📄 কুফরের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থের মধ্যে সম্পর্ক
শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক থাকে। শরিয়া যেসব বিষয়কে কুফর বলে আখ্যায়িত করেছে, তার মধ্যেও শাব্দিক অর্থের বিবেচনা রয়েছে। কারণ, কুফর অবলম্বনকারী ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামত অকৃতজ্ঞতার দ্বারা আড়াল করে। আল্লাহর নিয়ামতসমূহ সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এ কারণেই তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করা বিবেকের দাবিতেই অপরিহার্য। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর নিয়ামতের সমুদ্রে সার্বক্ষণিক ডুবে থেকেও তাঁর প্রভুত্ব অস্বীকার করে কিংবা ইসলামের দাওয়াতপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও তা প্রত্যাখ্যান করে, সেসব নিয়ামত আড়াল করার অপচেষ্টা করে, তার এমন কাজকে কুফর নামে আখ্যায়িত করা হয়।
আল্লামা আবুল বাকা কাফাওয়ি রাহ. লেখেন,
الكفر: كل شيئ غطى شيئا فقد كفره، ومنه سمي الكافر؛ لأنه يستر نعم الله.
'কুফর এমন সব জিনিসকে বলা হয়, যা কোনো বস্তুকে ঢেকে ফেলে। এই প্রাসঙ্গিকতার কারণেই কাফিরকে এ নামে নামকরণ করা হয়েছে। কারণ, সে আল্লাহর নিয়ামতসমূহ আড়াল করে রাখে।'
টিকাঃ
* আল-কুল্লিয়াত, ফাসলুল কাফ, মাদ্দা কাফারা: ১/৭৪২।
📄 কুফরের পারিভাষিক সংজ্ঞা
প্রথম সংজ্ঞা: ইমাম আবু বকর বাকিল্লানি রাহ. (মৃত্যু: ৪০৩ হিজরি) লেখেন,
هو ضد الإيمان، وهو الجهل بالله عز وجل والتكذيب به الساتر لقلب الإنسان عن العلم به.
'কুফর ইমানের বিপরীত। কুফর আল্লাহর ব্যাপারে অজ্ঞ থাকা এবং তাঁকে অস্বীকার করার নাম, যা মানুষের অন্তরকে তাঁর (আল্লাহর) ব্যাপারে জ্ঞানার্জন থেকে আড়াল করে রাখে।'
অধিকাংশ ইমাম এই সংজ্ঞার ব্যাপারে আপত্তি করেছেন। আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি, অস্তিত্ব ও এককত্বের ব্যাপারে যেকোনো অজ্ঞতাকে যদি কুফর আখ্যায়িত করে এই সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে অনেক মুসলিমকেই কাফির গণ্য করতে হবে। কারণ, আল্লাহর ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তৃত জ্ঞান কজন মানুষই-বা রাখে! উপরন্তু এটা বান্দার সাধ্যাতীত। কারণ, অদৃশ্যের বিষয়ে আমাদের অল্প জ্ঞানই দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও অধিকাংশ কাফির আল্লাহর ব্যাপারে কোনো না-কোনো পর্যায়ের জ্ঞান রাখে, সুতরাং তাদের একশব্দে 'জাহিল বিল্লাহ' (আল্লাহর ব্যাপারে অজ্ঞ) বলার সুযোগ নেই। তাই বলে তাদের মুসলিমদের মধ্যে গণ্য করা যাবে না। কিন্তু সংজ্ঞার সরলতাকে পুঁজি করে কেউ এই বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারে, এমন অবকাশ রয়েছে। মোটকথা, এই সংজ্ঞাকে পরিপূর্ণ ও সর্বব্যাপী বলার সুযোগ থাকছে না।
যদিও কেউ কেউ এসব আপত্তির জবাব দেওয়ারও চেষ্টা করেছেন; কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমাম কুফরের এই সংজ্ঞা গ্রহণ করেননি।
দ্বিতীয় সংজ্ঞা : ইমাম আবু হামিদ গাজালি রাহ. (মৃত্যু: ৫০৫ হিজরি) লেখেন,
الكفر هو تكذيب الرسول ﷺ في شيئ مما جاء به.
'রাসুল ﷺ যা কিছু নিয়ে এসেছেন, এর কোনো বিষয়ে তাঁকে অস্বীকার করার নাম হলো কুফর।'
তিনি তাঁর গ্রন্থে এই সংজ্ঞাকেই মূলনীতি হিসেবে ধরে এর আলোকে তাকফিরের পুরো আলোচনা উপস্থাপন করেছেন।
তৃতীয় সংজ্ঞা: ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু মুরতাজা ইয়ামানি ইবনুল ওয়াজির রাহ. (মৃত্যু : ৮৮০ হিজরি) লেখেন,
واعلم أن أصل الكفر هو التكذيب المتعمد لشيئ من كتب الله تعالى المعلومة أو لأحد من رسله عليهم السلام أو لشيئ مما جاؤوا به إذا كان ذلك الأمر المكذب به معلوما بالضرورة من الدين.
'জেনে রেখো, কুফরের মূলকথা হলো আল্লাহর প্রমাণিত কিতাবসমূহ থেকে কোনো কিতাব, তাঁর কোনো রাসুল অথবা তাঁদের আনীত আদর্শ ইচ্ছাকৃত অস্বীকার করা-যখন সেই অস্বীকৃত বিষয় দীনের অন্তর্ভুক্ত হওয়া আবশ্যিকভাবে জানা থাকবে।'
উপরিউক্ত উভয় সংজ্ঞায় দেখা যাচ্ছে, কুফরকে 'অস্বীকার' দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর ওপর আকিদা-বিশেষজ্ঞ অনেক ইমাম আপত্তি তুলেছেন। কারণ, কুফর শুধু অস্বীকারের রূপেই আসে না; বরং সত্যায়ন না করার দ্বারাও কুফর হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি রাসুল-কে অস্বীকার না করে এবং সত্যায়ন না করে, তাহলে সর্বসম্মত সে কাফির। তবে সে যেহেতু রাসুল-কে অস্বীকার করেনি, তাই উপরিউক্ত সংজ্ঞাদ্বয় মেনে নিলে তদনুসারে এমন ব্যক্তিকে কাফির বলা যাবে না।
তবে ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি রাহ. এই আপত্তির জবাব দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য হলো, রাসুলের আনীত শিক্ষাসমূহের মধ্যে অন্যতম শিক্ষা হচ্ছে তাসদিক (সত্যায়ন)। সুতরাং কেউ তাসদিক না করলে সেটা দীনের গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা অস্বীকার বলেই বিবেচিত হবে। অতএব, উল্লিখিত উদাহরণে ব্যক্তি যদিও প্রত্যক্ষভাবে অস্বীকার করছে না; কিন্তু তাসদিক না-করার কারণে তার পরোক্ষ অস্বীকার সাব্যস্ত হচ্ছে, যা সুনিশ্চিতভাবে কুফর।
সর্বোত্তম সংজ্ঞা : সব বিতর্ক ও আপত্তির বাইরে থাকতে পরবর্তী ইমামগণ কুফরের যে সংজ্ঞা অগ্রাধিকার দিয়েছেন- عدم الإيمان عما من شأنه. 'যেসব বিষয়ের ওপর ইমান আনা অপরিহার্য তার ওপর ইমান না-আনা।
কাজি আজদুদ্দিন রাহ. লেখেন, فهو عندنا عدم تصديق الرسول في بعض ما علم مجيئه به ضرورة. 'আমাদের কাছে কুফরের সংজ্ঞা হলো, যেসব বিষয়সহ রাসুলের আগমন আবশ্যিকভাবে জানা গেছে, এমন কোনো বিষয়ে তাঁকে সত্যায়ন না করা। তিনি তাঁর অন্য গ্রন্থে সংজ্ঞাটি এভাবে উপস্থাপন করেন, الكفر عدم الإيمان. 'কুফর হচ্ছে ইমান না রাখা।
এসব সংজ্ঞার আলোকে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হচ্ছে, কেউ যদি শরিয়ত অস্বীকার না করে আবার পূর্ণ শরিয়তের সত্যায়ন থেকেও বিরত থাকে, তাহলে সে কাফির বলে বিবেচিত হবে। কারণ, ইমানের ভিত্তি ছিল সত্যায়নের ওপর; কিন্তু তার থেকে সত্যায়ন পাওয়া যায়নি বিধায় তাকে মুমিন গণ্য করার সুযোগ নেই।
উপরিউক্ত সবগুলো সংজ্ঞার মধ্যে শেষোক্ত সংজ্ঞাটিই সর্বব্যাপী। কারণ, যে ব্যক্তি সংশয় অথবা অজ্ঞতার কারণে সত্যায়ন করেনি, সে-ও এর ব্যাপকতার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। আর প্রকাশ থাকে যে, এমন লোকেরা সর্বসম্মতভাবে কাফির।
টিকাঃ
* তামহিদুল আওয়ায়িল ওয়া তালখিসুদ দালায়িল, বাবুল কাওলি ফি মানাল কুফর: ৩৯৪।
** ফায়সালুত তাফরিকাহ বাইনাল ইসলামি ওয়া জানদাকা: ২৫।
* ইসারুল হাক্কি আলাল খালক ফি রাদ্দিল খিলাফাতি ইলাল মাজহাবিল হাক: ৩৭৬।
শারহুল মাকাসিদ, তারিফুল কুফর: ৩/৪৫৮।
প্রাগুক্ত, তারিফুল কুফর: ৩/৪৫৭।
শারহুল মাওয়াকিফ: ৮/৩৬১।
শারহুল আকায়িদিল আজদিয়া: ১০৮।
* বিশিষ্ট হানাফি ফকিহ আল্লামা বারকাওয়ি রাহ. তাঁর প্রণীত আত-তরিকাতুল মুহাম্মাদিয়া গ্রন্থে (পৃ. ১৬২) লেখেন,
(الكفر) هو عدم الإيمان عمن من شأنه أن يكون مؤمنا. والإيمان هو التصديق بالقلب بجميع ما جاء به محمد من عند الله تعالى والإقرار به عند عدم المانع حقيقة وحكما أو حكما فقط، وتفسير الكفر بالإنكار ليس بجامع الخروج الشك وخلو الذهن عنه، فعلى الأول بينهما تقابل العدم والملكة، وعلى الثاني تقابل التضاد।
📄 কুফরের প্রকার
কুফরকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন, এক ভাগ হচ্ছে নিম্নরূপ:
কেউ যদি স্রষ্টার অস্তিত্বই স্বীকার না করে, তাহলে তাকে ‘দাহরি’ বলা হয়। আর যদি সে আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করে; কিন্তু তাঁর তাওহিদে (একত্ব) বিশ্বাস না করে, তাঁর সঙ্গে অংশীদার সাব্যস্ত করে, তাহলে তাকে ‘মুশরিক’ বলা হয়। কিছু মানুষ এমন আছে, যারা আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস করে; কিন্তু নবিগণের ওপর ইমান রাখে না। যেমন, ব্রাহ্মণগোষ্ঠী নবুওয়াতে বিশ্বাস করে না। একদল বিবেকপূজারি দার্শনিকও আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার ক্ষেত্রে নবুওয়াতকে মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করাকে নিজেদের জন্য লজ্জার বিষয় মনে করে।
কেউ যদি অন্যান্য নবির নবুওয়াত স্বীকার করে; কিন্তু মুহাম্মাদ ﷺ -এর নবুওয়াত অস্বীকার করে কিংবা তাঁকে নবি মেনে নেওয়া সত্ত্বেও তার শরিয়া অনুসরণ থেকে নিজেকে বিরত রাখে; অথবা শুধু আরবজাতির জন্য তাঁর নবুওয়াত সীমাবদ্ধ মনে করে, তাহলে তাদের নিজ নিজ বিশ্বাস অনুসারে ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান, জরাথ্রুস্ট ইত্যাদি বলা হয়।
কেউ যদি ইসলাম ত্যাগ করে কুফর অবলম্বন করে, তবে তাকে ‘মুরতাদ’ এবং তার এমন কাজকে ‘ইরতিদাদ’ ও ‘রিদ্দাহ’ বলা হয়। আর যদি সে বাহ্যত মুসলিম পরিচয় ধারণ করে অন্তরে কুফরি আকিদা-বিশ্বাস ও ভুল মতাদর্শ লালন করে এবং তার লালিত সেই কুফরকে ইসলামের নামে প্রচার করে, তবে তাকে ‘মুলহিদ’ বা ‘জিন্দিক’ এবং তার এমন কাজকে ‘ইলহাদ’ ও ‘জানদাকা’ নামে অভিহিত করা হয়।
দ্বিতীয় ভাগ হচ্ছে এরূপ :
১. অন্তর দ্বারাও তাসদিক (সত্যায়ন) করে না এবং মুখ দ্বারাও ইকরার (স্বীকারোক্তি) করে না। এটাকে 'কুফরে ইনকার' বলে।
২. অন্তর দ্বারা তাসদিক করে; কিন্তু মৌখিকভাবে ইকরার করে না। এটাকে 'কুফরে জুহুদ' বলে।
৩. মুখ দ্বারা ইকরার করে; কিন্তু অন্তর দ্বারা তাসদিক করে না। এটাকে 'কুফরে নিফাক' বলে।
৪. অন্তর দ্বারা তাসদিক করে এবং মুখ দ্বারা ইকরারও করে; কিন্তু একগুঁয়েমি, হঠকারিতা বা জিদবশত তা গ্রহণ করে না। এটাকে 'কুফরে ইনাদ' বলে。
টিকাঃ
الرِّدَّةُ فِي الإِصْطِلاح: هي كُفْرُ الْمُسْلِمِ بِقَوْلٍ صَرِيحٍ أَوْ لَفْظٍ يَقْتَضِيهِ أَوْ فِعْلٍ يَتَضَمَّنُهُ. - لسان العرب، والصحاح والخرشي ٦٢/٨ ، والقليوبي ٤ / ١٧٤٠
الزَّنْدَقَةُ عِنْدَ جُمْهُورِ الْفُقَهَاءِ إِظْهَارُ الْإِسْلَامِ وَإِبْطَانُ الْكُفْرِ، فَالزَّنْدِيقُ هُوَ مَنْ يُظْهِرُ الْإِسْلَامَ وَيُبْطِنُ الْكُفْرَ . قَالَ الدُّسُوقِي: وَهُوَ الْمُسَمَّى فِي الصَّدْرِ الأَوَّل مُنَافِقًا، وَيُسَمِّيهِ الْفُقَهَاءُ زِنْدِيقًا. – الموسوعة الفقهية الكويتية: لفظ زَنْدَقَة.
৮৬ * দ্রষ্টব্য—শারহুল মাওয়াকিফ, তাজনিব ফি আসনাফিল কুফফার : ৮/৩৪২; শারহুল মাকাসিদ, আস-সামইয়াত: ৩/২৪১; ফাতহুল মুলহিম, কিতাবুল ইমান: ১/৫১১।