📄 জাহিলিয়াতের পরিচয়
'জাহালাত' মানে মূর্খতা ও অজ্ঞতা। যা কিছু মূর্খতা ও অজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাকে বলা হয় জাহিলিয়াত। জাহিলিয়াতে আক্রান্ত ব্যক্তি আল্লাহর সত্তা, আল্লাহর হক এবং আল্লাহর পছন্দনীয় দীন ও আনুগত্য সম্পর্কে মূর্খ ও অজ্ঞ থাকে।
সাধারণভাবে 'জাহিলিয়াত' শব্দ দ্বারা এমন সময় বোঝানো হয়, যাতে কোনো রাসুল বা কোনো আসমানি কিতাব থাকে না। এ অধ্যায়ে আমরা জাহিলিয়াত বলতে রাসুলের আবির্ভাবের পূর্বের সময়ের কথা বোঝাব, যখন মানুষ সকল নবি ও রাসুল কর্তৃক নির্দেশিত অভিন্ন দীন ও স্বীকৃত শরিয়ত বিস্মৃত হয়ে ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করেছিল। এমনকি এই জাহিলিয়াত শুধু আরবের মুশরিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান, অগ্নিপূজক, সাবায়িসহ অন্য ধর্ম ও মতাদর্শের অনুসারীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই জাহিলি যুগের বিভিন্ন অবস্থার বিবরণ কুরআন ও হাদিসে উল্লেখ হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন,
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولى
তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং প্রাচীন (প্রাক-ইসলামি) জাহিলি যুগের (নারীদের) মতো করে নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়িয়ো না। [সুরা আহজাব (৩৩) : ৩৩]
এই আয়াতে আল্লাহ রাসুলের পবিত্র স্ত্রীগণকে হাটে-বাজারে কিংবা মানুষের সামনে নিজেদের শোভা-সৌন্দর্য প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন। কারণ, জাহিলি যুগের নারীরা এভাবে নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াত। এমনকি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ চলাকালে তারা তো সম্পূর্ণ নগ্নতা ধারণ করত এবং সেটাকে তারা গর্বের বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করত।
অন্য আয়াতে এসেছে,
ثُمَّ أَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ بَعْدِ الْغَمِّ أَمَنَةً نُعَاسًا يَغْشَى طَائِفَةٌ مِّنْكُمْ وَطَائِفَةٌ قَدْ أَهَمَّتْهُمْ أَنْفُسُهُمْ يَظُنُّونَ بِاللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ
তারপর দুঃখের পর তিনি তোমাদের ওপর অবতীর্ণ করলেন প্রশান্ত তন্দ্রা, যা তোমাদের এক দলকে আচ্ছন্ন করেছিল। আর অপর দল নিজেদের জীবনের জন্য চিন্তা করছিল; তারা আল্লাহ সম্বন্ধে অন্যায়ভাবে জাহিলিয়াতের ধারণা পোষণ করছিল। [সুরা আলে ইমরান (৩) : ১৫৪]
জাহিলিয়াতের ধারণা ছিল হক ও হকপন্থিরা চিরস্থায়ীভাবে পরাজিত হবে এবং বাতিল ও বাতিলপন্থিরা চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হয়ে যাবে। আল্লাহর সাহায্য মুমিনদের প্রতি অবতীর্ণ না হয়ে মুশরিকদের প্রতি অবতীর্ণ হবে এবং শেষ পরিণামে গোটা পৃথিবীতে তাদেরই অবাধ নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে; সর্বত্র লাত-মানাত, উজ্জা ও হোবল দেবতার জয়জয়কার শোনা যাবে।
জাহিলিয়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি বিষয়ের প্রতি ইসলাম নিন্দা ও ভর্ৎসনা জ্ঞাপন করেছে। আল্লাহ বলেন,
افَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ﴾
তারা কি জাহিলিয়াতের বিচারব্যবস্থা চায়? অথচ বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহ থেকে উত্তম বিচারক আর কে হতে পারে! [সুরা মায়িদা (৫) : ৫০]
জাহিলি বিচারব্যবস্থাই হলো তাগুতি বিচারব্যবস্থা; যেখানে আল্লাহর শরিয়তকে অকার্যকর করে অন্য কোনো পদ্ধতিতে বিচারকার্য পরিচালনা করা হয়।
কুরআনে এসেছে,
إِذْ جَعَلَ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي قُلُوبِهِمُ الْحَمِيَّةَ حَمِيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ
স্মরণ করুন ওই সময়ের কথা, যখন কাফিররা তাদের অন্তরে পোষণ করেছিল গোত্রীয় অহমিকা—জাহিলিয়াতের অহমিকা। [সুরা ফাতহ (৪৮) : ২৬]
জাহিলি অহমিকা বা সংকীর্ণতার অর্থ হলো, একব্যক্তি শুধু তার ব্যক্তিত্বের মর্যাদা রক্ষার জন্য কিংবা নিজের কথার মর্যাদা রক্ষার জন্য জেনেবুঝে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা কিংবা কোনো অবৈধ কাজ করা অথবা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার খাতিরে জুলুম ও অন্যায় কাজেও সম্প্রদায়ের লোকদের সাহায্য ও সহায়তা করা। যেমন, মক্কার কাফিররা জানত এবং মানত—হজ ও উমরার জন্য বায়তুল্লাহ জিয়ারতের অধিকার সবারই আছে। এ দীনি কর্তব্যপালনে বাধা দেওয়ার অধিকার কারও নেই। এটি ছিল আরবের সুপ্রাচীন ও সর্বজনস্বীকৃত আইন; কিন্তু তারা নিজেদের অন্যায় ও অসত্য এবং মুসলিমদের সম্পূর্ণ ন্যায় ও সত্যের অনুসারী হিসেবে জানা সত্ত্বেও শুধু নিজেদের মর্যাদা রক্ষার খাতিরে মুসলিমদের উমরা করতে বাধা দেয়। এমনকি মুশরিকদের মধ্যে যারা সত্যানুরাগী ছিল তারাও বলেছিল, যারা ইহরামরত অবস্থায় কুরবানির উট সঙ্গে নিয়ে উমরা পালন করতে এসেছে, তাদের বাধা দেওয়া অন্যায় কাজ। কিন্তু কুরাইশ-নেতারা শুধু এ কারণে বাধা দিতে বদ্ধপরিকর ছিল যে, মুহাম্মাদ যদি এত বড় দলবল নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন, তাহলে সমগ্র আরবে আমাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে। তা ছাড়া তারা তাঁকে আল্লাহর নবি বলে মেনে নিতে পারছিল না। 'বিসমিল্লাহ' লিখতে নিষেধ করেছিল। এ সবই ছিল তাদের জাহিলি অহমিকা ও সংকীর্ণতা। ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ এবং মুসলিমদের উত্যক্তকরণের ব্যাপারে সকল মুশরিকের সম্মতি না থাকলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার্থে তারা এই অন্যায় কাজে পরস্পর সহযোগী হয়েছিল।
আয়েশা রা. বলেন,
النكاح في الجاهلية كان على أربعة أنحاء فنكاح منها نكاح الناس اليوم: يخطب الرجل إلى الرجل وليته أو ابنته فيصدقها ثم ينكحها، ونكاح آخر: كان الرجل يقول لامرأته إذا طهرت من طمثها أرسلي إلى فلان فاستبضعي منه، ويعتزلها زوجها ولا يمسها أبدا، حتى يتبين حملها من ذلك الرجل الذي تستبضع منه، فإذا تبين حملها أصابها زوجها إذا أحب، وإنما يفعل ذلك رغبة في نجابة الولد، فكان هذا النكاح نكاح الاستبضاع ونكاح آخر: يجتمع الرهط مادون العشرة فيدخلون على المرأة كلهم يصيبها، فإذا حملت ووضعت، ومر عليها ليال بعد أن تضع حَمْلَهَا، أَرْسَلَتْ إِلَيْهِمْ، فَلَمْ يَسْتَطِعْ رَجُلٌ مِنْهُمْ أَنْ يَمْتَنِعَ، حَتَّى يَجْتَمِعُوا عِنْدَهَا ، تَقُولُ لَهُمْ: قَدْ عَرَفْتُمُ الَّذِي كَانَ مِنْ أَمْرِكُمْ وَقَدْ وَلَدْتُ، فَهُوَ ابْنُكَ يَا فُلانُ، تُسَمِّي مَنْ أَحَبَّتْ بِاسْمِهِ فَيَلْحَقُ بِهِ وَلَدُهَا، لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يَمْتَنِعَ بِهِ الرَجُلُ، وَنِكَاحُ الرَّابِعِ : يَجْتَمِعُ النَّاسُ الكَثِيرُ، فَيَدْخُلُونَ عَلَى المَرْأَةِ، لا تَمْتَنِعُ مِمَّنْ جَاءَهَا، وَهُنَّ البَغَايَا، كُنَّ يَنْصِبْنَ عَلَى أَبْوَابِهِنَّ رَايَاتٍ تَكُونُ عَلَمًا، فَمَنْ أَرَادَهُنَّ دَخَلَ عَلَيْهِنَّ، فَإِذَا حَمَلَتْ إِحْدَاهُنَّ وَوَضَعَتْ حملها جُمِعُوا لَهَا، وَدَعَوْا لَهُمُ القَافَةَ، ثُمَّ أَلْحَقُوا وَلَدَهَا بِالَّذِي يَرَوْنَ، فَالْتَاطَ بِهِ، وَدُعِيَ ابْنَهُ، لَا يَمْتَنِعُ مِنْ ذَلِكَ، فَلَمَّا بُعِثَ مُحَمَّدُ ﷺ بِالحَقِّ، هَدَمَ نِكَاحَ الجَاهِلِيَّةِ كُلَّهُ إِلَّا نِكَاحَ النَّاسِ اليَوْمَ
‘জাহিলি যুগে বিয়ে ছিল চার প্রকার। প্রথমটি ছিল বর্তমান কালের অনুরূপ। যেমন, একে অন্যকে মেয়ের বিয়ের জন্য বার্তা পাঠাত। সে পয়গام মনজুর হওয়ার পর মোহরানা আদায়ের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হতো।
দ্বিতীয়টি ছিল নিজের স্বামী থাকা সত্ত্বেও অন্যের কাছ থেকে সন্তান গ্রহণ। বিবাহিত মহিলা রজঃস্রাব থেকে পাকসাফ হওয়ার পর তার স্বামী তাকে বলত, অমুক লোকের কাছে বার্তা পাঠিয়ে তার কাছ থেকে তার লজ্জাস্থান অধিকার করো। (অর্থাৎ তার সঙ্গে ব্যভিচার করো।) এ সময় স্বামী নিজ স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে থাকত। স্ত্রীর কাছে যেত না। যে লোকটিকে দিয়ে ব্যভিচার করানো হচ্ছিল, তার দ্বারা নিজ স্ত্রীর গর্ভে সন্তান আসার প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত স্বামী স্ত্রীর কাছে যেত না। গর্ভধারণের লক্ষণ প্রকাশের পর স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীর কাছে যেত। এমন করার কারণ ছিল যাতে সন্তান সুন্দর, অভিজাত ও পরিপূর্ণ হতে পারে। এ ধরনের বিয়েকে 'এসতেবদা' বিয়ে বলা হয়।
তৃতীয়ত, ১০ জন মানুষের চেয়ে কমসংখ্যক মানুষ কোনো একজায়গায় একজন মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার করত। মহিলা গর্ভবতী হওয়ার পর সে সব পুরুষকে কাছে ডেকে আনত। এ সময় কারও অনুপস্থিত থাকার উপায় ছিল না। সবাই উপস্থিত হলে মহিলা বলত, তোমরা যা করেছ, তা তো তোমাদের জানা, এখন আমার গর্ভ থেকে এ সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে। হে অমুক, এ সন্তান তোমার। তারপর সে মহিলা ইচ্ছামতো যে কারও নাম নিত। যার নাম নেওয়া হতো, নবজাত শিশুকে তার সন্তান হিসেবে সবাই মেনে নিত।
চতুর্থত, বহু লোক একত্রিত হয়ে একজন মহিলার কাছে যেত। মহিলা কোনো ইচ্ছুক পুরুষকেই বিমুখ করত না বা ফিরিয়ে দিত না। এরা ছিল পতিতা। এরা নিজেদের ঘরের সামনে একটা পতাকা টানিয়ে রাখত। এর ফলে ইচ্ছামতো বিনা বাধায় তাদের কাছে যাওয়া যেত। এ ধরনের মহিলা গর্ভবতী হলে এবং সন্তান প্রসব করলে যারা তার সঙ্গে মিলিত হয়েছিল, তারা সবাই হাজির হতো। তারপর একজন বিশেষজ্ঞ ডাকা হতো। সেই বিশেষজ্ঞ তার অভিমত অনুযায়ী সন্তানটিকে (সেই ব্যভিচারকারী পুরুষদের) কারও নামে ঘোষণা করত। পরবর্তী সময়ে সেই শিশু ঘোষিত ব্যক্তির সন্তান হিসেবে বড় হতো। সে ব্যক্তি সন্তানটিকে অস্বীকার করতে পারত না।
মুহাম্মাদ ﷺ-এর আগমনের পর আল্লাহ জাহিলিসমাজের সব ধরনের বিয়েপ্রথা বাতিল করে দেন এবং বর্তমানে প্রচলিত ইসলামি বিয়েপ্রথার প্রচলন করেন।
জাহিলি যুগে একাধিক স্ত্রী রাখা কোনো দোষের ব্যাপার ছিল না। সহোদর দুই বোনকেও অনেকে একই সময়ে স্ত্রী হিসেবে ঘরে রাখত। পিতার তালাক দেওয়া স্ত্রী অথবা পিতার মৃত্যুর পর সন্তান তার সৎমায়ের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হতো। তালাকের অধিকার ছিল শুধু পুরুষের ইখতিয়ার। তালাকের কোনো সংখ্যা নির্দিষ্ট ছিল না। (আবু দাউদ, তাফসির গ্রন্থাবলি, আত-তালাক মাররাতান দ্রষ্টব্য)
ব্যাপক জাহিলিয়াত যদিও রাসুলের আবির্ভাবের দ্বারা সমাপ্ত হয়ে গেছে; কিন্তু জাহিলিয়াতের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও প্রতীকের প্রকাশ সীমিত বা বৃহৎ পরিসরে এখনো রয়ে গেছে। জাবির ইবনু আবদিল্লাহ রা. বর্ণনা করেন,
كُنَّا فِي غَزَاةٍ فَكَسَعَ رَجُلٌ مِنَ المُهَاجِرِينَ رَجُلًا مِنَ الْأَنْصَارِ، فَقَالَ الأَنْصَارِيُّ: يَا لَلْأَنْصَارِ، وَقَالَ المُهَاجِرِيُّ: يَا لَلْمُهَاجِرِينَ، فَسَمَّعَهَا اللهُ رَسُولَهُ ﷺ قَالَ: «مَا بَالُ دَعْوَى أَهْلِ الْجَاهِلِيَّةِ؟» ثُمَّ قَالَ: مَا شَأْنُهُمْ فَقَالُوا كَسَعَ رَجُلٌ مِنَ المُهَاجِرِينَ رَجُلًا مِنَ الْأَنْصَارِ، فَقَالَ الْأَنْصَارِيُّ: يَا لَلْأَنْصَارِ، وَقَالَ المُهَاجِرِيُّ: يَا لَلْمُهَاجِرِينَ، فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ: «دَعُوهَا فَإِنَّهَا مُنْتِنَةٌ قَالَ جَابِرُ: وَكَانَتِ الأَنْصَارُ حِينَ قَدِمَ النَّبِيُّ ﷺ أَكْثَرَ، ثُمَّ كَثُرَ المُهَاجِرُونَ بَعْدُ
এক যুদ্ধে আমরা উপস্থিত ছিলাম। জনৈক মুহাজির সাহাবি এক আনসারি সাহাবির নিতম্বে আঘাত করেন। তখন আনসারি সাহাবি 'হে আনসারি ভাইয়েরা' এবং মুহাজির সাহাবি 'হে মুহাজির ভাইয়েরা' বলে ডাক দেন। আল্লাহ তাঁর রাসুলের কানে এ কথা পৌঁছে দিলেন। তিনি বললেন, জাহিলি লোকদের ডাকাডাকির মতো ডাকাডাকি হচ্ছে কেন? তাদের হলোটা কী! তখন উপস্থিত লোকেরা বললেন, এক মুহাজির এক আনসারির নিতম্বে আঘাত করেছেন। আনসারি সাহাবি 'হে আনসারি ভাইয়েরা' এবং মুহাজির সাহাবি 'হে মুহাজির ভাইয়েরা' বলে নিজ নিজ গোত্রকে ডাক দিয়েছেন। এ কথা শুনে নবি বললেন, তোমরা এসব ডাকাডাকি পরিত্যাগ করো। নিশ্চয়ই এটা দুর্গন্ধযুক্ত কথা, ঘৃণিত ডাক। নবি যখন মদিনায় হিজরত করে আসেন, তখন আনসাররা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। অবশ্য পরে মুহাজিররা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যান।
এ কথা মুনাফিক-সর্দার আবদুল্লাহ ইবনু উবাইয়ের কানে পৌঁছালে সে বলে ওঠে,
أَوَقَدْ فَعَلُوهَا وَاللهِ لَئِنْ رَجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِ جَنَّ الْآعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ فَقَالَ عُمَرُ يَا رَسُولَ اللهِ دَعْنِي أَضْرِبْ عُنُقَ هَذَا الْمُنَافِقِ . فَقَالَ النَّبِيُّ " دَعْهُ لَا يَتَحَدَّثُ النَّاسُ أَنَّ مُحَمَّدًا يَقْتُلُ أَصْحَابَهُ
এত বড় সাহস! এ কাজ তারা করেছে? আল্লাহর কসম, যদি আমরা মদিনায় ফিরে যেতে পারি, তাহলে অবশ্যই সেখান থেকে সম্মানিতরা হীনদের বিতাড়িত করবে।
উমর রা. বলেন, আল্লাহর রাসুল, আমাকে অনুমতি দিন, এই মুনাফিকের মুন্ডুটা উড়িয়ে দিই। রাসুল বললেন, তাকে এড়িয়ে চলো; লোকেরা যেন বলতে না পারে যে, মুহাম্মাদ তার সঙ্গীদের খুন করে।
এ ছাড়াও রাসুল ﷺ বলেন,
وَمَنْ ادَّعَى دَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ فَإِنَّهُ مِنْ جُنَا جَهَنَّمَ
যে লোক জাহিলিয়াতের রীতি-নীতির কথা বলে, সে জাহান্নামিদের দলভুক্ত।
ইসলাম হলো জ্ঞান, জাহিলিয়াত হলো অজ্ঞতা। ইসলাম হলো আলো, জাহিলিয়াত হলো অন্ধকার। জাহিলিয়াত ও ইসলামের মধ্যে পরস্পর তুলনা করলে ইসলামের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। যা কিছু জাহিলিয়াত, তা কখনো ইসলাম নয়; আর যা কিছু ইসলাম, তা কখনো জাহিলিয়াতের ছোঁয়ায় মলিন বা ক্লেদাক্ত নয়। রাসুলের আগমন দ্বারা পৃথিবী থেকে ব্যাপক জাহিলিয়াত বিদায় নিয়েছে। তাঁর আগমনে পৃথিবী প্রাণের সঞ্জীবনী ও আলোর দেখা পেয়েছে; কিন্তু এখনো কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, জনপদ ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষেত্রবিশেষ জাহিলিয়াত থাকতে পারে। যেমন, হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
عَنِ المَعْرُورِ بْنِ سُوَيْدٍ، قَالَ: لَقِيتُ أَبَا ذَرَّ بِالرَّبَذَةِ، وَعَلَيْهِ حُلَّةٌ، وَعَلَى غُلَامِهِ حُلَّةٌ، فَسَأَلْتُهُ عَنْ ذَلِكَ، فَقَالَ: إِنِّي سَابَبْتُ رَجُلًا فَعَيَّرْتُهُ بِأُمِّهِ، فَقَالَ لِي النَّبِيُّ ﷺ: «يَا أَبَا ذَرٍّ أَعَيَّرْتَهُ بِأُمِّهِ ۚ إِنَّكَ امْرُؤٌ فِيكَ جَاهِلِيَّةٌ، إِخْوَانُكُمْ خَوَلُكُمْ، جَعَلَهُمُ اللَّهُ تَحْتَ أَيْدِيكُمْ، فَمَنْ كَانَ أَخُوهُ تَحْتَ يَدِهِ، فَلْيُطْعِمْهُ مِمَّا يَأْكُلُ، وَلْيُلْبِسْهُ مِمَّا يَلْبَسُ، وَلَا تُكَلِّفُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ، فَإِنْ كَلَّفْتُمُوهُمْ فَأَعِينُوهُمْ
মারুর ইবনু সুওয়াইদ রাহ. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি একবার রাবাজা নামক স্থানে আবু জার রা.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তখন তাঁর পরনে ছিল একজোড়া কাপড় (লুঙি ও চাদর) আর তার চাকরের পরনেও ছিল ঠিক একই ধরনের এক জোড়া কাপড়। আমি তাঁকে এর (সমতার) কারণ জিজ্ঞেস করি। তিনি বললেন, একবার আমি একব্যক্তিকে গালি দিয়েছিলাম এবং তার মা সম্পর্কে লজ্জা দিয়েছিলাম, তখন রাসুল ﷺ আমাকে বললেন, 'আবু জার, তুমি তাকে তার মা সম্পর্কে লজ্জা দিয়েছ! তুমি তো এমন ব্যক্তি, যার মধ্যে এখনো জাহিলিয়াত রয়ে গেছে। জেনে রেখো, তোমাদের মালিকানাভুক্তরা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। তাই যার ভাই তার অধীনে থাকবে, সে যেন নিজে যা খায় তাকে তা-ই খাওয়ায় এবং নিজে যা পরে, তাকে তা-ই পরায়। তাদের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দিয়ো না, যা তাদের জন্য খুব কষ্টকর। যদি এমন কষ্টকর কাজ করতে দাও, তাহলে তোমরাও তাদের সে কাজে সাহায্য করবে।
অন্য হাদিসে রাসুল বলেন,
أَرْبَعُ فِي أُمَّتِي مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ لَا يَتْرُكُونَهُنَّ الْفَخْرُ فِي الْأَحْسَابِ وَالطَّعْنُ فِي الأَنْسَابِ وَالاسْتِسْقَاءُ بِالنُّجُومِ وَالنِّيَاحَةُ. وَقَالَ: النَّائِحَةُ إِذَا لَمْ تَتُبْ قَبْلَ مَوْتِهَا تُقَامُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَعَلَيْهَا سِرْبَالُ مِنْ قَطِرَانٍ وَدِرْعُ مِنْ جَرَبٍ
আমার উম্মাহর মধ্যে জাহিলিয়াতের চারটি বিষয় রয়েছে, যা তারা ত্যাগ করছে না। বংশমর্যাদা নিয়ে গর্ব, অন্যের বংশের প্রতি কটাক্ষ, গ্রহ-নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা এবং মৃতদের জন্য বিলাপ করা। তিনি আরও বলেন, বিলাপকারিণী যদি তার মৃত্যুর পূর্বে তাওবা না করে, তবে কিয়ামতের দিনে তাকে দাঁড় করানো হবে, তখন তার দেহে আলকাতরার আবরণ এবং খসখসে লোহার পোশাক থাকবে।
হাদিসটি সুনানুত তিরমিজি গ্রন্থে এভাবে বর্ণিত হয়েছে,
أَرْبَعُ فِي أُمَّتِي مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ لَنْ يَدَعَهُنَّ النَّاسُ النِّيَاحَةُ وَالطَّعْنُ فِي الأَحْسَابِ وَالْعَدْوَى أَجْرَبَ بَعِيرُ فَأَجْرَبَ مِائَةَ بَعِيرٍ مَنْ أَجْرَبَ الْبَعِيرَ الأَوَّلَ وَالْأَنْوَاءُ مُطِرْنَا بِنَوْءِ كَذَا وَكَذَا
আমার উম্মাহর মধ্যে জাহিলিয়াতের চারটি (খারাপ) বিষয় আছে, তারা এগুলো ছাড়ছে না: মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করে কাঁদা, বংশ তুলে গালি দেওয়া, সংক্রামক রোগ (নিজস্ব শক্তিতে) সংক্রমিত হওয়ার ধারণা করা—একটি উট সংক্রমিত হলে ১০০টি উটে তা সংক্রমিত হওয়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রথমটি কীভাবে সংক্রমিত হলো? আর নক্ষত্রের প্রভাব মান্য করা। অর্থাৎ, এরূপ বিশ্বাস করা যে, অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে আমাদের ওপর বৃষ্টি হলো।
যেহেতু জাহিলিয়াত সৃষ্টি হয় অজ্ঞতা থেকে, তাই রাসুল ﷺ জ্ঞানের আলো দ্বারা সযত্নে অজ্ঞতার আঁধার তাড়িয়েছেন। জাহিলিয়াতের স্থলে ইসলামকে প্রতিষ্ঠাপিত করেছেন। হাদিসে এসেছে,
أَلَا إِنَّ رَبِّي أَمَرَنِي أَنْ أُعَلِّمَكُمْ مَا جَهِلْتُمْ، مِمَّا عَلَّمَنِي يَوْمِي هَذَا، كُلُّ مَالٍ نَحَلْتُهُ عَبْدًا حَلَالُ، وَإِنِّي خَلَقْتُ عِبَادِي حُنَفَاءَ كُلَّهُمْ، وَإِنَّهُمْ أَتَتْهُمُ الشَّيَاطِينُ فَاجْتَالَتْهُمْ عَنْ دِينِهِمْ، وَحَرَّمَتْ عَلَيْهِمْ مَا أَحْلَلْتُ لَهُمْ، وَأَمَرَتْهُمْ أَنْ يُشْرِكُوا بِي مَا لَمْ أُنْزِلْ بِهِ سُلْطَانًا، وَإِنَّ اللَّهَ نَظَرَ إِلَى أَهْلِ الْأَرْضِ، فَمَقَتَهُمْ عَرَبَهُمْ وَعَجَمَهُمْ، إِلَّا بَقَايَا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ، وَقَالَ: إِنَّمَا بَعَثْتُكَ لِأَبْتَلِيَكَ وَأَبْتَلِي بِكَ، وَأَنْزَلْتُ عَلَيْكَ كِتَابًا لَا يَغْسِلُهُ الْمَاءُ، تَقْرَؤُهُ نَائِمًا وَيَقْظَانَ، وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَنِي أَنْ أُحَرِّقَ قُرَيْشًا، فَقُلْتُ: رَبِّ إِذًا يَتْلَغُوا رَأْسِي فَيَدَعُوهُ خُبْزَةٌ، قَالَ: اسْتَخْرِجُهُمْ كَمَا اسْتَخْرَجُوكَ، وَاغْزُهُمْ نَغْزُكَ، وَأَنْفِقْ فَسَنُنْفِقَ عَلَيْكَ، وَابْعَثْ جَيْشًا نَبْعَثْ خَمْسَةٌ مِثْلَهُ، وَقَاتِلْ بِمَنْ أَطَاعَكَ مَنْ عَصَاكَ، قَالَ: وَأَهْلُ الْجَنَّةِ ثَلَاثَةٌ ذُو سُلْطَانٍ مُقْسِطُ مُتَصَدِّقُ مُوَفَّقٌ، وَرَجُلٌ رَحِيمٌ رَقِيقُ الْقَلْبِ لِكُلِّ ذِي قُرْبَى وَمُسْلِمٍ، وَعَفِيفٌ مُتَعَفِّفُ ذُو عِيَالٍ، قَالَ: وَأَهْلُ النَّارِ خَمْسَةُ: الضَّعِيفُ الَّذِي لَا زَبْرَ لَهُ، الَّذِينَ هُمْ فِيكُمْ تَبَعًا لَا يَبْتَغُونَ أَهْلًا وَلَا مَالًا، وَالْخَائِنُ الَّذِي لَا يَخْفَى لَهُ طَمَعُ، وَإِنْ دَقَّ إِلَّا خَانَهُ، وَرَجُلٌ لَا يُصْبِحُ وَلَا يُمْسِي إِلَّا وَهُوَ يُخَادِعُكَ عَنْ أَهْلِكَ وَمَالِكَ وَذَكَرَ الْبُخْلَ أَوِ الْكَذِبَ وَالشَّنْظِيرُ الْفَحَّاشُ
শোনো, আমার রব আজ আমাকে যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা থেকে তোমাদের এমন বিষয় শিক্ষা দিতে তিনি আমাকে আদেশ করেছেন, যে বিষয়ে তোমরা অজ্ঞ। তা হলো, আমি আমার বান্দাদের যে ধন- সম্পদ দিয়েছি, তা পূর্ণরূপে হালাল। আমি আমার সকল বান্দাকে একনিষ্ঠ (মুসলিম) হিসেবে সৃষ্টি করেছি। তারপর তাদের কাছে শয়তান এসে তাদেরকে তাদের দীন থেকে বিচ্যুত করে দেয়। আমি যেসব জিনিস তাদের জন্য হালাল করেছিলাম, শয়তান তা হারাম করে দেয়। অধিকন্তু শয়তান তাদেরকে আমার সঙ্গে এমন বিষয়ে শিরক করার আদেশ দেয়, যে বিষয়ে আমি কোনো ভিত্তি (প্রমাণ) পাঠাইনি।
আল্লাহ পৃথিবীবাসীর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে কিতাবিদের কিছু লোক ব্যতীত আরব-আজম সবাইকে চরম অপছন্দ করেছেন। তারপর তিনি বললেন, তোমাকে এবং তোমার দ্বারা অন্যদের পরীক্ষার উদ্দেশ্যে আমি তোমাকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছি তোমার প্রতি আমি এমন কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যা পানি কখনো ধুয়ে-মুছে ফেলতে পারবে না। ঘুমন্ত ও জাগ্রত অবস্থায় তুমি তা পাঠ করবে।
রাসুল বলেন, 'কুরাইশ গোত্রের লোকদের জ্বালিয়ে দিতে আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। আমি তখন বললাম, হে আমার রব, আমি যদি এ কাজ করি তবে তারা তো আমার মাথা ভেঙে রুটির মতো টুকরো টুকরো করে ফেলবে।' আল্লাহ বললেন, 'তারা যেভাবে তোমাকে বহিষ্কার করেছে, ঠিক তদ্রুপ তুমিও তাদের বহিষ্কার করো। তুমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো। আমি তোমাকে সাহায্য করব। খরচ করো (আল্লাহর পথে), তোমার জন্যও খরচ করা হবে। তুমি একটি বাহিনী পাঠাও, আমি অনুরূপ পাঁচটি বাহিনী পাঠাব। যারা তোমার আনুগত্য করে তাদের সঙ্গে নিয়ে তোমার বিরুদ্ধাচরণকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করো।
তিন প্রকার মানুষ জান্নাতি হবে : (এক প্রকার মানুষ) তারা, যারা রাষ্ট্রীয় কর্ণধার, ন্যায়পরায়ণ, সত্যবাদী এবং নেককাজের তাওফিক লাভে ধন্য লোক। (দ্বিতীয়) সে-সকল মানুষ, যারা দয়ালু এবং আত্মীয়স্বজন ও মুসলমানদের প্রতি সহৃদয়। (তৃতীয়) ওই সকল মানুষ, যারা পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারী এবং বহু সন্তানের (গরিব) পিতা হওয়া সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তিকারী নয়।
তারপর তিনি বললেন, পাঁচ প্রকার মানুষ জাহান্নামি হবে। (এক) এমন দুর্বল মানুষ, যাদের মধ্যে (ভালো-মন্দ) পার্থক্য করার বুদ্ধি নেই। যারা তোমাদের এমন তাবেদার যে, না তারা পরিবার-পরিজন চায়, না ধনৈশ্বর্য। (দুই) এমন খিয়ানতকারী মানুষ, সাধারণ বিষয়েও যে খিয়ানত করে। যার লোভ কারও কাছেই গোপন নেই। (তিন) ওই লোক, যে তোমার পরিবার-পরিজন এবং ধন-সম্পদের ব্যাপারে সকাল-সন্ধ্যা তোমার সঙ্গে প্রতারণা করে। (চার) কৃপণ বা মিথ্যাবাদী (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) (পাঁচ) দুশ্চরিত্র, চরম অশ্লীলতাবাদী লোক।”
আদমশুমারিতে গণনা করা মুসলিম আর প্রকৃত তাওহিদবাদী মুসলিমের মধ্যে রয়েছে বিস্তর তফাত। রয়েছে যোজন যোজন দূরত্ব এবং সুবিশাল ফারাক। আদর্শহীন মুসলিমের দ্বারা যদি পুরো পৃথিবী ভরেও যায়, তবু তাদের দ্বারা ইসলামের কল্যাণ আশা করা যায় না। ইসলামের বিজয় আসবে প্রকৃত মুসলিমদের হাত ধরে, যারা ইসলামের শাশ্বত আদর্শ লালন করে এবং ইসলাম-প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। যাদের জ্ঞান নেই, যাদের আদর্শ নেই, যাদের বুকভরা স্বপ্ন নেই; অধিকন্তু যারা জাহিলিয়াতে আক্রান্ত, তাদের দ্বারা ইসলামের সোনালি সুদিন ফিরে আসার কোনো প্রত্যাশা করা যায় না। এরকম মুসলিমের দৃষ্টান্ত হলো ধুলোকণার মতো, বাতাসের সামান্য ঝাপটায় যা সহজেই উড়ে যায়। এরপর নিক্ষিপ্ত হয় দূরে কোথাও।
আদর্শ কখনো চেপে রাখা যায় না। সময়ে-অসময়ে, আঘাতে-প্রতিঘাতে, ইচ্ছা- অনিচ্ছায় তা প্রকাশ পেয়েই যায়। আদর্শ হচ্ছে মানুষের অস্তিত্বের স্মারক। একজন ব্যক্তিকে যে রূপে আমরা চিহ্নিত, চিত্রিত ও বিকশিত হতে দেখি, তার মূলে থাকে আদর্শ ও বিশ্বাস।
মানুষ সামাজিক জীব। সামাজিকতার সরল সমীকরণের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখলেও একজন মুসলিমকে অপরিহার্যভাবেই তার মধ্যে টেনে আনতে হয় দীনের চেতনা এবং সুন্দরের দ্যোতনা। আমরা যেসব সমাজে বাস করি, নিশ্চয়ই এগুলো জাহিলি সমাজ। এই যুগে জাহিলি সমাজের অবলম্বিত দীন হলো মানবধর্ম। এর মধ্যে থেকে জাহিলিয়াতের স্রোত ঠেলে, আঁধার সরিয়ে স্রষ্টা-নির্দেশিত সুন্দরের আনন্দলোকে ভ্রমণের মধ্যেই রয়েছে একজন মুসলিমের আলোকিত আদর্শের উত্তম বহিঃপ্রকাশ। তবে স্মর্তব্য, আমরা দীনকে স্বচ্ছন্দ করব। তাকে রূঢ়তায় আকীর্ণ করব না। নিজে তাকওয়ার ওপর চলব। অন্যকে বিচার করতে ফাতওয়ার অনুসরণ করব। ফাতওয়ার দর্পণে যা গ্রাহ্য ও সচল, অন্যের ক্ষেত্রে তা অস্বীকার করে রূঢ়তার অবগুণ্ঠন দিলে সমাজ তার গতি হারায়, মনুষ্যচরিত অপ্রসন্ন হয় এবং কেউ-বা স্থলিত হয়। রাসুল বলেছেন,
إِنَّ الدِّينَ يُسْرُ ، وَلَنْ يُشَادَّ الدِّينَ أَحَدٌ إِلَّا غَلَبَهُ، فَسَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَأَبْشِرُوا، وَاسْتَعِينُوا بِالْغَدْوَةِ وَالرَّوْحَةِ وَشَيْءٍ مِنَ الدُّلْجَةِ
নিশ্চয়ই দীন সহজ। দীন নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করে, দীন তার ওপর জয়ী হয়। কাজেই তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং (মধ্যপন্থার) কাছে থেকো, আশান্বিত থাকো এবং সকাল-সন্ধ্যা ও রাতের কিছু অংশে (ইবাদত-সহযোগে) সাহায্য চাও।
তবে সহজতার অর্থ কখনোই জাহিলিয়াতের সঙ্গে আপস করা নয়। তাওহিদ ও মিল্লাতে ইবরাহিমের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই। কারণ, শিকড়ই যদি কর্তিত হয়ে যায়, তাহলে বৃক্ষের মৃত্যু সুনিশ্চিত। এ ছাড়া দীনের শাখাগত বিষয়াদিতে অনর্থক বাড়াবাড়ির অনুপ্রবেশ ঘটানো ও এর প্রশস্ততাকে সংকীর্ণতায় আবদ্ধ করে ফেলার মধ্যে উম্মাহর জন্য কোনো কল্যাণ নেই।
টিকাঃ
* অর্থাৎ, উহুদযুদ্ধের সেই কঠিন বিপদের সময় সাহাবিগণের ওপর তন্দ্রা নেমে এসে তাঁদের প্রশান্ত করে দিচ্ছিল। আবু তালহা রা. বলেন, আমরা উহুদের দিন কাতারবন্দি অবস্থায়ই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিলাম। এমনকি আমাদের হাত থেকে তরবারি পড়ে যাচ্ছিল আর বার বার তা উঠিয়ে নিচ্ছিলাম। (সহিহ বুখারি: ৪৫৬২)
** এরা ছিল মুনাফিক সম্প্রদায়। তারা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত ছিল। তারা সবচেয়ে ভীতু ও কাপুরুষ এবং হকের বিপরীতে অবস্থানকারী সম্প্রদায় ছিল। (তাফসিরে তাবারি)
** দ্রষ্টব্য-সহিহ বুখারি: ২৭৩১-২৭৩২।
* অভিজাত-শ্রেণির অবস্থা এ রকম হলেও অন্যদিকে অন্যান্য শ্রেণির অবস্থা ছিল ভিন্নরূপ। সেসব শ্রেণির মধ্যে নারী-পুরুষের যে সম্পর্ক ছিল, একে পাপাচার, নির্লজ্জতা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও ব্যভিচার ছাড়া কিছু বলা যায় না।
* সহিহ বুখারি, কিতাবুন নিকাহ: ২/৭৬৯।
* সহিহ বুখারি: ৪৯০৫, ৪৯০৭; সহিহ মুসলিম: ২৫৮৪।
** প্রাগুক্ত; সুনানুত তিরমিজি: ৩৩১৫।
৫২ সুনানুত তিরমিজি: ২৮৬৩। হাদিসটি সহিহ।
৫৩ সহিহ বুখারি: ৩০।
* সহিহ মুসলিম: ২০৩১।
৫৫ সুনানুত তিরমিজি: ১০০১।
* রাসুলের আগমনের পূর্বে কিতাবিদের মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ প্রকৃত তাওহিদ ও মিল্লাতে ইবরাহিমের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এ ছাড়া বাকি সবাই মূল ধর্মকে পরিবর্তন করে শিরকে লিপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
** কারণ, তা মানুষের সিনায় সংরক্ষিত থাকবে। কালের আবর্তন-বিবর্তন তাকে মোটেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না।
** সহিহ মুসলিম: ২৮৬৫।
* সহিহ বুখারি: ৯।
📄 জাহিলিয়াত সম্পর্কে জানার প্রয়োজনীয়তা
জাহিলিয়াতে লিপ্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে আমরা জাহিলিয়াত সম্পর্কে জানব না; বরং আমরা সে সম্পর্কে জানব তার কৌশলী আঘাত ও হিংস্র থাবা থেকে বেঁচে থাকার জন্য। কবি আবু ফিরাস আল হামদানি বলেন,
عَرَفْتُ الشَّر لا للشر ولكن لتوفيه ... ومن لا يعرف الشر يقع فيه আমি অনিষ্ট চিনেছি অনিষ্টের জন্য নয়; বরং তা থেকে বাঁচার জন্য। যে অনিষ্ট চেনে না, সে তো তাতে পতিত হয়েই যায়।
রাসুল বলেন,
أَبْغَضُ النَّاسِ إِلَى اللهِ ثَلَاثَةٌ : مُلْحِدُ فِي الْحَرَمِ، وَمُبْتَغِ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ، وَمُطَّلِبُ دَمِ امْرِئٍ بِغَيْرِ حَقٌّ لِيُهَرِيقَ دَمَهُ
আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি হচ্ছে তিন জন : যে ব্যক্তি পবিত্র হারাম এলাকায় অন্যায় ও অপকর্মে লিপ্ত হয়। যে ব্যক্তি ইসলামি যুগে জাহিলিয়াতের প্রথা তালাশ করে। যে ব্যক্তি যথার্থ কারণ ব্যতীত কারও রক্তপাত দাবি করে।
এ হাদিস থেকে প্রতিভাত হচ্ছে, যে-কেউ ইসলামে থেকে জাহিলিয়াতের রীতি- নীতি ও আদর্শ-বিশ্বাস অনুসন্ধান করবে, সে হবে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষদের অন্যতম। জাহিলিয়াতের প্রথা অনুসন্ধান করাই যদি এত বড় অপরাধ হয়, তবে সরাসরি জাহিলিয়াতে লিপ্ত হওয়া এবং তার প্রচার-প্রসারে সচেষ্ট হওয়া কত বড় জঘন্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে!
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন জাহিলিয়াতের রোমশ বাহু ও নৃশংস নখরের আওতায় এসে পড়েছে সবকিছু। এ যুগে জাহিলিয়াতের থাবা একটু বেশি হিংস্র আর সারাক্ষণ উদ্যত, যেখানে জাহিলিয়াতের উৎপীড়নে মুসলিমমাত্রই দুচোখ বেয়ে অহর্নিশ বইতে থাকে নোনা অশ্রুর ধারা। যেখানে জাহিলিয়াতের নির্দেশে কোনো সন্ধ্যায় বা শেষ রাতে মুসলিমদের শহরগুলো বন্দি হয়ে পড়ে সামরিক আইন অথবা জরুরি অবস্থার শেকলে। জাহিলিয়াতের নির্দেশে প্রকাশ্যে হরণ করা হয় মুসলিমদের সব অধিকার। সান্ধ্য আইনের কবলে পড়ে রৌদ্রের দিন রূপান্তরিত হয় নিষিদ্ধ নিশীথে। বর্তমান পৃথিবীতে চিহ্নিত অপরাধীরা অবাধ স্বাধীন; আর সকল তাওহিদবাদীর বুকের দিকে উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র। এখানে প্রতিটি ব্যক্তি প্রতিমুহূর্তে আক্রান্ত হয় জাহিলিয়াতের আঘাতে। এমন পৃথিবীতে এমন সময়ে বাস করছি আমরা, যেখানে কুরআনের শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়নকে বিবেচনা করা হয় সবচেয়ে অমার্জনীয় অপরাধ বলে। যেখানে তাওহিদের বাণী উঁচু করাকে মনে করা হয় প্রকৃত জঙ্গিবাদ এবং সবচেয়ে জঘন্য সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তি হিসেবে।
ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত হলো জাহিলিয়াত। ইসলাম পৃথিবীতে আলো বিকিরণ করেছে জাহিলিয়াতের ঘোর অন্ধকার তাড়াতে। যার কারণে জাহিলিয়াতের মোকাবিলা করতে হবে একমাত্র ইসলাম, তাওহিদ ও কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা। বর্তমানে এমন মানুষও দেখা যায়, যারা জাহিলিয়াত দিয়ে জাহিলিয়াতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায়; অথচ জাহিলিয়াতের প্রতিদ্বন্দ্বিতার একমাত্র কার্যকারী উপায় হলো, তাওহিদের শক্তিকে আগ্নেয়াস্ত্রে পরিণত করা। প্রয়োজন এমন তাওহিদ, যা দুর্জয়, অক্ষয় ও অব্যয়-যা শয়তানকে হারাতে পারে, নফসকে পরাজিত করতে পারে এবং জাহিলিয়াতের দর্পকে চূর্ণ করে দিতে পারে। যা জাহিলি সমাজব্যবস্থার সঙ্গে লড়াই করতে পারে, যা বোমার মতো বিস্ফোরিত হয়ে খোদাদ্রোহিতার প্রাসাদ গুঁড়িয়ে দিতে পারে। যা স্টেনগানের মতো ভয়াবহ আওয়াজে গর্জে উঠে বাতিলের বুক ঝাঁঝরা করে দিতে পারে, আগুনের লকলকে জিহ্বার মতো ফুঁসে উঠে জাহিলিয়াতের ধ্বজাধারীদের কাল্পনিক আস্তানায় আগুন লাগিয়ে দিতে পারে- যেখান থেকে হররোজ ছুটে আসে পৈশাচিক গগনবিদারী হাসির হররা।
এসব কথা তো তার জন্য, যে জাহিলিয়াত চেনে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি জাহিলিয়াত চেনে না, তার দ্বারা ইসলামের ক্ষতি বই কিছু আশা করা যায় না। আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন,
إِنَّمَا تُنْقَضُ عُرَى الْإِسْلَامِ عُرْوَةً عُرْوَةً إِذَا نَشَأَ فِي الْإِسْلَامِ مَنْ لَا يَعْرِفُ الْجَاهِلِيَّةَ
'নিশ্চয়ই ইসলামের হাতলগুলো এক-এক করে ভেঙে যাবে, যখন ইসলামে এমন প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা জাহিলিয়াত চেনে না।'
টিকাঃ
* সহিহ বুখারি: ৬৮৮২।