهُوَ كَمَا قَالَ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ كَافِرًا فَقَدْ كَفَرَ بِتَكْفِيرِهِ إِيَّاهُ
কেউ অপর কারও ব্যাপারে কুফরের সাক্ষ্য দিলে তা তাদের একজনের ওপর বর্তাবে। যদি সেই ব্যক্তি কাফির হয়, তাহলে সে (যার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে) তার (সাক্ষ্য দানকারীর) কথার মতোই হচ্ছে। আর যদি সে কাফির না হয়, তাহলে তাকফিরকারী তাকে (অন্যায়ভাবে) তাকফির করার কারণে নিজে কাফির হয়ে যাবে。
এর কারণ অবশ্য স্পষ্ট। একটি মূলনীতি হলো, কর্তার ওপর হুকুম আরোপ করা হলে ক্রিয়ামূল তার কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। সুতরাং কাউকে কাফির বলার অর্থ হচ্ছে, তার লালিত দীন ও আদর্শকে কুফর বলা। অতএব, কোনো মুসলিমকে কাফির বলার অর্থ দাঁড়াচ্ছে খোদ ইসলাম, ইমান ও শরিয়াকে কুফর বলে আখ্যায়িত করা।
ইমাম তাহাবি রাহ. এ-সংক্রান্ত হাদিসগুলো উল্লেখ করার পর লেখেন,
فَتَأَمَّلْنَا مَا فِي هَذَا الْحَدِيثِ طَلَبًا مِنَّا لِلْمُرَادِ بِهِ مَا هُوَ؟ فَوَجَدْنَا مَنْ قَالَ لِصَاحِبِهِ: يَا كَافِرُ مَعْنَاهُ أَنَّهُ كَافِرُ؛ لِأَنَّ الَّذِي هُوَ عَلَيْهِ الْكُفْرُ فَإِذَا كَانَ الَّذِي عَلَيْهِ لَيْسَ بِكُفْرٍ، وَكَانَ إِيمَانًا كَانَ جَاعِلُهُ كَافِرًا جَاعِلَ الْإِيمَانِ كُفْرًا، وَكَانَ بِذَلِكَ كَافِرًا بِاللَّهِ تَعَالَى لِأَنَّ مَنْ كَفَرَ بِإِيمَانِ اللهِ تَعَالَى فَقَدْ كَفَرَ بِاللهِ، وَمِنْهُ قَوْلُ اللَّهِ: ﴿وَمَنْ يَكْفُرُ بِالْإِيْمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخُسِرِينَ﴾ [المائدة: 2] فَهَذَا أَحْسَنُ مَا وَقَفْنَا عَلَيْهِ مِنْ تَأْوِيلِ هَذَا الْحَدِيثِ وَاللَّهَ نَسْأَلُهُ التَّوْفِيقَ
‘আমরা এই হাদিসের প্রকৃত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে চিন্তা করলাম। তখন স্পষ্ট হলো, কেউ কাউকে কাফির বলে সম্বোধনের অর্থ হচ্ছে, সম্বোধিত ব্যক্তি কাফির। কারণ, সে যে আদর্শের ওপর রয়েছে, তা কুফর। সুতরাং সে যে আদর্শের ওপর রয়েছে, তা যদি কুফর না হয়ে ইমান হয়, তাহলে তাকে কাফির আখ্যায়িত করার অর্থ দাঁড়াচ্ছে ইমানকে কুফর বলে আখ্যায়িত করা। এর দ্বারা সে আল্লাহর সঙ্গে কুফরকারী হয়ে যাচ্ছে। কারণ, যে আল্লাহর প্রতি ইমান রাখাকে কুফর বলল, সে তো আল্লাহর সঙ্গেই কুফর করল। তার ব্যাপারেই এই আয়াত প্রযোজ্য- “যে ব্যক্তি ইমান প্রত্যাখ্যান করবে, তার যাবতীয় আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে গণ্য হবে।” [সুরা মায়িদা (৫) : ৫] আমরা এই হাদিসের যত ব্যাখ্যা জেনেছি, এর মধ্যে এটিই সর্বোত্তম। আমরা আল্লাহর কাছে তাওফিক কামনা করি।
টিকাঃ
* সহিহ বুখারি: ৬১০৪।
** মুসনাদু আহমাদ: ৫৮২৪। শায়খ শুয়াইব আরনাউত রাহ. বলেন, এর বর্ণনাসূত্র বুখারি ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহিহ।
* শারহু মুশকিলিল আসার, শায়খ শুয়াইব আরনাউত তাহকিককৃত: ২/৩২২, হাদিস: ৮৬২।
* প্রাগুক্ত: ২/৩২৩, হাদিস: ৮৬৪।
* প্রাগুক্ত : ২/৩২৫।
📄 যাচাইবিহীন তাকফিরের ব্যাপারে রাসূলের সতর্কবার্তা
ইমাম মুসলিম রাহ. তাঁর সহিহ গ্রন্থে বর্ণনা করেন,
عَنِ الْمِقْدَادِ بْنِ الأَسْوَدِ، أَنَّهُ أَخْبَرَهُ أَنَّهُ ، قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ إِنْ لَقِيتُ رَجُلاً مِنَ الْكُفَّارِ فَقَاتَلَنِي فَضَرَبَ إِحْدَى يَدَيَّ بِالسَّيْفِ فَقَطَعَهَا. ثُمَّ لَأَذَ مِنِّي بِشَجَرَةٍ فَقَالَ أَسْلَمْتُ لِلهِ أَفَأَقْتُلُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ بَعْدَ أَنْ قَالَهَا قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ لَا تَقْتُلْهُ". قَالَ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهُ قَدْ قَطَعَ يَدِي ثُمَّ قَالَ ذَلِكَ بَعْدَ أَنْ قَطَعَهَا أَفَأَقْتُلُهُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَا تَقْتُلْهُ فَإِنْ قَتَلْتَهُ فَإِنَّهُ بِمَنْزِلَتِكَ قَبْلَ أَنْ تَقْتُلَهُ وَإِنَّكَ بِمَنْزِلَتِهِ قَبْلَ أَنْ يَقُولَ كَلِمَتَهُ الَّتِي قَالَ".
মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'আল্লাহর রাসুল, আপনার কী মত-যদি আমি কোনো কাফিরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হই আর সে তরবারি দ্বারা আক্রমণ করে আমার এক হাত কেটে ফেলে। তারপর আমার আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য সে এক গাছের আড়ালে গিয়ে এ কথা বলে যে, আমি আল্লাহর জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছি! আল্লাহর রাসুল, তার এ কথা বলার পর আমি কি তাকে হত্যা করব'
রাসুল বললেন, 'না, তাকে হত্যা করো না।' আমি বলি, 'আল্লাহর রাসুল, সে তো আমার একটি হাত কেটে ফেলেছে; আর হাত কাটার পর ওই কথা বলছে! এমতাবস্থায় আমি কি তাকে হত্যা করব?' এবারও রাসুল বললেন, 'তাকে হত্যা করো না। কারণ, যদি তুমি তাকে হত্যা করো তাহলে তাকে হত্যার পূর্বে তুমি যে অবস্থায় ছিলে, সে তোমার সেই অবস্থায় এসে যাবে। আর ওই কালিমা পড়ার পূর্বে সে যে অবস্থায় ছিল, তুমি সে অবস্থায় উপনীত হবে!’
হাদিসটি যদিও হত্যাকাণ্ডের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে বিবৃত হয়েছে, তবে রক্তপাতের বৈধতা-অবৈধতা নির্ভর করে ইমান গৃহীত হওয়া বা না-হওয়ার ওপর। অঙ্গ কর্তনকারী যদি তার কথার দ্বারা মুসলিম হয়ে থাকে, তাহলে তাকে হত্যা করা নিষিদ্ধ হবে। আর যদি সে ওই কথার কারণে মুসলিম না হয়ে থাকে, তাহলে তাকে হত্যা করা বৈধ বলেই বিবেচিত হবে। সুতরাং এই হাদিসের আলোকে প্রতিভাত হচ্ছে, কেউ যদি ইমানের ঘোষণা দেয়, তাহলে তার ওপর কুফরের বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা সমীচীন নয়; বরং তাকে তাকফির করতে হলেও এর জন্য যথাযথ তাহকিক লাগবে। সুস্পষ্ট ও সুনিশ্চিত দলিল-প্রমাণ থাকলে তবেই তাকে তাকফির করা যাবে; অন্যথায় নয়।
সহিহ মুসলিমের অপর একটি হাদিস থেকেও এ বিষয়টির পক্ষে সুদৃঢ় প্রমাণ মেলে। উসামা ইবনু জায়েদ রা. বর্ণনা করেন,
بَعَثَنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ فِي سَرِيَّةٍ فَصَبَّحْنَا الْحُرَقَاتِ مِنْ جُهَيْنَةَ فَأَدْرَكْتُ رَجُلاً فَقَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ . فَطَعَنْتُهُ فَوَقَعَ فِي نَفْسِي مِنْ ذَلِكَ فَذَكَرْتُهُ لِلنَّبِيِّ ﷺ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ " أَقَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَقَتَلْتَهُ " . قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّمَا قَالَهَا خَوْفًا مِنَ السَّلاحِ . قَالَ " أَفَلَا شَقَقْتَ عَنْ قَلْبِهِ حَتَّى تَعْلَمَ أَقَالَهَا أَمْ لَا " . فَمَازَالَ يُكَرِّرُهَا عَلَى حَتَّى تَمَنَّيْتُ أَنِّي أَسْلَمْتُ يَوْمَئِذٍ . قَالَ فَقَالَ سَعْدٌ وَأَنَا وَاللَّهِ لَا أَقْتُلُ مُسْلِمًا حَتَّى يَقْتُلَهُ ذُو الْبُطَيْنِ . يَعْنِي أُسَامَةً قَالَ قَالَ رَجُلٌ أَلَمْ يَقُلِ اللَّهُ ﴿وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَ يَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ﴾ فَقَالَ سَعْدُ قَدْ قَاتَلْنَا حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَأَنْتَ وَأَصْحَابُكَ تُرِيدُونَ أَنْ تُقَاتِلُوا حَتَّى تَكُونَ فِتْنَةٌ
রাসুল ﷺ আমাদের এক জিহাদি অভিযানে পাঠালে আমরা ভোরে জুহায়নার (একটি শাখা গোত্র) আল হুরাকায় গিয়ে পৌঁছি। তখন আমি এক ব্যক্তির পিছু নিয়ে তাকে ধরে ফেলি। অবস্থা বেগতিক দেখে সে বলে ওঠে, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'; কিন্তু আমি বর্শা দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করে ফেলি। কালিমা পড়ার পর আমি তাকে হত্যা করেছি বিধায় আমার মনে সংশয়ের উদ্রেক হয়। তাই ঘটনাটি আমি নবিজির কাছে উল্লেখ করি। তিনি বললেন, 'তুমি কি তাকে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলার পর হত্যা করেছ?' আমি বলি, 'আল্লাহর রাসুল, সে অস্ত্রের ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে এরূপ বলেছে!' তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, 'তুমি তার অন্তর ছিঁড়ে দেখেছ, যার দ্বারা তুমি জানতে পারলে যে, সে এ কথাটি ভয়ে বলেছিল?'
(বর্ণনাকারী বলেন), তিনি এ কথাটি বার বার আবৃত্তি করতে থাকেন। আর আমি মনে মনে অনুশোচনা করতে থাকি-হায়, যদি আমি আজই ইসলাম গ্রহণ করতাম। বর্ণনাকারী বলেন, এ সময় সাআদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রা. বলেন, আল্লাহর কসম, আমি কখনো কোনো মুসলিমকে হত্যা করব না, যেভাবে এ ভুড়িওয়ালা (উসামা) মুসলিমকে হত্যা করেছে। বর্ণনাকারী বলেন, তখন জনৈক ব্যক্তি বললেন, আল্লাহ কি এ কথা বলেননি যে, 'তোমরা তাদের (কাফিরদের) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ-না ফিতনা দূরীভূত হয়; আর দীন পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর জন্য না হয়ে যায়?' এর জবাবে সাআদ রা. বললেন, 'অবশ্যই আমরা যুদ্ধ করেছি এবং ফিতনা নির্মূল হয়েছে। কিন্তু তুমি আর তোমার সঙ্গীরা এ উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করতে চাও, যেন ফিতনা সৃষ্টি হয়!’
কোনো কোনো বর্ণনায় দেখা যায়, উসামা রা. এ কথাও বলেছিলেন, (যাকে হত্যা করেছি) সে কোনো সাধারণ কাফির ছিল না। সে কয়েকজন মুসলিমকে নিজ হাতে হত্যা করেছে। কুফরের পক্ষে বীরদর্পে লড়াই করেছে। এরপর যখন তাকে পাকড়াও করি, তখন প্রাণরক্ষার তাগিদে মুসলিম সাজার ভান করেছে। এতৎসত্ত্বেও রাসুল ﷺ অত্যন্ত মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে বলেছিলেন, 'তুমি তার অন্তর ছিঁড়ে দেখেছ যে, সে এ কথাটি ভয়ে বলেছিল?'
এর দ্বারা বোঝা গেল, কাউকে মুসলিম হিসেবে বিবেচনার জন্য তার মৌখিক স্বীকারোক্তিই যথেষ্ট; কিন্তু কাউকে কাফির বলার জন্য সুস্পষ্ট ও সুনিশ্চিত অকাট্য দলিলের প্রয়োজন। কারণ, ইমান ও কুফরের ভিত্তি হলো অন্তরের ওপর। যেহেতু অন্তর দৃশ্যমান ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, তাই শরিয়া মৌখিক স্বীকারোক্তিকে বিবেচনায় নিয়েছে। সুতরাং যে-কেউ নিজেকে মুসলিম বলে পরিচয় দেবে, শক্ত দলিল ছাড়া তাকে তাকফির করা অনেক বড় অপরাধ। হাদিসে এসেছে,
بَعَثَ بَعْثًا مِنَ الْمُسْلِمِينَ إِلَى قَوْمٍ مِنَ الْمُشْرِكِينَ وَإِنَّهُمُ الْتَقَوْا فَكَانَ رَجُلُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ إِذَا شَاءَ أَنْ يَقْصِدَ إِلَى رَجُلٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ قَصَدَ لَهُ فَقَتَلَهُ وَإِنَّ رَجُلًا مِنَ الْمُسْلِمِينَ قَصَدَ غَفْلَتَهُ قَالَ وَكُنَّا تُحَدَّثُ أَنَّهُ أُسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ فَلَمَّا رَفَعَ عَلَيْهِ السَّيْفَ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ. فَقَتَلَهُ فَجَاءَ الْبَشِيرُ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ فَسَأَلَهُ فَأَخْبَرَهُ حَتَّى أَخْبَرَهُ خَبَرَ الرَّجُلِ كَيْفَ صَنَعَ فَدَعَاهُ فَسَأَلَهُ فَقَالَ لِمَ قَتَلْتَهُ". قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهَ أَوْجَعَ فِي الْمُسْلِمِينَ وَقَتَلَ فُلَانًا وَفُلَانًا - وَسَمَّى لَهُ نَفَرًا - وَإِنِّي حَمَلْتُ عَلَيْهِ فَلَمَّا رَأَى السَّيْفَ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ. قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَقَتَلْتَهُ". قَالَ نَعَمْ. قَالَ فَكَيْفَ تَصْنَعُ بِلا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ إِذَا جَاءَتْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ" . قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ اسْتَغْفِرْ لِي. قَالَ وَكَيْفَ تَصْنَعُ بِلا إِلَهَ إِلَّا اللهُ إِذَا جَاءَتْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ" . قَالَ فَجَعَلَ لَا يَزِيدُهُ عَلَى أَنْ يَقُولَ كَيْفَ تَصْنَعُ بِلا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ إِذَا جَاءَتْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ".
রাসুল ﷺ মুশরিকদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের একটি বাহিনী পাঠান। উভয় দল পরস্পর মুখোমুখি হয়। মুশরিকবাহিনীর এক ব্যক্তি ছিল, সে যখনই কোনো মুসলিমের ওপর হামলার ইচ্ছা করত, তাকে লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়ে শহিদ করে ফেলত। একজন মুসলিম তখন তার অসতর্ক মুহূর্তের অপেক্ষা করতে লাগলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমাদের বলা হলো, সে ব্যক্তি ছিলেন উসামা ইবনু জায়েদ। তিনি তার ওপর তলোয়ার উত্তোলন করলে সে বলে ওঠে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। তবু উসামা রা. তাকে হত্যা করেন। যুদ্ধে জয়লাভের সুসংবাদ নিয়ে দূত নবিজির খিদমতে উপস্থিত হয়। তিনি তার কাছে যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। দূত সব ঘটনাই বর্ণনা করে, এমনকি উসামার ঘটনাটিও বলে যে, তিনি কী করেছিলেন।
নবিজি উসামাকে ডেকে পাঠিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি সে ব্যক্তিকে হত্যা করলে কেন?' উসামা বললেন, 'আল্লাহর রাসুল, সে অনেক মুসলিমকে আঘাত করেছে এবং অমুক অমুককে শহিদ করেছে!' এ বলে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন। 'আমিতাকে আক্রমণ করতে যখন তলোয়ার উত্তোলন করি, অমনি সে বলে ওঠে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” রাসুল বললেন, 'তুমি তাকে মেরে ফেললে?' তিনি বললেন, 'জি হ্যাঁ।' রাসুল বললেন, 'কিয়ামতের দিন যখন (তার) "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” সামনে আসবে, তখন তুমি কী করবে?' তিনি আরজ করলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমার মাগফিরাতের জন্য দুআ করুন।' রাসুল বললেন, 'কিয়ামতের দিন যখন (তার) “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” সামনে আসবে, তখন তুমি কী করবে?' তারপর তিনি কেবল এ কথাই বলছিলেন- 'কিয়ামতের দিন যখন (তার) “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” সামনে আসবে, তখন তুমি কী করবে? কিয়ামতের দিন যখন (তার) "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” সামনে আসবে, তখন তুমি কী করবে?' তিনি এর অতিরিক্ত কিছু বলেননি।
টিকাঃ
* সহিহ মুসলিম: ৯৫।
* সহিহ মুসলিম: ৯৬।
* সহিহ মুসলিম: ৯৭।
📄 গুনাহের কারণে তাকফিরের ব্যাপারে হাদিসের নির্দেশনা
আনাস ইবনু মালিক রা. বর্ণনা করেন; রাসুল বলেছেন,
ثَلَاثُ مِنْ أَصْلِ الْإِيمَانِ : الْكَفُّ عَمَّنْ قَالَ : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَلَا نُكَفِّرُهُ بِذَنْبٍ، وَلَا تُخْرِجُهُ مِنَ الْإِسْلَامِ بِعَمَلٍ، وَالْجِهَادُ mَاضٍ مُنْذُ بَعَثَنِي اللهُ إِلَى أَنْ يُقَاتِلَ آخِرُ أُمَّتِي الدَّجَّالَ، لَا يُبْطِلُهُ جَوْرُ جَائِرٍ، وَلَا عَدْلُ عَادِلٍ، وَالْإِيمَانُ بِالْأَقْدَارِ
তিনটি বিষয় ইমানের মূলের অন্তর্ভুক্ত। (এক) যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পড়বে, তার ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা। কোনো গুনাহের কারণে তাকে তাকফির না করা এবং কোনো আমলের কারণে তাকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার না করা। (দুই) আমাকে (রাসুল হিসেবে) পাঠানোর সময় থেকে জিহাদ চালু রয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। আর উম্মতের জিহাদকারী সর্বশেষ দল দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। কোনো অত্যাচারী শাসকের অত্যাচার অথবা কোনো ন্যায়পরায়ণ শাসকের ইনসাফ এটাকে রহিত করতে পারবে না। (তিন) তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস রাখা।
টিকাঃ
*কুফরের কারণে তাকফির করা যায়; গুনাহের কারণে নয়। খারেজিদের সঙ্গে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের পার্থক্য এখানেই। খারেজিরা গুনাহের কারণে ব্যক্তিকে তাকফির করে। আর আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত কুফরের কারণে সংশ্লিষ্ট সব শর্ত ও বিধানের প্রতি লক্ষ রাখে এবং প্রতিবন্ধকতাসমূহ যাচাই করে এরপর কাউকে তাকফির করে।
১০০ সুনানু আবি দাউদ: ২৫৩২। ইমাম আবু দাউদ রাহ. হাদিসটি বর্ণনা করে নীরব থেকেছেন। ইমাম বায়হাকি রাহ. আল-ইতিকাদ গ্রন্থে (পৃ. ২২০) বলেছেন, এর কয়েকটি সমার্থক বর্ণনা রয়েছে। শায়খ শুয়াইব আরনাউত রাহ. বলেছেন, আনাস রা. থেকে যিনি এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন- যার নাম ইয়াজিদ ইবনু আবি নুশায়বা—তিনি মাজহুল। তবে সনদের অন্য সকল বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য। [তাখরিজু শারহিত তাহাবিয়া : ৫৩০; তাখরিজুল আওয়াসিম ওয়াল কাওয়াসিম: ৪/৩৭০] তা ছাড়া হাদিসটির এই সনদে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও ফকিহগণের কাছে এটি সমাদৃত। এর আলোকে যুগে যুগে তাকফিরের নীতিমালা রচিত ও চর্চিত হয়েছে। সুতরাং এটি প্রমাণযোগ্য।